হাজার হাজার গার্মেন্টের মেয়েরা সকাল-সন্ধ্যা পরিশ্রম করতে যায়। কেউ কী কখনো তাদের মুখ ভার করে যেতে দেখেছে?
আমাদের দেশের এই অপূর্ব মানুষগুলো আমাদের শক্তি। কতোবার এই মানুষগুলোকে আঘাতের পর আঘাত করে নুইয়ে দেওবার চেষ্টা করেছে, পারেনি। প্রত্যেকবার তারা মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। এই মানুষগুলো যখন তীব্রভাবে কিছু একটা চাইবে সেটাকে কেউ উপক্ষো করতে পারবে না। সেটাকে উপক্ষো করে কেউ টিকতে পারবে না।
বাংলাদেশের মানুষ এই অসহনীয় পরিবেশ থেকে মুক্তি চায়। কোন পথে সেই অসহনীয় পরিবেশ থেকে মুক্তি আসবে সেটি দেশের সাধারণ মানুষের জানার কথা নয়। তারা সেটা জানে না। কিন্তু তাদেরকে এই অসহনীয় পরিবেশ থেকে মুক্তি দিতে হবে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তিকে অবমাননা করা যাবে না।
কীভাবে সেটি করা হবে আমরা জানি না। কিন্তু সেটি করতে হবে। আমরা এই বিষণ্ন বাংলাদেশকে দেখতে চাই না।
ভাঙ্গা রেকর্ড
১.
পরীক্ষার প্রশ্নপ্রত্র ফাঁসের ব্যাপারটি গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের নজরে আনার জন্য আমি অনেকদিন থেকে চেষ্টা করে আসছিলাম, খুব একটা লাভ হয় নি । তাই শেষ পর্যন্ত আমাকে গত শুক্রবার একটি নাটকীয় কাজ করতে হল, আগের দিন পত্রিকায় একটা লেখা পাঠিয়ে, আমি সেখানে লিখলাম বিষয়টার প্রতিবাদ হিসাবে পরের দিন শুক্রবার আমি শহীদ মিনারে একটা প্ল্যাকার্ড নিয়ে বসে থাকব। তখন অনেকেই আমার কাছে জানতে চাইল কখন কিভাবে আমি সেখানে যাব। সাংবাদিকেরা, টেলিভিশন চ্যানেল গুলো আমার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করল কিন্তু আমি কারো কোন প্রশ্নের উত্তর দিলাম না। পুরো বিষয়টি ছিল একান্তভাবেই আমার ব্যক্তিগত প্রতিবাদ, সেখানে আমি নিজে থেকে কাউকেই ডাকতে পারি না। কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারি না। নিজের উদ্যোগে কেউ চলে আসলে সেটি ভিন্ন কথা।
শুক্রবার অনেকেই শহীদ মিনারে চলে এল। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা আছে, স্কুলের শিশুরা আছে, এইচ এস সি পরীক্ষার্থীরা আছে, বেশ কিছু শিক্ষক আছেন, এক দুইজন গৃহিণীও আছেন। কিছুক্ষনের ভেতর সংবাদপত্র, রেডিও এবং টেলিভিশনের সাংবাদিকেরাও চলে আসতে শুরু করলেন। বৃষ্টিতে ভিজতে আমার খুব ভাল লাগে আর সত্যি সত্যি ঝুম বৃষ্টি শুরু হল, অন্যদের বৃষ্টিতে ভিজতে কেমন লাগে আমি জানি না, কিন্তু শহীদ মিনারে প্রায় সবাই সেই বৃষ্টিতে কাক ভেজা হয়ে গেল। (আমি অনেককে বৃষ্টিতে ভেজার কথা শুনলে আতকে উঠতে দেখিছি। কিন্তু সবাইকে বলে রাখি আমাদের দেশের বৃষ্টির মত সুন্দর আর কিছু নেই। বৃষ্টিতে ভিজলে জ্বর হয় আমার জীবনে সেটি কখনো ঘটেনি।)
শহীদ মিনারে একটা প্ল্যাকার্ড নিয়ে আমার বসে থাকার কথা ছিল, আমি তাই খুব যত্ন করে একটা প্ল্যাকার্ড তৈরি করে সেখানে লিখে নিয়ে গেলাম “প্রশ্ন ফাঁস মানিনা মানবনা ছেলে মেয়েদের স্বপ্ন ধ্বংস হতে দিব না।” আজকাল ক্যামেরার কোন অভাব নেই তাই সেখানে প্রচুর ছবি তোলা হল এবং আমি প্ল্যাকার্ড নিয়ে বসে আছি সেই ছবিটা নিশ্চয়ই ফেসবুককে ভালোভাবে ছড়িয়ে পড়লো। কিন্ত আমি আসলে এই বিষয়টার কথা বলতে যাচ্ছি না, অন্য একটা কথা বলতে চাচ্ছি। প্লে-কার্ড হাঁতে আমার শহীদ মিনারে বসে থাকার ছবিটি নিয়ে একটা বিচিত্র ঘটনা ঘটল। কোন একজন ছবির প্ল্যাকার্ড এ আমার লেখার নামে খানিকটা পরিবর্তন করে সেই ছবিটা ফেসবুক এ ছেড়ে দিল। এখন এই ছবিটা দেখলে যে কেউ ভাববে আমি যে শুধু মাত্র প্রতিবাদ করছি তা নয় প্রশ্ন ফাঁস হওয়া পরীক্ষা গুলো বাতিলও করার দাবি জানাচ্ছি।
প্রশ্ন ফাঁস হয়ে যাওয়ার এই মহা বিপর্যয়ের জন্য ঠিক কি করতে হবে আমি কিন্তু সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ঠ একটি দুটি কথা বলেছি। কাউকে সব পরীক্ষা বাতিল করে নতুন করে পরীক্ষা নেয়ার পরামর্শ দেইনি। কিন্তু আমি সেটাই দাবী করছি কিছু মানুষ এই সংবাদটা প্রচার করার জন্য খুব ব্যস্ত। কারনটা কি সেটি এখনো আমার কাছে রহস্য। আমার জীবনে এটি নতুন কোন রহস্য নয়, একসময় স্বাধীনতা বিরোধী ধর্মান্ধরা আমার বিরুদ্ধে লেগে থাকত, এখন অন্যরাও তাদের সাথে যোগ দিচ্ছে।
যাই হোক শহীদ মিনারে প্ল্যাকার্ড নিয়ে বসে থাকার কারনে একটা খুব বড় কাজ হল, হটাৎ করে সারা দেশের সব মানুষ জানতে পারল দেশে খুব বড় একটা বিপর্যয় ঘটে গেছে। যারা দীর্ঘ দিন থেকে মেনে নিয়েছিল যে, “পরীক্ষা মানেই হল প্রশ্ন ফাঁস” তারাও এবার নড়ে চড়ে বসলো। যে সব সংবাদপত্র এতদিন ভুলেও প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে একটি লাইন ও লিখেনি তারা সম্পাদকীয় লিখতে শুরু করল, যে টেলিভিশন চ্যানেল প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে কিছু প্রচার করেনি তারা আমাকে কিংবা আমার মত শিক্ষকদের টক শোতে ডাকতে শুরু করলো, এমনকী শিক্ষাবিদেরাও প্রশ্ন পত্র ফাঁস নিয়ে কলাম লিখতে শুরু করলেন। একটা সমস্যার অস্তিত্ব স্বীকার করে নেয়া হলেই শুধু মাত্র সেই সমস্যার সমাধান করা যায় – মনে হল শিক্ষা মন্ত্রনালয় সেটি পুরোপুরি স্বীকার করে না নিলেও দেশের মানুষ সেটা স্বীকার করে নিয়েছে। কাজেই বিষয়টাকে আর সম্ভবতঃ ধামা চাপা দিয়ে রাখা যাবে না।
তবে সংবাদ মাধ্যমকে নিয়ে আমার এখন কিছু বক্তব্য রয়েছে- তাদের দায়িত্বটি আমি এখনো পুরোপুরি বুঝতে পারছি না। এবারে যে ব্যাপক ভাবে প্রশ্ন পত্র ফাঁস হয়েছে সেটি নিয়ে আমার কিংবা পরীক্ষার্থীদের মাঝে তিল পরিমান সন্দেহ নেই। পরীক্ষার আগে যে প্রশ্নটি এসেছে দুদিন পর সেই প্রশ্নটিই পরীক্ষায় আসছে এখানে সন্দেহ করার জায়গাটি কোথায় ? কিন্তু সংবাদ মাধ্যম গুলো কেন জানি পুরো বিষয়টি এখনো নিশ্চিত সত্য বলে স্বীকার না করে এটি অভিযোগ বলে গা বাঁচিয়ে সংবাদ পরিবেশন করে যাচ্ছে। এটি শুধুমাত্র একটা অভিযোগ নাকি সত্যি সত্যি এটা ঘটেছে সেটি প্রমাণ করার দায়িত্ব কার? আমার নাকি সংবাদ মাধ্যমের? আমি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবার পরও সংবাদ মাধ্যম কেন সেটি বিশ্বাস করে এটাকে একটি সত্য ঘটনা হিসেবে প্রচার করে না? কেন তারা এটাকে শুধুমাত্র একটা অভিযোগ হিসেবে বিবেচনা করে?
