যাই হোক, প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে এই চেঁচামেচিতে কিছু কাজ হয়েছে। বুয়েট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র-ছাত্রী প্রতিবাদ হিসেবে শহীদ মিনারে নিয়মিত উপস্থিত হচ্ছে। খবরের কাগজে দেখতে পেলাম আগামী ১১ জুন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে শিক্ষার ব্যাপারে আলোচনা করার জন্যে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সব শিক্ষাবিদদের ডাকা হয়েছে। সরাসরি এখনো বলা হয়নি যে তাদেরকে প্রশ্ন ফাঁস নিয়েই আলোচনা করার জন্যে ডাকা হয়েছে কিন্তু আমি আশা করছি এই সময়ে দেশের বড় শিক্ষাবিদদের ডাকা হলে তাঁরা নিশ্চয়ই এই ব্যাপারটা তুলে আনবেন। আমি এখন খুব আগ্রহ নিয়ে এই এগারো তারিখের মিটিংয়ের জন্য অপেক্ষা করে আছি।
২.
শুক্রবার ভোরবেলা আমি শহীদ মিনারে বসে ছিলাম, বিকেল বেলা এক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে আমার মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর সাথে দেখা হল। প্রশ্ন ফাঁসের মত এত বড় বিপর্যয়ের জন্য কেউ না কেউ নিশ্চয় দায়ী, যেহেতু কাউকে সেই দায় নেবার জন্য এগিয়ে আসতে দেখা যাচ্ছে না তাই খুব স্বাভাবিক ভাবেই দায়টুকু শিক্ষামন্ত্রীর ঘাড়েই এসে পড়বে। পুরস্কার বিতরণীর সেই অনুষ্ঠানেও তখন তাকে শিশু সাহিত্যের পাশাপাশি প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে কিছু কথা বলতে হল। মঞ্চে অনেকে বসে ছিলাম তার মাঝে বেছে বেছে শুধু আমাদের দুজনের ছবি তুলে সেই ছবিটা সংবাদ মাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে। শুনেছি সেই ছবি নিয়ে ফেসবুক জগতে অনেক ধরনের সমালোচনা হয়েছে । আমি কখনই ফেসবুক এর আলোচনা সমালোচনা দেখি না, দেখার সুযোগ ও নেই তাই ঠিক কোন বিষয়টিকে সমালোচনা করা হয়েছে জানি না। কিন্তু কোন বিষয়ে কারো সাথে সাময়িক মত পার্থক্য থাকলে আমি তার পাশে কেন বসতে পারব না আমি সেটা বুঝতে পারিনি। বিশেষ করে যখন একটা পুরস্কার দেবার জন্য আমাকে সেখানে ডেকে নিয়ে আয়োজকরা আমাকে সেখানে বসিয়েছেন।
আমার সাথে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর খুব ভালো সম্পর্ক তাই সেদিন ও নানা বিষয় নিয়ে কথাবার্তা হয়েছে। তিনি প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে তৈরী করে দেওয়া তদন্ত কমিটির সাথে ফোনে কথা বলে তখন তখনই আমার সাথে কথা বলার জন্য ব্যবস্থা করে দিলেন।
আমি সিলেট থাকি, শুক্র শনিবার কিংবা ছুটি ছাটায় ঢাকা যেতে পারি। তাই তদন্ত কমিটিকে পরেরদিন শনিবারেই তাড়াহুড়ো করে আমার সাথে দেখা করতে হলো। ঢাকা শহরে একটা নির্দিষ্ট সময়ে কোথাও হাজির হওয়ার মতো বিড়ম্বনা আর কিছুতে নেই, তাই ছুটির দিনে ভিন্ন ভিন্ন জায়গা থেকে ভিন্ন ভিন্ন সদস্যদের এক জায়গায় উপস্থিত হতে তাদের অনেক বেগ পেতে হয়েছিল। তদন্ত কমিটির সদস্যরা দীর্ঘ সময় বসে আমার কথা শুনলেন, আমার রাগ দুঃখ ক্ষোভ হতাশা সবকিছুই খুব সমবেদনার সঙ্গে গ্রহণ করলেন। আমি আমার কথাগুলো শুধু পত্রপত্রিকার কলাম লিখে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছিলাম, এই তদন্ত কমিটির সদস্যদের দিয়ে সেটি সঠিক জায়গায় পৌছাতে পারলে নিজেকে অনেকটা হলেও সান্তনা দিতে পারব।
৩.
আমি এক সময়ে অনিয়মিত ভাবে পত্রপত্রিকায় লিখতাম। আজকাল নিয়মিতভাবে লিখি। নিয়মের বাইরেও যদি কিছু একটা লিখি পত্রপত্রিকাগুলো সাধারণত সেগুলো ছাপাতে আপত্তি করে না। মজার ব্যাপার হল আমি যা লিখি বা যেভাবে লিখি এই দেশের অসংখ্য মানুষ তার চাইতে অনেক সুন্দর করে অনেক গুছিয়ে লিখতে পারে। আমি বিশেষভাবে চমৎকৃত হই যখন দেখি কমবয়সী তরুণ-তরুণী কিংবা কিশোর-কিশোরীরা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়ে কিছু একটা লেখে। প্রশ্ন ফাঁসের ব্যাপারে অনেকেই আমার কাছে অনেক কিছু লিখেছে সবই ব্যক্তিগত চিঠির মত, আমি সেগুলো থেকে তাদের মনের কিছু কথা পাঠকদের জন্যে তুলে দিচ্ছি।
ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্ন পেয়ে একজন লিখেছে, “… আমার প্রথম পত্র পরীক্ষা ভয়ঙ্কর খারাপ হয়েছে। ফাঁস হওয়া প্রশ্ন এসেছে দেখে লিখতে ইচ্ছে হয়নি। ঘেন্না লেগেছে। এখনো পড়ছি না, রুচি হচ্ছে না। কি হবে পড়ে বলবেন? আমার আর কিছুতেই কিছু এসে যায় না। এই সিস্টেম আমার জীবনকে তছনছ করতে পারবে না। আমি এত সস্তা না। আর পারলে করুক!”
এ রকম একটা চিঠি পেলে কেমন লাগে সেটা অনুমান করা খুব কঠিন নয়। তারপরও আমি ছেলেমেয়েগুলোর মনের জোর দেখে চমৎকৃত হই। আরেকজন লিখেছেন, “…. আমার ছোট ভাই চাকরির পাশাপাশি প্রাইভেট পড়ায়। তার একটা ভয়ানক অভিজ্ঞতার কথা শুনে আমি ভীষণ মর্মাহত হয়েছিলাম। গত ২০১৩ সালের এসএসসি পরীক্ষার সময় হিসাব বিজ্ঞান পরীক্ষার পূর্বের রাতে সে দেখে তার এক ছাত্র বাজারে ঘুরছে। সে তাকে পরীক্ষার কথা স্মরণ করে দিলে সে বলে যে তার পড়তে হবে না কারণ প্রশ্ন তার হাতে এবং প্রস্তুতি শেষ। আমার ভাই তাকে বলে, সে প্রশ্নের বিশ্বাসযোগ্যতা কি? ছাত্রের উত্তর ছিল, “স্যার গণিত পাইছিলাম হুবহু কমন, ইংরেজি দ্বিতীয় পত্র ১০০%, অতএব হিসাববিজ্ঞান নিয়া চিন্তা নাই, অবশ্যই কমন পড়বই।” পরের দিন দেখা গেল ঐ ছাত্রের কথাই সত্যি এবং সে হিসাব বিজ্ঞানে এ প্লাস এবং মোট জিপিএ ৪.৮৮ পেয়েছে। অথচ এই ছাত্র পাস করবে কি না তা নিয়ে সবাই চিন্তিত ছিল। এই হলো বাস্তবতা।”
এই চিঠির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা কী সবাই লক্ষ্য করেছে? আমরা শেষ পর্যন্ত এই বছরের এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে হইচই করছি। এই চিঠিতে কিন্তু এসএসসি পরীক্ষার কথা বলা হয়েছে- শুধু তাই নয় গত বছরের এসএসসি যার অর্থ প্রশ্ন ফাঁস আসলে হঠাৎ করে ঘটে যাওয়া একটা বিপর্যয় নয়, এটা একটা নিয়মিত ঘটনা। আমি যতদূর জানি শুধু এসএসসি নয়, পিএসসি এবং জেএসসিতেও এটা ঘটছে। যখন ভয়ঙ্কর অন্যায়কে নিয়মিত গ্রহণযোগ্য ঘটনা হিসেবে মেনে নেয়া হয় তার চাইতে সর্বনাশা কিছু হতে পারে বলে আমার জানা নেই।
