বিশ্বজিৎ নামের সেই ছেলেটিকে যখন ছাত্রলীগের ছেলেরা প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করল তখন সাংবাদিকেরা এই দৃশ্যটি ক্যামেরায় ধারণ করার জন্যে এত সময় না দিয়ে ছেলেটিকে যদি বাঁচানোর চেষ্টা করতেন তাহলে সে বেঁচে যেত কি না এই চিন্তাটি মাঝে মাঝেই আমার মাথায় উঁকি দেয়।
কেভিন কার্টার নামে একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফটোগ্রাফার ছিলেন। নব্বইয়ের দশকে এই ফটোগ্রাফার তার একটি ছবির জন্যে পুলিৎজার পুরস্কার পেয়েছিলেন। ছবিটি ছিল আফ্রিকার দুর্ভিক্ষের সময়ের ছবি, একটি শীর্ণ শিশু নিজেকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে খাবারের সন্ধানে, অদূরে তাকে অনুসরণ করছে একটি শকুন। দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতার সেই ছবির জন্যে কেভিন কার্টার পুলিৎজার পুরস্কার পেয়েছিলেন সত্যি, কিন্তু একজন মানুষ হয়ে একটা শিশুকে রক্ষা না করে শকুনের সঙ্গে ছবি তোলার জন্যে সারা পৃথিবীতে তার বিরুদ্ধে যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল– সম্ভবত সে জন্যেই তার কয়েক মাস পরে এই ফটোগ্রাফার আত্মহত্যা করেছিলেন।
একজন ফটোগ্রাফার চমকপ্রদ একটা ছবি তোলার জন্যে সবসময় চোখ-কান খোলা রাখেন। কিন্তু সেই ছবি তোলার সুযোগ করে দিয়ে যদি সন্ত্রাসীদের গোষ্ঠী সেই ফটোগ্রাফার, সেই পত্রিকা, পত্রিকার সম্পাদক সবাইকে ব্যবহার করে নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করে ফেলে তাহলে তার দায়িত্ব কে নেবে? আমাদের দেশের সংবাদমাধ্যমগুলো কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে তারা দুর্বৃত্ত, সন্ত্রাসী, হত্যাকারীদের মানুষকে আতংকিত করে তোলার প্রক্রিয়াকে গায়ে পড়ে সাহায্য করছে না ?
২.
এই দেশে আজকাল মানুষের নিরাপত্তা নেই, যে কোনো মানুষ যে কোনো সময়ে আক্রান্ত হতে পারে। গত সপ্তাহে আমাদের ক্যাম্পাসে একসঙ্গে অনেকগুলো ককটেল ফুটল। একটা আমাদের বাসার বারান্দায়। যখন সেটি ফাটানো হয়েছে তখন আমার স্ত্রী তার কয়েক ফুট দূরে। মাঝখানে দেয়াল দরজা থাকার জন্যে বড় ধরনের কিছু ঘটেনি। কিছুক্ষণের ভেতরেই সবাই বাসা থেকে বের হয়ে এল।
দেখতে দেখতে শত শত ছাত্র। ভয় কিংবা আতংকের বদলে বরং একটা উৎসব উৎসব ভাব। খুব কাছেই মেয়েদের হল। ককটেলের শব্দ তারা খুব ভালোমতো পেয়েছে। টেলিফোনে আমাদের জানানো হল তাদের কয়েকজন বের হতে চায়। প্রক্টর, রেজিস্ট্রার, শিক্ষক সবাই আছেন। তারা ভাবল বরং আমরাই মেয়েদের সাহস দিয়ে আসি!
মেয়েদের হলের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই সব মেয়েরা বের হয়ে আমাদের ঘিরে দাঁড়াল। একজন বলল, “স্যার, খুব ভয় লাগছে।” আমি বললাম, “ভয় লাগার কী আছে? এদেশে জন্মেছ, একটু সহ্য কর।” মেয়েরা তখন বাধা দিয়ে বলল, “না না স্যার, আমাদের নিজেদের জন্যে একটুও ভয় লাগছে না। আপনার আর ম্যাডামের জন্যে ভয় লাগছে।”
যখন এই বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে একদিন যেতে হবে এই ছেলেমেয়েদের ভালোবাসা ছেড়ে, কেমন করে যাব আমি জানি না। এরা আমাদের নূতন প্রজন্ম, ডিসেম্বর মাস এলে আমার এই দেশের তরুণ প্রজন্মের কথা মনে পড়ে। এই দেশটি তরুণ প্রজন্মের দেশ। তরুণ প্রজন্ম তীব্র আবেগ আর ভালোবাসায় এই দেশটির জন্ম দিয়েছিল। আবার তীব্র আবেগ আর ভালোবাসা দিয়ে এই দেশটিকে রক্ষা করবে, এই দেশটি গড়ে তুলবে।
সেদিন ভোরবেলা একটা টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিক আমার অফিসে চলে এসেছেন ইন্টারভিউ নিতে। ডিসেম্বর মাসে তারা মুক্তিযুদ্ধের উপর অনুষ্ঠান করবেন, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমার স্মৃতি জানতে চান, আমার কথা শুনতে চান।
আমি সেই টেলিভিশন চ্যানেলকে বলেছি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অনেক বীরত্ব আর অনেক বড় অর্জনের ইতিহাস, কিন্তু সেটা একই সঙ্গে অনেক বড় একটা আত্মত্যাগের ইতিহাস। আত্মত্যাগের এত বড় ইতিহাস পৃথিবীর অন্য কোথাও এভাবে আছে কি না আমার জানা নেই। এই মুক্তিযুদ্ধের সময় সারা বাংলাদেশে একটি পরিবারও ছিল না যার কোনো একজন আপনজন কিংবা কাছাকাছি একজন মানুষ মারা যায়নি। দেশ যেদিন মুক্ত হয়েছিল সেই অবিশ্বাস্য আনন্দের পাশাপাশি অনুভূতিটি ছিল স্বজনহারানো একটি গভীর বেদনার অনুভূতি।
আমি টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিককে মনে করিয়ে দিয়েছিলাম আমাদের প্রজন্ম সম্ভবত সবচেয়ে সৌভাগ্যবান প্রজন্ম। ভয়ংকর দুঃসময়ে কীভাবে টিকে থাকতে হয় আমরা জানি। তার চাইতে বড় কথা, একাত্তরের সেই ভয়ংকর দুঃসময়ে এই দেশের মানুষের সবচেয়ে সুন্দর রূপটি বের হয়ে এসেছিল। গভীর ভালোবাসায় মানুষ তখন একে অন্যের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল।
আমাদের প্রজন্ম মানুষের সেই রূপটি দেখেছে। আমরা তাই কখনও মানুষের উপর বিশ্বাস হারাই না। আমরা জানি অতিসাধারণ অকিঞ্চিৎকর একজন মানুষের ভেতরে একজন অসাধারণ মানুষ লুকিয়ে থাকে। প্রয়োজনের সময় তাকে বের করে আনা যায়। আমি জানি এটা হচ্ছে আমাদের শক্তি। জ্ঞানী-গুণী অল্প কয়জন সুশীল সমাজ আমাদের শক্তি নয়, অসংখ্য সাধারণ মানুষ আমাদের শক্তি। এই দেশে কোটি কোটি সাধারণ মানুষ, আমাদের ভয় কী?
এই সাধারণ মানুষদের পথ দেখাবে নূতন প্রজন্ম। তাই আমি সবসময় তাদের মুখ চেয়ে থাকি, তারা কখনও আমাকে নিরাশ করে না। অল্প একটু সুযোগ দিলে তারা ম্যাজিক করে ফেলতে পারে, আমি সবিস্ময়ে সেটি দেখি। এই নূতন প্রজন্মকে আমি বারবার মনে করিয়ে দিতে চাই কখনও যেন তারা হতোদ্যম না হয়, কোনো কিছু নিয়ে তারা যেন হতাশ না হয়।
