তাঁদের সবাইকে মনে করিয়ে দেওয়া যায় ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনী যখন এই দেশে গণহত্যা শুরু করেছিল তখন কোনো মানুষ যদি যুক্তিতর্ক দিয়ে বিবেচনা করত তাহলে তারা নিশ্চিতভাবেই ধরে নিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন করা একটা পুরোপুরি অবাস্তব বিষয়। মার্চ মাসে শুরু করে মে মাসের মাঝামাঝি পুরো দেশটা পাকিস্তান সেনাবাহিনী দখল করে নিয়েছিল। এখন যাদের যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচার করা হচ্ছে তারা সেই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পদলেহী অনুচর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মতো দেশ পাকিস্তানের পক্ষে, পৃথিবীর মুসলমান দেশগুলোও পাকিস্তানের পক্ষে, এক কোটি মানুষ দেশছাড়া, যারা দেশে আছে তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে, খুন করে সারা দেশে হাহাকার। দেশের কিছু কম বয়সী ছেলেমেয়ে মুক্তিযুদ্ধ করতে গিয়েছে, তাদের হাতে অস্ত্র নেই, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা নেই, পেশাদার বাহিনী বিশৃঙ্খল, যাঁরা নেতৃত্ব দেবেন তাঁদের মধ্যেও কোন্দল—এ রকম একটা পরিবেশ দিয়ে শুরু করে আমরা স্বাধীন একটা দেশ ছিনিয়ে আনতে পারব সেটা কি কেউ কল্পনা করেছিল? করেনি। কিন্তু তার পরও এই দেশের মানুষ দেশপ্রেমের যুক্তিহীন আবেগকে মূলধন করে এই দেশকে স্বাধীন করে ছেড়েছিল।
কাজেই যাঁরা এই দেশের হর্তাকর্তা-বিধাতা তাঁরা এই দেশের মানুষের ‘যুক্তিহীন’ আবেগকে খাটো করে দেখবেন না। প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয় না, তার সঙ্গে সহাবস্থান করতে হয়। টিপাইমুখের বেলায়ও হুবহু একই কথা বলা যায়—দেশের মানুষের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করার বৃথা চেষ্টা করবেন না, তাদের সঙ্গে সহাবস্থান করুন।
সূত্র: http://www.sadasidhekotha.com/article.php?date=2012-01-02
ডিসেম্বরের প্রথম প্রহর (ডিসেম্বর ০৬, ২০১৩)
১.
বেশ কিছুদিন থেকে বাংলাদেশের সব মানুষের মতো আমিও আটকা পড়েছি। প্রথমে হরতালে আটকা পড়েছিলাম। এখন অবরোধে আটকা পড়েছি। দুটোর মাঝে পার্থক্যটা আমার কাছে এখনও পরিষ্কার নয়। হরতাল শুরু হওয়ার আগেই গাড়ি পোড়ানো হত। অবরোধের আগেও পোড়ানো হয়। হরতালে গাড়ি পোড়ানোর সময় ভেতরে অনেক সময় যাত্রীরা থাকে। অবরোধেও তাই।
সিলেটে থাকি, আমার মা ঢাকা থাকেন। অন্য কোনো কাজ না থাকলেও শুধু মাকে দেখার জন্যে ঢাকা যাই। এখন যেহেতু ঢাকা যেতে পারছি না, দেখা করতে পারছি না, তাই টেলিফোনে কথা হয়।
আমার মা জানেন আমার বাসায় টেলিভিশন নেই। তাই টেলিভিশনে কী কী দেখানো হয় দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমাকে জানান। ইদানিং আমার মা টেলিভিশন না দেখার জন্যে আমার উপর খুব বিরক্ত। মোটামুটি ষ্পষ্ট করে বললেন, “সারা দেশে কী তাণ্ডব হচ্ছে, কী নৃশংসতা হচ্ছে নিজের চোখে দেখবি না, পালিয়ে বেড়াবি, এটা হয় না। তোকে দেখতে হবে– এই দেশে কী হচ্ছে নিজের চোখে তোকে দেখতে হবে।”
তারপরও আমি টেলিভিশনে সেই ভয়াবহ ঘটনা দেখি না। ইন্টারনেটে খবর পড়ি। খবরের কাগজে ছবিগুলো দেখে দ্রুত পৃষ্ঠা উল্টিয়ে ফেলি। গত কিছুদিন বাংলাদেশের খবরের কাগজে যে ছবি ছাপা হচ্ছে তার থেকে হৃদয়হীন নৃশংস অমানুষিক বর্বরতার ঘটনা এই দেশের মানুষ এত নিয়মিতভাবে দেখেছে বলে আমার জানা নেই।
কোনটা বেশি বড় নিষ্ঠুরতা আমি এখনও নিশ্চিত নই। একেবারে সাধারণ মানুষকে, স্কুলের ছেলেমেয়ে থেকে শুরু করে পথচারী কিংবা মহিলাদের পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করা, নাকি যারা এটা করছে তাদের বিরুদ্ধে একটা শব্দ উচ্চারণ না করে চুপচাপ এই ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো সমর্থন করে যাওয়া?
‘রাজনৈতিক সহিংসতা’ বলে একটা শব্দ চালু আছে। আমরা জানতাম সেটি এক রাজনৈতিক দল অন্য রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীকে করে থাকে। এখন যেটাকে রাজনৈতিক সহিংসতা বলা হচ্ছে সেখানে রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীর সংখ্যা খুব কম। বেশিরভাগ মানুষ সাধারণ মানুষ। আুগনে পুড়ে যাবার মতো ভয়ংকর আর কী হতে পারে? যারা মারা যাচ্ছেন তাদের আপনজনদের হাহাকার আর ক্ষোভের কথাটা আমি চিন্তাও করতে পারি না। যারা বেঁচে আছেন তাদের সেই অমানুষিক কষ্টের কথা কি বাইরে থেকে বোঝা সম্ভব?
যারা রাজনীতি করেন তারা সবকিছু পরিসংখ্যান দিয়ে বিশ্লেষণ করে ফেলতে পারেন, আমরা পারি না। একটামাত্র মৃত্যু কিংবা একটামাত্র নিষ্ঠুরতার কথা আমাদের পীড়ন করতে থাকে– এতগুলো আমরা কেমন করে সহ্য করব?
আমরা সবাই গণআন্দোলনের কথা জানি, যখন নিয়মতান্ত্রিকভাবে আর কিছু করা যায় না তখন সাধারণ মানুষ পথে নেমে আসে। কিন্তু আন্দোলনের নামে এই নৃশংসতার কথা আমরা কি আগে কখনও দেখেছি! যারা মানুষকে পুড়িয়ে মারছে তারা যখন বাড়ি ফিরে যায়, টেলিভিশনে সেই ভয়াবহ ঘটনাগুলো দেখে, তখন কি তাদের চোখ-মুখ আনন্দে ঝলমল করে উঠে?
সম্পূর্ণ নিরপরাধ মানুষগুলো যখন যন্ত্রণায় ছটফট করে, তাদের আপনজন যখন হতাশায়, ক্ষোভে, দুঃখে, ক্রোধে নিজেদের সংবরণ করতে পারে না– তখন কি এই মানুষগুলো উল্লসিত হয়ে ভাবে তারা তাদের গন্তব্যে আরও একটু পৌঁছে গেছে? তাদের নেতা-কর্মীরা কি ফোন করে তাদের অভিনন্দন জানান? যখন দেখা হয় তাদের পিঠ চাপড়ে দেন? আমার বড় জানতে ইচ্ছে করে।
যখন থেকে দেশে এই নূতন ধরনের সন্ত্রাস শুরু হয়েছে তখন আরও একটি বিচিত্র বিষয় আমার চোখে পড়তে শুরু করেছে। খবরের কাগজে প্রায়ই ছবি দেখতে শুরু করেছি, যেগুলো দেখে মনে হয় আমরা বুঝি নাটকের দৃশ্য দেখছি। সন্ত্রাসী এই কাজকর্মের এত নিখুঁত ছবি দেখে আমরা মাঝে মাঝে হকচকিয়ে যাই। দেখে মনে হয় সাংবাদিকেরা যেন ভালো করে ছবিগুলো তুলতে পারেন বুঝি সেজন্যেই তাদের সামনে অনেক যত্ন করে ঘটনাগুলো ঘটনা হচ্ছে।
