তারপর জ্বরের ঘোরে আপনমনে লুবিনি যেন শারিবার বিয়ের অনুষ্ঠান সাজাত। মাঝখানে মাটির বেদিতে নওরী-নওরিঁ বসে, চারদিকে চারটে কঞ্চি পুঁতে তাতে বিনিপাকের লাল সুতো দিয়ে ঘিরে ফেলছে লুবিনি, আর তার গলা থেকে তখন মৃদু অথচ উচ্ছল গান উঠত।
দেও আওয়েতো দেওরে ভাই
বান্ধনা তো সারিমাদে
দেও আওয়েতো দেওরে ভাই
মাকরানা সারিমাদে
দেও আওয়েতে দেওরে ভাই
সাপনারা সারিমাদে
এবং সে দুইহাতের আঁজলায় যৌতুক দেওয়ার ভঙ্গি করত নাচের মুদ্রায়। এই তোর ইওয়া হইছে, রে শারিবা। ইবার তোক আর তোর নওরিঁক হালদি মাখানু।
এ সে হলদি লাগিরে, এ তো মায়েরি
তেল মেশুরে লুড়ে, এ তো মায়েরি।
নানি তারপর উচ্ছল হাসত, হাসতে হাসতে কাশত এবং কাশতে কাশতে লোই তুলত।
৪৩.
এইভাবে একদিন লোই তুলে নানি ঠাণ্ডা হয়ে গেল। শারিবা তার বুকে গরম সেঁক দিয়েও আর উষ্ণ করতে পারল না। বাজিকরদের একটি যুগকে শেষ করে লুবিনি মরল। তারপর নতুন যুগ শুরু হল। কেননা তখন চৌধুরী সাহেব এ কথাটি তুলেছে, তুরা হিন্দু না মোছলমান, আঁ? মহিমবাবু প্রশ্ন তুলেছে, হাঁই বাপু, তোরা গরুও খাস, শুয়ারও খাস, ই কেমকা জাত রে বাবা!
এসব কথা তখন ওঠার কারণ ছিল। তখন সাহেবরা যাব যাব করছে। হিন্দুস্থান-পাকিস্তান হব হব করছে। সবচেয়ে বড় কথা, এই তাবৎ অঞ্চল জুড়ে তেভাগা নামে চাষিদের একটা বিরাট লড়াই হয়ে গেছে। এই লড়াইয়ে চাষি মরেছে অনেক সন্দেহ নাই, কিন্তু জোতদারও মরেছে, এটাও ঠিক। আধির উপর দখল কায়েম রাখার জন্য আধিয়াররা সংঘবদ্ধ হয়ে আছে।
এই শেষ ঘটনাটিই সবচেয়ে বড় বিপত্তির কারণ। কেননা যুদ্ধের বাজারে বাঁশ কাঠের দাম চড়া ছিল। কাজেই মহিমবাবু ও চৌধুরী সাহেব লালমিয়া জঙ্গল ও বাঁশবন পরিষ্কার করেছে বাজিকরদের দিয়ে। কেননা এত কম মজুরিতে অন্য কোনো মানুষ পাওয়া যেত না। জামিরের সঙ্গে একটিই মৌখিক চুক্তি ছিল, তা হল জঙ্গল খালাস হলে জমিগুলো বাজিকরদেরই আধি দিতে হবে।
মহিমবাবু কিংবা লালমিয়ার আপত্তি কিছু ছিল না। কারণ, তখনো তো হিন্দুস্থান-পাকিস্তান হয়নি। তখানা তো তেভাগা চাই’ আওয়াজ শোনা যায়নি। তখনো তো আধিয়ারের দাবি বলে কোনো অদ্ভুত কথা কেউ কোনোদিন শোনেনি।
কাজেই দু-দুটো বছর বাজিকরেরা সেই নতুন জমিতে শিক্ষানবিশি করল। এতদিন চাষের কাজে তারা আংশিক সময়ের শিক্ষানবিশি করত, এখন পুরো সময়ের। যা ফসল ফলল, তা অতি সামান্য। তবু তারই অর্ধেক মালিককে দিল, অর্ধেক নিজেরা খেল। একটা নতুন আনন্দ, যা জামির বাজিকরের মৃত্যু পর্যন্ত রোখ আর স্বপ্নই থেকে গেছে। এইভাবে তারা চাষের কাজ পুরোপুরি শিখল। জীবনের নতুন স্বাদ, সবরকম রঙের উজ্জ্বলতা তারা খুব ভায়ে ভয়ে অধিকার হিসাবে গ্রহণ করতে শিখল। যাবতীয় অনাস্বাদিত সুখের খোলা দরজার সামনে তারা যেন এসে দাঁড়িয়েছে। এইবারে ভেতরে প্রবেশ করার অনুমতি মিলে গেছে। গৃহস্থের অধিকার, সম্পত্তির অধিকার, সামাজিকতার অধিকার যেন আয়ত্তের মধ্যে এসে গেছে। যাযাবরের তাঁবু ছিঁড়ে ফেলে শক্ত খুঁটোর ঘর বাঁধা। তারপর জীবন বয়ে যাবে স্বাভাবিক স্রোতের মতো। অনির্দিষ্টের মধ্যে আর ঘুরতে হবে না। জমি হচ্ছে স্থিতি—দৈহিক, মানসিক ও সামাজিক। লুবিনি বলত, শারিবা, তুই বুঝবি না, বাজিকরের জুয়া রেজা-রেজানিওর বিয়ে দেওয়া বড় কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই গোষ্ঠীর মধ্যে এই ছয় পুরুষ ধরে ক্রমাগত রক্তের সম্বন্ধ হচ্ছে। এলা ঠিক কাম লয়। এতে মানুষের সাথ কুৎরিওঁ বা ওয়ারুর, কুকুর বা বাঁদরের তফাত থাকে না। হিন্দু তোমা সমাজে লিচ্ছে না, মুসলমান তোমা একসাথ ওঠবস করায় না। এংকা কথা তোর নানা ভাবিছিলো। কিন্তু শেষ দিশা করবা পারে নাই। তবি ভাবিছিল। জমিন হল্যে থিতু হবে, থিতু হলে সব হবে।
সেই থিতু যখন হাতের কাছে, তখনই লালমিয়া, মহিমবাবু চরম প্রশ্নটি করে। ইয়াসিন তখন বাজিকরদের সর্দার বা মণ্ডল। লালমিয়া আকৰ্ণ বিস্ময় প্রকাশ করে।
নাম তোর ইয়াসিন, আর তুমু মুছলমান লও?
জী মালিক, হামি বাজিকর।
জুম্মা জিয়াপৎ করো না?
ওলা জানি না, হুজুর।
ধম্মোকম্মো কি কর?
অভিজ্ঞ ব্যক্তিটি দলের মানুষের কাছে বেকুব হয়ে যায়, এদিক ওদিক তাকায়।
ঠাকুর দেবতা কিছু আছে?
ওলামাই, কালীমাই, বিগামাই, এলা সব আছে।
তবি তো তুমাদের হিঁদুর সঙ্গ?
কিন্তু মহিমবাবু বলে, ক্যারে, ওলামাই, কালীমাই তো বোঝ্নো, কিন্তু বিগামাইটা কি বস্তু?
অংকা ঠিক জানো না, মালিক।
পূজা আচ্চা হয়?
থানে সিঁদুর, ধূপ দেবা হয় হুজুর। আর গান হয়।
আবার গরুও খাস?
মৌনতা।
আবার শুয়ারও খাস?
নিরবচ্ছিন্ন মৌনতা।
কি বেজাত রে বাবা, ভাবা পারি না?
তৃতীয় বছরে খালাসি জমি ভদুই ধানে হেসে উঠেছে। বাজিকর তখন আর বলদকে বারাদ বলে না, ভঁইসকে হেলো বলে না। স্থানীয়দের মতো বলদ আর ভঁইসই বলে। বেশ কয়েক ঘরে বলদ ও ভঁইসের হাল হয়েছে। জীবন স্বচ্ছল নয়, কিন্তু পায়ের নিচে চোরাবালিও নেই। নরম মাটি শক্ত হচ্ছে।
কিন্তু শক্ত মাটিতেও ধস নামে। যার ধর্ম নেই তার সঙ্গে আবার ন্যায়নীতির সম্পর্ক কি? যার সমাজ নেই তার সঙ্গে সামাজিক চুক্তি হয় না। এসব লালমিয়া এবং মহিমবাবু চিরকাল ভালো বোঝে। সুতরাং ভাদুই ধান কাটার আগেই ইয়াসিন ও রূপার জমি বেহাত হয়ে যায়। রূপা কিংবা ইয়াসিন কিংবা বাজিকরদের অন্য। কত মহিমবাবু বা লালমিয়াকে সঠিক চিনত না।
