আমরা যখন কোথাও গিয়েছি আমার ব্যাগে একটা বা দুটো বই থাকত। এখন যখন কোথাও যাই আমার ই-বুক রিডারে শ’খানেক বই থাকে। প্রয়োজনে আরও কয়েক হাজার বই থেকে যে কোনো বই কিনে ফেলার সুযোগ থাকে। কেউ বিষয়টা মেনে নিক আর নাই নিক, নূতন পৃথিবী কিন্তু খুব দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। আজ থেকে কয়েক বছর পর সব কাগজের বইয়ের পাশাপাশি এই অদৃশ্য ই-বুক জায়গা করে নেবে। লেখাপড়া, জ্ঞান-বিজ্ঞান, গবেষণার জগতে এটা আসলে ঘটে গেছে। বিশেষ কিছু বইয়ের বেলায় কাগজের বই এখন অর্থহীন, প্রায় সব জার্নাল এখন ইলেকট্রনিক।
আমরা যারা পুরানো আমলের মানুষ তারা এখনও কাগজের বই আঁকড়ে ধরে রেখেছি কিন্তু নূতন প্রজন্মের মাঝে কোনো গোঁড়ামি নেই, তারা কাটশট নূতন স্টাইলে বই পড়া শুরু করবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, ভবিষ্যতে স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের নূতন বই না দিয়ে একটা ট্যাবলেট দেওয়া হবে সেখানে সকল পাঠ্যবই ডাউনলোড করে দেওয়া হবে!
বিষয়টা কিন্তু খুবই অবাস্তব কল্পনা নয়। প্রতি বছর প্রায় তিরিশ কোটি নূতন বই ছাপানো থেকে এটা লক্ষগুণ সহজ কাজ। ছোট শিশুরা নূতন পদ্ধতিতে ঝটপট অভ্যস্ত হয়ে যায়। কাজেই ঠিক করে পরিকল্পনা করে একটা দুটা পাইলট প্রজেক্ট হাতে নিলে এই বিপ্লবটি করে ফেলা যেতেই পারে।
কাজেই সবাইকে মাথায় রাখতে হবে বইয়ের জগতে নূতন একটা পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। যারা পরিবর্তনটুকু গ্রহণ করতে রাজি আছে তারা এ ব্যাপারে থাকবে। অন্যেরা পিছিয়ে যাবে।
আমাদের দেশেও কিন্তু এই উদ্যোগটি নেওয়া শুরু হয়েছে। প্রতি কয়েক বছর আমার কাছে বেশ কয়েকজন উদ্যোক্তা এসেছেন, আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, তারা আমার একটি দুটি বই ই-বুকে পাল্টে নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষাও শুরু করেছেন। এ বছরও একাধিক উদ্যোক্তা এই প্রক্রিয়াটি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছেন।
বিষয়টা ঠিক কীভাবে অগ্রসর হবে আমরা জানি না। যারা প্রযুক্তিবিদ তারাই কি প্রকাশক হয়ে যাবেন কী না সেটা নিয়েও অনেকের মাঝে সন্দেহ রয়েছে। আমার ধারণা প্রযুক্তিবিদেরা যদি শুধুমাত্র প্রযুক্তির একটা ভিত্তি তৈরি করে দেন আর প্রকাশকেরা কাগজের বইয়ের পাশাপাশি ইলেকট্রনিক বই ছাপানোর দায়িত্ব নিয়ে নেন– তাহলেই এই নূতন বিষয়টা ঘটে যেতে পারে। আমরা অনেক কম খরচে অনেক বই পড়া শুরু করতে পারব।
বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির জন্যে প্রতি বছর আমাদের আক্ষরিক অর্থে কোটি কোটি টাকার বই কিনতে হয়। বিদেশি একটা বইয়ের দাম দশ-পনর হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আইসিটি ইনসটিটিউট তৈরি হচ্ছে। তার লাইব্রেরির জন্যে প্রায় তেরো হাজার বই কেনার অর্ডার দেওয়া হয়েছে। গড়ে একটা বইয়ের দাম পড়েছে মাত্র চল্লিশ টাকা! কারণ বইগুলো ই-বুক।
ইনসটিটিউট তৈরি শেষ হয়নি, লাইব্রেরির দেওয়াল উঠেনি, সেলফ কেনা হয়নি। তের হাজার বই যে কোনোদিন চলে আসবে। বইগুলো কোথায় রাখা হবে সেটা নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র দুশ্চিন্তা নেই। বইগুলো উইয়ে খেয়ে ফেলবে কী না সেটা নিয়েও আমার দুশ্চিন্তা নেই। কোনো দুষ্টু ছেলে বইয়ের পাতা কেটে ফেলবে কী না সেটা নিয়েও দুশ্চিন্তা নেই।
আমাদের ডাটা সেন্টারের সার্ভারের হার্ড ড্রাইভে তের হাজার বই রাখতে কিংবা সংরক্ষণ করতে আমার এক চিমটিও বাড়তি জায়গা লাগবে না!
ভবিষ্যতের লাইব্রেরি কেমন হবে সেটি কি সবাই কল্পনা করতে পারছে?
বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড (জানুয়ারি ২৫, ২০১২)
কিছুদিন আগে আমি হিসাব করে দেখলাম, আমাদের দেশে এখন অনেক অলিম্পিয়াড শুরু হয়েছে। গণিত অলিম্পিয়াড দিয়ে শুরু। তারপর দেখতে দেখতে বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড, পদার্থবিজ্ঞান অলিম্পিয়াড, ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াড, রসায়ন অলিম্পিয়াড, প্রাণরসায়ন অলিম্পিয়াড, অ্যাস্ট্রোনমি অলিম্পিয়াড, ভাষা অলিম্পিয়াড এবং এমনকি একেবারে শেষ সংযোজন দাবা অলিম্পিয়াড! সবটা যে একই রকম ও আকারে হচ্ছে, তা নয়। কিন্তু শুরু যে হয়েছে_ সেটাই সবচেয়ে বড় কথা। আন্তর্জাতিক গণিত আর ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াড থেকে আমাদের ছেলেমেয়েরা এর মধ্যে রীতিমতো মেডেল নিয়ে এসেছে। অন্য কয়েকটাতে পৃথিবীর আসরে বাংলাদেশের নাম সম্মানসূচকভাবে উচ্চারিত হচ্ছে। আমাদের বড় বড় মানুষ, বড় বড় খেলোয়াড়রা যা পারেননি, বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়ে সেটা করে ফেলছে। কী চমৎকার একটা ব্যাপার!
এই চমৎকার ব্যাপারটার মাঝেও কিন্তু আমাদের খানিকটা ক্ষোভ রয়ে গেছে। বড় মানুষেরা যেটা দেশের জন্য করতে পারেননি, ছোট বাচ্চারা সেটা করে ফেলছে। তারপরও এই বিষয়গুলোতে কেন জানি সাহায্য-সহযোগিতা পাওয়া যায় না। সরকারের কথা ছেড়েই দিলাম, সামরিক বাহিনীর জন্য সরকারের বিশাল বাজেট। এবার মনে হয় সেটা আরও বেড়ে গেছে। আমাদের কোনো আপত্তি থাকত না, যদি দেখতাম আমাদের শিক্ষা খাতেও বাজেট একইভাবে বাড়ছে। কিন্তু আসলে সেটি ঘটেনি, শিক্ষা খাতে বাজেট কমেছে।
একটি ছাত্র যদি একটু কিছু শেখে, সঙ্গে সঙ্গে দেশ আরও একটু সম্পদশালী হয়ে ওঠে। কিন্তু তারপরও শিক্ষার বাজেট কমতে থাকে! আর শিক্ষার পাশাপাশি এই কার্যক্রমগুলো? সেগুলোর জন্য কোথাও কোনো অর্থ নেই! এক গণিত অলিম্পিয়াড ছাড়া অন্য কোনো অলিম্পিয়াডের ভদ্র কোনো বাজেট আছে বলে আমার জানা নেই। কেউ যদি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন, তাহলে তারা অবাক হয়ে দেখবেন, অনেক ক্ষেত্রেই একেবারে ব্যক্তিগত পর্যায়ে কিছু মানুষের অর্থ সাহায্যে এগুলো টিকে আছে! আমার কাছে ব্যাপারটা রহস্যের মতো মনে হয়_ শিশুদের জন্য টাকা খরচ করতে সবার এত কার্পণ্য কেন? একটি ব্যান্ড শো বা একটি ক্রিকেট খেলার জন্য আক্ষরিক অর্থে কোটি কোটি টাকা খরচ করা হয়। কিন্তু শিশুদের কার্যক্রম চালাতে উৎসাহী মানুষেরা বড় বড় কোম্পানি, বড় বড় প্রতিষ্ঠানের দ্বারে ঘুরতে থাকেন, কিন্তু কেউ ফিরেও তাকায় না। এই দেশের হর্তা-কর্তা-বিধাতারা এত শিশুবিদ্বেষী কেন? আমি তার অর্থ খুঁজে বের করতে পারি না! কেউ কি কখনও লক্ষ্য করেছেন ঈদে প্রায় কয়েকশ’ নাটক দেখানো হয়, তার মধ্যে বাচ্চাদের নাটক বলতে গেলে একটিও নেই! যদিও এ দেশে শুধু স্কুলের বাচ্চার সংখ্যাই তিন কোটি! ছোট বাচ্চাদের বিনোদনের কোনো সুযোগ নেই, তাদের জন্য আলাদা কোনো সিনেমা তৈরি হয় না, বই লেখা হয় না। কী আশ্চর্য!
