তখন রমণীরা পরত ঘাঘরা আর কামিজ, পুরুষেরা পরত নুগরু আর কুর্তি। এখন দেখ সব মেয়ে শাড়ি পরে, পুরুষেরা পরে ধুতি আর লুঙ্গি। সেসব ছেড়ে দিল, তার নিজের ভাষা, নিজের পোশাক, নিজের আচার-আচরণ, নিজের ক্রিয়াকর্ম, সব। কেন রে শারিবা কেন? তোর নানা বলত, আমি মজুর খেটে খাব আর ভিখ মাঙ্গব না, লোক ঠকাব না। বে-ইজ্জতের কাম করব না। আমার বালবাচ্চা হবে ইমানদার আদমি। মুখে বলত আমি মজুর খেটে খাব, মনে ছিল আমি গেরস্ত হব। সে শুধু লুবিনি জানত, আর জানত বালি বুড়ো।
কিন্তু সে আর হল কই শারিবা? বাজিকর পাটখেত নিড়াতে জানে না, মার খায়। বাজিকর হাল মই দিতে জানে না, মার খায়। আচানক চুরির দায়ে ধরা পড়ে, মার খায়, জেল হয়। গ্রামে মড়ক লাগে, দোষ হয় বাজিকরের। বাচ্চাকাচ্চা চুরি গেল, হারিয়ে গেল, মারো শালা বাজিকরকে, দেও তার ঘর জ্বালিয়ে। তবু জামির বাজিকর পাঁচবিবি নদীর চর আঁকড়ে পড়ে থাকে। পাঁচবার হাতি ঘরদোর ভাঙার পরে রোখ আর তার আগের মতো থাকে না। তখন একদিন চতু বাজিকর আর আনোয়ার বাজিকর ঝোলা ঘাড়ে নিয়ে ভিখ মাঙতে বের হয়। জামির তাদের আর না করতে পারে না। দশদিন বিশদিন ঘুরে তারা কিছু রোজগার করে ফিরে আসে। সঙ্গে নিয়ে আসে দুটো বাঁদরের বাচ্চা। বাঁদরের বাচ্চাকে খেলা শিখাতে হয়। তারা জামিরের কাছে ভয়ে কিংবা লজ্জায় আসে না।
জামিরই তাদের ডাকে। বলে, ঠিক আছে। বাঁচে থাকা পরথম লড়াই, তা-বাদে আর সব। কাজ পালে কাজ করবা, না পালে বান্দর লাচাবা, রহু চণ্ডালের হাড় দিয়া ভেলকি দেখাবা। কিন্তু কাজ পরথম। আমি বুঢ়াটা হোই গিলাম, কথাটা মনে রাখ, বাপাসকল। সব কাম শিখবা হবে।
তখন আবার ঢোলকে বাড়ি পড়ে। ডুগ ডুগ ডুগ ডুগ লাগ ভেলকি লাগ, চোখে মুখে লাগ, হামার ছাড়ে সবাকে লাগ। হাই দেখো রহু চণ্ডালের হাড়ের কিসমৎ। সত্যের গুল্লি ডবল হ’, মিথ্যার গুল্লি চইল্যে যা-হাঁ, এই দেখো ডবল, ডুগডুগডুগডুগ—
তেরে নাও পিছল গয়া টুট গইল ঘাঘরিয়া
গাওমে ভিজ গয়া শাড়িরে–
তেরো নাও পিছল গিয়ায়
পুখর ঘাটমে চিকনা মাটি—
পনেরো হাত উঁচু দিয়ে দড়িতে অবলীলায় হেঁটে যায় বাজিকর যুবতী, দড়িতে দোল খায়, হাতের পায়ের ভঙ্গি করে। নিচে ঢোলক বাজে, চটুল গান হয়।
৪২.
এইভাবে বাজিকরের জীবন লল গড়িতে। আর প্রতি বছরই দু-জন তিনজন করে কাশি ও রক্ত ওঠা রোগে মরতে থাকে। লুবিনিও এই দীর্ঘ জীবন বেঁচে থাকবে এই রোগেই মরার জন্য।
জামির বাজিকরদের বাসস্থান করে দিয়েছিল। সে বাসস্থান যতই অকিঞ্চিত্বর হোক, যতদিন জামির বেঁচেছিল তার স্থায়িত্ব নিয়ে কারো মনেই কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। কিন্তু জামিরের মৃত্যু যত নিকটবর্তী হচ্ছিল, বাজিকর ততই অসহায় বোধ করেছিল। সে শুধু জামিরের নেতৃত্ব হারাবার ভয়েই নয়, মানুষের জীবনে ও চতুষ্পর্শ্বে জটিলতা খুব দ্রুত বাড়ছিল যা বাজিকরদের কাছেও অজানা ছিল না।
দনুর বংশধরেরা মৃত্যুর আগে বহুকে প্রত্যক্ষ করে। শেষ পর্যায়ে রহু তাদের তৃপ্তি কিংবা দুঃখ দেয়। পীতেম প্রসন্ন রহুকে দেখেছিল আর জামির দেখে বিষণ্ণ রহুকে, যেমনটি ঠিক দনু দেখেছিল।
লুবিনি শেষপর্যন্ত গেরস্থপাড়ায় ভিক্ষা করতে যেত, কখনো কখনো দুরের গ্রামেও। কখনো দু-একদিনের জন্য সে ফিরতও না শারিবা সেই সময় বড় অসহায় বোধ করত নিজেকে। বাপ রূপা বাজিকর দিনমজুরি করে সংসার চালায়। লুবিনির দেখাশোনা সে করতে পারে না। শাবিরার বড় অভিমান হয় বাপের উপর। কিন্তু লুবিনি ব্যাপারটা মেনে নেয়।(কলৈ, তুই যখন উঁয়া হবি তখন হামাক খোয়াবি। উপর তো নিজেরি চলে না।
তারপর লুবিনির দৃষ্টি খুব দ্রুত ঘোলাটে হয়ে আসতে থাকে। যেন কয়েক মাসের মধ্যেই তার বয়স অনেক বেড়ে যায়। সে অথর্ব হয়ে যেতে থাকে ক্রমশ। তখনো রূপা তাকে দেখাশোনার কথা চিন্তা করতে পারে না। লুবিনির তারপর নিয়মিত জ্বর হতে থাকে।
শারিবা বলে, নানি, তোর গা এংকা গরম ক্যান? জ্বর হইছে?
লুবিনি নেশাগ্রস্তের মতো উত্তর দেয়, জ্বর লয়রে, শারিবা হামরা ইয়াক ‘হাতপাক’ বলি। বিগামাই বিরাগ হল্লে এংকা রোগ হয়। গলা থিকা ‘লোই’ উঠে, খাশি হয়, তবি ইয়ার নাম লোই লোগ। ইতো বাজিকরের লিয়তি।
রোগ যত বাড়তে থাকে, লুবিনি তত প্রাচীনা ও অপরিচিতা হতে থাকে শারিবার কাছে। মাঝরাত্তিরে ঘুম ভাঙলে শারিবা নানির বিড়বিড় শুনতে পেত। নানি বলত, ঠাকুরজি, হারুরানে যাই। ওলামাই, কালিমাই, বিগামাই, হারুরানে যাই।
শাবিরা এসব শব্দ বুঝতে পারত না। পরে সে জানতে পেরেছিল, এইসব অজ্ঞাত দেবতা বাজিকরের রাস্তার সংগ্রহ, তার নিজস্ব কিছু নয়। লুবিনি এইসব দেবতার কাছে আত্মার শান্তি, না মৃত্যুভয় থেকে নিষ্কৃতির জন্য প্রার্থনা করত কে জানে? জ্বর যখন খুব জাঁকিয়ে আসত, লুবিনির তখন বিকারের লক্ষণ দেখা দিত। চাটাইয়ের উপর উঠে বসে সে শারিবাকে টেনে কাছে এনে দূরে পাতালুর বাঁওড়ের দিকে কাঁপা কাঁপা হাত তুলে দেখাত।
কি, নানি? কি?—
শারিবা, হুই দেখ, রহু।
জামিরকে সে সারাজীবন লড়াই করতে ও হারতে দেখেছে, সেসব স্মৃতি তাকে প্রবল হতাশায় সেইসব সময় ও এখন এই শেষ সময়ে আচ্ছন্ন করে রাখে। তবুও
সে শারিবাকে কিছু কথা বলে যা পীতেম ও জামির ভাবত ও বলত।
শারিবা ভয় পেয়ে বলত, কি বলিস? কি বলিস, নানি?
লুবিনি তখন আধা সম্বিতে আসত। বলত, তুই খুব সুন্দর নওরঁ হবি, শারিবা। তোর বিয়েতে বহু দূর থেকে সিই গোরখপুর ঠেঙে নওরিঁ আনব। তারপর বলত, বিহা লয় ইওয়া। হামি মরার আগে বাজিকরের বুলিগুলা শিখ্যে লে, শারিবা। আমি তো ডঅ, বেহুদ্দা বুড়া, আজ বাদে কাইল মরি যাব। তা-পর শ্বশুরঘরের লোকের সাথ কথা বলবার পারবি না, তখনু সি বড় লাজের কথা হোবে।
