একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় এক সাথে পরীক্ষা নেওয়ার একটা বড় সুবিধা হচ্ছে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন তৈরি করার সময় শুধু একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সহযোগিতা নিয়ে খুশি থাকতে হবে না, দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা বসে প্রশ্ন তৈরি করতে পারবেন। সেজন্য হয়তো তাদের দুই একদিন এক সাথে বসতে হবে কিন্তু কোনো শিক্ষকরাই সেটা করতে আপত্তি করবেন না।
এই পদ্ধতিটি গ্রহণ করা হলে সবচেয়ে বড় লাভ হবে ছাত্রছাত্রীদের। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে সারাদেশ থেকে ছাত্রছাত্রীরা পড়তে আসে। যার অর্থ সারাদেশ থেকে ছাত্রছাত্রীদের ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসতে হয়। এই বছর তাদের কষ্ট অনেক কমে যাবে। সেই উত্তর বঙ্গের ছাত্রছাত্রীদের কষ্ট করে সিলেট আসতে হবে না। তারা কাছাকাছি যশোর ক্যাম্পাসেই পরীক্ষা দিতে পারবে। ঠিক সেরকম সিলেট এলাকার কোনো ছাত্রছাত্রী যদি যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে চায়, তাকে আর কষ্ট করে যশোর যেতে হবে না। তারা সিলেট বসেই ভর্তি পরীক্ষা দিতে পারবে। একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দিয়ে দুটো বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কোনো বিভাগের জন্য বিবেচিত হতে পারবে।
আমাদের এই দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার তারিখ নভেম্বরের শেষে (৩০ নভেম্বর)। কিন্তু রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। আমাদের তরুণ শিক্ষকেরা সবকিছু গুছিয়ে রেখেছেন। আমরা ইচ্ছে করলেই নেটে দেখতে পারি- কত জন এখন পর্যন্ত এই দুটো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরীক্ষা দিতে রেজিস্ট্রেশন করেছে। রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া শেষ হতে এখনো কয়েক সপ্তাহ বাকি। এর মাঝে আমরা দেখতে পাচ্ছি, প্রতি দশজনের মাঝে একজন ঠিক করছে তারা যশোর বসে সিলেটের জন্যে কিংবা সিলেটে বসে যশোরের জন্যে ভর্তি পরীক্ষা দেবে। যার অর্থ ভর্তি পরীক্ষার সময় বিপুল সংখ্যক পরীক্ষার্থী আর তাদের অভিভাবকদের দেশের এক মাথা থেকে অন্য মাথায়, না ঘুমিয়ে না খেয়ে না বিশ্রাম নিয়ে আসতে হবে না। ভবিষ্যতে যদি আমাদের এই উদ্যোগের সাথে আরও বিশ্ববিদ্যালয় যোগ দেয় তাহলে কী চমৎকার একটা ঘটনাই না ঘটবে।
২.
আমাদের বিশ্বাস, আমরা যে উদ্যোগটি নিয়েছি সেটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্যোগ। একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় মিলে যে একটি ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের ভোগান্তি কমানো সম্ভব, সেটি হয়তো এবারে প্রমাণ করা যাবে। অবশ্য এটি নতুন করে প্রমাণ করার কিছু নেই, মেডিকেলের ভর্তি পরীক্ষায় বহুদিন থেকে এটি করা হচ্ছে। শুধু মেডিকেল কলেজের জন্য এটি করা হয় তা নয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও প্রতিবছর সারা দেশের অসংখ্য কলেজে তিন চার লক্ষ ছাত্রছাত্রীদের ভর্তি পরীক্ষা নেয়। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমরা একবার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার সুযোগ পেয়েছিলাম। তখন আমি সরাসরি নিজের চোখে এই বিশাল কর্মযজ্ঞটি দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। দীর্ঘদিন থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় দক্ষতার সাথে এই পরীক্ষাটি চালিয়ে আসছে। যার অর্থ বাংলাদেশের সব কয়টি বিশ্ববিদ্যালয় মিলে একটি ভর্তি পরীক্ষা নিতে হলে যে কাজগুলো করতে হবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নীরবে প্রতিবছর সে কাজগুলো করে আসছে। অথচ মজার ব্যাপার হলো, আমাদের দেশের সংবাদ মাধ্যম কখনোই এই বিশাল প্রক্রিয়াটি দেশের মানুষের নজরে আনেনি। কোনো একটা অজ্ঞাত কারণে আমাদের দেশের সংবাদ মাধ্যম খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতিবাচক খবরগুলো বের করে সেটা ফলাও করে প্রচার করতে পছন্দ করে। তাদের সত্যিকারের ইতিবাচক সংবাদটিও কাউকে জানাতে আগ্রহী হয় না। মজার ব্যাপার হচ্ছে, দেশের হাই-ফাই ইউনিভার্সিটির হাই-ফাই গ্র্যাজুয়েটদের প্রায় সবাই কিন্তু দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। দেশটি চালাচ্ছে কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু গ্র্যাজুয়েটরা। অথচ সংবাদ মাধ্যমের এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কোনো সমবেদনা নেই, কোনো মমতা নেই। আমাদের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশাল সংখ্যক ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা করে। দেশের সরকার যদি এই বিশ্ববিদ্যালয়টিকে একটু গুরুত্ব দিয়ে তাদের সমস্যাগুলো মিটিয়ে দিতে আগ্রহী হত, তাহলে পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর নয়, আমাদের নিজের দেশের অনেক বড় উপকার হত!
৩.
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা শেষ হওয়া মানেই সব সমস্যার সমাধান নয়। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অল্প কিছু আসন, পরীক্ষার্থী অসংখ্য। তাই বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রীই আসলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায় না। জিপিএ ফাইভ বা গোল্ডেন ফাইভ পাওয়া অনেক ছাত্রছাত্রী যখন আবিস্কার করে ভর্তি পরীক্ষার মেধা তালিকায় তাদের নাম নেই, তখন তারা একটা অনেক বড় ধাক্কা খায়। যে আত্মবিশ্বাস নিয়ে তারা এতদিন লেখাপড়া করে এসেছে, ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে এসেছে, হঠাৎ করে তাদের আত্মবিশ্বাস ধূলিস্যাৎ হয়ে যায়, স্বপ্ন খান খান হয়ে যায়। আমি এই ছাত্রছাত্রীদের বলতে চাই, সবসময়ই কিন্তু এই সমস্যার জন্য তারা নিজেরা দায়ী নয়। এই দেশের অনেক নামীদামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নই কিন্তু খুব নিম্নমানের। অনেক সময়ই মেধাতালিকায় ভালো করা আর লটারীতে নাম ওঠার মাঝে বড় কোনো পার্থক্য নেই। হাইকোর্ট থেকে একবার আমাকে খুব বড় কোন একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো একটা ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে মতামত দেওয়ার জন্য ডেকেছিল। আমার তখন সেই ইউনিটের প্রশ্নগুলো দেখার সুযোগ হয়েছিল, আইনজীবীরা কোন প্রশ্নটি কোথা থেকে নেওয়া হয়েছে সেটা খুঁজে খুঁজে বের করে দাখিল করেছিলেন এবং আমি এক ধরণের আতঙ্ক নিয়ে আবিস্কার করেছিলাম সেই ভর্তি পরীক্ষার প্রতিটি প্রশ্নই কোনো না কোনো গাইড বই থেকে নেয়া!
