কিন্তু আমার ধারণা, বইপড়া একটা অসাধারণ বিষয়। যত দিন যাচ্ছে আমার সেই ধারণাটা আরও পোক্ত হচ্ছে। আমি জানি না সবাই এই বিষয়টা লক্ষ্য করছে কী না, আমরা যখন কিছু একটা পড়ি তখন আসলে কাগজের উপর আঁকি-বুকি করে রাখা কিছু ছোট ছোট চিহ্নের দিকে তাকাই (সেগুলোকে আমরা বর্ণ বা অক্ষর বলি)। সেই চিহ্নগুলো চোখের লেন্সের ভেতর দিয়ে (উল্টো হয়ে) রেটিনার উপর পড়ে। রেটিনা থেকে সেই সিগন্যাল মস্তিষ্কে যায়। মস্তিষ্ক সেগুলোকে বিশ্লেষণ করে। আমরা তখন তার মর্মোদ্ধার করি।
তারপর আসল ব্যাপারটা শুরু হয়– যেটা পড়েছি সেটা কল্পনা করি। যার কল্পনাশক্তি যত ভালো সে তত চমৎকারভাবে পুরো বিষয়টা উপভোগ করে। পুরো বিষয়টা আসলে অবিশ্বাস্য রকম উঁচুমানের একটা কাজ, মানুষ ছাড়া আর কারও পক্ষে সেটা করা সম্ভব না। যারা বই পড়ে, নিঃসন্দেহে তারা যারা পড়ে না তাদের থেকে ভিন্ন।
আমাকে মাঝে মাঝেই অনেকে জিজ্ঞেস করে, ভালো লেখক হওয়ার কোনো একটা শর্টকাট পদ্ধতি আমার জানা আছে কী না। আমি সবসময়েই বলি, ভালো লেখক হওয়ার একমাত্র পদ্ধতি হচ্ছে বই পড়া। যে যত বেশি বই পড়বে সে তত ভালো লিখতে পারবে। আমি এটা জোর দিয়ে বলি, কারণ আমাদের পরিবারের হুমায়ূন আহমেদ এই দেশের একজন অসাধারণ লেখক ছিল, আর সে একেবারে শিশু বয়স থেকে শুধু বই পড়ে আসছে। আমার মনে হয় সে জন্যে সে এত সুন্দর লিখতে পারত।
বই পড়ে সবাই যে সফল লেখক হয়ে যাবে তা নয় কিন্তু বই পড়লে নিশ্চিতভাবে নিজের ভেতরে একটা পরিবর্তন হয়। সেই কবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মারা গেছেন, জীবনানন্দ দাস ট্রামের তলায় চাপা পড়েছেন। মজার ব্যাপার হল, তাদের লেখাগুলো এখনও পুরোপুরি জীবন্ত। যখন পড়ি তখন মনে হয় তাঁরা বুঝি সামনে বসে আছেন। আমাদের দেশের মানুষের বইপড়ার অভ্যাসটি কম। যত দিন যাচ্ছে মনে হয় অভ্যাসটি আরও কমে যাচ্ছে।
ইউরোপ-আমেরিকার বাস বা রেলস্টেশনে অপেক্ষা করার সময় দেখা যায় সবাই একটা না একটা বই পড়ছে (আজকাল ই-বুক রিডার দিয়েও পড়ে)। খুব যে গভীর জ্ঞানের বই তা নয়, জনপ্রিয় কোনো বই কিন্তু পড়ছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সেই তুলনায় আমাদের দেশের বাস-ট্রেন-স্টেশনে গেলে দেখতে পাই মানুষজন খুবই বিরস বদনে কিছু না করে চুপচাপ বসে আছে (আজকাল মোবাইল টেলিফোন হয়েছে, তাই হয়তো মোবাইল ফোনে জোরে জোরে কথা বলছে)।
কিন্তু বইপড়ার দৃশ্য খুবই কম। আমি লক্ষ্য করে দেখেছি, যদি-বা কেউ বই পড়ে সেটি হবে কমবয়সী ছেলে বা মেয়ে, বড় মানুষ নয়। বড় মানুষেরা পত্রিকা পড়তে পারে। বড়জোর ম্যাগাজিনে চোখ বুলায় কিন্তু বই পড়ে খুব কম।
সারা পৃথিবীতেই বইয়ের প্রতিশব্দ এখন টেলিভিশন। বইপড়া যে রকম একটা অসাধারণ উঁচুমানের মানসিক প্রক্রিয়া, টেলিভিশন ঠিক সে রকম নিচুমানের মানসিক প্রক্রিয়া! বইপড়ার সময় মস্তিষ্কে যে রকম নানা ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকে, টেলিভিশন দেখার সময় তার কিছুই হয় না। আমরা টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে থাকলেই সবকিছু আমাদের মস্তিষ্কে ঢুকে যায়।
আমি বেশকিছু কিশোর উপন্যাস লিখেছি। মাঝে মাঝেই টিভির লোকজন আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে সেই উপন্যাসগুলো থেকে টিভির উপযোগী নাটক বানানোর অনুমতি চান। আমি কখনও তাদের অনুমতি দিই না। বিনয়ের সঙ্গে বলি, যখন কেউ আমার কিশোর উপন্যাসটি পড়ে, তখন সে চরিত্রগুলোকে নিজের মতো করে কল্পনা করে নিতে পারে। যার কল্পনাশক্তি যত প্রবল তার চরিত্রগুলো তত জীবন্ত। কিন্তু যখন সেটি থেকে টেলিভিশনের জন্যে নাটক (বা সিরিয়াল) তৈরি হবে তখন চরিত্রগুলোকে সে আর কখনও কল্পনা করতে পারবে না, সরাসরি তাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া হবে।
একজন শিশু, কিশোর যদি কল্পনা করা না শিখল তাহলে তার জীবনের পাওয়ার মতো আর কী থাকল? পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী আইনস্টাইন বলেছিলেন, জ্ঞান থেকে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে কল্পনাশক্তি। এর চাইতে খাঁটি কথা আর কিছু হতে পারে না। জ্ঞান যদি হয় একটা দামি গাড়ি, তাহলে কল্পনাশক্তি হচ্ছে পেট্রল! পেট্রল নামের কল্পনা ছাড়া জ্ঞানের গাড়ি নিশ্চল হয়ে এক জায়গায় পড়ে থাকবে, তাকে দিয়ে কোনো কাজ করানো যাবে না।
যারা টেলিভিশনের জন্যে নাটক তৈরি করতে খুবই আগ্রহী, তখন তারা আমাকে বোঝান বই খুব বেশি মানুষ পড়ে না, কিন্তু সবাই টেলিভিশন দেখে। আমি তখন তাদের উল্টো বুঝাই, সে জন্যেই বই নামে একটা বিষয়কে বাঁচিয়ে রাখতে হয়, যেন কেউ কেউ সেটা পড়ে অন্যসব সাধারণ মানুষ থেকে আলাদা হয়ে বড় হতে পারে।
যারা বই পড়ে তারা অন্য রকম মানুষ। একসময় তারাই দেশ, সমাজ কিংবা পৃথিবীর নেতৃত্বে দেবে। এখন আউট বই পড়ার জন্যে, তারা তাদের বাবা-মা থেকে যতই বকুনি শুনুক, একসময় তারাই হবে গুরুত্বপূর্ণ।
সে জন্যে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানটি আমার খুব প্রিয় একটি উৎসব। আমি যদি সেখানে যাবার সুযোগ পাই তাহলে হাজার হাজার শিশু-কিশোরকে দেখার সুযোগ পাই যারা অন্যদের থেকে ভিন্ন, যারা বই পড়ে। আমি জানি যারা বড় হয়ে তারাই এই দেশকে চালাবে।
বইয়ের প্রতিপক্ষ হিসেবে টেলিভিশনের সঙ্গে এখন আরও একটি বিভীষণ যুক্ত হয়েছে, সেটি হচ্ছে কম্পিউটার। কম্পিউটার নাম দেখেই বোঝা যাচ্ছে এটি তৈরি হয়েছিল কম্পিউট বা হিসাব করার জন্য। এখন মাঝে মাঝেই মনে হয় এটি ব্যবহার করে ‘কম্পিউট’ ছাড়া অন্য সব কাজই করা হয়!
