কাজেই ভর্তি পরীক্ষার মেধাতালিকায় ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের নাম খুঁজে না পেলে তারা যেন মন খারাপ না করে, নিজের উপর বিশ্বাস যেন না হারায়। সবসময়ই সেটি মেধার অভাব নয়, অনেক সময় সেটি সঠিক গাইড বই মুখস্ত করার ইচ্ছের অভাবও হতে পারে! এই দেশে যে ভর্তি কোচিংয়ের বিশাল একটা রমরমা ব্যবসা হতে থাকে, তার একমাত্র কারণ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় মুখস্ত নির্ভর গাইড বইয়ের প্রশ্ন!
৪.
আমি মনে করি, এখন আমাদের সময় হয়েছে অন্তত বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ছাত্রছাত্রীদের সত্যিকারের সম্মিলিত একটি ভর্তি পরীক্ষা উপহার দেওয়ার। নিঃসন্দেহে তার আগে অনেকগুলো বাধা পার হয়ে আসতে হবে। কিছু কিছু বাধা হয়তো বেশ জটিল, মনে হতে পারে প্রায় দুঃসাধ্য।
কিন্তু এই দেশের নতুন প্রজন্মের দিকে তাকিয়ে আমরা যদি সিদ্ধান্তটি নিয়ে নিই, তাহলে এই দেশের সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক মিলে নিশ্চয়ই সব বাধা অতিক্রম করতে পারব। কিন্তু সিদ্ধান্তটি নিতে হবে প্রথম।
যদি সেই সিদ্ধান্তটি নিতে না পারি, তাহলে নতুন প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। আর সংবাদ মাধ্যম যদি ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর আমাদের ব্যাংক ব্যালেন্স কতটুকু বেড়ে যায়, সেই তথ্যটি প্রকাশ করে দেয় তাহলে আমরা দেশের মানুষের সামনে লজ্জায় মুখও দেখাতে পারব না!
আমাদেরকেই ঠিক করতে হবে আমরা কী চাই।
বিষণ্ন বাংলাদেশ : সাদাসিধে কথা
প্রায় ছয় মাস আগে আমি ঠিক করেছিলাম যে প্রতি দুই সপ্তাহে আমি একটি করে কলাম লিখব। যারা লেখালেখি করেন তারা জানেন এটা একটা অনেক বড় সিদ্ধান্ত। প্রতি দুই সপ্তাহে একটা করে কলাম লেখা সোজা ব্যাপার না। তারপরেও আমি এতো বড় একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম দুটি কারণে। প্রথমত, এদেশের অনেকগুলো পত্রিকা সেটি একইসঙ্গে ছাপাতে রাজি হয়েছে। সারা পৃথিবীতে লেখকদের সম্মান দেওয়ার এই ব্যাপারটি আমার এ কলাম দিয়ে বাংলাদেশে প্রথমবার শুরু হলো।
দ্বিতীয়ত, আমার অসংখ্য বিষয় নিয়ে অসংখ্য জিনিস লেখার আছে। পাঠকরা আমার সব মতামত মেনে নেবেন সেটা আমি কখনো আশা করি না (কিংবা করতে চাই না)। কিন্তু কয়েক মিনিট সময় দিয়ে সেটা অনেকে পড়তে রাজি থাকবেন সেরকম আশা করা এমন কিছু দোষের নয়। কাজেই আমি ধরেই নিয়েছিলাম লেখার বিষয়বস্তু নিয়ে আমার কোনো সমস্যা হবে না।
লেখার বিষয়ে এখনো কোনো অভাব নেই। কিন্তু আমি সেগুলো নিয়ে লিখতে পারছি না। আমি যখন এটা লিখছি তখনো নতুন বছর শুরু হয়নি। কিন্তু এটা যখন প্রকাশিত হবে তখন নতুন বছর শুরু হবে। এই বছরটি শুরু হবে অবরুদ্ধ থেকে। একটা অবরুদ্ধ দেশে যখন মানুষকে গাড়ির ভিতরে পুড়িয়ে মারার কালচার তৈরি হয়েছে, ককটেলে শিশুর হাত উড়ে যাওয়া নিত্তনৈমত্তিক ঘটনা, শুধু ভিন্ন রাজনৈতিক দল করে বলে একজন নারীকে মাটিতে ফেলে তাকে কিল ঘুষি লাথি মেরে সেটার পক্ষে একটা যুক্তি পর্যন্ত দাঁড় করানো যায়, তখন আসলে বিচিত্র বিষয়ে কলাম লেখার ইচ্ছে করে না। তাই গত কয়েক মাস থেকে দুই সপ্তাহ পর পর কলাম লেখার দায়িত্বটি আমার জন্য আনন্দময় অভিজ্ঞতা নয়। অনেক সময়েই মন খারাপ করার সময়।
অথচ গত সপ্তাহটি খুব আনন্দময় একটি সময় হতে পারত। পঞ্চম শ্রেণি আর অষ্টম শ্রেণির সম্মিলিত পরীক্ষার রেজাল্ট হয়েছে এ সপ্তাহে। পরীক্ষা দু’টির নাম এইচএসসি ও এসএসসি’র কাছাকাছি- জেএসসি ও পিএসসি।
ছোট ছোট বাচ্চারা গম্ভীর হয়ে পরীক্ষা দিতে যায়, আবার সারা দেশব্যাপী এসব ছেলে-মেয়েদের একসাথে পরীক্ষার ফল বের হয়। টেলিভিশনে তার ঘোষণা দেওয়া হয়। এসব মিলিয়ে একটা হুলুস্থুল ব্যাপার। যেদিন পরীক্ষার রেজাল্ট হয় সেদিন বাচ্চারা স্কুলে এসে ভিড় করে। ক্যামেরার সামনে তাদের মুখের হাসি দেখলে আমাদের হতাশা, দুঃখ, কষ্ট, দুশ্চিন্তা দূর হয়ে যায়।
এবার যেদিন পরীক্ষার রেজাল্ট দেওয়া হবে সেদিনই সরকার আর বিরোধীদলের অগ্নিপরীক্ষা। সংসদ ভবনের ভেতরে মাইক্রোফোনে সরকার আর বিরোধীদলের শক্তি পরীক্ষা যতটুকু সুন্দর, পথে ঘাটে, রাস্তায় তাদের শক্তিপরীক্ষা ঠিক ততটুকু অসুন্দর।
তাই আমরা দেখেছি স্কুলে স্কুলে ছেলে-মেয়ে বলতে নেই। তাদের ভেতর সেই উচ্ছ্বাস নেই, আনন্দ নেই।
পুরো জাতি তাদের সেই হাসি মুখ দেখার আনন্দ থেকে বঞ্চিত হলো।
পরীক্ষার রেজাল্ট খুবই ভালো। আমরা সবাই খুব আনন্দিত, কিন্তু তার পরেও একটা ব্যাপার নিয়ে আমার ভেতরে একটা দুর্ভাবনা রয়ে গেছে।
সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই একটি করে স্কুল থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছেলে-মেয়েদের পড়ার জন্য তৈরি হলেও আশপাশের বাচ্চারাও পড়তে পারে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের যে স্কুলটা রয়েছে সেটা পরিচালনা করার যে কমিটি, আমি তার আহ্বায়ক।
তাই প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে স্কুলে গিয়ে বসে থাকি। বাচ্চাদের ছোটাছুটি দুষ্টুমি দেখি। (তারা কখনো আমাকে নিরাশ করে না)। মাঝে মাঝে স্কুলের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়েও কথা বলতে হয়।
স্কুলের শিক্ষদের সাথে একবার এরকম একটা বিষয় নিয়ে কথা হচ্ছিল। অষ্টম শ্রেণি পাস করে নবম শ্রেণিতে ওঠার পর কারা বিজ্ঞান পড়বে তা কীভাবে ঠিক করা হবে, সেটি ছিল আলোচনার বিষয়।
আমি বললাম জেএসসির রেজাল্ট দেখলেই বোঝা যাবে কার কোন বিষয়ে আগ্রহ, কোন বিষয়ে দক্ষতা। সেটা দিয়েই ঠিক করে নেওয়া যাবে। শিক্ষকরা নিজেদের ভেতর শুধু চাওয়া-চাওয়ি করলেন। তারপর একজন সাহস করে বললেন, যে আসলে জেএসসি’র রেজাল্ট সবারই এতো অস্বাভাবিক রকম ভালো থাকে যে খুব বেশি বিশ্বাস করা যায় না। স্কুলের নিজস্ব পরীক্ষাগুলো আরো বেশি নির্ভরযোগ্য!
