বিয়াল্লিশ বছর আগের কথা হলেও আমার এখনও সব স্পষ্ট মনে আছে, মনে হয় বুঝি মাত্র সেদিনের কথা। পাকিস্তানি মিলিটারি আত্মসমর্পণ করার পর, দেশ সত্যিকার অর্থে স্বাধীন হওয়ার পর আমরা তখন প্রথমবার স্বাধীন দেশের রাজপথে বের হয়েছি। সেই অবিশ্বাস্য আনন্দের কথা আমাদের প্রজন্ম কোনোদিন ভুলতে পারবে না।
প্রথম যেদিন খবরের কাগজ বের হয়েছে সেখানে দেখি এই দুই নরঘাতক, চৌধুরী মুঈনুদ্দীন আর আশরাফুজ্জামানের ছবি। তখন ধীরে ধীরে বুদ্ধিজীবী হত্যার খবর বের হয়ে আসতে শুরু করেছে, খবরের কাগজে এই দুই নরঘাতককে ধরিয়ে দেওয়ার আবেদন বের হয়েছে। পৃথিবীর সব কাপুরুষ নরঘাতকদের মতো তারাও আত্মগোপন করে প্রাণ বাঁচিয়েছে। তাদের ধরা যায়নি।
শুধু তাই নয়, পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে যখন এই দেশে মিলিটারি শাসন শুরু হল তখন পুরো দেশটা ‘অ্যাবাউট টার্ন’ করে উল্টোদিকে হাঁটতে শুরু করল। এই দুই নরঘাতক তখন দেশ থেকে ঘুরে গেছে, কেউ তাদের স্পর্শ করেনি।
শেষ পর্যন্ত এদেশের মাটিতে তাদের বিচার হয়েছে। তাদের দুজনকেই ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়েছে। তাদেরকে ইংল্যান্ড-আমেরিকা থেকে ধরে এনে এদেশের মাটিতে ফাঁসি দেওয়া যাবে কি না আমরা জানি না। শুধু এটুকু জানি, ইতিহাসের পাতায় তারা দেশদ্রোহী নরঘাতক হিসেবে পাকাপাকিভাবে চিহ্নিত হয়ে গেল। আজ থেকে শত বছর পর আমরা কেউ থাকব না, কিন্তু এই ইতিহাসের পাতাটি থেকে যাবে, যেখানে ভবিষ্যতের বংশধরেরা ঘৃণাভরে এই মানুষ দুটির দিকে তাকাবে।
১৯৭১ সালে চৌধুরী মুঈনুদ্দীন আর আশরাফুজ্জামানের মতো জামায়াতে ইসলামীর অনেক নেতা-কর্মী ছিল যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা অস্বীকার করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আজ্ঞাবহ হয়ে এই দেশে গণহত্যায় সাহায্য করেছে। একাত্তরে এই রাজনৈতিক দলটির যে চরিত্র ছিল ২০১৩ সালে কি তাদের সেই চরিত্রে কোনো পরিবর্তন হয়েছে?
আমার মনে হয় না। যদি হত তাহলে তারা যুদ্ধাপরাধীর বিচার মেনে নিয়ে নিজেদের দলকে গ্লানিমুক্ত করত। আমরা সবাই দেখেছি একেক জন করে যুদ্ধাপরাধীর বিচারের রায় বের হয়েছে, আর এই দলটি তার প্রতিবাদে সারা দেশে এক ধরনের তাণ্ডব শুরু করেছে। তারা কি বিশ্বাস করে একাত্তরে তারা যা করেছিল সেটা সঠিক?
তারা কি মনে করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আজ্ঞাবহ হয়ে দেশে গণহত্যা করা যায় এবং যারা সেটি করেছে এই দেশের মানুষ তাদের বিচার করতে পারবে না? তারা কী বিশ্বাস করে চৌধুরী মুঈনুদ্দীন আর আশরাফুজ্জামানের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করার অধিকার ছিল? একাত্তরে সেটি যদি কোনো অপরাধ না হয়ে থাকে তাহলে ভবিষ্যতেও কি সেটি আবার করা যাবে?
আমি এই প্রশ্নটি করছি, কারণ একাত্তরে এই রাজনৈতিক দলটি যা যা করেছিল এখন তারা আবার ঠিক সেই একই কাজগুলো করতে শুরু করেছে। তারা হিন্দুদের আক্রমণ করছে, তাদের বাড়ি পুড়িয়ে দিচ্ছে। ট্রেনলাইন তুলে ফেলছে। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরদের খুন করছে।
সামনে নির্বাচন। নির্বাচন কীভাবে হবে, সেটা এখনও দেশের কেউ জানে না। দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানী-গুণী মানুষেরা এই নির্বাচন নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন। কাজেই নিশ্চয়ই কিছু একটা ফরমুলা বের হয়ে যাবে, আমি সেটা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি না। আমার প্রশ্ন নির্বাচনের পরের অংশটুকু নিয়ে।
জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে বিএনপি গতবার নির্বাচনে জিতে আসার পর এই দেশের হিন্দুদের উপর যে বিভীষিকা নেমে এসেছিল আমি এখনও সেটা ভুলতে পারি না। আমার সেটি নিয়ে একটা অন্যরকম ক্ষোভ আছে। এই দেশে প্রগতিশীল হিসেবে যেসব পত্রিকা অহংকার করে কিংবা যে বুদ্ধিজীবীরা নিজেদের পরিচয় দেন তারা দীর্ঘদিন তাদের মুখ বন্ধ করে রেখেছিলেন।
শাহরিয়ার কবীরদের মতো কিছু মানুষ বিষয়টিকে সবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর পর খুব অনিচ্ছাসত্ত্বেও এইসব পত্রিকা তাদের রিপোর্টগুলো প্রকাশ করতে শুরু করেছিল। (যারা আমার কথা বিশ্বাস করেন না তারা আজ থেকে ঠিক এক যুগ আগের পত্রপত্রিকা বের করে পড়ে দেখতে পারেন!)
এই নির্বাচনে বিএনপি যদি জিতে আসে তাহলে কি এবারেও সেই বিভীষিকাটি আমাদের দেখতে হবে? এবার যেহেতু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে, তাই যারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চেয়েছে তাদের উপর নূতন মুঈনুদ্দীন আর নূতন আশরাফুজ্জামানরা আক্রমণ করবে না তো? এক যুগ আগে যে রকম সরকার চোখ বন্ধ করে রেখেছিল, আবার কি সে রকম হবে?
আমার দ্বিতীয় আরেকটি বিষয় নিয়ে প্রশ্ন আছে, কার কাছে সেই প্রশ্ন করব বুঝতে পারছি না। আমরা সবাই দেখেছি ইসলামকে রক্ষা করার জন্যে হেফাজতে ইসলাম নামে একটা সংগঠন হঠাৎ করে আত্মপ্রকাশ করেছে। পত্রপত্রিকায় যে সব খবরাখবর পড়েছি তাতে মনে হয়েছে এটি বুঝি আওয়ামী লীগেরই তৈরি করা একটি ইসলামি দল, কারণ দেখতাম আওয়ামী লীগের মন্ত্রী হেফাজতে ইসলামের হুজুরদের সামনে নতশিরে বসে থাকতেন!
হঠাৎ করে দেখা গেল হেফাজতে ইসলাম আসলে জামায়াতে ইসলামেরই একটা নূতন সংস্করণ! গণজাগরণ মঞ্চের উপর তাদের বিশেষ রাগ। আমি একদিন শাহবাগে বসেছিলাম যখন, হেফাজতের কর্মীরা তাদের সম্মেলনের পর শাহবাগ আক্রমণ করেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা সেই আক্রমণ ঠেকিয়েছিল। তা না হলে কী হত আমি এখনও জানি না।
