কিন্তু শারিবা চিনত। তাকে চিনিয়েছিল আকালু। আকালু পোলিয়াদের ছেলে, সাক্ষাৎ আকাল। তিন বছর বয়স থেকে সে অনাথ। এখন তার চোদ্দ বছর বয়স। শারিবার থেকে বছরদুয়েকের ছোটই হবে। অবশ্য বয়সের হিসাব শারিবা কিংবা আকালুদের সমাজে কেউই করে না। অন্তত নিয়মমতো করে না। তাদের বয়সের হিসাব শ্রমের মাপকাঠিতে, যথা—চ্যাংড়া, জোয়ান কিংবা বুঢ়া।
লুবিনির মৃত্যুর পর আকালুই শারিবার বন্ধু হয়। আকালু সেই তিন বছর বয়স থেকে পৃথিবীর সঙ্গে একা লড়ে যাচ্ছে। সুতরাং পৃথিবীকে সে ভালোই চেনে। সেই অবুঝ বয়স থেকেই তার পেশা হাপু গান। হাপু একটি দীর্ঘ ছড়া, গান ও আবৃওির মাঝামাঝি একটি সুরে গাওয়া হয়। অনুষঙ্গ থাকে গায়কের হাতের একটি মোটা পাঁচন লাঠি আর মুখ, নাক ও বুগল্প ইত্যাদি নির্গত বিভিন্ন বিকৃত ধ্বনি, শীৎকার। গানের সঙ্গে বা সমে লাঠি দিয়ে গায়ক তার সর্বাঙ্গে অত্যন্ত দ্রুত লয়ে আঘাত করে শব্দ সৃষ্টি করে। যেসব জায়গায় আঘাতের শব্দ অধিক হয় সেসব জায়গাতেই লাঠি বেশি পড়ে। অভ্যাসে ক্রমশ জায়গাটি নির্দিষ্ট ও ক্রমাগত আঘাত হিত হয়ে যায়। এই জায়গাগুলো হচ্ছে পিঠের উপরের দুই বাহুসন্ধি, পাছা, জানু, শিরদাঁড়ার ঢালু অংশ। এই সমস্ত অঞ্চল ক্রমশ কড়া পড়ে শক্ত ও তামাটে রঙের হয়ে যায়। গানের শেষাংশে লাঠির বাড়ি এমন দ্রুত ও ভয়াবহ শব্দে হতে থাকে যে সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ অনেকসময় ছুটে এসে হাত চেপে ধরে লাঠি কেড়ে নেয়।
আকালু অনেকদিন পর্যন্ত বুঝতে পারেনি মানুষ এই গান শুনে এবং লাঠি পটা দেখে পয়সা দেয় কেন। তার এই বিচিত্র পণ্যের একজন নিয়মিত ক্রেতা ছিল মহিমবাবু। সপ্তাহে দু-তিনবার আকালুকে সে ডেকে পাঠাত ও হাপু শুনতে শুনতে, দেখতে দেখতে মহিমবাবুর মেদবহুল শরীরের বিভিন্ন অংশ উত্তেজনায় কাপতে থাকত, চোখ দুটো বড় বড় হয়ে ঠেলে বেরোতে চাইত, নাকের পাটা ফুলে উঠত এবং দ্রুততায় আকালু লক্ষ্য করত মহিমবাবু হাঁফাচ্ছে।
আকালুর আরও কিছু বাঁধা খদ্দের ছিল। দুপুরে শুয়ে বসে আলসেমি করে— এমন কিছু স্ত্রীলোক, যাদের বউ অন্য পুরুষের সঙ্গে নষ্টামি করে এমন কিছু পুরুষমানুষ, আর তাড়ির গদিতে বা ভাটিখানায় যারা অনেকক্ষণ বসে নেশা করে তারা। আকালু লক্ষ্য করেছে, এই ধরনের মানুষ তার “হাপু শুনবে—হা-পু-উ” এই হাঁক শুনলে চঞ্চল হবেই।
এইভাবে সে তার বিচিত্র গান, শব্দ ও প্রহারের সঙ্গে মানুষের অন্য এক বা একাধিক ইন্দ্রিয়বৃত্তির সম্পর্ক ভাসাভাসা ভাবে ধরতে শেখে। ব্যাখ্যা সে করতে পারে না। কিন্তু মহিমবাবুর সঙ্গে বাগোলা হাটের সেই গেরস্ত মানুষটার তফাত বোঝে। সে মানুষটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই এক ভাড় তাড়ি গলায় ঢালছিল। লাঠির শব্দে হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে আকালুকে একনজর ভ্রু কুঁচকে দেখে। তারপর ভাড়টা নামিয়ে রেখে দ্রুত এসে লাঠিটা আকালুর হাত থেকে কেড়ে নেয় এবং ছুঁড়ে পগারে ফেলে মুখে বলে, ছিয়া ছিয়া, এলা বেটাছাবালের কাম? খাইটে খাবার পার না?
আকালু কোনো প্রতিবাদ করতে পারেনি। কেননা লোকটার মুখে একটা শক্তিশালী ধিক্কার ও ভৎসনা ছিল। কাজেই মহিমবাবুর সঙ্গে এই সুস্থ স্বাভাবিক মানুষটার তফাত বোঝে সে।
ইদানিং শারিবা আকালুর সঙ্গে সর্বত্র ঘোরে। শারিবা বলে, তুই যি অংকা পান্টি সে আগাপাশতলা বারাস, লাগে না?
লাগে তো।
তবি?
কি তবি? না বারালে মানসি পয়সা দিবে? হাঁই দেখে, মহিমবাবু। হামাক বারাবা দেখলি ওয়ার শরীরে স্বােয়াদ লাগে। অরুচি তো।
অরুচি? তোক বারাতে দেখলি স্বোয়াদ লাগে!
লাগে, লাগে। এলা তুই বুঝবু না।
সেই আকালু শারিবাকে আগেই বলেছিল, তোরাদের আধি জমিগুলান বেহাত হোই যাবে।
ক্যান?
অংকাই। আমুনি যায়।
এসব দার্শনিক কথা শারিবা বোঝে না। সে বলে তোর মাতা। মহিমবাবু লালমিয়ার কত্তো জমি। আরো জমি দে কি করবি?
আকালুর জিহ্বায় অশ্লীল কথা খুব স্বাভাবিকভাবে আসত। সে বলে, আর আর মানসের অ্যাটাই ইয়া থাকে। লালমিয়া আর মহিমবাবুর কড়া জানু?
কড়া!
পাঁচ পাঁচটা করে।
হেই!
বিশ্বাস যাচ্ছে না চাঁদু। দেখলি তবি বুঝতা।
তুই দেখিছিস?
নালে তোক অ্যাংকাই ক-ছি?
ধুর, মিছাই হামা বোকা বানাছে।
আকালু হি হি করে হাসে।
কিন্তু পরে শারিবার ধারণা হয়েছিল, এরকম একটা অস্বাভাবিক উপাঙ্গগুচ্ছের অস্তিত্ব না মানলে সবকিছু ব্যাখ্যা করা যায় কি করে?
দিগিন মণ্ডল নামে এক অবস্থাপন্ন জোতদার মহিমবাবুর কাছ থেকে রূপা ও ইয়াসিনের আধি জমিগুলো কিনে নেয়। সে মাঠ দু-খানায় তখন ভাদুই ধানে সাবে রঙ ধরেছে। দিগিন দুই বাজিকরকে ডেকে বলল, তিন দিন সময় দিলাম। ধান কেট্যে মাঠ ফাকা কর।
ক্যান?
জমিটা হামি কিন্যাছি।
কেন্তু ধান তো মোট্যে পাক ধরিছে।
ওলাই কাটবা হোবে। হামি আমন লাগাববছন বুড়া হই যাচ্ছে।
দু-জনে তখন মহিমবাবুর কাছে গিয়েছিল। মহিমবাবু তখন আকালুর আথাল-পাথাল পাণ্টির বারি খাওয়া দেখছে ও মুখের বিচিত্র ‘হোক্কা-হোক্কা’ আওয়াজ শুনছে। তার শরীরে তখন স্বেদ কম্প এইসব হচ্ছে। তার তখন কথা শোনার সময় নেই। পুরো না শুনেই বলল, আরে জমির অভাব হচ্ছে? পাশের জঙ্গল খালাস করে লেও। এলা কি অ্যাটা মোকদ্দমা?
ইয়াসিন, রূপা দিগিনের কাছে সাতদিনের সময় চায়। দিগিন হাঁ-না কিছুই বলে না ও তিনদিন পরে মাঠে হাল মই নামিয়ে দেয়। রূপার যাযাবর রক্তের আকস্মিক ক্রোধ ঝলসে ওঠে ও একজন তার হাতে খুন হয়। তারপরেই আড়ালের চিরকালের ভয়ার্ত মারখাওয়া বেদিয়া সারা দুনিয়াব্যাপী অন্ধকার দেখে পালায় সে, ক্রমাগত পালায়। পিছনে পড়ে থাকে দুই পুরুষেণ অর্জিত অধিকার, প্রিয়জন, আকাঙ্খা, অতৃপ্ত ঘর-গেরস্থালির পরিকল্পনা।
