১. বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান – মনের নতুন বিজ্ঞান

ভালোবাসা কারে কয়
মানব মনের জৈববিজ্ঞানীয় ভাবনা

লেখক : 
অভিজিৎ রায়

প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০১২

উৎসর্গ :

আমার বাবা, অধ্যাপক অজয় রায় যিনি বনস্পতির ছায়া দিলেন সারা জীবন

আমার মা, শেফালী রায় যিনি সারা জীবন আমাদের অগোছালো সংসার আর বাউণ্ডুলে জীবন সামলালেন তাঁর নিপুণ হাতে

আমার জীবনসঙ্গিনী, বন্যা আহমেদ যে না থাকলে সকালটা এত মিষ্টি হতো না, আর ভালবাসার জটিল প্রশ্নগুলোর উত্তর থেকে যেত অধরাই।

এবং আমাদের একমাত্র মেয়ে, তৃষা স্কুলের নানা প্রজেক্ট করতে গিয়ে বিবর্তন মনোবিজ্ঞান এখনই হয়ে উঠেছে তার বেশ বড় রকমের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।

.

ভূমিকা

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ যখন তার গানে প্রশ্ন করেছিলেন, সখি, ভালবাসা কারে কয়? তখন কি তিনি একটি বারের জন্যও ভাবতে পেরেছিলেন, এর উত্তর লুকিয়ে আছে তার সমসাময়িক একজন শখের প্রকৃতিবিদের গবেষণার ভিতর?[১] হ্যাঁ, প্রেম ভালবাসা, রাগ, অভিমান, ঈর্ষা কিংবা সৌন্দর্যের অস্তিত্বের সবচেয়ে আধুনিক তত্ত্বগুলোর জন্য আমরা যার কাছে ঋণী, তিনি প্রেম-পিরীতি বা মান অভিমান নিয়ে গবেষণা করা কোন কেউকেটা দার্শনিক, মনোবিজ্ঞানী বা আর্ট কালচারের বিশাল বোদ্ধা বা পোেস্টমডার্নিস্ট সমালোচক নন, তিনি ছিলেন এক নিবিড় প্রকৃতিপ্রেমিক, যিনি বিশাল আকারের পারিবারিক বাগানে ঘন্টার পর ঘণ্টা পড়ে থাকতেন- চরম আগ্রহ আর পরম বিস্ময় নিয়ে অবলোকন করতেন যত রাজ্যের ফুল,পাখি, ছোট বড় উদ্ভিদ আর পোকামাকড়, যত্ন করে পালতেন গুবরে পোকা, কেঁচো আর কবুতর। তিনি চার্লস ডারউইন।

বলতে দ্বিধা নেই, আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান আর দর্শনের টুকিটাকি বিষয় আমার আগ্রহের এবং লেখালিখির কেন্দ্রবিন্দু হলেও আমি বহুদিন ধরেই চার্লস ডারউইনের বিবর্তনতত্ত্বের বিশেষ করে যৌনতার নির্বাচনের এক বিশাল অনুরাগী। এ অনুরাগ এক দিনে জন্মেনি, গড়ে উঠেছে পলে পলে একটু একটু করে। আর এ অনুরাগ কেবল আমার একার নয়, আমার মত এই জামানার বিজ্ঞান লেখকদের অনেকরই। এ প্রসঙ্গে একটি ব্যাপার মনে পড়ছে। আমার জীবনসঙ্গিনী বন্যা আহমেদ তার বহুল প্রচারিত বিবর্তনের পথ ধরে বইটি লেখার সময় বইয়ের একদম প্রথমেই একটি উক্তি ব্যবহার করেছিল।[২] উক্তিটি প্রখ্যাত জীববিজ্ঞানী ও বংশগতিবিদ থিওডসিয়াস ডবঝানস্কির–

‘বিবর্তনের আলোকে না দেখলে জীববিজ্ঞানের কোন কিছুরই আর অর্থ থাকে না’।

ডবঝানস্কির এ উক্তিটি মূলতঃ জীবজগতকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছিল। এটি নিঃসন্দেহ বিবর্তনের আলোকে না দেখতে পারলে সত্যই জীবজগতকে বোঝা আর ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। ডবঝানস্কি এই মহামূল্যবান কথাটা বলেছিলেন তার ১৯৭৩ সালে লেখা একটি গবেষণাপত্রের শিরোনামে। ডবঝানস্কি যে কথাটা আমাদের চারপাশের জীবজগতের জন্য সঠিক বলে মনে করেছিলেন, আমি তার প্রায় চল্লিশ বছর পরে আমার এ বইটি লিখতে গিয়ে দেখছি সেটা মানব সমাজকে ব্যখ্যা করার জন্যও সমানভাবে কার্যকর। সত্যি কথা বলতে কী মানব সমাজের বিভিন্ন প্যাটার্ণ ব্যাখ্যা করতে গেলে বিবর্তনতত্ত্বকে আর বাইরে রেখে আমাদের পক্ষে এগুনো সম্ভব নয়। এতোদিন ধরে সমাজবিজ্ঞানী আর মনোবিজ্ঞানীরা বিবর্তনতত্ত্বকে বাইরে রেখে মানব সমাজের নানা সামাজিক ব্যাখ্যা প্রতিব্যাখ্যা জাহির করে চলেছিলেন। তাদের ব্যাখ্যায় ডারউইনীয় বিশ্লেষণ অনুপস্থিত থাকায় সেগুলো থেকে গেছে অনেকাংশেই অসম্পূর্ণ নয়তো হয়ে উঠেছে বৈজ্ঞানিক দিক দিয়ে একেবারেই অপাংক্তেয়। সেই সমস্যাগুলোর অসম্পূর্ণ সমাধানের পূর্ণতা দিতে বিবর্তন তত্ত্ব কীভাবে অগ্রসর বিশ্লেষণ হাজির করতে পারে তার বেশকিছু নমুনা হাজির করেছি আমার এ বইয়ে।

ডারউইনীয় বিশ্লেষণকে সমাজ ব্যাখ্যার একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ব্যাপারটা সহজে হয়তো অনেকেই মেনে নেবেন না। যদিও অন্য সকল প্রাণীকে জীবজগতের অংশ হিসেবে মানতে তাদের আপত্তি নেই, এমনকি ডারউইনীয় বিবর্তনের প্রয়োগ ছাড়া যে পিঁপড়েদের সমাজ থেকে শুরু করে শিম্পাঞ্জিদের সমাজ পর্যন্ত কোন কিছুরই ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব নয় সেটিও অনেকেই মানেন, কিন্তু মানুষকে ডারউইনীয় বিশ্লেষণের বাইরে রাখতেই অনেকে পছন্দ করেন। হয়তো। তারা ভাবেন, হাতি, গণ্ডার, শিম্পাঞ্জি কিংবা গরিলা–এ সকল প্রাণীরা যতই উন্নত হোক না কেন, তারা তো আর মানুষের মতো কবিতা লিখতে পারে না, পারেনা গলা ছেড়ে গান গেতে, কিংবা পারেনা স্থাপত্যকর্ম কোয়ান্টাম ফিজিক্স নিয়ে পড়াশুনা করতে, তাই মানুষ বোধ হয় অন্য প্রাণীদের থেকে একেবারে আলাদা, অনন্য। এ থেকে তারা সিদ্ধান্ত টানেন যে, ডারউইনীয় বিশ্লেষণ মানব সমাজের জন্য প্রযোজ্য নয়। আমি আমার এ বইয়ে এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির দুর্বলতাগুলো তুলে ধরেছি। আমি দেখিয়েছি, অনন্য বৈশিষ্ট্য থাকাটা ডারউইনীয় বিশ্লেষণকে বাতিল করে না। আসলে খেয়াল করলে দেখা যাবে, সব প্রাণীরই কিছু না কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, যার নিরিখে মনে হতে পারে যে তারা হয়তো অনন্য। যেমন, বাদুড়ের আন্ট্রাসনিক বা অতিশব্দ তৈরি করে শিকার ধরার এবং পথ চলার ক্ষমতা আছে, যা অনেক প্রাণীরই নেই। মৌমাছির আবার পোলারাইজড বা সমবর্তিত আলোতে দেখার বিরল ক্ষমতা আছে, যা আমাদের নেই। এধরনের অনন্য বৈশিষ্ট্য থাকার পরেও কেউ কিন্তু বলছেনা যে বাদুড় বা মৌমাছিকে জীববিজ্ঞানের বাইরে রাখতে হবে। তাহলে মানুষের ক্ষেত্রেই বা অযাচিত ব্যতিক্রম হবে কেন? আসলে আমরা অনেকে নিজেদের ‘আশরাফুল মাখলুকাৎ’ ভেবে নিয়ে অন্য প্রাণীদের থেকে একেবারেই আলাদা ভেবে প্রবল আত্মতৃপ্তি অনুভব করি। এই অযাচিত আত্মতৃপ্তিই অনেক সময় যৌক্তিক চিন্তায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। হয়ে উঠে অচলায়তন বৈজ্ঞানিক ভাবনার বিকাশে। আমি এ বইয়ে জোরালো দাবি উত্থাপন করে বলেছি মানব সমাজের কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য কিংবা জটিলতা বিদ্যমান থাকা। সত্ত্বেও আমরা মানুষেরা শেষ পর্যন্ত জীবজগতেরই অংশ। মানব সমাজে প্রেম, ভালবাসা, আত্মত্যাগ, ঘৃণা,সঙ্ত, পরার্থপরায়ণতা, সৃজনশীলতা এমনকি নৈতিকতা এবং মূল্যবোধের মত উপাদানগুলোও বিবর্তনের পথ ধরেই সৃষ্ট হয়েছে, কখনো প্রাকৃতিক নির্বাচনকে পুঁজি করে, কখনোবা যৌনতার নির্বাচনের কাঁধে ভর করে।

যৌনতা শুনলেই আমাদের অনেকের মাথায় ফ্রয়েড চলে আসে। আসাটা স্বাভাবিক। কিন্তু স্বাভাবিক হলেও সব সময় সঠিক নয়। যৌনতার মাধ্যমে ফ্রয়েড একসময় আমাদের মানসজগতের কিছু ব্যাখ্যা দিতে উদ্যত হয়েছিলেন বটে, কিন্তু ফ্রয়েডের যৌনতার ব্যাখ্যা আর ডারউইনের যৌনতার নির্বাচন কিন্তু একই ইমারতে দাঁড়িয়ে নেই। বরং, ফ্রয়েডের সাথে ডারউইনের ধারণা এবং তত্ত্বের পার্থক্য বিস্তর। ফ্রয়েড তার ব্যাখ্যায় প্রাণিজগতের বিবর্তন এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়া গোনায় ধরেননি, অনেক ক্ষেত্রেই নিজের মনোমত ব্যাখ্যা হাজির করেছিলেন। লিবিডো, অহম, শিশ্নাসুয়া খোজাগৃঢেষা, ইদিপাস-ইলেক্ট্রা গূঢ়েষার নানা রসালো তত্ত্ব আর ধারণার মাধ্যমে যার অনেকগুলোই আবার পরবর্তীতে অবৈজ্ঞানিক এবং বাতিল হিসেবে গণ্য হয়েছিল। কিছু কিছু আবার পরিগণিত হয়েছিল চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়াশীল ধারণা হিসেবেও। ডারউইন বর্ণিত যৌনতার নির্বাচন কিন্তু ফ্রয়েডীয় এ সমস্ত কুসংস্কার থেকে একদমই আলাদা। ডারউইনের এ তত্ত্বের একটি বৈজ্ঞানিক ইতিহাস আছে, আছে তত্ত্বের সপক্ষে জোরালো প্রমাণ। ডারউইন প্রকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে ঘটা বিবর্তন নিয়ে নিশ্চিত হলেও প্রকৃতি জগত পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে লক্ষ্য করেছিলেন, প্রাণিজগতে বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য পাওয়া যাচ্ছে যা কেবল প্রাকৃতিক নির্বাচন দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। কারণ এ বৈশিষ্ট্যগুলো প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফলশ্রুতিতে টিকে থাকার কথা নয়। এগুলো টিকে আছে, কারণ এই বৈশিষ্ট্যগুলো বিপরীত লিঙ্গের যৌনসঙ্গীর দ্বারা বংশপরম্পরায় দিনের পর দিন আদৃত হয়েছে বলেই। একটি চমৎকার উদাহরণ হচ্ছে পুরুষ ময়ূরের দীর্ঘ পেখম। এমন নয় যে দীর্ঘ পেখম পুরুষ ময়ূরকে। প্রকৃতিতে টিকে থাকতে কোন বাড়তি উপযযাগিতা দিয়েছিল। বরং দীর্ঘ পেখম স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যহতই করেছে পদে পদে। দীর্ঘ পেখম থাকলে দৌঁড়াতে অসুবিধা হয়, শিকারীদের হাতে মারা পড়ার সম্ভাবনাও থাকে বেশিমাত্রায়। কাজেই টিকে থাকার কথা বিবেচনা করলে দীর্ঘ পেখম ময়ূরের জন্য কোন বাড়তি উপযোগিতা দেয়নি বিবর্তনের পথ পরিক্রমায়। তাই প্রাকৃতিক নির্বাচনের সাহায্যে ময়ুরের দীর্ঘ পেখমকে ব্যাখ্যা করা অসম্ভবই বলা যায়। তাহলে ময়ূরের দীর্ঘ পেখম তৈরি হবার পেছনে রহস্যটা কি? এখানেই চলে আসে যৌনতার নির্বাচনের ব্যাপারটি। দীর্ঘ পেখম টিকে গেছে মূলতঃ নারী ময়ূর বা ময়ূরীর পছন্দকে প্রাধান্য দিয়ে। এই বৈশিষ্ট্য স্রেফ অলংকারিক। আসলে পুরুষ ময়ূরের লম্বা পেখমকে ভাল বংশাণুর নির্দেশক হিসেবে দেখত ময়ূরীরা। কাজেই দীর্ঘ পেখমের ঢেউ তোলা সুশ্রী ময়ুরেরা যৌনসঙ্গী হিসেবে নির্বাচিত হতে পেরেছিল। এভাবেই দীর্ঘ পেখমের বৈশিষ্ট্য বংশপরম্পরায় টিকে থেকেছে। ঠিক একইভাবে কোকিলের সুরেলা গলা, বাবুই পাখির বাসা বানানোর ক্ষমতা, ফুট ফ্লাইয়ের নাচ, উইডোবার্ডের দীর্ঘ লেজ কিংবা হরিণের শিং–এগুলোও উদ্ভূত হয়েছে বেঁচে থাকার প্রয়োজনে নয়, বরং বিপরীতলিঙ্গের বিভিন্ন পছন্দ অপছন্দ তথা যৌনতার নির্বাচনকে প্রাধান্য দিয়ে। আমি আমার এ বইয়ে দেখিয়েছি, ময়ূরের পেখমের মতই মানবসমাজেও অনেক বৈশিষ্ট্য আছে যেগুলো অর্নামেন্টাল বা অলংকারিক। কবিতা লেখা, গান করা থেকে শুরু করে গল্প বলা, আড্ডা মারা, কৌতুক করা, ভাস্কর্য বানানো প্রভৃতি হাজারো বৈশিষ্ট্য মানব সমাজে দেখা যায় যেগুলো স্রেফ অলংকারিক–এগুলো বেঁচে থাকায় কোন বাড়তি উপাদান যোগ করেনি, কিন্তু এগুলো টিকে গেছে যৌন নির্বাচনের প্রেক্ষিতে পছন্দ অপছন্দকে গুরুত্ব দিয়ে। ময়ূর দীর্ঘ পেখমের যাদুতে বিমোহিত করে সঙ্গীদের প্রলুব্ধ করে, হরিণ যেটা আবার করে থাকে তার বর্ণাঢ্য শিং এর যাদুতে। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, শুধু ময়ূর বা হরিণ নয়, মানব সমাজেও অলংকারিক বৈশিষ্ট্য কিন্তু একেবারে কম নেই। বড় চুল রাখা, দামি সানগ্লাস পরা, কেতাদুরস্ত কাপড়ের ফ্যাশন করা থেকে শুরু করে দামি গাড়ি, বাড়ি, শিক্ষা, বাকচাতুর্য, প্রতিভা, নাচ, গান, বুদ্ধিমত্তা সবকিছুই মানুষ কাজে লাগায় বিপরীত লিঙ্গকে আকর্ষণের কাজে। আসলে মানব সমাজের নারীপুরুষের বহু বৈশিষ্ট্য এবং অভিব্যক্তিই মোটাদাগে সম্ভবত যৌনতার নির্বাচনের ফলাফল হিসেবেই উদ্ভূত– আশা করছি পাঠকেরা বহুভাবে এই সত্যের উন্মোচন অবোলকন করবেন এই বইয়ে।

যৌনতার নির্বাচন এই বইটির বড় অংশ অধিকার করে থাকলেও সেটাই বইয়ের একমাত্র উপজীব্য নয়। বইটির মূল লক্ষ্য ডারউইনীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে জীবন, জগৎ এবং সমাজকে ব্যাখ্যার প্রচেষ্টা; আর সেই সাথে এ সংক্রান্ত বিভিন্ন আধুনিক গবেষণার সাথে বাঙালি পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দেয়া। সাড়া বিশ্ব জুড়ে জন টুবি, লিডা কসমাইডস, স্টিভেন পিঙ্কার, রিচার্ড ডকিন্স, ডেভিড বাস, ম্যাট রিডলী, জিওফ্রি মিলার, র‍্যান্ডি থর্ন হিল, রবার্ট টিভার্স, মার্গো উইলসন, সারাহ ব্ল্যাফার হার্ডি, হেলেন ফিশার, রবিন বেকার সহ বহু গবেষকদের বিবর্তন মনোবিজ্ঞান সংক্রান্ত গবেষণা আজ বিজ্ঞানের অন্যতম আকর্ষণীয় এবং গবেষণার সজীব ক্ষেত্রে পরিণত করেছে। তাদের সেই কষ্টার্জিত আধুনিক গবেষণাগুলোকেই সহজ ভাষায় বাঙালি পাঠকদের কাছে তুলে ধরার ঐকান্তিক প্রয়াস নিয়েছি আমি আমার এই বইয়ের মাধ্যমে। এই বইয়ের বেশ কিছু অংশ ধারাবাহিকভাবে মুক্তমনা ব্লগে এবং কিছু কিছু মুক্তান্বেষা পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। পাঠকদের গঠনমূলক সমালোচনা এবং প্রাঞ্জল তর্ক বিতর্ক নতুন জ্ঞানের দুয়ার উন্মোচন করেছিল। আমি এক্ষেত্রে মুক্তমনায় সংশপ্তক, আল্লাচালাইনা, বিপ্লব পাল, ফরিদ আহমেদ, জওশন আরা, গীতা দাস, ইরতিশাদ আহমদ, অপার্থিব সহ বহু ব্লগারদের অবদানকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। ফেসবুকেও পেয়েছি অসংখ্য মন্তব্য। আমার লেখাকে কেন্দ্র করে তাদের গঠমূলক আলোচনা আমার বইটিকে নতুনভাবে সাজাতে বাধ্য করেছে বহু ক্ষেত্রেই। পাশাপাশি আমার জীবনসঙ্গিনী বন্যা আহমেদের তীক্ষ্ম সমালোচনাগুলোও আমার পাণ্ডুলিপির পরিবর্তন পরিবর্ধনে অবদান রেখেছে অনেক। বন্যা নিজে বিবর্তনের অনুরাগী পাঠক এবং লেখক হওয়া সত্ত্বেও বিবর্তন মনোবিজ্ঞানের বহু ধারণার ব্যাপারে নিরন্তর সংশয়ী শুধু নয়, তীব্র সমালোচকও। তবে, এ ব্যাপারটা আমার জন্য যেন ‘শাপে বর হিসেবেই দেখা দিয়েছে। আমার মনে আছে, যখন আমি বইটির বিভিন্ন অংশ লিখছিলাম, বহু ক্ষেত্রেই আমার লেখালেখি এমনকি নাওয়া খাওয়া

সরিয়ে রেখে আর সাথে তর্কযুদ্ধে নামতে হয়েছে। আমার চৌদ্দ বছর বয়সী কন্যা তৃষা আমাদের এই তর্ক বিতর্ক দেখতে দেখতে হতাশ হয়ে বলেছে– “তোমরা এত অর্থহীন বিষয় নিয়ে এভাবে দিনের পর দিন ঝগড়া কর, যে অবাক লাগে! বন্যা আর আমি দু’জনই তখন তাকে বোঝানোর চেষ্টা করি- “আরে আমরা তো ঝগড়া করছি না, এটা এক ধরনের ইন্টেলেকচুয়াল ডিসএগ্রিমেন্ট অ্যান্ড ডিস্কাশন’। তাতে অবশ্য আমার কন্যার অবাক হবার মাত্রা কমে না, আমরাই বরং শেষ পর্যন্ত তর্কে ক্ষান্ত দেই। যা হোক, লেখাগুলো শেষ পর্যন্ত বন্যার সংশয়ী দৃষ্টি পার হয়েই যেতে হয়েছে বলে এর মান নিয়ে আমার কোনই সন্দেহ নেই। তারপরেও একটা বিষয় আমিও মাথায় রেখেছি। একেবারে প্রান্তিক গবেষণালব্ধ জিনিস গ্রন্থাকারে হাজির করলে একটা ভয় সবসময়ই থাকে যে, পরবর্তীতে অনেক কিছুই মিথ্যা হয়ে যেতে পারে। তারপরও এই প্রান্তিক জ্ঞানগুলো আমাদের জন্য,এবং আমার বইয়ের পাঠকদের জন্য জরুরী বলে আমি মনে করেছি। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্টিভেন পিঙ্কার তার ‘মন কিভাবে কাজ করে? বইয়ের ভুমিকায় বলেছিলেন[৩]–

‘এই বইয়ের প্রতিটি ধারণা সময়ের সাথে সাথে ভুল প্রমাণিত হয়ে যেতে পারে। কিন্তু সেটাই হবে আমাদের জন্য অগ্রগতি। কারণ পুরোন ধ্যান ধারণা গুলো এতোই নিরস যে ভুল হবারও যোগ্য নয়।’

আমিও সেকথাই বলার চেষ্টা করব। বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান বিজ্ঞানের নতুন শাখা। নতুন জিনিস নিয়ে গবেষনার ক্ষেত্রে– এর কিছু প্রান্তিক অনুমান যদি ভুলও হয়, সেটাই হবে পরবর্তী বিজ্ঞানীদের জন্য প্রগতির সূচক। সে কথা মাথায় রেখেই আমার এ বইটি লেখা।

আমার শেষ কটি বইয়ের প্রকাশক ছিলেন শুদ্ধস্বরের আহমেদুর রশীদ টুটুল। তার হাতে বই তুলে দেওয়ার আলাদা আনন্দ আছে। ‘বিজয় অধ্যুষিত’ ছাপার বাজারে আহমেদুর রশীদ টুটুলই একমাত্র প্রকাশক যিনি অভ্রতে কম্পোজকৃত (ইউনিকোডে লেখা) পাণ্ডুলিপি অবলীলায় প্রকাশ করে চলেছেন। ইমেইল, ফেসবুক এবং যোগাযোগের আধুনিক কারিগরী উপকরণগুলো তার নখদর্পণে থাকায় বাংলাদেশ থেকে প্রায় অর্ধগোলার্ধ দূরত্বে অবস্থান করেও তার সাথে যোগাযোগে কখনোই খুব একটা বেগ পেতে হয় না। তার চেয়েও বড় কথা, আমি আমার বইয়ে ছাইপাশ যাই লিখি না কেন, টুটুলের মনোরম প্রচ্ছদ, বাঁধাই, ভাল কাগজ এবং যত্ন নিয়ে ছাপানোর গুণে তার প্রকাশিত বইগুলো হাতে নিলেই একধরনের আলাদা আনন্দ হয়, তৈরি করে অনাবিল মুগ্ধতা। সেই মুগ্ধতাটুকুর রেশ এখনো না কাটায় এই বইটিও তার বিশ্বস্ত হাতেই তুলে দেয়া হল। বইটি পাঠকদের ভাল লাগলে এর সামগ্রিক কৃতিত্বটুকু কার লেখকের নাকি এই তরুণ প্রকাশকের এ ব্যাপারে আমি মোটেই নিশ্চিত নই।

অভিজিৎ রায়।
ফেব্রুয়ারি, ২০১২।

.

সূচীপত্র

প্রথম অধ্যায় বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান-মনের নতুন বিজ্ঞান

দ্বিতীয় অধ্যায় ব্ল্যাঙ্ক স্লেট

তৃতীয় অধ্যায় সংস্কৃতির ‘ভূত’

চতুর্থ অধ্যায় সখি, ভালোবাসা কারে কয়?

পঞ্চম অধ্যায় নারী ও পুরুষ দুই ভুবনের দুই বাসিন্দা?

ষষ্ঠ অধ্যায় জীবন মানে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা

সপ্তম অধ্যায় বিবর্তনের দৃষ্টিতে নৈতিকতার উদ্ভব

অষ্টম অধ্যায় যে প্রশ্নগুলোর উত্তর মেলেনি

.

০১. – বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান-মনের নতুন বিজ্ঞান

মুক্তমনায় (www.mukto-mona.com) এক বছর আগে বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান নিয়ে একটা সিরিজ শুরু করেছিলাম; শুরু করেছিলাম একটা ‘বড়দের জোক’ মানে প্রাপ্তবয়স্ক কৌতুক দিয়ে। কৌতুকটা এইরকম।

এক আধ-পাগলা ব্যাটা (ধরা যাক তার নাম মন্টু মিয়া) সারাদিন পাড়ায় ঘুরে ঘুরে গুলতি দিয়ে জানালার কাঁচ ভাঙত। এটাই তার নেশা। কিন্তু বাপ, তুই নেশা করবি কর তোর নেশার চোটে তো পাড়া-পড়শির ঘুম হারাম। আর তা হবে নাই বা কেন! কাশেম সাহেব হয়তো ভরপেট খেয়েদেয়ে টিভির সামনে বসেছেন, কিংবা হয়তো বিছানায় যাওয়ার পাঁয়তারা করছেন, অমনি দেখা গেল দড়াম করে বেডরুমের কাঁচ ভেঙে পড়লো। শান্ত কখনো বা সকালে উঠে প্রাতঃকৃত্য সারার নাম করে বাবা-মার কাছ থেকে লুকিয়ে চাপিয়ে বাথরুমে গিয়ে কমোডে উপবেশনপূর্বক একটা বিড়ি ধরিয়ে একখান সুখটান দেবার উপক্রম করেছে অমনি গুলতির চোটে বাথরুমের কাঁচ ছত্রখান। নরেন্দ্রবাবু সকালে উঠে এক রৌদ্রস্নাত দিন দেখে ‘আজি এ প্রভাতে রবির কর…’ কবিতার চরণ আবৃত্তি করতে করতে জানালা দিয়ে চাঁদমুখোনি বাড়িয়ে দিয়েছেন, অমনি এক ক্ষুদ্র ইষ্টকখণ্ড ‘আসিয়া জানালা তো ভাঙিলোই, তদুপরি কপালখানিও বেঢপ আকৃতিতে ফুলিয়া উঠিলো।

কাহাতক আর পারা যায়। পাড়া পড়শিরা একদিন জোট বেঁধে শলাপরামর্শ করে মন্টু মিয়াকে বগলদাবা করে শহরের পাশের পাগলা গারদে দিয়ে আসলো।

সে এক হিসেবে ভালোই হলো। এখন আর বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ করে কারো জানালার কাঁচ ভেঙে পড়ে না। কাশেম সাহেব ভরপেট খেয়ে টিভির সামনে বসতে পারেন, শান্ত বাবাজি হাগনকুঠিতে গিয়ে নিবিষ্ট মনে গিয়ে বিড়ি টানতে পারে, আর নরেন্দ্রবাবুও রবিঠাকুরের কবিতা শেষ করে জীবনানন্দ দাশেও সেঁধিয়ে যেতে পারেন, কোনো রকমের বাধা-বিপত্তি ছাড়াই। জীবন জীবনের মতো চলতে থাকে নিরুপদ্রপে।

আর অন্য দিকে মন্টু মিয়ার চিকিৎসাও ভালোই চলছে। প্রতিদিন নিয়ম করে তাকে ঔষধ পথ্য খাওয়ানো হচ্ছে, রেগুলার সাইকোথেরাপি দেওয়া হচ্ছে, সমাজ জীবন নিয়ে এন্তার জ্ঞানও দেয়া হচ্ছে। মানুষ সম্পর্কে আর সমাজ সম্পর্কে দায়িত্ববোধ গড়ে তোলা হচ্ছে। আর মন্টু মিয়ার দায়িত্ব নিয়েছেন দেশের বিখ্যাত বিশেষজ্ঞ ড. আজিম। তো এই উন্নত চিকিৎসা আর পরিবেশ পেয়ে মন্টু মিয়ার মনও ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়ে উঠলো। এখন আর জানালার কাঁচ দেখলেই মন্টু মিয়ার হাত আগের মতো নিশপিশ করে না। জব্দ করা গুলতির জন্য মন কেমন কেমন করে উঠে না। নিয়ম করে খায় দায়, বই পড়ে, ব্যায়াম করে আর সমাজ আর জীবন নিয়ে উচ্চমার্গীয় চিন্তা করে। অসুস্থতার কোনো লক্ষণই আর মন্টু মিয়ার মধ্যে নেই! দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়…

বহুদিন ধরে চিকিৎসার পর একদিন সুবে সাদিকে ডাক্তার সাহেব মন্টু মিয়ার কেবিনে এসে বললেন,

– “মন্টু মিয়া, তুমি সম্পূর্ণ সুস্থ।”

-”তাই? এইটা তো খুবই ভালো সংবাদ দিলেন স্যার। আমি তো ভাবতেছিলাম এই পাগলা গারদ থেকে কোনোদিন ছাড়াই পামু না আর।” মন্টু মিয়ার চোখে বিস্ময়।

– “কী যে বলো! আমাদের চিকিৎসার একটা ফল থাকবে না!”– ডাক্তার সাহেবের ভরাট গলায় একধরনের আত্মপ্রসাদের ছাপ।

– “তা তো বটেই। আপনাগো অনেক ধন্যবাদ ডাক্তার সাহেব। আপনারা সবাই মিল্লা আমার জন্য যা করলেন… ”।

– “না না কী যে বলেন। আপনার নিজের প্রচেষ্টা ছাড়া কী আর এ অসাধ্য সম্ভব হতো নাকি! ” বিনয়ের অবতার সেজে গেলেন ডাক্তার সাহেব। তারপর হাতের স্টেটসকোপ দিয়ে নাড়ি দেখলেন, রক্তের চাপ পেলেন স্বাভাবিক মাত্রায়। জিব বের করিয়ে চোখের পাতা টেনে ধরে নীচ-উপর করলেন কোনো অস্বাভাবিকতাই পেলেন না। আরও কিছু ছোটখাটো পরীক্ষা সেরে নিলেন। একজন স্বাভাবিক মানুষের যা যা লক্ষণ পাওয়া উচিত তাই পেলেন ডাক্তার সাহেব। ডাক্তার আজিম বুঝলেন তার চিকিৎসায় মন্টু এখন পুরোপুরি সুস্থ। অযথা আর হাসপাতালে আটকে রাখার কোনো মানে হয় না। তাকে রিলিজ করে দেওয়ার যাবতীয় কাগজপত্র হাতে নিলেন সই করবেন বলে। এই কাজটা একদমই ভালো লাগে না ড, আজিমের। সামান্য একটা রিলিজ, অথচ হাজারটা কগজপত্র, হাজার জায়গায় সই। কাগজগুলোতে চোখ বুলিয়ে একটা একটা করে সই-এর দায়িত্ব সেরে নিচ্ছেন ডাক্তার সাহেব। ফাঁকে ফাঁকে মন্টু মিয়ার সাথে কথোপকথন চালাচ্ছেন, যাতে যতদূর সম্ভব বিরক্তি থেকে মুক্ত থাকতে পারেন।

“তা হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে কী করবে মন্টু মিয়া? সোজা বাসায় চলে যাবে?”

– “হোটেলে? কেন? ভালো করে খাওয়া দাওয়া করবে বুঝি? তা করতেই পার। হাসপাতালের ঘাস পাতা খেতে খেতে অরুচি ধরে গেছে নিশ্চয়।”

– হোটেলটায় নাকি মদ-টদ আর সাথে আরও কিছু জিনিস পাওয়া যায় সস্তায়। ভাবতেছি অনেকদিন …

– হ্যাঁ হ্যাঁ তা তো বটেই। আরে এত লজ্জা পাচ্ছ কেন। ফুর্তি করার এটাই তো বয়স। হ্যাঁ, ওখানে শুধু মদই পাওয়া যায় না, সাথে নাকি সুন্দর সুন্দর মেয়েও পাওয়া যায়… মানে এই আমি শুনেছি আর কী…

(ড, আজিম যে সেসব উদ্ভিন্নযৌবনা মধুমক্ষিকার লোভে প্রায়শই বাসার নাম করে নিষাদে সেঁধিয়ে যান, আর দীর্ঘ সময় পরে মাঝরাতে বাসায় গিয়ে বউকে আলিঙ্গন করে বলেন…আজকেও ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গেল, বুঝলে এত কাজ থাকে… এই ব্যাপারটা এক্ষণে মন্টু মিয়ার কাছ হইতে চাপিয়া যাওয়াই শ্রেয় মনে করিলেন ড. আজিম)।

– ‘হ স্যার ওগো জিনিস ভালা। আমি জানি।‘

— ‘তো এতদিন পর এরকম একটা চান্স…নিশ্চয় অনেক আমোদ ফুর্তি করবে।

– ‘হ স্যার। লটের সব থেইক্যা সুন্দর মাইয়াডারে ভাড়া করুম। লগে এক বোতল কেরু’।

‘বাহ তারপর?’ ডাক্তার সই করার কথা ভুলে মন্টু মিয়ার দিকে চাইলেন। কেরুর প্রতি ড, আজিমের বিন্দুমাত্র আকর্ষণ না থাকলেও (তিনি আবার বিদেশি মদ ছাড়া কিছু মুখে দেন না), নারীদেহের প্রতি তার অন্তহীন আকর্ষণ। মন্টু মিয়া হোটেলে গিয়ে কী করবেন, তা ভেবেই তিনি রোমাঞ্চিত হয়ে উঠতে লাগলেন।

– “তারপর আর কী! একটা রুম বুক দিমু। টেকা পয়সা যা আছে তাতে চইলা যাইব’।

‘টাকা পয়সা যে তোমার আছে তা ত জানি। কিন্তু তুমি রুমে গিয়ে কী করবে? ডাক্তার সাহেবের আর তর সয় না।

‘রুমে গিয়া দরজাটা ভালো মতো লক করমু আগে। তারপর মাইয়াডারে বিছানায় বহাইয়া কেরুর বোতল খুইলা দিমু চুমুক। তারপর আস্তে ধীরে মাইয়াডার দিকে আগামু…।

– “তারপর, তারপর?’ ডাক্তার সাহেবের শিরদাঁড়া খাড়া হয়ে উঠছে।

— ‘তারপর স্যার…মাইয়াডার কাপড় আস্তেধীরে খুলতে শুরু করমু। তারপর…’

— ‘তারপর?’ ডাক্তার সাহেব উত্তেজনায় পারলে একেবারে দাঁড়িয়ে যান।

— তারপর ব্রাটা খুইলা লমু..

— “হ্যাঁ, তারপর? তারপর কী করবে?’ ড. আজিম এবারে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে যান।

– “তারপর স্যার, ওই ব্রাটার ইলস্টিকটারে গুলতি বানায়া হোটেলের জানালার সমস্ত কাঁচ ভাঙ্গুম!

– ‘কী!!!!’ ড, আজিম মাথায় হাত দিয়ে চেয়ারে বসে পড়লেন।

ছোটবেলায় শোনা এই ‘বড়দের’ জোকটা ‘ফালতু’ মনে হলেও এর মর্মার্থ কিন্তু ব্যাপক। এতে আমাদের মানব মনের এক অন্তহীন প্রকৃতিকে তুলে ধরা হয়েছে। এই বড়দের ‘ঈশপের গল্পের মর্মার্থ হলো কারো কারো মাথার ক্যারা এমনই যে, যত চেষ্টাই করা হোক না কেন সেই ক্যারা কোনো রকমেই বের করে ফেলা যায় না। যত সাইকোথেরাপিই দেয়া হোক না কেন, দেখা যায় আবার সুযোগ পেলেই এবাউট টার্ন করে রোগী। আমি ‘সমকামিতা কি প্রকৃতিবিরুদ্ধ’[৪] নামে একটি সিরিজ লিখেছিলাম (পরে এটি শুদ্ধস্বর থেকে বই আকারে প্রকাশিত হয়[৫]), সেখানে বহু দৃষ্টান্ত হাজির করে দেখিয়েছিলাম যে, সমকামিতার ব্যাপারটা অনেক ক্ষেত্রেই স্রেফ পরিবেশনির্ভর নয়, বরং ‘বায়োলজিকালি হার্ডওয়্যার্ড’। একটা সময় ছিল যখন, সমকামিতাকে ঢালাওভাবে মনোরোগ বা বিকৃতি বলে ভাবা হতো। ভাবা হতো সমকামিতা বোধ হয় কিছু বখে যাওয়া মানুষের বেলাল্লাপনা ছাড়া আর কিছু নয়। আজকের দিনে সেই ধারণা (অন্তত পশ্চিমে) অনেকটাই পাল্টেছে। এ প্রসঙ্গে জানানো যেতে পারে যে, ১৯৭৩ সালের ১৫ই ডিসেম্বর American Psychiatric Association (বহু চিকিৎসক এবং মনোবিজ্ঞানীদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সংগঠন) বিজ্ঞানসম্মত আলোচনার মাধ্যমে একমত হন যে সমকামিতা কোনো নোংরা ব্যাপার নয়, নয় কোনো মানসিক ব্যধি। এ হলো যৌনতার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। ১৯৭৫ সালে American Psychological Association একইরকম অধ্যাদেশ দিয়েছিলেন। সকল আধুনিক চিকিৎসকই আজ এ বিষয়ে একমত।

[বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান কী?

–বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান মূলত বিজ্ঞানের দুটো চিরায়ত শাখাকে একীভূত করেছে; একটি হচ্ছে বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞান (Evolutionary Biology) এবং অন্যটি বৌদ্ধিক মনোবিজ্ঞান (Cognitive Psychology)। বৌদ্ধিক মনোবিজ্ঞান থেকে আমরা জানতে পারি যে, আমাদের মানসপট নির্মাণে দীর্ঘদিনের এক জটিল পরিকল্পনার ছাপ আছে। আবার বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞান বলে যে, জীবদেহের এই ‘জটিল পরিকল্পনা’ বলে যেটাকে মনে হয় সেটা আসলে ডারউইন বর্ণিত ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন’ এবং কিছু ক্ষেত্রে যৌনতার নির্বাচনের ফলাফল। কাজেই, এই দুই শাখার মিশ্রণে গড়ে উঠা বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের উপসংহার হচ্ছে আমাদের জটিল মানসপটও উদ্ভূত হয়েছে দীর্ঘদিনের বিবর্তনীয় পথ পরিক্রমায় প্রাকৃতিক নির্বাচন এবং যৌনতার নির্বাচনকে পুঁজি করেই।]

মন্টু মিয়ার পাগলামো কিংবা সমকামিতাই কি ‘ক্যারা মাথার’ কেবল একমাত্র উদাহরণ? না তা মনে করা ভুল হবে। আমাদের চারপাশে চোখ মেললেই আমরা মানবপ্রকৃতির এ ধরনের আরও মজার মজার উদাহরণ দেখতে পাব। একই রকম কিংবা প্রায় একই রকম পরিবেশ দেয়ার পরও অভিভাবকেরা লক্ষ করেন তাদের কোনো বাচ্চা হয় মেধাবী, অন্যটা একটু শ্লথ, কেউ বা আবার অস্থির, কেউ বা চাপা স্বভাবের, কেউ বা কোমল কেউ বা হয় খুব ডানপিটে। কেউ বা স্কুলের লেকচার থেকে চটপট অঙ্কের সমস্যাগুলো বুঝে ফেলে, কেউ বা এ ধরনের সমস্যা দেখলেই পালিয়ে বাঁচে, কিংবা মাস্টারের বেতের বাড়ি খেয়ে বাসায় ফেরে। ছোটবেলা থেকেই কেউ পিয়ানোতে খুব দক্ষ হয়ে উঠে, কেউ বা রয়ে যায় তাল কানা। কেউ বা খেলাধুলায় হয় মহা চৌকস, কারো বা ব্যাটে বল লাগতেই চায় না। কেউ ছোটবেলা থেকেই গল্প-কবিতা লেখায় খুব পারদর্শী হয়ে উঠে, তার কেউ সাহিত্য শব্দটা উচ্চারণ করতে গেলেই দাঁত খুলে আসে কিংবা একটা চার লাইনের কবিতা লিখতে গেলেই কলম ভেঙে পড়ে। এ ধরনের ব্যাপারস্যাপারের সাথে আমরা সবাই কমবেশি পরিচিত।

কাজেই, আমরা কিছু উদাহরণ পেলাম যেগুলো হয়তো অনেকাংশেই পরিবেশনির্ভর নয়। অন্তত পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করে আমরা সেগুলোর প্রকৃতি রাতারাতি বদলে দিতে পারি না। আইনস্টাইনকে শিশু বয়সে আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলে বড় করলেই কি তিনি ম্যারাডোনা বা পেলে হয়ে উঠতে পারতেন? তা কিন্তু হলফ করে বলা যাবে না। তার মানে ভালোবা উপযুক্ত পরিবেশ দেয়ার পরও বাঞ্ছিত ফলাফল আমরা পাই না বহু ক্ষেত্রেই। তখন কপাল চাপড়ানোই সার হয়। কিন্তু তার মানে কিন্তু এটা মনে করা ভুল হবে যে, জীবন গঠনে পরিবেশের কোনো প্রভাব নেই। অবশ্যই আছে। জীবন গঠনে পরিবেশের ভূমিকা যে অনস্বীকার্য, সেটা তো আমরা ছোটবেলা থেকেই জানি। সে জন্যই প্রত্যেক পিতামাতা তার সন্তানকে একটা ভালো পরিবেশ দিয়ে বড় করতে চান। শিশুর মানসপটে পরিবেশের প্রভাব আছে বলেই ভালো একটা পরিবেশ প্রদানের জন্য কিংবা ভালো একটা স্কুলে বাচ্চাকে ভর্তি করানোর জন্য অভিভাবকেরা অহর্নিশি চিন্তিত থাকেন। তারপরও কি তারা সবসময় প্রত্যাশিত ফল পান? মুনির ঘরে কি শনি জন্মায় না? কিংবা আলিমের ঘরে জালিম? জন্মায় জন্মায়। এই আমার উদাহরণটাই ধরুন। আমার মা ছোটবেলা থেকে কত করে চাইল তার ছেলেটার যেন ধর্মেকর্মে মতি থাকে, সবার সাথে যেন ভালো ব্যবহার করি, কারো সাথে যেন ঝগড়া ফ্যাসাদে না জড়াই। তা আর হলো কই! ধর্মকর্ম আর আমার ধাতে সইলো না। মুনাফেকের খাতায় অচিরেই নাম উঠে গেল আমার। সাত বছর বয়সে আমি ঘোষণা দিয়ে বললাম–”মন্দিরের প্রসাদ যেন। আমাকে না খাওয়ানো হয় কক্ষনো’। আমাদের পাড়ার (মা-বাবার দৃষ্টিতে) সবচেয়ে অপছন্দের আর বখে যাওয়া ছেলেটার সাথে মিশতে শুরু করে দিলাম। আমার মা। নীরবে চোখের জল ফেলেন- “কী কুক্ষণে যে এইটারে পেটে ধরেছিলাম!” অথচ এমন কি হবার কথা ছিল? ভালো পরিবেশের কোনো অভাব ছিল না আমার …

পাঠকদের মাথায় নিশ্চয়ই প্রশ্ন উঁকি দিতে শুরু করেছে পরিবেশই যদি মানবপ্রকৃতি গঠনের একমাত্র নিয়ামক না হয়ে থাকে, তাহলে আর বাকি থাকে কী? বাকি থাকে একটা খুব বড় জিনিস। আজকের দিনের বিজ্ঞানীরা বলেন, মানবপ্রকৃতি গঠনে পরিবেশের প্রভাব যেমন আছে, তেমনি আছে আরেকটা জিনিসের প্রভাব। সেটা হচ্ছে বংশাণু বা ‘জিন’। মানুষের প্রকৃতি বিশ্লেষণে ‘জিন’কে নিয়ে আসায় অনেকের চোখই হয়তো কপালে উঠে যাবে। ভুরু কুঁচকে যেতে পারে কারো কারো। তবে আমি এ প্রবন্ধে দেখানোর চেষ্টা করব যে, পরিবেশ এবং “জিন’ মানবপ্রকৃতি গঠনে কোনোটার প্রভাবই কোনোটার চেয়ে কম নয়। আমরা প্রায়শই সন্তানদের দেখিয়ে বলি–ছেলেটা বাপের মতোই বদরাগী হয়েছে, কিংবা বলি মেয়ে হয়েছে মার মতোই সুন্দরী। চোখগুলো দেখেছ কী রকম টানা টানা?’ এগুলো কিন্তু আমরা এমনি এমনি বলি না। বহুদিনের অভিজ্ঞতা থেকেই এগুলো বলি, আর সেজন্যই এই উপমাগুলো আমাদের সংস্কৃতিতে এমনিভাবে মিশে গেছে। কেবল শারীরিক সৌন্দর্য নয়, আবেগ, অনুরাগ, হিংসাত্মক কিংবা বদরাগী মনোভাব এমনকি ডায়াবেটিস কিংবা হৃদরোগের ঝুঁকি পর্যন্ত আমরা বংশপরম্পরায় বহন করি ‘জেনেটিক তথ্য হিসেবে আমাদের অজান্তেই। বাবার হৃদরোগের উপসর্গ থাকলে ছেলেকেও একটু বাড়তি সচেতন হতে পরামর্শ দেন আজকের ডাক্তারেরা। কার্ব আর রেড মিট ছেড়ে দিতে বলেন। পরিবারে কারো ডায়াবেটিস থাকলে কিংবা কাছের কোনো আত্মীয়ের দেহে এ রোগ বাসা বেঁধে থাকলে অন্যান্যরাও নিয়মিত ‘সুগার চেক’ করা শুরু করে দেন। এগুলো কিন্তু আমরা সবাই জানি। শারীরিক গঠন কিংবা রোগ-বালাইয়ের ক্ষেত্রে তাও না হয় মানা যায়, কিন্তু মানুষের চরিত্র গঠনে ‘জিন’-এর প্রভাব থাকতে পারে, এ ব্যাপারটা মেনে নিতে অনেকেরই আপত্তি ছিল, এখনও আছে বহুজনেরই। আর আপত্তি আছে বলেই আমরা জ্ঞানের ক্ষেত্রটিকে পরিষ্কার দুইভাগে ভাগ করে। ফেলেছি– জীববিজ্ঞান আর সমাজবিজ্ঞান নামের অভিধায়। প্রাণিদেহের এবং সর্বোপরি মানুষের শারীরিক গঠন, দৈহিক বৈশিষ্ট্য, মিউটেশন ইত্যাদি নিয়ে গবেষণা করবেন জীববিজ্ঞানীরা, আর সমাজসংস্কৃতি আর মানুষের মন নিয়ে গবেষণা করবেন জীববিজ্ঞানীরা আর সমাজসংস্কৃতি আর মানুষের মন নিয়ে গবেষণা করবেন সমাজবিজ্ঞানীরা কিংবা মনোবিজ্ঞানীরা। এ যেন দুই স্বতন্ত্র বলয়। জীববিজ্ঞানের আহৃত গবেষণা সম্পর্কে সমাজবিজ্ঞানীরা নীরব থাকবেন। আবার সমাজিক বিজ্ঞানীদের বিভিন্ন সামাজিক গবেষণা সম্পর্কে জীববিজ্ঞানীরা উদাসীন থাকবেন। এটাই চিরন্তন নিয়ম হয়ে গিয়েছে যেন। কিন্তু এই বিভেদ কি যৌক্তিক? এই দুই বলয়ের মধ্যে কী কোনোই সম্পর্ক নেই? আধুনিক চিন্তাবিদরা কিন্তু বলেন, আছে। খুব ভালোভাবেই সম্পর্ক আছে। আসলে সংস্কৃতি বলি, কৃষ্টি বলি, দর্শন বলি, কিংবা সাহিত্য–এগুলোকিন্তু মানবমনের সম্মিলিত প্রকাশছাড়া আর কিছুনয়। আবার মানব মন কিন্তু মানব মস্তিষ্কেরই (Human brain) অভিব্যক্তি, যেটাকে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্টিভেন পিঙ্কার তার ‘হাউ মাইন্ড ওয়ার্কস’ বইয়ে খুব সহজভাবে ব্যাখ্যা করেছেন এই বলে– Mind is what the brain does’। আর এ কথা তো সবারই জানা যে, দীর্ঘকালের বিবর্তনীয় প্রক্রিয়াতেই তৈরি হয়েছে মানব বংশাণু যা আবার মস্তিষ্কের গঠনের অবিচ্ছেদ্য নিয়ামক। কাজেই একধরনের সম্পর্ক কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। আমরা চাইলেও আর সামাজিক আচার-ব্যবহার কিংবা মানবপ্রকৃতি বিশ্লেষণে জীববিজ্ঞানকে সমাজবিজ্ঞান থেকে আজকে আলাদা করে রাখতে পারি না। এ ব্যাপারটাই স্পষ্ট করেছেন জন ব্রকম্যান তার সাম্প্রতিক সায়েন্স এট এজ’ (২০০৮) বইয়ের ভূমিকায়

Connection do exist: our arts, our philosophies, our literature are the product of human minds interacting with one another, and the human mind is a product of human brain, which is organized in part by the human genome and has evolved by the physical process of evolution.

মানবপ্রকৃতি বিশ্লেষণে জিন বা বংশাণুকে গোনায় ধরা উচিত–এ ব্যাপারটি প্রথম স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেন এডওয়ার্ড ও উইলসন তার বিখ্যাত “সামাজিক জীববিজ্ঞান (Sociobiology) নামক পুস্তকে[৬]। সে সময় উইলসনের গবেষণার বিষয় ছিল পিঁপড়ে এবং পিঁপড়েদের সমাজ। পিঁপড়েদের চালচলন গতিবিধি এবং সমাজব্যবস্থা নিয়ে অনেকদিন ধরেই ভদ্রলোক রিসার্চ করছিলেন। ১৯৭১ সালে তিনি এ নিয়ে একটি সুন্দর একাডেমিক বইও লিখেছিলেন ‘দ্য ইনসেক্ট সোসাইটি’ নামে। ১৯৭৫ সালের ‘সোশিওবায়োলজি’ বইটিতেও তিনি পিঁপড়েদের আকর্ষণীয় জীবনযাপন আর সমাজের নানা রকমের গতিবিধিই মূলত ব্যাখ্যা করছিলেন। তিনি যদি সেখানেই থেমে যেতেন, তবে কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু তিনি সেখানে থেমে না গিয়ে শেষ অধ্যায়ে তার ধ্যানধারণা একেবারে মানবসমাজ পর্যন্ত নিয়ে যান। পরে সেই ধারণাকে উইলসন আরও বিস্তৃত করেন তার পরবর্তী ‘মানবপ্রকৃতি নিয়ে’ (১৯৭৮) নামের বইয়ে[৭]। তিনি বলেন আজকে আমরা যাদের আধুনিক মানুষ নামে অভিহিত করি, সেই হোমোস্যাপিয়েন্স প্রজাতিটির মূল মানসপটের বির্নিমাণ আসলে ঘটেছিল অনেক আগে যখন তারা বনে-জঙ্গলে শিকার করে আর ফলমূল কুড়িয়ে জীবনযাপন করত। একটু লক্ষ করলেই দেখা যাবে, সেই আদি স্বভাবের অনেক কিছুই এখনও আমরা আমাদের স্বভাবচরিত্রে বহন করি–যেমন বিপদে পড়লে ভয় পাওয়া, দল বেঁধে বিপদ মোকাবেলা করা, অন্য জাতি-গোত্রের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া, সবার আগে নিজের পরিবারের বা গোত্রের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত হওয়া ইত্যাদি। এগুলোর সাথে এখন যুক্ত হয়েছে বর্তমান সভ্যতার জটিল সাংস্কৃতিক উপাদান। এই জিন এবং সাংস্কৃতিক উপাদানের সুষম মিশ্রণেই গড়ে উঠে মানবপ্রকৃতি, যাকে উইলসন তার বইয়ে চিহ্নিত করেন ‘জিন-কালচার সহবিবর্তন’ (Gene-culture coevolution) নামে।

যখন অধ্যাপক উইলসনের বইটি প্রকাশিত হয়, তা একাডেমিয়ায় তুমুল বিতর্কের জন্ম দেয়। সমাজবিজ্ঞানীরা অধ্যাপক উইলসনের কাজকে দেখেছিলেন তাদের গবেষণার ক্ষেত্রে অযাচিত হস্তক্ষেপ হিসেবে। আর তাছাড়া সামাজিক ডারউইনিজম আর ইউজিনিক্সের দগদগে ঘা তখনো মানুষের মন থেকে শুকোয়নি। মানবপ্রকৃতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ‘জিন’ বা বংশাণুকে নিয়ে আসায় উইলসনকে অভিযুক্ত হতে হয় নিও-সোশাল ডারউইনিস্ট অভিধায়। অভিযোগ করা হয় উইলসন নিজের জাতিবিদ্বেষী মনোভাবকে বিজ্ঞানের মোড়কে পুরে উপস্থাপন করতে চাচ্ছেন। উইলসনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সোচ্চার ছিলেন সে সময়কার ‘আদর্শবাদী চিন্তাবিদেরা। তাদের অধিকাংশই অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ছাড়া অন্য কোনো বিশ্লেষণ দিয়ে মানবপ্রকৃতিকে ব্যাখ্যা করার প্রয়াসকে মেনে নিতে বরাবরই অনাগ্রহী ছিলেন। science for the People নামের বাম ভাবাদর্শে দীক্ষিত একটি সংগঠন উইলসনের বিরুদ্ধে সে সময় সোচ্চার হয়ে ওঠে। ১৯৮৪ সালে রিচার্ড লেওনটিন, স্টিফেন রোজ এবং লিওন কামিন-এই তিন মাস্কেটিয়ার্স ১৯৮৪ সালে ‘নট ইন আওয়ার জিনস’ বইয়ে উইলসন এবং অন্যান্য সামাজিক জীববিজ্ঞানীদের আক্ষরিক অর্থেই তুলোধুনো করেন। তারা তাদের বইয়ে দেখানোর চেষ্টা করেন যে, বিজ্ঞান এখন জাত্যাভিমানী পশ্চিমা পুঁজিবাদি সমাজের প্রোপাগান্ডা মেশিনে পরিণত হয়েছে, আর উইলসন সেই বৈষম্যমূলক ‘পুঁজিবাদী বিজ্ঞান’কে প্রমোট করছেন। তারা উইলসনের জমজ নিয়ে পরীক্ষা, পরিগ্রহণ পরীক্ষা প্রভৃতির উপর পদ্ধতিগত আক্রমণ পরিচালনা করেন, শুধু তাই নয় তাদের মার্কসবাদী দার্শনিক বিশ্বাস থেকে প্রস্তাব করেন জীববিজ্ঞানেও মার্ক্সবাদের মতো ‘দ্বান্দ্বিক বা ডায়লেক্টিকাল পদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত। এ নিয়ে অধ্যাপক রিচার্ড লেওনটিন একটি বইও লেখেন সে সময়—ডায়লেক্টিকাল বায়োলজিস্ট নামে।

এর প্রতিক্রিয়ায় বিবর্তনবাদী জীববিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স ১৯৮৫ সালে রিচার্ড লেওনটিন, স্টিফেন রোজ এবং লিওন কামিনের কাজের তীব্র সমালোচনা করে তাদের বইকে ‘স্কুল, আত্মাভিমানী, পশ্চাৎমুখী এবং ক্ষতিকর হিসেবে আখ্যায়িত করে ‘নিউ সায়েন্টিস্ট’ পত্রিকায় একটি প্রবন্ধ[৮] লেখেন। অধ্যাপক ডকিন্স অভিযোগ করেন যে, লেওনটিনরা নিজস্ব দার্শনিকভিত্তি থেকে মদদপুষ্ট হয়ে সামাজিক জীববিজ্ঞানীদের উপর যে সমস্ত অভিযোগ করেছেন এবং যেভাবে ভিত্তিহীন আক্রমণ পরিচালনা করেছেন তা স্ট্রম্যান হেত্বাভাস[৯] দোষে দুষ্ট। তিনি বলেন, বিজ্ঞানের কাজ হচ্ছে প্রকৃতির রহস্য উদঘাটন করা, কোনো ‘বৈষম্যমূলক পুঁজিবাদ’কে প্রমোট করা নয়।

সোশিওবায়োলজি বইটি প্রকাশের তিন দশক পরে আজ এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, উইলসন সামাজিক বিবর্তনবাদ নিয়ে যে কাজ শুরু করেছিলেন তা মৌলিক ছিল নিঃসন্দেহে। উইলসন সেই কাজটিই করেছিলেন যেটি ডারউইন পরবর্তী যে কোনো জীববিজ্ঞানীর জন্য হতে পারে মাইলফলক। তখন তিনি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হলেও পরে অনেকেই তার কাজের গুরুত্ব অনুভব। করতে পেরেছিলেন। উইলসন মানবপ্রকৃতি নিয়ে তার ব্যতিক্রমধর্মী কাজের কারণে দু-দুবার পুলিৎসার পুরস্কার পেয়েছিলেন। শুধু তাই নয় উইলসন যে কাজটি সামাজিক জীববিজ্ঞানকে এখন দেখা হয় বিবর্তনের সাম্প্রতিক গবেষণার অন্যতম সজীব একটি শাখা হিসেবে, যা পরবর্তীতে আরও পূর্ণতা পেয়েছে বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান (Evolutionary Psychology) নামের ভিন্ন একটি নামে। উইলসনের সোশিওবায়োলজি বইটির পর বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের জগতে অন্যতম উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো রিচার্ড ডকিন্সের ‘স্বার্থপর জিন’ (১৯৭৬) নামের অনন্যসাধারণ একটি বই[১০]। এই বইয়ের মাধ্যমে দকিন্স সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করলেন কেন জেনেটিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকা আমাদের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। তিনি তার বইয়ে দেখালেন যে, আমরা আমাদের এই দেহের পরিচর্যা নিয়ে যতই চিন্তিত থাকি না কেন দেহ কিন্তু কোনো প্রতিলিপি তৈরি করে না; প্রতিলিপি তৈরি করে বংশাণু বা জিন। তার মানে হচ্ছে আমাদের দেহ কেবল আমাদের জিনের বাহক (vehicle) হিসেবে কাজ করা ছাড়া আর কিছুই করে না। আমাদের খাওয়া-দাওয়া, হাসিকান্না, উচ্ছ্বাস, আনন্দ, সিনেমা দেখা, খেলাধুলা বা গল্প করা আমাদের দেহ যাই করুক শেষ পর্যন্ত ‘অত্যন্ত স্বার্থপর’ভাবে জিনকে রক্ষা করা আর জিনকে পরবর্তী প্রজন্মে পৌঁছে দেয়াতেই উদ্দেশ্য খুঁজে নিতে বাধ্য করে, বিবর্তনীয় দৃষ্টিকোণ থেকে জীবনের কোনো ‘উদ্দেশ্য যদি থেকে থাকে তবে সেটাই সে উদ্দেশ্য। মা বাবারা যে সন্তানদের সুখী দেখতে পাওয়ার জন্য পারলে জানটুকু দিয়ে দেয়–এটা কিন্তু জৈবিক তাড়না, আরও পরিষ্কার করে বললে জিনগত তাড়না থেকেই ঘটে। শুধু মানুষ নয় অন্য যে কোন প্রাণীর মধ্যেই সন্তানদের প্রতি অপত্য স্নেহ প্রদর্শন কিংবা সন্তানদের রক্ষা করার জন্য মা বাবারা সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে। অর্থাৎ, নিজের দেহকে বিনষ্ট করে হলেও পরবর্তী জিনকে রক্ষা করে চলে। পরবর্তী জিন রক্ষা না পেলে নিজের দেহ যত সুষম, সুন্দর, শক্তিশালী আর মনোহর কিংবা নাদুসনুদুস হোক না কেন, বিবর্তনের দিক থেকে কোনো অভিযোজিত মূল্য নেই। এক ধরনের ইঁদুর আছে যারা শুধু সঠিক সঙ্গী খুঁজে জিন সঞ্চালন করার জন্য বেঁচে থাকে। যৌনমিলনের পর পরই পুরুষ ইঁদুরটিমৃত্যুবরণ করে। অথচ এই মৃত্যুকূপের কথা জেনেও পুরুষ ইঁদুরটি সকল নিয়ে বসে থাকে ‘সর্বনাশের আশায়। এক প্রজাতির ‘ক্যানিবাল’ মাকড়শা আছে যেখানে স্ত্রী মাকড়শাটি যৌনমিলনের পর পরই পুরুষ মাকড়শাটিকে খেয়ে ফেলে। সাক্ষাৎ এই মৃত্যুর কথা জেনেও দেখা গেছে পুরুষ মাকড়শাগুলো জিন সঞ্চালনের তাড়নায় ঠিকই তাড়িত হয়। অর্থাৎ, দেহ এবং জিনের সংঘাত যদি উপস্থিত হয় কখনো সে সমস্ত বিরল ক্ষেত্রগুলোতে দেখা গেছে জিনই জয়ী হয় শেষপর্যন্ত। আমাদের দেহে ‘জাংক ডিএনএ’ কিংবা ‘সেগ্রেগেশন ডিস্টরশন জিন’-এর উপস্থিতি সেই সত্যটিকেই তুলে ধরে যে শরীরের ক্ষতি করে হলেও জিন অনেক সময় নিজেকে টিকিয়ে রাখে অত্যন্ত ‘স্বার্থপরভাবেই। এই বইয়ের মাধ্যমেই আসলে জীববিজ্ঞানীরা সমাজ এবং জীবনকে ভিন্নভাবে দেখা শুরু করলেন। পরার্থিতা, আত্মত্যাগ, দলগত নির্বাচনের মতো যে। বিষয়গুলো আগে বিজ্ঞানীরা পরিষ্কার করে ব্যাখ্যা করতে পারতেন না, সেগুলো আরও বলিষ্ঠভাবে জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করতে পারলেন তারা। তবে তার চেয়েও বড় যে ব্যাপারটি ঘটল, সেটা হলো মানবসমাজের বিভিন্ন সামাজিক প্যাটার্ন ব্যাখ্যা করার নতুন এক দুয়ার খুলে গেল জীববিজ্ঞানীদের জন্য। সেজন্যই ‘রিচার্ড ডকিন্সঃ কীভাবে একজন বিজ্ঞানী আমাদের চিন্তাভাবনার গতিপথকে সমূলে বদলে দিল’ নামের একটি বইয়ে তার সমসাময়িক বিজ্ঞানী এবং দার্শনিকেরা বলেছেন[১১], ডারউইনেরঅরিজিন অব স্পিশিজ–এরপর কোনো জীববিজ্ঞানীর লেখা বই যদি মানসপট এবং দৃষ্টিভঙ্গিকে পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখে, তো সেটি ডকিন্সের সেলফিশ জিন। এ ব্যাপারে ২০০১ সালে প্রকাশিত “সামাজিক জীববিজ্ঞানের সাফল্য নামের গ্রন্থে জন অ্যালকের মন্তব্যটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক[১২]–

‘প্রাণিজগতের আচরণ নিয়ে বর্তমান গবেষণার ক্ষেত্রে কেউ ‘সোশিওবায়োলজি কিংবা সেলফিশ জিন শব্দগুলো নিয়ে বেশি কথা বলার কিংবা নতুন করে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজনবোধ করেন না কারণ এগুলো এখন বিজ্ঞানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গিয়েছে’।

চিত্র। পেজ ২৩

চিত্র: অধ্যাপক উইলসনের সোশিওবায়োলজি বইটির ২৫ বছর পুর্তি এডিশন (২০০৪)

ডারউইন ১৮৫৯ সালে যখন তার সেই বিখ্যাত গ্রন্থ অরিজিন অব স্পিশিজ লিখেছিলেন, তখন তিনি পুরো বইটিতে মানুষের বিবর্তন নিয়ে তেমন কোনো উচ্চবাচ্য করেননি। হয়তো অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্ক এড়াতে গিয়েই এই কৌশল নিয়েছিলেন ডারউইন, যদিও বইয়ে মানবসমাজ এবং বিবর্তন নিয়ে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছিলেন এই বলে–”Light will be thrown on the origin of man and history। এবং একই প্যারাগ্রাফে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন–In the distant future… Psychology will be based on a new foundation.’

চিত্র। পেজ ২৫

চিত্র : ডকিন্সের সেলফিশ জিন যখন প্রথম ১৯৭৬ সালে বের হয় তখন তার কভার ছিল এরকম বিদঘুটে!

মজার ব্যাপার হলো–ডারউইন যেমন তার অরিজিন অব স্পিশিজ বইয়ে মানববিবর্তন নিয়ে আলোচনা করে ‘বিতর্কিত হতে চাননি, ঠিক। তেমনি তার একশ বছরেরও পরে বই লিখতে বসে ডকিন্স এবং উইলসনরাও তাদের হাটু কাঁপুনি থামাতে পারেননি। তারাও তাদের বইয়ে মানবসমাজ নিয়ে খুব বেশি আলোচনা করে ‘বিতর্ক’-এর কেন্দ্রবিন্দুতে আসতে হয়তো চাননি। ডকিন্সের ‘সেলফিশ জিন’ সুস্থ বৈজ্ঞানিক যুক্তি এবং আলোচনায় ভরপুর, কিন্তু প্রায় পুরোটাই তিনি সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন নিম্নস্তরের প্রাণিজগতের ক্ষেত্রে। উইলসন তার ৫২৬ পৃষ্ঠার ঢাউস আকারের বইটির পুরোটুকুতেই পিঁপড়া আর পোকামাকড় নিয়েই পড়ে ছিলেন, মানুষ নিয়ে কথা বলেছিলেন শেষ ২৮ পৃষ্ঠায় এসে। তারপরও ডারউইন যেমন বিতর্ক এড়াতে পারেননি, আধা মানুষ আর আধা বানরের কার্টুনের কেরিক্যাচার হজম করতে হয়েছে, ঠিক তেমনি ডারউইনের উত্তরসূরীদের নানা ধরনের কটুক্তি হজম করতে হচ্ছে ডারউইনেরই ভবিষ্যদ্বাণী— ‘সাইকোলজি উইল বি বেসড অন এ নিউ ফাউন্ডেশন’-কে পূর্ণতা দিতে গিয়ে।

চিত্র। পেজ ২৬

চিত্র : জন টুবি এবং লিডা কসমাইডস– বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাতা দম্পতি একটি কনফারেন্সে আমাদের মানসপটকে সুইস আর্মি ছুরির সাথে তুলনা করে দেখাচ্ছেন। তারা বলেন, বিবর্তনীয় প্রক্রিয়ায় উদ্ভূত মানব মনের মডিউলগুলো আমাদের পূর্বপুরুষদের সেই শিকারি সংগ্রাহকদের সমস্যা সমাধানের জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত হয়েছিল বলেই তার ছাপ আমরা এখনও বিভিন্ন কিছুতে খুঁজে পাই (ছবি— সায়েন্টিফিক আমেরিকানের সৌজন্যে)।

তবে আধুনিক ‘বিবর্তন মনোবিদ্যা’র জন্ম এদের কারো হাতে হয়নি, এর জন্ম হয়েছে মূলত এক সেলিব্রিটি দম্পতি জন টুবি (নৃতত্ত্ববিদ) এবং লিডা কসমাইডস (মনোবিজ্ঞানী)–এর হাত দিয়ে। তারা ১৯৯২ সালে ‘অভিযোজিত মনন’ নামে যে বইটি লেখেন সেটিকে আধুনিক বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের ভিত্তিমূল হিসেবে বিবেচনা করা হয়[১৩]। তারা এই বইয়ের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো সমাজবিজ্ঞানের প্রমিত মডেলকে (standard social science model, সংক্ষেপে SSSM) প্রশ্নবিদ্ধ করেন এবং সামাজিক বিবর্তন এবং সংস্কৃতির বিভিন্ন রূপরেখা জৈববিজ্ঞানীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেন। এই দৃষ্টিকোণটিকে আজ অনেকেই অভিহিত করছেন ‘মনের নতুন বিজ্ঞান’ (the new science of the mind) নামে। যারা জন টুবি এবং লিডাকসমাইডসের এই নতুন বিজ্ঞানের সাথে পরিচিত হতে চান, তারা অন লাইনে ‘Evolutionary Psychology: A Primer’[১৪] প্রবন্ধটি পড়ে নিতে পারেন (আমাদের মুক্তমনা সদস্য শিক্ষানবিস জন টুবি এবং লিডা কসমাইডসের প্রবন্ধটি নিজস্ব বিশ্লেষণ সহযোগে অনুবাদ করেছেন। তার অনুবাদটি রাখা আছে মুক্তমনায়[১৫])। জন টুবি আর লিডা কসমাইডস লেখাটিতে বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের মূলনীতি হিসেবে কতগুলো সূত্রেরও প্রস্তাব করেন। সেগুলো হলো–

প্রথম সূত্র: মস্তিষ্ক একটি ভৌত যন্ত্র যা অনেকটা কম্পিউটারের মতো কাজ করে। এর বর্তনীগুলো পরিবেশ উপযোগী স্বভাব তৈরি করে।

দ্বিতীয় সূত্র: প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে আমাদের স্নায়বিক বর্তনীগুলো গড়ে উঠেছে। বিবর্তনের ইতিহাসে আমাদের পূর্বপুরুষেরা যেসব সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিল সেগুলো সমাধান করার জন্যই প্রাকৃতিক নির্বাচন কাজ করেছে।

তৃতীয় সূত্র: আমাদের মনন বা চেতনাকে হিমশৈলের চূড়ার সাথে তুলনা করা যেতে পারে। হিমশৈলের বেশিরভাগ অংশই থাকে পানির নীচে লুকানো, ঠিক তেমনি আমাদের মনের মধ্যে যা কিছু ঘটে তার অধিকাংশই গোপন থাকে। সুতরাং চেতনা আমাদের এই বলে বিভ্রান্ত করতে পারে যে, মস্তিষ্কের বর্তনী বোধ হয় খুব সরল। আমরা প্রত্যহ যেসব সমস্যার সম্মুখীন হই সেগুলো সমাধান করা আপাতদৃষ্টিতে সহজ মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তার জন্য অনেক জটিল স্নায়বিক বর্তনীর জটিল যোগসাজোশের প্রয়োজন পড়ে।

চতুর্থ সূত্র: প্রতিটি অভিযোজনগত সমস্যা সমাধানের জন্য পৃথক পৃথক স্নায়বিক বর্তনী আছে। প্রতিটি বর্তনী কেবল নিজ কাজ করার জন্যই বিশেষায়িত।

পঞ্চম সূত্র: আমাদের আধুনিক করোটির ভিতরে বাস করে আদিম প্রস্তরযুগের মস্তিষ্ক[১৬]।

[শিকারিসংগ্রাহক পরিস্থিতি এবং সাভানা অনুকল্প

বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান মনে করে প্রায় ৬ মিলিয়ন বছর আগে শিম্পাঞ্জি থেকে আলাদা হওয়ার পর সেখান থেকে শুরু করে আজ থেকে দশ হাজার বছর পর্যন্ত আমরা মানুষেরা মূলত বনে জঙ্গলেই কাটিয়েছি। সেই সময় থেকে শুরু করে আধুনিক সময়কাল বিবর্তনের পঞ্জিকায় হিসেব করলে খুবই ক্ষুদ্র একটা সময়। আর কৃষি কাজের উদ্ভব কিংবা তারো পরে শিল্প বিপ্লব ইত্যাদি তো আরও তুচ্ছ। সঠিকভাবে বলতে গেলে, মানুষ শিকারি সংগ্রাহক ছিল প্লাইস্টোসিন যুগের পুরো সময়টাতে: ২৫ লক্ষ বছর পূর্ব থেকে ১২,০০০ বছর পূর্ব পর্যন্ত। ‘হোমো’ গণ এর উদ্ভবের সময়কালটাও ২৫ লক্ষ বছর পূর্বের দিকে। তার মানে মানুষের ২৫ লক্ষ বছরের বিবর্তনের ইতিহাসে ৯৯% সময়ই তারা ছিল শিকারি-সংগ্রাহক। অর্থাৎ, ইভলুশনারি স্কেলে মানুষেরা মানব সভ্যতার শতকরা নিরানব্বই ভাগ সময়টাই বনে জঙ্গলে আর ফলমূল শিকার করে কাটিয়েছে। কাজেই আমাদের মস্তিষ্কের মূল নিয়ামকগুলো হয়তো তৈরি হয়ে গিয়েছিল তখনই, সে সময়কার বিশেষ কিছু সমস্যা মোকাবেলার জন্য আজকের দিনের অত্যাধুনিক সমস্যাগুলোর জন্য নয়। এখনও অনেকেই মাকড়শা, তেলাপোকা কিংবা টিকটিকি দেখলে আঁতকে উঠে, কিন্তু বাস ট্রাক দেখে সেরকম ভয় পায় না। এটা বিবর্তনের কারণেই ঘটে বলে মনে করা হয়। বনে-জঙ্গলে দীর্ঘদিন কাটানোর কারণে বিষধর কীটপতঙ্গকে ভয় পাওয়ার স্মৃতি আমরা নিজেদের অজান্তেই বহন করি। সেজন্যই লিডা কসমাইডস এবং জন টুবি আধুনিক মানুষকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে বলেন–আমাদের আধুনিক করোটির ভিতরে বাস করে আদিম প্রস্তরযুগের মস্তিষ্ক।

এই আধুনিক করোটির ভিতরে আদিম প্রস্তরযুগের মস্তিষ্ক বাস করার ব্যাপারটাকে বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানে ‘সাভানা অনুকল্প’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই প্রিন্সিপলটির মূল কথা হলো[১৭]—

মানব মস্তিষ্কের মডিউলগুলো যখন তৈরি হয়েছিল, তখন আধুনিক সমাজের বিদ্যমান উপকরণগুলোর অনেকগুলোই ছিল না। ফলে আধুনিক পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য আমাদের মস্তিষ্ক সম্পূর্ণ প্রস্তুত নয়, বরং মস্তিষ্কে অনেকাংশেই রাজত্ব করে আদিম পরিবশের উপজাতসমূহ।]

১৯৯৪ সালে রবার্ট রাইট নামে একজন গবেষক একটি গুরুত্বপূর্ণ বই লিখলেন ‘মরাল এনিমেল’ নামে[১৮]। বিবর্তনীয় মনোবদ্যার উপর একটি পূর্ণাঙ্গ বই। এই বইয়ের লেখক প্রথমবারের মতো ‘সাহস করে’ ডারউইনের বিবর্তনের আলোকে মনোবিজ্ঞানকে ব্যাখ্যা করতে উদ্যোগী হন। শুধু তাই নয়, ডারউইনের জীবন থেকে অজস্র দৃষ্টান্ত হাজির করে দেখালেন, ভদ্র, সৌম্য, লাজুক স্বভাবের ডারউইনও শেষ পর্যন্ত আমাদের মতোই জৈব তাড়নায় তাড়িত একধরনের ‘এনিমেল’ ছাড়া আর কিছুই ছিলেন না। রবার্ট রাইটের বইটির পর এই বিষয়ে গণ্ডা গণ্ডা বই লেখা হয়েছে, এখনও হচ্ছে। গবেষকেরা এই ‘মনের নতুন বিজ্ঞান নিয়ে প্রতিনিয়ত গবেষণা করে যাচ্ছেন। গবেষকদের মধ্যে স্টিভেন পিঙ্কার, ডেভিড বাস, হেলেন ফিশার, জিওফ্রি মিলার, রবিন বেকার, ম্যাট রিডলী, ভিক্টর জন্সটন, সাতোসি কানাজাওয়া, ডনাল্ড সায়মন্স সহ অনেকেই আছেন। বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের বিভিন্ন আকর্ষণীয় বিষয় উপজীব্য করে বিগত কয়েক বছরে বিজ্ঞানী এবং গবেষকেরা লিখেছেন ‘হাও মাইন্ড ওয়ার্ক্স’[১৯], ‘এন্ট এন্ড দ্য পিকক’[২০], ‘দ্য রেড কুইন’[২১], ‘এনাটমি অব লাভ’[২২] ‘মেটিং মাইন্ড’[২৩], স্পার্ম ওয়ার্স[২৪] সহ অসংখ্য জনপ্রিয় ধারার বই। এছাড়া সফল টিভি প্রোগ্রামের মধ্যে আছে ‘দ্য সায়েন্স অব সেক্স’, ‘জেন্ডার ওয়ার্স’ ইত্যাদি। ইংরেজিতে বিবর্তন মনোবিজ্ঞান নিয়ে প্রচুর কাজ হলেও বাংলাভাষায় এ নিয়ে লেখা একদমই চোখে পড়ে না। মুক্তমনায় আমার সিরিজটির আগে এ নিয়ে কোনো পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণও চোখে পড়েনি আমার। আমার এ সিরিজটি প্রকাশিত হবার পর অপার্থিব, বন্যা, স্বাধীন, পৃথিবী, বিপ্লব পাল, সংসপ্তক, মুহম্মদ (শিক্ষানবিস) সহ অনেকেই এনিয়ে আলোচনা করেছেন, প্রবন্ধও লিখেছেন অনেকেই।

বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান নামের সাম্প্রতিক এই শাখাঁটি তাহলে আমাদের কী বলতে চাচ্ছে? সাদামাটাভাবে বলতে চাচ্ছে এই যে, আমাদের মানসপটের বিনির্মাণে দীর্ঘদিনের বিবর্তনীয় প্রক্রিয়ার একটি ছাপ থাকবে, তা আমরা যে দেশের, যে সমাজের বা যে সংস্কৃতিরই অন্তর্ভুক্ত হই না কেন। ছাপ যে থাকে, তার প্রমাণ আমরা দৈনন্দিন জীবনের অনেক কিছুতেই কিন্তু পাই। মিষ্টিযুক্ত কিংবা চর্বিযুক্ত খাবার আমাদের শরীরের জন্য খারাপ, কিন্তু এটা জানার পরও আমরা এ ধরনের খাবারের প্রতি লালায়িত হই। সমাজ-সংস্কৃতি নির্বিশেষেই এটা ঘটতে দেখা যায়। কেন? বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, একটা সময় মানুষ জঙ্গলে থাকত, খুব কষ্ট করে খাবারদাবার সংগ্রহ করতে হতো। শর্করা এবং স্নেহজাতীয় খাবার এখনকার মতো এত সহজলভ্য ছিল না। শরীরকে কর্মক্ষম রাখার প্রয়োজনেই এ ধরনের খাবারের প্রতি আসক্তি তৈরি হয়ে গিয়েছিল। তখন তো আর কারো জানার উপায় ছিল না যে, হাজার খানেক বছর পর মানুষ নামের অদ্ভুত এই ‘আইলস্যা’ প্রজাতিটি ম্যাকডোনাল্ডসের বিগ-ম্যাক আর হার্শিজ হাতে নিয়ে কম্পিউটারের সামনে বসে বসে ব্লগ আর চ্যাট করে অফুরন্ত অলস সময় পার করবে আর গায়ে গতরে হোঁদল কুতকুতে হয়ে উঠবে। কাজেই খাবারের যে উপাদানগুলো একসময় ছিল আদিম মানুষের জন্য শক্তি আহরণের নিয়ামক কিংবা ঠান্ডা থেকে বাঁচার রক্ষাকবচ, আজকের যান্ত্রিক সভ্যতার যুগে সেগুলোর মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার হয়ে উঠেছে তাদের জন্য মরণ-বিষ। কিন্তু এগুলো জেনেও আমরা আমাদের লোভকে সংবরণ করতে প্রায়শই পারি না; পোলাও বিরিয়ানি কিংবা চকলেট বা আইসক্রিম দেখলেই হামলে পড়ি। আমাদের শরীরে আর মনে বিবর্তনের ছাপ থেকে যাওয়ার কারণেই এটি ঘটে।

চিত্র। পেজ ৩০

চিত্র : চর্বিজাতীয় খাবার আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য খারাপ জেনেও আমরা সেগুলোর প্রতি অহরহ লালায়িত হই; আমাদের মানসপটে স্নেহজাতীয় খাবারের প্রতি আসক্তিসূচক বিবর্তনের ছাপ রয়ে যাওয়ার কারণেই এটি ঘটে।

এ ধরনের আরও উদাহরণ হাজির করা যায়। আমরা (কিংবা আমাদের পরিচিত অনেকেই) মাকড়শা, তেলাপোকা কিংবা টিকটিকি দেখলে আঁতকে উঠি। কিন্তু বাস ট্রাক দেখে সেরকম ভয় পাই না (উপরে শিকারি-সংগ্রাহক পরিস্থিতি ব্লক দ্রষ্টব্য)। অথচ কে না জানে, প্রতি বছর তেলাপোকার আক্রমণে যত মানুষ না মারা যায়, তার চেয়ে ঢের বেশি মানুষ মরে ট্রাকের তলায় পড়ে। অথচ ট্রাককে ভয় না পেয়ে আমরা ভয় পাই নিরীহ তেলাপোকাকে। এটাও কিন্তু বিবর্তনের কারণেই ঘটে। বনে-জঙ্গলে দীর্ঘদিন কাটানোর কারণে বিষধর কীটপতঙ্গকে ভয় পাওয়ার স্মৃতি আমরা নিজেদের অজান্তেই আমাদের জিনে বহন করি। সে হিসেবে, বাস ট্রাকের ব্যাপারগুলো আমাদের জন্য অপেক্ষাকৃত নতুন, তাই এগুলোকে ভয় পাওয়ার কোনো স্মৃতি আমরা এখনও আমাদের জিনে (এখনও) তৈরি করতে পারিনি। সেজন্যই বোধ হয় বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা লিডা কসমিডস এবং জন টুবি আধুনিক মানুষকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে বলেন—‘our modern skull house a stone age of mind’।

.

বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান : চেনা সমীকরণের ভুলে যাওয়া অংশটুকু

মানুষের প্রকৃতি গঠনে পরিবেশ এবং জিন দুইয়েরই জোরালো ভূমিকা আছে। পরিবেশের যে ভূমিকা আছে সেটা সবারই জানা। বড় বড় সমাজবিজ্ঞানী থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ, শ্রমিক, শিক্ষক, অভিভাবকসহ সবাই পরিবেশের গুরুত্বের কথা জানেন। কিন্তু সেই তুলনায় মানবপ্রকৃতি গঠনের পেছনে যে জিনেরও জোরালো ভূমিকা আছে সেটা কিন্তু বহু লোকেই জানে না। সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তো বটেই, এমনকি শিক্ষায়তনেও ব্যাপারাটা উহ্যই ছিল এতদিন। এখন সময় পাল্টেছে। বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানীরা আকর্ষণীয় গবেষণায় প্রতিদিনই হারিয়ে যাওয়া অংশের খোঁজ পাচ্ছেন। এই বইয়ে পরিবেশ এবং জিন নিয়ে কমবেশি আলোচনা করা হলেও, প্রাজ্ঞ পাঠকদের দৃষ্টি এড়াবে না যে, অনাদরে উপক্ষিত অংশটির উপরেই বেশি জোর দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, এবং তা করা হয়েছে সঙ্গত কারণেই। আমার মতে জিন তথা জৈববিজ্ঞানের অংশটুকু আমাদের অতি চেনা সমীকরণের ‘ভুলে যাওয়া অংশ। আধুনিক গবেষণার নিরিখে নতুন নতুন তথ্য আমরা জানতে পারছি, তা বস্তুনিষ্ঠভাবে বাঙালি পাঠকদের কাছে তুলে ধরাই এই বইয়ের মূল উদ্দেশ্য।

যে কথাটি এই বইয়ে বারে বারে আসবে তা হলো, বিবর্তন মনোবিদ্যা শুধু নতুন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সমাজ এবং জীবনকে ব্যাখ্যা করছে না, সেই সাথে সামাজিক বিজ্ঞানের বহু প্রচলিত অনুকল্প এবং ধারণাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলেছে। সারমর্ম করলে ব্যাপারগুলো দাঁড়াবে অনেকটা এরকম–

ক)মানুষ বিচ্ছিন্ন কিছু নয়, জীবজগতেরই অংশঃ বিবর্তন মনোবিজ্ঞানের প্রথম স্বীকার্যই হচ্ছে মানুষকে জীবজগতেরই অংশ হিসেবে চিন্তা করা। যতই অস্বস্তি লাগুক। আমাদের শুনতে, জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে মানুষ এক ধরনের পশু বৈ আর কিছু নয়[২৬]। তার মানে কিন্তু এই নয় যে মানবসমাজে কোনো অনন্য বৈশিষ্ট্য নেই। নিশ্চয় আছে। সে জন্যই তো মানুষ আলাদা একটি প্রজাতি। কুকুর, বিড়াল, হাতি, গরিলা যেমন আলাদা প্রজাতি, ঠিক তেমনি মানুষও একটি প্রজাতি। আর মানুষের মতো সব প্রজাতিতেই অনন্য বৈশিষ্ট্য খুঁজলে পাওয়া যাবে। মেরুভল্লুকের লোমশ শরীর, মৌমাছিদের ফুল থেকে মধু আহরণের ক্ষমতা, কুকুরের ঘ্রাণ শক্তি কিংবা চিতা বাঘের ক্ষীপ্রতা নিঃসন্দেহে তাদের নিজ নিজ প্রজাতির জন্য অনন্য বৈশিষ্ট্য। সেই বৈশিষ্ট্যগুলো আমরা জৈববৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকেই ব্যাখ্যা করি। অথচ মানবপ্রকৃতিকে ব্যাখ্যা করতে গেলেই জীববিজ্ঞান বাদ দিয়ে কেবল সামাজিক মডেলগুলোর শরণাপন্ন হন সমাজবিজ্ঞানীরা। এমন একটা ভাব যে, মানুষ অন্য প্রাণিজগৎ থেকে আলাদা বা বিচ্ছিন্ন কিছু, জীববিজ্ঞান এখানে অচল। না, এই দৃষ্টিভিঙ্গিটিকেই ভুল বলে মনে করেন সামাজিক জীববিজ্ঞানী এবং বিবর্তন মনোবিজ্ঞানীরা। বিখ্যাত সামাজিক জীববিজ্ঞানী পিয়ারি এল ভ্যান দেন বার্গি (Pierre L. van den Berghe) সেজন্যই বলেন–

নিঃসন্দেহে আমরা অনন্য। কিন্তু আমরা স্রেফ অনন্য হবার জন্য অনন্য নই। বৈজ্ঞানিকভাবে চিন্তা করলে প্রতিটি প্রজাতিই আসলে অনন্য, এবং তাদের অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলো পরিবেশের সাথে অভিযোজন করতে গিয়ে দীর্ঘদিনের বিবর্তনের ফলশ্রুতিতেই উদ্ভূত হয়েছে।

মানবসমাজের কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য কিংবা জটিলতা বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও মানুষ শেষ পর্যন্ত জীবজগতেরই অংশ। অথচ, সমাজবিজ্ঞানের প্রচলিত প্রমিত মডেল মানুষকে অন্য প্রাণিজগৎ থেকে একেবারেই আলাদা করে ফেলে দেখার পক্ষপাতি। অতীতে বহু সমাজবিজ্ঞানীই জৈবিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে মানবসমাজের গতি প্রকৃতি ব্যাখ্যার ব্যাপারে অনাসক্তি এবং ক্ষেত্রবিশেষে তীব্র আপত্তি উত্থাপন করেছেন। গবেষক এলিস লী দাবি করেছেন জৈবিক ব্যাখ্যার ব্যাপারে সমাজবিজ্ঞানীদের অনীহা, বিরক্তি এবং ভীতি যেটাকে এলিস ‘বায়োফোবিয়া’ বলে আখ্যায়িত করেছেন, ধীরে ধীরে শাখাঁটির পতন ডেকে আনছে[২৭]।

খ) মানব মস্তিষ্ক স্বর্গীয় কিছু নয়, বিবর্তন প্রক্রিয়ারই উপজাত: প্রতিটি জীব সেটা মানুষই হোক আর তেলাপোকাই হোক, কতগুলো কর্মক্ষম অংশের (functional parts) সমাহার। জীবের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ, যেমন হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, চোখ, রক্ত, হাড়, মাংশপেশী, যকৃত, চামড়া, অন্ত্র, জননগ্রন্থি সবগুলোরই আলাদা কাজ আছে।

চিত্র। পেজ ৩৩

চিত্র : এলিস লী সহ অনেক গবেষকই মনে করছেন যে, সমাজবিজ্ঞানীদের জৈবভীতি বা ‘বায়োফোবিয়া’ তাদের শাখাটির ক্রমশ পতন ডেকে আনছে।

বলা বাহুল্য, আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যা পুরোটাই দাঁড়িয়ে আছে এই কর্মক্ষম অংশগুলোর কাজকে আলাদাভাবে দেখার এবং সঠিকভাবে বিশ্লেষণের উপরেই। বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের পরিভাষায় বিভিন্ন অঙ্গের আলাদা কাজ করার ক্ষমতাকে বলে অভিযোজন বা এডাপ্টেশন। আর এই অভিযোজন ঘটে ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন নামে একটি ধীর স্থির এবং দীর্ঘকালীন একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের মতে প্রাকৃতিক নির্বাচন দেহের অন্যান্য অঙ্গের বিকাশে যেভাবে প্রভাব রেখেছে, ঠিক সেরকমভাবেই প্রভাবিত করেছে মস্তিষ্ককে এবং এর সাথে জড়িত স্নায়বিক বর্তনীকেও। কাজেই মস্তিষ্ককেও বিবর্তনের উপজাত হিসেবেই দেখতে হবে, চিন্তা করতে হবে অভিযোজনের মিথস্ক্রিয়ার সমন্বিত প্রতিরূপ হিসেবেই[২৮]।

সমাজবিজ্ঞানীদের একটা বড় অংশই ভুলভাবে মনে করেন বিবর্তন বোধ হয় ঘাড়ের কাছে এসে থেমে গেছে, এর উপরে আর উঠেনি[২৯]। বিবর্তন মনোবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণারত বিজ্ঞানীরা সমাজবিজ্ঞানীদের এই দৃষ্টিভঙ্গিকে একেবারেই ভুল মনে করেন। মানুষের হাতের আঙুল কিংবা পায়ের পাতা তৈরিতে যদি প্রাকৃতিক নির্বাচন এবং যৌনতার নির্বাচনসহ বিবর্তনের নানা প্রক্রিয়াগুলো ভূমিকা রেখে থাকে, মস্তিষ্ক তৈরির ব্যাপারেও এটি ভূমিকা রাখবে এটাই স্বাভাবিক। বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানীরা বিবর্তনের যে সূত্রগুলোশরীরের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের গঠন এবং অভিব্যক্তি প্রকাশের জন্য সত্যি মনে করেন, সেগুলো মস্তিষ্কের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া বোঝার জন্যও ব্যবহার করতে চান। তারা (যৌক্তিকভাবেই) মনে করেন, বিবর্তন কখনোই ঘাড়ের কাছে হঠাৎ করেই এসে শেষ হয়ে যায়নি, বরং উঠে গেছে একদম উপর পর্যন্ত।

গ) মানবপ্রকৃতি কোনো ব্ল্যাঙ্ক স্লেট নয়: সমাজবিজ্ঞানীদের একটা বড় অংশ মানবপ্রকৃতিকে একটি ব্ল্যাঙ্ক স্লেট বা তাবুলা রাসা (Tabula rasa) হিসেবে দেখতে পছন্দ করেন[৩০]। তারা মনে করেন, প্রতিটি মানুষ একটা স্বচ্ছ স্লেটের মতো প্রকৃতি নিয়ে জন্মায়, আর তারপর মানুষ যত বড় হতে থাকে তার চারপাশের পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতার মাধ্যমে ঐ স্বচ্ছ স্লেটে মানুষের স্বভাব ক্রমশ লিখিত হতে থাকে। কিন্তু বিবর্তন মনোবিজ্ঞান সংক্রান্ত বেশ কিছু সাম্প্রতিক গবেষণায় সমাজবিজ্ঞানীদের এই স্বতঃপ্রবৃত্ত বিরুদ্ধে বেশ কিছু জোরালো প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করা হয়ছে এই বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায়ে। সেজন্যই জীববিজ্ঞানী উইলিয়াম হ্যামিলটন জোরের সাথে বলেন[৩১], “The tabula of human nature was never rasa and it is now being read”।

ঘ) মানবপ্রকৃতি এবং সংস্কৃতি বংশাণু এবং পরিবেশের মিথস্ক্রিয়ার ফলাফল : এই বইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ব্যাপৃত হয়েছে পরিবেশ নির্ণয়বাদ বনাম বংশাণু নির্ণয়বাদকে কেন্দ্র করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সমাজবিজ্ঞানীর যেহেতু ধরেই নেন যে, মানবপ্রকৃতি অনেকটা ব্ল্যাঙ্ক স্লেটের মতো, তাই তারা কেবল পরিবেশ এবং সামাজিকীকরণের উপরই জোর দেন, অস্বীকার করেন বংশগতি সংক্রান্ত যে কোনো উপাত্তকে যা মানবপ্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কিন্তু এই বইয়ে আধুনিক বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্যের আলোকে দেখানো হয়েছে যে, জেনেটিক এবং সাংস্কৃতিক উপাদানের সুষম মিশ্রণেই মূলত গড়ে উঠে মানবপ্রকৃতি। মানবপ্রকৃতি গঠনে জিন বা বংশাণুর প্রভাব যেমন আছে, তেমনি আছে পরিবেশের। তাই সম্পূর্ণ বংশাণুনির্ণয়বাদী হওয়া কিংবা সম্পূর্ণ পরিবেশ নির্ণয়বাদী হওয়াটা চরম এবং ভুল অবস্থান, এবং প্রায় সকল ক্ষেত্রেই। পাঠকেরা বইয়ের দ্বিতীয় এবং তৃতীয় অধ্যায়ে এ নিয়ে চিন্তার উদ্রেককারী গুরুত্বপূর্ণ কিছু আলোচনার সন্ধান পাবেন বলে আশা করছি।

প্রতিটি অধ্যায়েই উপরে উল্লিখিত বিষয়গুলো নানাভাবে উঠে আসবে, দেখানোর চেষ্টা থাকবে যে, মানবপ্রকৃতি আসলে জিন-কালচার কোএভুলুশনেরই ফল, এবং এ দুয়ের সুষম সংমিশ্রণ। কিন্তু সেখানে যাওয়ার আগে গুরুত্বপূর্ণ যে কয়েকটি হেত্বাভাস (fallacy) নিয়ে সতর্ক থাকা দরকার, তা নিয়ে একটু আলোচনা প্রয়োজন।

.

বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান : যে হেত্বাভাসগুলো নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন

কী বনাম উচিত এর হেত্বাভাস (“Is” vs. “Ought” fallacy): এই বইটি পড়লে পাঠকেরা মানবপ্রকৃতির সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের একটা প্যাটার্নের ব্যাখ্যা পাবেন বেশিরভাগ জায়গাতেই। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, সেই প্যাটার্নটাই আপনার আমার সবার জন্যই প্রযোজ্য, কিংবা সেটাই সর্বোত্তম। কেন সমাজ বা মানবপ্রকৃতির বড় একটা অংশ কোনো একটা নির্দিষ্ট ছকে আবদ্ধ থাকে সেটা বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের সাহায্যে ব্যাখ্যা করা যায়, সমাজ কী রকম হওয়া উচিত তা নয়। আরও পরিষ্কার করে বললে বিবর্তন কোনো অথোরিটি দাবি করে না। কাজেই বিবর্তনের মাধ্যমে পাওয়া তথ্য কেউ ব্যক্তিগত জীবনে কিংবা সমাজে প্রয়োগ করার ঔচিত্যের আহ্বান জানালে সেটা নিঃসন্দেহে একটি ভ্রান্তি বা হেত্বাভাস হবে। কী বনাম উচিত এর কুযুক্তিকে হেত্বাভাস হিসেবে সর্বপ্রথম তুলে ধরেন আঠারো শতকের বিখ্যাত স্কটিশ দার্শনিক এবং ইতিহাসবিদ ডেভিড হিউম[৩২]।

প্রাকৃতিক হেত্বাভাস (Naturalistic fallacy): আগেই বলেছি, এই বইয়ে বহু জৈবিক প্যাটানের প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা পাবেন পাঠকেরা। কিন্তু কোনো কিছু প্রাকৃতিক হলেই সেটা ‘ভালো’ এরকম সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়াটা একটি বড় ধরনের ভ্রান্তি। যেমন, বিবর্তনের মাধ্যমে আমরা একটা প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা পাই কেন পুরুষদের মন মানসিকতা প্রতিযোগিতামূলক হয়ে বেড়ে উঠেছে, কিংবা কেন তারা অপেক্ষাকৃত সহিংস আর কেন মেয়েরা গড়পড়তা পুরুষদের চেয়ে জৈবিকভাবে বেশি স্নেহপরায়ণ। কিন্তু তার মানে কেউ যদি মনে করেন যে, তাহলে মেয়েরা কেবল গৃহস্থালির কাজ করবে, শিশু আর তার স্বামীপ্রভুর যত্ন-আত্তি করবে, আর ছেলেরা বাইরে ডাণ্ডাগুটি মেরে বেড়াবে সেটা হবে একটি প্রাকৃতিক হেত্বাভাসের উদাহরণ। আমরা জানি এই বাংলাতেই এমন একটা সময় ছিল যখন বাল্যবিবাহ করা ছিল ‘স্বাভাবিক’ (রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিম সহ অনেকেই বাল্যবিবাহ করেছিলেন। আর মেয়েদের বাইরে কাজ করা ছিল ‘প্রকৃতি বিরুদ্ধ। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত মেয়েদের বাইরে কাজ করার বিপক্ষে একটা সময় যুক্তি দিয়ে বলেছিলেন এই বলে[৩৩]—

যেমন করেই দেখ প্রকৃতি বলে দিচ্ছে যে, বাইরের কাজ মেয়েরা করতে পারবে না। যদি প্রকৃতির সেরকম অভিপ্রায় না হতো, তা হলে মেয়েরা বলিষ্ঠ হয়ে জন্মাতো। যদি বল, পুরুষদের অত্যাচারে মেয়েদের এই দুর্বল অবস্থা হয়েছে, সে কোনো কাজেরই কথা নয়।

অর্থাৎ, রবীন্দ্রনাথের যুক্তি এখন মানতে গেলে কপালে টিপ দিয়ে, হাতে দু-গাছি সোনার বালা পরে গৃহকোণ উজ্জ্বল করে রাখা রাবীন্দ্রিক নারীরাই সত্যিকারের ‘প্রাকৃতিক। আর শত সহস্র আমিনা, রহিমারা যারা প্রখর রোদ্দুরে কিংবা বৃষ্টিতে ভিজে ইট ভেঙে, ধান ভেনে সংসার চালাচ্ছে, কিংবা পোশাক শিল্পে নিয়োজিত করে পুরুষদের পাশাপাশি ঘামে শ্রমে নিজেদের উজাড় করে চলেছে তারা সবাই আসলে প্রকৃতি বিরুদ্ধ’ কুকর্মে নিয়োজিত কারণ, প্রকৃতিই বলে দিচ্ছে যে, বাইরের কাজ মেয়েরা করতে পারবে না। বাংলাদেশের অখ্যাত আমিনা, রহিমাদের কথা বাদ দেই, নাসার মহাজাগতিক রকেট উৎক্ষেপন থেকে শুরু করে মাইনিং ফিল্ড পর্যন্ত এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে মেয়েরা পুরুষদের পাশাপাশি আজ কাজ করছেন না। তাহলে? তাহলে আর কিছুই নয়। নিজের যুক্তিকে তালগাছে তোলার ক্ষেত্রে প্রকৃতি’ খুব সহজ একটি মাধ্যম, অনেকের কাছেই। তাই প্রকৃতির দোহাই পাড়তে আমরা ‘শিক্ষিত জনেরা’ বড্ড ভালোবাসি। প্রকৃতির দোহাই পেড়ে আমরা মেয়েদের গৃহবন্দি রাখি, জাতিভেদ বা বর্ণবাদের পক্ষে সাফাই গাই, অর্থনৈতিক সাম্যের বিরোধিতা করি, তেমনি সময় সময় সমকামী, উভকামীদের বানাই অচ্ছুৎ। কিন্তু যারা যুক্তি নিয়ে একটু আধটু পড়াশোনা করেছেন তারা জানেন যে, প্রকৃতির দোহাই পাড়লেই তা যুক্তিসিদ্ধ হয় না। বরং প্রকৃতির কাঁধে বন্দুক রেখে মাছি মারার অপচেষ্টা জন্ম দেয় এক ধরনের কুযুক্তি বা হেত্বাভাসের (logical fallacy)। ইংরেজিতে এই হেত্বাভাসের পুঁথিগত নাম হলো—‘ফ্যালাসি অব ন্যাচারাল ল’ বা ‘অ্যাপিল টু নেচার’[৩৪]। এমনি কিছু ‘অ্যাপিল টু নেচার’ হেত্বাভাসের উদাহরণ দেখা যাক–

১। মিস্টার কলিন্সের কথাকে এত পাত্তা দেওয়ার কিছু নেই। কলিন্স ব্যাটা তো কালো। কালোদের বুদ্ধি সুদ্ধি একটু কমই হয়। কয়টা কালোকে দেখেছ বুদ্ধি সুদ্ধি নিয়ে কথা বলতে? প্রকৃতি তাদের পাঁঠার মতো গায়ে গতরে যেটুকু বাড়িয়েছে, বুদ্ধি দিয়েছে সেই অনুপাতে কম। কাজেই তাদের জন্মই হয়েছে শুধু কায়িক শ্রমের জন্য, বুদ্ধিবৃত্তির চর্চার জন্য নয়।

২। মারামারি, কাটাকাটি হানাহানি, অসাম্য প্রকৃতিতেই আছে ঢের। এগুলো জীবজগতের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। কাজেই আমাদের সমাজে যে অসাম্য আছে, মানুষের উপর মানুষের যে শোষণ চলে তা খারাপ কিছু নয়, বরং ‘কমপ্লিটলি ন্যাচারাল’।

৩। প্রকৃতি বলে দিচ্ছে যে, বাইরের কাজ মেয়েরা করতে পারবে না। যদি প্রকৃতির সেরকম অভিপ্রায় না হতো, তা হলে মেয়েরা বলিষ্ঠ হয়ে জন্মাতো।

৪। সমকামিতা প্রকৃতিবিরুদ্ধ। প্রকৃতিতে তুমি কয়টা হোমোসেক্সয়ালিটির উদাহরণ দেখেছ?

৫। প্রকৃতিতে প্রায় প্রতিটি প্রজাতিতেই বহুগামিতা দৃশ্যমান, কাজেই মানবসমাজে বহুগামিতা গ্রহণ করে নেওয়াই সমীচীন।

উপরের উদাহরণগুলো দেখলে বোঝা যায়, ওতে যত না যুক্তির ছোঁয়া আছে, তার চেয়ে ঢের বেশি লক্ষনীয় ‘প্রকৃতি’ নামক মহাস্ত্রকে পুঁজি করে পাহাড় ঠেলার প্রবণতা। এমনি উদাহরণ দেওয়া যায় বহু। আমি আমার সমকামিতা (২০১০) বইয়ে[৩৫] এ ধরনের বহু প্রাকৃতিক হেত্বাভাসের উল্লেখ করেছিলাম। সেগুলো এই বইয়ের জন্যও প্রযোজ্য। প্রাকৃতিক হেত্বাভাসের ব্যাপারটি হেত্বাভাস হিসেবে সর্বপ্রথম তুলে ধরেন বিশশতকের প্রথমভাগে ইংরেজ দার্শনিক জর্জ এডওয়ার্ড মুর[৩৬]।

নৈতিক হেত্বাভাস (Moranistic fallacy): নৈতিক হেত্বাভাস হচ্ছে প্রাকৃতিক হেত্বাভাসের ঠিক উলটো। এর প্রবক্তা হার্ভাডের মাইক্রোবায়োলজিস্ট বার্নাড ডেভিস[৩৭]। এই ধরনের ভ্রান্তি যারা করেন, তারা ‘উচিত’কে ‘কী’ দিয়ে প্রতিস্থাপনের চেষ্টা করেন। কোনো কিছু নৈতিকভাবে সঠিক বলে মনে হলেই সেই ব্যাপারটাকে প্রাকৃতিক মনে করাটাই এই ভ্রান্তির মোদ্দাকথা। যেমন, ‘ধর্ষণ করা অনৈতিক, ফলে প্রকৃতিতে জীবজগতে কোথাও ধর্ষণ নেই’–এটা একটি নৈতিক হেত্বাভাসের উদাহরণ। কিংবা কেউ যদি বলেন, “মানবসমাজের শিক্ষায়তনে কোনো ধরনের বৈষম্য লালন করা হয় না, ফলে প্রকৃতিতেও কোনো ধরনের বৈষম্য নেই’–এটাও নৈতিক হেত্বাভাসের উদাহরণ হবে।

এই বইয়ে যতদূর সম্ভব এ ধরনের হেত্যুভাসগুলো এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা হয়েছে। এই বইয়ের উদ্দেশ্য কেবল নির্মোহ বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে দেখানো কীভাবে প্রকৃতি কিংবা সমাজের বিভিন্ন প্যাটার্ন কাজ করে, কিন্তু সমাজ কিংবা প্রকৃতি কেমন হওয়া উচিত তা নিয়ে কোনো মতামত দেয়া হয়নি। আমার প্রত্যাশা থাকবে আমার এই বইয়ের পাঠকেরাও এই বই থেকে কোনো ধরনের বৈধতাসূচক কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হবার আগে উপরের হেত্বাভাসগুলোকে স্মরণ করবেন।

০২. ব্ল্যাঙ্ক স্লেট

মানুষ কি সত্যই ‘ব্ল্যাঙ্ক স্লেট’ হয়ে পৃথিবীতে জন্মায়?

বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান অনেক কিছু খুব পরিষ্কার এবং বোধগম্যভাবে ব্যাখ্যা করলেও, এর অনেক উপসংহার এবং অনুসিদ্ধান্ত এতই বিপ্লবাত্মক (Radical) যে এটি অবগাহন করা সবার জন্য খুব সহজ হয়নি, এখনও হচ্ছে না। এর অনেক কারণ আছে। একটা বড় কারণ হতে পারে আমাদের মধ্যকার জমে থাকা দীর্ঘদিনের সংস্কার। অধিকাংশ মানুষ মনে করে, শিশু জন্ম নেয় একটা স্বচ্ছ স্লেটের মতো, মানুষ যত বড় হতে থাকে–তার চারপাশের পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতার মাধ্যমে ঐ স্বচ্ছ স্লেটে মানুষের স্বভাব ক্রমশ লিখিত হতে থাকে। অর্থাৎ, ভালো-মন্দ সবকিছুর জন্য দায়ী হচ্ছে একমাত্র পরিবেশ। খারাপ পরিবেশে থাকলে স্লেটে লেখা হবে হিংস্রতা কিংবা পাশবিকতার বীজ, আর ভালো পরিবেশ পেলে স্লেটও হয়ে উঠবে। আলোকিত। ব্রিটিশ দার্শনিক লক (১৬৩২-১৭০৪ খ্ৰীষ্টাব্দ) এই ‘ব্ল্যাঙ্ক স্লেট’ মতবাদের প্রবক্তা ছিলেন। এখনও অনেকেই (বিশেষত যাদের আধুনিক জেনেটিক্স কিংবা বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান পড়া হয়ে উঠেনি) এই মতবাদে বিশ্বাস করেন। বিশেষ করে রাজনীতিবিদদের মধ্যে এই ধারণাটি বোধগম্য কারণেই খুবই জনপ্রিয়। কিছুদিন আগেও আমেরিকায় ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার তার এক বক্তৃতায় বললেন–

‘একটি শিশু যখন ৬ বছর বয়সে প্রথম স্কুলে যেতে শুরু করে তার মন থাকে যেন শুন্য এক বাস্কেট। তারপর ধীরে ধীরে তাদের বাস্কেট ভর্তি হতে শুরু করে। ১৮ বছর বয়স হতে হতে তাদের শূন্য বাস্কেট প্রায় পুরোটাই ভর্তি হয়ে উঠে। এখন কথা হচ্ছে কাকে দিয়ে শিশুটির এই বাস্কেট পূর্ণ হবে? এটা কি ভালো একজন শিক্ষক, অভিভাবক, বন্ধু নাকি অসৎ মানুষজনদের দিয়ে?’

এই ব্ল্যাঙ্ক স্লেট তত্ত্ব সমাজবিজ্ঞানে খুবই জনপ্রিয় এবং বোধ্য কারণেই। সমাজবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাতা এমিল ডুর্খাইম ১৮৯৫ সালেই বলেছিলেন যে, ‘সমাজবিজ্ঞানের প্রধান অনুকল্পই হলো প্রতিটি মানুষকে ব্ল্যাঙ্ক স্লেট হিসেবে চিন্তা করতে হবে। মানুষ হচ্ছে ‘ব্ল্যাঙ্ক স্লেট-অন হুইচ কালচার রাইটস’। এর পর থেকে ‘ব্ল্যাঙ্ক স্লেট’ দর্শনটি সমাজবিজ্ঞানের জগতে স্বতঃসিদ্ধ হিসেবেই পরিগণ্য হয়—‘সব মানুষ আসলে জন্মগতভাবে সমান, খারাপ পরিবেশের কারণেই মানুষ মূলত খারাপ হয়ে উঠে’।

কিন্তু এই “ব্ল্যাঙ্ক স্লেট’-এর ধারণা কি আসলে মানবমনের প্রকৃত স্বরূপকে তুলে ধরে? হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান অধ্যাপক স্টিভেন পিঙ্কার ২০০২ সালে একটি বই লেখেন “ব্ল্যাঙ্ক স্লেট’ নামে[৩৮]। তিনি বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে সমাজে গেঁথে যাওয়া এবং জনপ্রিয় এই ‘ব্ল্যাঙ্ক স্লেটতত্ত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে একে একধরনের ‘ডগমা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন[৩৯]।

পিঙ্কার দাবি করেন, আমাদের কানে যতই অস্বস্তিকর শোনাক না কেন, কোনো শিশুই আসলে ‘ব্ল্যাঙ্ক স্লেট’ হয়ে জন্ম নেয় না। বরং একটু লক্ষ করলেই দেখা যাবে যে, প্রতিটি শিশু জন্ম নেয় কিছু না কিছু জন্মগত বৈশিষ্ট্যকে পুঁজি করে। এই বৈশিষ্ট্যগুলোর ছাপ পরিণত অবস্থাতেও রাজত্ব করে অনেক ক্ষেত্রেই। শুধু মানুষ কেন প্রাণিজগতের দিকে দৃষ্টি দিলেও ব্যাপারটা খুব ভালোমতই বোঝা যাবে। গুবরে পোকাকে ধরবার জন্য ইঁদুর যত তাড়াতাড়ি ছুটতে পারে, কবুতর তত তাড়াতাড়ি পারে না। বিড়াল যত ভালোভাবে রাতে দেখতে পায়, মানুষ তা পায় না। এই বিষয়গুলো কোনোভাবেই ‘ব্ল্যাঙ্ক স্লেট’ তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। ব্যাখ্যা করা যায় না একই প্রজাতির মধ্যে বিদ্যমান বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের পার্থক্যগুলোও। একই প্রজাতির অংশ হওয়া সত্ত্বেও কেউবা শ্লথ, কেউবা ক্ষিপ্র, কেউবা বাচাল, কেউবা শান্ত, কেউবা অস্থির, কেউ বা রয়ে যায় খুব চুপচাপ। জিনগত পার্থক্যকে গোনায় না ধরলে করলে প্রকৃতির এত ধরনের প্রকরণকে কোনো ভাবেই সম্পূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে না।

১৯৮০র দশকে টম ইনসেল নামে এক বিজ্ঞানী প্রেইরি ভোলস এবং মোন্টেন ভোলস নামে দু’ প্রজাতির ইঁদুর নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে দেখেন প্রেইরি ভোলস নামের ইঁদুরগুলো নিজের মধ্যে একগামী সম্পর্ক গড়ে তুলে, যৌনসঙ্গীর প্রতি আজীবন বিশ্বস্ত থাকে, বাচ্চা হবার পর তাদের পরিচর্যা করে বড় করে তুলতে অনেকটা সময় এবং শক্তি ব্যয় করে। আর মোন্টেন ভোলসগুলো স্বভাবে ঠিক উলটো। তারা স্বভাবত বহুগামী, এমনকি বাচ্চা জন্মানোর পর সামান্য সময়ের জন্য বাচ্চাদের পরিচর্যা করার পর আর এদের দিকে নজর দেয় না। টম ইনসেল প্রেইরি ভোলস এবং মোন্টেন ভোলস এর মস্তিষ্ক বিশ্লেষণ করে তেমন কোনো পার্থক্যই পেলেন না, কেবল প্রেইরি ভোলস নামের ইঁদুরগুলোর ব্রেনে অক্সিটোসিন নামে এক ধরনের হরমোনের আধিক্য লক্ষ করলেন। তিনি আরও লক্ষ করলেন মোন্টেন ভোলস ইঁদুরগুলোর ব্রেনে এই হরমোন একেবারেই নগণ্য। কেবল, বাচ্চা জন্মানোর পর স্ত্রী মোন্টেন ভোলসের মস্তিষ্কে এই হরমোনের আধিক্য সামান্য সময়ের জন্য বেড়ে যায়। টম ইনসেল দেখলেন সেই সামান্য সময়টাতেই স্ত্রী হঁদুর আর তার বাচ্চার মধ্যে প্রগাঢ় বন্ধনের উপস্থিতি থাকে। টম ইনসেল কৃত্রিমভাবে হঁদুরদের ব্রেনে অক্সিটোসিন প্রবেশ করিয়ে তাদের স্বভাব এবং প্রকৃতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ করলেন। দেখা গেল, এই হরমোনের প্রভাবে মোন্টেন ভোলস ইঁদুরগুলো তাদের পছন্দের বহুগামী স্বভাব পরিবর্তন করে তার যৌনসঙ্গীর প্রতি বিশ্বস্ত থাকা শুরু করে দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা এ ধরনের আরও গবেষণা করে দেখেছেন, জিন ম্যানিপুলেশন করে নিম্ন স্তরের প্রাণীদের মধ্যে আগ্রাসন, নমনীয়তা, হিংস্রতা, ক্ষিপ্রতা বা শ্লথতা ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যগুলির তারতম্য তারা ঘটাতে পারেন। অর্থাৎ, বংশাণুর বৈশিষ্ট্যের তারতম্যের কারণে প্রাণীদের স্বভাবেও পরিবর্তন আসে। এখন কথা হচ্ছে, মানুষও কিন্তু প্রকৃতিজগৎ এবং প্রাণিজগতের বাইরের কিছু নয়। অথচ, বংশাণুজনিত পার্থক্যের কারণে মানুষে মানুষে স্বভাবগত পার্থক্য হতে পারে মানুষের ক্ষেত্রে এই রূঢ় সত্যটি মানতে অনেকেই আপত্তি করবেন।

বংশাণুর বৈশিষ্ট্যের তারতম্য যদি মানুষের স্বভাবের পরিবর্তনের বলিষ্ঠ ব্যখ্যা হয়, তবে কাছাকাছি বা প্রায় একই বংশাণুযুক্ত লোকজনের ক্ষেত্রে একই স্বভাবজনিত বৈশিষ্ট্য পাওয়া উচিত। স্টিভেন পিঙ্কাররা বলেন তাই পাওয়া যাচ্ছে। পিঙ্কার তার ‘ব্ল্যাঙ্ক স্লেট’ বইয়ে অভিন্ন যমজদের (আইডেন্টিকাল টুইন) নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণার বেশকিছু মজার উদাহরণ হাজির করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, অভিন্ন যমজদের একে অন্যদের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ভিন্ন পরিবেশে বড় করা হলেও তাদের মধ্যে এক আশ্চর্যজনক সাদৃশ্য থেকেই যায়, শুধু চেহারায় নয় আচার, আচরণ, অভিরুচি, খাওয়া দাওয়া এমনকি ধর্মকর্মের প্রতি আসক্তিতেও। ইউনিভার্সিটি অব মিনিসোটার গবেষকেরা একসময় পঞ্চাশ জোড়া অভিন্ন যমজদের নিয়ে গবেষণা করেন, যে যমজেরা জন্মের পর পরই কোনো না কোনো কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়ে ভিন্ন ধরনের পরিবেশে বড় হয়েছিল। তাদের নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে গবেষকেরা লক্ষ করলেন, তারা আলাদা পরিবেশে বড় হলেও তার বিচ্ছিন্ন হওয়া সহোদরের সাথে আচার আচরণে অদ্ভুত মিল থাকে। সবচেয়ে মজার হচ্ছে অভিন্ন যমজ সহোদর অস্কার এবং জ্যাকের উদাহরণটি। জন্মের পর পরই বিচ্ছিন্ন হয়ে অস্কার বড় হয়েছিল। চেকোশ্লাভাকিয়ার এক নাৎসি পরিবারে, আর জ্যাক বড় হয়েছিল ত্রিনিদাদের ইহুদি পরিবারে। তারপরও তারা যখন চল্লিশ বছর পরে প্রথমবারের মতো মিনিসোটায় একে অপরের সাথে দেখা করতে আসলেন, তখন দেখা গেল তারা দুজনেই গাঢ় নীল রঙের শার্ট পড়ে উপস্থিত হয়েছেন, তাদের দুজনের হাতের কব্জিতেই রাবারব্যান্ড লাগানো। দুজনেই কফিতে বাটার টোস্ট ডুবিয়ে খেতে পছন্দ করতেন; তাদের দুজনেই বাথরুম ব্যবহার করতে গিয়ে টয়লেট ব্যবহারের আগেই একবার করে ফ্ল্যাশ করে নিতেন, এমনকি দুজনেরই একটি সহজাত মুদ্রাদোষ ছিল দুজনেই এলিভেটরে উঠে হাঁচি দেয়ার ভঙ্গি করতেন যাতে লিফটের অন্য সহযাত্রীরা আঁতকে উঠে দুপাশ থেকে সরে যায়। থমাস বুচার্ড নামের আরেক গবেষকের গবেষণায় জিম প্রিঙ্গার এবং জিম লুইস। নামের আরেকটি অভিন্ন যমজের চাঞ্চল্যকর মিল পাওয়া গিয়েছিল যা মিডিয়ায় রীতিমত হৈচৈ ফেলে দেয়। জন্মের পর ভিন্ন পরিবেশে বড় হবার পরও জিম-যমজদ্বয় যখন একত্রিত হলো, দেখা গেল–তাদের চেহারা এবং গলার স্বরে কোনো পার্থক্যই করা যাচ্ছে না। একই রকম বাচনভঙ্গি, একই রকম চাহনি, একই রকম অবসাদগ্রস্ত চোখ। তাদের মেডিকেল-হিস্ট্রি থেকে জানা গেল, তারা দুজনেই উচ্চ রক্তচাপ, হেমোরইডস এবং মাইগ্রেনের সমস্যায় ভুগছেন। তারা দুজনেই সালীম সিগারেটের ভক্ত, দুজনেরই টেনশনে নখ কামড়ানোর অভ্যাস আছে এবং দুজনের জীবনের একই সময় ওজন বাড়া শুরু হয়েছিল। শুধু তাই নয়–তাদের দুজনের কুকুরের নাম ‘টয়’। তাদের দুজনের স্ত্রীদের নাম ‘বেটি’, এবং তাদের দুজনেরই আগে একবার বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটেছিল। এবং এদের প্রাক্তন স্ত্রীদের নামও কাকতালীয় ভাবে এক–”লিন্ডা’। এখানেই শেষ নয় দুজনের প্রথম সন্তানের নামও ছিল একই–”জেমস অ্যালেন’; যদিও নামের বানান ছিল একটু ভিন্ন। আরেকটি ক্ষেত্রে দেখা গেল দুই যমজ মহিলা হাতে একই সংখ্যার আংটি পড়ে এসেছিলেন। তাদের একজন প্রথম ছেলের নাম রেখেছিলেন রিচার্ড এন্দু, আর অপরজন রেখেছিলেন এন্ড্রু রিচার্ড। সংশয়বাদী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এসমস্ত মিলগুলোকে নিতান্তই কাকতালীয়’ কিংবা ‘অতিরঞ্জন’ ভাবার যথেষ্ট অবকাশ থাকলেও মূল উপসংহার কিন্তু ফেলে দেয়ার মতো নয় আমরা আমাদের স্বভাব-চরিত্রের অনেক কিছুই হয়তো আসলে বংশাণুর মাধ্যমে বহন করি এবং দেখা গেছে অভিন্ন যমজদের ক্ষেত্রে এই উপরের ‘কাকতালীয় মিলগুলো অসদ যমজদের থেকে সবসময়ই বেশি থাকে। শুধু মিনিসোটার যমজ গবেষণা নয়; ভার্জিনিয়া, অস্ট্রেলিয়া, হল্যান্ড, সুইডেন এবং ব্রিটেনের গবেষকেরাও তাদের গবেষণা থেকে একই ধরনের ফল পেয়েছেন। এ ধরনের বেশকিছু গবেষণার ফলাফল লিপিবদ্ধ আছে উইলিয়াম ক্লার্ক এবং মাইকেল গ্ৰন্সটেইনের ‘আমরা কি নিয়ন্ত্রিত? মানব আচরণে জিনের ভূমিকা’ নামের বইটিতে[৪০]। লেখকেরা বলেছেন–

“For nearly all measures personality, heritability is high in western society: identical twins raised apart are much more similar than the fraternal twins raised apart.’

 চিত্র। পেজ ৪৩

চিত্র : একটি মজার কার্টুন– জন্মের পর পরই পৃথক হয়ে যাওয়া দুই যমজের হঠাৎ দেখা! (কার্টুনিস্ট– চার্লস এডামস); কার্টুনটি স্টিভেন পিঙ্কারের ‘ব্ল্যাঙ্ক স্লেট’ বইটি থেকে নেওয়া।

সাইকোপ্যাথ এবং সিরিয়াল কিলারদের নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোও আমাদের জন্য অস্বস্তি বাড়িয়ে দিয়েছে পুরোমাত্রায়। আমি যখন এ লেখাটি লিখতে শুরু করেছি, তখন আমেরিকান মিডিয়া ক্রেগলিস্ট কিলার’ খ্যাত ফিলিপ মার্ডফকে নিয়ে রীতিমত তোলপার। ফিলিপ মার্ডফ বস্টন মেডিকেলের ছাত্র। পড়াশোনায় ভালো। চুপচাপ শান্ত বলেই পরিচিতি ছিল তার। একজন গার্লফ্রেন্ডও ছিল তার। সামনেই বিয়ে করার কথা ছিল তাদের। ফিলিপ আর তার ভাবীবধুর ছবি সমন্বিত ওয়েবসাইটও সে বানিয়ে রেখেছিল। কে জানত যে, এই গোবেচোরা ধরনের নিরীহ রোমান্টিক মানুষটিই রাতের বেলা কম্পিউটারে বসে বসে ক্রেগলিস্ট থেকে মেয়েদের খুঁজে নিয়ে হত্যা করত! পুলিশের হাতে যখন একদিন ফিলিপ ধরা পড়লো, সহপাঠীরা তো অবাক। এমন গোবেচরা ছেলেটির মধ্যে এমন দানব লুকিয়ে ছিল? গার্লফ্রেন্ডটি তখনো ডিনায়ালে–”ফিলিপের তো মাছিটা মারতেও হাত কাঁপত, সে কী করে এত মানুষকে হত্যা করবে? পুলিশ নিশ্চয় ভুল লোককে ধরেছে। আমেরিকায় প্রতি ২৫ জনে একজন মনোবিকারগ্রস্ত সাইকোপ্যাথ আছে বলে মনে করা হয়। মনোবিজ্ঞানী মার্থা স্কাউট তার বাড়ির পাশেই বিকারগ্রস্ত খুনি’ বইয়ে অন্তত তিনটি জার্নাল থেকে রেফারেন্স হাজির করে দেখিয়েছেন যে, আপনার প্রতিবেশীদের মধ্যেই হয়তো লুকিয়ে আছে একজন মনোবিকারগ্রস্ত সাইকোপ্যাথ[৪১]। তারা আমার আপনার মতো একই রকম ‘ভালো পরিবেশে বাস করছে, দৈনন্দিন জীবনযাপন করছে কিন্তু আপনার আমার মতো সচেতনতা জিনিসটাকে মাথায় ধারণ করে না। এই ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করেছেন রবার্ট হেয়ার তার ‘বিবেকহীনঃ আমাদের মাঝে সাইকোপ্যাথদের অশান্ত পৃথিবী’ নামের বইয়ে[৪২]। কোনো নিয়ম, নীতি, ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ তাদের মধ্যে তৈরি হয় না। আসলে এসমস্ত ‘মানবিক বৈশিষ্ট্যগুলো THE দিয়ে একজন সাইকোপ্যাথের কাজকে। ব্যাখ্যার চেষ্টাই হবে বোকামি। অত্যন্ত স্বার্থপর ভাবে মনোবিকারগ্রস্ত সাইকোপ্যাথ তার মাথায় যেটা থাকে, সেটা করেই ছাড়ে। যখন কোনো সাইকোপ্যাথের মাথায় ঢোকে। কাউকে খুন করবে, সেটা সম্পন্ন করার আগ পর্যন্ত তার স্বস্তি হয় না। পিঙ্কার তার বইয়ে জ্যাক এবট নামক এক সাইকোপ্যাথের উদ্ধৃতি দিয়েছেন খুন করার আগের মানসিক অবস্থা তুলে ধরে–

তুমি টের পাবে যে তার জীবন-প্রদীপ তোমার হাতে ধরা ছুরির মধ্যে দিয়ে তির তির করে কাঁপছে। তুমি বুঝতে পারবে হত্যার জিঘাংসা তোমাকে ক্রমশ গ্রাস করে নিচ্ছে। তোমার শিকারকে নিয়ে একটু নিরালয়ে চলে যাবে যেখানে গিয়ে তুমি তাকে একেবারে শেষ করে দিতে পারো। …মাখনের মধ্যে ছুরি ঢুকানোর মতোই সহজ একটা কাজ কোনো ধরনের বাধাই তুমি পাবে না। তাদের চোখে শেষ মুহূর্তে এক ধরনের অন্তিম কাতরতা দেখবে, যা তোমাকে আরও উদ্দীপ্ত করে তুলবে।

প্রথম অধ্যায় শুরু করেছিলাম মন্টু মিয়ার গল্প দিয়ে যে কি না ইলাস্টিক দিয়ে জানালার কাঁচ ভাঙতো সেই মন্টু মিয়া হয়তো মনোবিকারগ্রস্ততার একটু ছোট স্কেলের উদাহরণ। বড় বড় উদাহরণগুলোর কথা আমরা সবাই কম বেশি জানি। জ্যাক দ্য রিপার, ‘বিটিকে কিলার’ ডেনিস রেডার, গ্রীন রিভার কিলার’ গ্রে রিজ ওয়ে, ‘সন অব স্যাম’ ডেভিড বার্কোউইজ, বুচার অব রুস্তভ’ আঁদ্রে চিকাতিলো, চার্লস এং, ডেরিক টড লি, জন ওয়েন গেসি প্রমুখ। কিন্তু সবচেয়ে অস্বস্তিকর যে বিষয়টি তুলে এনেছেন তার বইয়ে পিঙ্কার, সেটি হলো–”মনোবিকারগ্রস্তদের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিরাময় করা যায় না। তিনি বলেন,

আমরা যতদূর জানি, বিকারগ্রস্ত খুনিদের (সাইকোপ্যাথ) নিরাময় করা যায় না। বরং ম্যারিন রাইস দেখিয়েছেন, কিছু ক্ষেত্রে মানসিক চিকিৎসা প্রদান–যেমন আত্মবিশ্বাস বাড়ানো, সামাজিক দক্ষতা বাড়ানোর চেষ্টা হিতে বিপরীত হয়ে বিকারগ্রস্ত খুনিদের আরও বিপজ্জনক করে তুলে।

সমাজের নৈতিকতা এবং মূল্যবোধ শেখানোর মাধ্যমে যে মনোবিকারগ্রস্ত মানুষদের স্বভাব অনেক সময়ই পরিবর্তন করা যায় না সেই ‘সত্যটি’ (?) পিঙ্কার তার বইয়ে তুলে ধরেছেন উপরে উল্লিখিত জ্যাক এবট-এর একটি বাস্তব ঘটনা উল্লেখ করে। ঘটনাটি এরকম : পুলিতজার পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক নর্মান মেইলার জেলখানায় বন্দি দাগি আসামি জ্যাক এবট-এর কিছু চিঠি পড়ে এতই মুগ্ধ হন যে, যে তিনি নর্মান মেইলারকে জামিনে মুক্তি পেতে সাহায্য করেন। নর্মান মেইলার সে সময় গ্যারি গিলমোর নামের আরেক অপরাধীকে নিয়ে একটি বই লেখার কাজ করছিলেন। জ্যাক এবট তার নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে লেখককে সহায়তা করার প্রস্তাব দেন। জ্যাক এবট-এর রচনা এবং চিন্তা ভাবনা নর্মান মেইলারকে এতটাই অনুপ্রাণিত করেছিল যে, তিনি এবটুকে ‘প্রথাবিরুদ্ধ বুদ্ধিজীবী এবং সম্ভাবনাময় লেখক হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন; শুধু তাই নয়, তাঁকে লেখা এবট-এর চিঠিগুলো সংকলিত করে তিনি ১৯৮০ সালে এবট-এর একটি বই প্রকাশ করতে সহায়তাও করেন, বইটির নাম ছিল “জানোয়ারের উদরে” (In the belly of the beast)[৪৩]।

বইটি সে সময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। নর্মান মেইলারের তদ্বিরে ছাড়া পাওয়ার পর এবট বেশ নামিদামি মহলে অনেক বিদগ্ধ লোকজনের সাথে নৈশভোজেও আমন্ত্রিত হতেন। অথচ এর মধ্যেই ছ’সপ্তাহের মাথায় নিজের সাইকোপ্যাথেটিক চরিত্রের পুনঃপ্রকাশ ঘটালেন এবট এক রেস্তোরাঁর বেয়ারাকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে। ভাগ্যের কী পরিহাস এবট যেদিন দ্বিতীয় হত্যাকাণ্ড সম্পন্ন করে পুলিশের খাতায় নাম লেখাচ্ছিলেন, ঠিক তার পরদিনই তার ‘জানোয়ারের উদরে’ বইটির চমৎকার একটি রিভিউ বেরিয়েছিল নিউইয়র্ক টাইমস-এ। পত্রিকার সম্পাদক খুব আগ্রহ ভরেই সেটি ছাপিয়েছিলেন এবটের আগের দিনের হত্যাকাণ্ড সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল না থেকে।

এখানে একটি কথা বলা প্রয়োজন। আমরা খুব স্বতঃসিদ্ধভাবে ধরে নেই মনোবিকারগ্রস্ত কিংবা শিশুনিপীড়নকারীরা নিজেদের শিশুবয়সে নিপীড়নের শিকার হয়েছিল, সেজন্যই বোধহয় তারা বড় হয়ে অন্য মানুষদের মেরে কিংবা শিশুদের ধর্ষণ করে নিজেদের জিঘাংসা চরিতার্থ করে। এ ব্যাপারটি অনেকাংশেই ঠিক নয়। আমি যে বিটিকে খুনি ডেনিস রেডার, গ্রীন রিভার কিলার’ গ্রে রিজ ওইয়ের উদাহরণ দিয়েছি, তারা কেউই শিশু বয়সে নিপীড়নের শিকার হয়নি। ডেনিস রেডার ছোটবেলায় খুব ভালো পরিবেশেই বড় হয়েছিলেন। তিনি বিবাহিত ছিলেন, স্ত্রী, এবং দু’ছেলে নিয়ে আর দশটা সাধারণ পরিবারের মতোই জীবনযাপন করতেন[৪৪]।

গবেষক জোয়ান এলিসন রজার্স তাঁর ‘যৌনতা : একটি প্রাকৃতিক ইতিহাস’ বইটিতে লিখেছেন যে বেশীর ভাগ শিশু যৌন নিপীড়নকারীদের নিজেদের জীবনে শিশু নিপীড়নের কোনো ইতিহাস নেই বলেই প্রমাণ মেলে[৪৫]। বংশাণুবিজ্ঞানী ফ্রেড বার্লিনের উদ্ধৃতি দিয়ে রজার্স তার বইয়ে বলেছেন যে, “বিকৃত যৌন আচরণ শেখান নয়, এটা জৈবিকভাবেই অঙ্কুরিত’। অবশ্য তিনি এটাও বলতে ভুলেননি যে, সমাজকে রক্ষা করার জন্যই অপরাধীদের অবশ্যই শাস্তি দেয়া হয়, কিন্তু একই সাথে ঐ আচরণকে অর্থাৎ এ ধরনের প্রকৃতিকে বোঝার চেষ্টাও আমাদের চালিয়ে যাওয়া উচিত। স্টিভেন পিঙ্কারও তাঁর বইয়ের ৩১১ পৃষ্ঠায় বলেন যে কানাডীয়রা আমেরিকানদের মতো একই টিভি শো দেখে কিন্তু কানাডায় অপরাধজনিত হত্যার হার আমেরিকার ১/৪ ভাগ মাত্র। তার মানে সহিংস টিভি শো দেখে দেখে আমেরিকানরা সহিংস হয়ে উঠেছে— এই সনাতন ধারণা ঠিক নয়। আমাদের দেশে আমরা প্রায়ই বলি ‘হিন্দি ছবি দেখতে দেখতে পোলাটা বখে গেছে’ কিংবা বলি ‘ছোটবেলায় বাবা মা পিস্তল জাতীয় খেলনা কিনে দেয়াতেই আজকে পোলা মাস্তানি করে বেড়াচ্ছে। কিন্তু এ ধরনের বিশ্লেষণ’ আসলে কতটুকু বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারাকে তুলে ধরে? সত্যি বলতে কী–’জেনেটিক ডিটারমিনিজম’ ঠেকাতে আমরা নিজের অজান্তেই ‘কালচারাল ডিটারমিনিজমের’ আশ্রয় নিয়ে নেই। খুন-খারাবির পেছনে। জেনেটিক কোনো প্রভাব থাকতে পারে, এটা অস্বীকার করে আমরা দোষারোপ করি ছোটবেলার খেলনাকে। কিংবা ধর্ষণের পেছনে পর্নোগ্রাফিকে। কিন্তু এই মনোভাবও যে আসলে উন্নত কোনো কিছু নয় তা ম্যাটরীডলী তার ‘এজাইল জিন’ বইয়ে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে–”সাংস্কৃতিক নির্ণয়বাদ বংশাণু নির্ণয়বাদের মতোই ভয়ঙ্কর হতে পারে’ [৪৬]। একই কথা বলেছেন নারীবাদী ডারউইনিস্ট হেলেনা ক্রনিন তার ‘মানবপ্রকৃতির সঠিক পরিচিতি প্রবন্ধে একটু অন্যভাবে–’কেউ যদি বংশাণু নির্ণয়বাদকে ভয় পায়, তবে তার একই কারণে পরিবেশ নির্ণয়বাদকেও ভয় পাওয়া উচিত’[৪৭]। পিঙ্কারও তার বইয়ে সহিংসতা নিয়ে আমাদের সনাতন ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে বলেন, এ সমস্ত শিশুরা যুদ্ধ বা সহিংস খেলনার সাথে পরিচিত হবার অনেক আগেই সহিংস প্রবণতার লক্ষণ দেখায়। কাজেই শিশুরা আসলে আমাদের সমাজবিজ্ঞানীরা যেরকম ভাবে অনাদিকাল থেকে শিখিয়ে আসছেন– সেরকম ব্ল্যাঙ্ক স্লেট হয়ে জন্মায় না কখনই। আধুনিক বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের গবেষোনার আলোকে অনেক ক্ষেত্রেই এর স্বপক্ষে সত্যতা পাওয়া গেছে। তারপরেও ‘ব্ল্যাঙ্ক স্লেট’ ডগমা আমাদের মানসপট আচ্ছন্ন করে আছে বহু কারণেই। বাংলায় ‘ব্ল্যাঙ্ক স্লেট ডগমাকে’ খণ্ডন করে মানবপ্রকৃতির উপর জৈববৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা একেবারেই নেই বললেই চলে। মুক্তান্বেষার ২য় সংখ্যায় (জানুয়ারী ২০০৮) প্রকাশিত ‘মানবপ্রকৃতি কি জন্মগত নাকি পরিবেশগত?’ নামের প্রবন্ধটি এ দিক দিয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম বলা যায়।

পাঠকদের মনে হয়তো চিন্তা আঁকিবুকি করতে শুরু করেছে এই ভেবে যে, এবটের মতো উদাহরণগুলো যদি সত্যি হয়ে থাকে তবে তো আমাদের কপালে ঘোর ‘খারাবি’ আছে। সব কিছু যদি ‘জিন’ই নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করে তবে তো তা আমাদের ‘জেনেটিক ডিটারমিনেজম বা বংশাণু নির্ণয়বাদের দিকে ঠেলে দেবে। চিন্তা করে দেখুন সব কিছু যদি জিনেই লেখা থাকে তাহলে আর আমাদের চেষ্টা করেই বা কি লাভ? ‘জিনেই লেখা আছে ছেলে বড় হয়ে সিরিয়াল কিলার হবে’, আর ‘মনোবিকারগ্রস্ত মানুষদের স্বভাব পরিবর্তন করা যায় না– তা তো উপরেই। দেখলাম। এই আপ্তবাক্যদ্বয় মেনে হাত পা গুটিয়ে বসে থাকলে আর ভাগ্যবাদীদের সাথে পার্থক্য থাকল কোথায়?

না রসিকতা করছি না একেবারেই। আমার এই কথাকে হাল্কা কথা ভেবে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিলে কিন্তু ভুল হবে। আমি হাল্কাভাবে ভাগ্যের কথা বললেও জেনেটিক্সের এই সমস্ত নতুন দিক বেরিয়ে আসার সাথে সাথেই একদল ‘বিশেষজ্ঞ মানুষের আচার ব্যবহার, আনন্দ, হাসি কান্না, দুঃখ যাবতীয় সবকিছুকেই ‘জিনের’ মধ্যে খুঁজে পাওয়া শুরু করে দিলেন। এক দিকে রইলো ব্ল্যাঙ্ক স্লেটওয়ালারা যারা সবকিছু পরিবেশ বদল করেই সমাধান করে ফেলতে চান, আর আর অন্যদিকে তৈরি হলো আরেক চরমপন্থি ‘জেনেটিক ডিটারমিনিস্ট’-এর দল যারা পরিবেশ অস্বীকার করে সব কিছু বংশাণু দিয়েই ব্যাখ্যা করে ফেলেন। এই গ্রুপের একদল আবার আরও এক কাঠি সরেস হয়ে ‘জিন কেন্দ্রক ভাগ্যবাদ’ কিংবা ‘বংশাণু নির্ণয়বাদ’ প্রচার করা শুরু করে দিলেন। যেমন, জিনোম প্রজেক্ট শেষ হবার পর পরই ডাবল হেলিক্সের আবিষ্কারক অধ্যাপক জেমস ওয়াটসন বলা শুরু করলেন–

আগে মানুষ ভাবত আকাশের তারায় বুঝি ভাগ্য লেখা আছে। এখন মানুষ বুঝবে, ভাগ্য তারায় লেখা নেই, তার ভাগ্য লেখা রয়েছে জিনে!

কিন্তু সত্যই কি তাই? ব্যাপারটা কি এতই সরল? ওয়াটসনের কথা মতো মানুষের সমস্ত ভাগ্য কি তাহলে জিনেই লেখা আছে?

.

এপিজেনেটিক্স এবং নিউরোপ্লাস্টিসিটির শিক্ষা

না এতটা ভাগ্যবাদী কিংবা নৈরাশ্যবাদী হবার কোনো কারণ নেই। আজকের দিনের বিজ্ঞানীরা দেখেছেন বংশাণুগুলো আমাদের মানসপটের বিনিঈমাণ করলেও সেগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লোহার দরজার মতো অনড় নয়, বরং অনেকক্ষেত্রেই কাদামাটির মতোই নরম। পরিবেশের প্রভাবে এদের সক্রিয়করণ বা নিষ্ক্রিয়করণ ঘটানো যায়– অনেকটা বিদ্যুতের বাতির সুইচ অন/অফ-এর মতোই। যে বংশাণুগুলোকে কয়েক বছর আগেও মনে করা হতো একদমই অনমনীয়, মনে করা হতো বংশাণুর গঠনের সিংহভাগই জ্বণে থাকা অবস্থায় তৈরি হয়ে যায়, ভাবা হতো পরবর্তীকালের পরিবেশে এদের রদবদল হয় সামান্যই, আধুনিক ‘এপিজেনেটিক্স’এর গবেষণা হতে পাওয়া ফলাফল এর বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে বলেই এখন মনে করা হচ্ছে। জীববিজ্ঞানের এই নতুন শাখাঁটি থেকে আমরা ক্রমশ জানতে পারছি পরিবেশ থেকে সংকেত নিয়ে দেহ কীভাবে তার অভ্যন্তরস্থ জিনের প্রকাশভঙ্গিকে বদলে ফেলে। এজন্যই অনেক বিজ্ঞানী এদের চিহ্নিত করেন ‘নমনীয় জিনোম’ (Malleable Genome) হিসেবে, কেউ বা নাম দিয়েছেন ‘চপল জিন’ (Agile Gene)। সায়েন্টিফিক আমেরিকান মাইন্ড ম্যাগাজিনের ২০০৬ সালের অক্টোবর সংখ্যায় ডগলাস স্টেইনবার্গ আধুনিক ‘এপিজেনেটিক্স’এর বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর ফলাফল নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন[৪৮]। ফলাফলগুলো একদিকে যেমন চিন্তা জাগানিয়া, তেমনি অন্যদিকে এর আবেদন সুদূরপ্রসারী। আসলে জিনের গঠন আর বৈশিষ্ট্য যাই হোক না কেন, জিনের প্রকাশভঙ্গি যদি আমরা পরিবেশ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, তবে লাটাইয়ের সুতা অনেকটাই নিজেদের কজায় রাখতে পারবো। ড. ডাওসন চার্চ তার সাম্প্রতিক “আপনার জিনের ভিতরে জ্বিন’ বইয়ে সেজন্যই বলেছেন[৪৯]—

বিজ্ঞান ক্রমশ খুঁজে বের করছে আমাদের ক্রোমজোম কতকগুলো নির্ধারিত জিনের সমন্বয়ে তৈরি হয়ে থাকতে পারে, কিন্তু সে জিনগুলোর সক্রিয়তা নির্ভর করে আমাদের আত্মগত অভিজ্ঞতা এবং কীভাবে সেগুলোকে আমরা প্রক্রিয়াজাত করব, তার উপর।

পিঙ্কারের বইয়ের এবটের উদাহরণে আরেকটিবার ফেরত যাই। সাইকোপ্যাথ জ্যাক এবটের অনমনীয় মনোভাবের যে উদাহরণ পিঙ্কার তার বইয়ে হাজির করেছেন তা হয়তো অত্যধিক চরম মাত্রার’ উদাহরণ। আমাদের চারপাশের উদাহরণগুলো এমনতর চরম সীমায় অবস্থান করে না তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিবেশ পরিবর্তন করে করে কিংবা কড়া সামাজিক নিয়ম নীতি প্রয়োগ করে মানুষের ব্যবহার যে পরিবর্তন করা যায়, তা কিন্তু পরীক্ষিত সত্য। আমার জীবন। থেকেই একটা উদাহরণ হাজির করি–

প্রথম আমেরিকায় আসার পর নতুন নতুন গাড়ি চালানো শুরু করেছি। প্রায় দু’বছর বড় ধরনের কোনো এক্সিডেন্ট ছাড়া সময় পার করে দেবার পর সাহস গেল অতিমাত্রায় বেড়ে। হাইওয়ে ছেড়ে বাসার উপরের ছোট্ট রাস্তায় ঢুকতে হলে যে একটু গতি কমিয়ে ঢুকতে হবে–তা মাথায়ই থাকত না। যে রাস্তায় চলাচলের গতিসীমা সর্বোচ্চ ৩৫, সে রাস্তায় আমি ঢুকতাম প্রায় ৫০ মাইল বেগে। ফলে যা হবার তাই হলো, এক বিকেলে অফিস থেকে ফেরার পথে ঘাপটি মেরে বসে থাকা পুলিশের গাড়ির খপ্পরে পড়ে গেলাম। ব্যস জরিমানা গুনতে হলো। দিন কয়েক খুব সাবধানে গাড়ি চালালাম। তারপর ক’দিন বাদেই আবার যেই কি সেই। একদিন সকালে উঠে দেখলাম ঘড়িতে বাজে সাড়ে আটটা। ঠিক নয়টায় অফিসে একটা জরুরি মিটিং আছে। গাড়ি বের করে দেখলাম তেল নেই। তেল নিতে গিয়ে আরও মিনিট দশেক নষ্ট হলো। এবারে বুঝলাম মিটিং আর ধরা যাবে না। পেট্রল পাম্প থেকে গাড়ি বের করে সেই রাস্তাটায় উঠে যেই না এক্সিলেটরে পা রেখে মেরেছি এক ধুন্ধুমার টান–অমনি পাশ থেকে পুলিশ বাবাজির অভ্যুদয়। আবারো জরিমানা। এক মাসের ব্যবধানে একই রাস্তার উপরে দু’দুবার টিকেট পাওয়ার পর বোধ হয় চৈতন্য ফিরলল। ফিরবে নাই বা কেন–এমন টিকেট আর বার দুয়েক পেলেই আমার ড্রাইভিং লাইসেন্সটাই চলে যাবে। এখন হাইওয়ে থেকে রাস্তায় উঠলেই দেখি যতই আনমনা থাকি না কেন, স্পিডোমিটারের কাঁটা কখনই ত্রিশ অতিক্রম করে না। শাস্তির ভয়ে কিংবা কঠোর নিয়ম নীতি আরোপের ফলে যে মানুষ তার বহুদিনের অভ্যাস পরিবর্তন করতে পারে এটাই তো একটা ভালো উদাহরণ।

আরেকটা উদাহরণ দেই। আমার পরিচিত এক বাংলাদেশি ভদ্রলোক (সঙ্গত কারণেই নামটি উল্লেখ করছি না) বাংলাদেশ থেকে বিয়ে করে বউ নিয়ে আমেরিকায় এসেছেন। স্বভাবে একটু বদরাগী। রাগের সময় মাথা ঠিক থাকে না অনেক সময়ই। ঝগড়ার সময় বউকেও চড় থাপ্পড় মেরে বসেন। বউও প্রথম প্রথম সহ্য করত, কিংবা হয়তো মানিয়ে নিতে চাইত। কাউকে বলতো না। সবাই ভাবতো সুখের সংসার বুঝি তাদের। আর বউকে নেহাৎ গোবেচারা পেয়ে স্বামীরও সাহস গেল বেড়ে। নির্যাতনের মাত্রা বেড়েই চলছিল। একদিন বউ থাকতে না পেরে নাইন-ওয়ান ওয়ানে সোজা কল করে দিল। পুলিশ এসে স্বামী বাবাজিকে ধরে নিয়ে গেল। ভদ্রলোক বোধ হয় ভেবেছিলেন বউয়ের গায়ে একটু আধটু হাত তোলা আর এমন কী অপরাধ। দেশে তো সবাই করে! কিন্তু আমেরিকায় এগুলো আইনকানুন খুবই কড়া। তারপরও পুলিশ ভদ্রলোকের কান্নাকাটি দেখে হয়তো মায়া করে গারদে না ঢুকিয়ে বকাঝকা দিয়ে শেষপর্যন্ত ছেড়ে দিলেন। মনে করিয়ে দিলেন এরপর যদি গায়ে হাত তোলার অভিযোগ আসে, তাহলে তার কপালে বিপত্তি আছে। ভদ্রলোকও ছাড়া পেয়ে ভাবলেন ‘যাক! অল্পের উপর দিয়ে ফাঁরা কাটানো গেছে। কিছু দিন ভালো থাকলেন, সংসার ধর্ম পালন করলেন। কিন্তু কথায় বলে বউ পেটানোর স্বভাব নাকি মজ্জাগত, একবার যে বউয়ের গায়ে হাত তুলে, সে নাকি আবারো তুলে। ভদ্রলোকও আরেকদিন ঝগড়ার সময় বউয়ের গালে থাপ্পড় মেরে বসলেন। আর বউও কল করলেন পুলিশে। এবারে ফলাফল হলো ভয়াবহ। স্বামী প্রবরকে ধরে নিয়ে ঢুকিয়ে দেয়া হলো সোজা জেল হাজতে। কেউ ছারাতে এলো না। এমনকি কাছের বন্ধু-বান্ধবেরাও নয়। দু’দিন হাজতবাসের পর শেষ পর্যন্ত স্বামীর কান্নাকাটিতে বোধ হয় বউয়ের দয়া হলো। ভবিষ্যতের কথা ভেবে হোক, আর সামাজিকতার চাপেই হোক শেষ পর্যন্ত তিনি স্বামীর উপর থেকে অভিযোগ তুলে নিয়ে স্বামীকে জেল থেকে বের করে আনলেন। তবে পুলিশের মন এত সহজে গললো না। একেবারে ঠিকুজি কুঠি সমস্ত বৃত্তান্ত ফাইলবন্দি করে রাখলেন। বলে রাখলেন, তাকে নজরবন্দি রাখা হচ্ছে। ভবিষ্যতে কোনো ধরনের উল্টো-পাল্টা আচরণ দেখলেই সোজা ডিপোর্ট করে দেয়া হবে। তা বউ-পেটানো স্বভাব মজ্জাগত হোক আর শয্যাগতই হোক, পুলিশের ধাতানির উপর তো আর কারো কথা নাই, কারণ বাঘে ছুলে পনেরো ঘা, আর পুলিশে ছুলে নাকি আঠারো ঘা। আর তাছাড়া ডিপোর্ট হবার ভয় আসলেই প্রবাসী বাঙালির বড় ভয়। সবকিছু মিলিয়ে ভদ্রলোক এমন চুপসানো চুপসালেন যে, তার সেই পরিচিত আগ্রাসী চরিত্রই গেল বদলে। কারো সামনে আর মুখ তুলে কথা বলেন না। বউয়ের উপর এখন রাগ করা তো দূরের কথা বউকে তোয়াজ করা ছাড়া এক পা চলেন না। বাংলায় যাকে বলে ‘স্ত্রৈণ পুরুষ’ সেটাতেই রূপ নিয়ে নিলেন পুরোমাত্রায়। এই ঘটনার পর বহু বছর কেটে গেছে। বউয়ের উপর নির্যাতনের আর কোনো খবর পাওয়া যায়নি। কাজেই জিন ওয়ালাদের দাবি অনুযায়ী বউ পেটানোর অভ্যাস যদি কারো মজ্জাগত কিংবা বংশানুক্রমিক হয়েও থাকে, সামাজিক এবং রাষ্ট্ৰীয় চাপ অর্থাৎ সর্বোপরি পরিবেশ বাধ্য করে তার প্রকাশভঙ্গিকে বদলে ফেলতে।

আমার গাড়ি চালানোর উদাহরণটা কিংবা উপরের ‘ভদ্রলোকের’ বউ-পেটানোর উদাহরণটি নেহাৎ খুব ছোট স্কেলে, বড় স্কেলে ঘটা উদাহরণগুলোতে একটু চোখ বুলাই। দেশে যখন খুন-খারাবি কিংবা রাহাজানি বেড়ে যায়, তখন রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আইন-শৃঙ্খলা বাড়ানোর প্রচেষ্টা নেওয়া হয়, কখনো বিশেষ আইন প্রবর্তন করা হয় বা ট্রাইবুনালের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আশির দশকে যখন বাংলাদেশে এসিড নিক্ষেপের হার ভয়ানকভাবে বেড়ে গিয়েছিল, তখন সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ আইন প্রবর্তন করে তা বন্ধের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, জনসচেতনতা তৈরির চেষ্টা করা হয়েছিল যেন এধরনের অমানুষিকতা বন্ধ হয়। বছর খানেকের মধ্যে দেখা গেল এসিড নিক্ষেপের হার অনেক কমিয়ে আনা গিয়েছে। দেশের বাইরে এ ধরনের উদাহরণ আরও অনেক বেশি। বহু দাগি আসামি যারা তারুণ্যে সহিংস কিংবা জনবিরোধী কার্যকলাপের সাথে যুক্ত ছিল, কিংবা পরিচিত ছিল গ্যাংস্টার হিসেবে। তাদের অনেককেই পরবর্তীতে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে তাদের ব্যবহার পরিবর্তন করেই। এদের অনেকেই তাদের অতীতের কর্মকাণ্ড লিপিবদ্ধ করে বইও লিখেছেন, কেউ বা আজ এক্টিভিস্ট হিসেবে কাজ করছেন; মানুষকে তাদের অতীত থেকে শিক্ষা নিতে অনুপ্রাণিত করেছেন। দাবি-দাওয়া পূরণ করে ক্ষুব্ধ শ্রমিকদের কারখানায় ফিরিয়ে নেওয়া, সারের দাম কমিয়ে কৃষকদের শান্ত করার উদাহরণ আমরা প্রতিদিনের পত্রিকাতেই পড়ি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় কার্ফু জারি করে উন্মত্ত জনতাকে স্বাভাবিক আর শৃঙ্খলিত জীবনে ফিরিয়ে আনা যায় তা আমরা বহু ক্ষেত্রেই দেখেছি।

তাই জিন আমাদের মানসিক কাঠামোর বীজ বপন করলেও কখনোই আমাদের গন্তব্য নির্ধারণ করে না। পরিবেশের একটা প্রভাব থেকেই যায়। চাকরির টেনশন, স্ট্রেসফুল জীবনযাপনের প্রভাব শরীরে যে পড়ে সেটা পরীক্ষিত সত্য। ধূমপান, অত্যধিক মদ্যপান, ড্রাগ সেবনের প্রভাব শরীরে আছে বলেই ডাক্তাররা সেগুলো থেকে আমাদের মুক্ত থাকতে পরামর্শ দেন। সেজন্যই একই ধরনের জিন শরীরে বহন করার পরও অনেক সময় দেখা যায়, অভিন্ন যমজদের একজন দিব্যি সুস্থ সবল রয়েছে, অন্যজন বেহিসেবি জীবনযাপনে শরীরকে একেবারে নষ্ট করে ফেলেছে। ২০০৬ সালের আগস্ট মাসে প্রকাশিত নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় ‘Live Long? Die Young? Answer Isn’t Just in Genes’[৫০] প্রবন্ধে কলামিস্ট জিনা কোলাটা দুই যমজ বোনের উদাহরণ হাজির করে দেখিয়েছেন এক বোন ৯২ বছর বয়সেও দিব্যি সুস্থ সবল এবং রোগমুক্ত জীবনযাপন করছে, অথচ অন্য যমজ বোনটির অবস্থা আক্ষরিক অর্থেই ‘কেরোসিন’! সম্প্রতি রোগাক্রান্ত বোনটির ‘হিপ রিপ্লেসমেন্ট করতে হয়েছে, ‘ডিজেনেরেটিভ ডিসঅর্ডারে দৃষ্টিশক্তি প্রায় পুরোটাই চলে গেছে। দেহের অস্থিক্ষয়ের পরিমাণও উল্লেখ করার মতোই। আসলে জীবনযাপন এবং অভ্যাসের প্রভাব যে দেহের উপর পড়ে তা অস্বীকার করা উপায় নেই। সে জন্যই চিকিৎসক অধ্যাপক মাইকেল রেবিনফ বলেন,

অভিন্ন যমজেরা একই ধরনের জিন বিনিময় করলেও সেই জিনগুলো দেহে একই ধরনের রোগের প্রকাশ অনেকসময়ই ঘটায় না, যদিও সাধারণভাবে ব্যাপারটিকে খুবই জেনেটিক বলে মনে করা হয়।

চিত্র। পেজ ৫২

চিত্র : জোসেফাইন তেজাউরো এবং তার জমজ বোন– জেনেটিক প্রকৃতি এক হওয়া সত্ত্বেও তাদের দৈহিক অবস্থা একই রকম নয় (নিউইয়র্ক টাইমস, অগাস্ট ২০০৬)।

আরেকটি চাঞ্চল্যকর ফলাফল পাওয়া গেছে সম্প্রতি অধ্যাপক র‍্যান্ডি জার্টেল এর ইঁদুর নিয়ে গবেষণা থেকে। তিনি দেখেছেন, Agouti নামের যে জিনটি মানুষের ওবিসিটি বা স্থূলত্ব এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের জন্য দায়ী বলে মনে করা হয় সেটি এক ধরনের ইঁদুরের মধ্যেও প্রবলভাবে দৃশ্যমান। হলুদ বর্ণের এই এগুটি ইঁদুর জন্মের পরপরই রাক্ষসের মতো কেবল খেয়েই চলে। এবং এদের অধিকাংশই মানুষের মতো ক্যান্সার এবং ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয় এবং খুব তাড়াতাড়ি মারা যায়। এমনকি তাদের বাচ্চা জন্ম নিলেও তারা এ সমস্ত রোগের ঝুঁকি নিয়েই জন্মায়। অধ্যাপক জার্টেল কিছু ইঁদুরকে আলাদা করে ল্যাবের কাঁচের জারে রেখে তাদের খাদ্যাভাসের পরিবর্তন ঘটালেন। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি দেখলেন ইঁদুরদের জেনেটিক প্রকাশভঙ্গিতে পরিবর্তন এসেছে, এবং বাচ্চা যা জন্ম নিচ্ছে তা অধিকাংশই রোগের ঝুঁকিমুক্ত। এমনকি সদ্য জন্মানো বাচ্চার গায়ের রঙেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন পেলেন গবেষকেরা। আণবিক স্তরে জেনেটিক কোডের কোনো ধরনের পরিবর্তন না করে শুধু খাদ্যাভাস এবং পরিবেশ বদলে দিয়ে দেহজ বৈশিষ্ট্য পরিবর্তনের এক অনন্য নজির পেলেন তারা। তারা বুঝলেন মানুষের ক্ষেত্রে জেনেটিকভাবে হৃদরোগ কিংবা ডায়াবেটিস এর ঝুঁকি নিয়ে আমাদের অনেকেই জন্মানোর পরও ডাক্তারদের কথা শুনে কম শর্করা আর চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার অভ্যাস করে, নিয়মিত ব্যায়াম করে, ধূমপানমুক্ত জীবনযাপন করে কীভাবে আমরা এ সমস্ত রোগের ঝুঁকি কমিয়ে নিতে পারি।

এখন কথা হচ্ছে, পরিবেশ বদলে দিয়ে দেহজ বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করা যায় তা না হয় দেখলাম, কিন্তু পরিবেশ বদলে দিয়ে একইভাবে মানসিক প্রকাশভঙ্গিকেও কি বদলানো সম্ভব? বিজ্ঞানীরা বলেন অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব। মোজে সিজফ এবং মাইকেল মেনি–এ দুজন বিজ্ঞানীও জার্টেলের মতোই ইঁদুর নিয়ে গবেষণা করছিলেন। তারা দেখলেন একধরনের ইঁদুর আছে যাদের মা হঁদুরেরা তাদের বাচ্চাদের জন্য কোনো ধরনের যত্ন-আত্তি করে না। মা’দের আরেক দল আছে যারা আবার বাচ্চা জন্মানোর পর থেকেই জিব দিয়ে গা চেটে আর অতিরিক্ত আদর যত্ন করে বাচ্চাদের বড় করে। দেখা গেছে যে বাচ্চাগুলোর আদর যত্ন নেওয়া হয় তারা অনেক সাহসী, সামাজিকভাবে বন্ধুভাবাপন্ন আর শান্ত হয়ে বেড়ে উঠে। আর মায়ের অবহেলায় থাকা বাচ্চারা বেড়ে উঠে অস্থির আর ভীতু স্বভাবের হয়ে। তাদের দু দলের ব্রেনেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ করলেন বিজ্ঞানীরা। আদর পাওয়া বাচ্চাদের মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস নামের প্রত্যঙ্গটি থাকে অনেক বিবর্ধিত, আর তাদের স্ট্রেস হরমোন কর্টিসলের (cortisol) উপস্থিতি অনেক কম পাওয়া গেল। আর অবহেলায় বড় হওয়া বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এই হরমোন পাওয়া গেল অনেক বেশি। মানুষের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে যারা খুব স্ট্রেশূল জীবনযাপন করে থাকে, তাদের দেহে কর্টিসলের উপস্থিতি থাকে মাত্রাতিরিক্ত বেশি। তাদের হৃদরোগের ঝুঁকিও থাকে অনেক প্রবল। ড. সজফ এক অদ্ভুত কাজ করলেন। তিনি ওই ভীতু ইঁদুর দলের ব্রেনে এমন এক ধরনের এনজাইম (এসিটাইল গ্রুপ) প্রবেশ করালেন যা কটিসলের উৎপাদনকে বাধা দেয়। দেখা গেল ইঁদুরদের স্বভাবে পরিবর্তন এসেছে। তারা এখন অনেক সাহসী হয়ে উঠেছে। আবার একইভাবে আদরে বড় হওয়া সাহসী ইঁদুরের দল থেকে ইঁদুর নিয়ে তাদের মাথায় মিথাইল গ্রুপ প্রবেশ করিয়ে ভীতু আর অস্থির বানিয়ে দিলেন তারা। এদের গবেষণাকে ফিচার করে সম্প্রতি একটি নিবন্ধ লেখা হয়েছে জনপ্রিয় বিজ্ঞান পত্রিকা ডিস্কভার-এ। প্রবন্ধের শিরোনাম– DNA Is Not Destiny[৫১]।

চিত্র। পেজ ৫৩

চিত্র : কেবল মা ইঁদুরের খাদ্যাভাস পরিবর্তন করে অধ্যাপক জার্টেল দেখলেন ইঁদুরটি যে বাচ্চার জন্ম দিচ্ছে তার দৈহিক বৈশিষ্ট্য অনেকটাই আলাদা (ডিস্কভার, নভেম্বর, ২০০৬)।

ইঁদুরের ক্ষেত্রে (উপরের উদাহরণে) দেখা গেছে, যে সব বাচ্চাকে আদর যত্ন নেওয়া হয়েছে তারা অনেক সাহসী, সামাজিকভাবে বন্ধুভাবাপন্ন আর শান্ত হয়ে বেড়ে উঠেছে। তারা থাকে অন্যদের প্রতি অনেক সংবেদনশীল। আর মা বাবার আদর যত্ন না পেয়ে বড় হওয়া বাচ্চাগুলো হয়ে উঠে অস্থির, ভীতু এবং অসামাজিক। মানুষের ক্ষেত্রেও কি এটা ঘটা সম্ভব নয়? যে বাচ্চারা মা বাবার আদর যত্ন না পেয়ে অবহেলায় বড় হয় তাদের মধ্য থেকেই একটা অংশ হয়তো বড় হয়ে অসামাজিক কাজ কর্মে জড়িয়ে পড়ে? ব্যাপারটা সরলীকরণ মনে হলেও এটা ঘটা সম্ভব খুবই সম্ভব। সেজন্যই বোধ হয় প্রতিটি মা বা শিশুকে একটা ভালো পরিবেশ দিয়ে আদর যত্ন করে বড় করতে চান। টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক এরিক নেস্টলার দীর্ঘদিন ধরে বিষণ্ণতায় ভোগা রোগীদের মাথার ভিতরে হিপোক্যাম্পাস পর্যবেক্ষণ করে দেখেছেন যে, তাদের হিপোক্যাম্পাসের আকার এবং আয়তন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক সঙ্কীর্ণ থাকে। শুধু তাই নয়, তাদের হিপোক্যাম্পাসের মধ্যকার একধরনের প্রোটিনে (হিস্টোন) মিথাইল গ্রুপের অস্তিত্ব আবিষ্কার করেছেন (অনেকটা ওই ভীতু ইঁদুর দলের মতোই)। বিজ্ঞানীরা এখন জানেন কীভাবে মানুষের বিষণ্ণতা সারাতে হয়। তারা ওষুধের মাধ্যমে এসিটাইল গ্রুপকে হিস্টোনের সাথে সংযুক্ত করে দেন, যা মিথাইল গ্রুপের কাজকর্মকে বাধা দেয়। এজন্যই এন্টি ডিপ্রেসেন্ট ওষুধগুলো এত সহজে কাজ করে বিষণ্ণতা দূর করে মনকে ফুরফুরে করে তোলে। শিকাগোর ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডেনিস গ্রেসন স্কিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের উপর এসিটাইল গ্রুপের ঔষধ প্রয়োগ করে অনেক রোগীকেই সারিয়ে তুলতে পেরেছেন। অনেক বিজ্ঞানীই এখন মনে করেন শিশু বয়েসের পরিবেশ, পরিচর্যা আমাদের মানসজগৎ গঠনে সাহায্য শুধু করে না, পরবর্তীতে জিনের প্রকাশভঙ্গিকে বদলে দেবার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভুমিকা রাখে। যতই এপিজেনেটিক্সের আধুনিক গবেষণার ফলাফল বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে, ততই মানবপ্রকৃতির রহস্যোদঘাটনে জেনেটিক্সের পাশাপাশি পরিবেশ এবং পরিচর্যার গুরুত্ব আরও বেশি করে বোঝা যাচ্ছে, আর এগুলো মানবপ্রকৃতি বিষয়ক বিতর্কে যোগ করেছে নতুন মাত্রা। সায়েন্টিফিক আমেরিকান মাইন্ডের ২০০৬ সালের অক্টোবর-নভেম্বর সংখ্যায় এ জন্যই বলা হয়েছে–

নতুন গবেষণার ফলাফলের আলোকে এখন বোঝা যাচ্ছে মায়ের পরিচর্যার রীতি শিশুর জিনের প্রকাশভঙ্গির উপর যথেষ্ট প্রভাব ফেলে।

এপিজেনেটিক্স ছাড়াও ব্রেনের নিউরোপ্লাস্টিসিটি নিয়ে পল ব্যাচি রিটা, মাইকেল মার্জেনিচ, ভিলায়ানুর রামাচন্দ্রনের আধুনিক গবেষণাগুলোও খুব পরিষ্কারভাবে দেখিয়েছে কীভাবে পরিবেশের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের মস্তিষ্কও নিজেকে বদলে ফেলতে পারে। এ প্রসঙ্গে আরও বিষদভাবে জানতে হলে উৎসুক পাঠকেরা নর্মান দইজের মস্তিষ্ক যা নিজে থেকেই নিজেকে বদলে ফেলছে’ (২০০৭) বইটি পড়ে নিতে পারেন[৫২]।

.

ব্ল্যাঙ্ক স্লেট বনাম জুক বক্স

তাহলে পরিবেশ নির্ণয়বাদ বনাম বংশাণু নির্ণয়বাদের এই দড়ি টানাটানি থেকে কী উপসংহার বেরিয়ে এল? বেরিয়ে এল যে, সম্পূর্ণ বংশাণুনির্ণয়বাদী হওয়াকিংবা সম্পূর্ণ পরিবেশ নির্ণয়বাদী হওয়া দুই ক্ষেত্ৰই ভুল। মানবপ্রকৃতি গঠনে জিন বা বংশাণুর প্রভাব যেমন আছে, তেমনি আছে পরিবেশের। জিনের গুরুত্ব এ কারণে যে, আমরা বংশগতভাবে যে সমস্ত জিনগত বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে পেরেছি, তার টার্ন অন বা অফের মাধ্যমে জেনেটিক এক্সপ্রেশন বদলাতে পারি পরিবেশ থেকে বিবিধ সিগন্যাল নিয়ে। কিন্তু কোনো কারণে সেই মুল জিনটিই যদি আমার মধ্যে অনুপস্থিত থাকে, আমি যত সিগন্যাল পাঠাই না কেন তা বদলানো সম্ভব হবে না। আবার পরিবেশের গুরুত্ব সবসময়ই থাকবে কারণ জিনের প্রকাশভঙ্গি বদলানোর ব্যাপারটা নির্ভর করছে। পরিবেশ থেকে কী ধরনের সিগন্যাল পাওয়া যাচ্ছে তার উপর[৫৩]। আমাদের শরীরের ওজনের কথাই ধরা যাক। অনেক ক্ষেত্রেই দেহের কাঠামো মোটা হবে না চিকন হবে তার অনেক কিছুই কিন্তু জেনেটিক। কিন্তু তা বলে জিনের হাতে সব কিছু ছেড়ে দিয়ে আমরা বসে থাকিনা। আপনার যদি একটুতেই মুটিয়ে যাওয়ার প্রবণতা থাকে, তবে আপনি খাবারের উপর আরও যত্নবান হবেন, ব্যায়াম করবেন, চর্বি জাতীয় খাবার কম খাবেন–এইটাই ধর্তব্য। তা না করে আপনি যদি বেহিসেবি জীবন কাটাতে থাকেন, খানাপিনা পানীয়-এর প্রতি লালায়িত থাকেন, সমানে ভুরিভোজ করে যেতে থাকেন হয়তো আপনার দেহের জিনগুলো আনন্দে আত্মহারা হয়ে আপনার দেহকে নাদুসনুদুস করে তুলবে। কাজেই জিনের অভ্যন্তরস্থ জিনগত প্রকাশভঙ্গি কীভাবে বদলাবেন–তার অনেক কিছুই কিন্তু আপনার দেয়া পরিবেশের উপরই নির্ভর করবে।

একই কথা মানবপ্রকৃতি এবং মানুষের অর্জিত ব্যবহারের জন্যও খাটে। মানবপ্রকৃতি গঠনে জিন যেমন ভূমিকা রাখে, তেমনি রাখে পরিবেশ। অনেক সময় প্রকৃতিকে পরিবেশ থেকে আলাদা করা যায় না; আলাদা করার চেষ্টাও হয়তো অনেক ক্ষেত্রে ভ্রান্ত। ম্যাট রিডলী তার ‘এজাইল জিন’ বইয়ে সেজন্যই বলেছেন—

আমার কথা আরও একবার স্পষ্ট করে বলি। আমি মনে করি, মানুষের ব্যবহার বিশ্লেষণ করতে হলে প্রকৃতি এবং পরিবেশ দুটোকেই গোনায় ধরতে হবে। …নতুন আবিষ্কারের আলোকে বোঝা যাচ্ছে কীভাবে জিনগুলো মানুষের ব্যবহারকে প্রভাবিত করে, আবার কীভাবে মানুষের ব্যাবহার জিনগুলোর প্রকাশভঙ্গিকে প্রভাবিত করে। কাজেই বিষয়টা আর প্রকৃতি বনাম পরিবেশ (nature versus nurture) নয়, বরং পরিবেশ দিয়ে প্রকৃতি (nature via nurture)।

বংশাণু আর পরিবেশ–আসলে আয়তক্ষেত্রের দুটি বাহুর মতো। একটি দৈর্ঘ্য, আরেকটি প্রস্থ। মানবপ্রকৃতি নির্মাণে কার ভূমিকা বেশি জিন না পরিবেশ? এ প্রশ্ন কেউ করলে এর জবাবটিও আরেকটি প্রশ্ন করেই দেয়া যায়–আয়তক্ষেত্র তৈরিতে কার ভূমিকা বেশি দৈর্ঘ্য নাকি প্রন্থ?

চিত্র। পেজ ৫৭

চিত্র: বর্তমানে অনেক বিবর্তন মনোবিজ্ঞানী মানব মনকে ব্ল্যাঙ্ক স্লেটের বদলে জুক বক্সের সাথে তুলনা করছেন।

বংশাণু আর পরিবেশের দ্বন্দ্ব যুদ্ধের ফলাফল যাই হোক না কেন, মানুষের মন যে আসলে ব্ল্যাঙ্ক স্লেট হয়ে জন্মায় না তা এখন সমাজবিজ্ঞানীরাও মোটামুটিভাবে মেনে নিতে শুরু করেছেন। এর মধ্যে অনেকেই ভাবছিলেন এই ব্ল্যাঙ্ক স্লেট ব্যাপারটাকে অন্য কিছু দিয়ে পরিবর্তন করা যায় কিনা। বিজ্ঞানী জন টুবি এবং লিডা কসমাইডস একটি বিকল্প প্রস্তাব করেছেন সম্প্রতি। মানব মনকে ব্ল্যাঙ্ক স্লেট না বলে জুক বক্স হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে[৫৪]। স্লেটের তুলনায় জুক বক্স অনেক বেশি আকর্ষণীয় এবং মিথস্ক্রিয়াময়। জুকবক্সকে যেমন কেবল ভিতরের সরঞ্জামাদি দিয়ে বিচার করা যায় না, ঠিক তেমনি যায় না কেবল বাইরের সম্ভরণ দিয়েও। যেমন, F6 বোতাম টিপলে কোনো সুরই বাজবে না, যদি না বোতামের সাথে ভিতরে কোনো রেকর্ডের সংযোগ থেকে থাকে। অর্থাৎ বোতাম টেপা এবং সেই সাথে ভেতরের রেকর্ডের উপস্থিতি র সুগ্রন্থিত সংযোগের মাধ্যমেই আমরা সফলভাবে জুকবক্স থেকে সুরধ্বনি শুনতে পাই। পুরোপুরি না হলেও, বাংলাদেশে আমরা যে হারমোনিয়াম বাজিয়ে থাকি, সেটার ব্যাপারও অনেকটা প্রায় একই রকমের। হারমোনিয়ামের চাবি টিপে আপনি কেমন সুর তুলবেন তা হয়তো আপনার উপরেই নির্ভর করছে সেটা ‘খাঁচার ভিতর অচীন পাখি’র সুরই হোক, কিংবা হোক না চাহিলে তারে পাওয়া যায়’ এর সুর কিন্তু সুর তোলার মতো উপকরণগুলো হারমোনিয়ামের চাবির সাথে আগে থেকেই যুক্ত থাকতে হবে। কোন চাবির সাথে ‘সা’ আর কোন্ চাবির সাথে ‘রে আর কোনো চাবি টিপলে ‘গা’ তা আপনাকে জানতে হবে, এবং হারমোনিয়ামের সঠিক চাবি থেকে সঠিক সুর বেরুতে হবে। অর্থাৎ পুরো ব্যাপারটি নির্ভর করছে ভিতর এবং বাইরের সুষম সমন্বয়ের উপর। আমাদের মনও কাজ করে অনেকটা সেরকম ভাবেই, ভিতরের জেনেটিক কাঠামোর সাথে বাইরের পরিবেশের এক ধরনের সুষম মিথস্ক্রিয়ায়।

০৩. সংস্কৃতির ‘ভূত

আগেই বলেছি বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান সমাজ এবং সংস্কৃতির অনেক কিছু খুব পরিষ্কার এবং বোধগম্যভাবে ব্যাখ্যা করলেও এর অনেক উপসংহার এবং অনুসিদ্ধান্ত এতই বিপ্লবাত্মক যে এটি অবগাহন করা সবার জন্য খুব সহজ হয়নি, এখনও হচ্ছে না। এর অনেক কারণ আছে। এর মধ্যে একটা কারণ আমাদের মধ্যেকার জমে থাকা দীর্ঘদিনের সংস্কার।

তবে ওটাই একমাত্র কারণ নয়। বিতর্কের মুল কারণ খুঁজলে দেখা যাবে, বিতর্কটা যতটা না সংস্কারের জন্য, তার চেয়ে অনেক বেশি বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের অন্তর্নিহিত

অনুকল্প আর এর থেকে পাওয়া বিভিন্ন অনুসিদ্ধান্তের কারণে।

মূল বিতর্কটা নিঃসন্দেহে মানব মনের স্বরূপ নিয়ে। বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানীরা রঙ্গমঞ্চে হাজির হবার আগে সার্বজনীন মানবপ্রকৃতি’ বলে কিছু আছে কি না সেটাই ঠিকমত আমাদের কাছে পরিষ্কার ছিল না। যেমন, স্প্যানিশ লিবারেল দার্শনিক হোসে ওর্তেগাগ্যাসেট মানবপ্রকৃতির অস্তিত্ব অস্বীকার করে বলতেন, “মানুষের কোনো প্রকৃতি নেই, যা আছে তা হলো ইতিহাস। ব্রিটিশ-আমেরিকান নৃতত্ত্ববিদ অ্যাশলে মন্টেগু বলতেন, “মানুষের সহজাত স্পৃহা (instinct) বলে কিছু নেই; কারণ তার সব কিছুই তার চারপাশের সমাজ-সংস্কৃতি থেকেই শেখা। কেউ বা আবার মানবপ্রকৃতিকে স্বীকার করে নিলেও তাকে একেবারেই কাঁচামালের মতো আদিম মনে করতেন। যেমন প্রখ্যাত নৃতাত্ত্বিক মার্গারেট মীড বলতেন, ‘মানবপ্রকৃতি হচ্ছে অশোধিত, সবচেয়ে ম্যাড়মেড়ে কাঁচামাল[৫৫]।

বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানীরা এসে মানবপ্রকৃতি নিয়ে এই প্রচলিত ছকটিকেই উলটে দিয়েছেন। ব্যাপারটা একটু খোলাসা করা যাক। একজন শৈলচিকিৎসক যখন হাসপাতালে অপারেশনের জন্য আসা কোনো রোগীর পেটের ভিতর ছুরি চালাবেন বলে ঠিক করেন তখন তিনি জানেন যে, পেট কাটলে এর ভিতরে কী পাওয়া যাবে। পাকস্থলি, বৃহদান্ত্র, ক্ষুদ্রান্ত, অগ্ন্যাশয় ইত্যাদি। পাকস্থলির জায়গায় পাকস্থলি থাকে, আর অগ্ন্যাশয়ের জায়গায় অগ্ন্যাশয়। অন্য রোগীর ক্ষেত্রেও পেট কেটে চিকিৎসক পাকস্থলির জায়গায় পাকস্থলি দেখবার প্রত্যাশাই করেন। এটাই স্বাভাবিক। বিভিন্ন রোগীর পাকস্থলিতে পার্থক্য থাকতে পারে কারোটা মোটা, কারোটা চিকন, কারোটা দেখলেই হয়তো বোঝা যাবে ব্যাটা আমাশয় রোগী, কারোটা আবার স্বাস্থ্যকর। বৈশিষ্ট্যে পার্থক্য যাই থাকুক না কেন, মানুষের পাকস্থলি দেখে কারো গরুর কিংবা ঘোড়ার পাকস্থলি বলে ভুল হবে না। কারণ মানুষের পাকস্থলির একটা প্রকৃতি আছে, যেটা গরুর পাকস্থলি থেকে আলাদা। আমি অবশ্য গরুর পাকস্থলি বিশেষজ্ঞ নই, যিনি বিশেষজ্ঞ যেমন পলাশি বাজারের সলিমুল্লাহ কসাই তিনি খুব ভালো করেই আমাদের দেখিয়ে দিতে পারবেন গরুর পাকস্থলি কেমন হয়, খাসিরটা কেমন, ভেড়ারটা কেমন আর মুরগিরটা কেমন। ঠাটারিবাজারের নিত্যানন্দ কসাই হলে তার লিস্টে শুয়োরের পাকস্থলিও চলে আসতে পারে। সলিমুল্লা কিংবা নিত্যানন্দ কসাইয়ের অভিজ্ঞ চোখকে খাসির পাকস্থলির নামে শুয়োরের পাকস্থলি বলে চালানোর চেষ্টা করে ধোঁকা দেয়া যাবে না। কারণ তারা জানেন, খাসির পাকস্থলির প্রকৃতি শুয়োরেরটা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। একই কথা মানুষের পাকস্থলির জন্যও প্রযোজ্য। একথাবলা ভুল হবে না যে, মানুষের পাকস্থলির প্রকৃতিই অন্যপ্রাণীর পাকস্থলি থেকে তাকে আলাদা করে দিচ্ছে।

বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, পেটের ভিতরে পাকস্থলির যেমন একটা প্রকৃতি আছে, তেমনি মানুষের মনেরও আলাদা একটা প্রকৃতি আছে যেটা অন্য প্রাণী থেকে আলাদা। উদাহরণ দেয়া যাক। মানুষের খুব কাছাকাছি প্রজাতি শিম্পাঞ্জি। শিম্পাঞ্জির সাথে মানুষের জিনগত মিল শতকরা ৯৯ ভাগ। কাজেই ধরে নেওয়া যায় শিম্পাঞ্জির সাথে মানুষের অনেক কিছুতেই মিল থাকবে। কিন্তু যতই মিল থাকুক না কেন সার্বজনীনভাবে মানবপ্রকৃতি শিম্পাঞ্জির প্রকৃতি থেকে আলাদা হবে বলে আমরা ধরে নিতে পারি, অনেকটা উপরের উদাহরণের পাকস্থলির প্রকৃতির মতোই। কিছু উদাহরণ হাজির করি। শিম্পাঞ্জি সমাজে মেয়ে শিম্পাঞ্জিরা বহুগামী হয়— তারা যত ইচ্ছা ছেলেদের সাথে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করে তাদের আসলেই কোনো বাছবিচার নেই। পুরুষ শিম্পাঞ্জিরা আবার অন্য মেয়ে শিম্পাঞ্জি (যাদের সাথে এখনও দৈহিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় নাই) তাদের বাচ্চাকে ধরে নিয়ে মেরে ফেলে। এ ধরনের কোনো প্যাটার্ন আমাদের মানবসমাজে চোখে পড়ে না। চোখে না পড়াই স্বাভাবিক, কারণ মানুষের প্রকৃতি শিম্পাঞ্জিদের প্রকৃতি থেকে আলাদা।

বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানীদের কথামত আমরা জানলাম ‘মানবপ্রকৃতি’ বলে একটা কিছু তাহলে আছে, যেটা অন্য প্রাণীদের থেকে আলাদা। কিন্তু কেমন সে প্রকৃতি? সমাজবিজ্ঞানী কিংবা নৃতাত্ত্বিকরা অনেকদিন ধরেই এর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছেন। তারা বলেন এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে রয়েছে মানবসমাজের সংস্কৃতিতে। সমাজবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাতা এমিল ডুর্খাইম কোনো সার্বজনীন মানবপ্রকৃতির জন্মগত প্রকরণকে অস্বীকার করে তাকে ব্ল্যাঙ্ক স্লেটের সাথে তুলনা করেছিলেন। তার মতে সাংস্কৃতিক বিভাজনই মানবপ্রকৃতিকে তুলে ধরার একমাত্র নিয়ামক। কাজেই মানবপ্রকৃতি বিষয়ে যে প্রশ্নই করা হোক না কেন–এর উত্তর আমাদের খুঁজে নিতে হবে সংস্কৃতিতে। মেয়েদের তুলনায় ছেলেরা বেশি সহিংস কেন–এর উত্তর হলো সংস্কৃতিই এর কারণ। ছেলেরা কেন সত্তুর বছরের বুড়ির চাইতে বিশ বছরের ছুঁড়ির প্রতি বেশি লালায়িত হয় এর উত্তর হচ্ছে সংস্কৃতি। ছেলেরা কেন মেয়েদের চেয়ে বেশি পর্নোগ্রাফি দেখে, কিংবা বহুগামী উত্তর একটাই–সংস্কৃতি’! ওম সংস্কৃতায়ঃ নমো! Omnia cultura ex cultural

সমাজবিজ্ঞানের পুরোধা এমিল ডুর্খাইম যে ইটের গাথুনি দিয়ে গিয়েছিলেন তাতে ‘সংস্কৃতির প্রাসাদ’ বানাতে এবারে এগিয়ে এলেন নৃতাত্ত্বিকেরা। নৃতত্ত্ববিদের জনক বলে যাকে অভিহিত করা হয় সেই ফ্রানজ বোয়া এবং মার্গারেট মীড ছিলেন এদের মূল কান্ডারি। ফ্রানজ বোয়া যে মতবাদ প্রচার করলেন তাতে সকলের মনে হলো, মানুষের প্রকৃতি বুঝি একেবারেই নমনীয়। এতে জন্মগত কোনো বৈশিষ্ট্যের কোনো ছাপ নেই, কোনোদিন ছিলও না। সব কিছুই সংস্কৃতিনির্ভর। আর বোয়ার প্রিয় ছাত্রী “নৃতত্ত্বের রানি’ মার্গারেট মীড আদিম ‘স্যামোয়া’ জাতির মেয়েদের নিয়ে এমন এক আদর্শিক সমাজ কল্পনা করে ফেললেন, যার বাস্তব অস্তিত্ব আসলে পৃথিবীর কোথাওই নেই। মীডের ‘স্যামোয়া’ যেন আক্ষরিক অর্থেই হচ্ছে স্বর্গের প্রতিরূপ। সেখানে কারো মধ্যে নেই কোনো ঝগড়া, নেই কোনো ঘৃণা, ঈর্ষা কিংবা হিংসা। যৌনতার ক্ষেত্রে তাদের আচরণ একেবারে স্বতঃস্ফুর্ত। সেখানকার মেয়েরা বহুগামী, যৌনতার ব্যাপারে পুরোপুরি স্বাধীন যখন ইচ্ছে স্বামীর সাথে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে প্রিয় মানুষের সাথে সম্পর্ক করে নিতে পারে। তারা স্বাধীনভাবে যেটা চায় সেটা করতে পারে। মীডের অনুকল্প ছিল, স্যামোয়া জাতির সংস্কৃতিই তাদের মেয়েদের এমন স্বতঃস্ফূর্ত আর স্বাধীন করে তুলেছে। তিনি সেসময় ফাপুয়া (Fa’apua’a) এবং ফোফোয়া (Fofoa) নামের দুজন স্যামোয়ান নারীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য তার গবেষণায় ব্যবহার করেন। তাদের দেয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে মীড সিদ্ধান্তে আসেন, বংশগতি নয় বরং সংস্কৃতিই ব্যক্তিত্বকে প্রভাবিত করে। মার্গারেট মীড তার চিন্তাধারা ব্যক্ত করে ১৯২৮ সালে ‘Coming of Age in Samoa নামের যে গ্রন্থ রচনা করেন সেটি ‘সংস্কৃতিভিত্তিক প্রাসাদের এক অগ্রগণ্য দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়[৫৬]। কিন্তু পরবর্তীতে ডেরেক ফ্রিম্যানসহ অন্যান্য গবেষকদের গবেষণায় প্রমানিত হয় যে, মীডের অনুকল্পগুলো স্রেফ উইশফুল থিংকিং ছাড়া আর কিছু ছিল না। [৫৭,৫৮] গবেষকেরা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে, মীডের গবেষণা ছিল একেবারেই সরল এবং মীড স্যামোয়ান মেয়েদের দ্বারা নিদারুণভাবে প্রতারিত হয়েছিলেন। ফ্রিম্যানের গবেষণা থেকে বেরিয়ে এল, স্যামোয়ান জাতির মধ্যে হিংসা, বিদ্বেষ, রাগ, ঘৃণা, হত্যা লুণ্ঠন আর দশটা জাতির মতোই প্রবলভাবে বিদ্যমান, সরলমনা মীড সেগুলো দেখতেই পাননি। ডেরেক ফ্রিম্যানের অনুমান এবং অভিযোগের একেবারে সরাসরি সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায় মীডের গবেষণা প্রকাশের ষাট বছর পর। ১৯৮৮ সালের মে মাসে ফাপুয়া (Fa’apua’a), যখন তার বয়স ৮৬ বছর অফিশিয়ালি স্যামোয়ান সরকারের কাছে স্বীকার করে নেন যে, তিনি আর তার বন্ধু ফোফোয়া স্যামোয়ান নারীদের যৌনপ্রবৃত্তি নিয়ে যে তথ্য মীডকে ১৯২৬ সালে দিয়েছিলেন তার সবটুকুই ছিল বানোয়াট। এ কমপ্লিট হোক্স।

চিত্র। পেজ ৬২

চিত্র :দুটি বহুল আলোচিত বই :বাম পাশে মার্গারেট মীডের কামিং অফ এজ ইন সামোয়া (১৯২৬), আর ডানে ডেরেক ফ্রিম্যানের দ্য ফেটফুল হোক্সিং অব মার্গারেট মীড (১৯৯৯)।

সেজন্যই ম্যাট রীডলী তার ‘এজাইল জিন’ বইয়ে মীডের গবেষণা সম্বন্ধে বলতে গিয়ে বলেন[৫৯], “তার মানবপ্রকৃতির সাংস্কৃতিক ভিন্নতা খোঁজার ব্যর্থ চেষ্টা অনেকটা এমন কুকুর খুঁজে পাওয়ার মতোই যে কুকুর ঘেউ ঘেউ না করে মিউ মিউ করে।

মার্গারেট মীডের মতোই শান্তিপূর্ণ এক জাতির সন্ধান করতে গিয়ে সত্তুরের দশকে লেজে গোবরে করেছেন ম্যানুয়েল এলিজাল্ডে জুনিয়র (Manuel Elizalde Jr)। তিনি দেখাতে গিয়েছিলেন ঢালাওভাবে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে সহিংসতা, যুদ্ধবাজির কথা ঢালাওভাবে উল্লেখ করা থাকলেও ফিলিপাইনের এক জঙ্গলে টেসাডে (Tasaday) নামে এমন এক ট্রাইব আছে যারা নাকি আক্ষরিক অর্থেই এখনও সেই আদিম প্রস্তর যুগে বাস করছে। তারা ছাল বাকল পড়ে ঘুরে বেড়ায়, গুহায় বসবাস করে আর তারা নাকি এমনই শান্তিপ্রিয় যে তাদের ভাষাতে সহিংসতা, আগ্রাসন কিংবা সংঘর্ষসূচক কোনো শব্দই নেই। তাদের সংস্কৃতি একেবারে শান্তিতে শান্তিময়। এই মহা ব্যতিক্রমী শান্তিপূর্ণ মানবপ্রজাতি নিয়ে ১৯৭৫ সালে একটি বইও বের হয়েছিল ‘শান্ত টেসাডে’ নামে[৬০]।

চিত্র। পেজ ৬৩

চিত্রঃ মার্কোস সরকারের পরিকল্পনায় সভ্য মানুষকে অর্ধনগ্ন করে ছাল বাকল পড়িয়ে শান্তিপূর্ণ টেসাডের মিথ সুপরিকল্পিত ভাবে তৈরি করা হয়।

কিন্তু থলের বেড়াল বেরিয়ে আসতে সময় লাগেনি। আশির দশকের শেষদিকে বিজ্ঞানীদের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এল যে ম্যানুয়েল এলিজাল্ডের আগেকার কাজকর্ম আসলে ছিল পুরোটাই সাজানো[৬১]। আশে পাশের গ্রাম থেকে জিন্স আর টিশার্ট পরা সুশিক্ষিত ছেলেপিলেদের ছাল বাকল পরিয়ে ‘শান্ত টেসাডে’ সাজানো হয়েছিল। টেসাডের শান্তিময় ধরনের কোনো ট্রাইবই আসলে ফিলিপাইনে নেই, ছিলও না কখনোই। সত্তুরের দশকে ফিলিপাইনের একনায়ক ক্ষমতাশীন মার্কোস সরকারের পরিকল্পনায় ম্যানুয়েল এলিজাল্ডের কুকর্মে ইন্ধন যোগানো হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল ‘শান্ত টেসাডে’কে পুঁজি করে বহির্বিশ্বে ফিলিপাইনের ইমেজ বাড়ানো।

আসলে সংস্কৃতির বিভাজনের কথা ঢালাওভাবে সাহিত্য, সংস্কৃতিতে আর নৃতত্ত্বে উল্লিখিত হয় বটে, কিন্তু অনেক সময়ই দেখা যায় এই বিভাজন মোটেই বস্তুনিষ্ঠতার মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ হয় না। ব্যাপারটা নৃতত্ত্ববিদ আর সমাজবিদদের জন্য এক নিদারূন লজ্জার ব্যাপার। একটু লক্ষ করলেই দেখা যাবে, সংস্কৃতির যত বিভাজনই থাকুক না কেন, প্রত্যেক সংস্কৃতিতেই দেখা যায়, মানুষেরা অনেকটা একইভাবে রাগ অনুরাগ, হিংসা, ক্রোধ প্রকাশ করে থাকে। পশ্চিমা বিশ্বের আলো ঝলমলে তথাকথিত আধুনিক সভ্যতা থেকে শুরু করে পৃথিবীর আনাচে-কানাচে যত গহীন অরণ্যের যত নাম না জানা গোত্রের মধ্যেই অনুসন্ধান করা হোক না কেন দেখা যাবে নাচ, গান, ছবি আঁকার ব্যাপারগুলো সব সংস্কৃতিতেই কম বেশি বিদ্যমান। কেউ হয়তো গুহার পাথরে হরিণ শিকারের ছবি আঁকছে, কেউ পাথরে খোদাই করে মূর্তি বানাচ্ছে, কেউ নদীর ধারে বসে পাল তোলা নৌকাকে ক্যানভাসে উঠিয়ে আনছে, কেউবা আবার মাটির পটে গড়ে তুলছে অনবদ্য শিল্পকর্ম। সংস্কৃতির বিবিধ উপাদান যোগ হবার কারণে ব্যক্তি কিংবা সংস্কৃতিভেদে চিত্রকল্পের প্রকাশ ভঙ্গিতে হয়তো পার্থক্য আছে কিন্তু চিত্র প্রকাশের বিমূর্ত স্পৃহাটি সেই একই রকম থেকে যাচ্ছে। শুধু ছবি আঁকা নয়, নাচ-গানের ক্ষেত্রেও আমরা তাই দেখব। এক দেশে কেউ একতারা হাতে বাউল গান গেয়ে চলছে তো আরেকজন অন্য দেশে নিবিষ্ট মনে পিয়ানো বাজিয়ে চলছে। কেউবা চোখ মুদে সেতার বাজাচ্ছে তো কেউবা গিটার কিংবা কেউ সন্তুর। যে একেবারেই আলসে সে হয়তো পড়াশুনা করার টেবিলকেই ঢোল বানিয়ে তাল ঠুকছে রবীন্দ্র সংগীতের সাথে। এক সংস্কৃতিতে কেউ হয়তো ডিস্কো নাচ নাচছে, অন্য জায়গায় সেরকমই একজন কেউ ভরত নাট্যম, আরেক জায়গায় কেউ ল্যাটিন ফিউশন, কেউবা কোনো অচেনা ট্রাইবাল ড্যান্স। নাচের রকমফেরে কিংবা মুদ্রায় পার্থক্য থাকলেও সংস্কৃতি নির্বিশেষে নাচ-গানের অদম্য স্পাহাটি কিন্তু এক সার্বজনীন মানবপ্রকৃতিকেই উর্ধ্বে তুলে ধরছে। যুদ্ধের এবং যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহারের ব্যাপারটিও অনেকটা তাই কম হোক বেশি হোক প্রতিটি সংস্কৃতিতেই যুদ্ধের উপাদান কম বেশি আছে। কেউ বা যুদ্ধ করেছে লাঠি-সোটা দিয়ে, কেউ বা বল্লম দিয়ে, কেউ বা তীর ধনুক দিয়ে কিংবা কেউ বুমেরাং ব্যবহার করে, কেউবা। কামান বন্দুক ব্যবহার করে, কেউবা পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র বানিয়ে। আদিম গুহাচিত্রগুলোতেও দেখা যায় তীক্ষ্ণ সেসব অস্ত্র ব্যবহার করে আমাদের পূর্বপুরুষেরা পশু শিকার করেছে, কখনো বা হানাহানি মারামারি করেছে নিজেদের মধ্যেই। কাজেই কেউ যদি হঠাৎ এসে দাবি করে কোনো এক দেশের বিচিত্র সংস্কৃতিতে মানুষ এতোই শান্তিপ্রিয় যে তাদের ভাষাতে কিংবা সংস্কৃতিতে সহিংসতা, আগ্রাসন কিংবা সংঘর্ষসূচক কোনো শব্দই নেই, তাহলে নিঃসন্দেহে সেটা সার্বজনীনতার বিরুদ্ধে যাবে। কিন্তু সেরকম কিছু আদৌ পাওয়া যায়নি। বরং যারা বিভিন্ন সময়ে সেরকম এক্সোটিক কিছু দাবি করেছিলেন, তাদের দাবিই শেষ পর্যন্ত মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়েছে। উপরের শান্তিময় টেসাড়ে কিংবা স্যামোয়ার উদাহরণগুলো কিন্তু তারই প্রমাণ। এই ব্যাপারটির তাৎপর্য উপলব্ধি করেই ডোনাল্ড ব্রাউন তার ‘Human Universals’ গ্রন্থে বলেছেন[৬২]—‘It is the human universals not the differences that are truly intriguing’

বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, সংস্কৃতি ব্যাপারটা মানবসমাজের অনন্য বৈশিষ্ট্য হিসেবে গণ্য হলেও এটি কোনো গায়েবি পথে নয়, বরং অন্য সব কিছুর মতো জৈব বিবর্তনের পথ ধরেই উদ্ভূত হয়েছে (evolved biologically)[৬৩]। আমরা উপরে যে নাচ, গান, ছবি আঁকা, যুদ্ধসহ বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করেছি (যেগুলো মানব সভ্যতার যে কোনো সংস্কৃতিতেই খুঁজে পাওয়া যাবে ভিন্ন ভিন্ন অভিব্যক্তিতে), সেরকম অন্তত ৪০০টি বৈশিষ্ট্য স্টিভেন পিঙ্কার লিপিবদ্ধ করেছেন তার ব্ল্যাঙ্ক স্লেট বইয়ের পরিশিষ্টে[৬৪]। বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন এগুলো সবগুলোই অভিন্ন মানবপ্রকৃতির দিকেই ইঙ্গিত করে। বাহ্যিকভাবে যত পার্থক্যই আমরা দেখি না কেন, আসলে আমরা মানুষেরা এক অভিন্ন সংস্কৃতির অংশ। কারণ, আমাদের দেহ কাঠামোর মতো সংস্কৃতিও মোটা দাগে মানব বিবর্তনের অভিযোজনগত ফসল। ঠিক যেমন আমাদের হাত পা কিংবা অগ্ন্যাশয় তৈরি হয়েছে বংশাণু বা জিনের নিয়ন্ত্রণে, ঠিক তেমনি মানবসংস্কৃতিও তৈরি হয়েছে বংশাণুর দ্বারাই (বংশাণুর দ্বারা বলা হচ্ছে কারণ, দীর্ঘকালের বিবর্তনীয় প্রক্রিয়াতেই তৈরি হয়েছে মানব বংশাণু যা আবার মস্তিষ্কের গঠনের অবিচ্ছেদ্য নিয়ামক, আর সংস্কৃতি হচ্ছে সেই মানব মস্তিষ্কেরই সম্মিলিত অভিব্যক্তি)।

বাঘের যেমন নখর বিশিষ্ট থাবা আছে, ক্যাঙ্গারুর পেটে আছে থলি, ঠিক তেমনি মেরুভল্লুকের গায়ে আছে পুরু পশম। এই বৈশিষ্ট্যগুলো যেমন স্ব-স্ব প্রজাতির ক্ষেত্রে অনন্য বৈশিষ্টের দিকে নির্দেশ করে; ঠিক তেমনি মানবসমাজের জন্য অনন্য বৈশিষ্টের নিয়ামক হয়ে আছে মানবসংস্কৃতি। বাঘে বাঘে নখরের আকার আকৃতিতে পার্থক্য থাকলেও সেটা যেমন শেষ পর্যন্ত বাঘের নখরই, ঠিক তেমনি সংস্কৃতিতে কিছু বাহ্যিক ছোটখাট ভেদাভেদ থাকলেও সেটা শেষ পর্যন্ত অভিন্ন মানব সংস্কৃতিই। হ্যাঁ, শতধা বিভক্তি সত্ত্বেও মানব কালচারগুলো আসলে সম্মিলিতভাবে সার্বজনীন সংস্কৃতি বা কালচারাল ইউনিভার্সাল (Cultural Universal)-কেই উর্ধ্বে তুলে ধরে, অন্তত বিবর্তন মনোবিজ্ঞানীদের তাই অভিমত।

২০১০ সালের আগস্ট মাসে মুক্তমনা ব্লগে যখন আমার লেখাটা ‘সংস্কৃতির ভূত’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল, ঠিক একই সময় ড. নৃপেন্দ্র সরকারও একটি চমৎকার লেখা লিখেছিলেন–বিবর্তনের চোখে চোখের জল শিরোনামে। সেখানে তিনি ব্যথা বেদনা আর চোখের জলের বিবর্তনীয় উৎস খুঁজতে সচেষ্ট হপ্যেছিলেন[৬৫]। লেখায় সংস্কৃতিভেদে কান্নার উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, প্রিয়জনের মৃত্যুতে কান্নাকাটিতে হিন্দুদের জুড়ি নেই। কান্না চলবে দিনের পর দিন। কোনো কোনো হিন্দু সমাজে এই কান্না এক মাস পর্যন্ত দীর্ঘায়িত করা হয়। মাস শেষে শ্রাদ্ধ করে অফিসিয়ালি কান্নার ইতি দেওয়া হয়। হিন্দু কান্না এখানেও শেষ হয় না। গয়াতে পিণ্ড দেওয়ার সময় একবার। কাশীতেও একবার। সেই পিণ্ডদান একবছর পরেই হোক আর বার বছর পরেই হোক। বুক ভাঙবে, চোখে বৃষ্টির ধারা বইবে। কিন্তু ড. সরকার তার লেখাটিতে তিব্বতীদের মধ্যে এক গোত্রের উল্লেখ করেছিলেন যারা প্রিয়জনের মৃত্যুতে কাঁদে না, দেবতা রুষ্ট হবে এই ভয়ে। তারা নাকি চোখের জল শুকিয়ে ফেলে। অনেকের মনে হতে পারে, তিব্বতীদের এই ব্যাপারটা (যদি না ব্যাপারটা মার্গারেট মীড কিংবা ম্যানুয়েল এলিজাল্ডে জুনিয়রের মতো হোক্স কিছু হয়) সার্বজনীন সংস্কৃতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আসলে কিন্তু তা নয়। তারাও আমার আপনার মতো স্বজন হারার দুঃখে ব্যথিত হয়। হয়তো কল্পিত দেবতার শাস্তির ভয়ে প্রকাশ করে না, কিন্তু ব্যথা অনুভবের ব্যাপারটা থেকেই যায়। আমি লেখাটি মুক্তমনায় দেওয়ার পর ‘আবেগ বিশ্বজনীন, কিন্তু প্রকাশভঙ্গি ভিন্ন হতে পারে’ বলে সেটাই স্পষ্ট করেছেন মুক্তমনা ব্লগার জওশন আরা তার একটি মন্তব্যে[৬৬]–

আমাদের স্বাতন্ত্র্য পরিমাপ করি, পারিপার্শ্বিকতার সাপেক্ষে আমরা কতটুকু ভিন্ন ভাবে চিন্তা করি, কাজ করি, সেইটুকু বিচার করে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে আমরা ‘ইউনিভার্সাল হিউম্যান কালচারের’ বাইরে যাই না। কেবল বহুল প্রচলিতর চেয়ে ভিন্ন পন্থা অনুসরণ করি। স্বজন হারানোয় কে চল্লিশ দিন কাঁদল আর কে চোখ শুষ্ক করে রেখেছিল, সেগুলো কেবল মাত্র মানদণ্ড থেকে ভিন্নতার উদাহরণ। ভিত্তিভূমি হলো, স্বজন হারানোতে বিচ্ছেদ ব্যথা বা কষ্ট অনুভব করা। এইখানেই সার্বজনীনতা।

মানব সংস্কৃতি কোনো উদ্ভট কিংবা বিচিত্র সংস্কৃতির ভিন্ন ভিন্ন সমাবেশের জোড়াতালি দেয়া ফসল নয়, বরং, জৈবিক পথেই উদ্ভূত একটি অভিন্ন এবং সার্বজনীন মানব উপাদানের অংশ।

০৪. সখি, ভালোবাসা কারে কয়?

ডারউইন দিবস এবং ভালোবাসা দিবস

মুক্তমনায় আমরা প্রতি বছর ডারউইন দিবস পালন করি। সেই বিশেষ দিনটিতে চার্লস ডারউইন এবং তার যুগান্তকারী বিবর্তন তত্ত্বকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করার চেষ্টা করা হয়। হয়তো অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, এরকম ঘটা করে অজানা অচেনা দিনটিকে স্মরণ করার কারণ কী? কারণ আছে। আসলে পৃথিবীতে খুব কম বৈজ্ঞানিক ধারণাই কিন্তু জনসাধারণের মানসপটে স্থায়ীভাবে বিপ্লব ঘটাতে পেরেছে। পদার্থবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে কোপার্নিকাসের সৌরকেন্দ্রিক তত্ত্ব এমনি বিপ্লবী তত্ত্ব, তেমনি জীববিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ডারউইন আর রাসেল ওয়ালেস প্রস্তাবিত বিবর্তনতত্ত্ব। দার্শনিক ডেনিয়েল ডেনেট তার একটি বইয়ে বলেছিলেন[৬৭],

আমাকে যদি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ধারণাটির জন্য কাউকে পুরস্কৃত করতে বলা হয়, আমি নিউটন, আইনস্টাইনদের কথা মনে রেখেও নির্দ্বিধায় ডারউইনকেই বেছে। নেব।

কাজেই এমন যুগান্তকারী একটি তত্ত্ব, তার সঠিক উদযাপন না হলে কী চলে! বলা বাহুল্য, মুক্তমনাই প্রথমবারের মতো ডারউইন দিবসকে বাঙালি পাঠকদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবার দায়িত্বটুকু কাঁধে তুলে নিয়েছিল ২০০৬ সালে। আন্তর্জালের বাংলা ভাষাভাষী মানুষেরা সে বছর ডারউইন দিবস পালন করে প্রথমবারের মতো। এর পর থেকে প্রতি বছরই পালন করা হচ্ছে। সবচেয়ে বড় আকারে পালন করেছিলাম আমরা ২০০৯ সালে। কারণ ঐ বছরটাই ছিল ডারউইনের জন্মের দ্বিশতবার্ষিকী আর সেই সাথে তার জগদ্বিখ্যাত গ্রন্থ প্রজাতির উদ্ভব’ বা ‘অরিজিন অব স্পিশিজ-এর প্রকাশেরও দেড়শত বছর। এখন তো বাংলাদেশে বিজ্ঞান চেতনা পরিষদ, যুক্তিবাদী কাউন্সিল সহ বহু সংগঠনই ঘটা করে ডারউইন দিবস পালন করে, দিনব্যাপী আলচনা অনুষ্ঠান কিংবা র‍্যালির আয়োজন করে। বলা নিষ্প্রয়োজন, আমাদের জন্য ডারউইন দিবস ডারউইনের দীর্ঘ শশ্রুমন্ডিত মুখচ্ছবির কোনো স্তব ছিল না, বরং তাঁর যুগান্তকারী আবিষ্কারের যথাযথ স্বীকৃতি, তাঁর বৈজ্ঞানিক অবদানের প্রতি নির্মোহ আর বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

ডারউইন দিবস পালন করা হয় প্রতি বছর ১২ই ফেব্রুয়ারি। বাংলাদেশের প্রায় কেউই এই বিশেষ দিনটির সাথে পরিচিত না হলেও এর দু দিন পরের ১৪ই ফেব্রুয়ারি তারিখটির সাথে প্রায় সবাই পরিচিত। সেই যে ভ্যালেন্টাইন্স ডে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। এই ভালোবাসা দিবস কী, কিংবা কাহাকে বলে তা নিয়ে বোধ হয় বিশদ না বললেও চলবে। কারণ এ ব্যাপারটি কারোরই এখন অজানা কিছু নয়। কিন্তু যেটি অজানা তা হলো, এই ভালোবাসা দিবসের উদযাপিত ভালোবাসার সাথে ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্বের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা! এই অধ্যায়টি সেই ঘনিষ্ঠ প্রেমময় সম্পর্কেরই উন্মোচন।

গত বছর ২০১০ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি আমাদের মুক্তমনা সদস্য অপার্থিব একটি চমৎকার প্রবন্ধ লেখেন ‘ভালোবাসা ও বিবর্তন’ শিরোনামে[৬৮]। দুই দিবসের তাৎপর্যকে বিনি সুতার মালায় তিনি গাঁথলেন এক অনুপম ছন্দে। তিনি তার প্রবন্ধ শুরুই করলেন এই বলে–

রসকষহীন ডারউইন দিবসের পর আসে রসে ভরপুর ভালোবাসাদিবস প্রেমিকদের ডারউইন দিবসের কঠিন শীতল শিক্ষা থেকে রেহাই দিয়ে ভালোবাসার মিষ্টি আমেজের ছোঁয়া নিয়ে। দুটো দিবসের প্রায় একই সময় পালন করাটা হয়তো এক যোগসূত্রহীন কাকতালীয় ব্যাপার। ডারউইনের জন্মদিন আর রোমান পাদ্রী সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনেরমৃত্যুদিবসের মধ্যে কি যোগসূত্ৰই বা থাকতে পারে। কিন্তু ডারউইনের তত্ত্ব তথা বিবর্তনের সঙ্গে সত্যই ভালোবাসার এক গভীর যোগসূত্র আছে যা মোটেই কাকতালীয় নয়। ডারউইনের “প্রজাতির উৎস (Origin of Species)” আর “মানুষের উৎপত্তি (The Descent of man)” বই দুটি প্রকাশিত হবার পর থেকে আজ অবধি ডারউইনের সেই মূল তত্ত্বকে ভিত্তি করে ও নতুন সাক্ষ্য প্রমাণ আর পর্যবেক্ষণলব্ধ। জ্ঞান এর দ্বারা সেই তত্ত্বকে পরিশীলিত ও সংশোধিত করে মানবপ্রকৃতিকে বোঝার চেষ্টায় জীববিজ্ঞানীরা অনেক দূর এগিয়ে গেছেন। প্রেম কী?” “মানব নৈতিকতার উৎস কি? এ ধরনের সনাতন প্রশ্নগুলোর উত্তর এখন অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে আসছে সামাজিক-জীববিজ্ঞানী আর বিবর্তন মনোবিজ্ঞানীদের গবেষণার বদৌলতে, বিশেষ করে বিংশ শতকের শেষ দুই দশকে প্রখ্যাত গবেষকদের বিভিন্ন গবেষণা থেকে। তাঁদের গবেষণা মানব অনূভুতির সকল দিকেরই কারণ হিসেবে আমাদের বৈবর্তনিক ইতিহাসের দিকেই অঙ্গুলি নির্দেশ করে। অন্য সব অনুভূতির মতো প্রেমানুভূতির মূলও বিবর্তনে নিহিত।

অপার্থিব ভুল কিছু বলেননি। বিবর্তনের কল্যাণে প্রেম ভালোবাসার অন্তিম রহস্যগুলোর অনেক কিছুই এখন আমাদের হাতের মুঠোয়। তবে কিছু কথা আছে। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন যে, বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানীরা প্রেম শব্দটিকে কেবল আধো আধো প্লেটোনিক কিংবা স্বর্গীয় পরিমণ্ডলে আবদ্ধ না থেকে এটাকে অনেক ব্যাপক অর্থে ব্যবহার করেন। ফস্টি নস্টি কিংবা টক ঝাল মিস্টি ভালোবাসার অনুভুতির বাইরে আছে পারস্পরিক মনোদৈহিক আকর্ষণ। পাশাপাশি থাকে রাগ, অভিমান, ঈর্ষা। এর সাথে থাকে সঙ্গী নির্বাচনের কৌশল, আনন্দ, ভয়, ঘৃণা, বিচ্ছেদ এমনকি যৌনমিলনের উদগ্র আকাঙ্ক্ষাও।

শুরু করা যাক সেই চিরপুরাতন অথচ সদা নতুন প্রশ্নটি দিয়ে। প্রেম কী? শেক্সপিয়র তার একটি নাটিকায় তার সৃষ্ট চরিত্রের মুখ দিয়ে উচ্চারণ করিয়েছিলেন, “what ‘tis to love?[৬৯]। আমাদের কবিগুরু রবীন্দ্রনাথও তার একটি বিখ্যাত গানে একই ধরনের প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলেন[৭০]—

সখি, ভাবনা কাহারে বলে?
সখি, যাতনা কাহারে বলে?
তোমরা যে বলো দিবস-রজনী ‘ভালোবাসা’, ‘ভালোবাসা
সখি, ভালোবাসা কারে কয়!
সেকি কেবলি যাতনাময়।
সেকি কেবলই চোখের জল?
সেকি কেবলই দুখের শ্বাস?…

ভালোবাসা নিয়ে ইংরেজিতেও অনেক ধরনের গান আছে। এর মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় গানটি হচ্ছে–I’ll Never Fall in Love Again।[৭১] গানের কথাগুলো এরকমের–

What do you get when you fall in love?
A guy with a pin to burst your bubble
That’s what you get for all your trouble
I’ll never fall in love again
I’ll never fall in love again
What do you get when you kiss a girl
You get enough germs to catch pneumonia
After you do, she’ll never phone you
I’ll never fall in love again
I’ll never fall in love again

কিন্তু কবিগুরু যখন ‘সখি ভালোবাসা কাহারে বলে?” বলে গানে গানে প্রশ্ন করেছিলেন কিংবা শেক্সপিয়র তার নাটকের সংলাপ লিখেছিলেন, “what ‘tis to love?” বলে, তখন কি তারা একবারের জন্যও ভাবতে পেরেছিলেন তাঁদের এই প্রশ্নের উত্তর অপেক্ষা করছে তাঁদের মৃত্যুর অনেক পরে বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে? বিবর্তন মনোবিজ্ঞানসহ বিবর্তনের বিভিন শাখা থেকে পাওয়া প্রান্তিক জ্ঞানের বদৌলতে প্রেমের এক সন্তোষজনক ব্যাখ্যা কিন্তু দেয়া সম্ভব।

কিছুদিন আগেও আমরা ঢালাওভাবে বলে দিতাম ভালোবাসার কোনো সংজ্ঞা নেই, বিজ্ঞান ভালোবাসার কোনো ব্যাখ্যা দিতে অক্ষম ইত্যাদি। সেই দিন আর নেই। বিজ্ঞান এখন চোরের মতো সিঁদ কেটে ঢুকে পড়েছে ভালোবাসার গোপন কুঠুরিতে। চলুন আমরাও সে কুঠুরিতে পা রাখি…

.

কুদ্দুস সিমির প্রেম : নিশা লাগিলো রে…

কুদ্দুস ‘লবে’ পড়িয়াছে। তাহার মন উড়ু উড়ু। পড়ালেখায় মন নেই। বই খুললেই কেবল সিমির মুখ ভেসে উঠে। আনমনে গাইতে থাকে আগুনের গান–

ফিজিক্স কেমিস্ট্রিতে মন বসে না
বই খুললেই দেখি তার মুখখানা
অস্থির মন আর বাধা মানে না।
একা পথে চললেই পাশে চলে সে
নিবিড় হয়ে সে বলে সে মোরে
ভালোবাসি ভালোবাসি ..।

ক্যামন যেন ঘোরের মধ্যে থাকে কুদ্দুস সর্বক্ষণ। একটা পাখি দেখলে মনে হয়-ইস পাখির মতো ডানা মেলে যদি সিমির সাথে উড়ে বেড়ানো যেতো। একটা গোলাপ ফুল দেখলেই মনে হয়–আহা যদি সিমির হাতে তুলে দেয়া যেত! রাস্তার পাশে চটপটির গাড়ি দেখলে মনে হয়–আহা সিমির সাথে মিলে ফুচকা খাওয়া যেত!

না সিমির সাথে ফুচকা খাওয়া আর কুদ্দুসের হয়ে উঠে না। কারণ সিমি রাস্তার আজে বাজে জিনিস খায় না। সিমি মহা বড়লোকের মেয়ে। বসুন্ধরার আলিশান ফ্ল্যাটে থাকে। পাজেরো জিপে করে ভার্সিটিতে আসে। ড্রাইভার সাহেব দরজা খুলে দেয়, আর সিমি আলতো পায়ে গাড়ি থেকে নেমে সটান হাঁটা দেয় ক্লাসের দিকে। স্টিফেনি মেয়র কিংবা লিসি হ্যারিসনের ইংরেজি উপন্যাসের বই বগলে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। “হাবি জাবি পোলাপাইনরে’ পাত্তাই দেয় না সিমি। মোটের উপর সিমি জানেই না তার জন্য কোন এক মজনু দিওয়ানা!

আর ওদিকে তো মজনু কুদ্দুসের অবস্থা আসলেই কেরোসিন। সারাক্ষণই ঘোরের মধ্যে থাকে। মনে মনে আকাশ-কুসুম কল্পনা। ভাবে কোনোদিন হয়তো চলতে গিয়ে কিংবা সিঁড়ি ভেঙে নামতে গিয়ে সিমি উষ্টা খেয়ে পড়বে, স্টেফানি মেয়ারের বইগুলো বগল থেকে ছিটকে পড়ে যাবে, আর ঠিক সেসময়ই বীর পুরুষের মতো রঙ্গমঞ্চে আবির্ভাব ঘটবে নায়করাজ কুদ্দুসের। পড়ে যাওয়া বইগুলো কুড়িয়ে নিয়ে সিমির হাতে তুলে দিবে, সিমি প্রথম বারের মতো অবাক নয়নে তাকাবে কুদুসের দিকে, সে দৃষ্টিতে থাকবে আধো কৃতজ্ঞতা, আধো প্রেম, আর আধো রহস্যের ছোঁয়া…

নিশা লাগিলো রে,
বাঁকা দু’নয়নে নিশা লাগিলো রে …

কিন্তু সাতমন ঘিও পুড়ে না, আর সিমিও উষ্টা খায় না। আর কুদুসের প্রেমের শিকেও ছিঁড়ে না। কিন্তু ছিঁড়ে না ছিঁড়ে না বলেও শেষ পর্যন্ত ছিড়লো একদিন। ক্যামনে? ক্যামনে আর, এমনে

চোখ থাকলেই চোখাচোখি হবে।
হলো!
এখানেই শেষ হতে পারত–
না, প্রেম হয়ে গেল!

তা কুদ্দুস-সিমির প্রেম ক্যামনে হলো, আর তারপর আর কী কী হলো আমরা আর সেখানে এখন না যাই। আমরা বরং চিন্তা করি কুদুসের এই সদা ঘোর লাগা অবস্থার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা কী? এ নিয়ে রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতনামা নৃতত্ত্ববিদ হেলেন ফিশার এবং স্নায়ুচিকিৎসকলুসিব্রাউন, আর্থার অ্যারোন প্রমুখ বিজ্ঞানীরা প্রায় ৪০ জন প্রেমে পড়া ছাত্রছাত্রীদের উপর এক গবেষণা চালান[৭২]। তাদের গবেষণার ধরনটি ছিল এরকমের। প্রেমিক-প্রেমিকাঁদের সামনে তাদের ভালোবাসার মানুষটির ছবি রাখা হলো, এবং তাদের মস্তিষ্কের ফাংশনাল এমআরআই (fMRI) করা হলো। দেখা গেল, এ সময় তাদের মস্তিষ্কের ভেন্ট্রাল এবং কর্ডেট অংশ উদ্দিপ্ত হচ্ছে, আর সেখান থেকে প্রচুর পরিমাণে ডোপামিন নামক এক রাসায়নিক পদার্থের নিঃসরণ ঘটছে। অবশ্য কারো দেহে ডোপামিন বেশি পাওয়া গেলেই যে সে প্রেমে পড়েছে তানাও হতে পারে। আসলে নন-রোমান্টিক অন্যান্য কারণেও কিন্তু ডোপামিনের নিঃসরণ বাড়তে পারে। যেমন, গাঁজা কিংবা কোকেইন সেবন করলে। সেজন্যই আমরা অনেক সময়ই দেখি ভালোবাসায় আক্রান্ত মানুষদের আচরণও অনেকটা কোকেইনসেবী ঘোরলাগা অবস্থার মতোই টালমাটাল হয় অনেক সময়ই।

তবে ভালোবাসার এই রসায়নে কেবল ডোপামিনই নয় সেই সাথে জড়িত থাকে অক্সিটাইসিন, ভেসোপ্রেসিন সহ নানা ধরনের বিতিকিচ্ছিরি নামের কিছু হরমোন। বিজ্ঞানীরা বলেন, এই হরমোনগুলো নাকি ‘ভালোবাসা টিকিয়ে রাখতে’ মানে প্রেমিক প্রেমিকার বন্ধন দীর্ঘদিন জোরালো করে রাখতে সহায়তা করে। এমনকি বিজ্ঞানীরা এও বলেন কেউ মনোগামী হবে না বহুগামী হবে–তা অনেকটাই কিন্তু নির্ভর করছে এই হরমোনগুলোর তারতম্যের উপর। দেখা গেছে রিসেপটর বা গ্রাহক জিনে ভেসোপ্রেসিন হরমোনের আধিক্য থাকলে তা পুরুষের একগামী মনোবৃত্তিকে ত্বরান্বিত করে। বিজ্ঞানীরা প্রেইরি ভোলস আর মোন্টেইন ভোলস নামক দুই ধরনের ইঁদুরের উপর গবেষণা চালিয়ে তারা দেখেছেন, একগামিতা এবং বহুগামিতার মতো ব্যাপারগুলো অনেকাংশেই হরমোনের ক্রিয়াশীলতার উপর নির্ভরশীল। এমনকি বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম উপায়ে ভেসোপ্রেসিনের প্রবাহকে আটকে দিয়ে একগামী ইঁদুরকে বহুগামী, কিংবা অতিরিক্ত ভেসোপ্রেসিন প্রবেশ করিয়ে বহুগামী ইঁদুরকে একগামী করে ফেলতে সমর্থ হয়েছেন। তবে ইঁদুরের ক্ষেত্রে যেটা সত্য তার পুরোটুকু মানুষের ক্ষেত্রে সত্য কি না তা নিয়ে বিতর্ক করা যেতে পারে। অন্তত বহুগামী পুলপুরুষদের লোলুপতাকে কেবল ইঁদুরের মতো হরমোন চিকিৎসার সাহায্যে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বললে অধিকাংশই দ্বিমত করবেন।

আমরা না হয় কুদ্দুসের প্রেমময় সময়গুলোই বিশ্লেষণে আনি এই মুহূর্তে। কথা হচ্ছে তীব্র প্রেমের সময়গুলোতে কেন দিগবিদিকশূন্য নেশার ঘোর লাগা ভাবের উদয় হয়, কেন বুদ্ধিশুদ্ধি একেবারেই লোপ পায়? কেনই বা ভয়ভীতি উবে যায় রাতারাতি? এ সময় বন্ধুদের পরামর্শও মাথায় ঢোকে না। যদি কেউ কুদ্দুসকে বলতো ‘ঐ ব্যাটা কুদ্দুস সিমির পিছে অযথা ঘুইরা লাভ নাই, ওর জগৎ আর তোর জগৎ আলাদা…’ কুদ্দুসের মাথার দেওয়াল সেই তথ্য পৌঁছুবেই না। কিন্তু কেউ যদি আবার উলটো বলে যে, ‘সিমি আজকে তোর সম্বন্ধে জানতে চেয়েছিল … সাথে সাথেই কুদুসের মনে হবে এ যেন ‘মক্কা বিজয়’! আসলে তীব্রপ্রেমের সময়গুলোতে কেন মানুষজনের বুদ্ধিসুদ্ধি লোপ পায় তার একটা ভালো ব্যাখ্যা আছে বিজ্ঞানীদের কাছে। আমাদের মস্তিষ্কে অ্যামাগডালা বলে একটি বাদাম আকৃতির প্রত্যঙ্গ আছে। সেটা এবং মস্তিষ্কের কর্টেক্সের কিছু এলাকা আমাদের ভয়-ভীতি নিয়ন্ত্রণ করে, অকস্মাৎ বিপজ্জনক পরিস্থিতি এলে আমাদের আগাম সতর্ক করে দিতে পারে। দেখা গেছে প্রেমের রোমাঞ্চকর এবং উত্তাল সময়গুলোতে মস্তিকের এ এলাকাগুলোর কাজ একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ভয় ভীতি কিংবা ক্রিটিকালি’ চিন্তা করার ব্যাপারস্যাপারগুলো পুরোপুরি লোপ পায় তখন। দুমুখেরা বলে, বেশি পরিমাণে গাঁজা-ভাং খেলেও নাকি ঠিক এমনটিই হয়।

.

বিবর্তন ও প্রেম

কুদ্দুসের এই কোকেইন মার্কা প্রেমানুভূতির মূল উৎস বা কারণ কী তাহলে? উত্তরটা কিন্তু খুব সোজা। ঘুরে ফিরে সেই একই ব্যাপার, যা বিবর্তনের একেবারে গোড়ার কথা বংশাণু রক্ষার তাগিদ বা নিজের জিনকে টিকিয়ে রাখার অবচেতন প্রয়াস। আসলে প্রতিলিপি, পরিব্যক্তি এবং প্রকারণের সমন্বয়ে গঠিত প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটা বিবর্তন শুধু প্রেমানুভূতিই নয়, বস্তুত এটি ক্ষুধা, তৃষ্ণা, কামনা, বাসনা, প্রণয়, আকাঙ্ক্ষা সহ মানুষের সব ধরনের অনুভূতি ও আচরণেরই জন্ম দেয়।

আসলে বংশাণু রক্ষার জন্য যে কোনো প্রাণী অন্তত দুটি কাজ সুচারুভাবে করতে চায়। এক প্রজননক্ষম বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকতে চায়, আর দুই সঠিক যৌনসঙ্গী নির্বাচনের মাধ্যমে নিজের বংশাণু পরবর্তী প্রজন্মে ছড়িয়ে দিতে চায়। সঠিক সঙ্গী নির্বাচন করাটা এক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং এটিই প্রধানত প্রণয়াকাঙ্ক্ষার মূল উপলক্ষ্য হিসেবে কাজ করে। ডারউইন নিজেও ব্যাপারগুলো নিয়ে অনেক চিন্তা করেছিলেন এবং তিনি প্রাকৃতিক নির্বাচনের (Natural Selection) পাশাপাশি যৌনতার নির্বাচন (Sexual Selection)কেও যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছিলেন। না দিয়ে তো উপায় ছিল না। ডারউইন লক্ষ করেছিলেন যে, প্রাণী জগতে বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য পাওয়া যাচ্ছে যা কেবল প্রাকৃতিক নির্বাচন দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। কারণ এ বৈশিষ্ট্যগুলো প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফলশ্রুতিতে টিকে থাকার কথা নয়। এগুলো টিকে আছে, কারণ এই বৈশিষ্ট্যগুলো বিপরীত লিঙ্গের যৌনসঙ্গীর দ্বারা বংশপরম্পরায় দিনের পর দিন আদৃত হয়েছে। একটি ক্লাসিক উদাহরণ হচ্ছে পুরুষ ময়ূরের দীর্ঘ পেখম থাকার উদাহরণ। এমন নয় যে দীর্ঘ পেখম পুরুষ ময়ুরকে প্রকৃতিতে টিকে থাকতে কোনো। বাড়তি উপযোগিতা দিয়েছিল। বরং দীর্ঘ পেখম স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহতই করার কথা, এবং করেছে। তাই প্রাকৃতিক নির্বাচনের সাহায্যে ময়ুরের দীর্ঘ পেখমকে ব্যাখ্যা করা যায় না। দীর্ঘ পেখম ময়ুরদের জন্য চরম অসুবিধাজনক। দীর্ঘ পেখম থাকলে দৌঁড়াতে অসুবিধা হয়, শিকারিদের চোখয়ে পড়ার সম্ভাবনাও থাকে বেশিমাত্রায়। কাজেই টিকে থাকার কথা বিবেচনা করলে দীর্ঘ পেখম ময়ূরের জন্য কোনো বাড়তি উপযোগিতা দেয়নি বিবর্তনের পথ পরিক্রমায়। দীর্ঘ পেখম টিকে গেছে মূলত নারী ময়ূর বা ময়ুরীর পছন্দকে প্রাধান্য দিয়ে। পুরুষ ময়ূরের লম্বা পেখমকে ভালো বংশাণুর নির্দেশক হিসেবে দেখত ময়ূরীরা। কাজেই দীর্ঘ পেখমের ঢেউ তোলা সুশ্রী ময়ুরেরা যৌনসঙ্গী হিসেবে নির্বাচিত হতে পেরেছিল, কারণ বিপরীত লিঙ্গের যৌনসঙ্গীদের কাছে তারা ছিল একেকজন ‘ব্রাড পিট’ কিংবা টম ক্রুজ! তারাই শেষপর্যন্ত নির্বাচিত হয়েছিল ময়ূরীদের যৌনাকর্ষণের ভিত্তিতে[৭৩]।

চিত্র। পেজ ৭৪

চিত্র : ময়ূরের দীর্ঘ পেখম টিকে আছে মূলত নারী ময়ূর বা ময়ূরীর পছন্দ তথা যৌনতার নির্বাচনকে প্রাধান্য দিয়ে।

মোটা দাগে, যৌনতার নির্বাচন কোনো বাড়তি সুবিধা দেয় না প্রজাতির বেঁচে থাকায়। এগুলো কেবলই গয়নাগাটির মতো ‘অর্নামেন্টাল প্রোডাক্ট। ময়ূরের পেখমের মতো মানবসমাজেও অনেক বৈশিষ্ট্য আছে যেগুলো অর্নামেন্টাল বা অলংকারিক। কবিতা লেখা, গান করা থেকে শুরু করে গল্প বলা, আড্ডা মারা, গসিপ করা, ভাস্কর্য বানানো প্রভৃতি হাজারো বৈশিষ্ট্য মানবসমাজে দেখা যায় যেগুলো স্রেফ অলংকারিক–এগুলো বেঁচে থাকায় কোনো বাড়তি উপাদান যোগ করেনি, কিন্তু এগুলো টিকে গেছে যৌন নির্বাচনের প্রেক্ষিতে পছন্দ অপছন্দকে গুরুত্ব দিয়ে।

এই ‘মেটিং সিলেকশনের’ মায়াবী খেলা চলে কম-বেশি সব প্রাণীর মধ্যেই। স্তন্যপায়ী প্রাণীর প্রায় সব প্রজাতিতেই দেখা যায় পুরুষেরা সাধারণত অনেক বড় এবং বলশালী হয়, সেই সাথে দেখা যায় অনেক আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্যের সমাহার (যেমন, উজ্জ্বল রঙ, শিং, কেশর, দ্রুতগামিতা, ক্ষিপ্রতা, নৃত্য এবং সংগীতে পারদর্শিতা ইত্যাদি)। মানুষও এর ব্যতিক্রম নয়। বড় চুল রাখা, দামি সানগ্লাস, কেতাদুরস্ত কাপড় পরা থেকে শুরু করে দামি গাড়ি, বাড়ি, শিক্ষা, বাকচাতুর্য, প্রতিভা, নাচ, গান, বুদ্ধিমত্তা সবকিছুই মানুষ কাজে লাগায় বিপরীত লিঙ্গকে আকর্ষণের কাজে। মানবসমাজের নারীপুরুষের বহু বৈশিষ্ট্য এবং অভিব্যক্তিই মোটাদাগে সম্ভবত যৌনতার নির্বাচনের ফল। আমি মুক্তমনা ব্লগে বেশ কিছু যৌনতার নির্বাচনের গুরুত্ব তুলে ধরে বেশ কিছু লেখা আগে লিখেছি[৭৪,৭৫]; সংশপ্তক কিছুদিন আগে মেটিং সিলেকশনে পুরুষের নাচের গুরুত্ব তুলে ধরে একটি চমৎকার প্রবন্ধ লিখেছিলেন মুক্তমনায় পুরুষের নৃত্য এবং নারী’ শিরোনামে[৭৬]। এগুলো সবই মানবসমাজে যৌনতার নির্বাচনের গুরুত্বকে সুচারুভাবে তুলে ধরে। অপার্থিব তার ‘ভালোবাসা ও বিবর্তন’ (পূর্বোক্ত) লেখায় লীন মাগুলিস ও ডরিয়ান সেগান “Mystery Dance: On the Evolution of Human Sexuality” বই থেকে একটি চমৎকার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন–

“প্রযুক্তি কিংবা সভ্যতা আমাদেরকে আমাদের পশুত্ব থেকে খুব দূরে সরাতে পারেনি, বরং তা আরও জোরাল ভাবে সেটা অধিষ্ঠিত করেছে। সৌখিন চশমা, স্কন্ধালঙ্কার ইত্যাদি যেন অনেকটা ময়ূরের পুচ্ছের মতোই। “

যৌনতার নির্বাচন আমাদের মানসপটে কাজ করে বলেই কারো সুন্দর চেহারা কিংবা মনোহারী ব্যক্তিত্ব দেখলে আমরা সবাই মনের অজান্তেই আন্দোলিত হয়ে উঠি। বঙ্কিমচন্দ্র যে একসময় বলেছিলেন, ‘সুন্দর মুখের জয় সর্বত্র ব্যাপারটা কিন্তু মিথ্যে নয় একেবারে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ কিংবা সংস্কৃতিভেদে সবাই বিপরীত লিঙ্গের যে বৈশিষ্ট্যগুলোকে আকর্ষণীয় বলে মনে করে সেগুলো হলো–পরিষ্কার চামড়া এবং প্রতিসাম্যময় মুখ, পরিষ্কার চোখ, সুন্দর এবং সুগঠিত দাঁত, সতেজ এবং সুকেশী চুল এবং চেহারার গড়পড়তা। সুন্দর চামড়া[৭৭]  (Unblemished skin), স্বচ্ছ চোখ (clear eyes), সুন্দর এবং সুগঠিত দাঁত (intact teeth), সতেজ এবং সুকেশী চুল (luxuriant hair) কেন পছন্দনীয় তা বোঝা কঠিন কিছু নয়। এগুলো তারুণ্য, সুস্বাস্থ্য এবং সর্বোপরি প্রজনন ক্ষমতার বাহ্যিক প্রকাশ ছিল আমাদের আদিম পূর্বপুরুষদের কাছে। একই ব্যাপার খাটে প্রতিসাম্যময় মুখের (symmetrical face) ক্ষেত্রেও। এ ধরনের সুগঠিত চেহারা বিপরীত লিঙ্গের কাছে প্রমাণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল যে তার পছন্দনীয় মানুষটি অপুষ্টির শিকার নয়, কিংবা জীবাণু কিংবা পরজীবীদের আবাসস্থল নয়। অর্থাৎ এ বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল বংশাণু টিকিয়ে রাখার প্রয়াসে সঠিক যৌনসঙ্গী নির্বাচনের একধরনের ‘সফল মার্কার।

চেহারার গড়পড়তা ব্যাপারটা সাদা দৃষ্টিতে বিভ্রান্তিকর মনে হতে পারে। কেন গড়পড়তা চেহারাকে আকর্ষণীয় বলে মনে হবে? এটা মনে হয় কারণ, ‘গড়পড়তা চেহারা একটা বিশেষ ব্যাপারকে তুলে ধরে। সেটা হচ্ছে ‘জেনেটিক ডাইভার্সিটি বা বংশানুক্রমিক বৈচিত্র্য। এই বৈচিত্র্য বজায় থাকা মানে বাহক অধিকতর রোগ প্রতিরোধে সক্ষম এবং প্রতিকূল পরিবেশে সহজে অভিযোজিত হবার ক্ষমতা সম্পন্ন বলে ধরে নেওয়া হয়। আসলে আমরা যে গড়পড়তা চেহারাকে ‘সুন্দর’ বলে রায় দেই, তা বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন একটি ছোট পরীক্ষার মাধ্যমে। নির্বিচারে ১০ টি চেহারা নিয়ে ফটোশপ কিংবা কোনো প্রফেশনাল সফটওয়্যারে চেহারাগুলো মিশ্রিত (blend) করে উপস্থাপন করলে সেটিকে অধিকতর আকর্ষণীয় বলে মনে হয়। নীচের ছবিটি লক্ষ করুন। প্রথম দুটো ছবিকে মিশ্রিত করে তৃতীয় ছবিটি তৈরি করা হয়ছে। মনঃস্তাত্বিক জরিপে অধিকাংশ লোকই তৃতীয় ছবিটিকে অন্য দুটো ছবির চেয়ে অধিকতর আকর্ষণীয় বলে রায় দেয়!

চিত্র। পেজ ৭৬

চিত্র : যখন একাধিক আসল চেহারাকে মিশ্রিত করে গরপরতা চেহারাতে পরিণত করা হয়, সেটি অধিকাংশ মানুষের চোখে আকর্ষণীয় হয়ে উঠে।

তবে যৌনতার নির্বাচন শুধু অভিন্ন মানবপ্রকৃতি গঠন করেছে ভাবলে কিন্তু ভুল হবে। বহুক্ষেত্রেই এটি পার্থক্য সূচিত করেছে নারী পুরুষের পছন্দ-অপছন্দে। অভিন্ন কিছু বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি যৌনতার নির্বাচন আবার কাজ করেছে নারী-পুরুষের পার্থক্যসূচক মানসজগৎ তৈরিতেও পলে পলে একটু একটু করে। আসলে সত্যি বলতে কি যৌনতার নির্বাচনকে পুঁজি করে পুরুষ যেমন গড়েছে নারীকে, তেমনি নারীও গড়েছে পুরুষের মানসপটকে। এক লৈঙ্গিক বৈশিষ্ট্যগুলোর আবেদন তৈরি করেছে আরেক লিঙ্গের চাহিদা। তৈরি এবং ত্বরান্বিত হয়েছে বিভিন্ন লিঙ্গ-ভিত্তিক নানা পছন্দ অপছন্দ। পুরুষ দীর্ঘকাল ধরে যুদ্ধবিগ্রহের মধ্য দিয়ে নিজেকে নিয়ে গেছে বলে স্বভাবে হয়ে উঠেছে অনেক সহিংস। আবার নারীরাও একটা সময় পুরুষদের এই সহিংসতাকে প্রশ্রয় দিয়েছে, কারণ এ ধরনের পুরুষেরা নিজ নিজ ট্রাইবকে রক্ষা করতে পারত বহিঃশত্রুর হাত থেকে। এ ধরনের সমর দক্ষ পুরুষেরা ছিল সবার হার্টথ্রব এরা দিয়েছিল নিজের এবং পরিবারের জন্য বাড়তি নিরাপত্তা। এ ধরনের সাহসী পুরুষেরা নিজেদের জিন ছড়াতে পেরেছে অনেক সহজে, আমার মতো কাপুরুষদের তুলনায়! ফলে নারীরাও চেয়েছে তার সঙ্গীটি কাপুরুষ না হয়ে সাহসী হোক, হোক বীরপুরুষ! এই ধরনের চাহিদার প্রভাব এখনও সমাজে দৃশ্যমান। ডেট করতে যাওয়ার সময় কোনো নারীই চায় না তার সঙ্গী পুরুষটি উচ্চতায় তার চেয়ে খাটো হোক। সম্পর্ক রচনার ক্ষেত্রে এ যেন এক অলিখিত নিয়ম, শুধু আমেরিকায় নয়, সব দেশেই! বাংলাদেশে বিয়ে করতে গেলে পাত্রের উচ্চতা বউয়ের উচ্চতার চেয়ে কম দেখা গেলেই আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে গাই-ই শুরু হয়ে যায় মুহূর্তেই। খাটো স্বামীকে বিয়ে করতে হলে স্ত্রীরও মনোকষ্টের সীমা থাকে না। হাই হিল জুতো আর তার পরা হয়ে ওঠে না। আসলে দীর্ঘদিনের বিবর্তনীয় প্রভাব মানসপটে রাজত্ব করার কারণেই এটি ঘটে। লম্বা চওড়া জামাই সবার আদরনীয়, কারণ একটা সময় লম্বা চওড়া স্বাস্থ্যবান এই সব পূর্বপুরুষেরা রক্ষা করতে পেরেছিল স্বীয় গোত্রকে, রক্ষা করেছিল উত্তরপুরুষের জিনকে অন্যদের তুলনায় অনেকে ভালোভাবে। সেই আদিম মানসপট আধুনিক মেয়েদের মনে রাজত্ব করে তাদের অজান্তেই!

আবার পুরুষদের মানসজগতেও নারীদেহের কিছু বৈশিষ্ট্য নিয়ে উদগ্র আগ্রহ দেখা যায় সম্ভবত বিবর্তনীয় তথা যৌনতার নির্বাচনের মাধ্যমে মানসপট তৈরি হবার কারণেই। যে কোনো দেশের সাহিত্যের পাতা উল্টালেই দেখা যাবে– নারীর পিনোন্নত স্তন, সুডৌল নিতম্ব আর ক্ষীণ কটিদেশ নিয়ে যুগের পর যুগ কাব্য করেছে পুরুষ সকল সংস্কৃতিতেই। কারণ নারীদেহের এই বৈশিষ্ট্যগুলোই সকল পুরুষের কাছে মহার্ঘ্য বস্তু। কিন্তু কেন? কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা বলেন, আদিম সমাজে পুরুষদের কাছে বৃহৎ স্তন এবং নিতম্বের মেয়েরা অধিকতর আদৃত ছিল প্রাকৃতিক কারণেই। বিপদসঙ্কুল জঙ্গুলে পরিবেশে মেয়েদের বাচ্চা কোলে নিয়ে পুরুষদের সাথে ঘুরতে হতো। এলাকায় খাদ্যস্বল্পতা দেখা দিলে বাচ্চাকে বুকের দুধ খাইয়ে দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখতে হতো। অতি আধুনিক কালের কৃষিবিপ্লবের কথা বাদ দিলে মানুষকে আসলেই শতকরা নব্বই ভাগ সময় যুদ্ধ করতে হয়েছে খাদ্যস্বল্পতার বিরুদ্ধে। যে নারী দীর্ঘদিন খাদ্যস্বল্পতার প্রকোপ এড়িয়ে বুকের দুধ খাইয়ে বাচ্চাকে বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছে, তারা টিকে গেছে অনেক বেশি হারে। কাজেই কোনো নারীর বৃহৎ স্তন পুরুষদের কাছে প্রতিভাত হয়েছে ভবিষ্যত-প্রজন্মের জন্য ‘অফুরন্ত খ্যাদ্যের ভাণ্ডার হিসেবে। এ এক অদ্ভুত বিভ্রম যেন। এই বিভ্রম দীর্ঘদিন ধরে পুরুষকে করে তুলেছে পুখুল স্তনের প্রতি আকর্ষিত। তারা লালায়িত হয়েছে, লুব্ধ হয়েছে–এ ধরনের দৈহিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন নারীর সাথে সম্পর্ক করতে উদ্বুদ্ধ হয়েছে। জৈবিক তাড়নায়। ঠিক একই ভাবে, বহিঃশত্রু যখন আক্রমণ করেছে তখন যে নারী বাচ্চাকে কোলে নিয়ে দৌড়ে বাঁচতে পেরেছে, তাদের জিন রক্ষা পেয়ছে অনেক সহজে। এই পরিস্থিতির সাথে তাল মিলাতে গিয়ে নারীর কোমড় হয়েছে ক্ষীণ, আর নিতম্ব হয়েছে সুদৃঢ়। আর এ বৈশিষ্ট্যগুলো পুরুষদের কাছে হয়ে উঠেছে অনেক বেশি আদরণীয়।

নারীর সুদৃঢ় নিতম্বের প্রতি পুরুষদের আগ্রহের অবশ্য আরও একটি বড় কারণ আছে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন বিগত পাঁচ মিলিয়ন বছরে মানুষের মস্তিষ্কের আকার বৃদ্ধি পেয়েছে অবিশ্বাস্য দ্রুততায়। ফলে এটি বাচ্চার জন্মের সময় তৈরি করেছে জন্মসংক্রান্ত জটিলতার। এই কিছুদিন আগেও সারা পৃথিবীতেই বাচ্চা জন্ম দিতে গিয়ে মারা যাওয়া মায়েদের সংখ্যা ছিল খুবই উদ্বেগজনকভাবে বেশি। আজকের দিনের সিসেক অপারেশন এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতি এই জটিলতা থেকে নারীকে অনেকটাই মুক্তি দিয়েছে। কিন্তু আদিম সমাজে তো আর সি-সেকশন বলে কিছু ছিল না। ধারণা করা হয়, সভ্যতার উষালগ্নে ক্ষীণ নিতম্ববিশিষ্ট নারীদের মৃত্যু অনেক বেশি হয়েছে বড় মাথাওয়ালা বাচ্চার জন্ম দিতে গিয়ে। টিকে থাকতে পেরেছে সুডৌল এবং সুদৃঢ় নিতম্ব-বিশিষ্ট মেয়েরাই। কারণ তারা অধিক হারে জন্ম দিতে পেরেছে স্বাস্থ্যবান শিশুর। ফলে দীর্ঘদিনের এই নির্বাচনীয় চাপ তৈরি করেছে। নারী দেহের সুদঢ় নিতম্বের প্রতি পুরুষতান্ত্রিক উদগ্র কামনা!

চিত্র। পেজ ৭৯

চিত্রঃ অধ্যাপক দেবেন্দ্র সিংহ তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, কোমর এবং নিতম্বের অনুপাত মোটামুটি ০.৭ এর মধ্যে থাকলে তা তৈরি করে মেয়েদের ‘classic hourglass figure’, এবং এটি পুরুষদের মনে তৈরি করে আদি অকৃত্রিম যৌনবাসনা।

পুরুষের চোখে নারীর দেহগত সৌন্দর্যের ব্যাপারটাকে এতদিন পুরোপুরি “সাংস্কৃতি ব্যাপার বলে মনে করা হলেও আমেরিকার টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক দেবেন্দ্র সিংহ তার গবেষণা থেকে দেখিয়েছেন যে, সংস্কৃতি নির্বিশেষে নারীর কোমর এবং নিতম্বের অনুপাত ০.৬ থেকে ০.৮ মধ্যে থাকলে সার্বজনীনভাবে আকর্ষণীয় বলে মনে করে পুরুষেরা। অধ্যাপক সিংহের মতে মোটামুটি কোমর নিতম্ব = ০.৭ এই অনুপাতই তৈরি করে মেয়েদের ‘classic hourglass figure’, যা পুরুষদের মনে তৈরি করেছে আদি অকৃত্রিম যৌনবাসনা। সংস্কৃতি নির্বিশেষে এই উপাত্তের পেছনে সত্যতা পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়[৭৮]। সম্প্রতি পোলিশ একটি গবেষণা থেকে জানা গিয়েছে যে, সুডৌল স্তন, সরু কোমড় এবং হৃষ্ট নিতম্ব মেয়েদের সর্বচ্চ উর্বরতা প্রকাশ করে, যার পরিমাপ পাওয়া গেছে দুটো প্রধান যৌনোদ্দীপক হরমোনের (17-B-estradiol & progesterone) আধিক্য বিশ্লেষণ করে[৭৯]। পুরুষের মনে প্রথিত হওয়া যৌনোদ্দীপক কোমর/নিতম্বের অনুপাত আসলে তারুণ্য, গর্ভধারণক্ষমতা (Fertility) এবং সাধারণভাবে সুসাস্থ্যের প্রতীক। কাজেই এটিও পুরুষের কাছে প্রতিভাত হয় এক ধরনের ‘ফিটনেস মার্কার হিসেবে। বিবর্তন মনোবিজ্ঞানী ভিক্টর জন্সটন তাঁর “Why We Feel? The Science of Emotions’ বইয়ে বলেন যে মেয়েদের কোমর ও নিতম্বের অনুপাত ০.৭ হলে এন্ড্রোজেন ও এস্ট্রোজেন হরমোনের যে অনুপাত গর্ভধারণের জন্য সবচেয়ে অনুকুল সেই অনুপাতকে প্রকাশ করে। এরকম আরেকটি নিদর্শক হলো সুডৌল ওষ্ঠ। সেজন্যই গড়পড়তা পুরুষেরা এঞ্জেলিনা জোলি কিংবা ঐশ্বরিয়া রাইয়ের পুরুষ্টু ওষ্ঠ ছবিতে দেখে লালায়িত হয়ে ওঠে। কাজেই দেখা যাচ্ছে সৌন্দর্যের উপলব্ধি কোনো বিমূর্ত ব্যাপার নয়। এর সাথে যৌন আকর্ষণ এবং সর্বোপরি গর্ভধারণক্ষমতার একটা গভীর সম্পর্ক আছে, আর আছে আমাদের দীর্ঘদিনের বিবর্তনীয় পথপরিক্রমার সুস্পষ্ট ছাপ।

.

বর্ণে গন্ধে ছন্দে গীতিতে হৃদয়ে দিয়েছ দোলা

শচীন দেব বর্মনের গাওয়া আমার একটা খুব প্রিয় গান আছে। গানটির কথাগুলোর সাথে অবশ্য অনেকেই পরিচিত (এখানে একটি কথা বলে রাখি, গানটির গীতিকার কিন্তু হলেন মীরা দেব বর্মন; শচীন কর্তার স্ত্রী![৮০])–

বর্ণে গন্ধে ছন্দে গীতিতে
হৃদয়ে দিয়েছ দোলা
রঙেতে রাঙিয়া রাঙাইলে মোরে
একি তব হোলি খেলা।
তুমি যে ফাগুন রঙেরও আগুন
তুমি যে রসেরও ধারা।
তোমার মাধুরী তোমার মদিরা
করে মোরে দিশাহারা
মুক্তা যেমন শুক্তিরও বুকে
তেমনি আমাতে তুমি
আমার পরানে প্রেমের বিন্দু
তুমিই শুধু তুমি …

প্রেমের কথা বলতে গেলে গন্ধের কথা আলাদাভাবে বলতেই হবে। আমাদের ইন্দ্রিয়গুলোর মধ্যে গন্ধের অনুভূতিই সম্ভবত সবচেয়ে প্রাচীন। এমনকি এককোষী ব্যাকটেরিয়া পর্যন্ত কেবল ‘গন্ধ শুকে বুঝতে পারে কোন খাবারটা পুষ্টিকর আর কোনটা তাদের জন্য মরণবিষ। এখন দেখা যাচ্ছে শুধু খাদ্যদ্রব্য শোকাই নয় যৌনতার পছন্দ অপছন্দের ক্ষেত্রে কিংবা যৌনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রেও গন্ধ খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইঁদুর, বিড়াল, কুকুরসহ অধিকাংশ স্তন্যপায়ী প্রাণীই বেঁচে থাকা কেবল নয়, যৌনসম্পর্কের ব্যাপারেও অনেকাংশে নির্ভরশীল থাকে গায়ের গন্ধের উপর। আসলে যৌনতার নির্বাচনের এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বলে মনে করা হয় শরীরের গন্ধকে। আমাদের প্রত্যেকের আঙুলের ছাপ যেমন আলাদা, তেমনি আমাদের প্রত্যেকের শরীরের গন্ধও আলাদা, যা অবচেতন মনেই সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। বিজ্ঞানীরা বলেন, গন্ধের এই তথ্যগুলো জীবদেহে লিপিবদ্ধ থাকে এক ধরনের জিনের মধ্যে, যার নাম ‘হিস্টোকম্পিট্যাবিলিটি কমপ্লেক্স জিন’ বা সংক্ষেপে MHC gene[৮১]।

বিজ্ঞানীরা অবশ্য জিনের পাশাপাশি গন্ধ পরিবহনের পিছনে এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থেরও ভূমিকা খুঁজে পেয়েছেন সেটাকে ফেরোমোন (Pheromone) বলে তারা অভিহিত করেন। এই ফেরোমোন নার্ভ জিরো’ নামে এক ধরনের করোটিক স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে সঞ্চালিত হয়ে প্রাণিজগতে সঙ্গী নির্বাচন এবং প্রজননকে ত্বরান্বিত করে বলে ধারণা করা হয়[৮২]। দেখা গেছে গন্ধের উপর নির্ভর করে অনেক প্রাণীই লিঙ্গ চিহ্নিতকরণ, সামাজিক পদমর্যাদা, অঞ্চল, প্রজননগত অবস্থানসহ অনেক কিছু নির্ণয় করতে পারে। যেমন, ১৯৫৯ সালে ইঁদুরের উপর হিল্ডা ব্রুসের একটি গবেষণা[৮৩] থেকে পাওয়া গেছে যে, সঙ্গমের পর যদি কোনো ইঁদুর অরচিত কোনো ইঁদুরের গন্ধের খোঁজ পায়, তাহলে তার জরায়ুতে ভ্রুণ প্রতিস্থাপিত না হয়ে ঝরে পড়ে। কিন্তু পরিচিত বা পছন্দের সঙ্গীর গন্ধ গর্ভধারণে কখনো বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। তার মানে ফেরোমোনের সাহায্যে পছন্দের সঙ্গীর মাধ্যমে গর্ভধারণ নিশ্চিত করতে কিংবা বাতিল করতে পারে এ ধরনের ইঁদুরেরা।

২০০৬ সালে নোবেল জয়ী বিজ্ঞানী লিন্ডা বাক এবং তার সহযোগী সিয়াটলের একটি ক্যান্সার রিসার্চ সেন্টারে গবেষণারত অবস্থায় নতুন গ্রাহক প্রোটিনের পরিবারের ১৫টি সদস্যকে সনাক্ত করতে সমর্থ হন। ইঁদুরের নাকে খুঁজে পাওয়া এই গ্রাহকগুলো ফেরোমোনকে সনাক্ত করতে পারে বলে প্রমাণিত হয়েছে।

প্রাণিজগতে ফেরোমোনের ভূমিকা খুব ভালোভাবে প্রমাণিত হলেও মানুষের মধ্যে এর সরাসরি সম্পর্ক যে খুব জোরালো সেটা কিন্তু এখনও বলা যাবে না[৮৪]। আসলে অন্য প্রাণীরা তাদের বেঁচে থাকা এবং সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে গন্ধের উপর খুব বেশি মাত্রায় নির্ভরশীল হলেও বিবর্তনের ক্রমধারায় গন্ধের উপযোগিতা এবং গুরুত্ব মানব প্রজাতিতে কমে এসেছে। মানুষ তার দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণেন্দ্রিয় কিংবা বুদ্ধিমত্তার উপর যেভাবে নির্ভর করে, ঠিক তেমনভাবে গন্ধের উপর নয়। তারপরেও বিজ্ঞানীরা মনে করেন, আমাদের ঘাণজ আবরণীকলায় (olfactory epithelium) এখনও প্রায় ৩৪৭টি ভিন্ন ধরনের সংবেদনশীল নিউরনের অস্তিত্ব আছে। এই নিউরনগুলো ভিন্ন ভিন্ন গন্ধ সনাক্ত করতে পারলেও আমাদের মাথায় বহুসময়েই গন্ধগুলো মিশ্রিত হয়ে উপস্থাপিত হয়, অন্য প্রাণীদের ক্ষেত্রে যেটা আলাদাই থাকে। লিন্ডা বাক ইঁদুরের ক্ষেত্রে যে সমস্ত ফারমোনের গ্রাহক জিনে খুঁজে পেয়েছিলেন, তার অন্তত ছয়টি মানুষের মধ্যেও আছে।

চিত্র। পেজ ৮২

চিত্রঃ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডর্মে কিংবা ছাত্রী আবাসে একই কক্ষে একাধিক ছাত্রীরা বেশ কিছুদিন ধরে অবস্থান করলে তাদের রজঃস্রাব একই সময়ে সমাপতিত হয়ে যায়। ফেরোমোন প্রবহের কারণেই এটি হয়। বলে বেশ কিছু গবেষণায় আলামত পাওয়া গেছে।

অন্য প্রাণীদের মতো মানুষের জীবন যাত্রাতেও ফেরোমোনের প্রভাব থাকতে পারে এ ব্যাপারটি বোঝা যেতে শুরু করে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মার্থা ক্লিনটক এবং ক্যাথলিন স্টার্নের একটি গবেষণা থেকে। বিজ্ঞানীরা অনেকদিন ধরেই জানেন যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডর্মে কিংবা ছাত্রী-আবাসে একই কক্ষে একাধিক ছাত্রীরা অবস্থান করলে তাদের ঋতু বা রজঃস্রাব একই সময়ে সমাপতিত হয়ে যায়। এই রহস্যময় ব্যাপারটিকে বলে ঋতুচক্রের সমলয়ীকরণ (menstrual synchrony)। মার্থা ক্লিনটক তার ১৯৭১ সালের গবেষণাপত্রে দেখিয়েছিলেন যে এটার পেছনে মূল ভুমিকা পালন করে ফেরোমোন[৮৬]।

১৯৯৮ সালে মার্থা ক্লিনটক তার আগের গবেষণাকে আরও বিস্তৃত করেন। তিনি তার এ পরীক্ষায় দেখান, যে ফেরোমোন শুধু ঋতুচক্রের সমলয়ীকরণই নয়, সেই সাথে মেয়েদের অনিয়মিত মাসিককে নিয়মিত করতেও ভূমিকা রাখে। সাধারণত দেহের লোমশ জায়গাগুলোকে (যেমন, বগলের তলা কিংবা যৌনাঙ্গের এলাকা প্রভৃতি) ফেরোমোনের উৎস বলে মনে করা হয়। মার্থা ক্লিনটক এই পরীক্ষায় কিছু স্বাচ্ছাসেবক পুরুষের বগল থেকে নেওয়া ঘামের ফেরোমোন নারিদের ঠোঁটে লাগিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে পরীক্ষা করে দেখেন, এর ফলে মেয়েদের অনিয়মিত মাসিক নিয়মিত হয়ে যাচ্ছে[৮৭]। ব্যাপারটা অস্বাভাবিক নয়। অনেক বিজ্ঞানীই মনে করেন, অন্য প্রাণীদের মতো এত ব্যাপক আকারে না হলেও শরীরের গন্ধ মানব শরীরের রোগ প্রতিরোধতন্ত্র গঠনে বড় ভূমিকা রাখে, এবং এর পেছনে আছে বিবর্তনীয় কারণ। হেলেন ফিশার তাঁর অ্যানাটমি অফ লাভ বইয়ের ৪২ পৃষ্ঠায় লিখেছেন[৮৮]—

পুরুষের গায়ের গন্ধ (ঘাম) মেয়েদের ঋতুচক্রকে স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে। সেজন্যই ছেলেদের ঘামের গন্ধের প্রতি মেয়েদের (অবচেতন) আকর্ষণ খুব সম্ভবত বিবর্তনজনিত। পুরুষদের সুগন্ধি ব্যবহার করার ও মেয়েদের তা পছন্দ করার কারণ হলো পণ্য উৎপাদনকারীর বিজ্ঞাপকদের আগ্রাসী সাংস্কৃতিক মগজ ধোলাই যার দরুন ঘাম হওয়াকে অপরিচ্ছন্নতার সঙ্গে এক করে দেখা হয়।

অর্থাৎ, এ ব্যাপারটি মনে রাখতে হবে যে, ঘামের পচা গন্ধ যে আমরা অপছন্দ করি সেটা এবং ফেরোমোনের গন্ধ কিন্তু এক নয়। ঘামের দুর্গন্ধ তৈরি হয় ঘামের ব্যাক্টেরিয়া পচনের ফলে, যা আবহাওয়ায় ছড়ায় কিছু সময়ের জন্য। কিন্তু অন্যদিকে ফেরোমোনের গন্ধ মূলত দেহজাত যা খুবই সূক্ষ এবং সেটা সচেতনভাবে পাওয়া যায় না। আমরা যতই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকি না কেন, সেটা সবসময়ই দেহ থেকে বের হতে থাকে বলে মনে করা হয়। ছেলেরা যখন এগারো বারো বছর বয়সের দিকে বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছায়, তখন তাদের দেহ হয়ে উঠে নানা ধরনের নতুন ধরনের গন্ধের আড়ত, যা তার আগেকার শিশু বয়সের গন্ধ থেকে একেবারেই আলাদা। স্নায়ুবিজ্ঞানী লোয়ান ব্রিজেন্ডিন তার সাম্প্রতিক ‘মেইল ব্রেন’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, এই নতুন গন্ধটি টেস্টোস্টেরন হরমোনের প্রভাবে পুরুষের দেহজ ঘামগ্রন্থি থেকে নির্গত ফেরোমোন এবং এন্ড্রোস্টেনেডিওনের একধরনের সুষম মিশ্রণ[৮৯]। আর ছেলেদের এই গন্ধটা মেয়েরা পায় প্রবৃত্তিগতভাবে,ঘ্রাণজ আবরণীকলার মাধ্যমে নয়, বরং এর বাইরে আরেকটি পৃথক অঙ্গের মাধ্যমে যাকে বলা হয় ভোমেরোনাসা তন্ত্র (Vomeronasal Organ) বা সংক্ষেপে VNO[৯০]।

চিত্র। পেজ ৮৪

চিত্রঃ বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে ভোমেরোনাসা তন্ত্র। নামক পৃথক একটি তন্ত্র ফেরোমোন সনাক্ত এবং প্রবাহে ভূমিকা রাখে।

গন্ধ যে মানুষের মনের মেজাজ মর্জি পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে তা কিন্তু আমরা প্রাত্যহিক জীবনের নানা উদাহরণ থেকে খুব সাধারণভাবেই জানি। পুজা-অর্চনার সময় ধূপধুনা জ্বালানো, কিংবা মিলাদ মাহফিলে আগর বাতি জ্বালানো হয় গন্ধের মাধ্যমে চিত্ত চাঞ্চল্য দূর করে মানসিক ভাবগাম্ভীর্যতা বজায় রাখার প্রয়োজনেই। গোলাপের গন্ধে মন প্রফুল্ল হওয়া, লেবুর গন্ধে সতেজ থাকা, ফিনাইল এলকোহলের গন্ধে রক্তচাপ কমার কিংবা ইউক্যালিপ্টাস পাতার ঘ্রাণে শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়মিত হবার কিছু প্রমাণ বিজ্ঞানীরাও পেয়েছেন। আর বিভিন্ন সৌগন্ধিক কোম্পানিগুলো টিকেই আছে পারফিউমের সুবেশী গন্ধকে প্রফুল্লতায় নিয়ে যাওয়ার নানা রকম চেষ্টার উপকরণের উপরেই। কিন্তু এসবের বাইরেও বিজ্ঞানীরা গন্ধের আরও একটি বড় ভূমিকা খুঁজে পেয়েছেন। আমরা যে ‘হিস্টোকম্পিট্যাবিলিটি কমপ্লেক্স জিন’ বা MHC জিনের কথা আগে জেনেছি, দেখা গেছে অনেক প্রাণী গন্ধের মাধ্যমে MHC জিন সনাক্ত করতে পারে। এভাবে তারা গন্ধ শুকে নিজেদের পরিবারে কিংবা নিকটাত্মীয়দের সাথে সঙ্গম করা থেকে বিরত থাকতে পারে। এই বিরত থাকার ব্যাপারটা কিন্তু বিবর্তনীয় পথেই সৃষ্ট হয়েছে। মানবসমাজেও খুব কাছের পরিবার পরিজনদের (বাবা, মা ভাই বোন কিংবা নিকটাত্মীয়) মধ্যে যৌনসঙ্গমকে ঘৃণার চোখে দেখা হয়, সামাজিকভাবেই একে ‘ব্যাভিচার’ হিসেবে গণ্য করা হয়। এর কারণ হচ্ছে, খুব কাছের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ব্যাভিচারের ফলে যে সন্তান জন্মায় দেখা গেছে তার বংশাণু বৈচিত্র্য হ্রাস পায়, ফলে সে ধরনের সন্তানের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়। শুধু তাই নয় জীববিজ্ঞানীরা গবেষনা করে দেখেছেন যে, বাবা কিংবা মায়ের পরিবারে যদি কোনো জিনবাহিত রোগ থাকে, তবে শতকরা ২৫ ভাগের মতো ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সম্ভাবনা থেকে যায় ত্রুটিপূর্ণ জেনেটিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে সন্তান জন্মানোর। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ‘কনজেনিটাল বার্থ ডিফেক্ট’ (congenital birth defects) বা জন্মগত সমস্যা। নিঃসন্দেহে আমাদের আদিম পূর্বপুরুষেরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ব্যাপারটি অনুধাবন করেছিলেন যে কাছাকাছি পারিবারিক সম্পর্কযুক্ত মানুষজনের মধ্যে যৌনসম্পর্ক হলে বিকলাঙ্গ শিশু জন্ম নিচ্ছে। এবং সে সমস্ত শিশুর মৃত্যু হার বেশি। সামাজিকভাবেই এটিকে প্রতিহত করার প্রবণতা দেখা দেয়। সেজন্যই বিবর্তনের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় আমাদের প্রবৃত্তিগুলো এমনভাবে তৈরি হয়েছে যে, বেশিরভাগ মানুষই নিজেদের পরিবারের সদস্যদের দেখে যৌন আকাঙ্ক্ষায় উদ্দীপ্ত হয় না। বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন অন্য প্রাণীদের মতো মানুষও অবচেতনভাবেই গন্ধের সাহায্যে ব্যাপারটির ফয়সলা করে। এর একটি প্রমাণ পাওয়া গেছে জীববিজ্ঞানী ক্লাউস ওয়েডেকাইণ্ডের একটি গবেষণায়[৯১]।

সেই পরীক্ষায় সুইজারল্যান্ডের বার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্লাউস ওয়াইল্ড ১০০ জন কলেজ ছাত্রকে আলাদা করে তাদের সুতির জামা পরিয়ে রেখেছিলেন দুই দিন ধরে। সেই দুই দিন তারা কোনো ঝাল-ঝোলওয়ালা খাবার খায়নি, ধূমপান করেনি, কোনো ডিওডারেন্ট ব্যবহার করেনি, এমনি কোনো সুগন্ধি সাবানও নয়, যাতে করে নমুনাক্ষেত্র প্রভাবান্বিত হবার ঝামেলা-টামেলাগুলো এড়ানো যায়। তারপর যেটা করা হলো তা বেশ মজার। তাদের সবগুলো জামা একত্রিত করে একটি বাক্সে ভরে আরেকদল অপরিচিত ছাত্রীদের দিয়ে শোঁকানো হলো। মেয়েদেরকে গন্ধ শুকে বলতে বলা হলো কোনো টি-শার্টের গন্ধকে তারা ‘সেক্সি’ বলে মনে করে। দেখা গেল মেয়েরা সেসমস্ত টি-শার্টের গন্ধকেই পছন্দ করছে কিংবা যৌনোদ্দীপক বলে রায় দিচ্ছে যে সমস্তটি-শার্টের অধিকারীদের দেহজ MHC জিন নিজেদের থেকে অনেকটাই আলাদা। আর যাদের MHC জিন নিজের জিনের কাছাকাছি বলে প্রতীয়মান হয়, তাকে মেয়েরা অনেকটা নিজের ভাইয়ের মতো মনে করে[৯২]!

১৯৯৭ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের বংশগতিবিদ ক্যারোল ওবারের এ ধরনের আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে একই MHC জিন বিশিষ্ট বাহকেরা সাধারণত একে অপরের সাথে যৌন সম্পর্কে অনিচ্ছুক হয়[৯৩]। শুধু তাই নয়, বিজ্ঞানীরা দেখেছেন এই পৃথিবীতে দম্পতিদের বন্ধ্যাত্ব এবং গর্ভপাত সমস্যার একটি বড় কারণ আসলে লুকিয়ে আছে দম্পতিদের MHC জিনের সমরূপতার মধ্যে। ডাক্তাররা ১৯৮০ সালের পর থেকেই কিন্তু এ ব্যাপারটা মোটামুটি জানেন। তারা দেখেছেন অনেক নারী দৈহিক এবং মানসিকভাবে কোন ধরনের সমস্যার মধ্যে না থাকা সত্ত্বেও সন্তান হচ্ছে না কেবল দুর্ভাগ্যজনকভাবে তার MHC জিন তার স্বামীর জিনের কাছাকাছি হওয়ায়। অনেক সময় যদিওবা সন্তান হয়ও তা থাকে পর্যাপ্ত ওজনের অনেক নীচে। আর এ ধরনের একই MHC জিন বিশিষ্ট সম্পর্কের ক্ষেত্রে গর্ভপাতের হারও থাকে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি[৯৪]। হিউম্যান লিউকোসাইট এন্টিজেন’ (সংক্ষেপে HLA) নামে আমাদের ডিএনএ-এর একটি অত্যাবশ্যকীয় অংশ আছে যা দেহের রোগ প্রতিরোধের সাথে জড়িত। জুরিখের বংশগতি বিশেষজ্ঞ তামারা ব্রাউনের সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে জানা গেছে যে এই HLAর বৈচিত্র্যই ‘সঠিক ভালোবাসার মানুষ’ নির্বাচনে বড় সড় ভুমিকা রাখে। সাধারণভাবে বললে বলা যায়, আপনার হবু সঙ্গীর HLAর বিন্যাস আপনার থেকে যত বেশি বৈচিত্র্যময় হবে, তত বেশি বাড়বে তার প্রতি আপনার আকর্ষণের মাত্রা এবং সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হবার সম্ভাবনা[৯৫]। এই ধরনের জেনেটিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ সঙ্গী খুঁজে পাওয়ার কাজকে ত্বরান্বিত করার জন্য জিনপার্টনার ডট কম (genepartner.com)-এর মতো সাইটগুলো ইতোমধ্যেই বিনিয়োগ করতে শুরু করেছে। এর মাধ্যে এর মক্কেলরা নাকি তাদের থুতু পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হতে পারবেন, তার ভবিষ্যত সঙ্গীর HLAর বিন্যাস বৈচিত্র্য তাকে কতটুকু আকর্ষিত কিংবা বিকর্ষিত করতে পারে, আর এতে খরচ পড়বে পরীক্ষা প্রতি ৯৯ ডলার! কে জানে হয়তো তৃতীয় বিশ্বের মতো দেশগুলোতে বহুদিন ধরে চলে আসা এরেঞ্জড ম্যারেজ’-এর জেনেটিক রূপ দেখা যাবে ভবিষ্যতের ‘উন্নত পৃথিবীতে। MHC জিন কিংবা HLAর বিন্যাস দেখে গুনে শুনে দল বেধে সঙ্গী নির্বাচন করছে প্রেমিক প্রেমিকেরা কিংবা বিবাহ ইচ্ছুকেরা[৯৬]!

তবে পাঠকদের নিশ্চয় বুঝতে দেরি হবার কথা নয় যে, কেবল জেনেটিক ম্যাচ বা বংশগতীয় জুড়ির উপর নির্ভর করে সঙ্গী নির্বাচনের চেষ্টা খুব বেশি সফল হওয়ার কথা নয়, কারণ মানব সম্পর্ক এমনিতেই অন্য প্রাণীর চেয়ে অনেক জটিল। মানুষের সম্পর্কের স্থায়িত্ব জিনের বাইরেও অনেক বেশি নির্ভরশীল পরিবেশ এবং সম্পর্কের সামাজিকীরনের উপর। সেজন্যই দেখা যায় অনেক সময় বংশগতীয় পরীক্ষায় আশানুরূপ ফলাফল না আশা সত্ত্বেও অনেকের ক্ষেত্রেই সম্পর্ক তৈরি এবং বিকাশে সমস্যা হয়নি, কেবল সামাজিক উপাদানগুলোর কারণেই। তারপরেও অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন বংশগতীয় ব্যাপারটা মিলে গেলে সম্পর্ক তৈরিতে সেটা অনুকূল প্রভাব আনতে পারে ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে। ক্লাউস ওয়াইন্ড, ক্যারোল ওবার, তামারাব্রাউন সহ অনেক বিজ্ঞানীই মনে করেন, আমাদের ডিএনএতে প্রকাশিত এই ভালোবাসার সংকেতগুলো শেষ পর্যন্ত ফেরোমোন প্রবাহের মাধ্যমেই আমাদের মস্তিকে পৌঁছায়, যার ভিত্তি মূলত লুকিয়ে আছে সঙ্গীর গায়ের গন্ধের মধ্যেই। সেজন্যই বিলিয়ন ডলারের ম্যাচমেকিং সাইটগুলো এখন ভালোবাসার রসায়ন বুঝতে ডিএনএ বিশ্লেষণ এবং সর্বোপরি গায়ের গন্ধ নিয়েও আগ্রহী হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকে আমরা জানতে শুরু করেছি যে, আর সব প্রাণীর মতো মানুষও অবচেতন মনেই গন্ধ শোঁকার মাধ্যমে সঙ্গী বাছাইয়ের কাজটি করে থাকে। কথিত আছে, ১৫ শতকে ফ্রান্সের সম্রাট তৃতীয় হেনরীর শাসনামলে সম্রাটের আমন্ত্রণে মারিয়া নামে এক নর্তকীরাজপ্রাসাদে নাচতে এসেছিল। শোনা যায়, নাচ শেষ হবার পর ঘর্মাক্ত শরীর একটি তোয়ালে দিয়ে মুছে মারিয়া সম্রাটের দিকে ছুড়ে দেয়। সম্রাট সেই তোয়ালে পেয়ে ‘ভালোবাসার গন্ধে এমনই বিমোহিত হন, যে মারিয়াকে আর প্রাসাদ থেকে যেতে দেননি, তাকে সম্রাজ্ঞী হিসেবে বরণ করে নিয়েছিলেন। অবশ্য বলা বাহুল্য, আমাদের মতো অধিকাংশ ছা-পোষা মানুষের ক্ষেত্রে এই ধরনের গন্ধকেন্দ্রিক পছন্দগুলো সম্রাট হেনরীর এত প্রকটভাবে দৃশ্যমান নয়। আর আগেই বলেছি, গন্ধের মাধ্যমে পছন্দের এই ব্যাপারটি আসলে সচেতন ভাবে নয়, বরং প্রবৃত্তিগতভাবেই ঘটে, এবং এটি উদ্ভূত হয়েছে বিবর্তনেরই ক্রমিক ধারায়।

প্রতি অঙ্গ কাঁদে তব প্রতি অঙ্গ-তরে।
প্রাণের মিলন মাগে দেহের মিলন।
হৃদয়ে আচ্ছন্ন দেহ হৃদয়ের ভরে।
মুরছি পড়িতে চায় তব দেহ-’পরে।
তোমার নয়ন পানে ধাইছে নয়ন,
অধর মরিতে চায় তোমার অধরে।

দেহমিলন নামে চতুষ্পদী কবিতার শুরুতে কবিগুরু উপরের যে চরণগুলো লিখেছেন, তা যেন প্রেম ভালোবাসার একেবারে মোদ্দা কথা–”অধর মরিতে চায় তোমার অধরে’! সত্যই তো। চুমুবিহীন প্রেম যেন অনেকটা লবনহীন খিচুড়ির মতোই বিস্বাদ!

তাই ভালোবাসার কথা বললে অবধারিতভাবেই চুমুর কথা এসে পড়বে। ভালোবাসা প্রকাশের আদি এবং অকৃত্রিম মাধ্যমটির নাম যে চুম্বন সেই বিষয়ে সম্ভবত কেউই দ্বিমত করবেন না। কাজেই কেন কবিগুরুর কথামতো আমাদের অধর মরিতে চায় অন্যের অধরে তার পেছনের বিজ্ঞানটি না জানলে আমাদের আর চলছে না।

বাঙালি, আফগানি, জাপানিজ, মালয় থেকে শুরু করে পশ্চিমা সংস্কৃতি সব জায়গাতেই প্রেমের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে চুম্বন পাওয়া যাবে। সংস্কৃতিভেদে চুম্বনের তারতম্য আর ভেদাভেদ আছে ঠিকই—কোথাও প্রেমিক প্রেমিকাকে কিংবা প্রেমিকা প্রেমিককে চুমু খায় গোপনে, কোথাও বা প্রকাশ্যে, কারো চুম্বন শীতল, কারোটা বা উদগ্র, কেউ ঘার কাৎ করে চুমু খায় কেউ বা খায় মাথা সোজা রেখে। কিন্তু চুম্বন আছেই মানবসভ্যতার সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে মিশে[৯৭]। তাই চুম্বনের বিবর্তনীয় উৎসটি আমাদের জানা চাই।

আর শুধু মানুষই নয়, অনেকে জেনে হয়তো অবাক হবেন, চুমুর অস্তিত্ব রয়েছে এমনকি অন্যান্য অনেক প্রাণীর মধ্যেই[৯৮]। ইঁদুর, কুকুর, বিড়াল, পাখি থেকে শুরু করে শিম্পাঞ্জি, বনোবো সহ বহু প্রাণীর মধ্যেই চুম্বনের অস্তিত্ব লক্ষ করা গেছে। এ সমস্ত প্রাণীদের কেউ বা চুমু খায় খাদ্য বিনিময় থেকে শুরু করে আদর সোহাগ বিনিময় এমনকি ঝগড়া-ফ্যাসাদ মেটাতেও। বিজ্ঞানী বিজ্ঞানী ফ্রান্স ডি ওয়াল তার প্রাইমেট সংক্রান্ত বিভিন্ন গবেষণায় দেখিয়েছেন চুম্বনের ব্যাপারটা মানবসমাজেরই কেবল একচেটিয়া নয়, আমাদের অন্য সকল জ্ঞাতিভাই প্রাইমেটদের মধ্যেও তা প্রবলভাবেই দৃশ্যমান।

চিত্র। পেজ ৮৯

চিত্র: চুম্বনের ব্যাপারটা মানবসমাজেরই। কেবল একচেটিয়া নয়, প্রাইমেট এবং নন প্রাইমেট অনেক প্রাণীর মধ্যেই চুম্বনের অস্তিত্ব দেখা যায়। ছবিতে প্রেইরি কুকুর নামে খ্যাত একধরনের ইঁদুরের মধ্যকার চুম্বন।

চিত্র। পেজ ৯০

চিত্র:দুটি শিম্পাঞ্জির মধ্যকার চুম্বন দেখানো হয়েছে।

কেউ কি কবুতরের চুমু খাওয়া দেখেছেন? ওরা ঘরের চালে একেবারে উপরে দাঁড়িয়ে ঠোঁটে ঠোঁট আংটার মতো করে আটকিয়ে দেয়। তারপরে বিশেষ ছন্দে উঠা নামা করে মিনিট খানেক। বাংলাদেশে গ্রামাঞ্চলে একে বলে “নালি ভাঙ্গা। তারা বলে, কবুতর “নালি ভাঙছে। বাচ্চা হবে”[৯৯]। কিসিং গোরামি (kissing gourami) নামে এক ধরনের মাছ আছে, যাদের মধ্যেও চুম্বন ব্যাপারটা বেশ প্রচলিত। যারা অ্যাকুরিয়ামে গোরামি মাছ পালেন, তারা প্রায়শই এদের চুম্বনলীলা দেখার সৌভাগ্য অর্জন করেন।

চিত্র। পেজ ৯০

চিত্র: যারা অ্যাকুরিয়ামে গোরামি মাছ পালেন, তারা প্রায়শই এধরনের চুম্বনলীলা দেখতে পান। এই আচরণের জন্য এধরনের মাছদের ‘কিসিং গোরামি’ নামে ডাকা হয়।

তবে কিসিং গোরামিদের চুম্বন আসলে ‘সত্যিকার চুম্বন নয়। এদের চুম্বন আসলে এক ধরনের দ্বন্দ্বযুদ্ধের স্বরূপ, যার মাধ্যমে তারা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা করে; আর সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাপারটা চুম্বন হিসেবে প্রতিভাত হয়। কুকুর, বিড়াল এবং পাখিদের মধ্যে মুখ দিয়ে অবলেহন (licking) এবং পরিচ্ছন্নতা (grooming) নির্দেশক অনেক কিছু করতে দেখা যায়, যা অনেক সময়ই অনেকের কাছে ভুলভাবে চুম্বন বলে মনে হতে পারে। সেই দিক থেকে চিন্তা করলে মানুষের মধ্যে চুম্বনের ক্ষেত্র অনেকটাই ভিন্ন।

চিত্র। পেজ ৯১

চিত্র : ফরাসি স্থপতি অগুস্ত রদ্যাঁর (Auguste Rodin) একটি বিখ্যাত স্থাপত্যকর্ম– The Kiss। আমি আর বন্যা প্রথমবার ২০০২ সালে। প্যারিসে গিয়ে রদ্যাঁর এই অদ্ভুত সুন্দর স্থাপত্যকর্মটি দেখে নির্বাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম অনেকক্ষণ!

তাহলে মানবসমাজে চুম্বনের শুরুটা কোথায়, আর কীভাবে? বলা আসলেই মুশকিল। তবে, ১৯৬০ সালে ইংরেজ প্রাণিবিজ্ঞানী ডেসম মরিস প্রথম প্রস্তাব করেন যে, চুম্বন সম্ভবত উদ্ভূত হয়েছে আমাদের পূর্বপুরুষ প্রাইমেট মায়েদের খাবার চিবানো আর সেই খাবার অপরিণত সন্তানকে খাওয়ানোর মাধ্যমে। শিম্পাঞ্জি মায়েরা এখনও এভাবে সন্তানদের খাওয়ায়, আমাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যেও ব্যাপারটা ঠিক এভাবেই এবং এ কারণেই তৈরি হয়েছিল। মনে করা হয় খাদ্যস্বল্পতার সময়গুলোতে যখন সন্তানকে খাবার যোগাতে পারত না, তখন অসহায় সন্তানকে প্রবোধ দিতে এভাবে মুখ দিয়ে খাবার খাওয়ানোর ভান করে সান্ত্বনা দিত স্নেহবৎসল মায়েরা। এভাবেই একটা সময় চুম্বন মানব বিবর্তনের একটি অংশ হয়ে উঠে, এর পরিধি বৃদ্ধি পায় সন্তানের প্রতি ভালোবাসা থেকে প্রেমিক প্রেমিকার রোমান্টিকতায়, যার বহুবিধ অভিব্যক্তি আমরা লক্ষ্য করি মানবসমাজের বিভিন্ন সংস্কৃতিতে আনাচে কানাচে, নানাভাবে।

তবে আজকের দিনের চিরচেনা তীব্র রোমান্টিক প্রেমের সাথে চুম্বনের জৈববৈজ্ঞানিক তথা বিবর্তনীয় উৎস খুঁজতে গেলে আমাদের বের করতে হবে চুমু খাওয়ার এই মাধ্যমটি সম্পর্ক তৈরি এবং টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে কোন ধরনের বাড়তি উপযোগিতা কখনো দিয়েছিল কি না, এবং এখনও দেয় কি না। এ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছেন। যেমন, নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানী গর্ডন জি গ্যালোপের (Gordon G. Gallup) গবেষণা থেকে জানা গেছে, চুম্বন মানবসমাজে মেটিং সিলেকশন বা যৌনসঙ্গী নির্বাচনে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে[১০০]। বিশেষ করে প্রথম চুম্বন ব্যাপারটা রোমান্টিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণ হিসেবে অনেকের জীবনেই উঠে আসে বলে মনে করা হয়। সাধারণত প্রথম প্রেম কিংবা প্রথম যৌনসঙ্গমের মতো প্রথম চুম্বনের ঘটনাও প্রায় সবাই হাজারো ঘটনার ভিড়ে মনের স্মৃতিকোঠায় সযত্নে জমিয়ে রাখে স্থায়ীভাবে। মহাকবি কায়কোবাদের একটা চমৎকার কবিতা আছে প্রথম চুম্বন নিয়ে–

মনে কি পড়ে গো সেই প্রথম চুম্বন!
যবে তুমি মুক্ত কেশে
ফুলরানি বেশে এসে,
করেছিলে মোরে প্রিয় স্নেহ-আলিঙ্গন!
মনে কি পড়ে গো সেই প্রথম চুম্বন?

প্রথম চুম্বন!
মানব জীবনে আহা শান্তি-প্রস্রবণ!
কত প্রেম কত আশা,
কত স্নেহ ভালোবাসা,
বিরাজে তাহায়, সে যে অপার্থিব ধন!
মনে কি পড়ে গো সেই প্রথম চুম্বন!

হায় সে চুম্বনে
কত সুখ দুঃখে কত অশ্রু বরিষণ!
কত হাসি, কত ব্যথা,
আকুলতা, ব্যাকুলতা,
প্রাণে প্রাণে কত কথা, কত সম্ভাষণ!
মনে কি পড়ে গো সেই প্রথম চুম্বন!

সে চুম্বন, আলিঙ্গন, প্রেম-সম্ভাষণ,
অতৃপ্ত হৃদয় মূলে।
ভীষণ ঝটিকা তুলে,
উন্মত্ততা, মাদকতা ভরা অনুক্ষণ,
মনে কি পড়ে গো সেই প্রথম চুম্বন!

তবে কায়কোবাদ প্রথম প্রেমের মাহাত্ম নিয়ে যতই কাব্য করুক না কেন, প্রকৃত বাস্তবতা একটু অন্যরকম। বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্ডারগ্র্যাড ছাত্রদের উপর গবেষণা চালাতে গিয়ে গবেষকেরা দেখেন, অন্তত ৫৯ ভাগ ছাত্র এবং প্রায় ৬৬ ভাগ ছাত্রীরা স্বীকার করেছে যে তাদের জীবনে প্রথম চুম্বন’-এর পর পরেই সঙ্গীর প্রতি আগ্রহ রাতারাতি উবে গেছে। এমন নয় যে সেই সব খারাপ চুমু আসলেই খুব খারাপ ছিল। কিন্তু প্রথমবার চুম্বনের পরেই তাদের সবারই মনে হয়েছিল কোথায় যেন মিলছে না–সামথিং ইজ নট রাইট! গর্ডন জি গ্যালোপের অভিমত এ ক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য[১০১]–

While many forces lead two people contact romantically, the kiss, particularly the first kiss, can be a deal breaker.

কিন্তু কেন এমন হয়? সেটাই ব্যাখ্যা করছেন বিজ্ঞানীরা। আমরা যে আগের অংশে ফেরোমোন এবং MHC জিনের সাথে পরিচিত হয়েছিলাম, দেহজ গন্ধের মাধ্যমে সেখানকার ভালোবাসার সংকেতগুলো পৌঁছে যায় মস্তিষ্কে। ঠিক এমনটাই ঘটে চুম্বনের ক্ষেত্রেও। অর্থাৎ চুমুর মাধ্যমে সঙ্গীর বংশগতীয় কম্প্যাটিবিলিটির খোঁজ পায় মানব মস্তিষ্ক। অর্থাৎ সোজা বাংলায়, সঠিক চুমু মানসিকভাবে সঠিক যৌনসঙ্গীকে খুঁজে নিতে সহায়তা করে। চুম্বনের পর যদি কায়কোবাদের মতো সেই “আহা শান্তি প্রস্রবণ” কিংবা “ভীষণ ঝটিকা তুলে, উন্মত্ততা, মাদকতা ভরা অনুক্ষণ’ আসে আপনার কাছে তাহলে বুঝতে হবে, আপনার মস্তিষ্ক ইঙ্গিত করছে আপনার সঙ্গী বংশগতীয় ভাবে আপনার জন্য সঠিক। আপনার জৈবিক দেহ আপনার সঙ্গীর দ্বারা নিরুপদ্রুপভাবে গর্ভধারণ করার জন্য নির্বাচিত হয়েছে! আর যদি চুম্বনের পর মনে হয় কোথায় যেন মিলছে না’ তাহলে বুঝতে হবে যে, আপনার সঙ্গীর MHC জিনের বিন্যাস আপনার জন্য কম্পিটেবল নয়।

তবে চুম্বনের রসায়নে নারী পুরুষে কিছুটা পার্থক্য লক্ষ করা গেছে। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অধ্যাপক গ্যালোপ এবং তার সহকর্মীরা ১০৪১ জন কলেজ ছাত্র-ছাত্রীর উপর গবেষণা চালান। তাদের গবেষণা থেকে পাওয়া গেছে, তীব্র চুম্বন পুরুষদের জন্য আবির্ভূত হয় যৌনসম্পর্ক সূচিত করার পরবর্তী ধাপ হিসেবে। কিন্তু অন্য দিকে মেয়েরা চুম্বনকে গ্রহণ করে সম্পর্কের মানসিক উন্নয়নের একটি সুস্থিত পর্যায় হিসেবে[১০২]।

গ্যালপের গবেষণায় আরও দেখা গেছে চুম্বনের ব্যাপারটা ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে প্রতিভাত হয়। মেয়েদের কাছে ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণই শুধু নয়, অধিকাংশ মেয়েরা চুম্বন ছাড়া এমনকি সঙ্গীর সাথে যৌনসম্ভোগে অস্বীকৃত হয়। কিন্তু ছেলেদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এতখানি প্রকট নয়। ছেলেদের কাছে একটা সময় পর চুমু খাওয়া না খাওয়া তেমন বড় হয়ে উঠে না– চুমুটুমু না খেয়ে হলেও কোনো আকর্ষণীয় মেয়ের সাথে যৌনসম্ভোগ করতে পারলে ছেলেদের জন্য তাতেই সই! সমীক্ষায় দেখা গেছে কেউ “গুড কিসার’ না হওয়া সত্ত্বেও মেয়েদের চেয়ে অধিক সংখ্যক ছেলেরা তার সাথে যৌনসম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী হয়।

মেয়েদের জন্য চুম্বন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠার পেছনে কিছু বিবর্তনীয় কারণ রয়েছে বলে মনে করা হয়। বিবর্তনের পথিকৃত চার্লস ডারউইন যৌনতার নির্বাচন তত্ত্বনিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে খেয়াল করেছিলেন যে, প্রকৃতিতে প্রায় সর্বত্রই মেয়েরা সঙ্গী নির্বাচনের ব্যাপারে খুব বেশি হিসেবি, সাবধানী আর খুঁতখুঁতে হয়ে থাকে। এই ব্যাপারটি জীববিজ্ঞানে পরিচিত ‘নারী অভিরুচি (female choice) হিসেবে। ডারউইনের সময়ে ডারউইন ব্যাপারটি পর্যবেক্ষণ করলেও এই নারী অভিরুচির পেছনের কারণ সম্পর্কে তিনি কিংবা তার সমসাময়িক কেউ ভালোভাবে অবহিত ছিলেন না। কিন্তু পরবর্তীকালের জীববিজ্ঞানী এবং বিবর্তন মনোবিজ্ঞানীদের গবেষণায় এর পেছনের কারণটি আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যেতে শুরু করে। বিশেষত বিখ্যাত সামাজিক জীববিজ্ঞানী রবার্ট ট্রাইভার্সের ১৯৭২ সালের গবেষণা এ ব্যাপারে একটি মাইলফলক[১০৩]। ট্রাইভার্স তার গবেষণায় দেখান যে, প্রকৃতিতে (বিশেষতঃ স্তন্যপায়ী জীবের ক্ষেত্রে) সন্তানের জন্ম এবং লালন পালনের ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে নারীরাই বেশি শক্তি বিনিয়োগ করে। গর্ভধারণ, সন্তানের জন্ম দেয়া, স্তন্যপান করানো সহ বহু কিছুতে মেয়েদেরকেই সার্বিকভাবে জড়িত হতে হয় বলে মেয়েদের তুলনামূলকভাবে অধিকতর বেশি শক্তি খরচ করতে হয়। ভবিষ্যৎ জিন বা পরবর্তী প্রজন্ম রক্ষায় মেয়েদের এই অতিরিক্ত বেশি শক্তি খরচের ব্যাপারটা স্তন্যপায়ী সকল জীবদের জন্যই কমবেশি প্রযোজ্য। জীববিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলে ‘অভিভাবকীয় বিনিয়োগ’ (parental investment)। মানুষও একটি স্তন্যপায়ী প্রাণী। একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হবার পরেও নির্দ্বিধায় বলা যায় মেয়েরাই অভিভাবকীয় বিনিয়োগের সিংহভাগে জড়িত থাকে। যেহেতু পুরুষদের তুলনায় নারীদের অভিভাবকীয় বিনিয়োগের সিংহভাগে জড়িত থাকতে হয়, তারা যৌনসঙ্গী নির্বাচনের ব্যাপারে হয়ে উঠে অধিকতর হিসেবি এবং সাবধানী। বিবর্তনীয় পথপরিক্রমায় মেয়েরা সঙ্গী নির্বাচনের ব্যাপারে অধিকতর সাবধানী হতে বাধ্য হয়েছে, কারণ অসতর্কভাবে দুষ্ট-সঙ্গী নির্বাচন করলে অযাচিত গর্ভধারণ সংক্রান্ত ঝুট-ঝামেলা পোহাতে হয় নারীকেই। ডেভিড বাস তার ‘Human Mating Strategies শীর্ষক গবেষণাপত্রে সেজন্যই লিখেছেন[১০৪]—

বিবর্তনীয় যাত্রাপথে যে সকল মেয়েরা হিসেবি কিংবা সাবধানী ছিল না, তারা খুব কমই প্রজননগত সফলতা (reproductive success) অর্জন করতে পেরেছে। কিন্তু যারা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে শয্যাসঙ্গী নির্বাচন করতে পেরেছে, যেমন যৌনসঙ্গী নির্বাচনের সময় গুরুত্ব দিয়ে চিন্তা করেছে তার সঙ্গী সঙ্গমের পরই পালিয়ে না গিয়ে তার সাথেই থাকবে কিনা, বাবা হিসেবে তার ভবিষ্যৎ সন্তানের দেখভাল করবে কিনা, সন্তান এবং পরিবারের পরিচর্যায় বাড়তি বিনিয়োগ করবে কি না ইত্যাদি–সে সমস্ত সতর্ক মেয়েরাই সফলভাবে প্রজননগত উপযোগিতা উপভোগ করতে পেরেছে। কাজেই ট্রাইভার্সের দৃষ্টিকোণ থেকে জীবজগতে প্রজাতির প্রজননগত সাফল্য এবং সফলভাবে প্রজন্ম টিকিয়ে রাখার মূলে রয়েছে সেই প্রজাতির নারীদের সতর্ক সঙ্গী নির্বাচনী অভিরুচি (careful mate choice)।

কাজেই যৌনসঙ্গীর ব্যাপারে নারীদের সতর্ক থাকতে হয়, কারণ ভুল সঙ্গীকে নির্বাচনের মাশুল হতে পারে ভয়াবহ। অন্তত একজন নারীর জন্য চুম্বন হয়ে উঠে সঙ্গী বাছাইয়ের একটি অবচেতন প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে সে নির্ণয় করতে চেষ্টা করে তার সঙ্গী তার ভবিষ্যৎ সন্তানের অভিভাবকীয় বিনিয়োগে অবদান রাখবে কি না কিংবা তাদের সম্পর্কের ব্যাপারে অঙ্গীকারাবদ্ধ (committed) কি না ইত্যাদি[১০৫]। আর আগেই বলা হয়েছে, চুমুর মাধ্যমে MHC জিনের মধ্যকার ভালোবাসার সংকেতগুলো পৌঁছে যায় মস্তিষ্কে। পুরুষের লালাগ্রন্থিতে যে সমস্ত যৌন হরমোনের উপস্থিতি থাকে, সেটার উপাত্তই চুমু বিশ্লেষণের জন্য বয়ে নিয়ে যায় মস্তিষ্কে।

চুম্বনের রসায়নে নারী পুরুষে কিছুটা পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয়ে মিল পাওয়া গেছে। চুম্বন মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে নারী পুরুষ উভয়েরই। মনোবিজ্ঞানী উইন্ডি হিল এবং তার ছাত্রী কেরি উইলসনের গবেষণা থেকে জানা গেছে চুম্বনের পরে দেহের কর্টিসল (cortisol) হরমোন, যার পরিমাণ মানসিক চাপের মধ্যে থাকলে বৃদ্ধি পায় বলে মনে করা হয়, তার স্তর লক্ষণীয়ভাবে কমে আসে। এর থেকে বোঝা যায় যে, রোমান্টিক চুম্বন আমাদের মানসিকভাবে চাপমুক্ত থাকতে সহায়তা করে।

.

কেন হীরার আংটি কিংবা সোনার গয়না হয়ে উঠে ভালোবাসার উপঢৌকন?

চিত্র। পেজ ৯৬

আমি যখন এই অংশটি বইয়ের জন্য লিখছিলাম তখন প্রিন্স উইলিয়াম এবং কেট সবে বিয়ে করেছেন। মিডিয়ার গরম খবর। এটি তখন। এই একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক এবং গণতান্ত্রিক বিশ্বের নাগরিক হিসেবে আমার অবশ্য এই সব অথর্ব রাজা রানি আর তাদের সুপুত্র কিংবা কুপুত্রদের বিয়ে কোনো আগ্রহ ছিল না কখনই। কেবল বিনোদন হিসেবে মাঝে মধ্যে এ ধরনের খবরে চোখ বোলানোই সার হতো। কিন্তু সেসময় গত কয়েকদিন ধরে এইকেট উইলিয়ামের বিয়ে নিয়ে মিডিয়াযাশুরুকরেছিল তাতে আমি রীতিমতো হতভম্ব। সে সময় এই মিডিয়া কাঁপানো বিয়ের একদিন আগে আমেরিকার ওপর দিয়ে বয়ে গেছেসময়কালের ভয়ঙ্করীপ্রলঙ্করী এক ঘূর্ণিঝড়। চারশ’র মতো লোক মারা গিয়েছিল। আলাবামার অবস্থা তো যাচ্ছেতাই, এমনকি আমি যে জর্জিয়াস্টেটেথাকি সেখানকার আশেপাশের বেশকিছুবাড়িঘড় ভেঙেছে, মানুষও মারা গেছে কম বেশি। অথচ সিএনএন-এর মতো সংবাদমাধ্যম সে সময় সেসব কিছু বাদ দিয়ে কেবল কেটআর উইলিয়ামের বিয়ের আয়োজন প্রচার করে চলছিল সারাদিন ধরে যেন পৃথিবীতে এটাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু! কেট কোন রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেছেন, কীরকম পোশাক পড়েছেন, বিয়ের পরে কীভাবে ব্যালকনিতে পরস্পরকে চুম্বন করলেন, আটটি স্তরের কত বড় আয়তনের কেক ছিল বিয়েতে, কীভাবে তারা জনতার উদ্দেশ্যে হাত নাড়লেন–এগুলো নিয়ে বিশ্লেষণের পর বিশ্লেষণ চলছে। অবশ্য মিডিয়ার আর কী দোষ। আমার মতো আদার ব্যাপারীর এই রাজকীয় বিয়ে নিয়ে আগ্রহ না থাকলেও সাড়া বিশ্বের মানুষের আগ্রহের কমতি দেখছি না! ৫০০০ পুলিশ অফিসারসহ আর্মি নেভি আর এয়ারফোর্সের নিয়োগদান সহ কেবল নিরাপত্তা রক্ষার জন্যই নাকি খরচ হয়েছে প্রায় ৩৫ মিলিয়ন ডলার। কাজেই পুরো বিয়ের আয়োজনের খরচ কত হতে পারে সহজেই অনুমেয়। নিঃসন্দেহে এই বিশাল খরচের বড় একটা অংশের ব্যয়ভার বহন করতে হয় সেই জনগণকেই। তাতেও যে কারো কোনো আপত্তি আছে তা মনে হচ্ছে না। খোদ বাকিংহাম প্যালেসের বাইরেই নাকি প্রায় ৫০০,০০০ মানুষ জমায়েত হয়েছিল বর-বধূকে একনজর দেখার জন্য। কাজেই এই অপব্যয়িতাকে সাদরে গ্রহণ করার ব্যাপারে নিরাসক্ত হলে আপনিও আমার মতো বিবর্তনীয়ভাবে ‘মিসফিট’ বলে বিবেচিত হয়ে যাবেন!

চিত্র। পেজ ৯৭

চিত্রঃ ক্যারট হীরার আংটিটি উইলিয়াম কেট কে বাগদানের সময় উপহার দিয়েছেন, তার মূল্যমান। খোলাবাজারে প্রায় আকাশ ছোঁয়া।

তাই আমার মতো বিবর্তনীয়ভাবে মিসফিটহবার হাত থেকে বাঁচতে হলে দুচারটি কথা জেনে রাখতে পারেন। প্রিন্স উইলিয়াম তার হবু বধূ কেট মিডেলটনকে বিয়ের প্রস্তাব দেন আট বছর ধরে প্রেম করার পর ২০১০ সালের নভেম্বরের ১৬ তারিখ। প্রায় ৮ ক্যারট হীরার আংটিটি উইলিয়াম কেট কে সে সময় উপহার দিয়েছেন, সেটি একসময় তার মা প্রিন্স ডায়না পরতেন। কাজেই আংটিটি নিয়ে উইলিয়ামের আবেগ সহজেই অনুমেয়। তিনি সেটা মিডিয়ায় বলেছেনও–এটা আমার মায়ের বিয়ের অঙ্গুরি। কাজেই এটা আমার কাছে অবশ্যই বিশেষ কিছু। আমি চাই যে আমার মার স্মৃতি আমার বিয়ের সময় অক্ষুণ্ণ থাকুক। কাজেই এই আংটির পেছনে এত আবেগময় স্মৃতি জড়িত যে, কখনো যদি এই আংটি নিলামে উঠে, তবে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিরাও এই আংটিটি কেনার জন্য দরদাম করতে ভয় পাবেন। এমনকি যদি শুধু হীরার মূল্যমান হিসেবেও বিচার করি, তাহলেও খোলাবাজারে এ ধরনের আংটি ২০০,০০০ থেকে ২৫০,০০০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে।

কিন্তু কেন এত ব্যয়বহুল বিনিয়োগ? হয়তো ভাবছেন রাজারাজড়াদের ব্যাপারস্যাপারই আলাদা। তারা যদি হীরার আংটি নিয়ে লালায়িত না হন, তো হবে কে? কিন্তু আপনি খুঁজলেই দেখতে পাবেন, সাধারণদের মধ্যেও হিরের আংটি নিয়ে বিহ্বলতা কম নয়।

আমার অফিসের এক বান্ধবী প্রায় ৩/৪ ক্যারেটের এক ডায়মন্ডের রিং পরে অফিসে আসে (যদিও ওটা সত্যিকারের হীরা কি না আমার কিছুটা সন্দেহ আছে)। হীরকখচিত আঙুল দুলিয়ে দুলিয়ে এমনভাবে কথা বলে যে, হীরার আংটিটার দিকে যে কারো নজর যেতে বাধ্য। আর সুযোগ পেলেই সে সবাইকে শুনিয়ে ফেনিয়ে ফেনিয়ে গল্প শোনায়—কোন সাত সাগর পাড়ি দিয়ে কোন হীরক রাজার দেশ থেকে তার প্রেমিক এই বিশাল এই হীরার আংটি বানিয়ে নিয়ে এসেছিল, আর কত রোমান্টিকভাবে তাকে বিয়ের প্রস্তাব করেছিল!

আমার অফিসের আরেক কলিগ গ্রাজুয়েশন করে নতুন চাকরি শুরু করেছে। কিন্তু বেচারা গার্লফ্রেন্ডকে বিয়ে করতে পারছে না, কারণ গার্লফ্রেন্ডকে তুষ্ট করার মতো হীরের আংটি কেনার সামর্থ নাকি এখনও অর্জন করতে পারেনি। তার গার্লফ্রেন্ড নাকি এমনিতে খুব ভালো, কোনো কিছুই চায় না তার কাছে, কিন্তু একটি কথা নাকি সম্পর্কের প্রথমেই তাকে বলে দিয়েছে বাগদানের সময় যেনতেন হীরের আংটি হলে কিন্তু তার চলবে না। এমন আংটি দিয়ে তাকে প্রপোজ করতে হবে যেন সেটা সবাইকে দেখিয়ে বাহবা কুড়াতে পারে। বেচারা বয়ফ্রেন্ডটি এখন চোখ কান বুজে চাকরি করছে, টাকা জমাচ্ছে। ওভারটাইম করে টু-পাইস একটু বেশি কামানো যায় কি না–তার নানা ফন্দি ফিকির খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। হীরের আংটি দিয়ে প্রেমিকার মন তুষ্ট করতে হবে না!

পাশ্চাত্যের মতো আমাদের দেশেও মেয়েদের মধ্যে গয়নাগাটি পছন্দ করার চল আছে। শুধু চল বললে ভুল হবে, বিয়ের সময় কতভরি সোনার গয়না দিয়ে বৌকে কেমনভাবে সাজানো হলো সেটা সবসময়ই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। একটা সুযোগ পেলে অনেক মেয়েই বিয়ের সময় শ্বশুরবাড়ি থেকে পাওয়া গয়নাগাটি বন্ধুবান্ধব-আত্মীয়স্বজনদের দেখিয়ে কিংবা কোনো বিয়ে বাড়িতে বা বড় কোনো পার্টিতে গলা কিংবা কানে স্বর্ণালঙ্কারের ঝলক দেখিয়ে সবার মাঝে বাহবা কুড়াতে পছন্দ করে এগুলো আমরা হর-হামেশাই দেখি। কেন পাশ্চাত্যে হীরের আংটি কিংবা আমাদের দেশে সোনার গয়না মেয়েদের এত পছন্দের? এই প্রশ্নটা আমার বরাবরই মনে খচখচ করত। হীরার অঙ্গুরি সোনার গয়নার কোনো ব্যবহারিক উপযোগিতা নেই। ভাত, মাংস, পোলাও-কোরমা খেয়ে যেমন উদরপূর্তি করা যায়, বিলাসবহুল বাড়িতে থেকে গা এলিয়ে দিয়ে আরাম-আয়েশ করা যায়, মার্সিডিস কিংবা রোলস রয়েসে বসে রাজার হালে ঘুরে বেড়ানো যায়, আই ফোনে যেমন সেকেন্ডে সেকেন্ডে কথা বলা যায়, আই প্যাডে যেমন রেস্তোরাঁয় বসে কফির পেয়ালা হাতে নিয়ে ব্রাউস করা যায় হীরা কিংবা সোনার সেরকম কোনো ব্যবহারিক উপযোগিতা কেউ কখনোই খুঁজে পায়নি। অথচ তারপরেও হীরা বা সোনার গয়নার জন্য সুযোগ পেলেই হামলে পড়ে মেয়েরা। আর ছেলেরাও ভালোবাসার প্রমাণ হিসেবে রাজ-রাজ্য চষে হাজির করে প্রায়োগিকভাবে মূল্যহীন কিন্তু নারীর কাছে অমূল্য সেই সব রত্ন পাথর আর সোনা দানা। কিন্তু কেন?

উত্তরটা খুঁজে পেয়েছিলাম অনেক পরে। ডারউইনের সেক্সয়াল সিলেকশন তথা যৌনতার নির্বাচনের মধ্যেই যে এই জটিল প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে ছিল সেটা কি আর আমি তখন জানতাম?

প্রাণিজগৎ থেকেই শুরু করি। যৌনতার নির্বাচনের বহুল প্রচলিত ময়ুরের পেখমের উদাহরণটি আবারো এখানে চলে আসবে। আমরা জানি, ময়ূরের দীর্ঘ পেখম টিকে আছে মূলত নারী ময়ূর বা ময়ূরীর পছন্দ তথা যৌনতার নির্বাচনকে প্রাধান্য দিয়ে। কীভাবে? ১৯৭৫ সালে ইসরাইলি জীববিজ্ঞানী অ্যামোজ জাহাভি (Amtoz Zahavi) প্রস্তাব করলেন যে, ময়ূরীর এই দীর্ঘ পেখম ময়ূরের কাছে প্রতিভাত হয় এক ধরনের ফিটনেস ইন্ডিকেটর’ বা সুস্বাস্থ্যের মাপকাঠি হিসেবে। জাহাবির মতে, সতোর সাথে সুস্বাস্থ্যের বিজ্ঞাপন দিতে গেলে এমন একটা কিছুর মাধ্যমে সেটা প্রকাশ করতে হবে যাতে খরচের প্রাচুর্যটা এমনকি সাদা চোখেও ধরা পড়ে। সোজা ভাষায় সেই বিজ্ঞপ্তি অঙ্গটিকে নিঃসন্দেহে হতে হবে ‘কস্টলি অর্নামেন্ট। ঠিক এজন্যই যৌনতার অলংকারগুলো প্রায় সবসময়ই হয় বেঢপ আকারে বিবর্ধিত, ব্যয়বহুল, অপব্যয়ী কিংবা জবরজং ধরনের জটিল কিছু।

ময়ূরের পেখম কেবল ময়ূরীর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য সস্তা প্রচারণা নয়। ময়ূরের পেখম দীর্ঘ, ভারী আর ভয়ানক বিপদসঙ্কুল। দীর্ঘ পেখম এত অনায়াসে তৈরি করা যায় না, আর এমনকি এই বেয়াক্কেল পেখমের কারণে তার শিকারিদের চোখে পড়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যায় অনেক। বেচারা ময়ূরকে কেবল নিজের দেহটিকেই বয়ে বেড়াতে হয় না, টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে বেড়াতে হয় তার পশ্চাৎদেশের সাথে জুড়ে থাকা এই অবিশ্বাস্য বড় ধরনের বাড়তি একটা পেখমের ঝাঁপি (জাহাভির মতে এই বিলাসিতা এমনই দৃষ্টিকটু যে এটা প্রায় পঙ্গুত্বের সামিল, তার তত্ত্বের নামই এজন্য Handicap principle)। এজন্য ময়ুরকে হতে হয় স্বাস্থ্যবান এবং নীরোগ। কখনোসখনো কোনো স্বাস্থ্যহীন ময়ুরের দীর্ঘ পেখম গজাতে পারে বটে, কিন্তু সেটা বয়ে নিয়ে বেড়িয়ে খাবার খোঁজা, কিংবা শিকারিরা তাড়া করলে দ্রুত দোঁড়িয়ে পালিয়ে যাওয়া সেই স্বাস্থ্যহীন ময়ূরের পক্ষে দুঃসাধ্যই হবে। কেবল মাত্র প্রচণ্ড শক্তিশালী কিংবা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ময়ূরের পক্ষেই এই সমস্ত প্রতিবন্ধকতা ডিঙ্গিয়ে এ ধরনের পেখমের বিলাসিতা ধারণ করা সম্ভব হয়।

তাই পেখমওয়ালা বিলাসী ময়ূর ময়ূরীর পালের কাছে গিয়ে সোচ্চারে ঘোষণা করতে পারে—

এই যে মহীয়সী ময়ূরী, আমার ন্যাজের দিকে তাকাও; দেখো-আমি সুস্থ, আমি সুন্দর! আমি এমনই স্বাস্থ্যবান আর শক্তিশালী যে, আমি আমার ষাট ইঞ্চি ব্যাসার্ধের পেখম বয়ে বেড়াতে পারি অবলীলায়। আমি আমার খাদ্য আর দৈহিক পুষ্টিকে সাইফন করে আমার পেখমের আকার-আকৃতিকে তোমারই জন্য বর্ণাঢ্য করে রেখেছি। কোন শিকারি আমাকে পেছনে থেকে আক্রমণ করে পরাস্ত করতে পারে না। ভারী লেজ থাকা সত্ত্বেও আমি উসেইন বোল্টের মতো এক দৌড়ে শিকারিকে পেছনে ফেলে দিতে পারি, আমার রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্দান্ত, আমার দেহ কোনো রোগ জীবাণুর আবাসস্থল নয়। তুমি দেখলেই বুঝবে–উজ্জ্বল পেখম আর অন্য সব কিছুমিলিয়ে আমার সঞ্চিত সম্পদ অঢেল ধন সম্পদ আর প্রাচুর্যে আমি ভরপুর। আমাকে সঙ্গী হিসেবে নির্বাচণকরলে তুমি সুখে থাকবে হেনারী…”।

তাই ময়ূরীকে আকর্ষণের জন্য স্বভাবগতভাবেই ময়ূরকে বিলাসী হতে হয়। আমরা যতই অপচয়কারীকে ‘শয়তানের ভাই’ বলে গালমন্দ করি না কেন, অপচয় এবং ব্যয়বাহুল্য জৈবজগতে যৌনসম্পর্ক গঠনের (sexual courtship) এক অত্যাবশকীয় নিয়ামক। একটা পুরুষ কোকিলকে তার অতিরিক্ত বিশ ভাগ শক্তি ব্যয় করতে নিজের গলাকে সুরেলা করে তুলতে। কারণ এই সুরেলা গলাই তার আকর্ষণের হাতিয়ার। ঠিক একই কারণে হরিণের শিংকে হতে হয় বর্ণাঢ্য, তার প্রয়োজনের চেয়ে ঢের বেশি। তার মানে, যৌনতার নির্বাচনেরমাধ্যমেপ্রজাতির বিবর্তন হতে গেলেঅপচয়প্রবণতার প্রকাশ হতে হবে একরকম অবশ্যম্ভাবী। এটা যে কেউই বুঝবে যে, একটাময়ূর তার পেখমনা থাকলে বরং আরও ভালোভাবে চলে ফিরে বেড়াতে পারত। তার এই বেঢপ পেখমের পেছনে এত শক্তি অপচয় না করে খেয়ে দেয়ে আমোদ-ফুর্তি করে বেড়াতে পারত। পেখমের পিছনে শক্তি খরচ না করে শক্তি সঞ্চয়ে মনোনিবেশ করতে পারত। কিন্তু যৌনতার নির্বাচনী চাপ তাদের মানসজগতে অবিরতভাবে কাজ করে যায় বলেই, সে পেখম গঠনের ব্যাপারে নির্লিপ্তভাবে অপব্যয়ী হয়ে ওঠে; উঠতে তাকে হবেই। বিজ্ঞানীরা বলেন, প্রকৃতিতে দৃষ্টিকটু রকমের অপব্যয়িতাই হচ্ছে সততার সাথে নিজের সম্পদকে অন্যের সামনে তুলে ধরার একমাত্র সহজ মাধ্যম।

বিজ্ঞানীরা বলেন, বিবর্তনের যাত্রাপথে নারী অভিরুচির ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ। নারী অভিরুচির কারণেই পুরুষ ময়ূরের পেখম দীর্ঘ হয়েছে। পুরুষ কোকিলের গলা সুরেলা হয়েছে। পুরুষ বাবুই পাখি শিখেছে মনোরম বাসা বানাতে। নীচে একটি টেবিলের সাহায্যে দেখানোর চেষ্টা করা হলো, কীভাবে নারী অভিরুচিকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে বিভিন্ন প্রজাতিতে ব্যয়বহুল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কিংবা নানা অপব্যয়ী বৈশিষ্ট্যের উদ্ভব ঘটেছে[১০৬]—

চিত্র। পেজ ১০১

মানবসমাজেও কি আমরা এরকমের অপব্যয়িতার হাজারো প্রমাণ পাই না? যাদের বেশি টাকা পয়সা আছে, তারা দামি অট্টালিকা বানায়, বনেদি এলাকায় থাকে, রোলস রয়েস কিংবা পাজেরো গাড়ি হাঁকিয়ে বেড়ায়, সৌখিন এবং দামি ডিজাইনার ব্র্যান্ডের পোশাক-আশাক কিংবা জুতো পরে ঘুরে বেড়ায়। বৈষয়িক দিক থেকে চিন্তা করলে এগুলোর কোনোটারই কিন্তু দরকার ছিল না। বরং দামি গাড়ি কিংবা পোশাক-আশাকের পেছনে নিয়মিত অর্থ ব্যয় না করে টাকাগুলো ব্যাংকে তুলে রাখলে অপব্যয়িতার হাত থেকে মুক্ত থাকা যেত, পয়সা কড়িও একটু বেশি জমতো। কিন্তু তাই কি হয়? কোনো পয়সাওয়ালাই কেবল সুইস ব্যাংকে তার সব টাকা পয়সা তুলে রেখে ছেঁড়া গেঞ্জি, পায়জামা আর ছেঁড়া স্যান্ডেল পরে টো-টো করে ঘুরে বেড়ায় না। বরং উলটো নিজের অর্জিত সম্পদের সংকেতকে বস্তুনিষ্ঠভাবে অন্যের কাছে তুলে ধরতে চায় আর রাজপ্রাসাদোপম বাড়ি কিংবা দামি গাড়ি, জুতো জামাকেন্দ্রিক অপব্যয়িতা গুলোই হচ্ছে তাদের জন্য সর্বসাধারণের কাছে সম্পদ প্রকাশের ‘ফিটনেস মার্কার’!

নিজের সম্পদকে তথা ব্যয়বহুল অলংকারগুলোকে সতোর সাথে প্রকাশ করে। নিজের ‘ফিটনেস’কে বিজ্ঞাপিতকরতে চায় সকলেই। সম্পদ বলতে কেবলশুধু বাড়ি গাড়ি, টাকা-পয়সা, জুতো-জামার কথাই আমি বোঝাচ্ছি না, সেই সাথে আমাদের বিজ্ঞাপিত সম্পদের তালিকায় চলে আসবে শিক্ষা, বুদ্ধিবৃত্তি, জ্ঞান, সাহস, দৈহিক শক্তি, সংগীতপ্রতিভা বাকচাতুর্য, সুদর্শন চেহারা, কৃষ্টি, নৃত্যপটুতা, প্রগতিশীলতা, অধিকার সচেতনতা, উদ্ভাবনীশক্তি, দৈহিক সৌন্দর্য, সততা, নৈতিকতা, দয়াপরবশতা, রসিকতা, হাস্যরসপ্রিয়তাসহঅনেক কিছুই। কারণ দীর্ঘদিনের বিবর্তনীয় যাত্রাপথে মানুষ শিখেছে যে এই দৃষ্টিনন্দন গুণাবলিগুলোর প্রতিটিইবিপরীতলিঙ্গের কাছেহয়ে উঠে আকর্ষণের বস্তু, আর সম্ভবত যৌনতার নির্বাচনের পথ ধরেই সেগুলো মানবসমাজেবিকশিত হয়েছে বিপরীত লিঙ্গের বিভিন্ন চাহিদাকে প্রাধান্য দিয়ে। কিন্তু তার পরেও বলতে বাধ্য হচ্ছি এর কোনোটিই বিয়ের সময় হীরার আংটির মতো গুরুত্বপূর্ণ “ভালোবাসারউপঢৌকন হিসেবে উঠে আসেনা। কিন্তু কেন?

চিত্র। পেজ ১০২

চিত্র : যৌনতার নির্বাচন যদি সঠিক হয়ে থাকে তবে, প্রকৃতিতে দৃষ্টিকটু রকমের অপব্যয়িতাই হচ্ছে সতোর সাথে নিজের সম্পদকে অন্যের সামনে তুলে ধরার একমাত্র সহজ মাধ্যম। সেজন্যই কি হীরার আংটি মানবসমাজে এত পছন্দনীয় ‘নাপশাল গিফট’?

হীরার আংটি দিয়ে প্রস্তাব না করে আপনি আপনার প্রেমিকাকে বাজার থেকে একটা আইদাহ আলু কিনে কিংবা সিলেটি কমলালেবু নিয়ে এসে প্রস্তাব করতে পারতেন। যত হাস্যকরই শোনাক না কেন, আলু কিংবা কমলালেবুর ব্যবহারিক উপযোগিতা কিন্তু হীরা কিংবা সোনাদানার চেয়ে অনেক বেশি। ক্ষুধার সময় আলু খেয়ে কিংবা মনের আনন্দে কমলা চিবিয়ে আপনি খিদে দূর করতে পারেন। কিন্তু হীরার আংটি দিয়ে সেসব কিছুই আপনি করতে পারবেন না। কিন্তু তারপরেও বাগদানের রোমান্টিক সময়ে হীরার বদলে আলু নিয়ে হাজির হলে, আপনার কপালে কী দুর্গতি হবে সেটা বোধ হয় না বলে দিলেও চলবে! আলু পটল তো কোনো ছার, এমনকি দামি গাড়ি-বাড়ি, কম্পিউটার, আইফোন কোনোকিছু দিয়েই আপনি বিয়ের সম্পর্ক তৈরি করতে পারবেন না, যদিও এগুলোর সবগুলোরই কিছু না কিছু। ব্যবহারিক উপযোগিতা আছে। রহস্যটি হলো, জাহাভির হ্যাঁন্ডিক্যাপ প্রিন্সিপল অনুযায়ী, বিয়ের প্রস্তাবের (প্রাণিজগতে অবশ্য যৌনসম্পর্কের) উপহার এমন হতে হবে যার কোনো ব্যবহারিক উপযোগিতা নেই (এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে তা হতে পারে ময়ূরের পেখমের অপকারী), কিন্তু বিপরীত লিঙ্গের চোখে তা হতে হবে অমূল্য। জৈববিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলে ‘কোর্টশিপ গিফট’ (courtship gift) বা ‘নাপশাল গিফট (nuptial gift)[১০৭,১০৮]। গাড়ি-বাড়ি, আইদাহ আলু কিংবা আইফোন সবকিছুরই ব্যবহারিক কিছু না কিছু উপযোগিতা আছে পুরুষের কাছে।  তাই সেগুলো কখনোই ‘কোর্টশিপ গিফট’ হয়ে উঠার যোগ্য নয়। কোর্টশিপ গিফট হতে পারে কেবল হীরা কিংবা স্বর্ণালঙ্কারের মতো অপদ্রব্য গুলোই, যেগুলোর কোনোই ব্যবহারিক উপযোগিতা নেই পুরুষের কাছে, অথচ নারীর মানসপটে সেটি অমূল্য এক ‘ফিটনেস মার্কার’[১০৯]।

গবেষক পিটার সজু এবং রবার্ট সেইমোর ২০০৫ সালের ‘Costly but worthless gifts facilitate courtship’ নামের একটি গবেষণাপত্রে দেখিয়েছেন যে, সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে এ ধরনের ‘কোর্টশিপ গিফট’-ই কার্যকরী যা হবে দৃষ্টিকটুভাবে অপব্যয়ী এবং ব্যবহারিকভাবে মূল্যহীন[১১০]। মানবসমাজের বিবর্তনীয় যাত্রাপথে সেজন্যই হীরার আংটি কিংবা স্বর্ণালঙ্কার খুব চমৎকার একটি কোর্টশিপ গিফট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। একটি কারণ, এর কোনো ব্যবহারিক মূল্য পুরুষের কাছে নেই। কোনো পুরুষই হীরা কিংবা সোনার জন্য লালায়িত থাকে না। হীরা বা সোনা দোকানে নিয়ে বেচে দেয়া ছাড়া একজন পুরুষ কিছুই করতে পারে না। সেটা নিয়ে সে বাঁচতে পারে না, সেটা খেয়ে উদরপূর্তি করতে পারে না, পারে না আমোদিত হতে। কেবল একটি কাজই সে হীরা দিয়ে করতে পারে নারীকে উপহার দিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে, আর ভালোবাসার সম্পর্কের সূচনা করতে হতে পারে সেই সম্পর্ক স্বল্পমেয়াদি কিংবা দীর্ঘমেয়াদি। শোনা যায়, কেউ কেউ নাকি স্বল্পমেয়াদি সম্পর্ক তৈরি করার ক্ষেত্রে হীরার অলংকারের উপর নির্ভর করতেন। চলচ্চিত্রের নায়িকা, গায়িকা, অভিনেত্রী, মডেল থেকে শুরু করে খবর পাঠিকাসহ শোবিজের সাথে যুক্ত বিভিন্ন সুন্দরী ললনাদের শয্যাসঙ্গী করার অভিপ্রায়ে তাদের পৃথিবীর আধুনিক নামিদামি কোম্পানির জুয়েলারি পাঠাতেন। তাদের স্বল্পমেয়াদি সম্পর্ক বা শর্ট-টার্ম স্ট্র্যাটিজির জন্য যে ধরনের বিনিয়োগ করতেন দেখা গেছে, সে ধরনের বিনিয়োগ একই রকম কার্যকরী লং-টার্ম স্ট্র্যাটিজির ক্ষেত্রেও। সেজন্যই বাংলাদেশের বিয়েতে সোনাদানা কিংবা পাশ্চাত্যে হীরার আংটি বৈবাহিক সম্পর্কের সূচনায় এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে।

মেরেলিন মনরোর কথা আমরা সবাই জানি। পঞ্চাশ ষাটের দশকের সুদর্শনা অভিনেত্রী ছিলেন তিনি, এবং মাত্র ৩৬ বছর বয়সে মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত ছিলেন বহু পুরুষের হার্টথ্রব। অভিনয়ের পাশাপাশি গানও গাইতেন মনোরো। মনোরোর গাওয়া চমৎকার গান আছে ‘Diamonds are a Girl’s Best Friend’ নামে। মেরোলিন। মনোরো গানটি গেয়েছিলেন ১৯৫৩ সালে ‘Gentlemen Prefer Blondes’ নামের একটি ছবির জন্য। গানের কথাগুলো এরকমের[১১১]–

The French were bred to die for love
They delight in fighting duels
But I prefer a man who lives
And gives expensive jewels
A kiss on the hand may be quite continental
But diamonds are a girl’s best friend
A kiss may be grand but it won’t pay the rental
On your humble flat, or help you at the automat
Men grow cold as girls grow old
And we all lose our charms in the end
But square cut or pear shaped
These rocks don’t lose their shape
Diamonds are a girl’s best friend…

আরেকটা বিখ্যাত গান আছে ‘ডায়মন্ডস আর ফরএভার’ নামে। গানটি ১৯৭১ সালের শন কনরি অভিনিত জেমস বন্ডের একটি সিনেমায় ব্যবহৃত হয়েছিল। গায়িকা ছিলেন শার্লি ব্যাসি, পঞ্চাশের দশকের আরেকজন জনপ্রিয় শিল্পী (এবং আমার এখনও প্রিয় গায়িকা)। গানের কথাগুলো এরকমের[১১২]–

Diamonds are forever,
They are all I need to please me,
They can stimulate and tease me,
They won’t leave in the night,
I’ve no fear that they might desert me.

Diamonds are forever,
Hold one up and then caress it,
Touch it, stroke it and undress it,
I can see every part,
Nothing hides in the heart to hurt me.

I don’t need love,
For what good will love do me?
Diamonds never lie to me,
For when love’s gone,
They’ll luster on….

আমাদের দেশ সহ ভারতবর্ষে হীরার মতো সোনাকেও ভালোবাসার খুব মূল্যবান উপঢৌকন হিসেবে ধরা হয়, এবং সেটাও একই কারণে।

চিত্র। পেজ ১০৬

চিত্রঃ ভারতবর্ষে হীরার মতো সোনাকেও ভালোবাসার খুব মূল্যবান উপঢৌকন বা ‘নাপশাল গিফট’ হিসেবে দেখা হয়।

সোনা দানার কোনো ব্যবহারিক উপযোগিতা পুরুষদের কাছে নেই, কিন্তু নারীর কাছে তা অমূল্য। কেন ভারতবর্ষের নারীরা স্বর্ণালঙ্কার ভালোবাসে? এর ব্যাখ্যা হিসেবে জনপ্রিয় rediff.com একটি ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে[১১৩]—

স্বর্ণালঙ্কার নারীর জন্য কেবল কেবল শক্তিশালী আবেগই তৈরি করে না, পাশাপাশি নারীর অবয়বকে সার্বিক পূর্ণতা দেয়। নারী স্বর্ণালঙ্কার পরে নিজেকে মনে করে লাস্যময়ী, সুন্দরী,সফল, আত্মপ্রত্যয়ী, এবং যৌনাবেদনময়ী।

রোমান কবি অভিড প্রায় একহাজার বছর আগে তার একটি লেখায় বলে গিয়েছিলেন–

নারীরা কবিতা ভালোবাসে। কিন্তু তার জন্য মূল্যবান কিছু উপহার দাও। … Gold buys honor; gold procures love

অভিডের মৃত্যুর পর সহস্র বছর পার হয়ে গেছে, কিন্তু তবুও আমরা সেই স্বর্ণযুগেই পড়ে রয়েছি!

.

আছে ভালোবাসা, আছে ঈর্ষা

সুরঞ্জনা ওইখানে যেয়ো নাকো তুমি,
বোলো নাকো কথা ওই যুবকের সাথে;
ফিরে এসো সুরঞ্জনা
নক্ষত্রের রূপালি আগুন ভরা রাতে;

ফিরে এসো এই মাঠে, ঢেউয়ে;
ফিরে এসো হৃদয়ে আমার
দূর থেকে দূরে–আরও দূরে
যুবকের সাথে তুমি যেয়ো নাকো আর।

কী কথা তাহার সাথে?–তার সাথে!…

‘আকাশলীনা’ নামের কবিতায় ঈর্ষাপরায়ণ চরিত্রের এক অসাধারণ চিত্রায়ণ করেছেন কবি জীবনানন্দ দাশ,যে কবিতায় ঈর্ষাকাতর প্রেমিক অন্য যুবকের সাথে সুরঞ্জনার কথা বলা নিয়ে চিন্তিত, ঈর্ষান্বিত। হ্যাঁ-প্রেম যেমন আছে, তেমনি আছে ঈর্ষাপরায়ণতা। প্রেমের মতোঈর্ষাপরায়ণতার ব্যাপারটাও বোধ হয় মানুষের মজ্জাগত। একতরফাভাবে প্রেম কখনোই কোথাওই হয় না, প্রেমে ছলনা আছে, আছে প্রতারণা। আর ছলনা বা প্রতারণা থাকলে থাকবেঈর্ষা, থাকবে ঘৃণা, এবং ক্ষেত্রবিশেষে জিঘাংসাও। শুনতে যতই খারাপ লাগুক না কেন ছলনা,বিশ্বাসঘাতকতা,ঈর্ষা বা জিঘাংসার মতো বৈশিষ্ট্যগুলোর জন্মও হয়েছে প্রেমের মতোই একই বিবর্তনীয় যাত্রাপথে। বিবর্তন মনোবিজ্ঞানীদের এগুলো নিয়েও সঙ্গত কারণেই গবেষণা করতে হয়। ডেভিড বাস তাঁর বই ভয়ঙ্কর আবেগ : প্রেম এবং যৌনতার মধ্যে ঈর্ষাও জড়িত থাকে কেন? নামের বইয়ে দেখিয়েছেন, কেউ প্রেমে প্রতারণা করলে আমরা ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠি। ঈর্ষা আসলে একটি সারভাইভাল স্ট্র্যাটিজি–বেঁচে থাকার এক সুচতুর পরিকল্পনা। আসলে বিবর্তনের ধারাবাহিকতাতেই ভালোবাসার মতো ঈর্ষার বীজও মানুষের মনে তৈরি হয়েছে, এর পরিস্ফুটন ঘটেছে। আমাদের বর্তমান মানসিকতার মধ্যে ঈর্ষার বীজ দেখে বোঝা যায়, আমাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যেও ঈর্ষা যথেষ্ট পরিমাণেই ছিল। যাদের মধ্যে ঈর্ষা ছিল না তাঁরা প্রজননগতভাবে সফল ছিল না, তারা কোনো উত্তরসূরী রেখে যান নি[১১৪]। তবে এর অর্থ এই নয় যে, আমাদের সবাইকে ঈর্ষাপরায়ণ হিসেবে বড় হতে হবে, আর কাউকে দেখলেই ঈর্ষান্বিত হতে হবে। ঈর্ষার ব্যাপারটা বহুলাংশেই সময়। এবং পরিস্থিতি নির্ভর। বিবর্তনের কৌশল সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়, এছাড়া বিবর্তনের কৌশলজনিত যে কোনো মানবিক বৈশিষ্ট্য মানুষের মধ্যে পারিসাংখ্যিক সীমায় বিস্তৃত, কারও ক্ষেত্রে কম, কারও ক্ষেত্রে বেশি।

চিত্র। পেজ ১০৮

চিত্র : আমাদের পূর্বপুরুষেদের মধ্যেও ঈর্ষা যথেষ্ট পরিমাণেই ছিল। যাদের মধ্যে ঈর্ষা ছিল না তাঁরা প্রজননগতভাবে সফল ছিল না, তারা কোনো উত্তরসূরী রেখে যান নি।

তবে বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন ঈর্ষা এবং প্রতারণার রকমফের নারী পুরুষে ভিন্ন হয়। বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের অনুকল্প অনুযায়ী যৌনতা সংক্রান্ত হিংসা কিংবা ঈর্ষার ব্যাপারটি আসলে জৈবিকভাবে অনেকটাই পুরুষদের একচেটিয়া, যাকে বলে–’সেক্সুয়াল জেলাসি বা যৌন-ঈর্ষা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে-কেবল পুরুষদেরই যৌন ঈর্ষা থাকবে কেন? কারণ হচ্ছে, সঙ্গমের পর গর্ভধারণ এবং বাচ্চা প্রসবের পুরো প্রক্রিয়াটা নারীরা নিজেদের মধ্যে ধারণ করে, পুরুষদের আর কোনো ভূমিকা থাকে। ফলে পুরুষরা নিজেদের পিতৃত্ব নিয়ে কখনোই পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারে। সত্যি কথা বলতে কী–আধুনিক ‘ডিএনএ টেস্ট আসার আগ পর্যন্ত আসলে কোনো পুরুষের পক্ষে একশত ভাগ নিশ্চয়তা দিয়ে বলা সম্ভব ছিল না যে সেই তার সন্তানের পিতা। কিন্তু মাতৃত্বের ব্যাপারটা কিন্তু নয়। মাকে যেহেতু গর্ভধারণ করতে হয়, প্রত্যেক মাই জানে যে সেই তার সন্তানের মা। অর্থাৎ, পিতৃত্বের ব্যাপারটাশতভাগ নিশ্চিত না হলেও মাতৃত্বের ব্যাপারটা নিশ্চিত। এখন চিন্তা করে দেখি আমাদের পূর্বপুরুষেরা যখন বনে জঙ্গলে ছিল অর্থাৎ শিকারি-সংগ্রাহক হিসেবে জীবন চালাতো, তখন কোনো সুনিয়ন্ত্রিত একগামী পরিবার ছিল না। ফলে পুরুষদের আরও সমস্যা হতো নিজেদের ‘পিতৃত্ব নিয়ে। পিতৃত্বের ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়, কারণ বিবর্তনের স্বার্থপর জিনের (selfish gene) ধারকেরা স্বার্থপরভাবেই চাইবে কেবল তার দেহেরই প্রতিলিপি তৈরি হোক। কিন্তু চাইলেই যে নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে তা তো নয়। সম্পর্কে প্রতারণা হয়। তার স্ত্রী যে অন্য কারো সাথে সম্পর্ক তৈরি করে গর্ভধারণ করবে না, তা সে কীভাবে নিশ্চিত করবে? আদিম বন-জঙ্গলের কথা বাদ দেই, আধুনিক জীবনেও কিন্তু প্রতারণার ব্যাপারটা অজানা নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, আমেরিকায় শতকরা প্রায় ১৩ থেকে ২০ ভাগ পুরুষ অন্যের সন্তানকে নিজ সন্তান’ ভেবে পরিবারে বড় করে। জার্মানিতে সেই সংখ্যা ৯ থেকে ১৭ ভাগ। সারা বিশ্বেই মোটামুটিভাবে নন-জেনেটিক সন্তানকে নিজ সন্তান হিসেবে বড় করার হার শতকরা ৯ থেকে ১৫ ভাগ বলে মনে করা হয়[১১৫]। বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় অন্যের (অর্থাৎ নন- জেনেটিক) সন্তানকে নিজ সন্তান ভেবে বড় করার এই প্রতারণাকে বলা হয় কাকোন্ট্রি (cuckoldry), যার বাংলা আমরা করতে পারি—কোকিলাচরণ[১১৬]।

চিত্র। পেজ ১০৯

চিত্র : সারা বিশ্বেই মোটামুটিভাবে নন-জেনেটিক সন্তানকে নিজ সন্তান হিসেবে বড় করার হার (কোকিলাচরণ) শতকরা ৪ থেকে ১৫ ভাগ বলে মনে করা হয়। যে সমস্ত পুরুষেরা নিজেদের পিতৃত্ব নিয়ে সন্দিহান (উপরের গ্রাফে লো কনফিডেন্স গ্রুপ হিসেবে চিহ্নিত), তাদের পরিবারে নন জেনেটিক সন্তান বেশি পাওয়া গেছে, প্রায় শতকরা ৩০ ভাগ[১১৭]।

এখন কথা হচ্ছে, জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এর প্রভাবকী? প্রভাব হচ্ছে, কাকোল্ড্রি বা কোকিলাচরণ ঘটলে সেটা পুরুষের জন্য এক ধরনের অপচয়। কারণ সে ভুল ভাবে  অন্যের জিনের প্রতিলিপি নিজের প্রতিলিপি হিসেবে পালন করে শক্তি বিনষ্ট করবে। এর ফলে নিজের জিন জনপুঞ্জে না ছড়িয়ে সুবিধা করে দেয় অন্যের জিন সঞ্চালনের, যেটা ‘সেলফিশ জিন’ পারতপক্ষে চাইবে না ঘটতে দিতে। ফলাফল? ফলাফল হচ্ছে, পুরুষেরা মূলত ‘সেক্সয়ালি জেলাস’ হিসেবে বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় বেড়ে উঠে। তারা নিশ্চিত করতে চায় যে, তার যৌনসঙ্গী বা স্ত্রী, কেবল তার সাথেই সম্পর্ক রাখুক, অন্য পুরুষের সম্পর্ক এড়িয়ে কেবল তার সাথেই চলুক। এইটা বজায় রাখতে পারলেই সে শতভাগনা হোক, অন্তত কিছুটা হলেও নিশ্চয়তা পাবে যে, তার এই সম্পর্কের মধ্যে কোকিলাচরণ ঘটার সম্ভাবনা কম। এজন্যই ইসলামিক দেশগুলোতে কিংবা অনুরূপ ট্রেডিশনাল সমাজগুলোতে মেয়েদের হিজাব পরানো হয়, বোরখা পরানো হয়, কিংবা গৃহে অবরুদ্ধ রাখা হয়, কিংবা বাইরে কাজ করতে দেয়া হয় না– এগুলো আসলে প্রকারান্তরে পুরুষতান্ত্রিক ‘সেক্সুয়াল জেলাসি’রই বহিঃপ্রকাশ।

চিত্র। পেজ ১১০

চিত্র : ইসলামিক দেশগুলোতে কিংবা অনুরূপ সনাতন সমাজব্যবস্থায় মেয়েদের যে হিজাব পরানো হয়, বোরখা পরানো হয়, কিংবা গৃহে অবরুদ্ধ রাখা হয়–এগুলো আসলে প্রকারন্তরে পুরুষতান্ত্রিক ‘সেক্সুয়াল জেলাসি’-রই বহিঃপ্রকাশ।

আসলে নারীকে অন্তরীণ করে, তাদের অধিকার এবং মেলামেশা সীমিত করার মাধ্যমে সে সব দেশে পুরুষেরা নিশ্চিত করতে চায় যে, কেবল তার জিনের প্রতিলিপিই তার স্ত্রীর শরীরে তৈরি হোক, অন্য কারো নয়। কারণ স্ত্রীর কোকিলাচরণ ঘটলে সেটা তার জন্য হয়ে উঠে সময় এবং অর্থের অপচয়’। পুরুষালি ঈর্ষার মূল উৎস এখানেই। ডেভিড বাস তার ‘Human Mating Strategies’ শীর্ষক গবেষণাপত্রে সেজন্যই লিখেছেন[১১৮]—

যেহেতু মানব শুক্রাণু দিয়ে ডিম্বাণুর নিষেকের পুরো প্রক্রিয়াটিই নারীর দেহাভ্যন্তরে ঘটে, পুরুষের মধ্যে নিজের সন্তানের অভিভাবকত্ব নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হতে পারে। অপর পক্ষে মাতৃত্ব নিয়ে একটি নারীর কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই, এখানে নিশ্চয়তা শতভাগ, তা সেটা যে শুক্রাণু দিয়েই নিষিক্ত হোক না কেন! কাজেই যৌনতার ক্ষেত্রে অবিশ্বস্ততা কেবল একটি পুরুষের (জেনেটিক) পিতৃত্ব থেকে বঞ্চিত করতে পারে, নারীর মাতৃত্ব থেকে নয়।… এ সকল কারণে, বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, যৌনতার অবিশ্বস্ততার ক্ষেত্রে কোনো আলামত পাওয়া গেলে নারীদের চেয়ে পুরুষেরাই অধিকতর বেশি মনক্ষুণ্ণ হবে।

চিত্র। পেজ ১১১

চিত্র: অধ্যাপক ডেভিড বাস সহ অন্যান্য গবেষকেরা তাদের গবেষণায় দেখেছেন পুরুষেরা নারীদের চেয়ে অনেক বেশি ‘সেক্সুয়াল জেলাসি’তে ভোগে। যৌনতার অবিশ্বস্ততার ক্ষেত্রে কোনো আলামত পাওয়া গেলে নারীদের চেয়ে পুরুষেরাই অধিকতর বেশি মনক্ষুণ্ণ হয়।

পুরুষেরা বেশি মনক্ষুণ্ণ হবে কারণ, বিবর্তনীয় পরিভাষায় প্রতারিত পুরুষের সঙ্গী গর্ভধারণ করলে তাকে অর্থনৈতিক এবং মানসিকভাবে অন্যের সন্তানের পেছনে অভিভাবকত্বীয় বিনিয়োগ করতে হবে, যার মুল্যমান জৈববৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে অনেক বলে মনে করা হয়। মূলত তার অভিভাবকত্বের পুরোটুকুই বিনিয়োগ করতে হবে এমন সন্তানের পেছনে যার মধ্যে নিজের কোনো বংশাণুর ধারা বহমান নেই। স্বার্থপর জিনের দৃষ্টিকোণ থেকে এটা এক ধরনের অপচয়ই বটে। নিজের পিতৃত্বের ব্যাপারে সংশয়ী থাকতে হওয়ায় বিবর্তনীয় যাত্রাপথে পুরুষের মানসপট যৌনতার ব্যাপারে ঈর্ষান্বিত হয়ে গড়ে উঠেছে, কিন্তু নারীরা মাতৃত্বের ব্যাপারে নিশ্চিত থাকায়, তা হয়নি[১১৯]।

অবশ্য স্বার্থপরভাবে নিজের জেনেটিক ধারা তার সঙ্গীর মাধ্যমে যেন বাহিত হয়, তা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা মানুষ ছাড়া অন্য প্রাণীর মধ্যেও দেখা যায়। যেমন, পুরুষ ভেলিড মাকড়শা (veliidae water spider) তার সঙ্গীকে কজা করার পর কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত শুয়ে থাকে, যাতে সঙ্গম করুক আর নাই করুক, অন্তত অন্য পুরুষ মাকড়শা যেন তার সঙ্গীর দখল নিতে চেষ্টা না পারে। Plecia nearcticas নামের এক ধরনের পতঙ্গের (জনপ্রিয়ভাবে ‘লাভ বাগ’ হিসেবে পরিচিত) নিষেকের ক্ষেত্রেও পুরুষ পতঙ্গটি বেশ কয়েকদিন ধরে স্ত্রী পতঙ্গটিকে জড়িয়ে ধরে রাখে, যাতে অন্য কোনো পতঙ্গ এসে এর নিষেক ঘটাতে না পারে। আবার, এক ধরনের ফলের মাছি আছে যাদের শুক্ররসের মধ্যে একধরনের বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ থাকে, যা স্ত্রী-যোনিতে গিয়ে পূর্বাপর সকল শুক্রাণুকে ধ্বংস করে দেয়, এবং প্রকারান্তরে নিশ্চিত করতে চায় যে, কেবল তার শুক্রাণু দিয়েই নিষেক ঘটুক[১২০]। কিছু মথ এবং প্রজাপতির ক্ষেত্রে শুক্ররসের মধ্যে বিদ্যমান কিছু রাসায়নিক পদার্থ ‘সঙ্গম রোধনী’ (copulatory plug) হিসেবে কাজ করে। এর ফলে যোনির মধ্যে শুক্রাণু ঢুকে ডিম্বাণুর প্রবেশপথে অনেকটা আঁঠার মতো আটকে থাকে যেন পরে অন্য কোনো কোনো পুরুষের শুক্রাণু সেঁধিয়ে গিয়ে ঝোঁপ বুঝে কোপ মারতে না পারে। তবে সবচেয়ে চরম উদাহরণ আমি পেয়েছি Johannseniella nitida নামের এক ধরনের মাছির ক্ষেত্রে, সঙ্গম শেষে যাদের পুরুষের লিঙ্গ ভেঙে ভিতরে রয়ে যায়। এ যেন অনেকটা সঙ্গমান্তে নারীর যোনি ছিপি দিয়ে আটকে দেয়া যেন অন্য প্রতিযোগীরা এর পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে না পারে। যদিও কীট পতঙ্গের সাথে মানুষের পার্থক্য উল্লেখ করার মতোই বিশাল, কিন্তু তারপরেও সঙ্গীকে নিজের অধিকারে রাখার ব্যাপারে স্ট্র্যাটিজিগতভাবে মিল লক্ষণীয়[১২১]। দুর্ভাগ্যবশত অন্য পতঙ্গের মতো মানুষের শুক্রাণুতে সঙ্গমরোধনী আঁঠাও নেই, কিংবা পুরুষাঙ্গ ভেঙে যোনিতেও থেকে যায় না, তবে বিভিন্ন সমাজে পর্দা, বোরখা আর হিজাবের বেপরোয়া প্রয়োগ দেখা যায় বৈকি। এগুলো তো এক ধরনের ছিপিই বলা চলে, কারণ এর মাধ্যমে পুরুষেরা নিশ্চিত করতে চায় যে, এ নারী অন্যের কামুক দৃষ্টি এড়িয়ে কেবল তারই অধিকারভুক্ত হয়ে থাকুক।

পুরুষদের ঈর্ষার ব্যাপারটা না হয় বোঝা গেল। কিন্তু মেয়েদেরটা? মেয়েদেরও ঈর্ষাহয়, প্রবলভাবেই হয়–তবে, বিবর্তন মনোবিজ্ঞানীদের অভিমত হলো–সেটাঠিক ‘সেক্সুয়াল জেলাসি’ নয়। মেয়েরা বিবর্তনীয় পটভূমিকায় একজন পুরুষকে রিসোর্স বা সম্পদ হিসেবে দেখে এসেছে। কাজেই একজন পুরুষ একজন দেহপসারিণীর সাথে যৌনসম্পর্ক করলে মেয়েরা যত না ঈর্ষান্বিত হয়, তার চেয়ে বেশি হয় তার স্বামী বা পার্টনার কারো সাথে রোমান্টিক কিংবা ‘ইমোশনাল’ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লে। ডেভিড বাস, ওয়েসেন এবং লারসেনের নানা গবেষণায় এর সত্যতা মিলেছে[১২২]। এখানে আমি আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার উল্লেখ করব। প্রাথমিক একটি গবেষণার সন্ধান পাওয়া যায় ১৯৭৮ সালের একটি গবেষণাপত্রে[১২৩]। ২০ জন পুরুষ এবং ২০ জন নারীকে নিয়ে পরিচালিত সেই গবেষণায় ঈর্ষাপরায়ণ হওয়ার বিভিন্ন উপলক্ষ্য থেকে যে কোনো একটি বেছে নিতে বলা হয়। অপশনগুলোর মধ্যে তার সঙ্গীর অন্য কারো সাথে যৌনসম্পর্ক স্থাপন থেকে শুরু করে সঙ্গীর সময় এবং সম্পদ অন্য কারো জন্য বরাদ্দ করার মতো সব পথই খোলা ছিল। দেখা গেল বিশ জন নারীর মধ্যে সতের জনই সেই অপশন বাছাই করেছে যেখানে তার সঙ্গী অন্য কারো জন্য নিজের সময় এবং সম্পদ ব্যয় করছে। কিন্তু অন্য দিকে বিশ জন পুরুষ সদস্যদের মধ্যে ষোল জনই অভিমত দিয়েছে তার সঙ্গী অন্য কারো সাথে যৌনসম্পর্ক গড়ে তুললে সেটা তাকে সবচেয়ে বেশি ঈর্ষাপরায়ণ করে তুলবে। এধরনের আরেকটি গবেষণা সত্তুরের দশকে চালানো হয়েছিল পনেরোটি দম্পতির মধ্যে[১২৪]। সে গবেষণা থেকেও একইভাবে উঠে এসেছিল যে, পুরুষেরাঈর্ষাপরায়ণ হয়ে উঠেযদি তার সঙ্গীর সাথে কোনো তৃতীয়পক্ষের যৌনসম্পর্কের কোনো আলামত পাওয়া যায়। কিন্তু মেয়েদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য থেকে জানা যায়, তারা বেশি ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে উঠে যদি তার সঙ্গী অন্য কোনো মেয়ের সাথে আবেগী কিছু করলে যেমন টাংকি মারা, রোমান্টিক সম্পর্কে জড়ানো, চুমু খাওয়া, এমনকি এগুলো কিছু না করে তার সঙ্গী পুরুষটি অন্য নারীর সাথে কেবল দীর্ঘক্ষণ ধরে কথাবার্তা বললেও সে ঈর্ষান্বিত হয়ে ওঠে। এ গবেষণাগুলো থেকে বোঝা যায়, ছেলেরা তার সঙ্গী কার সাথে কতটুকু কথা বলল না বলল তা নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন থাকেনা, যতটা থাকে সঙ্গীর যৌনতার বিশ্বস্ততার ব্যাপারে। কিন্তু অন্যদিকে মেয়েদেরটা একটু ভিন্ন। তাদের সঙ্গী অন্য কোনো মেয়ের জন্য কতটুকু সময় এবং সম্পদ ব্যয় করল, তা তাদের উদ্বিগ্ন করে তুলে।

এ ব্যাপারে বড়সড় গবেষণা করেছেন অস্টিনের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তন মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ডেভিড বাস। ৫১১ জন কলেজ ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে চালানো এ গবেষণায় তাদের কল্পনা করতে বলা হয় যে, তার সঙ্গী কারো সাথে যৌনসঙ্গমে প্রবৃত্ত হয়েছে কিংবা কারো সাথে মানসিক আবেগময় এক ধরনের সম্পর্ক তৈরি করেছে। কোন ব্যাপারটা তাকে বেশিঈর্ষাকাতর করে তুলবে? প্রায় ৮৩ শতাংশ নারী মনেকরেছে তার সঙ্গী তাকে না জানিয়ে অন্য কোনো মেয়ের সাথে আবেগময় সম্পর্ক গড়ে তুললে সেটা তাকে ঈর্ষাপরায়ণ করে তুলবে, কিন্তু ছেলেদের ক্ষেত্রে সেটি মাত্র শতকরা ৪০ ভাগ। অন্যদিকে শতকরা ৬০ ভাগ ছেলে মত দিয়েছে তার সঙ্গী তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে অন্য কারো সাথে দৈহিক সম্পর্ক গড়ে তুললে সেটা তাকে চরম ঈর্ষাকাতর করে ফেলবে। মেয়েদের ক্ষেত্রে সেটা পাওয়া গেছে মাত্র ১৭ ভাগ[১২৫]। বাসের এই ফলাফল কেবল আমেরিকার গবেষণা থেকে পাওয়া গেলেও পরবর্তীতে কোরিয়া, জাপান, চীন, সুইডেনসহ অনেকে দেশেই একই ফলাফল পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে[১২৬]। একই ধরনের ফলাফলের দাবি এসেছে হাঙ্গেরি, মেক্সিকো, নেদারল্যান্ডস, সোভিয়েত রাশিয়া এবং যুগোস্লাভিয়াতে চালানো সমীক্ষা থেকেও[১২৭]। তাই বিবর্তন মনোবিজ্ঞানীরা ধারণা করেন নারী-পুরুষে এই ঈর্ষাগত পার্থক্য সমগ্র মানবজাতির মধ্যেই পারিসাংখ্যিক পরিসীমায় বিস্তৃত। ধারণা করা হয় বিবর্তনের দীর্ঘদিনের যাত্রাপথে নিজের সঙ্গীকে ধরে রাখার অভিপ্রায়ে আমাদের পূর্বপুরুষরা যেভাবেঈর্ষা প্রদর্শন করে প্রজননগত সফলতা পেয়েছিল, তার বিবিধ ছাপই দেখা যায় আজকের নারী-পুরুষদের মানসপটে। বলাবাহুল্য, নারী এবং পুরুষেরা ভিন্নভাবে সঙ্গী নিজেদের আয়ত্বে রাখার কৌশল করায়ত্ব করেছিল, সেই পার্থক্যসূচক অভিব্যক্তিগুলোই স্পষ্ট হয় নারী পুরুষের ঈর্ষাকেন্দ্রিক মনোভাব ঠিকমতো বিশ্লেষণ করলে।

তবে সবাই যে অধ্যাপক বাসের এ উপসংহারগুলোর সাথে একমত পোষণ করেছেন তা নয়। যেমন করেননি নর্দার্ন ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের অধ্যাপক ডেভিড বুলার। তিনি তার বই ‘অভিযোজনরত মনন’ (Adapting Minds) বইয়ে[১২৮] এবং বেশ কিছু প্রবন্ধে অধ্যাপক বাসের ঈর্ষা সংক্রান্ত গবেষণাগুলোর পদ্ধতিগত সমালোচনা হাজির করেছেন[১২৯]। পুরুষেরা কেবল সঙ্গীর যৌনতার ক্ষেত্রে অবিশ্বস্ততার সন্ধান পেলেই কেবল ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠেন, অন্য কিছুতে তেমন নয় বলে বাস যে অভিমত দিয়েছেন, তা সঠিক নয় বলে বুলার মনে করেন। আমরা জীবনানন্দ দাশের আকাশলীনা কবিতায় যুবককে দেখেছি সুরঞ্জনা এক অচেনা যুবকের সাথে যৌনসম্পর্ক স্থাপন নয়, কেবল কথা বলাতেই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে। এ ধরনের অনেক পুরুষই আমাদের চারপাশে আছে। আবার যৌনতার ব্যাপারেও উদার পুরুষের সংখ্যাও কম নয়। যেমন, অধ্যাপক বাসের গবেষণা থেকেই উঠে এসেছে যে, জার্মানি কিংবা নেদারল্যান্ডের মতো দেশে যেখানে যৌনতার ব্যাপারগুলো অনেক শিথিল, সেখানে পুরুষেরা সঙ্গীর যৌনতার ব্যাপারে অনেক কম ঈর্ষাপরায়ণ থাকেন। কোরিয়া এবং চীনের মানুষদের উপর গবেষণা করেও দেখা গেছে সেখানকার পুরুষেরা সঙ্গীর যৌনতার ক্ষেত্রে অবিশ্বস্ততার আলামত পেলে অন্য অনেক দেশের পুরুষদের মতো খুব বেশি মনক্ষুণ্ণ হন না। আবার নারীদের ক্ষেত্রেও তারা কেবল সঙ্গীর রোমান্টিক কিংবা ‘ইমোশনাল’ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়াকে বেশি গুরুত্ব দেয়, সঙ্গীর রোমান্সবিহীন যৌন সম্পর্ককে নয় বলে ঢালাওভাবে উপসংহার টানা হয়েছে সেটাও কতটুকু নিশ্চিত সে প্রশ্ন থেকেই যায়। আমরা কিছুদিন আগেই দেখেছি ক্যালিফোর্নিয়ার ভূতপূর্ব গভর্নর এবং খ্যাতিমান অভিনেতা আর্নল্ড শোয়ার্সনেগার এবং তার স্ত্রী মারিয়া শ্রাইভারের দীর্ঘ পঁচিশ বছরের বৈবাহিক সম্পর্ক ভেঙে যেতে। আর্নল্ড শোয়ার্সনেগার বিবাহিত সম্পর্কের বাইরে তার বাসার গৃহপরিচারিকার সাথে যৌনসম্পর্ক রেখেছিলেন। এমন নয় যে, শোয়ার্সনেগার পরিচারিকার সাথে কোনো রোমান্টিক সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন। যৌনতার ক্ষেত্রে অবিশ্বস্ততার আলামত পাওয়াতেই মারিয়া শ্রাইভার শোয়ার্সনেগারকে ছেড়ে চলে গেছেন। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী নারীরা সঙ্গীর যৌন-অবিশ্বস্ততাকে খুব গুরুত্ব দিয়েই গ্রহণ করে, অধিকাংশ পুরুষের মতোই। তাই অধ্যাপক বুলারের মতে বিবর্তন পুরুষ নারীতে ঈর্ষার কোনো ‘আলাদা মেকানিজম’ তৈরি করেনি, বরং নারী পুরুষ উভয়ই ঈর্ষাকেন্দ্রিক একই মেকানিজমের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, কেবল এর পরিস্ফুটন পরিস্থিতিভেদে ভিন্ন হয়।

.

 ঈর্ষার পরিণাম

এখন কথা হচ্ছে ঈর্ষার পরিণাম কীরকম হতে পারে? ছোটখাটো সন্দেহ, ঝগড়াঝাটি, দাম্পত্য কলহ, ডিভোর্স থেকে শুরু করে গায়ে হাত তোলা, মারধোর থেকে শুরু করে হত্যা পর্যন্ত গড়াতে পারে, তা সবাই মোটামুটি জানেন। যেহেতু অধিকাংশ বিবর্তনবাদী মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন যে, ‘সেক্সুয়াল জেলাসি’ জৈবিক কারণে পুরুষদেরই বেশি, তারাই পরকীয়া কিংবা কোকিলাচরণের কোনো আলামত সঙ্গীর মধ্যে পেলে গড়পড়তা বেশি সহিংস আচরণ করে।

সঙ্গী ‘অযাচিত’ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে এই সন্দেহ একজন ঈর্ষাপরায়ণ পুরুষের মনে দানা বাঁধলে তিনি কী করবেন? অনেক কিছুই করতে পারেন। হয়তো স্ত্রী বা সঙ্গী একা বাড়ি থেকে বেরুলে গোপনে তার পিছু নেবেন, হয়তো অফিসে গিয়ে হঠাৎ করেই ফোন করে বসবেন জানতে তার স্ত্রী বা সঙ্গী এখন ঠিক কী করছেন, খোঁজ-খবর নেবেন মার্কেটে যাওয়ার কথা বলে স্ত্রী আসলেই মার্কেটে গিয়েছে নাকি ঢুকে গিয়েছে তার গোপন প্রেমিকের ঘরে। তিনি চোখে চোখে রাখবেন তার সঙ্গী কোনো পার্টিতে, বিয়ে বাড়িতে কিংবা জন্মদিনের অনুষ্ঠানে গেলে কী করেন, কোথায় কার সাথে আড্ডা মারেন। সঙ্গীর অবর্তমানে গোপনে তার ইমেইল পড়বেন, কিংবা সেলফোনের টেক্সটে নজর বুলাবেন, ইত্যাদি। এই আচরণগুলোর সমন্বিত একটি নাম আছে বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের অভিধানে ভিজিলেন্স (vigilance); এর বাংলা আমরা করতে প্রি ‘শকুনাচরণ’। শকুন যেমন উপর থেকে নজর রাখে তার শিকারের প্রতি, ঈর্ষাপরায়ণ পুরুষের আচরণও হয়ে দাঁড়ায় তার সঙ্গীর প্রতি অনেকটা সেরকমের।

ভিজিলেন্সের পরবর্তী কিংবা ভিন্ন একটি ধাপ হতে পারে ভায়োলেন্স (violence) বা সহিংসতা। সহিংসতার প্রকোপ অবশ্য ক্ষেত্রবিশেষে ভিন্ন হয়। কখনো সঙ্গীর গায়ে হাত তোলা, কখনো বা সন্দেহের তালিকাভুক্ত গোপন প্রেমিককে খুঁজে বের করে করে থ্রেট করা, বাড়ি আক্রমণ করা, বেনামে ফোনে হুমকি-ধমকি দেয়া, কিংবা নিজে গিয়ে কিংবা গুন্ডা লেলিয়ে পিটানো, প্রকাশ্যে হত্যা, গুম, খুন ইত্যাদি। রাষ্ট্রীয় আইনে ভিজিলেন্স বা শকুনাচরণ অপরাধ না হলেও ভায়োলেন্স বা সহিংসতা অবশ্যই অপরাধ। কিন্তু অপরাধ হলেও এটা কিন্তু অনেক পুরুষেরই মনোসঞ্জাত স্ট্র্যাটিজি, যা তারা সুযোগ পেলেই ব্যবহার করেছে ইতিহাসের যাত্রাপথে সে কথা কারো অজানা নয়।

এ ক্ষেত্রে ১৯৮০ সালের দিকে পত্রপত্রিকায় সাড়া জাগানো ক্যানাডিয়ান মডেল এবং অভিনেত্রী ডরোথি স্ট্র্যাটেন হত্যার উল্লেখ বোধ হয় অপ্রাসঙ্গিক হবে না। অনিন্দ্য সুন্দরী ডরোথি স্ট্র্যাটেন তখন কানাডার সেন্টিনিয়াল হাইস্কুলে পড়ছিলেন, আর বাড়ির পাশে ‘ডেইরি কুইন’ নামের ফাস্ট ফুড রেস্তরাঁয় কাজ করতেন। রেস্তরাঁয় কাজ করতে গিয়েই পল স্নাইডার নামে এক লোকের সাথে পরিচয় হয় তার। অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের ভাবের আদানপ্রদান–পরিচয় থেকে পরিণয়। ডরোথি স্ট্র্যাটেনের বয়স তখন ১৭। আর স্নাইডারের ২৬। পরিচয়ের পর থেকেই স্নাইডার ডরোথিকে বোঝাতে পেরেছিলেন যে, ডরোথির একটি চমৎকার সুন্দর মুখশ্রী আর আকর্ষণীয় দেহবল্লরী আছে, যা মডেল হবার জন্য একেবারে নিখুঁত। ডরোথি প্রথমে রাজি না হলেও স্নাইডারের চাপাচাপিতে বাধ্য হয়ে কিছু ছবি তুলেন। স্নাইডারই তোলেন সে ছবিগুলো তার নিজস্ব ক্যামেরায়। তারপর তা পাঠিয়ে দেন হিউ হেফনারের কাছে। হিউ হেফনার প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রতিষ্ঠাতা। স্নাইডার হেফনারের কাছ থেকে উত্তর পেলেন দুই দিনের মধ্যেই।

এরপরের সময়গুলো ডরোথি স্ট্র্যাটেনের জন্য খুবই পয়মন্ত। তিনি হিউ হেফনারের বিখ্যাত ‘প্লেবয় প্রাসাদে গিয়ে উঠলেন স্নাইডারকে সাথে নিয়ে। শুরু হলো ডরোথির প্লেবয় মিশন। তিনি ১৯৭৯ সালে নির্বাচিত হলেন প্লেবয়। ম্যাগাজিনের ‘মাসের সেরা প্লে মেট’ হিসেবে। ১৯৮০ সালে তিনি হন বর্ষসেরা। প্লেবয়ের পাঠককূল যেন আক্ষরিক অর্থেই ডরোথির পরিষ্কার চামড়া এবং প্রতিসাম্যময় দেহ, লাস্যময় কিন্তু নিষ্পাপ মুখশ্রী, আর নির্মল চাহনি দিয়ে আবিষ্ট ছিল সেসময়। রাতারাতি ডরোথি বনে গেলেন তারকা। আর অন্যদিকে স্নাইডারের অবস্থা রইলো আগের মতোই চাকরিবাকরিবিহীন, হতাশাগ্রস্ত। হেফনারের কাছেও স্নাইডার তেমন কোন সহনীয় কিছু ছিল না। একদিন প্লেবয় প্রাসাদ থেকে স্নাইডারকে তাড়িয়েই দেয়া হলো। প্রাসাদরক্ষীকে বলে দেয়া হলো যে, তিনি যেন স্নাইডারকে বাড়ির ত্রিসীমানায় না দেখেন।

চিত্র। পেজ ১১৭

চিত্র : ডরোথি স্ট্র্যাটেন (১৯৬০– ১৯৮০)

এদিকে ডরোথিকে নিয়ে শুরু হলো হেফনারের ম্যালা পরিকল্পনা। তাকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হলো হলিউডের নায়ক, নায়িকা আর খ্যাতিমান পরিচালকদের সাথে। এদের মধ্যে ছিলেন হলিউডের উঠতি পরিচালক পিটার বোগদানোভিচ। পিটার তখন ইতোমধ্যেই ‘পেপার মুন’ (১৯৭৩) আর ‘দ্য লাস্ট পিকচার শো’ (১৯৭১)’র মতো জনপ্রিয় ছবি তৈরি করে ফেলেছেন। তিনি ডরোথিকে দেখেই তার ভবিষ্যৎ ছবির নায়িকা হিসেবে মনোনীত করে ফেললেন। ডরোথির জন্য এ যেন আকাশের চাঁদ পাওয়া। অবশ্য বর্ষসেরা প্লেবয় হিসেবে মনোনয়নের কারণে ইতোমধ্যেই ডরোথি পরিচিত হয়ে উঠেছেন বিভিন্ন মহলে। তিনি অভিনয় শুরু করেছেন বাক রজার্স এবং ফ্যান্টাসি আইল্যান্ডের মতো টিভি সিরিয়ালে।

ডরোথির দিনকাল ভালোই চলছিল। পিটার বোগদাননাভিচের ‘দে অল লাফড’ ছবিতে অভিনয় শুরু করেছেন। এটিই তার প্রথম ছবি। অন্যদিকে তার সঙ্গী পল স্নাইডার চাকরিবাকরিবিহীন। গ্ল্যামারাস ডরোথির পাশে চলচিত্র জগতে অচ্ছুৎ স্নাইডার ‘নিতান্তই বেমানান’ হয়ে উঠছেন ক্রমশ। কিন্তু তিনি তখনো ডরোথিকে বিয়ের জন্য চাপ দিয়ে যাচ্ছিলেন। ডরোথিও প্রথমে না করেন নি, কারণ আফটার অল– পল স্নাইডারের কারণেই প্লেবয়ের মাধ্যমে তার খ্যাতির যাত্রা শুরু হয়েছিল। ডরোথি স্নাইডারকে বিয়ে করতে রাজি হলেন বটে কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই অনিবার্যভাবে প্রেমে পড়ে গেলেন পিটার বোগদানোভিচের। স্নাইডারকে এড়িয়ে চলতে শুরু করলেন ডরোথি। তার সাথে বিচ্ছেদের চিন্তা শুরু করেছেন তিনি।

বেপরোয়া পল স্নাইডার শেষবারের মতো ডরোথির সাথে দেখা করতে চাইলেন। যদিও ডরোথির বন্ধুবান্ধব তাকে স্নাইডারের সাথে সকল ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করতে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছিলেন, ডরোথি ভাবলেন—হোয়াট দ্য হেক, এই একবারই তো। তিনি ভাবলেন যে মানুষটার সাথে এতদিনের একটা সম্পর্ক ছিল, যার কারণে তিনি এই খ্যাতির সিঁড়িতে তার সাথে দেখা করে কিছুটা কৃতজ্ঞতার ঋণ শোধ করলে ক্ষতি কী!

সেই ভাবাই তার কাল হলো। ১৯৮০ সালের ১৪ই অগাস্ট ডরোথি স্নাইডারের সাথে দেখা করলেন। সাথে তার হ্যান্ডব্যাগে নিলেন এক হাজার ডলার। ভাবলেন এ টাকাগুলো স্নাইডারের হাতে তুলে দিলে স্নাইডারের রাগ ক্ষোভ কিছুটা হলেও কমবে, আর তা ছাড়া চাকরিবাকরিবিহীন স্নাইডারের টাকার দরকার নিঃসন্দেহে। কিন্তু স্নাইডারের মাথায় ছিল ভিন্ন পরিকল্পনা। তিনি তার শটগান ডরোথির মাথায় তাক করে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে গুলি করলেন। হত্যা করলেন ডরোথিকে। পুলিশ পরে বাসায় এসে রক্তের বন্যায় ভেসে যাওয়া ডরোথির নিথর দেহ আবিষ্কার করলেন। যে নির্মল চাহনি আর নিষ্পাপ মুখশ্রী এতোদিন আবিষ্ট করে রেখেছিল ডরোথির ভক্তদের, হাজার হাজার ম্যাগাজিনের কভার পেজে যে মুখের ছবি এতোদিন ধরে আগ্রহভরে প্রকাশ করেছেন পত্রিকার প্রকাশকেরা, সেই মুখ বিধ্বস্ত। রক্তস্নাত বিকৃত মুখ, ফেটে যাওয়া মাথার খুলি আর এখানে ওখানে ছড়িয়ে পড়া মগজের মাঝে পড়ে থাকা নগ্ন দেহ ডরোথির। দেহে নির্যাতন আর ধর্ষণের ছাপও ছিল খুব স্পষ্ট।

স্নাইডারের ঈর্ষাপরায়ণতার মর্মান্তিক বলি হলেন ডরোথি। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস মৃত্যুর কিছুদিন আগের এক সাক্ষাৎকারে ডরোথি তার সবচেয়ে অপছন্দনীয় বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন ঈর্ষাপরায়ণতা! মাত্র বিশ বছর বয়সেই পৃথিবীর সমস্ত রূপ রস ভালোবাসা ছেড়ে অজানার পথে পাড়ি জমাতে হলো ডরোথিকে। স্নাইডার নিজেও আত্মহত্যা করেন ডরোথিকে হত্যার পর পরই। ব্যাপারটিকে সাদা চোখে জিঘাংসার জের বলে মনে হলেও সেটি আরেকটু গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে। ডরোথি ছিলেন সুন্দরী, কিন্তু নিজের সৌন্দর্য নিয়ে তিনি তেমন সচেতন হয়তো ছিলেন না যখন তিনি ডেইরি কুইন রেস্তরাঁয় পার্ট টাইম কাজ করতেন। প্লেবয় ম্যাগাজিনের বর্ষসেরা প্লে মেট নির্বাচিত হবার পরই তিনি বুঝতে পারেন যে তিনি পরিণত হয়েছেন বহু শিক্ষা দীক্ষা গুণমান সমৃদ্ধ রথী মহারথী পুরুষের হার্টথ্রবে। অর্থাৎ খুব স্বল্প সময়ের মধ্যেই বাজারে ডরোথির ‘মেটিং ভ্যালু’ বেড়ে গিয়েছিল অনেকগুণ। আর অন্যদিকে স্নাইডার ছিলেন চালচুলোহীন, চাকরিবাকরিবিহীন বেকার যুবক। তিনি অর্থবিত্তে বলীয়ান সামাজিক প্রতিপত্তিশালী হেফনার কিংবা পিটার বোগদানোভিচদের সাথে পাল্লা দিয়ে পারবেন কেন? তার মেটিং ভ্যালু ছিল পড়তির দিকে। প্রতিযোগিতায় হেরে যাওয়ার, অর্থাৎ এতদিনের সুন্দরী সঙ্গী ‘হাত ছাড়া হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাই ঈর্ষান্বিত করে তুলেছিল স্নাইডারকে। ভিজিলেন্স থেকে তিনি বেছে নিয়েছিলেন ভায়োলেন্সের পথ। বিবর্তন মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, বিবর্তনীয় যাত্রাপথে নারীরা পুরুষ সঙ্গীদের এক ধরনের ‘সম্পদ’-এর যোগান হিসেবে চিহ্নিত করে এসেছে[১৩০]। অর্থবিত্ত, ভালো চাকরি, সামাজিক পদমর্যাদা, প্রভাব-প্রতিপত্তি পুরুষদের জন্য খুব বড় ধরনের মেটিং ভ্যালু। কাজেই চাকরি হারানো কিংবা চাকরি না থাকার মানে সম্পদের যোগান বন্ধ। মেয়েরা সঙ্গী নির্বাচনের সময় চাকরিদার এবং সামাজিকভাবে প্রতিপত্তিওয়ালা ছেলেদের পছন্দ করে। এগুলো না থাকলে মেটিং ভ্যালু কমে আসবে। স্নাইডারের ক্ষেত্রে ঠিক এটিই ঘটেছিল। ব্যাপারটাকে সামাজিক স্টেরিওটাইপিং বলে মনে হতে পারে, কিন্তু পুরুষদের জন্য চাকরিবাকরি না করে বেকার বসে থাকাটা কোনো অপশনই নয় বিয়ের বাজারে কিংবা এমনিতেই সামাজিকভাবে, কিন্তু বহু সমাজেই মেয়েদের জন্য তা নয়। আমার ব্যক্তিগত জীবনের উদাহরণ টানি এ প্রসঙ্গে। স্বভাবে আমরা দুজনেই ঘরকুনো হলেও চাপে পড়ে আমাকে আর বন্যাকে মাঝেমধ্যেই কোনো দেশি পার্টিতে যেতে হয় এই আটলান্টায়। অনেক সময়ই নতুন কারো সাথে দেখা হয়, পরিচয়ের এক পর্যায়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয়–”ভাই আপনি কোথায় চাকরি করেন?’ বন্যার ক্ষেত্রে ঠিক তা হয় না। তার দিকে প্রশ্ন আসে ‘আপা/ভাবী, আপনি বাসায় থাকেন নাকি চাকরি করছেন?’ এ থেকে বোঝা যায় নারীদের ক্ষেত্রে চাকরি না করাটা একটা অপশন মনে হলেও ‘ভালো স্বামীর ক্ষেত্রে তা হয় না কখনোই, তা তিনি যতই শখের বসে বইপত্তর লিখুন কিংবা ব্লগ করুন! সেজন্যই চাকরি না থাকলে একজন নারী যতটা না পীড়িত হয়, একজন পুরুষকে তার বেকার জীবন পীড়িত করে ঢের বেশি। তারা হয়ে উঠে হতাশাগ্রস্ত এবং সর্বোপরি এই ভঙ্গুর সময়টাতেই তারা সঙ্গী হারানোর ভয়ে হয়ে উঠে চিন্তিত এবং ঈর্ষান্বিত। জীববিজ্ঞানী রবিন বেকার এবং মার্ক বেলিস ইংল্যান্ডে চালানো তাদের একটি গবেষণায় দেখিয়েছেন, একজন বিবাহিত নারী যখন অন্য কোনো পুরুষের সাথে পরকীয়ায় জড়ায়, সেই পুরুষের চাকরির স্ট্যাটাস, প্রতিপত্তি, সামাজিক অবস্থান প্রভৃতি তার বর্তমান স্বামীর চেয়ে সাধারণত বেশি থাকে[১৩১]। অন্য আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, শতকরা ৬৪ ভাগ ক্ষেত্রে একজন পুরুষ তার সঙ্গীকে হত্যা করে যখন সে থাকে চাকরিবাকরিবিহীন একজন বেকার ভ্যাগাবন্ড[১৩২]।

বাংলাদেশের সংবাদপত্র এবং মিডিয়া ছিল আলোচনার তুঙ্গে। ঘটনাটি হলো ব্রিটিশ কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রুমানা মঞ্জুর দেশে থাকাকালীন সময়ে তার স্বামী হাসান সাঈদের হাতে রক্তাক্ত হয়েছেন, ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন। আঁচড়ে কামড়ে নাক ঠোঁট গালের মাংস খুবলে নেওয়া হয়েছে। চোখে আঙুল ঢুকিয়ে তার চোখ উপড়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। রুমানাকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে বাংলাদেশ এবং ভারতের হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠিয়েও লাভ হয়নি, রুমানার দুটো চোখই অন্ধ হয়ে গেছে।

হাসান সাঈদের এই ‘পশুসুলভ আচরণে স্তম্ভিত হয়ে গেছে সবাই। কী ভীষণ কুৎসিত মন মানসিকতা থাকলে শুধু সঙ্গীনীকে কেবল মারধোর নয়, রীতিমত নাক কান গাল কামড়ে ছিঁড়ে নেওয়া যায়, আঙুল ঢুকিয়ে চোখ উপড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা যায়। পত্রপত্রিকা, ফেসবুক আর ব্লগে চলছিল আলোচনা, প্রতিবাদের ঝড়। কেউ দুষছেন পুরুষতন্ত্রকে, কেউ বা ধর্মকে, কেউ বা আবার দোষারোপ করছেন দেশের আইন-কানুনকে। আবার কিছু মহল থেকে তাকে পাগল প্রতিপন্ন করার চেষ্টাও হয়েছে।

চিত্র। পেজ ১২০

চিত্র : আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রুমানা গত ৫ জুন স্বামী হাসান সাঈদের মারাত্মক নির্যাতনের শিকার হন।

না হাসান সাঈদ পাগলছাগল কিছুই নন, বরং বিবর্তন মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে তিনি নারীর কাছে মেটিং ভ্যালু কমে যাওয়া একজন হীনম্মন্য ঈর্ষাপরায়ণ পুরুষ যার শকুনাচরণ ক্রমশ রূপ নিয়েছিল নিষ্ঠুর পুরুষালি সহিংসতায়। সাঈদ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী, সে বুয়েটের পড়ালেখা সে শেষ করতে পারেনি, ইটের ভাটি সিএনজি-সহ বিভিন্ন ব্যবসায় হয়েছে ব্যর্থ। সম্প্রতি শেয়ারেও খেয়েছে লোকসান। অন্যদিকে রুমানা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সফল শিক্ষিকা, ব্রিটিশ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সের শেষ পর্যায়ে। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে রুমানার মেটিং ভ্যালুর পারদ সাঈদের চেয়ে অনেক উধ্বগামী। সত্য হোক মিথ্যে হোক সাথে যোগ হয়েছিল ইরানি যুবক তাহের বিন নাভিদ কেন্দ্রিক কিছু ‘রসালো’ উপাখ্যান। সঙ্গী হারানোর ভয়ে ভীত এবং ঈর্ষান্বিত সাঈদ ঝগড়া বিবাদ কলহের স্তর পার হয়ে তার দেহ করে ফেলেছে ক্ষতবিক্ষত। মুক্তমনায় লীনা রহমান রুমানা মঞ্জুর ও নরকদর্শন’ শীর্ষক একটি চমৎকার লেখা লিখেছেন।33। লেখাটিতে সামাজিক বিভিন্ন অসঙ্গতির প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপের পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মীয় বিধিনিষেধ যেগুলো নারীকে অবদমনের ক্রীড়নক হিসেবে ব্যবহৃত হয় সেগুলো নিয়েও প্রাণবন্ত আলোচনা ছিল। কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয়। বস্তুত লীনার লেখাটির সাথে সামগ্রিকভাবে একমত হয়েও লেখাটির মন্তব্যে বলতে বাধ্য হয়েছিলাম–

রুমানার উপর অত্যাচারের পেছনে ধর্মের ব্যাপারটা কতটুকু জড়িত তা নিয়ে সন্দেহ আছে আমার। ধর্মের কারণে যে অত্যাচার হয় না তা নয়, অনেকই হয়, তবে রুমানার ক্ষেত্রে ধর্মের চেয়েও প্রবলতর ব্যাপারটি হচ্ছে পুরুষালি জিঘাংসা। নারী যখন স্বাবলম্বী হয়ে উঠে,শিক্ষা দীক্ষা, সংস্কৃতি এবং আর্থিক দিক দিয়ে তার সঙ্গীকে ছাড়িয়ে যায়, বহু পুরুষই তা মেনে নিতে পারে না। উচ্চশিক্ষায় রুমানার সফলতা সাঈদের ক্ষেত্রে তৈরি করেছে এক ধরনের হীনম্মন্যতা,ঈর্ষা আর জিঘাংসা। তারই শিকার রুমানা।

আমার বিশ্লেষণ যে ভুল ছিল না, তা দেখা গিয়েছে জনকণ্ঠে (১৮ই জুন ২০১১) প্রকাশিত প্রাথমিক রিপোর্টে। রিমান্ডের প্রথম দিনেই সাঈদ স্বীকারোক্তি দিয়েছিল– ‘নিজ হীনম্মন্যতা থেকেই রুমানার চোখ উপড়ে ফেলতে চেয়েছি’[১৩৪]।

চিত্র। পেজ ১২১

চিত্র: দু চোখ হারানো রুমানা মঞ্জুর সাংবাদিক সম্মেলনে কথা বলছেন।

রুমানা এপিসোডের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এই আলোচনায় আসবে। পুলিশের হাতে দশ দিন পর্যন্ত ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকা এই তথাকথিত স্বামী রত্নটি রুমানার চরিত্র হননে নেমেছিল। ফাঁদা হয়েছিল মিথ্যে প্রেমিকের সাথে এক রসালো গল্প। বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকাগুলো এগুলো রসালো চাটনির মতোই পরিবেশন করেছে। রাতারাতি কিছু মানুষের সমর্থনও কুড়াতে সক্ষম হলেন সাঈদ। অনেকেই ইনিয়ে-বিনিয়ে বলতে শুরু করলেন ‘এক হাতে তালি বাজে না। নিশ্চয়ই কোনো গড়বড় ছিল। পরে অবশ্য সাঈদ নিজেই স্বীকার করেছিল যে, রুমানার পরকীয়ার গল্পগুলো বানানো, মিথ্যা। আমরা আগেও দেখেছি এ ধরনের ক্ষেত্রে পুরুষদের একটাই অস্ত্র থাকে নির্যাতিত মেয়েটিকে যে কোনো ভাবে খারাপ মেয়ে ‘ হিসেবে প্রতিপন্ন করা। সেই যে ইয়াসমিনকে ধর্ষণ করেছিল পুলিশেরা। এর পরদিন পুলিশেরা যুক্তির জাল বুনে বলেছিল ইয়াসমিন বেশ্যা, খারাপ মেয়ে। যেন খারাপ মেয়ে প্রমাণ করতে পারলে খুন ধর্ষণ, চোখ খুবলে নেওয়া সব জায়েজ হয়ে যায়! আসলে সত্য কথা হলো সাঈদ বুঝতে পেরেছিল খারাপ মেয়ে প্রমাণ করতে পারলে ‘পুরুষতন্ত্রকে সহজেই হাতে রাখা যায়। ওটাই ছিল সাঈদের তখনকার ‘সারভাইভাল স্ট্র্যাটিজি’। সেজন্যই আমরা দেখলাম যে, রুমানাকে নিয়ে আগে বলা পরকীয়ার ব্যাপারগুলো সাঈদ নিজ মুখে অস্বীকার করার আগ পর্যন্ত বেশ কিছু মানুষের সহানুভূতি আদায় করে নিতে পেরেছিলেন সাঈদ। বাজারি পত্রিকা পড়ে তৈরি হওয়া জনমতের একটি বড়ো অংশ সাঈদ দোষ স্বীকারের আগ পর্যন্ত ক্রমাগত সন্দেহের তীর হেনেছে রুমানা মঞ্জুরের দিকে। শুধু পুরুষেরা নয়, এমনকি অনেক নারীও রুমানার প্রতি সন্দেহের ‘অনেক আলামত’ পেয়ে গিয়েছিলেন। এ থেকে কিন্তু বোঝা যায় পুরুষতান্ত্রিক চিন্তাভাবনা কেবল পুরুষদেরই আচ্ছন্ন করেনি, দীর্ঘদিনের কালিক পরিক্রমায় এটি অসংখ্য নারীর মানসপটেও রাজত্ব করেছে এবং এখনও করছে।

হ্যাঁ পুরুষতন্ত্রকে কষে গালি দেয়া সহজ, কিন্তু কেন পুরুষতন্ত্রের মানসপট এভাবে বিবর্তিত হয়েছে তা বিশ্লেষণ করা তেমন সহজ নয়। সহজ নয় এটি বিশ্লেষণে আনা যে পরকীয়া শুনলেই কেন জনচেতনার সহানুভূতিতে আঘাত লেগে যায়, সবাই মরিয়া হয়ে উঠে তার বিপরীতটা প্রমাণ করতে। রুমানার কলঙ্কের কাউন্টার হিসেবে রুমানা কত নিষ্কলঙ্ক আর সতী-সাধ্বী মেয়ে সেটা প্রমাণ করতে আবার কিছু পত্রিকা ফলাও করে প্রচার করতে শুরু করল রুমানা কত মৃদুভাষী ছিলেন, তিনি দিনে পাঁচবেলা নামাজ পড়তেন, মাথায় কাপড় দিয়ে কানাডার প্রতিবেশীদের সাথে দেখা করতেন, সেখানে প্রতিবেশীদের সাথে কত মিষ্টি ব্যবহার তিনি করতেন, কত ভালো রান্না করে তাদের খাওয়াতেন, বিদেশ বিভূঁইয়ে কত ভালোভাবে ইসলামি মতাদর্শ অনুযায়ী জীবনযাপন করতেন, অন্য ছেলেদের সাথে তেমন মিশতেন না, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শেষেই কানাডা থেকে স্বামী সন্তানকে ফোন করার জন্য ছুটে আসতেন, বাইরে একদমই বেরুতেন না ইত্যাদি। এ সবকিছুই আসলে সেই চিরচেনা মানসপটকে তুলে ধরে—নারীকে গড়ে উঠতে হবে পুরুষদের বানানো ছকে—কথাবার্তায় হবে মৃদুভাষী,চলনে-বলনে শান্ত-সৌম, মাথায় কাপড় টেনে চলতে হবে, স্বামীহীনম্মন্যকিংবা নপুংসক যাই হোক না কেন, তাকে নিয়েই থাকতে হবে, তার প্রতি থাকতে হবে সদা অনুগত। অনেকটা বাংলা সিনেমার এই গানটার মতো[১৩৫]—

আমি তোমার বন্ধু, তুমি আমার স্বামী
খোদার পরে তোমার আসন বড় বলে জানি …

পরকীয়া তো দূরের কথা, কোনো ধরনের অবিশ্বস্ততার আলামত পেলে খুন জখম কিংবা চোখ খুবলে নেওয়ার শাস্তিও সামাজিকভাবে লঘু হয়ে যায়। কারণ পুরুষেরা স্ত্রীদের অবিশ্বস্ততাকে প্রজননগতভাবে অধিকতর মূল্যবান বলে মনে করে। যেহেতু পিতৃতন্ত্রের মূল লক্ষ্য থাকে ‘সুনিশ্চিত পিতৃত্বে সন্তান উৎপাদন’ সেজন্য, পিতৃতান্ত্রিক সমাজে জৈবিক এবং সামাজিক কারণেই স্ত্রীর পরকীয়াকে ‘হুমকি। হিসেবে দেখা হয়। স্ত্রী পরকীয়ার ঘটনা প্রকাশিত হয়ে গেলে স্বামী ক্ষতিগ্রস্ত হয় মান সম্মান, সামাজিক পদপর্যাদা সহ বহু কিছুতেই। তিনি সমাজে পরিণত হন ইয়ার্কি ফাজলামোর বিষয়ে। এটা শুধু আমাদের দেশে নয়, অনেক দেশের জন্যই সত্য। এমনকি পাঠকেরা জেনে অবাক হবেন যে, ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত আমেরিকার টেক্সাসে এমন আইন চালু ছিল যে, অবিশ্বস্ততার আলামত পেয়ে স্বামী যদি স্ত্রীকে হত্যা করে তবে সেটি কোনো অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে না। প্রাচীন রোমে এমন আইন চালু ছিল যে, যদি স্বামীর নিজ গৃহে পরকীয়া বা ব্যাভিচারের ঘটনা ঘটে, তবে স্বামী তার অবিশ্বস্ত স্ত্রী এবং তার প্রেমিকাকে হত্যা করতে পারবেন; ইউরোপের অনেক দেশে এখনও সেসব আইনের কিছু প্রতিফলন দেখা যায়[১৩৬]। তিভ, সোগা, গিসু, নয়োরো, লুয়িয়া, লুয়ো প্রভৃতি আফ্রিকান রাজ্যে হত্যাকাণ্ডের উপর গবেষণা চালিয়ে দেখা গেছে যে, সেখানে ৪৬ শতাংশ হত্যাকাণ্ডই সংগঠিত হয় যৌনতার প্রতারণা, অবিশ্বস্ততা প্রভৃতিকে কেন্দ্র করে। একইভাবে, সুদান উগান্ডা এবং ভারতেও যৌন ঈর্ষা বা ‘সেক্সুয়াল জেলাসি’ হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হবার মূল কারণ বলে জানা গেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, যখনই স্বামী কোনো পরকীয়ার আলামত পেয়েছে, কিংবা স্ত্রী যখন স্বামীকে ত্যাগ করার হুমকি দিয়েছে তখনই সেই হত্যাকাণ্ডগুলো সংগঠিত হয়েছে। সাঈদের ক্ষেত্রেও আমরা দেখেছি স্বামীর সাথে বেশ কিছুদিন ধরেই রুমানার ঝগড়াঝাটি চলছিলে। কলহের এক পর্যায়ে রুমানা উত্তেজিত হয়ে স্বামীর সঙ্গে সংসার করতে অপারগতা প্রকাশ করেছিলেন। এরপর থেকেই মূলত রুমানাকে হত্যার পরিকল্পনা করে সাঈদ। ২১শে মে বেধড়ক মারধরের পর গলা টিপে রুমানাকে হত্যার ব্যর্থ চেষ্টা চালায়। এ সময় রুমানার চিল্কারে বাড়ির সবাই এগিয়ে গেলে সে যাত্রা পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। পরে পরিবারের হস্তক্ষেপে তা মিটমাট হয়। তারপর কিছুদিন পরে রুমানার মা মেহেরপুরে গ্রামের বাড়ি বেড়াতে গেলে ৫ই জুন আবারো হত্যার চেষ্টা চালায়। সে দিন সাঈদ রুমানাকে ঘরে ডেকে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। এ সময় উভয়ের মধ্যে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে রুমানার গলা টিপে ধরে। রুমানা সজোরে আঘাত করে নিজেকে মুক্ত করে ফেলেন। এ সময় সাঈদের চোখের চশমা পড়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে রুমানাকে বীভৎসভাবে হত্যার উদ্দেশ্যে তার গাল, নাক, মুখসহ স্পর্শকাতর স্থানে কামড়াতে থাকে। সাঈদ রুমানার নাকে কামড় দিয়ে ছিঁড়ে ফেলে। চোখে আঙুল ঢুকিয়ে চোখ উপড়ে ফেলার চেষ্টা করে …

হ্যাঁ, আমরা সবাই সাঈদের কৃতকর্মের শাস্তি চাই। কোনো সুস্থ মাথার মানুষই প্রত্যাশা করবেন না যে, এ ধরনের নৃশংস ঘটনা ঘটিয়ে সাঈদ অবলীলায় মুক্তি পেয়ে যাক, আর তৈরি করুক আরেকটি ভবিষ্যৎ-অপরাধের সুস্থিত ক্ষেত্র। বরং, তার দুষ্টান্তমুলক শাস্তিই কাম্য। কিন্তু সমাজে যখন নারী নির্যাতন প্রকট আকার ধারণ করে, যখন নৃশংসভাবে একটি নারীর গাল নাক কামড়ে জখম করা হয়, রাতারাতি চোখ খুবলে নেওয়া হয়, এর পেছনের মনস্তাত্বিক কারণগুলোও আমাদের খুঁজে বের করা জরুরি। আমাদের বোঝা দরকার কোনো পরিস্থিতিতে সাঈদের মতো লোকজনের আচরণ এরকম বিপজ্জনক এবং নৃশংস হয়ে উঠতে পারে। আমাদের অস্তিত্বের জন্যই কিন্তু সেগুলো জেনে রাখা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে একটি সুন্দর পৃথিবী তৈরির প্রত্যাশাতেই এটা দরকার।

.

সেক্সবম্ব

নীচের ছবি দুটো লক্ষ করুন।

কোন্ ছবিটিকে আপনার কাছে অধিকতর ‘প্রিয়দর্শিনী’ বলে মনে হয়? জরিপে অংশ নেওয়া অধিকাংশ পুরুষ এবং নারীই অভিমত দিয়েছেন ডান পাশেরটি অর্থাৎ ২য় ছবিটিকে।  এবারে আরেকটু ভালো করে ছবি দুটো লক্ষ করুন। দেখবেন যে ছবি দুটো আসলে একই নারীর। আসলে আরও স্পষ্ট করে বললে একটি ছবি থেকেই পরের ছবিটি তৈরি করা হয়ছে, কম্পিউটারে একটি বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহার করে। আর এটি প্রোগ্রাম করেছেন আইরিশ বংশদ্ভূত বিবর্তন মনোবিজ্ঞানী ড. ভিক্টর জনস্টন[১৩৭]। গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, ১ম ছবির সাথে ২য় ছবির পার্থক্য আসলে সামান্যই। প্রথম ছবিটির নারীর চিকন ঠোঁটকে একটু পুরু করা হয়েছে ২য় ছবিতে, চিবুকের আকার সামান্য কমিয়ে দেয়া হয়েছে, চোখের গভীরতা একটু বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আর তাতেই অধিকাংশ পুরুষের কাছে ছবিটি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু কেন?

বিজ্ঞানী ভিক্টর জনস্টন সহ অন্যান্য গবেষকদের মতে, পুরু ঠোঁট আসলে অধিক এস্ট্রোজেন জমা হয়ে মুখমণ্ডল নমনীয় থাকার লক্ষণ, আর অন্য দিকে সরু এবং চিকোনো চিবুক ‘লো টেস্টোস্টেরন’ মার্কার। এ ব্যাপারটা পুরুষদের কাছে। পছন্দনীয় কারণ এ বৈশিষ্ট্যগুলো মোটা দাগে নারীর উর্বরাশক্তির বহিঃপ্রকাশ[১৩৮]। এ অধ্যায়ের প্রথম দিকে উল্লেখ করেছিলাম সৌন্দর্য্যের উপলব্ধি কোনো বিমূর্ত ব্যাপার নয়। এর সাথে যৌন আকর্ষণ এবং সর্বোপরি গর্ভধারণক্ষমতার একটা গভীর সম্পর্ক আছে, আর আছে আমাদের দীর্ঘদিনের বিবর্তনীয় পথপরিক্রমার সুস্পষ্ট ছাপ। আমরা যখন কাউকে প্রিয়দর্শিনী বলে ভাবি, আমাদের অজান্তে আসলে সেই চিরন্তন উপলব্ধিটাই কাজ করে। আমাদের আদিম পূর্বপুরুষেরা যৌনসঙ্গী নির্বাচনের সময় এস্ট্রোজেনের মাত্রা নির্ণয়ের কোনো আধুনিক যন্ত্রপাতি খুঁজে পায়নি, তাদের কাছে সঙ্গীর পরিষ্কার চামড়া, ঘন চুল, কমনীয় মুখশ্রী, প্রতিসাম্যময় দেহ, পিনোন্নত স্তন, সুডৌল নিতম্ব আর ক্ষীণ কটিদেশ ছিল গর্ভধারণ ক্ষমতা তথা উর্বরতার প্রতীক। তাদের কাছে এই বৈশিষ্ট্যগুলোই ছিল আদরণীয়। তারা যৌনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিয়েছে বিপরীত লিঙ্গের এ সমস্ত দেহজ বৈশিষ্টেরই। যাদের এ বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল তারাই সঙ্গী হিসেবে অধিকহারে নির্বাচিত হয়েছে, আর তারা প্রকারন্তরে অর্জন করেছে প্রজননগত সফলতা, আমরা তাদেরই বংশধর। তাই সঙ্গী নির্বাচনের সময় আমাদের মনেও খেলা করে যায় সেই একই ধরনের অভিব্যক্তিগুলো, যেগুলোর প্রকাশ ঘটেছিল আসলে অনেক অনেক আগে প্লেইস্টোসিন যুগে আমাদের পূর্বপুরুষদের সঠিক সঙ্গী নির্বাচনের তাগিদে।

ঠিক একইভাবে মেয়েরাও লম্বা চওড়া সুদর্শন পুরুষ পছন্দ করে, যাদের রয়েছে। সুগঠিত চোয়াল, চওড়া কাঁধ আর প্রতিসম সুগঠিত দেহ। যেমন অভিনেতা ব্র্যাড পিট তার সুগঠিত দেহ, চওড়া এবং সুদৃঢ় চোয়ালের জন্য সারা পৃথিবীজুড়েই নারীদের কাছে আকর্ষণীয় এবং সুদর্শন পুরুষ হিসেবে খ্যাত। কারণ, পুরুষের এ পুরুষালি বৈশিষ্ট্যগুলোই দীর্ঘদিন ধরে নারীদের কাছে নির্বাচিত হয়েছে এক ধরনের ‘ফিটনেস মার্কার হিসেবে, শিকারি সংগ্রাহক সমাজে এ ধরনের পুরুষেরা ছিল নারীদের কাছে অতিপ্রিয়, তারা ছিল স্বাস্থ্যবান, উদ্যমী, সাহসী, ক্ষিপ্র এবং গোত্রের নিরাপত্তা প্রদানে সফল। তারা অর্জন করতে পেরেছিল বহু নারীর সান্নিধ্য এবং পেয়েছিল প্রজননগত সফলতা। খুব সুচারুভাবে সেই অভিব্যক্তিগুলো নির্বাচিত হয়েছিল বলেই সেগুলো নারীদের মানসপটে রাজত্ব করে এখনও, তারা সুদর্শন পুরুষ দেখে আমোদিত হয়।

চিত্র। পেজ ১২৬

চিত্র : অভিনেতা ব্র্যাড পিট তার। সুগঠিত দেহ, চওড়া এবং সুদৃঢ় চোয়ালের জন্য সারা পৃথিবী জুড়েই নারীদের কাছে আরাধ্য।

অন্যদিকে প্লেবয়, ভোগ কিংবা কসমোপলিটনের কভার গার্ল (বাংলা করলে বলা যায় ‘মলাট সুন্দরী’)-দের দিকে কিংবা ছবির জগতের নায়িকাদের তাকালে বোঝা যায় কেন পুরুষেরা তাদের দেখলে লালায়িত হয়ে উঠে। তাদের থাকে ক্ষুদ্র নাসিকা, চিকোনো চিবুক, বড় চোখ, পুরুষ্ঠ ঠোঁট। তাদের সবার বয়সই থাকে মোটামুটি ১৭ থেকে ২৫-এর মধ্যে যেটি মেয়েদের জীবনকালের সবচেয়ে উর্বর সময় বলে। সাধারণভাবে মনে করা হয়। তাদের দেহ সৌষ্ঠব থাকে প্রতিসম। তাদের কোমর এবং নিতম্বের অনুপাত থাকে ০.৭ এর কাছাকাছি। শুধু প্লেবয়ের মলাট সুন্দরী নয়, বড় বড় অভিনেত্রী এবং সুপার মডেলদের জন্যও ব্যাপারটা একইভাবে দৃশ্যমান। হলিউড অভিনেত্রী এবং একসময়ের বিশ্বসুন্দরী ঐশ্বরিয়া রাইয়ের দেহের মাপ ৩২ ২৫-৩৪ অর্থাৎ প্রায় ০.৭৩। এঞ্জেলিনা জোলির ০.৭২। জেনিফার লোপেজের ০.৬৭। বিপাশা বসুর ০.৭৬। আর মেরোলিন মনেরোর দেহের মাপ ছিল ৩৬-২৪ ৩৪, মানে একদম খাপে খাপ ০.৭। নারীদেহের এই অনুপাতের একটা আলাদা মাহাত্ম্য আছে পুরুষের কাছে। দেখা গেছে, সারা দুনিয়া জুড়ে শোবিজের সাথে যুক্ত এই কাক্ষিত নারীদের কোমর আর নিতম্বের অনুপাত সবসময়েই ০.৬ থেকে ০.৮ এর মধ্যে, বা আরও স্পষ্ট করে বললে ০.৭ এর কাছাকাছি ঘোরাফেরা করে। আমরা আগে অধ্যাপক দেবেন্দ্র সিংহের একটি গবেষণার কথা উল্লেখ করেছিলাম, যে গবেষণা থেকে জানা গেছে, নারীর কোমর এবং নিতম্বের অনুপাত ০.৬ থেকে ০.৮ মধ্যে থাকলে তা তৈরি করে সেই ‘ক্লাসিক hourglass figure’ যা সার্বজনীনভাবে পুরুষদের কাছে আকর্ষণীয় বলে প্রতীয়মান! অধ্যাপক সিংহ ১৯২০ সাল থেকে শুরু করে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত ‘মিস আমেরিকা’দের মধ্যে এবং ১৯৫৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত প্লেবয়ের নায়িকাদের মধ্যে জরিপ চালিয়ে দেখেছেন মিস আমেরিকাদের ক্ষেত্রে কোমর-নিতম্বের অনুপাত ছিল ০.৬৯ থেকে ০.৭২ এর মধ্যে, আর প্লেবয়ের নায়িকাদের ক্ষেত্রে ০.৬৮ থেকে ০.৭১ এর মধ্যে[১৩৯]। এ সমস্ত আদর্শ দেহবল্ললরীর অধিকারী নায়িকারা এক একজন সেক্সবম্ব, যাদের যৌনাবেদন পুরুষদের কাছে। আক্ষরিক অর্থেই আকাশ ছোঁয়া। আর, বলা বাহুল্য পুরুষদের মানসপটে এই উদগ্র আগ্রহ তৈরি হয়েছে ডারউইন বর্ণিত যৌনতার নির্বাচনের পথ ধরে।

কিন্তু সত্যই সেক্সুয়ালের সিলেকশনের মাধ্যমে সত্যিই সেক্সবম্ব তৈরি হয় নাকি? ব্যাপারটা হাতে কলমে পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলেন জীববিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স। তবে মানুষের ক্ষেত্রে নয়, স্টিকেলব্যাক মাছের ক্ষেত্রে[১৪০]। তার পরীক্ষাটি একধরনের অধিপ্রাকৃতিক উদ্দীপনার (supernormal stimuli) পরীক্ষা বলা যায়। অধ্যাপক ডকিন্স সহ অন্যান্য জীববিজ্ঞানীরা জানতেন যে, স্টিকেলব্যাক মাছের ক্ষেত্রে স্ত্রী মাছেরা যখন উর্বর সময় অতিক্রম করে তখন তাদের পেট হয়ে উঠে ডিমে ভর্তি গোলাকার, লালাভ টসটসে। পুরুষ মাছেরা তাদের দেখে লালায়িত হয়। ডকিন্স তার ল্যাবের একুরিয়ামে সাধারণ রূপালি মাছের পেট কৃত্রিমভাবে বড়, গোলাকার আর লালাভ করে দিয়ে কিছু ‘ডামি মাছ’ পানিতে ছেড়ে দিলেন। ব্যাস দেখা গেল পুরুষ স্টিকেলব্যাক মাছেরা পারলে হামলে পড়ছে সে সব মাছের ওপর। যত বেশি নিখুঁত, গোলাকার আর লালাভ পেট বানানো হচ্ছে, তত বাড়ছে পুরুষ মাছদের যৌনোদ্দীপনা। ডকিন্সের ভাষায় সেই ডামি মাছগুলো ছিল স্টিকেলব্যাক মাছের রাজত্বে এক একটি ‘সেক্সবম্ব’।

যে ব্যাপারটা স্টিকেলব্যাক মাছের ক্ষেত্রে সত্য বলে মনে হচ্ছে, মানুষের ক্ষেত্রেও কি সেটার সত্যতা বিভিন্নভাবে পাওয়া যাচ্ছে না? নারীদের সাম্প্রতিক ‘ব্রেস্ট ইমপ্ল্যান্ট সার্জারির হুজুগের কথাই ধরা যাক। এটা এমন এক ধরনের সার্জারি, যার মাধ্যমে নারীরা স্তনের আকার পরিবর্তন করে থাকেন। এ সার্জারিগুলো এক সময় কেবল পর্নোস্টাররাই করতেন, এখন হলিউড বলিউডের অভিনেত্রীদের কাছেও ব্যাপারটা খুবই সাধারণ, এমনকি বাসার গৃহিণীরাও তা করতে শুরু করেছে। আমেরিকান সোসাইটি অব প্লাস্টিক সার্জন (ASPS)-এর তথ্য অনুযায়ী কেবল ২০০৩ সালেই আট মিলিয়ন মহিলা ‘ব্রেস্ট ইম্পল্যান্ট সার্জারি করেছে, যেটা আবার ২০০২ সালের চেয়ে শতকরা ৩২ ভাগ বেশি। খোদ আমেরিকাতে প্রতি বছর এক লক্ষ বিশ হাজার থেকে দেড় লক্ষ নারী ব্রেস্ট ইম্পল্যান্ট করে থাকে[১৪১]। এমন নয় যে ক্ষুদ্র স্তন তাদের কোনো দৈহিক সমস্যা করে। সার্জারির পুরো ব্যাপারটাই কেবল নান্দনিক (aesthetic), পুরুষদের যৌনোদ্দীপনাকে প্রাধান্য দিয়ে নিজেদের দেহকে সুন্দর করে উপস্থাপন, আর সর্বোপরি আত্মবিশ্বাস বাড়ানো। স্টিকেলব্যাক পুরুষ মাছেরা যেমন বড়, গোলাকার আর লালাভ পেটওয়ালা স্ত্রী মাছদের জন্য লালায়িত হয়, ঠিক তেমনি মানবসমাজে দেখা গেছে পুরুষেরা সুদৃঢ়, গোলাকার আর পিনোন্নত স্তন দেখে উদ্দীপ্ত হয়ে উঠে! পুরুষদের এই পছন্দ অপছন্দের প্রভাব পড়ছে আবার নারীদের আচরণে। এগুলো তারই প্রতিফলন। শুধু ব্রেস্ট ইম্পল্যান্টই নয়, সেই সাথে বোটক্স, ফেসলিফট, ঠোঁটের প্রস্থ বাড়ানো, চোখের ভুরু উঁচু করা, বাঁকা দাঁত সোজা করা, নাক খাড়া করা সহ সকল ধরনের প্লাস্টিক সার্জারির ক্রমবদ্ধমান জনপ্রিয়তা তৈরি করছে মানবসমাজে সেক্সবম্বের স্বপ্নীল চাহিদা!

প্লাস্টিক সার্জারির কথা বাদ দেই, সারা পৃথিবী জুড়ে স্নো, পাউডার লিপস্টিকের কী রমরমা ব্যাবসা। এই সব প্রসাধনসামগ্রীর মূল ক্রেতা কিন্তু মেয়েরাই। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে শুধুমাত্র আমেরিকাতেই প্রতি মিনিটে ১৪৮৪টি লিপস্টিকের টিউব এবং ২০৫৫ জার ‘স্কিন কেয়ার প্রোডাক্ট বিক্রি হয়। আমরা এগুলোর যত সামাজিক ব্যাখ্যা প্রতিব্যখ্যা করি না কেন, কিংবা যত ইচ্ছে মিডিয়াকে দোষারোপ করি না কেন, এইধরনের ইন্ডাস্ট্রি টিকে থাকার হিসেব খুব সহজ সরল পুরুষেরা মেয়েদের কাছ থেকে যথাসম্ভব তারুণ্য এবং সৌন্দর্য আদায় করে নিতে চায়। আবার মেয়েরাও বিপরীত লিঙ্গের সেই সঙ্গমী মননকে প্রাধান্য দিয়ে অব্যাহতভাবে সৌন্দর্যচর্চা করে যায়, তারা ত্বককে রাখতে চায় যথাসম্ভব মাখনের মতোন পেলব, ঠোঁটকে গোলাপের মতো প্রস্ফুটিত; কারণ তারা দেখেছে এর মাধ্যমে স্টিকেলব্যাকের ডামি মাছগুলোর মতোই অনেক ক্ষেত্রে স্ট্র্যাটিজিগতভাবে সঙ্গী নির্বাচন আর ধরে রাখায় সফল হওয়া যাচ্ছে।

চিত্র। পেজ ১৩০

চিত্র : পরিসংখ্যানে দেখা গেছে শুধুমাত্র আমেরিকাতেই প্রতি মিনিটে ১৪৮৪টি লিপস্টিকের টিউব এবং ২০৫৫ জার ‘স্কিন কেয়ার প্রোডাক্ট’ বিক্রি হয়।

এ তো গেল মেয়েদের সঙ্গমী মননের স্ট্র্যাটিজি। অন্যদিকে পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রায় আট বিলিয়ন ডলারের গড়ে ওঠা পর্নোগ্রাফিক ইন্ডাস্ট্রি পুরুষদের ‘সেক্সবম্ব’ চাহিদার চরমতম রূপ বললে অত্যুক্তি হবে না। সারা দুনিয়া জুড়ে আট বিলিয়ন ডলারের পর্নোগ্রাফি ব্যবসা টিকে আছে পুরুষের লালসা আর জৈবিক চাহিদাকে মূল্য দিয়ে। মেয়েরা কিন্তু কখনোই পর্নোগ্রাফির মূল ক্রেতা নয়, ছিলও না কখনো। ব্রেস্ট ইমপ্ল্যান্ট করা সিলিকোনো গার্লদের নিখুঁত দেহবল্লরী আর যৌনাবেদনময়ী মায়াবী নারীদের আকর্ষণে পুরুষেরা নিশিরাত জেগে থাকে কম্পিউটারের সামনে। পর্নোগ্রাফি দেখা কোনো সত্যিকার যৌনসঙ্গম নয়, তারপরেও পর্নোভিডিও পুরুষদের নিয়ত উত্তেজিত করে তুলে অনেকটা স্টিকেলব্যাক মাছের মতোই যেন। স্টিকেলব্যাক মাছের পুরুষ মাছেরা যেমনিভাবে লালাভ পেটওয়ালা ডামি মাছ থেকে কামার্ত হয়ে পড়েছিল ডকিন্সের ল্যাবে একুরিয়ামের ভেতর, ঠিক তেমনি মানবসমাজের ‘পুরুষ মাছেরা একইভাবে কামার্ত হয়ে পড়ে কম্পিউটারের ভেতর ডামি মডেলদের নগ্নদৃশ্য দেখে! তার মানে, নিজেদের আমরা ‘আশরাফুল মাখলুকাৎ’ বা সৃষ্টির সেরা জীব ভেবে যতই আত্মপ্রসাদ লাভের চেষ্টা করি না কেন, আমরা প্রাণিজগতের বাইরে নই, আমাদের মানসজগৎও তৈরি হয়েছে অন্য প্রাণীদের মতোই যৌনতার নির্বাচনের পথ ধরে, পর্নোগ্রাফি এবং সেক্সবম্বদের প্রতি পুরুষদের উদগ্র আগ্রহ সেই আদিম সত্যকে স্পষ্ট করে তুলে।

.

ছেলেদের পুরুষাঙ্গের আকার এবং প্রকৃতি কি তবে মেয়েদের যৌনতার নির্বাচনের ফল?

প্রেম ভালোবাসা এবং যৌনতায় পুরুষের পুরুষাঙ্গ যে একটা আলাদা জায়গা দখল করে আছে, তা আর নতুন করে বলে দেবার বোধ হয় দরকার নেই। কিন্তু যেটা অনেকের কাছেই অজানা তা হলো, বহু নারী গবেষকই তাদের অভিজ্ঞতা এবং গবেষণা থেকে ইঙ্গিত করেছেন ভালো যৌনসম্ভোগের জন্য পুরুষাঙ্গের আকার সম্ভবত খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়[১৪২]। কিন্তু তারপরেও বেশ কিছু সমীক্ষায় দেখা গেছে পৃথিবীতে অধিকাংশ পুরুষই তার পুরুষাঙ্গের আকার ‘ছোট’ ভেবে হীনম্মন্যতায় ভুগে থাকে। যেমন, গবেষক জে. লিভার ২০০৬ সালে ৫২৩১ জন পুরুষের উপর গবেষণা চালিয়ে দেখেন[১৪৩], প্রায় সকল পুরুষই প্রত্যাশা করে যে, তার পুরুষাঙ্গ আরেকটু বড় হলেই ভালো হতো। প্রতি এক হাজার জনে মাত্র দুজন অভিমত দিয়েছে পুরুষাঙ্গ ছোট হবার পক্ষে। আরেক গবেষক বি.ই. ডিলন এবং তার দলবল ২০০৮ সালে গবেষণায় দেখান যে, কৈশোর থেকে শুরু করে প্রৌঢ়ত্ব পর্যন্ত সবসময়ই পুরুষদের জন্য পুরুষাঙ্গের ক্ষুদ্র আকার একটি বিশাল উদ্বেগের কারণ[১৪৪]। অনেক পুরুষই আছেন যারা সঙ্গীর সাথে প্রথম যৌন সম্পর্কের আগে এই ভেবে উদ্বিগ্ন থাকে যে, নগ্ন অবস্থায় তার ক্ষুদ্র পুরুষাঙ্গ দেখতে পেয়ে তার সঙ্গীনিশ্চয় যারপরনাই মনঃক্ষুণ্ণ হবে। কিন্তু পুরুষেরা তার নিজের যন্ত্রটি নিয়ে যাই ভাবুন না কেন, মজার ব্যাপার হচ্ছে প্রায় ৮৫ ভাগ নারী মনে করে তার সঙ্গীর পুরুষাঙ্গের আকার তার প্রত্যাশা এবং মাপমতোই আছে[১৪৫]?

সত্যি কথা হলো পুরুষদের পুরুষাঙ্গের “ক্ষুদ্র” আকার নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভোগার আসলে কোনো কারণ নেই। মানবসমাজে পুরুষদের পুরুষাঙ্গের গড়পড়তা আকার অন্যান্য প্রাইমেটদের চেয়ে ঢের বড় সুপার সাইজ বলা যায়। আর এই ব্যাপারটা তৈরি হয়েছে নারীর যৌন অভিরুচিকে প্রাধান্য দিয়ে। জিওফ্রি মিলার তার ‘সঙ্গমী মনন’ গ্রন্থের size mattered অংশে পুরুষাঙ্গের আকার নিয়ে নারী বিজ্ঞানীদের সনাতন কিছু ধারণাখণ্ডনকরে অভিমতদিয়েছেন, তারা যেভাবে পুরুষাঙ্গের আকারকেহিসেবের বাইরে রাখতে চেয়েছেন, ব্যাপারটা আসলে এতোটা তুচ্ছ করার মতোনয়। যৌনতার নির্বাচনের মূল জায়গাটিতে আবারো ফেরত যাই। আমরা আগের একটি অংশে দেখেছিলাম নারীর পিনোন্নত স্তন, সুডৌল নিতম্ব আর ক্ষীণ কটিদেশের প্রতি পুরুষদের সার্বজনীন আকর্ষণের কথা, আমরা দেখেছি কীভাবে যৌনতার নির্বাচনের মাধ্যমে পুরুষেরা মেয়েদের দেহের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যকে নির্বাচিত করেছিল, কারণ সে বৈশিষ্ট্যগুলোই হয়ে উঠেছিল তাদের চোখে প্রজনন ক্ষমতা এবং সুস্বাস্থ্যের প্রতীক। এই যৌনতার নির্বাচন কিন্তু একতরফাভাবে হয়নি। আমরা আগেই বলেছি, যৌনতার নির্বাচনকে পুঁজি করে পুরুষ যেমন গড়েছে নারীকে, তেমনি নারীও গড়েছে পুরুষের মানসপটকে এবং তার দেহজ বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যকে। এক লৈঙ্গিক বৈশিষ্ট্যগুলোর আবেদন তৈরি করেছে আরেক লিঙ্গের চাহিদা।

অনেক বিজ্ঞানীই আজ মনে করেন মানবসমাজে পুরুষদের পুরুষাঙ্গের আকার এবং প্রকৃতি অনেকটাই নির্ধারিত হয়েছে নারীর যৌন চাহিদাকে মূল্য দিয়ে। ব্যাপারটা নিয়ে একটু খোলামেলা আলোচনায় যাওয়া যাক। মানুষের কাছাকাছি প্রজাতির প্রাইমেট সদস্যদের দিকে তাকালে দেখা যাবে, ম্যাড্রিলদের গাঢ় গোলাপি রঙের অণ্ডকোষ আর লাল রঙের পুরুষাঙ্গ আছে। ভার্ভেট বানরদের নীল রঙের অণ্ডকোষের সাথে রক্তিম লাল বর্ণের পুরুষাঙ্গ আছে, ইত্যাদি। মানুষের মধ্যে অবশ্য সেসব কিছুই নেই। সাদা চোখে মনে হতে পারে মানুষদের পুরুষাঙ্গ বোধ হয় সাদামাটা ম্যারম্যারে একটি অঙ্গ। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলেন, আসলে তা নয়। প্রাইমেটদের অন্য প্রজাতির তুলনায় মানব পুরুষাঙ্গ আকারে বড়, মোটা এবং অধিকতর নমনীয়। একটা তুলনামূলক হিসেব দেই। গরিলাদের বিপুল দেহের কথা আমরা সবাই জানি। কিন্তু এতবড় দেহ থাকলে কী হবে, তাদের পুরুষাঙ্গের আকার পূর্ণ উত্থিত অবস্থাতেও মাত্র দুই ইঞ্চির বেশি হয় না। শিম্পাঞ্জিদের ক্ষেত্রে সেটি মাত্র তিন ইঞ্চি। আর মানুষের ক্ষেত্রে উখিত পুরুষাঙ্গের আকার গড়পড়তা পাঁচ ইঞ্চি। সবচেয়ে বড় পুরুষাঙ্গের আকার বৈজ্ঞানিক সমীক্ষায় পাওয়া গিয়েছে প্রায় তের ইঞ্চি, যা গড়পড়তা দৈর্ঘ্যের দ্বিগুণেরও বেশি। আর তার চেয়েও বর কথা হলো, মানব পুরুষাঙ্গের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়েছে, যা অন্য প্রাইমেট বর্গদের থেকে একদমই আলাদা। অন্য প্রাইমেট প্রজাতিতে যেখানে পুরুষাঙ্গে একটি হাড় আছে যেটিকে বৈজ্ঞানিক ভাষায় ব্যাকালাম (baculum) বলে অভিহিত করা হয় সেটি মানব লিঙ্গে একেবারেই অনুপস্থিত। সেজন্য বিশেষ এই মানব প্রত্যঙ্গটি হয়েছে অন্য প্রাইমেটদের তুলনায় অনেক বেশি নমনীয়। বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানী জিওফ্রি মিলার তার গবেষণায় দাবি করেছেন অন্য প্রাইমেটদের পেন্সিল সদৃশ রোগা পুরুষাঙ্গের তুলনায় মানব পুরুষদের দীর্ঘ, চওড়া এবং হাড়বিহীন নমনীয় পুরুষাঙ্গ তৈরি হয়েছে মূলত নারীর সার্বিক চাহিদাকে মূল্য দিয়ে[১৪৬]। মিলার তার ‘সঙ্গমী মনন’ (The Mating Mind) বইয়ে বিস্তৃতভাবে বর্ণনা করেছেন এ ধরনের পুরুষাঙ্গ নারীরা পছন্দ করেছে কারণ এটি মেয়েদের চরম পুলক (অর্গাজম) আনয়নে সহায়তা করেছে, এটি হয়েছে তাদের জন্য প্রচণ্ড রকমের আনন্দের উৎস, এবং তাদের ক্রমিক চাহিদা তৈরি করেছে উন্নত পুরুষাঙ্গ গঠনের নির্বাচনী চাপা[১৪৭]। অন্য কিছু গবেষকদের সাম্প্রতিক গবেষণাতেও এই দাবির স্বপক্ষে কিছুটা সত্যতা মিলেছে বলে দাবি করা হয়[১৪৮]।

কান টানলে নাকি মাথা আসে। তাই পুরুষাঙ্গের আকারের কথা বলার সাথে সাথে অণ্ডকোষের আকার নিয়েও কিছু কথা এখানে চলে আসবে। পাঠকদের কী মনে হবে জানি না, পুরো ব্যাপারটা আমার কাছে কিন্তু খুবই আকর্ষণীয়। বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানীরা দেখেছেন শুক্রাশয় বা অণ্ডকোষের আকারের সাথে বহুগামিতা কিংবা অবিশ্বস্ততার একটা সম্পর্ক পাওয়া যাচ্ছে। সে ব্যাপারটিতে যাওয়ার আগে আমাদের কাছাকাছি প্রজাতিগুলো থেকে কিছু মজার উদাহরণ হাজির করা যাক। আমরা সবাই চোখে না দেখলেও বই পত্র কিংবা ‘কিং কং’ জাতীয় মুভির মাধ্যমে বিশালকায় গরিলার আকার আয়তনের সাথে পরিচিত। একেকটি ব্রহ্মদৈত্য গরিলা আকারে ওজনে প্রায় সাড়ে তিনশ থেকে চারশ পাউন্ড ছাড়িয়ে যায়। কেউ হয়তো ভাবতে পারেন যে, দেহের আয়তনের সাথে তাল মিলিয়ে তার শুক্রাশয়ের আকারও হবে মাশাল্লা ফুটবল না হোক, নিদেনপক্ষে হওয়া উচিত টেনিস বলের সাইজ। আসলে কিন্তু তা হয় না। এমন চারশ পাউন্ড ওজনের বহদাকার গরিলাদের শুক্রাশয়ের ওজন হয় মাত্র দেড় আউন্স। আর অন্যদিকে শিম্পাঞ্জিদের দৈহিক আকার কিন্তু অনেক ছোটখাট। কিন্তু সে তুলনায় তাদের শুক্রাশয়ের আকার অনেক বড়। মাত্র ১০০ পাউন্ড ওজনের একটি শিম্পাজির শুক্রাশয়ের ওজন প্রায় চার আউন্স! এ যেন বারো হাত কাঁকুড়ের তেরো হাত বীচি! কিন্তু কেন এমন হলো?

এর কারণ লুকিয়ে আছে শিম্পাঞ্জি আর গরিলাদের সামাজিক সম্পর্কের পার্থক্যের মাঝে। দেখা গেছে শিম্পাঞ্জিদের মধ্যে নারীরা হয় বহুগামী। তারা একই দিনে একাধিক পুরুষ শিম্পাঞ্জির সাথে যৌনসম্পর্কে লিপ্ত হয়। অধিক সংখ্যক পুরুষের সাথে যথেচ্ছাচার সম্ভোগের মাধ্যমে নারী শিম্পাঞ্জিরা প্রকারান্তরে নিশ্চিত করতে চায় যে, উৎকৃষ্ট জেনেটিক মাল-মশলাসম্পন্ন পুরুষের দ্বারাই যেন তার ডিম্বাণুর নিষেক ঘটে। কিন্তুনারীশিম্পাঞ্জির এই ধরনের অভিরুচির কারণে পুরুষ শিম্পাঞ্জির জন্য ‘বংশরক্ষা’ হয়ে যায় মাত্রাতিরিক্ত কঠিন। তাদেরকে এক অসম বীর্য প্রতিযোগিতার (sperm competition) মধ্যে নামতে হয়। নারী শিম্পাঞ্জির যোনিতে গর্ভধারণ নিয়ে বিভিন্ন পুরুষ শিম্পাঞ্জির শুক্রের মধ্যে নিরন্তর প্রতিযোগিতা চলে, সেই কারণে একটি পুরুষ শিম্পাঞ্জির পক্ষে কখনোই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয় না যে, যৌনসম্পর্ক হলেই তার নির্দিষ্ট বীর্য থেকেই নারী শিম্পাঞ্জিটি গর্ভধারণ করবে বা করছে। কিন্তু সেই সম্ভাবনা কিছুটা হলেও বৃদ্ধি পায় যদি তার শুক্রাশয়ের আকার অপেক্ষাকৃত বড় হয়, আর তার শুক্রাশয় যদি সঙ্গমের সময় অঢেল শুক্রের যোগান দিতে সমর্থ হয়। শিম্পাঞ্জির এই বীর্য প্রতিযোগিতার লড়াইকে অনেকটা লটারি টিকেটের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। যত বেশি সংখ্যক লটারি টিকেট আপনার দখলে থাকবে তত বেশি সম্ভাবনা তৈরি হবে আপনার বিজয়ী হবার। আপনার যদি সামর্থ্য থাকে প্রায় সব লটারি টিকেট কোনোভাবে করায়ত্ত করার, আপনার বিজয়ী হবার সম্ভাবনা পাল্লা দিয়ে বাড়বে। আদিতে হয়তো শিম্পাঞ্জিকুলে বড়, ছোট কিংবা মাঝারি সব ধরনের শুক্রাশয়ওয়ালা পুরুষ শিম্পাঞ্জির অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু শিম্পাঞ্জি নারীদের বহুগামিতার সাথে পাল্লা দিতে দিয়ে বড় শুক্রাশয়ওয়ালা শিম্পাঞ্জিরাই বাড়তি সুবিধা পেয়েছিল, তারাই প্রতিযোগিতায় সফল গর্ভসঞ্চারের মাধ্যমে অধিক হারে সন্তানসন্ততি রেখে গেছে। এই নির্বাচনী চাপই শিম্পাঞ্জিকুলে ত্বরান্বিত করেছে বৃহৎ শুক্রাশয় গঠনের দিকে (গড়পড়তা শিম্পাঞ্জির শুক্রাশয়ের ওজন তার দেহের ওজনের ০.৩ ভাগ, এবং শুক্রাণু প্রক্ষেপণের সংখ্যা প্রতি বীর্যপাতে ৬০ x ১০)।

ঠিক উলটো ব্যাপারটি ঘটে গরিলাদের ক্ষেত্রে। নারী গরিলারা বহুগামী নয়। কেবল পুরুষ গরিলারা বহুগামী। শক্তিশালী পুরুষ গরিলারা বড় সড় হারেম তৈরির মাধ্যমে নিশ্চিত করে বহু নারীর দখল। এভাবে পুরুষ গরিলারা নিশ্চিত করে তাদের অধিনস্ত নারীর দেহে নিরাপদ গর্ভসঞ্চার। কাজেই পুরুষ গরিলাদের জন্য ব্যাপারটা কখনোই পুরুষে পুরুষে বীর্য প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ থাকে না, বরঞ্চ হয়ে উঠে শক্তিমত্তার প্রতিযোগিতা। শক্তিশালী পুরুষ গরিলারা স্বীয় শক্তির মাধ্যমে অধিকাংশ নারীর দখল নিয়ে নেয়, অধিকাংশ শক্তিহীনদের জন্য পড়ে থাকে দুর্ভাগ্য। সামাজিক অবস্থানের কারণেই গরিলাদের ক্ষেত্রে নির্বাচনী চাপ তৈরি করেছে বড়সড় দেহ সমৃদ্ধ শক্তিশালী দেহগঠনের, বৃহৎ শুক্রাশয় তৈরির দিকে নয়। গরিলাদের ক্ষেত্রে বৃহৎ শুক্রাশয় গঠনের কোনো উপযোগিতা নেই। নারী পুরুষের মধ্যকার সামাজিক সম্পর্কের কারণেই গরিলাদের ক্ষেত্রে দেহ অনুপাতে শুক্রাশয়ের আকার অনেক ছোট (শুক্রাশয়ের ওজন দেহের ওজনের ০.০২ ভাগ, এবং শুক্রাণু প্রক্ষেপণের সংখ্যা প্রতি বীর্যপাতে ৫x ১০)।

আপনার মাথায় নিশ্চয় এখন ঘুরতে শুরু করেছে গরিলা আর শিম্পাঞ্জিদের ক্ষেত্রে না হয় বোঝা গেল, কিন্তু মানবসমাজের ক্ষেত্রে এ ব্যাপারটা কী রকম? এক্ষেত্রে মানুষের অবস্থান হলো গরিলা আর শিম্পাঞ্জির মাঝামাঝি (শুক্রাশয়ের ওজন দেহের ওজনের ০.০৪-০.০৮ ভাগ এবং শুক্রাণু প্রক্ষেপণের সংখ্যা প্রতি বীর্যপাতে ২৫x১০৭), যদিও গবেষকদের অনেকেই রায় দিয়েছেন শুক্রাশয়ের গতি প্রকৃতি কিছুটা শিম্পাঞ্জির দিকে একটু বেশি করে ঝুঁকে রয়েছে। মানবসমাজে পুরুষমানুষদের শুক্রাশয়ের আকার গরিলাদের মতো এত ছোট নয়, ফলে ধরে নেওয়া যায় যে, মানবসমাজে নারীরা শতভাগ একগামী মনোভাবাপন্ন নয়। আবার শুক্রাশয়ের আকার পুরুষ শিম্পাঞ্জিদের শুক্রাশয়ের মতো এত বড়সড়ও নয়–ফলে আমরা এটাও বুঝতে পারি যে, মানবসমাজে নারীরা আবার শতভাগ নির্বিচারী বহুগামীও হবে না। মানুষের মধ্যে একগামিতা যেমন আছে তেমনি বহুগামিতার চর্চাও। মানুষ নামের এই প্রাইমেটের এই স্পিশিজটির অধিকাংশ সদস্যই “বিবাহ নামক ইন্সটিটিউশনের মাধ্যমে মনোগামিতার চর্চাকে বৈশিষ্ট্য হিসেবে জ্ঞাপন করলেও এর মধ্যে আবার অনেকেই সময় এবং সুযোগমতো বহুগামী হয়, কাকোন্দ্রির চর্চা করে। অনেক ক্ষমতাবান পুরুষেরা যেমন মহামতি আকবর, চেঙ্গিসখান প্রমুখ) আবার অধিক নারীর দখল নিতে অনেকটা গরিলাদের মতোই। ‘হারেম তৈরি করে, কিন্তু বেশিরভাগ মানুষই ‘সিরিয়াল মনোগামি’ অর্থাৎ, একই সময়ে কেবল একজন সঙ্গীর সাথেই জীবন অতিবাহিত করে। নারীদের ক্ষেত্রেও বহুগামিতা ঠিক একই কারণে দৃশ্যমান এবং সেটা সকল সমাজেই। বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অধিকাংশ নারীরাই নাকি বিয়ের আগে দু চারটি প্রেম-টেম করে শেষমেষ একটি স্বামী খুঁজে নিয়ে ঘর-সংসার করে, কদাচিৎ স্বামীকে ফাঁকি দিয়ে পরকীয়া করে লুকিয়ে-ছাপিয়ে, কখনো বা একেবারেই নয়। পশ্চিমেও মেয়েরা বয়ঃসন্ধির পর থেকেই স্বাধীনভাবেই একাধিক ‘ডেট করে, তাদের মধ্য থেকেই যোগ্য সঙ্গীকে বেছে নেয়। কখনো বা সঙ্গী বাছার প্রক্রিয়া চলতেই থাকে আজীবন, অনেকটা অধুনা পরলোকগত অভিনেত্রী এলিজাবেথ টেলরের মতো। সেজন্যই জোয়ান এলিসন রজার্স তার “যৌনতা : প্রাকৃতিক ইতিহাস” (Sex: A Natural History) বইয়ে উল্লেখ করেছেন[১৪৯]–

পুরুষের অপেক্ষাকৃত বড় শুক্রাশয় এটাই ইঙ্গিত করে যে, নারীরা বিবর্তনের ইতিহাস পরিক্রমায় একগামী নয়, বরং বহুগামীই ছিল।

মানবেতিহাসের পথপরিক্রমায় নারীরা যে আসলে একগামী ছিল না, তা পুরুষদের পুরুষাঙ্গের অগ্রভাগের আকৃতি এবং সেই সাথে সঙ্গমের প্রকৃতি থেকেও তা কিছুটা আঁচ করা যায়। এ নিয়ে জৈব শরীরবৃত্তবিদ গর্ডন জি গ্যালপ এবং তার দলবলের একটি চমৎকার গবেষণা আছে[১৫০]। মানব লিঙ্গ একটি বীর্য প্রতিস্থাপন যন্ত্র (The human penis as a semen displacement device) শিরোনামের এই গবেষণাপত্রে গবেষকদল দেখিয়েছেন, অন্য প্রাইমেটদের থেকে মানুষের পুরুষাঙ্গের গঠন কিছুটা আলাদা। ব্যাকালাম নামের হাড়টি যে আমাদের পুরুষাঙ্গে অনুপস্থিত, তা আমরা আগেই জেনেছি। এর বাইরে, পুরুষাঙ্গের অগ্রভাগ (glans) সুচালো কীলকাকৃতির (wedge shaped)। লিঙ্গের অগ্রভাগের ব্যাস পুরুষাঙ্গের স্তম্ভের ব্যাসের চেয়ে খানিকটা বড় হয়। পুরুষাঙ্গের অগ্রভাগ এবং স্তম্ভের সাধারণ তলে উদ্ভূত হওয়া করোনাল রিজ’-এর অবস্থান থাকে স্তম্ভের সাথে উলম্বভাবে। এ ছাড়া, সঙ্গম শুরুর পর থেকে বীর্যস্থলনের আগ পর্যন্ত যোনির অভ্যন্তরে পুরুষকে উপর্যপুরি লিঙ্গ সঞ্চালনের (repeated thrusting) প্রয়োজন হয়। কাজেই সুচালো কীলকসদৃশ লিঙ্গের অগ্রভাগের আকৃতি এবং সেই সাথে উপর্যপুরি লিঙ্গাঘাতের প্রক্রিয়া এটাই ইঙ্গিত করে যে, নারীর যোনির ভিতরে স্বল্প সময়ের মধ্যে অন্য কোনো পুরুষের শুক্রাণুর আগমন ঘটে থাকলে সেটাকে বিতাড়িত করার জন্য যথেষ্ট। গ্যালোপের গবেষণাপত্রের ২৭৮ পৃষ্ঠায় সেটারই ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে[১৫১]—

If a female copulated with more than one male within a short period of time, this would allow subsequent males to “scoop out”‘ semen left by others before ejaculating.

আরও একটি ব্যাপারেও নারীদের পরকীয়ার ভালোই আলামত পাওয়া গেছে। দম্পতিদের দীর্ঘদিন আলাদা করে রেখে এবং বহুদিন পরে সঙ্গমের সুযোগ করে দিয়ে দেখা গেছে এতে পুরুষের বীর্যপাতের হার নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। যত বেশি দিন যুগলকে পরস্পর থেকে আলাদা করে রাখা হয়, পুনর্বার মিলনের সময় তত বেশি পাওয়া যায় শুক্রাণু প্রক্ষেপণের হার। দেখা গেছে যদি কোনো দম্পতির মধ্যে স্বামী স্ত্রী শতভাগ সময় জুড়ে একসাথে থাকে, তবে প্রতিবার সঙ্গমে গড়পড়তা ৩৮৯ মিলিয়ন শুক্রাণু প্রক্ষিপ্ত হয়। কিন্তু যদি শতকরা ৫ ভাগ সময় জুড়ে দম্পতিরা একসাথে থাকে, তবে প্রতি প্রক্ষেপণে শুক্রাণুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭১২ মিলিয়নে–অর্থাৎ প্রায় দ্বিগুণ! আসলে দীর্ঘদিন বিচ্ছেদের পর মিলনের সময় স্পার্মের যোগান বেড়ে যায় কারণ, পুরুষেরা ভেবে নেয় যে বিচ্ছেদকালীন সময়টুকুতে স্ত্রীর পরকীয়া ঘটার কিছুটা হলেও সম্ভাবনা থাকে। অন্য কোনো পুরুষের শুক্রাণু স্ত্রী ধারণ করতে পারে এই সম্ভাবনা থেকেই বীর্য প্রতিযোগিতা বা স্পার্ম ওয়ার এ লিপ্ত হয় পুরুষটি তার অজান্তেই। প্রতিযোগিতায় জয়ী হতে সে নিক্ষিপ্ত করে তার অঢেল শুক্রাণুর যোগান, এবং দাবি করে তার শুক্রের মাধ্যমে নারীর গর্ভধারণের কাঙ্ক্ষিত নিশ্চয়তা। ইতিহাসের পথপরিক্রমায় নারীদের পরকীয়া এবং বহুগামিতার আলামত প্রচ্ছন্নভাবে আছে বলেই দীর্ঘদিন বিচ্ছেদের পর মিলনের সময় খুব প্রত্যাশিতভাবেই শুক্রাণুর সংখ্যা বেড়ে যায়।

যদি মানবসমাজে নারীরা অনাদিকাল থেকে বহুগামিতায় অভ্যস্থ না হতো, যদি একগামী সম্পর্কের বাইরেও অতিরিক্ত যুগল মৈথুনে (extra-pair copulations) কখনোই নিজেদের নিয়োজিত না করত, তাহলে পুরুষের পুরুষাঙ্গের অগ্রভাগ কীলকাকৃতি হওয়ারও দরকার পড়তো না, প্রয়োজন হতো না সঙ্গমকালীন সময়ে উপর্যুপরি লিঙ্গাঘাতেরও152। দরকার ছিল নাদীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থাকার পর মিলনের সময় শুক্রাণুর সংখ্যা বৃদ্ধিরও। আসলে মানবসমাজে নারীর একগামিতার পাশাপাশি বহুগামিতার প্যাটার্নের একটি উল্লেখযোগ্য সাক্ষ্য এগুলো। শুধু পুরুষের বিশেষ অঙ্গেই নয়, বহুগামিতার নিদর্শন রয়েছে নারীদের নিজেদের শরীরেও। সেটা জানতে হলে আমাদের নারীর চরম পুলক বা অর্গাজম সম্বন্ধে জানতে হবে।

.

পুলকিত মনন (অর্গাজমিক মাইণ্ড)

বিখ্যাত জীবাশ্মবিদ এবং বিবর্তন বিজ্ঞানী স্টিফেন জে, গুল্ড মনে করতেন নারীর চরম পুলকের কোনো বিবর্তনীয় উপযোগিতা নেই[১৫৩]। এটা অনেকটা বিবর্তনের সাইড-ইফেক্ট যাকে তিনি ডাকতেন স্প্যান্ড্রেল নামে। বড় বড় ইমারত তৈরি করার সময় দেখা যায় যে, দুটি খিলানের মাঝে স্প্যান্ড্রেল বাড়তি উপাদান হিসেবে এমনিতেই তৈরি হয়ে যায়,ইমারতের কারিগরি নকশার প্রয়োজনে নয়, বরং উপজাত হিসেবে। এই স্প্যান্ড্রেলগুলো ইমারতকে মজবুত করতেও সাহায্য করে না, আরোপ করে না কোনো বাড়তি গুণাগুণ। কোনো প্ল্যান প্রোগ্রাম ছাড়াই এগুলো কাঠামোতে উড়ে এসে জুড়ে বসে। যৌনসঙ্গমের সময় নারীর পুলকের ব্যাপারটাও গুল্ড মনে করতেন অনেকটা সেরকমেরই, যার স্বকীয় কোনো ‘সার্ভাইভাল ভ্যালু’ নেই; এটা স্রেফ বিবর্তনের উপজাত।

এভাবে ভাবার অবশ্য কারণ আছে। পুরুষদের জন্য পুলক বা অর্গাজম সরাসরি বীর্যপাতের সাথে যুক্ত। অর্থাৎ বীর্যপাতের সময়টাতেই পুরুষেরা চরম পুলক অনুভব করে। পুরুষদের ক্ষেত্রে পুলকের ব্যাপারটা সরাসরি প্রজননের সাথে যুক্ত থাকায় এ থেকে ‘পুরুষালি অর্গাজমের’ বিবর্তনগত উপযোগিতা সহজেই খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে তা নয়। নারীর চরম পুলকের সাথে গর্ভধারণের কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। সত্যি বলতে কী–চরম পুলক ছাড়াও নারীর পক্ষে গর্ভধারণ সম্ভব, এবং সেটা অহরহই ঘটছে। সমীক্ষায় দেখা গেছে শতকরা মাত্র ১৫ ভাগ নারী সঙ্গমের সময় সবসময়ই চরম পুলক লাভ করে, ৪৮ ভাগ নারী অধিকাংশ সময়, ১৯ ভাগ নারী জীবনের কখনো-সখনো, ১১ ভাগ নারী কদাচিৎ আর ৭ ভাগ নারী জীবনের কখনোই অর্গাজম অনুভব করে না[১৫৪]। অর্থাৎ, পুরুষদের অর্গাজমের ব্যাপারটা প্রচ্ছন্ন হলেও মেয়েদেরটা রহস্যময়, জটিল এবং অনেকসময় সাগরতীরে মৎস্যকুমারীর দেখা পাওয়ার মতোই যেন অলভ্য।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই সনাতন স্প্যান্ড্রেল আর উপজাত তত্ত্বের বাইরে গিয়ে নারীর পুলকের বেশ কিছু বিবর্তনীয় ব্যাখ্যা হাজির করেছেন বিবর্তন মনোবিজ্ঞানীরা। জীববিজ্ঞানীরা আবার এর মধ্যে খেয়াল করেছেন যে, মানুষ ছাড়াও অন্য প্রাইমেটদের নারীদের মধ্যেও চরম পুলকের অস্তিত্ব রয়েছে[১৫৫, ১৫৬]। ব্যাপারটা সত্যি হয়ে থাকলে নারী অর্গাজমের বিবর্তনগত উপযোগিতা থাকা অসম্ভব কিছু নয়।

বহু বিবর্তনবাদী মনোবিজ্ঞানী অভিমত দিয়েছেন যে, এই প্রক্রিয়ায় আসলে নারীরা তাদের অজান্তেই পুরুষদের বীর্য প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে থাকে, এবং অর্গাজমের জটিল অথচ মায়াবী প্রক্রিয়ায় যোগ্য কিংবা সঠিক পুরুষটিকে বাছাইয়ের কাজ করে ফেলে। অর্গাজমের সময় একটি নারীর শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হয়ে উঠে, হৃৎস্পন্দনের হার বেড়ে যায়, মুখ দিয়ে গোঙানির মতো শব্দ বের হতে থাকে, মাংশপেশীর সংকোচন বা খিচুনির মতো অবস্থা ঘটে, কারো কারো ক্ষেত্রে হয় হ্যালুসিনেশন বা অলীক দর্শন[১৫৭]। নারীর ভেতরে চলা এই জটিল এবং রহস্যময় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নারী সনাক্ত করে নেয় তার কাঙ্ক্ষিত ‘মিস্টার রাইট’কে। সে হিসেবে চিন্তা করলে অর্গাজম আসলে নারীর এক ধরনের ‘মেট সিলেকশন ডিভাইস বা সঙ্গী নির্ণায়ক যন্ত্র। নিউইয়র্ক টাইমসের খ্যাতনামা বিজ্ঞান লেখিকা ন্যাটালি এঞ্জিয়ার সেজন্যই তার বইয়ে লিখেছেন[১৫৮]–

নারীর পুলক হচ্ছে নারী অভিরুচি বাস্তবায়নের এক চূড়ান্ত অভিব্যক্তি। … এটা নারীর মতো করে গোপন বিতর্কের নিয়ন্ত্রণ নিজ হাতে তুলে নেওয়ার একটি সচেতন প্রক্রিয়া।

নারীর পুলকের সময় জরায়ুসহ বিভিন্ন মাংশপেশীর অবিরত সংকোচন ঘটে চলে। বিজ্ঞানীরা বলেন এই সংকোচন ঘটার পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ আছে। এই জরায়ুর মাংশপেশী সংকোচনের মাধ্যমে একটি নারী নিশ্চিত করে যে, জরায়ুর গ্রীবাদেশীয় শ্লৈষ্মিক ঝিল্লি (cervical mucus barrier) অতিক্রম করে সে যেন শুক্রাণুকে নিজের দেহভ্যন্তরে পুরোপুরি টেনে নিতে পারে। আমি একটি প্রকাশিত কেস স্টাডি থেকে এমন ঘটনার সন্ধানও পেয়েছি যে, অর্গাজমের চাপে একটি পুরুষের কন্ডম পর্যন্ত ভিতরে শুষে নিয়েছিল একটি নারীর দেহ, পরবর্তী অনুসন্ধানে কন্ডমটি পাওয়া গিয়েছিল নারীটির সার্ভিকাল ক্যানালের সরু পথে আটকে যাওয়া অবস্থায়[১৫৯]। এ থেকে অনুমান করা যায় যে, অর্গাজম বা নারী পুলকের মূল লক্ষ্য থাকে শুক্রাণুকে যতদূর সম্ভব ডিম্বাণুর কাছাকাছি পৌঁছে দেয়া, এর ফলে বৃদ্ধি পায় গর্ভধারণের সম্ভাবনা।

বিজ্ঞানীরা এটাও দেখেছেন যে, নারীর অর্গাজম হলে সে যে পরিমাণ শুক্রাণু নিজের অভ্যন্তরে ধারণ করে, অর্গাজম না হলে তার চেয়ে অনেক কম শুক্রাণু সে তার মধ্যে ধারণ করতে পারে। অর্থাৎ অর্গাজম হলে নারীর নিজের অভ্যন্তরে শুক্রাণুর ধারণ ক্ষমতা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়[১৬০]। যেমন, দেখা গিয়েছে। স্বাভাবিক অবস্থায় একটি নারী সাধারণত সঙ্গমের পর মোটামুটি ৩৫ ভাগ শুক্রাণু নিজ দেহ থেকে বের করে দেয়। কিন্তু নারীর অর্গাজম হলে সে প্রায় সত্তর ভাগ স্পার্ম নিজের মধ্যে ধারণ করে, আর বের করে দেয় ৩০ ভাগ। তার মানে চরম পুলক না হবার অর্থ হলো, অধিকতর বেশি শুক্রাণুর বর্জন। এই সাক্ষ্যগুলো সেই ‘স্পার্ম রিটেনশন’ তত্ত্বকেই সমর্থন করে যার মাধ্যমে নারী অধিক সংখ্যক শুক্রাণুকে যোনি থেকে জরায়ু এবং ডিম্বাশয়ের দিকে টেনে নিয়ে প্রকারান্তরে নিশ্চিত করতে চায় সঠিক পুরুষকে দিয়ে নিজের গর্ভধারণের সম্ভাবনা।

এখন কথা হচ্ছে সঠিক পুরুষটি কেমন হতে পারে যে কি না নারীকে নিয়মিত অর্গাজম উপহার দেবে? কোনো কিছু চিন্তা না করেই বলা যায় যে পুরুষটির একটি গুণ হতে পারে—সে দেখতে শুনতে হবে সুদর্শন। জীববিজ্ঞানের ভাষায় সুদর্শন পুরুষের মানে হচ্ছে প্রতিসম (symmetrical) চেহারা আর দেহের অধিকারী পুরুষ। কারণ বিবর্তনীয় পথপরিক্রমায় নারীরা বুঝে নিয়েছে যে, প্রতিসম চেহারা এবং দেহসৌষ্ঠবের অধিকারী পুরুষেরা স্বাস্থ্যবান, তাদের দেহ রোগ জীবাণুর আবাসস্থল নয়, অর্থাৎ মোটা দাগে তারা ‘সুপেরিয়র জেনেটিক কোয়ালিটি’র অধিকারী। রান্ডি থর্নহিল স্টিভেন গেংস্টাডের গবেষণা থেকে দেখা গেছে, নারীদের পুলকের পৌনঃপুনিকতা এবং চরম পুলকানুভূতি আনয়নের ক্ষেত্রে সুদর্শন পুরুষেরাই অধিকতর বেশি সফল হয়ে থাকে[১৬১]।

সুদর্শন পুরুষেরাও আবার সে ব্যাপারটি ভালো করেই জানে এবং বুঝে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, সুদর্শন পুরুষেরা খুব কম সময়ের মধ্যেই (shortest courtship) যে কোনো ভালোবাসার সম্পর্ককে যৌনসম্পর্কের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এও দেখা গেছে, পশ্চিমা দেশে সুদর্শন পুরুষেরা ডেট করার সময় গড়পড়তা প্রতি নারীর পেছনে কম সময় এবং অর্থ ব্যয় করে। শুধু তাই নয় সুদর্শন স্বামীরা অনেক বেশি হারে স্ত্রীদের প্রতারণা করে অন্য সম্পর্কে জড়ায়[১৬২]।

তবে নারী পুলক নিয়ে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ব্যাপারটি বেরিয়ে এসেছে বিজ্ঞানী রবিন বেকার এবং মার্ক বেলিসের সাম্প্রতিক একটি গবেষণা থেকে। তাদের গবেষণা থেকে দেখা গেছে যে সমস্ত নারীরা পরকীয়ায় মত্ত, তাদের অর্গাজম অনেক বেশি হয়। মানে, নিয়মিত সঙ্গীর চেয়ে গোপন প্রেমিকের সাথে সঙ্গমে নারীর চরম পুলকের হার অনেক বেশি থাকে তাদের ক্ষেত্রে। ব্রিটেনের ৩৬৭৯ জন নারীর উপর জরিপ চালিয়ে তারা দেখেছেন যে, তাদের ঋতুচক্রের সবচেয়ে উর্বর সময়গুলোতেই তারা পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে, যে সময়টাতে তাদের গর্ভধারণ করার সম্ভাবনা থাকে সবচেয়ে বেশি[১৬৩]। এটাও দেখা গেছে যে, পরকীয়ারত নারীরা স্বামীর সাথে অনেক বেশি পুলক জালিয়াতি (fake orgasm) করে স্বামীদের আশ্বস্ত রাখতে চেষ্টা করে সম্ভবত এই ধারণা দিতে যে, সে কেবল তার স্বামীর প্রতিই রয়েছে বিশ্বস্ত[১৬৪]।

নিঃসন্দেহে স্বামীদের জন্য কোনো সুসংবাদ নয় এটি। কিন্তু এ ব্যাপারগুলো থেকে বোঝা যায় যে, মেয়েদের মেটিং স্ট্র্যাটিজি সব সময় স্বামীকে তুষ্ট করে ‘যৌন বিশ্বস্ত হয়ে চলার জন্য বিবর্তিত হয়নি, বরং বিস্তৃত হয়েছে কখনো সখনো উৎকৃষ্ট জিনের সন্ধানে নিজের প্রজনন সফলতাকে বাস্তিবায়িত করার জন্যও। মাথা নেড়ে যতই এটাকে অস্বীকারের চেষ্টা করা হোক না কেন, বিবর্তনের অমসৃণ যাত্রাপথে রয়েছে এর সুস্পষ্ট পদচিহ্ন।

.

চোখের আলোয় দেখেছিলেম মনের গভীরে

ভালোবাসার কথা বললেই আমাদের সামনে সবার আগে হৃদয়ের কথা চলে আসে। বিদগ্ধ প্রেমিক-প্রেমিকারা অহরহ ‘হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল হয়ে ওঠে, সেটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু আসল সত্যটা হলো বিজ্ঞানীরা বলেন, ভালোবাসার উৎস হৃদয় নয়, বরং মস্তিষ্ক। শুধু তাই নয়, বিবর্তন মনোবিজ্ঞানী জিওফ্রি মিলারের মতে, মানুষের মস্তিষ্ক বা ব্রেন হচ্ছে এক ‘Magnificent Sexual Ornament, যা যৌনতার নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তিত হয়েছে আমাদের পছন্দ-অপছন্দ অভিরুচিকে মূল্য দিয়ে। মিলারের মতে মস্তিষ্কের প্রকৃতিও অনেকটা পুরুষাঙ্গের মতোই যৌননির্বাচনের ফসল। আমরা সে সমস্ত সঙ্গীর সাথেই থাকতে পছন্দ করি যাদের সাথে থেকে আমরা সুখী বোধ করি[১৬৫]। আর কার সাথে সুখী বোধ করব, তা নির্ধারণ করে আমাদের মস্তিষ্ক, হৃদয় নয়। আমরা যেমন স্বাস্থ্যবান, সুদর্শন সঙ্গী পছন্দ করি, তেমনি পছন্দ করি এমন কাউকে যে রসিকতা বোঝে, প্রেম-ভালোবাসার ব্যাপারে রোমান্টিক এবং বিশ্বস্ত, শিল্প-সাহিত্য সংগীতের ব্যাপারে সমঝদার। আমরা এ ধরনের গুণাবলিগুলো পছন্দ করি কারণ বিপরীতলিঙ্গের চাহিদাকে মূল্য দিয়ে আমাদের মস্তিষ্ক অভিযোজিত হয়েছে আর আমাদের পছন্দ-অপছন্দ আর ভালোলাগাগুলো বিবর্তিত হয়েছে যৌনতার নির্বাচনের পথ ধরে। যৌনতার নির্বাচনই আমাদের মস্তিষ্কে তৈরি করেছে গান-বাজনা, নৃত্য-গীত, কাব্য, শিল্প-সাহিত্য, স্থাপত্যকর্ম, খেলাধুলা, বাগ্মীতা প্রভৃতির প্রতি অনুরাগ। যাদের মধ্যে এ গুণাবলি আমরা খুঁজে পাই, তারা অনেক সময়ই হয়ে ওঠে আমাদের পছন্দের মানুষজন।

বিজ্ঞানীরা লক্ষ করেছেন যে, মস্তিষ্কের প্রকৃতি বদলে গেলে ভালোবাসার প্রকৃতিও বদলে যায়। এরকম একটি কেস স্টাডির কথা আমি সম্প্রতি পড়েছি পল ব্লুমের ‘হাও প্লেসার ওয়ার্ক্স’ বইয়ে। ১৯৩১ সালে নথিবদ্ধ এ ঘটনা থেকে জানা যায় এক মহিলা তার স্বামীকে নিয়ে অহরহ অভিযোগ করতেন–তার সঙ্গী মোটেই পরিশীলিত নয়, কেমন যেন অদক্ষ চাষাভূষা টাইপের। বরদাস্তই করতে পারতেন না তিনি স্বামীকে একেবারে। কিন্তু কিছুদিন পরে কোনো এক রোগে কিংবা দুর্ঘটনায় মহিলাটির মস্তিষ্কের বড় একটা অংশ আহত হয়। দুর্ঘটনার পর স্মৃতিশক্তি ফিরে পাওয়ার পর তার সঙ্গী সম্বন্ধে দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে গিয়েছিল। যে লোকটাকে কিছুদিন আগেও অপরিশীলিত চাষাড়ে বলে মহিলার মনে হচ্ছিল, সেই সঙ্গী তার কাছে রাতারাতি আবির্ভূত হলেন “ধনবান, বুদ্ধিদীপ্ত, সুদর্শন এবং বর্ণাঢ্য ব্যক্তি হিসেবে। সত্যি বলতে কী যৌনাকর্ষণ এবং রোমান্টিক প্রেমের ব্যাপারগুলো রয়ে যায় মস্তিষ্কের খুব গভীরে, মনের গহীন কোণে। মস্তিষ্কের আঘাত সেই মহিলাটিকে সুযোগ করে দিয়েছিল একেবারে নতুনভাবে শুরু করতে, ফলে তার চিরচেনা সঙ্গী তার কাছে আবির্ভূত হয়েছিল একেবারে নতুন মানুষ হিসেবে, অনেক পছন্দনীয় হিসেবে। অর্থাৎ, মস্তিষ্কের প্রকৃতি বদলে যাওয়ায় মহিলাটির ভালোবাসার প্রকৃতিও বদলে গিয়েছিল।

‘A Midsummer Night’s Dream’ নাটিকায় শেক্সপিয়র উচ্চারণ করেছিলেন, ‘Love looks not with the eyes but with the mind’। শেক্সপিয়র মিথ্যে বলেননি। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথও তার একটি গানে যে কথাটি বলেছিলেন, ‘চোখের আলোয় দেখেছিলেম চোখের বাহিরে’; সেই কথাটিকেই সামান্য বদলে দিয়ে বিবর্তন মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে বললে বলা যায়–

চোখের আলোয় দেখেছিলেম মনের গভীরে।
অন্তরে আজ দেখব, যখন আলোক নাহি রে।

আশা করছি রবীন্দ্রনাথের গানে বিবর্তন মনোবিজ্ঞানের কাঁচি চালানোয় রবীন্দ্রভক্তরা মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে যাবেন না। ভালোবাসার দাবি বলে কথা!

০৫. নারী ও পুরুষ : দুই ভুবনের দুই বাসিন্দা?

আধুনিক বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানীরা আরও বলেন, ডারউইনের ‘সেক্সুয়াল সিলেকশন’ বা ‘যৌনতার নির্বাচন’ বিবর্তন প্রক্রিয়ায় মূল ভূমিকা রেখে থাকে তবে এর একটি প্রভাব আমাদের দীর্ঘদিনের মানসপট নির্মাণেও অবশ্যম্ভাবীরূপে পড়বে। যৌনতার উদ্ভবের কারণে সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে নারী-পুরুষ একই মানবপ্রকৃতির অংশ হওয়া সত্ত্বেও তাদের মধ্যে প্রাকৃতিকভাবেই তৈরি হয়েছে এক ধরনের মনোদৈহিক পার্থক্য জৈববৈজ্ঞানিক পথেই। নারীদের জননতন্ত্রের প্রকৃতি পুরুষদের জননতন্ত্র থেকে আলাদা। মেয়েদেরকে যে ঋতুচক্র, নয়মাসব্যাপী গর্ভধারণসহ হাজারো ঝুট-ঝামেলা পোহাতে হয়–পুরুষদের সেগুলো কোনোটিই করতে হয় না। একটি পুরুষ, তাত্ত্বিকভাবে হলেও যে কোনো সময়ে এই পৃথিবীর বুকে অসংখ্য নারীর গর্ভে অসংখ্য সন্তানের জন্ম দিতে পারে (কুখ্যাত চেঙ্গিস খানের মতো কেউ কেউ সেটা করে দেখিয়েছেও)। কিন্তু একটি মেয়ে এক বছরে শুধু একটি পুরুষের শুক্রাণু দিয়েই গর্ভ নিশ্চিত করতে পারে–এর বেশি নয়। আসলে কেউ যদি বলেন, জৈববৈজ্ঞানিক দিক থেকে বিচার করলে যৌনতার উদ্ভবই হয়েছে আসলে নারী-পুরুষে পার্থক্য করার জন্য এটা বললে মোটেই অত্যুক্তি হবে না। এই পার্থক্যের প্রভাব ছেলে মেয়েদের মানস জগতেও পড়েছে, পড়েছে সমাজেও। কোনো গবেষকই এখন অস্বীকার করেন না যে যৌনতার বিভাজন নারী পুরুষে গড়ে দিয়েছে বিস্তর পার্থক্য শুধু দেহ কাঠামোতে নয়, তার অর্জিত ব্যবহারেও। সেজন্যই গবেষক ডোনাল্ড সিমন্স বলেন,

‘Men and women differ in sexual natures because throughout the immensely long haunting and gathering phase of evolutionary history of sexual desires and dispositions that were adaptive for either sex were for either sex were for the other tickets to reproductive oblivion.’

মানব সভ্যতার যে কোনো জায়গায় খোঁজ নিলে দেখা যায় ছেলেরা সংস্কৃতি নির্বিশেষে মেয়েদের চেয়ে চরিত্রে বেশি ভায়োলেন্ট’ বা সহিংস হয়ে থাকে, মেয়েরা বাচনিক যোগাযোগে (ভার্বাল কমিউনিকেশন) ছেলেদের চেয়ে বেশি পরিপক্ক হয়। পলিগামি বা বহুগামিত্ব ব্যাপারটা মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের মধ্যে অধিকতর প্রবলভাবে দৃশ্যমান। সম্পর্কের মধ্যে প্রতারণা বা ‘চিট’ ব্যাপারটাও কিন্তু মেয়েদের চেয়ে ছেলেরা বেশি করে থাকে। আবার মেয়েরা প্রতারণা ধরতে অধিকতর দক্ষ।

আসলে বৈজ্ঞানিকভাবে চিন্তা করলে ডিম্বাণু এবং শুক্রাণু কিন্তু আলাদা। পুরুষের স্পার্ম বা শুক্রাণু উৎপন্ন হয় হাজার হাজার, আর সে তুলনায় ডিম্বাণু উৎপন্ন হয় কম। ডিম্বাণুর আকার শুক্রাণুর চেয়ে বড় হয় অনেক অর্থাৎ, জৈববৈজ্ঞানিকভাবে চিন্তা করলে স্পার্ম সহজলভ্য, তাই কম দামি, আর সে তুলনায় ডিম্বাণু অনেক মূল্যবান। ‘স্পার্ম অনেক চিপ’ বলেই (সাধারণভাবে) পুরুষদের একটা সহজাত প্রবণতা থাকে বহু সংখ্যক জায়গায় তার প্রতিলিপি ছড়ানোর। সেজন্য তথাকথিত আধুনিক একগামী সমাজেও দেখা যায় পুরুষেরাই বেশি প্রতারণা করে সম্পর্কে, আর আগেকার সময়ে রাজা বাদশাহদের হারেম রাখার কিংবা শক্তিশালী সেনাপতিদের যুদ্ধ জয়ের পর নারী অধিকারের উদাহরণগুলোর কথা না হয় বাদই দিলাম। অপর দিকে ‘এগ ভালুয়েবল’ বলেই প্রকৃতিতে নারীরা যৌনসঙ্গী নির্বাচনের ব্যাপারে থাকে অপেক্ষাকৃত খুঁতখুঁতে, কারণ তারা নিশ্চিত করতে চায় কেবল উৎকৃষ্ট জিনের দ্বারাই যেন তার ডিম্বাণুর নিষেক ঘটে। এ ছাড়া এর আগের অধ্যায়ে আমরা রবার্ট ট্রাইভার্সের ‘অভিভাবকীয় বিনিয়োগ’ (parental investment) অনুকল্পের সাথেও পরিচিত হয়েছি। যেহেতু নারীরা অভিভাবকীয় বিনিয়োগের সিংহভাগে জড়িত থাকে, তারা যৌনসঙ্গী নির্বাচনের ব্যাপারে হয়ে উঠে অধিকতর হিসেবি এবং সাবধানী। সেজন্যই প্রকৃতিতে দেখা যায়, পুরুষ ময়ূর পেখম তুলে দাঁড়িয়ে থাকে, ‘খুঁতখুঁতে ময়ূরী হিসেব নিকেশ করে নির্বাচন করে যোগ্যতম ময়ূরকেই তার সৌন্দর্যের ভিত্তিতে। পুরুষ কোকিল গান গেতে থাকে তাদের সুমধুর গলায়, ফুট ফ্লাইরা নাচতে থাকে স্ত্রী মাছিদের প্রণয় লাভের জন্য, পুরুষ চিত্রল হরিণেরা সম্মোহিত করতে চায় তাদের বর্ণাঢ্য শিং এর যাদুতে, আর স্ত্রীরা নির্বাচন করে তাদের মধ্যে যোগ্য পুরুষটিকে।

মানবসমাজের দিকে তাকানো যাক। সাধারণভাবে বললে, একজন পুরুষ তার সারা জীবনে অসংখ্য নারীর গর্ভে সন্তানের জন্ম দিতে পারে। ইতিহাসে একজন পুরুষের সবচেয়ে বেশি সংখক সন্তানের হিসেব পাওয়া যায় ব্লাড থাস্টি মৌলে ইসমাইল-এর (১০৪২ জন সন্তান)। তাত্ত্বিকভাবে একজন পুরুষ গর্ভ সঞ্চার করতে পারে প্রতি মুহূর্তেই। অপরদিকে একজন নারী বছরে কেবল একটি সন্তানেরই জন্ম দিতে পারে। সে হিসেবে সাড়া জীবনে তার সন্তান সর্বোচ্চ ২০-২২টির বেশি হবার সম্ভাবনা নেই (যমজ সন্তানের হিসেব গোনায় আনছি না)। বিবর্তনীয় পটভূমিকায় দেখা গেছে নারীরা যদি ক্রমাগত সঙ্গী বদল করতে থাকলে তা আসলে কোনো প্রজননগত উপযোগিতা (reproductive benefit) প্রদান করে না। তার চেয়ে বরং সন্তানের দেখাশোনায় শক্তি বেশি নিয়োজিত করলেই বরং ভবিষ্যৎ জিন টিকে থাকার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। সম্ভবত এই কারণেই নারীদের মধ্যে বহুগামিতা থাকে পুরুষদের তুলনায় কম। সমীক্ষা থেকে দেখা গেছে, আদিম কিছু ট্রাইবে ভ্রাতৃয় বহুভ্রাতৃত্ব (fraternal polyandry), যেখানে সহোদর ভাইয়েরা মহাভারতের দ্রৌপদীর মতো একজন পত্নীর অংশীদার– দুচারটি জায়গায় দৃশ্যমান হলেও অভ্রাতৃয় বহুভ্রাতৃত্ব (nonfraternal polyandry) পৃথিবীর কোথাওই সেভাবে দৃশ্যমান নয়।

পর্নোগ্রাফির প্রতি আকর্ষণ মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের মধ্যে বেশি, সেটা বোধ হয় না বলে দিলেও চলবে। কিন্তু মেয়েরা আবার ছেলেদের তুলনায় ‘লাভ স্টোরি’র বেশি ভক্ত। সিরিয়াল কিলারের সংখ্যা ছেলেদের মধ্যে বেশি, মেয়েদের মধ্যে খুবই কম। সংস্কৃতি নির্বিশেষে পুরুষদের টাকা পয়সা, স্ট্যাটাস ইত্যাদির মাপকাঠিতে বিচার করা হয়, আর মেয়েদের সৌন্দর্যের। নৃতত্ত্ববিদ মেলভিন কনোর খুব পরিষ্কার করেই বলেন–

ছেলেরা মেয়েদের চেয়ে বেশি সহিংস আর মেয়েরা অনেক বেশি সংবেদনশীল–অন্তত শিশু এবং নাবালকদের প্রতি। এই ব্যাপারটা উল্লেখ করলে একে যদি ‘গতানুগতিক কথাবার্তা’ (cliché) বলে কেউ উড়িয়ে দিতে চান সেটা এ সত্যকে কিছুমাত্র দমন করবে না।

ব্যাপারগুলো সঠিক নাকি ভুল, কিংবা ‘উচিত’ নাকি ‘অনুচিত’ সেটি এখানে বিচার্য নয়, বিচার্য হচ্ছে আমাদের সমাজ কেন এইভাবে গড়ে উঠেছে যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মন মানসিকতা একটি নির্দিষ্ট ছকে সবসময় আবদ্ধ থাকে? এখানেই মানবপ্রকৃতি বিশ্লেষণে বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান যতটা সফল, সমাজবিজ্ঞান ততটা নয়।

কেন সংস্কৃতি-নির্বিশেষে ছেলেরা সম্পর্কের মধ্যে থাকা অবস্থায় তার সঙ্গীর সাথে বেশি প্রতারণা করে কিংবা কেন পর্নোগ্রাফির বেশি ভক্ত–এটি জিজ্ঞাসা করলে সমাজবিজ্ঞানী কিংবা নারীবাদীদের কাছ থেকে নির্ঘাত উত্তর পাওয়া যাবে যে, যুগ যুগ ধরে মেয়েদের সম্পত্তি বানিয়ে রাখা হয়েছে, তারা শোষিত এই মনোবৃত্তি তারই প্রতিফলন। কিন্তু যে সমস্ত সমাজে ছেলেমেয়েদের পার্থক্যসূচক মনোভাবের মাত্রা কম–সেখানে কী তাহলে এ ধরনের ঝোঁক নেই? না তা মোটেও নয়। এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া গেছে ইসরায়েলের কিবুজ (Kibbutz) শহরের একটি পরীক্ষামূলক গবেষণায়। সমাজে বিদ্যমান সমস্ত রীতি বা ট্যাবু আসলে জন্মগত নয়, বরং সংস্কৃতি থেকেই উদ্ভূত–এই ধারণা থেকে সেখানকার অধিবাসীরা ঠিক করেছিল সমস্ত যৌনতার প্রভেদমূলক পার্থক্যকে ওই শহর থেকে ঝেটিয়ে বিদায় করা হবে। তার প্রক্রিয়া হিসেবে সেখানকার মেয়েদেরকে ছেলেদের মতো ছোট ছোট চুল রাখতে উৎসাহিত করা হলো, আর ছেলেদেরকে শেখানো হলো সহিংসতা ত্যাগ করে কীভাবে শান্তিপুর্ণভাবে বসবাদ করা যায়! যে সমস্ত মেয়েরা ‘টম বয়’ হয়ে জীবন কাটাতে চায়, তাদের পিঠ চাপড়ে সাধুবাদ জানানো হলো, ছেলেরা যেন ঘরের কাজ আর মেয়েরা যেন বাইরের কাজে দক্ষ হয়ে ওঠে সেজন্য যথাযথ ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হলো। অর্থাৎ সব মিলিয়ে কিবুজ সে সময় গণ্য হয়েছিল আদর্শবাদীদের স্বর্গ হিসেবে যেখানে ছেলেমেয়েদের মধ্যে কোনো বিভেদ নেই। কিন্তু তিন প্রজন্ম পরে দেখা গেল সেই ‘আদর্শ’ কিবুজ পরিণত হয়েছে সবচেয়ে সেক্সিস্ট বা যৌনবৈষম্যবাদী শহর হিসেবে। সেখানকার মানুষজন আদর্শবাদীদের স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে ফিরে গিয়েছিল সেই চিরন্তন গত্বাঁধা জীবনে। অভিভাবকদের আদর্শবাদী নীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করল পরবর্তী প্রজন্মের সন্তানেরা। ছেলেরা দেখা গেল, অভিভাবকদের দেখিয়ে দেয়া পথ অস্বীকার করে বেশি পদার্থবিজ্ঞান, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং গণিত পড়তে শুরু করেছে, মেয়েরা বেশি যাচ্ছে মেডিকেলে। তারা নার্সিং-এ কিংবা শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছে ছেলেদের চেয়ে অনেক বেশি। ছেলেদের ঘরের কাজ করার যে ট্রেনিং দেয়া হয়েছিল, কিন্তু দেখা গেল মেয়েরাই শেষপর্যন্ত ঘরদোর গোছানোর দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে। দায়িত্ব তুলে নেওয়ার পেছনে কারণ হিসেবে তারা বলল, “আরে ছেলেরা ঠিকমত বাসাবাড়ি পরিষ্কার রাখতে পারে না। আর অন্যদিকে ছেলেরা বলল, “আরে যত ভালোভাবেই করি না কেন বউয়ের মর্জিমাফিক কিছুতেই হয় না। ব্যাপারটা অপ্রিয় হলেও সত্য যে, এ ধরনের বিভক্তিগুলোকে যতই অস্বীকার করে সাম্যের পথে সমাজকে ঠেলে দেয়া হয়, বিদ্যমান জৈববৈজ্ঞানিক পার্থক্যগুলো সে সমাজে তত প্রকট হয়ে উঠে। ইতিহাস তাই সাক্ষ্য দেয়।

.

চাহিদায় পার্থক্য, পার্থক্য মানসিকতাতেও

মনোবিজ্ঞানীরা অনেকেদিন ধরেই লক্ষ করছিলেন যে, ছেলেমেয়েদের পারস্পরিক চাহিদা পছন্দ, অপছন্দে যেমন মিল আছে, তেমনি আবার কিছু ক্ষেত্রে আছে চোখে পড়ার মতোই পার্থক্য। এটা হবার কথাই। নারী পুরুষ উভয়কেই সভ্যতার সূচনার প্রথম থেকেই ডারউইন বর্ণিত ‘সেক্সুয়াল সিলেকশন’ নামক বন্ধুর পথে নিজেদের বিবর্তিত করে নিতে হয়েছে, শুধু দৈহিকভাবে নয় মন মানসিকতাতেও। দেখা গেছে, ছেলেরা আচরণগত দিক দিয়ে মেয়েদের চেয়ে অনেক প্রতিযোগিতামূলক (competitive) হয়ে থাকে। ছেলেদের স্বভাবে প্রতিযোগিতামূলক হতে হয়েছে কারণ তাদের বিভিন্ন গোত্রের সাথে প্রতিযোগিতা করে, যুদ্ধ বিগ্রহ করে বাঁচতে হয়েছে আদিকাল থেকেই। যারা এ ধরনের প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে টিকে থাকতে পেরেছে তারাই অধিক হাড়ে সন্তানসন্ততি এ পৃথিবীর বুকে রেখে যেতে পেরেছে।

আধুনিক জীবনযাত্রাতেও পুরুষদের এই প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতাকে একটু চেষ্টা করলেই ধরা যাবে। একটা মজার উদাহরণ দেই। আমেরিকার একটি জরিপ থেকে দেখা গেছে পরিবার নিয়ে লং ড্রাইভিং-এ বেড়িয়ে কখনো পথ হারিয়ে ফেললে পুরুষেরা খুব কমই পথের অন্য মানুষের কাছ থেকে চায়। তারা বরং নিজেদের বিবেচনা থেকে দেখে নিজেরাই পথ খুঁজে নিতে তৎপর হয়, না পারলে বড়জোর ল্যান্ডমার্ক, ম্যাপের দারস্থ হয়, কিন্তু কাউকে জিজ্ঞাসা করে না। আর অন্যদিকে মেয়েরা প্রথমেই গাড়ি থামিয়ে কাউকে জিজ্ঞাসা করে নেয়। আসলে পুরুষেরা গাড়ি থামিয়ে কাউকে জিজ্ঞাসা করতে পছন্দ করে না, কারণ তাদের ‘আত্মম্ভরি’ মানসিকতার কারণে ব্যাপারটাকে তারা ‘যুদ্ধে পরাজয়’ হিসেবে বিবেচনা করে ফেলে নিজেদের অজান্তেই। আর মেয়েদের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব তাদের মানসপটে এত প্রবলভাবে রাজত্ব করে না বলে তারা সামাজিক সম্পর্ক তৈরি করে সমাধানে পৌঁছুতে উদগ্রীব থাকে। শুধু ড্রাইভিংই একমাত্র উদাহরণ নয়; পুরুষেরা অর্থ, বিত্ত আর সামাজিক প্রতিপত্তির প্রতি যে বেশি আকৃষ্ট তা যে কোনো সমাজেই প্রযোজ্য। এটাও এসেছে দীর্ঘদিনের প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা থেকে।

চিত্র। পেজ ১৪৭

চিত্র- সমীক্ষায় দেখা গেছে। ড্রাইভিং-এ বেরিয়ে কখনো পথ হারিয়ে ফেললে পুরুষেরা খুব কমই পথের অন্য মানুষের কাছ থেকে। চায়। তারা বরং নিজেদের বিবেচনা থেকে দেখে। নিজেরাই পথ খুঁজে নিতে তৎপর হয়, না পারলে। মানচিত্রের দারস্থ হয়, কিন্তু কাউকে জিজ্ঞাসা করে না।

এদিকে পুরুষেরা যখন প্রতিযোগিতা, হানাহানি মারামারি করে তাদের ‘পুরুষতান্ত্রিক’ জিঘাংসা চরিতার্থ করতে সচেষ্ট হয়েছে (যুদ্ধ এবং হানাহানি নিয়ে এর পরের অধ্যাআয়ে আরও বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে), তখন অন্য দিকে মেয়েরা দায়িত্ব নিয়েছে ‘সংসার গোছানোর। গৃহস্থালির পরিচর্যা মেয়েরা বেশি অংশগ্রহণ করায় তাদের বাচনিক এবং অন্যান্য যোগাযোগের ক্ষমতা ছেলেদের চেয়ে অনেক বেশি বিবর্ধিত হয়েছে। একটি ছেলের আর মেয়েদের মস্তিষ্ক বিশ্লেষণ করে গঠনগত যে বিভিন্ন পার্থক্য পাওয়া গেছে, তাতে বিবর্তনীয় অনুকল্পই সঠিক প্রমাণিত হয়। ছেলেদের ব্রেনের আকার গড়পড়তা মেয়েদের মস্তিষ্কের চেয়ে অন্তত ১০০ গ্রাম বড় হয়, কিন্তু ওদিকে মেয়েদের ব্রেন ছেলেদের চেয়ে অনেক ঘন থাকে। মেয়েদের মস্তিষ্কে কর্পাস ক্যালোসাম এবং এন্টেরিয়র কমিসুর নামক প্রত্যঙ্গ সহ টেম্পোরাল কর্টেক্সের যে এলাকাগুলো ভাষা এবং বাচনিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে সহায়তা করে বলে মনে করা হয়, মেয়েদের ক্ষেত্রে সেগুলো ছেলেদের চেয়ে অন্তত ২৯ ভাগ বিবর্ধিত থাকে। শুধু তাই নয়, মেয়েদের মস্তিষ্কে রক্তসঞ্চালনের হার ছেলেদের ব্রেনের চেয়ে শতকরা ১৫ ভাগ বেশি থাকে।

মস্তিষ্কের গঠনগত পার্থক্যের প্রভাব পড়ে তাদের অর্জিত ব্যবহারে, আর সেই ব্যবহারের প্রভাব আবার পড়ে সমাজে[১৬৬]। অভিভাবকেরা সবাই লক্ষ করেছেন, মেয়ে শিশুরা ছেলে শিশুদের চেয়ে অনেক আগে কথা বলা শিখে যায় একই রকম পরিবেশ দেয়া সত্ত্বেও। ছেলেদের বাচনিক যোগাযোগের ক্ষেত্রগুলো গড়পড়তা মেয়েদের মতো উন্নত না হওয়ায় ডাক্তাররা লক্ষ করেন পরিণত বয়সে ছেলেরা সেরিব্রাল পালসি, ডাইলেক্সিয়া, অটিজম এবং মনোযোগ-স্বল্পতা সহ বিভিন্ন মানসিক রোগে বেশি আক্রান্ত হয়। এ ধরনের আরও পার্থক্য আছে। ব্যবহারিক জীবনে দেখা যায় ছেলেরা যখন কাজ করে অধিকাংশ সময়ে শুধু একটি কাজে নিবদ্ধ থাকতে চেষ্টা করে, এক সাথে চার পাঁচটা কাজ করতে পারে না, প্রায়শই গুবলেট করে ফেলে। আর অন্যদিকে মেয়েরা অত্যন্ত সুনিপুণ ভাবে ছয় সাতটা কাজ একই সাথে করে ফেলে। এটাও হয়েছে সেই হান্টার গ্যাদারার পরিস্থিতি দীর্ঘদিন মানসপটে রাজত্ব করার কারণেই। শিকারি হবার ফলে পুরুষদের স্বভাবতই শিকারের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখতে হতো, ফলে তাদের মানসজগৎ একটিমাত্র বিষয়ে ‘ফোকাসড়’ হয়ে গড়ে উঠেছিল, আর মেয়েদের যেহেতু ঘরদোর সামলাতে গিয়ে বাচ্চা কোলে নিয়ে হাজারটা কাজ করে ফেলতে হতো তারা দক্ষ হয়ে উঠেছিল একাধিক কাজ একসাথে করাতে।

আরও কিছু পার্থক্য উল্লেখ করা যাক। ছেলেদের মস্তিষ্কের প্যারিয়েটাল কর্টেক্সের আকার মেয়েদের মস্তিষ্কের চেয়ে অনেক বড় হয়। বড় হয় অ্যামাগদালা নামের বাদাম আকৃতির প্রত্যঙ্গের আকারও। এর ফলে দেখা গেছে ছেলেরা জ্যামিতিক আকার নিয়ে নিজেদের মনে নাড়াচাড়ায় মেয়েদের চেয়ে অনেক দক্ষ হয়। তারা একটি ত্রিমাত্রিক বস্তুকে সামনে থেকে দেখেই নিজেদের মনের আয়নায় নড়িয়ে চড়িয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বুঝে নিতে পারে বস্তুটি, পেছন থেকে, নীচ থেকে বা উপর থেকে কিরকম দেখাতে পারে। জরিপ থেকে দেখা গেছে, ছেলেরা গড়পড়তা বিমূর্ত এবং ‘স্পেশাল’ কাজের ব্যাপারে বেশি সাবলীল, আর মেয়েরা অনেক বেশি বাচনিক এবং সামাজিক কাজের ব্যাপারে সাবলিল।

চিত্র। পেজ ১৪৯

চিত্র : বিজ্ঞানীরা ছেলে এবং মেয়েদের মস্তিষ্ক বিশ্লেষণ করে গঠনগত বিভিন্ন পার্থক্য লক্ষ্য করেছেন (ছবি- সায়েন্টিফিক আমেরিকানের সৌজন্যে)

হয়তো এজন্যই ছেলেরা অধিক হারে স্থাপত্যবিদ্যা কিংবা প্রকৌশলবিদ্যা পড়তে উৎসুক হয়, আর মেয়েরা যায় শিক্ষকতা, নার্সিং কিংবা সমাজবিদ্যায়। এই ঝোঁক সংস্কৃতি এবং সমাজ নির্বিশেষে একই রকম দেখা গেছে। এই রকম সুযোগ দেয়ার পরও বাংলাদেশের অধিকাংশ মেয়েরা বড় হয়ে বুয়েটের চেয়ে মেডিকেলে পড়তেই উদগ্রীব থাকে। কোনো সংস্কৃতিতেই ছেলেরা খুব একটা যেতে চায় না নার্সিং-এ, মেয়েরা যেমনিভাবে একটা ‘গ্যারেজ মেকানিক’ হতে চায় না অধিকাংশ ক্ষেত্রেই। এটা কি কেবলই মেয়েরা শোষিত কিংবা পিছিয়ে পড়া বলে, নাকি বিবর্তনীয় ‘সিলেকশন প্রেশার’ তাদের মধ্যে অজান্তেই কাজ করে বলে?

.

সব টাকমাথা পয়সাওয়ালা লোকের ঘরে সুন্দরী বউ দেখি কেন?

কলেজ জীবনে ক্লাস ‘বাং মেরে’ নিউমার্কেটে ঘুরার অভিজ্ঞতা আমাদের সময়কার বোধ হয় কমবেশি সব ছাত্রেরই আছে। আমারও ছিল পুরোমাত্রায়। একটা পুরো গ্যাং নিয়ে চলে যেতাম। ওই গ্যাং-এর একটা অংশ আবার সুন্দর মেয়ে দেখায় সদা ব্যস্ত থাকত। কিন্তু দেখলে কী হবে, পোড়াকপাল, যত বেশি সুন্দরী মেয়ে–তত বেশি টাক মাথা, বয়স্ক, হোঁদল-কুকুতে স্বামী নিয়ে ঘুরছে। শেষমেষ এমন হলো যে, টাকমাথা ‘আবলুস বাবা’ টাইপের কাউকে বলিউডের নায়িকাদের মতো মেয়ে নিয়ে ঘুরতে দেখলেই আমরা ধরে নিতাম ব্যাটার হয় ম্যালা পয়সা, নইলে ব্যাটা সমাজে বিরাট কেউকেটা কেউ হবে। মজার ব্যাপার হলো–পরে দেখা যেত আমাদের অনুমান নির্ভুল হতো প্রায় সবক্ষেত্রেই। আসলে ক্ষমতাবান পুরুষেরা যে সুন্দরী তরুণীদের প্রতি বেশি লালায়িত হয়, আর সুন্দরীরা পয়সা আর স্ট্যাটাসওয়ালা স্বামীর প্রতি–এটা সব সমাজেই এত প্রকট যে এটা নিয়ে গবেষণা করার কেউ প্রয়োজনই বোধ করেননি কখনো। এজন্যই ন্যান্সি থর্নহিল বলেন,

Surely no one has ever seriously doubted that men desire young, beautiful women, and that women desire wealthy high status men.

কিন্তু সনাতন সমাজবিজ্ঞানীরা আপত্তি করেছেন। তাদের অনুমান ছিল সব সংস্কৃতিতে নিশ্চয় এ ধরনের ‘স্টেরিওটাইপিং’ নেই। এখন এদের অনুমান সঠিক না কি ভুল তা পরীক্ষা করে দেখার সিদ্ধান্ত নিলেন মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডেভিড বাস। তিনি ৩৩ টি দেশে সমীক্ষা চালিয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে, সঙ্গী নির্বাচনের সময় ছেলেরা গড়পড়তা দয়া, বুদ্ধিমত্তা আশা করে, কিন্তু পাশাপাশি প্রত্যাশা করে তারুণ্য এবং সৌন্দর্য। অন্যদিকে মেয়ারাও গড়পড়তা ছেলেদের কাছ থেকে দয়া, বুদ্ধিমত্তা আশা করে ঠিকই, পাশাপাশি সঙ্গীর কাছ থেকে আশা করে ধন সম্পদ আর স্ট্যাটাস। অধ্যাপক বাস প্রথমে আমেরিকায় সমীক্ষা চালালেন। দেখা গেল, আমেরিকায় মেয়েরা যত ভালো চাকরিই করুক না কেন, তারা আশা করে তার স্বামী তাদের চেয়ে বেশি রোজগার করবে নইলে ব্যাপারটা ‘এনাফ কুল’ হবে না। ম্যাচ ডট কম—এর মতো সাইটগুলোতে দেখা যায় মেয়েরা তার হবু সঙ্গীর স্ট্যাটাস এবং প্রতিপত্তির প্রতি আগ্রহী হয় ছেলেদের চেয়ে ১১ গুন বেশি। এমনকি একটি পরীক্ষায় অধ্যাপক বাস একই লোককে কখনো বার্গার কিং বা ম্যাকডোনাল্ডসের কর্মীর পোশাক পরিয়ে, কখনোবা বিরাট কোনো কোম্পানির সিইও সাজিয়ে পরীক্ষা করলেন। দেখা গেল, নিম্ন স্ট্যাটাসের পোশাক পরা লোকের সাথে মেয়েরা প্রাথমিকভাবে কোনো ধরনের সম্পর্ক করতেই রীতিমত অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। অথচ একই লোককে বড় স্ট্যাটাসের কোনো পোশাক পরিয়ে বাইরে নেওয়া হলেই মেয়েরা তার প্রতি উৎসুক হয়ে উঠছে। কিন্তু ছেলেদের ক্ষেত্রে সেরকম প্রবণতা লক্ষ করা যায়নি। অর্থাৎ, ছেলেরা সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে মেয়েদের স্ট্যাটাস নিয়ে খুব বেশি উদ্বিগ্ন নয়, যতটা তারা উদ্বিগ্ন একটি মেয়ের দৈহিক সৌন্দর্যের ব্যাপারে। প্রথমে যখন বাসের ফলাফল বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতে প্রকাশিত হলো, সেটা উড়িয়ে দেয়া হলো এই বলে–আরে ওটা আমেরিকার পচে যাওয়া ভোগবাদী সংস্কৃতির নিদর্শন। অন্য জায়গায় নিশ্চয় এরকম হবে না। অন্য জায়গার ঘটনা বুঝতে বাস ইউরোপীয় দেশগুলোতে তার সমীক্ষা চালালেন। সেখানেও একই ধরনের ফলাফল বেড়িয়ে আসলো— ছেলেরা মেয়েদের সৌন্দর্যের প্রতি বেশি মনোযোগী, আর মেয়েরা ছেলেদের স্ট্যাটাসের- তা সে হল্যান্ডেই সমীক্ষা চালান হোক, অথবা জার্মানিতে। এবারে বলা হলো ইউরোপীয় সংস্কৃতি অনেকটা আমেরিকার মতোই। সেখানে তো এরকম ফলাফল আসবেই। এরপর অধ্যাপক বাস ছয়টি মহাদেশ এবং পাঁচটি দ্বীপপুঞ্জের ৩৭ টি ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতিতে গড়ে ওঠা ১০০৪৭ জন লোকের উপর সমীক্ষা চালালেন– একেবারে আলাস্কা থেকে শুরু করে সেই জুলুল্যান্ড পর্যন্ত। প্রতিটি সংস্কৃতিতেই দেখা গেল মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে আর্থিক প্রতিপত্তিকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ করে[১৬৭]। জাপানে এই পার্থক্য সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেল আর হল্যান্ডে সবচেয়ে কম কিন্তু তারপরেও সংস্কৃতি নির্বিশেষে নারী-পুরুষের চাহিদার পার্থক্য কিন্তু থেকেই যাচ্ছে।

.

সেক্সুয়াল ফ্যান্টাসিঃ কেন পুরুষেরা পর্নোগ্রাফি ভালোবাসে আর মেয়েরা প্রেমের উপন্যাস

নারীপুরুষের এ ধরনের চাহিদার পার্থক্য আরও প্রকট হয়েছে নারী-পুরুষদের মধ্যকার যৌনতা নিয়ে ‘ফ্যান্টাসি’কেন্দ্রিক গবেষণাগুলোতেও। ব্রুস এলিস এবং ডন সিমন্সের করা ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে যে, পুরুষ এবং নারীদের মধ্যকার যৌনতার ব্যাপারে ফ্যান্টাসিগুলো যদি সততার সাথে লিপিবদ্ধ করা হয়, তাহলে দেখা যাবে তিনজনের মধ্যে একজন পুরুষ একাধিক নারীর সাথে যৌনতার ফ্যান্টাসিতে ভোগে, এমনকি সারা জীবনে তাদের পার্টনারের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে কল্পনা করে তারা আমোদিত হয়ে উঠে আর মেয়েদের মধ্যে সে সংখ্যাটা মাত্র ৮ ভাগ। এলিস এবং সিমন্সের সমীক্ষায় অংশগ্রহণ করা অর্ধেক সংখ্যক নারীরা অভিমত দিয়েছে, যৌনতা নিয়ে কল্পনার উন্মাতাল সময়গুলোতেও তারা কখনো সঙ্গী বদল করে না, অন্য দিকে পুরুষদের মধ্যে এই সংখ্যাটা মাত্র ১২ ভাগ। মেয়েদের যৌনতার ফ্যান্টাসিগুলো তার নিজের পরিচিত যৌনসঙ্গীকে কেন্দ্র করেই সবসময় আবর্তিত হয়, আর অন্যদিকে পুরুষদের যৌনতার ফ্যান্টাসিগুলো সময় সময় সম্পূর্ণ অপরিচিত মেয়েকে নিয়েও উথলে ওঠে। একারণেই গবেষক এলিস এবং সিমন্স তাদের গবেষণাপত্রে এই বলে উপসংহার টেনেছেন[১৬৮]—

পুরুষদের যৌনতার বাঁধন-হারা কল্পনাগুলো হয়ে থাকে সর্বব্যাপী, স্বতঃস্ফুর্ত, দৃষ্টিনির্ভর, বিশেষভাবে যৌনতাকেন্দ্রিক, নির্বিচারী, বহুগামী এবং সক্রিয়। অন্যদিকে মেয়েদের যৌন অভিলাস অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক, আবেগময়, অন্তরঙ্গ এবং অক্রিয়।

একই ধরনের ফলাফল পাওয়া গেছে বিবর্তন মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক ডেভিড বাসের ‘মেটিং স্ট্র্যাটিজি’ নিয়ে বিভিন্ন গবেষণাতেও। এমনি একটি গবেষণায় দেখা গেছে একজন পুরুষকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়েছে সাড়া জীবনে কতজন যৌনসঙ্গীর দরকার বলে তার মনে হয়, গড়পড়তা উত্তর পাওয়া গেছে-১৮। নারীদের ক্ষেত্রে সেটা মাত্র ৪.৫ (নীচের ছবি দ্রঃ)।

চিত্র। পেজ ১৫৩

Figure 4. Number of sexual partners desired. (Subjects recorded in blank spaces provided how many sexual partners they would ideally like to have for each specified time interval)

চিত্র— বিজ্ঞানীরা দেখেছেন ছেলে এবং মেয়েদের মধ্যে যৌনসঙ্গীর চাহিদার মাত্রায় পার্থক্য রয়েছে। একজন পুরুষের গড়পড়তা যৌনসঙ্গীর সংখ্যার মানসিক চাহিদা মেয়ের চাহিদার চেয়ে অন্তত চারগুণ বেশি থাকে (উৎসডেভিড বাস, হিউম্যান মেটিং স্ট্র্যাটিজি)

আরও কিছু মজার তথ্য এবং জরিপের ফলাফল সন্নিবেশিত করা যাক। এই জরিপটা চালানো হয়েছিল একটি কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে। আর.ডি ক্লার্ক এবং হ্যাটফিল্ডের পরিচালিত এ গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছিল জার্নাল অব সাইকোলজি এন্ড হিউম্যান সেক্সয়ালিটিতে ১৯৮৯ সালে[১৭০]। ব্যাপারটা ছিল এরকমের। কলেজের কিছু ছাত্রদের শিখিয়ে দেয়া হয়েছিল যে তারা অপরিচিত ছাত্রীদের সামনে গিয়ে বলবে

“এই মেয়ে শোন, তোমাকে আমি কয়েকদিন ধরেই ক্যাম্পাসে দেখছি। তুমি খুবই আকর্ষণীয়।”

তারপরের তিনটি প্রশ্ন হবে এরকমের

১। তুমি আমার সাথে ডেটে যেতে চাও?

২। তুমি কি আমার সাথে আমার এপার্টমেন্টে যেতে চাও?

৩। তুমি কি আমার সাথে সেক্স করতে ইচ্ছুক?

দেখা গেছে, এ ধরনের প্রশ্নে ৫০% ছাত্রী ডেট এ যেতে রাজি হয়েছে, ৬% ছাত্রী সেই ছাত্রের সাথে এপার্টমেন্টে যেতে রাজি হয়েছে এবং ০% ছাত্রী সেক্সে রাজি হয়েছে। শুধু তাই নয়, বহু ছাত্রী প্রথমেই এভাবে সেক্সের আবেদন হাজির করাকে ‘ইনসাল্ট’ বা অপমান হিসেবে নিয়েছে।

কিন্তু ছেলেদের ক্ষেত্রে ফলাফল পাওয়া গেছে ভিন্ন রকমের। কোনো মেয়ে যদি কোনো ছাত্রের কাছে গিয়ে ঠিক উপরের প্রশ্নগুলো করে, তবে দেখা গেছে, ৫০% ছেলে প্রথমেই ডেটে রাজি হয়েছে, ৬৯% সেই ছাত্রীর সাথে এপার্টমেন্টে যেতে রাজি হয়েছে, আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে ৭৫% ছাত্র প্রথমেই ছাত্রীর সাথে যৌনকর্মে সম্মতি দিয়েছে।

ছেলে মেয়েদের যৌন-অভিলাসের পার্থক্যসূচক এই প্রবণতার প্রভাব পড়েছে আজকের দিনের বাণিজ্যে এবং পণ্য-দ্রব্যে। এমনি একটি দ্রব্য হচ্ছে ‘পর্নোগ্রাফি অন্যটি হলো ‘রোমান্স নভেল। পর্নোগ্রাফির মূল ক্রেতা নিঃসন্দেহে পুরুষ। পুরুষদের উদগ্র এবং নির্বিচারী সেক্স ক্রেজের চাহিদা পূর্ণ করতে বাজার আর ইন্টার্নেট সয়লাব হয়ে আছে সফট পর্ন, হার্ড পর্ন, থ্রি সাম, গ্রুপ সেক্সসহ হাজার ধরনের বারোয়ারি জিনিসপত্রে। এগুলো পুরুষেরাই কিনে, পুরুষেরাই দেখে। মেয়েরা সে তুলনায় কম। কারণ, মেশিনের মতো হার্ডকোর পর্ন পুরুষদের তৃপ্তি দিলেও মেয়েদের মানসিক চাহিদাকে তেমন পূর্ণ করতে পারে না। সমীক্ষায় দেখা গেছে নারীর নগ্ন দেহ দেখে পুরুষেরা যেমন সহজেই আমোদিত হয়, মেয়েরা তেমনি হয় না। কারণ মেয়েদের অবারিত সেক্স জাগ্রত করতে দরকার অবারিত ইমোশন!

আর মেয়েদের এই ‘অবারিত ইমোশন’ তৈরি করতে বাজারে আছে ‘রোমান্স নভেল। এই রোমান্টিক নভেলের মূল ক্রেতাই নারী। দেদারসে প্রেম-পিরিতি বিচ্ছেদের পসরা সাজিয়ে শয়ে শয়ে বই সাড়া দুনিয়া জুড়ে বের করা হয়, আর সেগুলো দেদারসে বিক্রি হতে থাকে সাড়া বছর জুড়ে, মূলত মেয়েদের হাত দিয়ে। বাংলাদেশে যেমন আছে ইমদাদুল হক মিলন, তেমনি আমেরিকায় সুসান এলিজাবেদ ফিলিপ্স, ভারতে তেমনি সুবোধ ঘোষ কিংবা নীহাররঞ্জন গুপ্ত। প্রেম কত প্রকার ও কী কী তা বুঝতে হলে এদের উপন্যাস ছাড়া গতি নেই। আমি শুনেছি, রোমান্স নভেলের জন্য প্রকাশকেরা ইদানীংকালে বিশেষত উঠতি লেখকদের নাকি বলেই দেয় কীভাবে তার উপন্যাস ‘সাজাতে হবে, আর কী কী থাকতে হবে। একটু প্রেম, অনুরাগ, কমিটমেন্ট, মান-অভিমান, বিচ্ছেদ, ক্লাইম্যাক্স তারপর মিলন। আবেগের পশরা বেশি থাকতে হবে, সে তুলনায় সেক্সের বাসনা কম। বইয়ে নায়িকার সেক্সের সাথে আবার ইমোশন মিলিয়ে দিতে হবে, ইত্যাদি। এভাবে প্রতিদিনই তৈরি হচ্ছে রোমান্স নভেলের ম্যানুফ্যাকচারিং। মেয়েরা দেদারসে কিনছে, আবেগে ভাসছে, হাসছে, কখনো বা চোখের পানি ফেলছে। আর বই উঠে যাচ্ছে বেস্ট সেলার তালিকায়।

আরও কিছু আনুষঙ্গিক মজার বিষয় আলোচনায় আনা যাক। পশ্চিমা বিশ্বে এক সময় ‘প্লেবয়’-এর পাশাপাশি একসময় ‘প্লে গার্ল’ এবং ‘ভিভা’ চালানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। চলেনি। মেয়েরা এ ধরনের পত্রিকা কেনেনি, বরং কিনেছে সমকামী পুরুষেরা ঢের বেশি। ছেলেদের প্রেম অধিকাংশ ক্ষেত্রেই খুব যান্ত্রিক। পর্নোগ্রাফি সেজন্যই ছেলেদেরকেই বেশি আকর্ষণ করে। আরও একটি প্রাসঙ্গিক উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। ভায়াগ্রা পুরুষের জন্য কাজ করলেও মেয়েদের জন্য করে না। ভায়াগ্রা কাজ করে খুব সাধারণ একটি পদ্ধতিতে। পুরুষাঙ্গে রক্তপ্রবাহ বাড়িয়ে দিয়ে। ঠিক একই পদ্ধতিতে ক্লায়টোরিসে রক্তপ্রবাহ বাড়িয়ে দিয়ে মেয়েদের জন্য ‘পিঙ্ক ভায়াগ্রা’ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সফল হয়নি। একটি বড় কারণ মেয়েদের প্রেম এত যান্ত্রিক নয়, তাদের প্রেম অনেক বর্ণময়, অনেক ধরনের আবেগের সুগ্রন্থিত মিশ্রণ। তাই ছেলেদের ভায়াগ্রার মতো মেয়েদের জন্য ভায়াগ্রা তৈরি করতে গিয়ে বড় বড় কারখানাগুলো চুল ছিঁড়ে ফেলছে কিন্তু পণ্ডশ্রমই সার হয়েছে, সফলতা আসেনি। এদিকে ছেলেরা শুধু কেন বল খেলবে আর মেয়েরা পুতুল–এই শিকল ভাঙার অভিপ্রায়ে ভিন্ন ধরনের খেলনা প্রবর্তনের চেষ্টা হয়েছিল–চলেনি। কারণ কী? কারণ হচ্ছে, আমরা যত আড়াল করার চেষ্টাই করি না কেন, ছেলেমেয়েদের মানসিকতায় পার্থক্য আছে আর সেটা দীর্ঘদিনের বিবর্তনীয় ছাপ থাকার কারণেই। এই ব্যাপারটিই প্রকাশিত হয়েছে ব্রিটিশ পত্রিকা ইন্ডিপেন্ডেন্টে এক মায়ের আর্তিতে। সেই মা পত্রিকায় (নভেম্বর ২, ১৯৯২) তার অভিজ্ঞতা থেকে লিখেছেন–

আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে আপনার পত্রিকার বিজ্ঞ পাঠকেরা কী বলতে পারবেন কেন একই রকমভাবে বড় করা সত্ত্বেও যতই সময় গড়াচ্ছে আমার দুই জমজ বাচ্চাদের মধ্যকার নারী-পুরুষজনিত পার্থক্যগুলো প্রকট হয়ে উঠছে? কার্পেটের উপর যখন তাদের খেলনাগুলো একসাথে মিলিয়ে মিশিয়ে ছড়িয়ে রাখা হয়, তখন দেখা যায় ছেলেটা ঠিকই ট্রাক বা বাস হাতে তুলে নিচ্ছে, আর মেয়েটা পুতুল বা টেডি বিয়ার।

শুধু মানব শিশু নয়, মানুষের কাছাকাছি প্রজাতি ‘ভার্ভেট মাঙ্কি’ নিয়ে গবেষণা করেও বিজ্ঞানীরা দেখেছেন তাদের হাতে যদি খেলনা তুলে দেয়া হয়, ছেলে বানরেরা ট্রাক বাস গাড়ি ঘোড়া নিয়ে বেশি সময় কাটায় আর মেয়ে বানরেরা পুতুল কোলে নিয়ে। মানবসমাজে দেখা গেছে খুব অল্প বয়সেই ছেলে আর মেয়েদের মধ্যে খেলনা নিয়ে এক ধরনের পছন্দ তৈরি হয়ে যায়, বাবা-মা’রা সেটা চাপিয়ে দিক বা না দিক। দোকানে নিয়ে গেলে ছেলেরা খেলনা-গাড়ি কিংবা বলের দিকে হাত বাড়াতে শুরু করে, আর মেয়েরা পুতুলের প্রতি। এই মানসিকতার পার্থক্যজনিত প্রভাব পড়েছে খেলনার প্রযুক্তি, বাজার এবং বিপণনে। যে কেউ টয়সেরাসের মতো দোকানে গেলেই ছেলেমেয়েদের জন্য খেলনার হরেক রকম সম্ভার দেখতে পাবেন। কিন্তু খেলনাগুলো দেখলেই বোঝা যাবে–এগুলো যেন দুই ভুবনের দুই বাসিন্দাদের চাহিদাকে মূল্য দিতে গিয়ে আলাদা আলাদা ভাবে বানানো।

চিত্র। পেজ ১৫৬

চিত্র— বিজ্ঞানীরা ছেলে ভার্ভেট মাঙ্কি নিয়ে গবেষণা করে দেখেছেন ছেলে এবং মেয়েদের মধ্যে খেলনার প্রতি পছন্দের প্রকৃতি ভিন্ন হয়, যা আমাদের মানবসমাজের ছেলেমেয়েদের খেলনা নিয়ে ‘স্টেরিওটাইপিং’-এর সাথে মিলে যায় (ছবি- সায়েন্টিফিক আমেরিকানের সৌজন্যে)

শুধু শিশু বয়সে নয়, পরিণত বয়সেও ছেলে মেয়েদের মধ্যকার মানসিকতার। প্রভেদমুলক পার্থক্য বজায় থাকে পুরোমাত্রায়। পুরুষদের একটা বড় অংশ অর্থ, প্রতিপত্তি এবং যৌনতার প্রতি যেভাবে লালায়িত হয়, মেয়েরা গড়পড়তা সেরকম হয় না। বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান ছেলে মেয়েদের এই মানসিক পার্থক্যকে খুব সহজেই ব্যাখ্যা করতে পারে। ডকিন্সের ‘সেলফিশ জিন’ তত্ত্ব সঠিক হলে, আমাদের দেহ জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে নিতে চাইবে ‘জিন সঞ্চালনে’। পুরুষদের জন্য যেহেতু নয় মাস ধরে গর্ভধারণের ঝামেলা নেই, নেই অন্য আনুষঙ্গিক ঝামেলা মেয়েদের যেগুলো পোহাতে হয় গর্ভধারণের জন্য, সেহেতু তাদের মধ্যে একটা অংশ থাকেই যারা মনে করে যত বেশি জিন সঞ্চালন করা যাবে ততই বেশি থাকবে ভবিষ্যত প্রজন্ম বেঁচে থাকার সম্ভাবনা। তাই ইতিহাসে দেখা যাবে শক্তিশালী পুরুষেরা কিংবা গোত্ৰাধিপতিরা কিংবা রাজা বাদশাহরা হেরেম তৈরি করে সুন্দরী স্ত্রী আর উপপত্নী দিয়ে প্রাসাদ ভর্তি করে রাখত। পর্নোগ্রাফির প্রতি আকর্ষণ পুরুষদেরই বেশি থাকে কিংবা পতিতাপল্লীতে পুরুষেরাই যায় আদিম সেই উদগ্র ‘যৌনস্পৃহা মানসপটে রাজত্ব করার কারণেই।

.

পর্নোগ্রাফি থেকে মুক্ত নয় রক্ষণশীল জিহাদি (অবশ্যই পুরুষ) সৈনিকেরাও

২০১১ সালের মে মাস। আমি যখন বইয়ের এই অংশটুকু লিখছিলাম, তখন পাকিস্তানের এবোটাবাদে ঝটিকা আক্রমণ চালিয়ে ওসামা বিন লাদেনকে সবেমাত্র হত্যা করা হয়েছে। লাদেনকে হত্যার জন্য মার্কিন বাহিনী হঠাৎ করেই পাকিস্তানে অভিযান চালায়। লাদেন তখন ইসলামাবাদ থেকে ৩৫ মাইল দূরে এবোটাবাদ নামক একটি শহরের একটি তিন তলা বাড়িতে অবস্থান করছিল।  হেলিকপ্টার দিয়ে পরিচালিত ওই অভিযানে লাদেন, লাদেনের একজন ছেলে এবং তার ২ জন। সহযোগীর মৃত্যু হয়।

কিন্তু তার মৃত্যুর পর যে খবরটি মিডিয়ায় এল তা আরও চাঞ্চল্যকর। ওসামা বিন লাদেনকে হত্যার পর ওসামার বাড়ি থেকে জব্দ কম্পিউটার থেকে পাওয়া গেল পর্নোগ্রাফির হরেক রকম কালেকশন। যে বিন লাদেন মেয়েদের সম্মান করে শরিয়া মোতাবেক চলাফেরা, হিজাব পরা, পর্দানসীন থাকাকে পশ্চিমা ধাচের অশালীন চলাফেরার চেয়ে অনেক উৎকৃষ্ট বলে মনে করতেন, সেই লাদেন পশ্চিমা মেয়েদের পর্নোগ্রাফি তার কম্পিউটারে সংগ্রহ করে রাখতেন, এবং সম্ভবত উৎসাহের সাথে সেগুলো তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতেন। এ খবরটি প্রকাশিত হয়েছে রয়টার, সিএনএন, ইয়াহু নিউজ, ফক্স নিউজ, এবিসি নিউজ, গার্ডিয়ান, হাফিংটন পোস্টসহ বহু নিউজ মিডিয়াতেই[১৭১]।

এর মানে হচ্ছে, মরহুম বিন লাদেন চমৎকার একটি ইসলামি জীবন অনুসরণ করেছেন। যেখানে তিনি তার বিপ্লবী আদর্শে বলিয়ান উম্মতদের আত্মঘাতী বোমা হামলায় প্ররোচিত করেছেন, নাইন-ইলেভেনের মতো আরও ঘটনা পুনর্বার। ঘটানোর ডাক দিয়েছেন, কাফির নাসারাদের সমূলে ধ্বংস করে ইসলামি সাম্যবাদের পতাকা তুলে ধরার হাঁকডাক পেরেছেন, সেখানে সেই বিপ্লবের অসংবাদিত নেতা লাদেন ইসলামাবাদের মাত্র ৬০ মেইল দূরে সামরিক বাহিনীর অভয়ারণ্য বলে খ্যাত এবোটাবাদের একটি দূর্গতুল্য প্রাসাদে তিন স্ত্রী এবং এগারোজন সন্তানসন্ততি নিয়ে নিরাপদে জীবনযাপন করতেন, কাফির নাসারাদের বানানো কোকা-কোলা / পেপসি চুক চুক করে পান করতেন, শখ করে দূর্গের বাইরে মারিজুয়ানা বা গঞ্জিকার বাগান করতেন, এবং গভীর রাতে কম্পিউটারে বসে বসে পর্নোগ্রাফি দেখতেন। চমৎকার একজন ইসলামি নেতার মতোই কাজ কারবার।

যদিও হলফ করে বলার উপায় নেই যে, বিন লাদেনই সেই পর্নোগুলো দেখতেন, কিন্তু তারপরেও যখন তার পার্সোনাল কম্পিউটারেই রকমারি ধরনের ঢালাও পর্নের সংগ্রহ আবিস্কৃত হয়েছে, এবং সেই কম্পিউটারটি সুরক্ষিত ছিল কেবল বিন লাদেনের নিত্যদিনের ব্যবহারের জন্যই, তখন মন থেকে জোরালো একটা সন্দেহের তীর প্রক্ষিপ্ত হয় বৈকি! যাহা হাঁসের মতো প্যাঁক প্যাঁক করে আর যার হাঁসের মতো পালক আছে তাহা শেষ পর্যন্ত হাঁসই।

[কেন পর্নোগ্রাফি বহু পুরুষদের উন্মাতাল করে? পর্নোগ্রাফি দেখা কোনো সত্যিকার যৌনসঙ্গম নয়, এটা সবাই জানে। তারপরেও পর্নোভিডিও কেন পুরুষদের উত্তেজিত করে, কামার্ত করে তুলে? বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানে এর উত্তর পাওয়া গেছে। সাভানা অনুকল্পের কথা আমরা প্রথম অধ্যায়ে জেনেছি; যে কারণে আমরা তেল চর্বিযুক্ত খাবারের প্রতি লালায়িত হই, যে কারণে আমরা সাপ আর বিষধর কীটপতঙ্গ দেখলেই ভয় পাই, পর্নোগ্রাফির প্রতি বহু পুরুষদের আসক্তির কারণও মূলত একই জায়গায়। সাভানা অনুকল্প বলছে, আমরা আধুনিক জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হয়ে উঠলেও আমাদের মস্তিষ্ক রয়ে গেছে প্রস্তর যুগে আমাদের করোটির ভিতর বাস করে আদিম প্রস্তর যুগের মস্তিষ্ক। কারণ মানব মস্তিষ্কের মূল মডিউলগুলো তৈরি হয়ে গিয়েছিল আমরা যখন আফ্রিকার সাভানা তৃণভুমিতে শিকারি সংগ্রাহক হিসেবে জীবন। কাটাতাম। ভিডিও, সিনেমা, এগুলো আধুনিক কারিগরী উৎকর্ষময়তার অবদান, কিন্তু আমাদের মস্তিষ্ক আধুনিক জটিলতার মাঝে সময় অতিক্রম করলেও এর প্রকৃত বাস্তবতা থেকে অপার বাস্তবতাকে পৃথক করতে অনেক সময়ই থাকে অক্ষম। সেজন্যই গভীর রাতে ভূতের বই পড়লে বা সিনেমা দেখলে আমাদের অনেকেরই গা ছম ছম করে। যে কারণে ভূতের সিনেমা দেখে অনেকে ভয় পায়, একই কারণে পর্নোগ্রাফি দেখেও অনেকে উত্তেজিত হয়। মেয়েদের নগ্ন ছবি কিংবা পর্নোভিডিও দেখলে পুরুষদের মস্তিষ্ক বুঝে উঠতে পারে না যে, এগুলো সত্যি নয়–এগুলো আসলে কৃত্রিমভাবে তৈরি পণ্যমাত্র। এই অত্যাধুনিক পণ্যগুলোর কোনো অস্তিত্ব আমাদের পূর্বপুরুষদের সাভানা পরিবেশে ছিল না। তাদের কাছে সে সময় কোনো নগ্ন মেয়ের সাথে সঙ্গম কিংবা সঙ্গম করার জন্য উত্তেজক পরিস্থিতি তৈরি হওয়া সবসময়ই ছিল সে সময়ের প্রেক্ষাপটে প্রকৃত বাস্তবতার নিয়ামক। কাজেই আধুনিক মানুষ কম্পিউটারে বসে কোনো মেয়ের নগ্ন ছবি দেখলে কিংবা পর্নো ভিডিও দেখলে প্রস্তর যুগে তৈরি পুরুষের মস্তিষ্ক অনুধাবন করতে পারে না যে উপকরণগুলো আসলে কৃত্রিম,বরং মস্তিষ্কে সেই সমস্ত সঙ্কেতই পাওয়া যায় যার মাধ্যমে মনে হয় সত্যি সত্যিই ওই মেয়েদের সাথে যৌনসঙ্গমের একটা সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ সময় পুরুষদের জননেন্দ্রিয় শক্ত হয়ে যায়, রক্তচাপ বেড়ে যায়, তাদের দৃষ্টি ফোকাস হয়ে উঠে ভিডিওতে দেখা মেয়ের দেহের বিবিধ যৌনাঙ্গে। ঠিক এগুলোই ঠিক একইভাবে ঘটে সত্যিকার এবং সফল যৌনসঙ্গমের প্রাক্কালে। মস্তিষ্ক যদি বুঝতে পারত ভিডিওতে দেখা কিংবা কম্পিউটারে ব্রাউজ করা মেয়েগুলো ভার্চুয়াল, তাদের সাথে সত্যিকার সঙ্গম করা সম্ভব হবে না, তাহলে সে দৃশ্যগুলো দেখে পুরুষাঙ্গ কখনই সঙ্গমের জন্য উখিত হতে শুরু করত না। কিন্তু মানব মস্তিষ্ক সেটা অনুধাবন করতে পারে না বলেই পর্নোগ্রাফি দেখলে পুরুষেরা উত্তেজিত হয়ে উঠে।

সাভানা অনুকল্পের ব্যাপারটা একইভাবে নারী মস্তিষ্কের জন্যও প্রযোজ্য। নারীদের জন্য পর্নোগ্রাফির আবেদন ভিন্নভাবে তৈরি হয়েছে বিবর্তনের যাত্রাপথে। বিবর্তনীয় পথপরিক্রমায় পুরুষদের মতো ঘন ঘন সঙ্গী বদল মেয়েদের জন্য কোনো প্রজননগত সফলতা নিয়ে আসেনি। নারীরা যৌনসঙ্গী নির্বাচনের ব্যাপারে থাকে অপেক্ষাকৃত খুঁতখুঁতে, ফলে স্বভাবগতভাবেই নারীরা অসতর্ক সঙ্গমে (casual sex) পুরুষদের মতো প্রলুব্ধ হয় না। কারণ, এ ধরনের অসতর্ক সঙ্গমে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভকালীন ঝামেলা পোহাতে হয়েছে নারীকেই। গবেষণায় দেখা গেছে, গড়পড়তা একটি পুরুষ কোনো নারীর সাথে পরিচয়ের এক সপ্তাহের মাথায় যৌনসঙ্গমে ইচ্ছুক হয়, সেখানে একটি নারী যৌনসম্ভোগের জন্য অপেক্ষা করতে চায় ছয় মাস[১৭২]। ঠিক যে কারণে পুরুষের প্রস্তর যুগের মস্তিষ্ক পর্নো ভিডিও দর্শনে উত্তেজিত হয়ে ওঠে, ঠিক একই কারণে মেয়েরা হয়ে পড়ে এ ব্যাপারে সতর্ক। মেয়েদের প্রস্তর যুগের মস্তিষ্ক ভুল সঙ্কেত পাঠাতে থাকে যে, এই পর্নোগ্রাফির ফলশ্রুতিতে তারা গর্ভবতী হয়ে যেতে পারে। তাই অধিকাংশ মেয়েই পর্নোগ্রাফির প্রতি নিস্পৃহ কিংবা নিরাসক্ত থাকে, এদের মধ্যে অনেকেই দারুণভাবে বীতশ্রদ্ধও। বিবর্তনীয় যাত্রাপথে নারী পুরুষের যৌনতার ভিন্ন স্ট্র্যাটিজির কারণেই পর্নোগ্রাফির প্রতি ভিন্ন আবেদন দেখা যায়।]

বিন লাদেনের পর্নো দেখা নিয়ে আমার কোন সমস্যা ছিল না। মুক্তমনায় প্রকাশিত প্রবন্ধে আমি সেটা পরিষ্কার করে বলেছিলাম যে, আমি পর্নোবিরোধী কেউ না। কে নিশিরাত জেগে পর্নোগ্রাফি দেখছে আর না দেখছে সেটা আমার বিবেচ্য ছিল না কখনোই, এই লেখার মাধ্যমে পর্নোগ্রাফির বিলুপ্তির কোনো পিটিশনও হাজির করছি না আমি, যার ইচ্ছে হয় দেখুক, আমার কী বলার আছে! কিন্তু আমার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুটি হলো–যে বিন লাদেন পাশ্চাত্যে অশ্লীলতা, পর্নোগ্রাফি, হোমোসেক্সয়ালিটি আর পতিতাবৃত্তিসহ বহুকিছুতে সোচ্চার, সকল ধরনের পশ্চিমা বেলেল্লাপনার বিরুদ্ধেই তার নিরঙ্কুষ জিহাদ, সেই নীতি নৈতিকতার চূড়ামণি বিধ্বংসী জিহাদি নেতা লাদেন বসে বসে পর্নোগ্রাফি দেখতেন—ব্যাপারটা অভিনব না? সর্ষের মধ্যেই যখন ভুত থাকে, তখন আর কী বা বেশি বলার থাকে।

শুধু পর্নোগ্রাফি নয়, বিন লাদেনের দূর্গ থেকে এভেনার মতো বিভিন্ন ‘সেক্সুয়াল স্টিমুলেটরও পাওয়া গেছে। তার চেয়েও মজার ব্যাপার হলো, নিজে আয়েশ করে বাহারি ধরনের পর্নো দেখলেও তার মৃত্যুর পরে তার স্ত্রীরা যেন কোনোক্রমেই পুনর্বার বিয়ে না করতে পারেন–এ নিয়ে একটি উইল করে গেছেন ‘মহানুভব লাদেন’। অবশ্য এগুলো কোনোটাই আমার কাছে খুব একটা বিস্ময়কর কিছু মনে হয়নি। কাগজে কলমে মৌলানারা তোতাপাখির মতো ‘ইসলামে পর্নোগ্রাফি হারাম’ জাতীয় বুলি আউরালেও কিংবা বোরখা আর হিজাবের জয়গান গাইলেও আরব বিশ্ব এবং মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোই সবচেয়ে ‘সেক্স স্টার্ভড’ জাতি সেটা অনেক আগে থেকেই মুখে মুখে প্রচলিত ছিল। হিন্দি নাচ গানের সেক্সুয়াল ভিডিওর জমজমাট ব্যবসা নাকি আরবেই। মধ্যপ্রাচ্যের ‘বেলি ড্যান্সিং কিংবা পাকিস্তানের মুজরার কথাও কমবেশি সবাই জানে। শুধু তাই নয়, সৌদি বাদশাহদের হারেম পোষা থেকে শুরু করে, দেশ বিদেশ থেকে সুন্দরী নারী ভাড়া করে নিয়ে এসে শেখদের পার্থিব লালসায় ব্যবহারের খবর প্রায়ই পত্রপত্রিকায় পাওয়া যায়[১৭৩]। আর এর মধ্যে পাওয়া গেছে আরও এককাঠি সরেস খবর। সম্প্রতি গুগলের বদৌলতে পর্নোওয়েবসাইট কারা বেশি পরিভ্রমণ করে এ সংক্রান্ত জরিপ চালানো হয়েছে, আর এ থেকে বেরিয়ে এসেছে এক মজাদার তথ্য। ২০০৬ সালে করা এ জরিপে পাওয়া ফলাফলে যে তথ্য উঠে এসেছে তা অনেকের কাছেই বিস্ময়কর। সবচেয়ে বেশি পর্নসাইট ভ্রমণ করেন ইসলামি শরিয়া সমদ্ধ পাকিস্তানিরা[১৭৪]। শুধু ২০০৬ সালের পর থেকেই পাকিস্তানিরা এ ব্যাপারে শীর্ষে, এবং গত বছরের জরিপেও একই ফলাফল বেরিয়ে এসেছে[১৭৫]। জরিপ থেকে দেখা যাচ্ছে, পাকিস্তানিরা কেবল হিউম্যান সেক্সেই আগ্রহী নয়, সেই সাথে ‘horse sex’, ‘donkey sex’, ‘camel sex’ প্রভৃতি সার্চেও তালিকার প্রথমে। শুধু পশুমেহনে পাকিদের আসক্তি থাকলেও না হয় কথা ছিল, সেই সাথে তারা আগ্রহী ‘rape sex’, ‘child sex এবং ‘rape video’ দর্শনেও (সাধু সাবধান)। পর্নোগ্রাফির প্রতি এই ইসলামি রাষ্ট্রটির প্রবল আসক্তি দেখে অনেকেই বলছেন, এই দেশটাকে পাকিস্তান না ডেকে পনিস্তান ডাকলে কেমন হয়?[১৭৬] ঘটনা অবশ্য এখানেই শেষ নয়, আরও আছে ২০০৬ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী যৌনতাসন্ধানী বুভুক্ষু প্রথম দশটি দেশের ছয়টিই ইসলামি দেশগুলোর দখলে। সেগুলো হচ্ছে: মিসর (দ্বিতীয়), ইরান (চতুর্থ), মরক্কো (পঞ্চম), সৌদি আরব (সপ্তম) এবং তুরস্ক (অষ্টম)। অমুসলিম দেশ চারটে হচ্ছে: ভিয়েতনাম (তৃতীয়), ভারত (ছয়), ফিলিপাইন (নবম) এবং পোল্যান্ড (দশম)। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, প্রথম আটটি দেশের ছ’টিই মুসলিম অধ্যুষিত দেশ। দ্য ডেইলি বিস্টের Panifest 017 Catania ‘Osama’s Dirty Mind : Bin Laden’s porn and Muslim hypocrisy on sex’ শীর্ষক প্রবন্ধে এজন্যই লিখেছেন[১৭৭]–

Some of the Muslim societies that are the most repressive toward women…also have some of the highest rates of pornography usage in the world.

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের টেরোরিজম বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিন ফেয়ার বলেছেন, ‘লাদেনের বাসায় পর্নো পাওয়ায় অবাক হইনি মোটেই। জিহাদিরা পর্নো ভালোবাসবে এটা তো জানা কথাই। সাধে কী তাদের জন্য পরকালে বাহাত্তরটা হুর পরির লোভ দেখানো হয়েছে নাকি!’। রজার সিম্পসনের উদ্ধৃতি দিয়েই বলতে হয়—- the greater the repression the greater the revolution’, আমি মুক্তমনায় প্রকাশিত আমার ঐ প্রবন্ধে সেজন্যই কৌতুক করে বলেছিলাম, “আগামী বিশ্বের সেক্সুয়াল রিভলুশন সম্ভবত ইসলামি বিশ্বেই শুরু হবে, আর মরহুম বিন লাদেন হলেন সেই বিপ্লবের পথিকৃৎ। আমার তো তাই মনে হচ্ছে’।

অথচ পর্নোগ্রাফি নাকি হারাম ইসলামে[১৭৮]! এক মুখে পর্নোকে হারাম বলা হয়, অথচ ইসলামের জিহাদিদের নেতাই বসে বসে সোৎসাহে পর্নো দেখেন। হারামের কথাই যখন এল, কী হারাম আর কী হারাম নয় তা বলা সত্যই মুশকিল। ধর্মকারী নামে একটা সাইট আছে নেটে। সেই সাইটের প্রকৃতি সম্বন্ধে সাইটটিতে বলা হয়েছে, ‘যুক্তিমনস্কদের নির্মল বিনোদনের ব্লগ। বিতর্ক বা বাকবিতণ্ডার স্থান নেই এখানে। এই ব্লগে ধর্মের যুক্তিযুক্ত সমালোচনা করা হবে, ধর্মকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হবে, অপদস্থ করা হবে, ব্যঙ্গ করা হবে। যেমন করা হয়ে থাকে সাহিত্য, চলচ্চিত্র, খেলাধুলা বা অন্যান্য যাবতীয় বিষয়কে।

অবশ্য সেক্স ম্যানিয়্যাক জীব কেবল ইসলামেই আছে তা মনে করলে বেজায় ভুল হবে। সব ধর্মেই সেটা কমে বেশি আছে বলাই বাহুল্য। ভারতে পরলোকগত সাইবাবার সেক্স স্ক্যান্ডাল পত্রপত্রিকায় এসেছে। “ভগবান রজনীশের’ যৌনউন্মত্ততার কথাও সর্বজনবিদিত ছিল। চার্চের বিভিন্ন পাদ্রী প্রায়ই শিশু যৌন নিপীড়ন এবং ব্যভিচারের কারণে নিত্যদিনই পত্রপত্রিকার শিরোনাম হন, তা তো আমরা এখনও হর-হামেশাই দেখছি। আসলে যেখানেই মাত্রাতিরিক্ত বাধার প্রাচীর তুলে দিয়ে যৌনতাকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছে, সেখানেই তৈরি হয়েছে নানা ধরনের আসক্তি এবং আস্ফালন। আমরা অবশ্য মনে করি যৌনতা বিবর্তনেরই ফসল। যৌনতাকে পাপ, ব্যভিচার, পশ্চিমের বেলাল্লাপনা বলে কৃত্রিম উপায়ে যে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, যায় না দমন করা কেবল হিজাব কিংবা বুরকার বুলি কপচিয়ে, সেটা মরহুম ওসামা বিন লাদেন লুকিয়ে লুকিয়ে পর্নো দেখে এবং অন্যান্য (অ)কাজ কুকাজের মাধ্যমে বিবর্তন মনোবিজ্ঞানের সত্যতাই পুনর্বার প্রমাণ করে দিলেন, নয় কি?

.

আমাদের সৌন্দর্যবোধ আর শিল্পবোধগুলো তৈরি হয়েছে বিবর্তনের পথ ধরে

সুদক্ষ শিল্পীর নয়নাভিরাম শিল্পকর্ম কে না ভালোবাসে! পিকাসোর গুয়েরনিকা, অগস্ত রদ্যার ‘থিঙ্কার কিংবা মাইকেলএঞ্জেলোর ‘ডেভিড’ দেখে আমরা মুগ্ধ হই, ঠিক তেমনি আমরা উদ্বেলিত হই শামীম শিকদারের ‘স্বোপার্জিত স্বাধীনতার পাশে দাঁড়িয়ে, কিংবা নিতুন কুণ্ডুর ‘সাবাস বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ করে। কিন্তু কেন আমাদের ভাস্কর্য দেখতে ভালো লাগে? কখনো কি আমরা ভেবেছি কেন ভাস্করদের নিপুণ কাজ আমাদের মনোমুগ্ধকর বলে মনে হয়, তাদের ব্যক্তিত্বকে কাঙ্ক্ষিত মনে হয়? অনেক বিবর্তন মনোবিজ্ঞানীই মনে করছেন ব্যাপারটির উৎস আসলে বিবর্তনমনোসঞ্জাত। আমাদের পূর্বপুরুষেরাও এমনিভাবে পাথুরে হাতিয়ার, প্রবালের নেকলেস প্রভৃতি বানিয়ে জয় করতে পেরেছিল বিপরীত লিঙ্গের আকর্ষণ, জাগাতে পেরেছিল অন্যদের চিত্তচাঞ্চল্য। প্রায় দের মিলিয়ন বছর আগে হোমো ইরেক্টাসরা শুরু করেছিল পাতলা পাথরের ফালি বানানো। এগুলো দেখতে ডিম্বাকৃতির, কখনোবা ত্রিভুজাকৃতির পাতার মতোন বা ‘টিয়ার ড্রপ’ আকারের[১৭৯]। এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকাসহ পৃথিবীর যেখানেই হোমো ইরেক্টাস আর হোমো ইরগাস্টারদের যাতায়াত ছিল, সেখানেই পাওয়া গেছে হাজার হাজার একুলিয়ান হ্যান্ড অ্যাক্স। সবচেয়ে পুরনো ‘অ্যাকুলিয়ান হ্যান্ড অ্যাক্স’-এর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে ১.৮ মিলিয়ন বছর আগেকার।

এ প্রাচীন হাতিয়ারগুলোই আমাদের মানবেতিহাসের সবচেয়ে পুরনো শিল্প। ব্যবহারিক অস্ত্রের এই বিমুগ্ধকর নান্দনিক রূপান্তর প্রাগৈতিহাসিক মানুষের কারিগরি দক্ষতা তুলে ধরে। ডারউইনীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ‘হ্যান্ড এ্যাক্স’ সভ্যতার নতুন এক ধাপের প্রতীক। দেখে মনে হয় এই হাতিয়ারগুলো তৈরিই হয়েছে একধরনের প্রচ্ছন্ন ‘ফিটনেস সিগন্যাল দেয়ার জন্য, যে সিগন্যালের মধ্যে প্রকাশ পায় নির্মাতার বুদ্ধি, কর্মনিপুণতা, সচেতনতা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং দূরদর্শিতা। অনেকটা পেখমওয়ালা ময়ূরের মতোই অস্ত্র বানানোয় দক্ষ পুরুষ আকর্ষণ করতে পেরেছিল আদিম সমাজে নারীদের অনুগ্রহ। আমাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে যাদের এ গুণগুলো ছিল তারা আকর্ষণ করেছিল অধিকমাত্রায় বিপরীত লিঙ্গের সান্নিধ্য, তারাই রেখে গেছে অধিক হারে উত্তরসূরী। যারা এই কারিগরিবিদ্যা রপ্ত করতে পারেনি, তারা বিপরীত লিঙ্গের চোখে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেনি, তারা প্রজননগতভাবে সফল ছিল না।

চিত্র। পেজ ১৬৩

চিত্রঃ ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত তাঞ্জিনিয়ার ওল্ডুভাই গর্জে পাওয়া প্রাচীন অ্যাকুলিয়ান হ্যান্ড অ্যাক্স।

নিউজিল্যান্ডের কেন্টারবেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডেনিস ডাটন (৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৪-২৮ ডিসেম্বর, ২০১০) একটি বই লিখেছেন ডারউইনীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের সৌন্দর্যপ্রিয়তা এবং শিল্পের প্রতি অনুরাগ বিশ্লেষণ করে[১৮০]। তার একটি চমৎকার লেকচার আছে টেড ডট কম সাইটে এবং ইউটিউবে[১৮১]। তিনি মনে করেন, শিল্প বিষয়ক যে কোনো আধুনিক রুচি সেটা যে কোনো শিল্প মাধ্যমই হোক না কেন, উদ্ভূত হয়েছে বিবর্তনের ক্রমপ্রক্রিয়ায়, ডারউইনের তত্ত্ব দিয়ে যাকে সফলভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে পূর্বপুরুষদের চোখে পাথুরে হাতিয়ার তৈরির মতো দক্ষতাগুলো যেমন আকর্ষণীয় হয়ে ধরা দিয়েছিল, সেই একই ধরনের ভালোলাগাগুলো এখনও আমাদের মনে কাজ করে যায় প্রায় একইরকমভাবে। নিপুণ কারিগরি দক্ষতায় সম্পন্ন যে কোনো কাজ বা শিল্প দেখলে আমাদের মন এখনও প্রফুল্ল হয়ে ওঠে, আমরা সেই শিল্পকর্মের প্রতি আকৃষ্ট হই অবচেতনভাবেই। কোনো গয়নার দোকানে টিয়ার ড্রপ আকারের কোনো হীরার অলংকার দেখলে আমাদের মন উদ্বেলিত হয়ে উঠে। এমন মনে করার কারণ নেই যে আমাদের সংস্কৃতিই হঠাৎ করে শিখিয়েছে এগুলোকে সুন্দর ভাবতে। বরং আমাদের সুদূর পূর্বপুরুষরাও ভালোবাসতো এই ধরনের শৈল্পিক আকৃতিগুলো, আর কদর করত এর নির্মাণের পেছনের কর্মকুশলতা আর দক্ষতাকে। আমাদের আধুনিক রুচিবোধগুলো মূলত তৈরি হয়েছে সেই প্লেইস্টোসিন যুগের আদিম পছন্দ অপছন্দগুলোর উপর ভর করেই। বিজ্ঞানীরা বলেন, শিল্প, সাহিত্য, ভাস্কর্য, খেলাধুলা প্রভৃতির প্রতি অনুরাগগুলো তৈরি হয়েছে লৈঙ্গিক আবেদনের মাধ্যমে যৌনতার নির্বাচনের পথ ধরে। প্রাকৃতিক নির্বাচন গড়ে উঠেছে মূলত বেঁচে থাকার প্রতিযোগিতার মাধ্যমে, আর অন্যদিকে যৌনতার নির্বাচন কাজ করেছে প্রজননগত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে।

বিবর্তন মনোবিজ্ঞানী জিওফ্রি মিলার মনে করেন, আমাদের এই শৈল্পিক রুচিবোধগুলো কোনো অদৃশ্য সৃষ্টিকর্তার সুনিপুণ ডিজাইনের মাধ্যমে যেমন হয়নি, ঠিক তেমনি পুরোটুকু তৈরি হয়নি অন্ধ এবং নির্বিচারী এবং প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমেও। বরং আমাদের মানসপটের বিবর্তন হয়েছে আমাদের পূর্বপুরুষদের দীর্ঘদিনের চাহিদাকে মূল্য দিয়ে, তাদের বুদ্ধিবৃত্তির উপর ভর করে এবং তাদের সতর্ক সঙ্গী নির্বাচনের মাধ্যমে। আমরা তাদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে অর্জন করেছি তাদের নানারকম পছন্দ-উদ্যম, সৃজনশীলতা, কৌতুকপ্রিয়তা, বুদ্ধিমত্তা এবং শিল্পবোধসহ বিভিন্ন নৈর্ব্যক্তিক বিষয়ের প্রতি আকর্ষণ। তারা সঙ্গী নির্বাচনের সময় সচেতনভাবেই গুরুত্ব দিয়েছে কিছু বৈশিষ্ট্যের প্রতি, সে সমস্ত বৈশিষ্ট্য গুলো সংরক্ষিত থেকেছে আমাদের জনপুঞ্জে। সে সমস্ত বৈশিষ্ট্য কারো মধ্যে খুঁজে পেলে আমাদের মস্তিষ্ক স্বভাবতই আমোদিত হয়, প্রলুব্ধ হয় ঠিক যেমন ময়ূরী প্রলুব্ধ হয় দীর্ঘ পেখমওয়ালা ময়ূরকে খুঁজে পেলে। আমরা মূলত আমাদের পূর্বপুরুষদের লক্ষ বছরের বংশগতীয় পরীক্ষানিরীক্ষার সফল পরিণতি।

.

নারী পুরুষ শেষ পর্যন্ত অভিন্ন মানব সত্তারই অংশ

পুরো অধ্যায়টিতে মূলত জৈববৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে নারী পুরুষের পার্থক্য উল্লেখ করা হলেও এটা মনে রাখতে হবে যে, নারী পুরুষ কোনো আলাদা প্রজাতির জীব নয়, নয় কোনো ভিন্ন ভুবনের দুই বাসিন্দা, বরং তারা শেষ পর্যন্ত তারা অভিন্ন মানবপ্রকৃতিরই অংশ। হ্যাঁ নারীপুরুষের মধ্যে শারীরবৃত্তীয় দিক থেকে এবং আচরণগত বিভিন্ন দিক থেকে পার্থক্য আছেই, সেটার কারণ বহুবিধ। বিবর্তন মনোবিজ্ঞানীদের মতে, নারী এবং পুরুষকে বিবর্তনের যাত্রাপথে ভিন্ন ধরনের অভিযোজনগত সমস্যা মোকাবেলা করতে হয়েছে, তারা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে সমস্যাগুলোর সমাধান করেছে, যেগুলোর প্রকাশ আজও তাদের মানসপটে রয়ে গিয়েছে। যেমন, গর্ভধারণ, শিশুকে স্তন্যপান করানো সহ বহুকিছুর অভিযোজনগত সমাধান জৈবিকভাবে করতে হয়েছে কেবলমাত্র নারীকেই। আবার অন্য দিকে অনাগত সন্তানের পিতৃত্বের নিশ্চয়তার সংশয় সংক্রান্ত ঈর্ষা নিয়ে জুঝতে হয়েছে মূলত পুরুষকেই, নারীকে নয়। এগুলোর পার্থক্য সূচক প্রভাব নারী পুরুষের শরীরে এবং মনোজগতে পড়বে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয়।

বিভিন্ন সমস্যা নারী পুরুষ যেমন ভিন্নভাবে যেমন সমাধান করেছে, তেমনি আবার অতীতের পৃথিবীতে বহু অভিযোজনগত সমস্যাই ছিল যেগুলো আবার তারা সমাধান করেছে প্রায় একই রকমভাবে, একই পদ্ধতিতেই। যেমন, নারী পুরুষ উভয়েরই দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের জন্য সঠিক সঙ্গী খুঁজে নিতে হয়েছে, তাদেরকে বুঝতে হয়েছে তার সঙ্গী তাদের সম্পর্কের ব্যাপারে বিশ্বস্ত থাকবে কিনা, সন্তানকে বড় করলে তুলার ব্যাপারে শতভাগ নিয়োজিত থাকবে কি না ইত্যাদি। ভালোবাসা, সম্পর্কের স্থায়িত্ব, সুস্থ জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা, নিজেদের সুখ স্বাচ্ছন্দ বৃদ্ধি প্রভৃতি বহু ব্যাপারে নারীপুরুষের চাহিদাগুলো নির্বিশেষে একইরকমই হয়[১৮২]। নারী পুরুষ উভয়েই চায় নিজেরা সুখী হতে, নিজেদের সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত এবং সুখী দেখে যেতে। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশীদের প্রতি ভালোবাসা, দায়িত্ব প্রভৃতির ব্যাপারে কারো অবদানই কম নয়। বিজ্ঞানী জেনেট শিবলী হাইড তার একটি গবেষণাপত্রে দেখিয়েছেন, নারীপুরুষের পার্থক্যসূচক অভিব্যক্তিগুলোর চেয়ে তাদের মধ্যে জেন্ডারগত সাম্যই বেশি পরিলক্ষিত হয়[১৮৩]। নারীবাদী বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে, যৌনতার বৈচিত্র্য এবং শারীরিক আগ্রাসনসহ কিছু ক্ষেত্রে একটি নারীর সাথে একটি পুরুষের পার্থক্য রয়েছে সত্য[১৮৪], কিন্তু সেটা জেন্ডারগত সাম্যকে লঙ্ঘন করে না, বরং আন্তঃযৌনতা প্রতিযোগিতা (intrasexual competition) দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়[১৮৫]। রোজালিন ফ্র্যাঙ্কলিন বিশ্ববিদ্যালয়ের (শিকাগো মেডিকাল স্কুল) বিজ্ঞানী লিসি এলিয়ট তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, নারী পুরুষের মধ্যে শারীরিক এবং জৈবিক দিক থেকে পার্থক্য আছে, কিন্তু সেই পার্থক্যগুলো এমন কিছু বড় নয়। বহুক্ষেত্রেই ছেলেদের বাচনক্ষমতা, সহমর্মিতা যেমন চেষ্টা করলে বাড়ানো যায়, ঠিক তেমনি আবার মেয়েদের গাণিতিক কিংবা ত্রিমাত্রিক প্রক্ষেপণের ক্ষমতাগুলোও বাড়িয়ে নেওয়া যেতে পারে[১৮৬]। যেমন, দেখা গেছে, গণিত বা বিজ্ঞানের বিষয়গুলোতে চেষ্টা করলে নারীরা শুধু পুরুষদের সমান নয়, এমনকি ছাড়িয়েও যেতে পারে। আসলে জগতের বহু বিষয় যেগুলো একসময় কেবল ‘পুরুষদের এলাকা’ বলে চিহ্নিত করা হতো, সেগুলোতে নারীরা কেবল পদার্পণই করেনি, ছাড়িয়েও গিয়েছে। যেমন, সারা পৃথিবীতে গণিতকে ঢালাওভাবে পুরুষদের আধিপত্যময় বিষয় বলে বিবেচনা করা হলেও দেখা গেছে আইসল্যান্ডে মেয়েরা গড়পড়তা ছেলেদের চেয়ে অনেক ভালো ফলাফল করেছে[১৮৭]।

চিত্র। পেজ ১৬৬

চিত্র :গণিত এবং বিজ্ঞানে পুরুষদের তুলনায় নারীদের অনাগ্রহ এবং অসফলতার কথা ঢালাওভাবে মিডিয়ায় বলা হলেও আইসল্যান্ডে গণিতে গড়পড়তা নারীরাই পুরুষদের চেয়ে অনেক ভালো ফলাফল করছে।

আবার ছেলেরা গড়পড়তা যে সব ক্ষেত্রে মেয়েদের চেয়ে দুর্বল–বিশেষত সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে কিংবা সহমর্মিতা আর সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোতে সম্মিলিত চর্চার মাধযমে সেগুলোর অব্যাহতভাবে উন্নতি করা সম্ভব হয়েছে অনেক ছেলেরই। কাজেই উপযুক্ত পরিবেশ পেলে এবং সঠিক প্রচেষ্টা থাকলে নারী পুরুষ সবার পক্ষেই কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন সম্ভব। পাথরের গায়ে কখনোই খোদাই করে লেখা নেই নারীরা ‘ইহা পারিবে’, আর পুরুষেরা ‘উহা’। বরং অভিন্ন মানববৈশিষ্টের বহু কিছুই আমরা নারী পুরুষ নির্বিশেষে আমাদের মধ্যে ধারণ করি, এবং নিজ নিজ পছন্দ, অভিরুচি এবং আগ্রহকে প্রাধান্য দিয়ে সেগুলোর পরিস্ফুটন ঘটাই।

চিত্র। পেজ ১৬৭

চিত্র : ছেলেরা গড়পড়তা যে সব ক্ষেত্রে মেয়েদের চেয়ে দুর্বল বলে চিহ্নিত– বিশেষতঃ সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে কিংবা সমবেদনা বা সহমর্মিতা প্রদর্শন কিংবা সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোতে– সম্মিলিত চর্চার মাধ্যমে সেগুলোর অব্যাহতভাবে উন্নতি করা সম্ভব হয়েছে অনেক ক্ষেত্রেই। যেমন, ছেলেদের তার বোন, সাথী কিংবা সমরূপ কারো সাথে ছোটবেলা থেকেই পুতুল খেলার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে দেখা গেছে, তাদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগের এবং পরিচর্যামূলক দক্ষতাগুলো বাড়িয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে যথেষ্ট পরিমাণেই।

এই জায়গায় আমার মতে, নারীদের নিয়ে একটু বেশি বলা দরকার, যেহেতু সামাজিক স্টেরিওটাইপিং এর ব্যাপারগুলো মূলত নারীদের ঘিরেই, এবং সেগুলো নারীদের অবদমনের কাজেই বেশি ব্যবহৃত হয়। একটা সময় ছিল যখন নারীদের পুরুষের সমকক্ষ হওয়া তো দুরের কথা মানুষ হিসেবেই গণ্য করা হতো না। অথচ উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালে আজ দেখা যাবে, নারীরা জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রতিটি ক্ষেত্রেই পুরুষদের সাথে পাল্লা দিয়ে অংশগ্রহণ করেছে। যেমন, সবচেয়ে দুর্গম, এবং মেধাশীল ক্ষেত্র বলে চিহ্নিত মহাকাশযাত্রায় নারীদের অবদানের কথাই বলা যাক। সোভিয়েত নারী ভ্যালেন্টিনা তেরেস্কোভা ছিলেন প্রথম মহাকাশ বিজয়ী নারী, এ কথা আমরা সবাই জানি। কিন্তু অনেকেই হয়তো জানি না, বর্তমানে নাসার বহু। উল্লেখযোগ্য মহাকাশ মিশনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সুদক্ষ নারীরা। যেমন, আইলিন কলিনস ১৯৯৯ সালের স্পেস শাটলের প্রথম মহিলা কমান্ডার হিসেবে কলাম্বিয়া মিশনের সময় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এর আগে তিনি মার্কিন বিমান বাহিনির সি-১৪১ বিমানের প্রধানের দায়িত্বেও ছিলেন। ২০০৭ সালের স্পেস শাটল ডিস্কভারি এবং আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের মিলনের সময় উভয়েরই প্রধান ছিলেন নারী। ডিস্কভারির নেতৃত্বে ছিলেন পামেলা মেলরয় আর আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের দায়িত্বে ছিলেন পেগি হুইটুন। নাসায় কর্মরত ভারতীয় উপমহাদেশের প্রয়াত ড, কল্পনা চাওলাও কলম্বিয়া মিশনে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মহাকাশচারণায় যথেস্ট কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন; এরোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং এ পিএইচডি ডিগ্রি ছিল তার। আরেকজন পিএইচডি ডিগ্রিধারী মার্কিন নভোচারী শ্যানন লুসিড একসময় মহাকাশে দীর্ঘতম সময় কাটানোর রেকর্ড সৃস্টি করেছিলেন। এ ছাড়া ড, স্যালী রাইডের কথাও অনেকে জানেন যিনি স্পেস শাটলের প্রথম মহিলা সদস্য হন ১৯৮৩ এ। মহাকাশ জয়ে এখনও অবদান রাখতে না পারলেও বাঙালি মেয়েরা পিছিয়ে নেই যাত্রীবাহী বিমান চালনায়। যেমন, বাংলাদেশ বিমানের ইয়াসমিন রহমান এশিয়ার প্রথম মহিলা ডিসি-১০ বিমানের ক্যাপ্টেন হবার গৌরব অর্জন করেন ১৯৯১ তে। ডিসি-১০ বিমানের ক্যাপ্টেন হয়ে পাঁচ বছর বিমান চালাবার পর রাজনৈতিক কারণে তাকে অবসর গ্রহণে বাধ্য করা হয়েছিল। কিন্তু তারপরেও ইয়াসমিন রহমানের অগ্রযাত্রা থেমে থাকেনি। স্থাপত্যবিজ্ঞানে ডিগ্রি নিয়ে পাঁচ বছর স্থপতির পেশায় নিয়োজিত থেকে আবার সাফল্যের সাথে পরীক্ষা দিয়ে সক্রিয় বিমান চালনায় প্রত্যাবর্তন করে বিমানের এয়ারবাস এর ক্যাপ্টেন হন ২০০১ সালে। নারীদের জন্য তিনি এক উজ্জীবিত উদাহরণ। পাশাপাশি বাংলাদেশের সুলেখক এবং গবেষক সেলিনা হোসেনের কন্যা ফারিয়া লারার কথাও আমরা জানি, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে স্নাতক হওয়ার পাশাপাশি ছিলেন একজন সফল পাইলট। ১৯৯৬ সালে সিভিল এভিয়েশন অথরিটি অফ বাংলাদেশের কাছ থেকে তিনি প্রাইভেট পাইলটের লাইসেন্স অর্জন করেন। এর দু’বছর পরে ১৯৯৮ সালের ১৯ শে মার্চ লারা বাণিজ্যিক পাইলট হওয়ার লাইসেন্স পান। তিনি এরপরই পাইলটদের প্রশিক্ষক হবার প্রশিক্ষণ দেন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী যিনি এই পেশায় আসেন। ১৯৯৮ সালের ২৯শে সেপ্টেম্বর একটি বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সেই পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। দুর্ঘটনায় অকাল মৃত্যু না হলে তিনিই হতেন বাংলাদেশের প্রথম নারী পাইলট প্রশিক্ষক।

মুক্তমনা সদস্য অপার্থিব ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস: নারীরা সব পারে’ নামের একটি প্রবন্ধে বাংলাদেশের পাপিয়া নামের এক সাহসী মেয়ের উদাহরণ নিয়ে এসেছিলেন[১৮৮]। ১৯৯৮ সালের দিকে পাপিয়া জীবিকার তাগিদে ঢাকার রাস্তায় রিকশা চালাতে শুরু করে ইতিহাস সুস্টি করেছিলেন। পাপিয়া তার রিক্সায় বাহক নারী নাকি পুরুষ তা বিচার না করে সবাইকে বহন করতেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় সেটাই বোধহয় প্রথম আর শেষ উদাহরণ। বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতা এখনও এরকম দুঃসাহসিক কাজে মেয়েদের গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়। সামাজিক বাস্তবতার জন্য মেয়েরা বাসের ড্রাইভার বা কন্ডাক্টরও হয়তো হতে পারবেন না ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও, যদিও ট্রাফিক ও যাত্রীসংখ্যার দিক দিয়ে সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক আর ঢাকার মধ্যে খুব একটা পার্থক্য নেই তবু সিঙ্গাপুর শহরে কিংবা ব্যাংককে মেয়ে বাসকন্ডাক্টর এক অতি পরিচিত দৃশ্য। আমি নিজেই দীর্ঘদিন সিঙ্গাপুরে থেকেছি। বহুবারই বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে এমন বাসে আমার উঠতে হয়েছে যেখানকার চালক পুরুষ নন, নারী। শুধু বাসের চালক বা কন্ডাক্টর হওয়া নয়, রাস্তায় রাস্তায় ফটোকপি মেশিন চালনা, মাল পরবহন, মালামালের ক্রয়বিক্রয় সহ সব ধরনের মানসিক এবং শারীরিক শ্রমসাধ্য কাজে পুরুষের পাশাপাশি নারীরা অংশগ্রহণ করেছে সমান তালে।

সিঙ্গাপুরে থাকাকালীন সময়ের একটা মজার ঘটনা মনে পড়ছে এ প্রসঙ্গে। ১৯৯৯/২০০০ সালের ঘটনা। আমি তখন সবেমাত্র বাংলাদেশ থেকে সিঙ্গাপুরে পাড়ি দিয়ে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরে মাস্টার্স করছি। আমরা কয়েক বন্ধু মিলে সিঙ্গাপুরের ক্লেমেন্টি এলাকায় বাসা ভাড়া করে থাকতাম, আর সেখান থেকে বাস নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতাম। বাসে সিটের তুলনায় যাত্রী উঠতো বেশি, অনেকটা ঢাকা শহরের বাসগুলোর মতোই। বাসের সিট ভরে যাওয়ার পর অনেক যাত্রীকেই দাঁড়িয়ে যেতে হতো তাদের মধ্যে নারী পুরুষ সবাই থাকতেন। স্বভাবতই আমরা যারা বাংলাদেশ থেকে সবেমাত্র এসেছি তাদের জন্য ব্যাপারটা ছিল খুব অস্বস্তিকর। আমরা সব তাগড়া জোয়ানেরা সিট দখল করে বসে আছি, আর হয়তো পাশেই একটি মেয়ে পুরো রাস্তা বাসের রড ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। আমার বন্ধু। সাইফুল ছিল খুব মানবদরদি টাইপের। একদিন ঠিক তার সিটের পাশেই একটি নরমসরম মেয়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে, দেখে থাকতে না পেরে উঠে দাঁড়িয়ে নিজ সিটে মেয়েটিকে বসতে অনুরোধ করল। কিন্তু মেয়েটি তাতে খুশি হলো না মোটেই, বরং অবাক হয়ে জানতে চাইলেন,

– “আপনার জায়গায় কেন আমি বসব?_অবাক চোখে প্রশ্ন মেয়েটির।

— ‘কারণ, আপনি দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন। আর আমি বসে … সাইফুলের জবাব।

— ‘হ্যাঁ, কিন্তু আমি বসলে তো আবার আপনাকে দাঁড়িয়ে যেতে হয়।

–‘তাতে অসুবিধা নেই।

– “আমার আছে। আপনি তো আমার আগে বাসে উঠেছেন, আপনি কেন আমার জন্য সিট ছেড়ে দেবেন? আর দিলেই বা আমি বসব কেন?

— ‘কিন্তু আপনি তো মেয়ে… আমতা আমতা কণ্ঠ সাইফুলের।

— মেয়ে তো কী হয়েছে? আমি তো আর অথর্ব নই। আপনি যেভাবে দাঁড়িয়ে যেতেন, আমি ঠিক একইভাবে দাঁড়িয়ে যাচ্ছি। এতে তো কোনো অসুবিধা হচ্ছে না।‘

-‘তা বটে, কিন্তু …’

— ‘আমরা এখানে কেবল বয়োবৃদ্ধ নাগরিক বা সিনিয়র সিটিজেনদের কিংবা পঙ্গু বা প্রতিবন্ধীদের জন্য আসন ছেড়ে দেই। অন্য কারো জন্যে নয়। আপনাদের দেশে কি নিয়ম আলাদা?

— “হ্যাঁ, আমাদের দেশে বাসে নারীদের জন্য আলাদা আসন থাকে। কোনো নারী দাঁড়িয়ে থাকলে আমরা তাদের জন্য আসন ছেড়ে দেই। নইলে অভদ্রতা করা হয়। আমি ভেবেছিলাম এই ভদ্রতার ব্যাপারটা সব জায়গায় একই রকম হবে…।

— কিন্তু আপনি কি বুঝতে পারছেন, যে এই ভদ্রতার আড়ালে একটি মানসিকতা কাজ করছে যে, নারীরা অথর্ব, তারা আপনাদের মতো দাঁড়িয়ে বাসে করে যেতে পারবেন না…’।

ঘটনার অনেক দিন পার হয়ে গেলেও এই সংলাপগুলো আমার এখনও মনে আছে আমার, সাইফুলের দুজনেরই। এই ভদ্রতার আড়ালে একটি মানসিকতা কাজ করছে যে, নারীরা অথর্ব’ মেয়েটির এই ধাক্কার জের আমাদের বহন করতে হয়েছিল অনেকদিন।

আসল কথা হলো, সভ্যতার বিনির্মাণে কারো অবদানই কম নয়, দুজনেই একে অন্যের পরিপূরক। নারী পুরুষ উভয়েই সভ্যতা তৈরিতে অবদান রেখেছে বিপুলভাবে, এ নিয়ে কারোই কোনো সন্দেহ থাকা উচিত নয়। অধ্যায়টি শেষ করছি কাজী নজরুল ইসলামের ‘নারী’ কবিতাটি থেকে অবিস্মরণীয় কিছু লাইন তুলে দিয়ে

‘বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর।
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।
বিশ্বে যা কিছু এল পাপ তাপ বেদনা অশ্রুবারি,
অর্ধেক তার আনিয়াছে নর অর্ধেক তার নারী।

জগতের যত বড় বড় জয়, বড় বড় অভিযান
মাতা ভগ্নি বধূদের ত্যাগে হইয়াছে মহান।
কোন রণে কত খুন দিল নর, লেখা আছে ইতিহাসে
কত নারী দিল সিঁথির সিঁদুর, লেখা নাই তার পাশে।

কত মাতা দিল হৃদয় উপড়ি, কত বোন দিল সেবা
বীর স্মৃতি স্তম্ভের গায়ে লিখিয়া রেখেছে কেবা?
কোনো কালে একা হয়নি ক জয়ী পুরুষের তরবারী
প্রেরণা দিয়েছে, শক্তি দিয়েছে বিজয় লক্ষ্মী নারী’।

সে যুগ হয়েছে বাসি
যে যুগে যে যুগে পুরুষ দাস ছিল না ক, নারীরা আছিল দাসী!
বেদনার যুগ, মানুষের যুগ, সাম্যের যুগ আজি,
কেহ রহিবে না বন্দী কাহারও, উঠিছে ডঙ্কা বাজি!

০৬. জীবন মানে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা

যুদ্ধ মানে শত্রু শত্রু খেলা,
যুদ্ধ মানেই আমার প্রতি তোমার অবহেলা
…. (নির্মলেন্দু গুণ)

মানবিকতার নমুনা

অনেকেই খুব সরল চিন্তাভাবনা থেকে ধরে নেন, মানুষ বোধ হয় খুব শান্তিপ্রিয় একটা জীব, আর সহিংসতাজিনিসটা পুরোটাই কেবল পশুদের প্রবৃত্তি। এই পশুপ্রবৃত্তিকে মানুষ আবার আলাদা করে ‘পাশবিকতা’ বলে ডাকে। এমন একটা ভাব যে, আমরা মানুষেরা তো আর পশু নই, আমরা সৃষ্টির সেরা জীব। আমরা কি আর পশুদের মতো সহিংসতা, খুন ধর্ষণ, হত্যা–এগুলোতে জড়াই? আমরা মানব। পাশুদের কাজ ‘পাশবিক’ আর আমাদের কাজ সব ‘মানবিক’। তো, সৃষ্টির সেরা জীব মানুষের এই খোদ বিংশ শতাব্দিতে ঘটানো কিছু ‘মানবিক কাজের খতিয়ানে নজর দেয়া যাক[১৮৯]—

  • প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মারা যায় দেড় কোটি লোক, আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি লোক।
  • পাকিস্তানি বাহিনী ১৯৭১ সালের নয় মাসের মধ্যে ৩০ লক্ষ বাংলাদেশিকে হত্যা করে, ধর্ষণ করে প্রায় ২ লক্ষ নারীকে।
  • ল্যান্সেট সার্ভে অনুযায়ী আমেরিকার ইরাক দখল এবং যুদ্ধে এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৬ লক্ষের উপর।
  • খেমাররুজ বাহিনী কম্বোডিয়ায় ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সালের মধ্যে হত্যা করে অন্তত ২০ লাখ মানুষকে।
  • চীনে চেয়ারম্যান মাও-এর শাসনামলে গৃহযুদ্ধ দুর্ভিক্ষসহ নানা কারণে মারা যায় ৪ কোটি লোক। চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময়েই মৃত্যুসংখ্যা ছাড়িয়ে যায় ৩০ লক্ষের উপর। এছাড়া সোভিয়েত ইউনিয়নে ২ কোটি লোক, ১০ লাখ লোখ ভিয়েতনামে, ২০ লাখ লোক উত্তর কোরিয়ায়, ২০ লাখ লোক কম্বোডিয়ায়, ১০ লাখ লোক পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে, দেড় লাখ লোক পূর্ব ইউরোপে, ১৭ লাখ লোক আফ্রিকায়, ১৫ লাখ লোক আফগানিস্তানে কমিউনিস্ট শাসনামলে নিহত হয়।
  • বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে আমেরিকার আধিপত্যের ঝান্ডার উদাহরণগুলোও এখানে প্রাসঙ্গিক। মার্কিন আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে শুধু ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়ই উত্তর ও দক্ষিণ ভিয়েতনামের প্রতি বর্গমাইল জায়গার ওপর গড়ে ৭০ টনের বেশি বোমা ফেলেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। অন্য ভাষায় বললে, মাথাপিছু প্রতিটি লোকের জন্য ৫০০ পাউন্ড বোমা। এমনকি গাছপালা ধ্বংসের রাসায়নিকও ছড়িয়ে দিয়েছিল দেশের অনেক জায়গায়। নিউজ উইকের এক সাংবাদিক যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপে কাজ করতেন, তিনি লিখেছেন নাৎসিরা বিশ্বযুদ্ধের সময় ইহুদিদের উপর যে অত্যাচার চালিয়েছিল, ভিয়েতনামে মার্কিন নির্যাতন তাকেও হার মানিয়েছিল। ভিয়েতনামের মাইলাই হত্যাকাণ্ড মানবসভ্যতার ইতিহাসের এক ঘৃণ্য অধ্যায়। ১৯৬৮ সালের ১৬ই মার্চ সকাল সাড়ে তিনটায় সাম্রাজ্যবাদী মার্কিনবাহিনী দক্ষিণ চীন সাগরের উপকুলে একটি ছোট্ট গ্রাম মাইলাইতে প্রবেশ করে, এবং গ্রামের নিরস্ত্র সাধারণ লোকের উপর হামলা চালিয়ে নারী, শিশু, বৃদ্ধসহ ৩৪৭ জন গ্রামবাসীকে কয়েকঘণ্টার মধ্যে হত্যা করে। নারী আর শিশুদের বিকৃত উপায়ে ধর্ষণ করে ওই আবু-গারিবের কয়েক ডিগ্রি উপরের মাত্রায়। গ্রামের সাধারণ মানুষের উপর নির্যাতন এতই ভয়াবহ ছিল যে, খোদ মার্কিনবাহিনীরই দুই-একজন (হিউ টমসন)-এর বিরোধিতা করে গ্রামবাসীর পক্ষে অস্ত্র হাতে রুখে দাঁড়ায়। অনেকদিন ধরে সারাবিশ্ব এই ঘটনা সম্পর্কে বিন্দুবিসর্গ জানতে পারেনি। এ ধরনের বহু নজিরবিহীন। ধ্বংসলীলা ঘটেছে দেশে-দেশে রক্তলোলুপ মার্কিন সাম্রাজ্যের হাতে এই বিংশ শতাব্দীতে।
  • সাড়া বিশ্বে প্রতি বছর পাঁচ হাজার নারী মারা যায় ‘অনর কিলিং’-এর শিকার হয়ে। মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে এই মৃত্যুর হার সর্বাধিক।
  • সাড়া বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ১৪ লক্ষ নারী ধর্ষণ এবং শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়। হাই স্কুলে গমনরত প্রায় ১৭ ভাগ ছাত্রী কখনো না কখনো শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়, ১২ ভাগ ছাত্রী শিকার হয় যৌন নিগ্রহের।
  • আন্তর্জাতিকভাবে প্রতি বছর সামাজিক নিপীড়ন, ধর্ষণ, হেনস্থাসহ বিভিন্ন কারণে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয় দশ লক্ষ লোক।
  • সাড়া বিশ্বেই প্রায় ১৬ লক্ষ লোক সহিংসতার শিকার হয়ে মারা যায়। তার অর্ধেকই মারা যায় আত্মহত্যায়, এক তৃতীয়াংশ গণহত্যায় এবং এক পঞ্চমাংশ সশস্ত্র সংঘাতে।
  •  প্রতি বছর সাড়া দুনিয়া জুড়ে চোদ্দ হাজারেরও বেশি সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড ঘটে, মৃত্যুবরণ করে ২২০০০ লোক।
  • দলীয় কোন্দল, অস্ত্রবাজি প্রভৃতির শিকার হয়ে জাপান, অষ্ট্রেলিয়া ইংল্যান্ড প্রভৃতি দেশে প্রতি বছর মারা যায় পনেরো থেকে পচার জন লোক, আর ব্রাজিল, দক্ষিন আফ্রিকা, কলম্বিয়া আর আমেরিকায় এই সংখ্যা বছরে দশ হাজার থেকে শুরু করে চল্লিশ হাজার ছাড়িয়ে যায়।

চিন্তা করে দেখুন–উপরে আমাদের মানবিক’ কীর্তিকলাপগুলোর যে গুটিকয় হিসাব-কিতাব উল্লেখ করেছি তা কেবল এই বিংশ শতাব্দী বা তৎপরবর্তী সময়ের ঘটনা। বিশাল সিন্ধুর বুকে কেবল বিন্দুমাত্র, তাই না? কিন্তু তারপরেও ‘মানবিক বীভৎসতার সামান্য নমুনা দেখেই যে কারো চক্ষু চরকগাছ হতে বাধ্য।

হয়তো অনেকে ভাবতে পারেন যে, পারমাণবিক অস্ত্র আর আধুনিক অস্ত্র সস্ত্রের ঝনঝনানি বৃদ্ধি পাওয়াতেই বোধ হয় সহিংসতা বিংশ শতাব্দীতে এত মাত্রাতিরিক্ত বেড়েছে। আগেকার পৃথিবীর সময়গুলো নিশ্চয় খুব শান্তিময় ছিল। আমাদের বুড়ো দাদা-দাদি কিংবা বয়োবৃদ্ধদের প্রায়ই সুর করে বলতে শুনি–’তোরা সব গোল্লায় যাচ্ছিস, আমাদের সময়ে আমরা কত ভালো ছিলাম। তো আপনিও যদি আপনার দাদা-দাদি আর বয়োজ্যেষ্ঠদের মতো সেরকমই ভেবে থাকেন যে, ‘দিন যত এগুচ্ছে সমাজ তত অধঃপতিত হচ্ছে, তাহলে আপনার জন্য অপেক্ষা করছে বড়সড় বিস্ময়। স্টিভেন পিঙ্কারের উদ্ধৃতি দিয়েই বলি[১৯০]—

আসলে আমরা আমাদের এই বিংশ শতাব্দীতেই তুলনামুলকভাবে সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ এবং সহিষ্ণু সময় অতিক্রম করছি, আমাদের পূর্বপুরুষেরা ছিল আক্ষরিক অর্থেই বর্বর।

হয়তো পিঙ্কারের কথাটা অত্যুক্তি মনে হবে। কিন্তু আপনি যদি নিরপেক্ষভাবে মানব জাতির ইতিহাসের পাঠ নেন, এবং তথ্য বিশ্লেষণ করেন তাহলে আর সেটাকে অবাস্তব কিংবা অত্যুক্তি কোনোটাই মনে হবে না। আসুন, সেটার দিকে একটু নজর দেই।

আমাদের আদিম পূর্বপুরুষ যারা প্লেইস্টোসিন যুগের পুরো সময়টাতে শিকারি সংগ্রাহক হিসেবে জীবনযাপন করত তাদের জীবনযাত্রা থেকে কিছু বাস্তব পরিসংখ্যান হাজির করা যাক। ১৯৭৮ সালে প্রত্নতত্ত্ববিদ ক্যারোল এম্বার তার গবেষণায় দেখান যে, আদিমযুগেশিকারি সংগ্রাহক সমাজের শতকরা ৯০ ভাগ গোত্রই হানাহানি মারামারিতে লিপ্ত থাকত আর এর মধ্যে শতকরা ৬৪ ভাগ ক্ষেত্রে যুদ্ধ সংগঠিত হতো প্রতি দুই বছরের মধ্যেই[১৯১]। প্রত্নতত্ত্ববিদ লরেন্সকিলী (Lawrence Keeley) আধুনিক বিশ্বেবিংশশতাব্দিতে ঘটা ইউরোপ আমেরিকার সহিংসতার সাথে আমাদের পূর্বপুরুষদের সহিংসতার তুলনা করে দেখিয়েছেন যে, বিংশ শতাব্দীতে বিভিন্ন যুদ্ধে যে হারে মানুষ মারা গেছে (দুই বিশ্ব যুদ্ধে নিহতদের সংখ্যা গোনায় ধরেও) সেটা আদিম কালে আমাদের পূর্বপুরুষদের সহিংসতার তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য[১৯২]।

চিত্র। পেজ ১৭৫

চিত্র— আদিম কালের শিকারি-সংগ্রাহক সমাজ এবং আধুনিক বিংশ শতাব্দীর সমাজের তুলনামূলক রেখচিত্র (প্রত্নতত্ত্ববিদ লরেন্স কিলীর ‘ওয়ার বিফোর সিভিলাইজেশন’ থেকে সংগৃহিত)।

উপরের গ্রাফটি লক্ষ করুন। উপর থেকে শুরু করে প্রথম আটটি গ্রাফ শিকারি সংগ্রাহক সমাজের। আর শেষটি যেটি ‘প্রায় অদৃশ্যমান’ অবস্থায় কোন রকমে অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে, সেটি আধুনিক কালের সহিংসতার নিদর্শন। গ্রাফটি দেখলেই আপনি তুলনামূলক সহিংসতার নমুনাটি বুঝতে পারবেন, আধুনিক কালের তুলনায় আদিমকালে সহিংসতা কি হারে বেশি ছিল। এখনও মানবসমাজে নিউগিনি হাইল্যান্ডস এবং আমাজন এলাকায় কিছু আদিম শিকারি সংগ্রাহক সমাজের অস্তিত্ব দেখা যায়। সেখানকার জিরো (Jivaro) কিংবা ইয়ানোমামোর (Yanomamd) শিকারি সংগ্রাহক সমাজে যে পরিমাণ সহিংসতা হয় তাতে একজন ব্যক্তির অন্তত শতকরা ৬০ ভাগ সম্ভাবনা থাকে আরেজন শিকারির হাতে মারা যাওয়ার, সেখানে গেবুসিতে (Gebusi) সেই সম্ভাবনা শতকরা মাত্র ১৫ ভাগ। আর আধুনিক সমাজে সেটা ২ ভাগেরও কম। আদিম সমাজে যে হারে মারামারি কাটাকাটি চলতো, সেই হারে আধুনিক সমাজ পরিচালিত হলে বিংশ শতাব্দীতে একশ মিলিয়ন নয়, দুই বিলিয়ন মানুষ মারা যেত বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। সেই হিসেবে আমরা পিছাইনি, বরং এগিয়েছি।

প্রাচীনকালে শুধু যুদ্ধ বিগ্রহ নয়, যুদ্ধের পর যুদ্ধবন্দিদের উপর যেভাবে অত্যাচার করা হতো তা শুনলে আজকের নরম হৃদয়ের মানুষেরা অক্কা পাবেন নিঃসন্দেহে। এক গোত্র আরেক গোত্রের উপর আক্রমণ চালিয়ে শুধু ‘স্পয়েল ওব ওয়ার’ হিসেবে নারীদের ধর্ষণ, উপভোগ কিংবা দাস তো বানাতোই (এগুলো ছিল একেবারেই মামুলি ব্যাপার), যুদ্ধবন্দিদের বসিয়ে রেখে তাড়িয়ে তাড়িয়ে চোখ উপড়ে ফেলা হতো, হাত পা কেটে ফেলা হতো, অনেক সময় আবার আয়েশ করে উপড়ানো মাংস ভক্ষণও করা হতো আনন্দের সাথে[১৯৩, ১৯৪]। পাঠকদের হয়তো বর্ণনাগুলো পড়ে বিকৃত হরর ছায়াছবির মতো মনে হতে পারে, কিন্তু মনে রাখতে হবে আজকের দিনের হরর ছায়াছবিগুলোই ছিল সেসময়ের নির্মম বাস্তবতা। সে সময় যুদ্ধের ব্যাপারে কোনো নিয়মনীতি ছিল না, ছিল না কোনো ‘জেনেভা কনভেনশন’, ছিল না নারী কিংবা শিশুদের প্রতি কোনো বিশেষ সুব্যবহারের নির্দেশ। একতরফাভাবে যুদ্ধ করে প্রতিপক্ষকে কচুকাটা করাই ছিল যুদ্ধের একমাত্র লক্ষ্য।

বিংশ শতাব্দীতে আমরা পারতপক্ষে মারামারি হানাহানি খুনোখুনি একদম বাদ দিতে পারলেও অনেকটাই কমিয়ে এনেছি বলা যায়। এমনকি যুদ্ধের সময়ও কিছু ‘এথিক্স’ পালন করি, যেমন, বেসামরিক জায়গায় হত্যা, লুণ্ঠন, বোমাবাজিকে নিরুৎসাহিত করি, যুদ্ধবন্দিদের উপর যতদূর সম্ভব আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী মানবিক ব্যবহার করার চেষ্টা করি। এর পেছনে গণতান্ত্রিক আইন প্রয়োগ, শিক্ষার বিস্তার, মানবিক অধিকারের প্রতি সচেতনতা বৃদ্ধি প্রভৃতিকে উল্লেখ করা যায়। শুধু তাই নয়, আমাদের সভ্য জীবনযাত্রা লক্ষ করুন। অনেক কিছুতেই আমরা প্রাণপণে ‘পলিটিকালি কারেক্ট’ থাকার চেষ্টা করি। বক্তব্যে কিংবা লেখায় উপজাতির বদলে বলি আদিবাসী, নিগ্রো শব্দের বদলে বলি আফ্রিকান আমেরিকান। সভ্য সমাজে অফিস আদালতে কাজ যারা করেন তারা সচেতন থাকেন আরও একধাপ বেশি লক্ষ রাখেন কারো ধর্ম, বর্ণ, জেন্ডার কিংবা বয়স নিয়ে কোনোক্রমেই যেন বক্রোক্তি যেন প্রকাশিত না হয়ে যায়। আমরা আজ সমবেতভাবে গ্লোবাল ওয়ার্মিং নিয়ে দুশ্চিন্তা করি, বিলুপ্তপ্রায় পান্ডা কিংবা মেরু ভল্লুকদের রক্ষার ব্যাপারে আমাদের মন কেঁদে উঠে অহর্নিশি। অথচ এই ষোড়শ শতকে আমাদের মহা শান্তিপ্রিয়’ পূর্বপুরুষেরাই প্যারিসের রাস্তায় জীবন্ত বিড়াল দড়িতে ঝুলিয়ে দিত, তারপর তাতে তেল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিত। সেই জীবন্ত বিড়াল যখন আগুনে পুড়ে ব্যথায় কোঁকাতে থাকত, সেটা ছিল তাদের বিনোদনের উৎস। বিড়ালের চারপাশে সমবেত জনতা হাততালি দিয়ে চিৎকার করে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করত। তাদের চোখের সামনে। অসহায় বিড়ালটি একদল পাষণ্ড লোকের বিনোদনের খোড়াক যোগাতে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যেতো[১৯৫]।

.

মিথ অব নোবেল স্যাভেজ

কিন্তু যত আশাবাদীই হই কিংবা হওয়ার অভিনয় করি না কেন, সত্যি বলতে কী মানুষের বেঁচে থাকার ইতিহাস আসলে শেষ পর্যন্ত সহিংসতারই ইতিহাস। যে কোনো প্রাচীন ইতিহাসভিত্তিক জনপ্রিয় চলচ্চিত্রগুলোতে চোখ রাখলেই দেখা যায় এক রাজা আরেক রাজার সাথে যুদ্ধ করছে, কেউ ষড়যন্ত্র করছে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য, কেউবা পার্শ্ববর্তী রাজ্য আক্রমণের জন্য মুখিয়ে আছে, কখনো গ্ল্যাডিয়েটরদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে ক্ষুধার্ত সিংহের খাঁচায়, কখনো বা নরবলি দেয়া হয়েছে কিংবা কুমারী নারী উৎসর্গ করা হয়েছে রাজ্যের সমৃদ্ধি কামনায়। আমরা ইতিহাসের সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে যত পেছনের দিকেই যাই না কেন, এ ধরনের যুদ্ধ এবং অমানবিক নৃশংসতার হাত থেকে আমরা নিস্তার পাই না। আমাদের আদিম পূর্বপুরুষেরা কেউ বা যুদ্ধ করেছে। লাঠিসোটা দিয়ে, কেউ বা বল্লম দিয়ে, কেউ বা তীর ধনুক দিয়ে কিংবা কেউ বুমেরাং ব্যবহার করে। আদিম গুহাচিত্রগুলোতে চোখ রাখলেই দেখা যায় তীক্ষ্ণ সেসব অস্ত্র ব্যবহার করে তারা পশু শিকার করেছে, কখনো বা হানাহানি মারামারি করেছে। নিজেদের মধ্যেই। তারপরেও আমাদের স্কুল কলেজের বইপত্রে শেখানো হয়েছে কিংবা জনপ্রিয় মিডিয়ায় বহুদিন ধরে বোঝানো হয়েছে আমরা নাকি খুব শান্তিপ্রিয় জীব। আমরা পশুদের মতো নির্বিচারে হানাহানি মারামারি করি না। আসলে মানুষ খুব ‘শান্তিপ্রিয় প্রজাতি’সমাজে গেড়ে বসা এই মিথটিকে স্টিভেন পিঙ্কার তার ব্ল্যাঙ্ক স্লেট চিহ্নিত করেছেন ‘মিথ অব নোবেল স্যাভেজ’ (Myth of NobelSavage) হিসেবে। অবশ্য এই অযাচিত মিথটিকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে নৃতাত্ত্বিক এবং সমাজতাত্ত্বিকদের অবদানও ফেলে দেবার মতো নয়। তারা প্রথম থেকেই উৎসাহী ছিলেন আমাদের অন্ধকার জীবনের ইতিবৃত্তগুলো বেমালুম চেপে গিয়ে একধরনের আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি জনমানসে প্রোথিত করতে। সে সব ‘শান্তিকামী নতত্ত্ববিদেরা’ এক সময় সোৎসাহে বলে বেড়াতেন যে, ছোটখাটো যুদ্ধ টুদ্ধ হলেও মানবেতিহাসের পাতায় কোনো নরভক্ষণের (canabalism) দৃষ্টান্ত নেই। তারপর তারা নিজেরাই নিজেদের কথা গিলতে শুরু করলেন যখন সহিংসতা, হানাহানি, যুদ্ধ, হত্যা এবং এমনকি নরভক্ষণেরও গণ্ডায় গণ্ডায় আলামত বেরিয়ে আসতে শুরু করল। প্রাথমিক একটি দৃষ্টান্তের উল্লেখ পাওয়া যায় প্রায় আটশহাজার বছর আগেকার পাওয়া ফসিলের আলামত থেকে। অ্যারিজোনা স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ববিদ ক্রিস্টি জি. টার্নার বহু পরিত্যক্ত মানব হাড়-গোড় বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্তে আসেন যে, সেগুলো আসলে রান্না করে ভক্ষণ করা হয়েছিল, আর তা করেছিল সমসাময়িক মানুষেরাই। তাদের সে সময়কার থালা-বাসন এবং অন্যান্য রন্ধন সামগ্রীতেও মায়োগ্লোবিনের (পেশী প্রোটিন) নিদর্শন স্পষ্ট[১৯৬]। এমনকি আমরা হোমোস্যাপিয়েন্সরা আজ থেকে ৫০,০০০ বছর আগে নিয়ান্ডার্থালদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলাম এবং সম্ভবত তাদের অবলুপ্তির কারণ ছিলাম আমরাই-শান্তিপ্রিয় আধুনিক মানবদের পুর্বসূরীরা[১৯৭]। ইরাকের রাজধানী বাগদাদ থেকে ৪০০ কিলোমিটার উত্তরে শানিদার গুহায় পাওয়া বিভিন্ন আলামত আর রালফ সোলেকি[১৯৮] এবং স্টিভেন চার্চিলের গবেষণা থেকে জানা গেছে সম্ভবত আধুনিক হোমোস্যাপিয়েন্স মানুষের নিক্ষিপ্ত অস্ত্রশস্ত্রের আঘাতেই নিয়ান্ডার্থালদের মৃত্যু হয়। শানিদার গুহায় পাওয়া নিয়ান্ডার্থালদের ফসিলের ক্ষতের সাথে আধুনিক মানুষের হাত থেকে নিক্ষিপ্ত হালকা বর্শার আঘাতের সামঞ্জস্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়[১৯৯]। শুধু তাই নয়, গবেষক ফার্নান্ডো রেমিরেস রোসির গবেষণা থেকে জানা গেছে, কিছু জায়গায় যুদ্ধজয়ের পরে হোমোস্যাপিয়েন্সরা ঘটা করে নিয়ান্ডার্থালদের মাংস ভক্ষণ করে উৎসব পালন করত। অধ্যাপক রোসিস্পষ্ট করেই বলেন, “এটা পরিষ্কার যে, আধুনিক মানুষেরা নিয়ান্ডার্থালদের খাদ্য হিসেবে ভক্ষণ করেছিল[২০০]।

চিত্র। পেজ ১৭৯

চিত্র : (ক) স্টিভেন চার্চিলের হাতে দুই ধরনের অস্ত্রের মডেল। বাম হাতে নিয়ানডার্থালদের ভারী অস্ত্র, আর ডান হাতে আদিম আধুনিক মানুষের হাল্কা বর্শা জাতীয় অস্ত্র, যার আঘাতের ছাপ নিয়ান্ডার্থালদের ফসিলে স্পষ্ট। (খ) ফার্নান্ডো রেমিরেস রোসির আলামত থেকে স্পষ্ট যে, হোমোস্যাপিয়েন্সরা নিয়ান্ডার্থালদের সাথে কেবল যুদ্ধই করেনি, তাদের মাংসও ভক্ষণ করেছিল একসময়।

.

পুরুষালি সহিংসতা

আগের অধ্যায় থেকে আমরা জেনেছি পুরুষেরা মেয়েদের চেয়ে বেশি সহিংস, এবং তার কারণ আমাদের বৈজ্ঞানিকভাবেই বিবর্তনীয় পথ পরিক্রমার আলোকে খুঁজতে হবে। বিবর্তনীয় বিজ্ঞানীরা বলেন, পুরুষেরা এক সময় ছিল হান্টার বা শিকারি, আর মেয়েরা ফলমূল সংগ্রাহক। প্রয়োজনের তাগিদেই একটা সময় পুরুষদের একে অন্যের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হয়েছে; অন্য গোত্রের সাথে মারামারি হানাহানি করতে হয়েছে; নিজের সাম্রাজ্য বাড়াতে হয়েছে; অস্ত্র চালাতে হয়েছে। তাদেরকে কারিগরি বিষয়ে বেশি জড়িত হতে হয়েছে। আদিম সমাজে অস্ত্র চালনা, করা শিকারে পারদর্শী হওয়াকে বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে বেঁচে থাকার অন্যতম নিয়ামক হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। যারা এগুলোতে পারদর্শী হয়ে উঠেছে তারাই অধিক হারে সন্তান সন্ততি এ পৃথিবীতে রেখে যেতে পেরেছে, যারা এগুলো পারেনি তারা বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

পৃথিবীতে মানব সভ্যতার ইতিহাস ঘাটলে পাওয়া যাবে পুরুষেরা শুধু আত্মরক্ষা করতেই যুদ্ধ করেনি, যুদ্ধ করেছে সাম্রাজ্য বাড়াতে আর সম্পত্তি আর নারীর দখল নিতে। জন টুবি, লিডা কসমাইডস, রিচার্ড র্যাংহাম তাদের বেশ কিছু গবেষণায় দেখিয়েছেন, যে ট্রাইবাল সোসাইটিগুলোতে সহিংসতা শক্তিশালী পুরুষদের উপযোগিতা দিয়েছিল টিকে থাকতে, এবং তারা সেসময় যুদ্ধ করত নারীর দখল নিতে[২০১]। এমনকি এখনকার ট্রাইবাল সমাজগুলোতে এই মানসিকতার প্রভাব বিরল নয়। এর বাস্তব প্রমাণ বিজ্ঞানীরা পেয়ছেন ভেনিজুয়ালার আদিম ট্রাইব ইয়ানোমামো (Yanomamd)দের নিয়ে গবেষণা করে। নৃতত্ত্ববিদ নেপোলিয়ন চ্যাংনন এই ট্রাইব নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে খুব অবাক হয়েই লক্ষ করেন–

এরা শুধু সম্পদ আহরণের জন্য যুদ্ধ করে না, এরা যুদ্ধ করে নারীদের উপর অধিকার নিতেও।

দেখা গেল ট্রাইবে যতবেশি শক্তিশালী এবং সমর-দক্ষ পুরুষ পাওয়া যাচ্ছে, তত বেশি তারা নারীদের উপর অধিকার নিতে পেরেছে।

আসলে যতই অস্বীকার করা হোক না কেন, কিংবা শুনতে আমাদের জন্য যতই অস্বস্তি লাগুক না কেন, গবেষকরা ইতিহাসের পাতা পর্যালোচনা আর বিশ্লেষণ করে বলেন, বিশেষত প্রাককৃষিপূর্ব সমাজে সহিংসতা এবং আগ্রাসনের মাধ্যমে জোর করে একাধিক নারীদের উপর দখল নিয়ে পুরুষেরা নিজেদের জিন ভবিষ্যত প্রজন্মে ছড়িয়ে দিয়েছিল। ইতিহাসে চেঙ্গিস খানের (১১৬৭-১২২৭) মতো যুদ্ধবাজেরা একেকটি একটি বড় উদাহরণ। চেঙ্গিস খান শুধু যুদ্ধই করতেন না, যে সাম্রাজ্যই দখল করতেন, সেখানকার নারীদের ভোগ করতেন উৎসাহের সাথে। তিনি বলতেন[২০২],

সর্বোত্তম আনন্দজনক ব্যাপার নিহিত রয়েছে শত্রুকে ধ্বংসের মধ্যে, তাদেরকে তাড়া করার মধ্যে আর তাদের যাবতীয় সম্পদ লুটপাটের মধ্যে, ধ্বংসের আর্তনাদে আক্রান্তদের আপনজনের চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় পানি ঝরা অবলোকন করতে, তাদের অশ্বের দখল নিতে, আর তাদের স্ত্রী এবং কন্যাদের নগ্ন শরীরের উপর উপগত হতে।

পুরুষদের এই সনাতন আগ্রাসী মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায় আজকের সমাজে ঘটা যুদ্ধের পরিসংখ্যানেও। এখনও চলমান ঘটনায় চোখ রাখলে দেখা যাবে—প্রতিটি যুদ্ধেই দেখা যায় অসহায় নারীরা হচ্ছে যৌননির্যাতনের প্রথম এবং প্রধান শিকার। বাংলাদেশে, বসনিয়া, রুয়ান্ডা, আলবেনিয়া, কঙ্গো, বুরুন্ডিয়া, প্যালেস্টাইন, ইরাক, ইরান সহ প্রতিটি যুদ্ধের ঘটনাতেই সেই নগ্ন সত্যই বেরিয়ে আসে যে, এমনকি আধুনিক যুগেও নারীরাই থাকে যুদ্ধের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু।

চিত্র। পেজ ১৮১

চিত্র : ইয়ানোমামো গোত্রের পুরুষেরা পার্শ্ববর্তী গ্রাম আক্রমণের আগে এভাবেই সমরশিক্ষা গ্রহণ এবং নিজেদের মধ্যে প্রদর্শন করে থাকে। (ছবি- সায়েন্টিফিক আমেরিকানের সৌজন্যে)

শুধু আধুনিক যুগই বাবলি কেন, ইতিহাসের পাতা উল্টালে কিংবা বিভিন্ন দেশের লোককাহিনি উপকথাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যৌনতার কারণে পৃথিবীতে যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং রক্তপাতও কম হয়নি। তার উল্লেখ পাওয়া যায় সাহিত্যে, ইতিহাসে, আর শিল্পীর ভাস্কর্যে। পশ্চিমা বিশ্বে হোমারের সেই প্রাচীন সাহিত্য ইলিয়াড শুরুই হয়েছিল একটি যুদ্ধকে কেন্দ্র করে, আর সেই যুদ্ধ আবার হয়েছিল একটি নারীকে অপহরণের কারণে সেই হেলেন; হেলেন অব ট্রয়। আমাদের সংস্কৃতিতেও প্রাচীন রামায়ণের কাহিনি আমরা জানি রাম-রাবণের যুদ্ধ হয়েছিল সীতাকে অপহরণের জন্য। এ ধরনের সাহিত্যের উপকরণ এবং উপকথা সব সংস্কৃতিতেই কমবেশি ছড়িয়ে আছে। এ থেকে একটি নিষ্ঠুর সত্য বেরিয়ে আসে ব্যাপক আকারে জিন সঞ্চালনের জন্য যুদ্ধ পুরুষদের একটি আকর্ষণীয় মাধ্যম ছিল প্রতিটি যুগেই।

আজ আমরা যারা পৃথিবীতে বাস করছি, শান্তিপ্রিয় নিরুপদ্রব জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, তারা সবাই কিন্তু সেই আদিম সমাজের সহিংস পূর্বপুরুষদের বংশধর, যারা অস্ত্র চালনায় ছিল দক্ষ আর সুচারু এবং যারা সাহসিকতা, বুদ্ধি, ক্ষিপ্রতা আর সমরদক্ষতার মাধ্যমে স্বীয় গোত্রকে দিয়েছিল বাড়তি নিরাপত্তা আর নিঃসন্দেহে অর্জন করতে পেরেছিল বহু নারীর প্রণয় এবং অনুরাগ। ঠিক সেজন্যই পুরুষদের এই ‘পুরুষালি গুণগুলো সার্বজনীনভাবেই নারীদের কাছে প্রত্যাশিত গুণ হিসেবে স্বীকৃত। বিখ্যাত নৃতাত্ত্বিক সলোমন আ্যাশ সেজন্যই বলেন, “আমরা এমন। কোনো সমাজের কথা জানি না, যেখানে সাহসিকতাকে হেয় করা হয়, আর ভীরুতাকে সম্মানিত করা হয়। এ থেকে বোঝা যায় যে, সাহসিকতার মতো গুণগুলোকে আমাদের আদিম পুর্বপুরুষেরা যৌনতার নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের অজান্তেই নির্বাচিত করেছিল। এখনও সেই গুণগুলোর উৎকর্ষতার চর্চাকে ইনিয়ে বিনিয়ে মহিমান্বিত করার অফুরন্ত দৃষ্টান্ত দেখি সমাজে। জেমস বন্ড, মিশন ইম্পসিবল কিংবা আজকের ‘নাইট এন্ড ডে’র মতো চলচিত্রগুলো ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যার কেন্দ্রে থাকে প্রায় অমানবীয় ক্ষমতাসম্পন্ন হিরোইক ইমেজের একজন পুরুষালি চরিত্র, যে অসামান্য বুদ্ধি, ক্ষিপ্রতা আর সাহসের মাধ্যমে একে একে হাজারো বিপদ পার হয়ে চলেছে, আর অসংখ্য নারীর মন জয় করে চলেছে।

চিত্র। পেজ ১৮২

চিত্র : জেমস বন্ড কিংবা নাইট এন্ড ডে-র মতো ছবিগুলোতে প্রদর্শিত পুরুষালি সহিংসতা, ক্ষিপ্রতা এবং দৈহিক উৎকর্ষতা কি আসলে আদিম বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানজাত চাহিদার স্বপ্নীল রূপায়ণ?

শুধু জেমস বন্ডের ছবি নয়, বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণারত বিজ্ঞানীরা সমাজের বিভিন্ন প্যাটার্নের ব্যাখ্যা হিসেবে সম্প্রতি খুব চমৎকার কিছু বিশ্লেষণ হাজির করেছেন। বইয়ের পরিসরের কথা ভেবে সব কিছু নিয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা হয়তো সম্ভব নয়, আমি এই অধ্যায়ে মূলত আমার আলোচনা ভায়োলেন্স বা সহিংসতা বিষয়েই কেন্দ্রীভূত রাখার চেষ্টা করব।

অধ্যাপক মার্টিন ড্যালি এবং মার্গো উইলসন ১৯৮৮ সালে একটি বই লেখেন হোমিসাইড নামে[২০৩]। তাদের বইয়ে তারা দেখান যে, হত্যা, গণহত্যা, নারী ধর্ষণ, শিশু হত্যা, অভিভাবক হত্যা, পুরুষ কর্তৃক পুরুষ হত্যা, স্বামী কর্তৃক স্ত্রী হত্যা, স্ত্রী কর্তৃক স্বামী হত্যা সব কিছুর উৎস আসলে লুকিয়ে রয়েছে বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের ব্যাখ্যায়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করা যাক।

.

কেন সিন্ডারেলার গল্প কম বেশি সব সংস্কৃতিতেই ছড়িয়ে আছে?

শিশুনির্যাতন বিষয়টাকে অভিভাবকদের ব্যক্তিগত আক্রোশ কিংবা বড়জোর সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক কারণ হিসেবে এ পর্যন্ত চিত্রিত করা হলেও, এর সার্বজনীন রূপটি আসলে ব্যাখ্যাহীন ছিল। কিন্তু ব্যাখ্যাহীন থাকলেও অজানা ছিল না। সবাই কম বেশি জানত যে, প্রতিটি সংস্কৃতিতেই সিন্ডারেলা কিংবা স্নো হোয়াইটের মতো লোককথা কিংবা গল্পকাহিনি প্রচলিত, যেখানে সত্বাবা কিংবা সৎমা কর্তৃক শিশুর উপর নির্যাতন থাকে মূল উপজীব্য হিসেবে।

চিত্র। পেজ ১৮৩

চিত্র : পৃথিবীর প্রায় সব সংস্কৃতিতেই সিন্ডারেলা বা স্নো হোয়াইটের মতো লোককাহিনি বা রূপকথা প্রচলিত আছে, যেখানে বিবৃত থাকে সৎ মার অত্যাচারের বেদনাঘন কাহিনি।

ছোটবেলায় রুশদেশীয় উপকথার খুব মজার মজার বই পড়তাম। আশি আর নব্বই দশকের সময়গুলোতে চিকন মলাটে বাংলায় রাশিয়ান গল্পের (অনুবাদ) অনেক বই পাওয়া যেত। আমি সবসময়ই তীর্থের কাকের মতো বসে থাকতাম নতুন নতুন গল্পের বই পড়ার আশায়। প্রতি বছর জন্মদিনের সময়টাতে তৃষ্ণা যেন বেড়ে যেত হাজারগুণে। কারণ, জানতাম কেউ না কেউ রুশদেশীয় উপকথার বই নিয়ে আসবে উপহার হিসেবে। অবধারিতভাবে তাই হতো। এমনি একটি জন্মদিনে একটা বই পেয়েছিলাম বাবা ইয়াগা’ (Baba Yaga) নামে। গল্পটা এরকম এক লোকের স্ত্রী মারা গেলে লোকটি আবার বিয়ে করে। তার প্রথম পক্ষের স্ত্রীর ছিল এক ফুটফুটে মেয়ে। কিন্তু সৎ মা এসেই মেয়েটির উপর নানা ধরনের অত্যাচার শুরু করে। মারধোর তো ছিলই, কীভাবে চিরতরে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেয়া যায় সেটারও পাঁয়তারা চলছিল। শুধু তাই নয়, মেয়েটিকে ছলচাতুরি করে সৎমা তার বোনের বাসায় পাঠানোর নানা ফন্দি-ফিকির করে যাচ্ছিল। সৎমার বোন আসলে ছিল এক নরখাদক ডাইনি। যাহোক, গল্পে শেষ পর্যন্ত দেখা যায় কোনো রকমে মেয়েটি নিজেকে ঘোর দুর্দৈব থেকে বাঁচাতে পেরেছিল, আর মেয়েটির বাবাও বুঝে গিয়েছিল তার নতুন স্ত্রীর প্রকৃত রূপ। শেষমেষ গুলি করে তার স্ত্রীকে হত্যা করে মেয়েকে ডাইনির খপ্পর থেকে রক্ষা করে তার বাবা।

আমি জার্মান ভাষাতেও এ ধরনের একটি গল্প পেয়েছি যার ইংরেজি অনুবাদ বাজারে পাওয়া যায় ‘জুপিটার ট্রি’ নামে। সেখানে ঘটনা আরও ভয়ানক। সত্মা তার স্বামীর অনুপস্থিতিতে সৎ ছেলেকে জবাই করে হত্যা করার পর দেহটা হাঁড়িতে জ্বাল দিয়ে বেঁধে খেয়ে ফেলে। আর হাড়গোড়গুলো পুঁতে ফেলে বাসার পাশে এক জুপিটার গাছের নীচে। তারপর সম্মা নির্বিঘ্নে ঘুমাতে যায় সব ঝামেলা চুকিয়ে। কিন্তু জুপিটার গাছের নীচে পুঁতে রাখা ছেলেটার হাড়গোড় থেকে গভীর রাতে জন্ম হয় এক মিষ্টি গলার গায়ক পাখির। সেই পাখি তার কণ্ঠের জাদুতে সৎমাকে সম্মোহিত করে বাড়ির বাইরে নিয়ে আসে আর শেষ পর্যন্ত উপর থেকে পাথর ফেলে মেরে ফেলে। এখানেই শেষ নয়। পাখিটি তারপর অলৌকিকভাবে সেই আগেকার ছেলেতে রূপান্তরিত হয়ে যায় আর তার বাবার সাথে সুখে শান্তিতে জীবন কাটাতে থাকে।

রুশ দেশের কিংবা জার্মান দেশের উপকথা স্রেফ উদাহরণ হিসেবে নেওয়া হয়েছে। আসলে এধরনের গল্প কিংবা উপকথা সব সংস্কৃতিতেই কমবেশি পাওয়া যায়। এমনকি আমাদের সংস্কৃতিতেও রূপকথাগুলোতে অসংখ্য সুয়োরানি, দুয়োরানির গল্প আছে, এমনকি বড় হয়েও দেখেছি বহু নাটক সিনেমার সাজানো প্লট যেখানে সম্মা জীবন অতিষ্ঠ করে তুলছে একটি ছোট্ট মেয়ের বা ছেলের। নিশ্চয় মনের কোণে প্রশ্ন উঁকি মারতে শুরু করেছে কেন সবদেশের উপকথাতেই এ ধরনের গল্প ছড়িয়ে আছে? আসলেই কী এ ধরনের গল্পগুলো বাস্তব সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে, নাকি সেগুলো সবই উর্বর মস্তিষ্কের কল্পনা? পশ্চিমে ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকানো যাক। আমেরিকার মতো জায়গায় বিবাহবিচ্ছেদের হার তুলনামূলকভাবে বেশি, স্টেপ বাবা কিংবা স্টেপ মা’র ব্যাপারটা একেবারেই গা সওয়া হয়ে গেছে, দত্তক নেওয়ার ব্যাপারটাও এখানে খুব সাধারণ। কাজেই ধরে নেওয়া যায় যে, এই সমস্ত অগ্রসর সমাজে সৎঅভিভাবক কর্তৃক শিশু নির্যাতনের মাত্রা কম হবে। সত্যিই তা কম, অন্তত আমাদের মতো দেশগুলোর তুলনায় তো বটেই। কিন্তু ড্যালি এবং উইলসন তাদের গবেষণায় দেখালেন, এমনকি পশ্চিমেও সঅভিভাবক (step parents) কর্তৃক শিশু নির্যাতনের মাত্রার চেয়ে জৈবঅভিভাবক (biological parent)-দের দ্বারা শিশু নির্যাতনের মাত্রা তুলনামূলকভাবে অনেক কম পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ, এমনকি অগ্রসর সমাজে সৎঅভিভাবকদের দ্বারা শিশু নির্যাতন কম হলেও জৈব অভিভাবকদের তুলনায় তা আসলে এখনও অনেক বেশিই। যেমন, পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, আমেরিকার আধুনিক সমাজেও জৈব অভিভাবকদের দ্বারা শিশু নির্যাতনের চেয়ে সৎ অভিভাবক কর্তৃক শিশু নির্যাতন। অন্তত ১০০ গুণ বেশি। কানাডায় জরিপ চালিয়েও একই ধরনের ফলাফল পাওয়া গেছে। সেখানে স্বাভাবিক অভিভাবকের তুলনায় সঅভিভাবকদের নির্যাতনের মাত্রা ৭০ গুণ বেশি পাওয়া গেল।

চিত্র। পেজ ১৮৫

চিত্র : মার্টিন ড্যালি এবং মার্গো উইলসন তাদের গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, সঅভিভাবক কর্তৃক শিশু নির্যাতনের মাত্রার চেয়ে জৈবঅভিভাবকদের দ্বারা শিশু নির্যাতনের মাত্রা সবসময়ই তুলনামূলকভাবে কম পাওয়া যায়।

আসলে বিবর্তনীয় প্রেক্ষাপটে চিন্তা করলে তাই পাওয়ার কথা। জৈব অভিভাবকেরা তাদের জেনেটিক সন্তানকে খুব কমই নির্যাতন বা হত্যা করে, কারণ তারা সহজাত কারণেই নিজস্ব জিনপুল তথা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংসের চেয়ে রক্ষায় সচেষ্ট হয় বেশি, কিন্তু সঅভিভাবকদের ক্ষেত্রে যেহেতু সেই ব্যাপারটি জেনেটিকভাবে’ সেভাবে নেই, অনেকাংশেই সামাজিকভাবে আরোপিত, সেখানে নির্যাতনের মাত্রা অধিকতর বেশি পাওয়া যায়। ব্যাপারটা শুধু মানুষ নয়, অন্য প্রাণিজগতের ক্ষেত্রেও খুব প্রবলভাবে দৃশ্যমান। আফ্রিকার বনভূমিতে সিংহদের নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে দেখেন, সেখানে একটি পুরুষ সিংহ যখন অন্য সিংহকে লড়াইয়ে পরাজিত করে গোত্রের সিংহীর দখল নেয়, তখন প্রথমেই যে কাজটি করে তা হলো সে সিংহীর আগের বাচ্চাগুলোকে মেরে ফেলে। আফ্রিকার সেরেঙ্গিটি প্লেইনে গবেষকদের হিসেব অনুযায়ী প্রায় শতকরা ২৫ ভাগ সিংহসাবক তার বৈপিত্রের খপ্পরে পড়ে মারা যায়[২০৪]। একই ধরনের ব্যবহার দৃশ্যমান গরিলা, বাঘ, চিতাবাঘ, বেবুন প্রভৃতি প্রাণীর মধ্যেও। এখন মানুষও যেহেতু অন্য প্রাণীদের মতো বিবর্তনের বন্ধুর পথেই উদ্ভূত হয়েছে, তাই তার মধ্যেও সেই পশুবৃত্তি’র কিছুটা ছিটেফোঁটা থাকার কথা। অনেক গবেষকই মনে করেন, প্রচ্ছন্নভাবে হলেও তা পাওয়া যাচ্ছে। মার্টিন ড্যালি এবং মার্গো উইলসনের উপরের পরিসংখ্যানগুলো তারই প্রমাণ। ডেভিড বাস তার ‘দ্য মার্ডারার নেক্সট ডোর’ বইয়ে সেজন্যই বলেন[২০৫]–

Put bluntly, a stepparent has little reproductive incentive to care for a stepchild. In fact, a stepparent has strong incentives to want the stepchild out of the way. A stepfather who kills a stepchild prevents that child’s mother from investing valuable resources in a rival’s offspring. He simultaneously frees up the mother’s resources for investigating in his own offspring with her.

এই ব্যাখ্যা থেকে অনেকের মনে হতে পারে যে বৈপিত্রের হাতে শিশু হত্যাটাই বুঝি ‘প্রাকৃতিক’ কিংবা অনেকের এও মনে হতে পারে যে, সৎ অবিভাবকদের কুকর্মের বৈধতা অবচেতন মনেই আরোপের চেষ্টা হচ্ছে বুঝি। আসলে তা নয়। সিংহর ক্ষেত্রে যেটা বাস্তবতা, মানবসমাজের ক্ষেত্রেও সেটা হবে তা ঢালাওভাবে বলে দেওয়াটা কিন্তু বোকামি। আর মানবসমাজ এমনিতেই অনেক জটিল। জৈব তাড়নার বিপরীতে কাজ করতে পারার বহু দৃষ্টান্তই মানবসমাজে বিদ্যমান; যেমন পরিবার পরিকল্পনার মাধ্যমে সন্তান না নেওয়া, অনেকের সমকামী প্রবণতা প্রদর্শন, দেশের জন্য আত্মত্যাগ, কিংবা আত্মহত্যার দৃষ্টান্ত, সন্তানদের পাশাপাশি মা বাবার প্রতি ভালোবাসা, পরকীয়ার কারণে নিজ সন্তানকে হত্যা, সন্তান থাকার পরেও আরও সন্তান দত্তক দেয়া, আবার পরের ছেলে কেষ্টর মায়ায় কাদম্বিনীর গৃহত্যাগ (শরৎচন্দ্রের মেজদিদি গল্প দ্র.) সহ বহু দৃষ্টান্তই সমাজে আমরা দেখি যেগুলোকে কেবল জীববিজ্ঞানের ছাঁচে ফেলে বিচার করতে পারি না। মনে রাখতে হবে, আধুনিক বিশ্ব আর সিন্ডারেলা আর সুয়োরানির যুগে পড়ে নেই; নারীরা আজ বাইরে কাজ করছে, ভিক্টোরীয় সমাজের তুলনায় তাদের ক্ষমতায়ন এবং চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় সামাজিক সম্পর্কগুলো দ্রুত বদলে যাচ্ছে। পাশ্চাত্য বিশ্বে বিবাহবিচ্ছেদ যেমন বেড়েছে, তেমনি পাল্লা দিয়ে দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে উঠছে ‘স্টেপ ড্যাড’ আর ‘স্টেপ মম’-এর মতো ধারণাগুলো। এমনকি সমকামী দম্পতিদের দত্তক নেওয়ার দৃষ্টান্তও বিরল নয়। বহু পরিবারেই দেখা যায় জৈব অভিভাবক না হওয়া সত্ত্বেও সন্তানের সাথে অভিভাবকদের সুসপম্পর্ক গড়ে উঠাতে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। আর বৈপিত্রের দ্বারা সন্তান হত্যার পেছনে আদি জৈবিক প্রভাব যদি কিছু মানবসমাজে থেকেও থাকে, সেটার বিপরীত প্রভাবগুলোও প্রাকৃতিকভাবে অঙ্কুরিত হতে হবে জিনপুলের টিকে থাকার প্রয়োজনেই। সেজন্যই দেখা যায় বিবাহবিচ্ছিন্ন একাকীমা (single mother) যখন আরেকটি নতুন সম্পর্কে জড়ান, তখন তার প্রাধান্যই থাকে তার সন্তানের প্রতি তার প্রেমিকের মনোভাবটি কী রকম সেটি বুঝার চেষ্টা করা। কোনো ধরনের বিরূপতা লক্ষ করলে কিংবা অস্বস্তি অনুভব করলে সম্পর্কের চেয়ে সন্তানের মঙ্গলটাই মুখ্য হয়ে উঠে অধিকাংশ ক্ষেত্রে। আবার অনেক ক্ষেত্রে তার নতুন পুরুষটি প্রাথমিকভাবে ততটা বাঞ্ছিত না হলেও যদি কোনো কারণে সন্তানের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠে, তবে সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে মার কাছে অগ্রগামিতা পেতে বাড়তি দূরত্ব অতিক্রম করে ফেলেন তিনি। আবার সম্পর্ক তৈরির পরে কখনো সখনো ঝগড়াঝাটি হলে স্থায়ীভাবে অযাচিত টেনশনের দিকে যেন ব্যাপারটা চলে না যায়, সেটিও থাকে সম্পর্কের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এগুলো সবকিছুই তৈরি হয় টিকে থাকার জন্য বিবর্তনীয় টানাপোড়েনের নিরিখে।

.

কেন দাগি অপরাধীদের প্রায় সকলেই পুরুষ?

মার্টিন ড্যালি এবং মার্গো উইলসন তাদের বইয়ে দেখিয়েছেন যে, ইতিহাসের একটা বড় সময় জুড়ে মানবসমাজ আসলে একগামী ছিল না, বরং সেসময় পুরুষেরা ছিল বহুগামী। মানবসমাজ ছিল পলিজাইনাস (polygynous) যেখানে শক্তিশালী কিংবা ক্ষমতাশালী পুরুষেরা একাধিক নারীকে বিয়ে করতে পারত, কিংবা তাদের দখল নিতে পারত[২০৬]। পলিজাইনাস সমাজে কিছু সৌভাগ্যবান পুরুষ তাদের অতুলনীয় শক্তি আর ক্ষমতার ব্যবহারে অধিকাংশ নারীর দখল নিয়ে নিত, আর অধিকাংশ শক্তিহীন কিংবা ক্ষমতাহীন পুরুষদের কপালে থাকত অশ্বডিম্ব! যত খারাপই লাগুক, এটাই ছিল রূঢ় বাস্তবতা। নারীর দখল নেওয়ার জন্য পুরুষে পুরুষে একসময় প্রতিযোগিতা করতে হতো; আর এই প্রতিযোগিতা বহুক্ষেত্রেই ‘শান্তিময় ছিল না, বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই প্রতিযোগিতা রূপ নিত রক্তাক্ত সংঘাতে, আর তার পরিণতি হতো হত্যা আর অপঘাতে। পুরুষেরা সম্পদ আহরণ করত কিংবা লড়াই আর যুদ্ধের মাধ্যমে শক্তিমত্তা প্রদর্শন করত মূলত নারীদের আকর্ষণের জন্য। যারা সম্পদ আহরণে আর শক্তি প্রদর্শনে ছিল অগ্রগামী তারা দখল নিতে পারত একাধিক নারীর। সম্পদ আর নারী নিয়ে এই প্রতিযোগিতার কারণেই সমাজের পুরুষদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার চর্চার (সংঘাত, খুন, ধর্ষণ, অস্ত্রবাজি, গণহত্যা প্রভৃতি) প্রকাশ ঘটেছিল। বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, পুরুষালি সহিংসতার বড় একটা উৎস আসলে নিহিত সেই চিরন্তন ‘ব্যাটেল অব সেক্স’-এর মধ্যেই। এমনকি আধুনিক কালে ঘটা বিভিন্ন অপরাধ এবং ভায়োলেন্সগুলোকেও বহু সময়েই এর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায়।

[জীববিজ্ঞানের চোখে পুরুষালি সহিংসতা

মানবসমাজে পুরুষরা কেন নারীদের চেয়ে অধিকতর সহিংস তার খুব সহজ ব্যাখ্যা আছে জীবজ্ঞানে। আগের অধ্যায়ে এ ব্যাপারে খুব হাল্কাভাবে আভাস দেয়া হয়েছিল। প্রাকৃতিকভাবেই শুক্রাণু এবং ডিম্বাণুর প্রকৃতি আলাদা। পুরুষের স্পার্ম বা শুক্রাণু উৎপন্ন হয় হাজার হাজার, আর সেতুলনায় ডিম্বাণু উৎপন্ন হয় কম। ডিম্বাণুর আকার শুক্রাণুর চেয়ে বড় হয় অনেক। অর্থাৎ, জৈববৈজ্ঞানিকভাবে চিন্তা করলে স্পার্ম সহজলভ্য, তাই কম দামি, আর সে তুলনায় ডিম্বাণু অনেক মূল্যবান। ‘স্পার্ম অনেক সহজলভ্য বলেই (সাধারণভাবে) পুরুষদের একটা সহজাত প্রবণতা থাকে বহু সংখ্যক জায়গায় তার প্রতিলিপি ছড়ানোর। একজন পুরুষ তার সারা জীবনে অসংখ্য নারীর গর্ভে সন্তানের জন্ম দিতে পারে, অপরদিকে একজন নারী বছরে জন্ম দিতে পারে কেবল একটি সন্তানেরই। মূলত নারী পুরুষের যৌনতার পার্থকের কারণেই পুরুষরা মূলত নারীর চেয়ে সহিংস হয়ে বেড়ে ওঠে। কেবল মানুষ নয় মূলত সকল স্তন্যপায়ী জীবের ক্ষেত্রেই এই ধারা খুব প্রবলভাবেই বিদ্যমান। জীববিজ্ঞানীরা জৈবিকভাবে নারী পুরুষদের মধ্যকার যৌনতার পার্থক্যকে অনেক সময় ফিটনেস ভ্যারিয়েন্স’ (Fitness varience) এর মাধ্যমে প্রকাশ করেন। যৌনতার পার্থক্যের কারণেই পুরুষদের ফিটনেস ভ্যারিয়েন্স নারীর চেয়ে বেশি[২০৭]। আর তা ছাড়া, ইতিহাসের একটা বড় সময় জুড়ে মানবসমাজ আসলে একগামী ছিল না, বরং সেসময় পুরুষেরা ছিল বহুগামী। এখনও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মানবসমাজ মনোগেমাস নয়, বরং মাইল্ডলি পলিজাইনাস[২০৮]। মনোগেমাস প্রজাতিতে নারী পুরুষের আকার আয়তন সমান হয়, অনেক সময় পার্থক্য করাই মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। যেমন পেঙ্গুইনের ক্ষেত্রে। নারী পেঙ্গুইন আর পুরুষ পেঙ্গুইনের আকার একেবারে সমান সমান। কিন্তু যে সমস্ত প্রজাতিতে পুরুষে পুরুষে প্রতিযোগিতা হয় নারীর দখল নেওয়ার জন্য সেখানে পুরুষের দৈহিক আকার নারীর চেয়ে বড় হয়। যেমন গরিলার ক্ষেত্রে একটি পুরুষ গরিলার গড়পড়তা ওজন হয় ৪০০ পাউন্ড, অপর দিকে নারী গরিলার মাত্র ২০০ পাউন্ড। অর্থাৎ, পুরুষ গরিলা ওজনে নারী গরিলার চেয়ে শতকরা একশ ভাগ বেশি থাকে। এখন মানবসমাজের দিকে তাকালে আমরা কি দেখি? গড়পড়তা একটি পুরুষের ওজন মোটামুটি ১৯০ পাউন্ড, আর নারীর ওজন ১৬০ পাউন্ড, অর্থাৎ গড়পড়তা পুরুষের ওজন নারীর চেয়ে ২৬ শতাংশ বেশি। পুরুষদের দৈহিক আকার মেয়েদের চেয়ে বেশি হওয়া, শক্তিমত্তা এবং আপার বডি ম্যাস–সব কিছুই প্রমাণ করে বিবর্তনীয় পথ পরিক্রমায় সম্ভবত খুব ভায়োলেন্ট পুরুষ-পুরুষ প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে আমাদের যেতে হয়েছে। এ ধরনের সমাজে স্বাভাবিকভাবেই পুরুষে পুরুষে দ্বন্দ্ব হয়, হয় প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতার কারণেই বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার চর্চার (আধুনিক মানবসমাজে সংঘাত, খুন, ধর্ষণ, অস্ত্রবাজি, গণহত্যা প্রভৃতি হচ্ছে কিছু উদাহরণ) প্রকাশ ঘটে। জীববিজ্ঞান থেকে কিছু উলটো (ব্যতিক্রমী) উদাহরণ হাজির করেও যৌনতার সাথে আগ্রাসনের সম্পর্কে ব্যাখ্যা করা যায়। কিছু মাছ আর পাখি আছে যেখানে পুরুষেরা নারীদের মতোই নয় মাস ধরে যে গর্ভধারণের সমতুল্য কিছু নমুনা প্রদর্শন করে থাকে। যেমন, মাছের ক্ষেত্রে কিছু পুরুষ মাছ নিজেদের মুখে ডিম নিয়ে বসে থাকে যতক্ষণ না তা থেকে বাচ্চা বের হয়। কিছু পুরুষ পাখি আছে যারা একই রকমভাবে ‘ফার্টিলাইজড এগ’ বহন করে। সে ধরনের প্রজাতিগুলোতে নারীদের ‘ফিটনেস সিলিং’ অনেক বেশি থাকে পুরুষদের তুলনায়। কারণ এখানে নারীরা বোহেমিয়ানভাবে ইচ্ছেমত ‘ঘুরে ফিরে বেড়াতে পারে, আর পুরুষেরা ‘গর্ভবতী’ থাকে (আক্ষরিক অর্থে নয়) অনেকটা সময় জুড়ে আর বাচ্চার তদারকের একটা বড় দায়িত্ব পালন করে। এই ধরনের প্রজাতিতে নারীরা অধিকতর সহিংস, আগ্রাসী এবং প্রতিযোগিতামূলক হয়ে থাকে[২০৯]। এই ব্যতিক্রমী উদাহরণ’গুলো থেকেও স্পষ্ট হয় যে, মূলত যৌনতার পার্থক্য তথা ফিটনেস ভ্যারিয়েন্সের কারণেই প্রাণিজগতে লিঙ্গভিত্তিক আগ্রাসনের পার্থক্য সূচিত হয়।]

আধুনিক বিশ্বেও পুরুষেরা সম্পদ আহরণের জন্য, ক্যারিয়ারের জন্য, অর্থ উপার্জনের জন্য মেয়েদের তুলনায় অধিকতর বেশি শক্তি এবং সময় ব্যয় করে। কারণ এর মাধ্যমে তারা নিশ্চিত করে অধিকসংখ্যক নারীর দৃষ্টি, এবং সময় সময় তাদের অর্জন এবং প্রাপ্তি। অর্থাৎ, একটা সময় পুরুষেরা নারীর দখল নিতে নিজেদের মধ্যে শারীরিক প্রতিযোগিতা আর দ্বন্দ্বযুদ্ধে নিজেদের নিয়োজিত রাখত, এখন সেটা পরিণত হয়েছে। অর্থ, বৈভব, ক্যারিয়ার তৈরির লড়াইয়ে। বিত্তশালী ছেলেরা বিএমডারু কিংবা রোলসরয়েসে চড়ে বেড়ায় নিজেদের বৈভবের মাত্রা প্রকাশ করতে, কিংবা হাতে ফ্যাশানেবল মোভাডো ঘড়ি কিংবা ব্র্যান্ডনেমের কেতাদুরস্ত কাপড় পরিধান করে, যার মাধ্যমে ‘শো অফ করে নিজেকে অন্য পুরুষদের চেয়ে যোগ্য হিসেবে প্রতিপন্ন করতে চায়। শুধু কেতাদুরস্ত কাপড়, গাড়ি কিংবা ঘড়ি নয় কথাবার্তা, চালচলন, স্মার্টনেস, শিক্ষাগত যোগ্যতা, রাজনৈতিক বা সামাজিক ক্ষমতা বা প্রতিপত্তি সবকিছুকেই পুরুষেরা ব্যবহার করে নারীকে আকর্ষণের কাজে। সেজন্যই বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, অর্থ-প্রতিপত্তি আর ক্ষমতায় বলীয়ান পুরুষেরাই বেশি পরকীয়ায় বেশি আসক্ত হন (এ নিয়ে সামনে আরও আলোচনা আসবে)। যৌনতার এই ধরনের পার্থক্যের কারণেই পুরুষেরা সামগ্রিকভাবে অধিকতর বেশি ঝুঁকি নেয়, ঝুঁকিপূর্ণ কাজকর্ম, পেশা কিংবা খেলাধুলায় (কার রেসিং, বাঙ্গি জাম্পিং কিংবা কিকবক্সিং) জড়িত হয় বেশি, একই ধারায় অপরাধজগতেও তারা প্রবেশ করে অধিক হারে। এর সত্যতা মিলে সহিংসতা নিয়ে গবেষকদের বাস্তব কিছু পরিসংখ্যানেও। সাড়া বিশ্বে যত খুন-খারাবি হয় তার শতকরা ৮৭ ভাগই হয় পুরুষের দ্বারা[২১০]। আমেরিকার মধ্যে চালানো জরিপে পাওয়া গেছে যে শতকরা ৬৫ ভাগ ক্ষেত্রে পুরুষ দ্বারা পুরুষ হত্যার ঘটনা ঘটে। শতকরা ২২ ভাগ ক্ষেত্রে পুরুষের হাতে নারী হত্যার ঘটনা ঘটে। খুন-খারাবির ১০ ভাগ ক্ষেত্রে নারী হত্যা করে পুরুষকে, আর মাত্র ৩ ভাগ ক্ষেত্রে নারী হত্যা করে নারীকে[২১১]। সারা বিশ্বে পুরুষদের হাতে পুরুষদের হত্যার হার আরও বহুগুণে বেশি পাওয়া গেছে ভিন্ন কিছু পরিসংখ্যানে। যেমন, ব্রাজিলে শতকরা ৯৭ ভাগ ক্ষেত্রে, স্কটল্যান্ডে ৯৩ ভাগ ক্ষেত্রে, কেনিয়ায় ৯৪ ভাগ ক্ষেত্রে, উগান্ডায় ৯৮ ভাগ ক্ষেত্রে এবং নাইজেরিয়ায় ৯৭ ভাগ ক্ষেত্রে পুরুষ কর্তৃক পুরুষের হত্যার ঘটনা ঘটে থাকে[২১২]। এর মাধ্যমে পুরুষ-পুরুষ প্রতিযোগিতা, দ্বন্দ্ব, সংঘাত এবং জিঘাংসার বিবর্তনীয় অনুকল্পই সঠিক বলে প্রমাণিত হয়।

গড়পড়তা নারীরা পুরুষদের চেয়ে কম ঝুঁকি নেয়। বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানী এনি ক্যাম্পবেল (Anne Campbell) মনে করেন, অনর্থক ঝুঁকি নেওয়ার ব্যাপারগুলো মেয়েদের জন্য কোনো রিপ্রোডাক্টিভ ফিটনেস প্রদান করে না[২১৩]। আদিম কাল থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত হয়ে নিজের জীবন বিপন্ন করার চেয়ে মেয়েরা বরং সন্তানদের দেখভাল করায় অর্থাৎ জিনপুল রক্ষায় নিয়োজিত থেকেছে বেশি। অনেক গবেষকই মনে করেন, মেয়েরা যে কারণে পুরুষদের মতো ঘন ঘন সঙ্গী বদল করে না, ঠিক সেকারণেই তারা ঝুঁকিপূর্ণ কাজেও জড়িত হয় কম, কারণ, বিবর্তনগত দিক থেকে সেগুলো কোনো প্রজননগত উপযোগিতা (reproductive benefit) প্রদান করে না। এ কারণেই মেয়েদের মানসজগৎ কম প্রতিযোগিতামূলক এবং সর্বোপরি কম সহিংস হিসেবে গড়ে উঠেছে। যে কোনো সংস্কৃতি খুঁজলেই দেখা যাবে, নৃশংস খুনি বা সিরিয়াল কিলার পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে একেবারেই কম, ঠিক যে কারণে পর্নোগ্রাফির প্রতি আসক্তি মেয়েদের মধ্যে কম থাকে পুরুষের তুলনায়।

.

কেন ক্ষমতাশালী পুরুষেরা বেশি পরকীয়ায় আসক্ত হয়?

বিল ক্লিন্টন ২৪ বছর বয়স্ক মনিকা লিউনেস্কির সাথে নিজের অফিসে দৈহিক সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর। ১৯৯৮ সালের ২১ শে জানুয়ারি তা মিডিয়ার প্রথম খবর হিসেবে সারা বিশ্বে প্রচারিত হয়ে যায়।

চিত্র। পেজ ১৯১

চিত্র : মনিকা লিউনস্কি এবং বিল ক্লিন্টন

অনেকেই অবাক হলেও অবাক হননি ডারউইনীয় ইতিহাসবিদ লরা বেটজিগ (Laura Betzig)। তিনি প্রায় বিশ বছর ধরে ডারউইনীয় দৃষ্টিকোণ থেকে রাজনীতিবিদদের কিংবা প্রভাবশালী চালচিত্র নিয়ে গবেষণা করে যাচ্ছিলেন[২১৪, ২১৫]। খবরটা শোনার পর তার প্রথম প্রতিক্রিয়াই ছিল, “কী, বলেছিলাম না?”[২১৬]। তার এহেন প্রতিক্রিয়ার কারণ আছে। তিনি বহুদিন ধরেই বলার চেষ্টা করছিলেন যে, ইতিহাসে প্রভাবশালী এবং প্রতিপত্তিশালী পুরুষেরা তাদের ‘বৈধ’ স্ত্রীর পাশাপাশি সব সময়ই চেষ্টা করেছে অধিক সংখ্যক নারীর দখল নিতে এবং তাদের গর্ভে সন্তানের জন্ম দিতে। ইতিহাসে রাজা বাদশাহদের রঙ-বেরঙের জীবনকাহিনি পড়লেই দেখা যাবে, কেউ রক্ষিতা রেখেছেন, কেউ দাসীর সাথে সম্পর্ক করেছিলেন, কেউ বা হারেম ভর্তি করে রেখেছিলেন অগণিত সুন্দরী নারীতে। সলোমনের নাকি ছিল তিনশো পত্নী, আর সাত হাজার উপপত্নী। মহামতি আকবরের হারেমে নাকি ছিল ৫০০০-এর ওপর নারী। ফিরোজ শাহ নাকি তার হারেমে প্রতিদিন তিনশ নারীকে উপভোগ করতেন। মরোক্কান সুলতান মৌলে ইসমাইলের হারেমে দুই হাজারের উপরে নারী ছিল, এবং ইসমাইল সাহেব বৈধ অবৈধ সব মিলিয়ে এক হাজারের উপর সন্তান-সন্ততি তিনি পৃথিবীতে রেখে গেছেন[২১৭]। রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার, দ্বিগবিজয়ী আলেকজান্ডার কিংবা চেঙ্গিসখান (এবং তার বংশধরদের) নারী-লালসার কথাও সর্বজনবিদিত। তাদের সন্তান-সন্তদিদের সংখ্যাও অসংখ্য[২১৮]। এর মাধ্যমে একটি নির্জলা সত্য বেরিয়ে আসে, ইতিহাসের ক্ষমতাশালী পুরুষেরা তাদের প্রজননগত সফলতার (reproductive success) মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছিল বহুনারীর দখলদারিত্বকে। আজকে আমরা যতই ‘মনোগামিতা’র বিজয়কেতন উড়াই না কেন, পুরুষের ক্ষমতা বৃদ্ধির সাথে বহুগামিতার প্রকাশ ঘটে বহু ক্ষেত্রেই খুব অনিবার্যভাবে। কিংবা আরও পরিষ্কার করে বললে বলা যায়, মানসিকভাবে বহুগামী পুরুষেরা নারীদের আকর্ষণ এবং ভোগ করার আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত করতে পারে যদি তাদের হাতে পর্যাপ্ত যশ, প্রতিপত্তি আর ক্ষমতা থাকে।

চিত্র। পেজ ১৯৩

চিত্র : শোয়ার্সনেগার এবং তার স্ত্রী মারিয়া শ্রাইভারের দীর্ঘ পঁচিশ বছরের বৈবাহিক সম্পর্ক এখন কেবলই স্মৃতি।

আমি যখন এ বইয়ের জন্য এই অংশটি তৈরি করছি, তখন এ মুহূর্তে দুটি ঘটনা নিয়ে আমেরিকান মিডিয়া তোলপাড়। একটি হচ্ছে প্রভাবশালী ফরাসি অর্থনীতিবিদ, আইনবিদ এবং রাজনীতিবিদ, আইএমএফ-এর প্রধান ডমেনিক স্ট্রাউস কান আমেরিকায় এসে হোটেলে থাকাকালীন অবস্থায় হোটেলের এক পরিচারিকাকে (ক্লিনার) যৌননির্যাতন করে গ্রেফতার হয়েছেন। ডমেনিক স্ট্রাউস কান বিবাহিত এবং চার সন্তানের পিতা। তাকে আগামী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছিল। এই ডমেনিক স্ট্রাউস কান যখন হোটেলে এই বিদঘুটে ঘটনা ঘটিয়ে বমাল আমেরিকা ত্যাগ করছিলেন, তখন তাকে প্লেন থেকে নামিয়ে গ্রেফতার করা হয়। ডমেনিক স্ট্রাউসের এই নিন্দনীয় ঘটনায় যখন মিডিয়া ব্যতিব্যস্ত, ঠিক একই সময় দ্বিতীয় আরেকটি ঘটনা চলে এল মিডিয়ার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। ক্যালিফোর্নিয়ার ভূতপূর্ব গভর্নর এবং খ্যাতিমান অভিনেতা আর্নল্ড শোয়ার্সনেগার এবং তার স্ত্রী মারিয়া শ্রাইভারের দীর্ঘ পঁচিশ বছরের বৈবাহিক সম্পর্ক ভেঙে গেছে। প্রথম প্রথম মনে হচ্ছিল দুজনের রাজনৈতিক মনোমালিন্যতার কারণেই কিংবা বনিবনা হচ্ছে না বলেই বুঝি পারস্পরিক বোঝাঁপড়ার ভিত্তিতে সম্পর্কের ইতি টানতে চাইছেন তারা। কিন্তু কয়েকদিন পরেই মিডিয়ায় চলে আসল আসল খবর। আর্নল্ড শোয়ার্সনেগার বিবাহিত সম্পর্কের বাইরে তার বাসার গৃহপরিচারিকার সাথে যৌনসম্পর্ক ছিল। শুধু তাই নয় তাদের এই সম্পর্কের ফলশ্রুতিতে একটি সন্তানও জন্মেছিল ১৪ বছর আগে। আর সেই সন্তানটি জন্মেছিল তার এবং তার স্ত্রী মারিয়ার ছোট সন্তানের জন্মের এক সপ্তাহের মধ্যে।

এ দুটি ঘটনা নতুন করে পুরনো ধাঁধাটিকে সামনে নিয়ে এল। কেন ক্ষমতাশালী পুরুষেরা বেশি পরনারীতে আসক্ত হয়, কেন অর্থ, যশ, প্রতিপত্তি বাড়ার সাথে সাথে তাদের অনেকেরই বেলাল্লাপনা পাল্লা দিয়ে বাড়ে? তারা সামাজিক এবং রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন থাকেন, সমাজ এবং সম্মান নিয়ে তাদের চলাফেরা করতে হয় অহর্নিশি, তাদেরই বরং মান সম্মানের ব্যাপারে অনেক সচেতন থাকার কথা। তা না হয়ে উলটোটাই কেন ঘটতে দেখা যায়? কেন বড় বড় রাজনৈতিক নেতারা সামান্য একটি এফেয়ার’ করতে গিয়ে এমন সব ঝুঁকি নেন, যা শেষ পর্যন্ত তাদের পতন ডেকে আনে? ব্যাপারটি পর্যালোচনা করতে গিয়ে স্বনামখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন এই সপ্তাহে একটি কভারস্টোরি করেছে তাদের পত্রিকায়– “Sex. Lies. Arrogance. What Makes Powerful Men Act Like Pigs’ নামের উত্তেজক একটি শিরোনামে–

চিত্র। পেজ ১৯৫

চিত্র :টাইম ম্যাগাজিনের এ সপ্তাহের (৩০ মে, ২০০১) ইস্যুর প্রচ্ছদ

টাইম ম্যাগাজিনের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ন্যান্সি গিবসের এ প্রবন্ধে খুব স্পস্ট করেই বলা হয়েছে[২১৯]—

মনোবিজ্ঞানের একটি গবেষণা থেকে জানা গেছে ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা রাজনৈতিক ক্ষমতার ক্ষেত্রে যারা মূলত শীর্ষস্থান অধিকার করে থাকেন, তাদের মধ্যেই পরকীয়ার সম্ভাবনা বেশি। ক্ষমতা কেবল একা আসে না, ক্ষমতার সাথে সাথে দুটি জিনিস অনিবার্য ভাবে চলে আসে সুযোগ এবং আত্মবিশ্বাস। বলাবাহুল্য, সুযোগ আর আত্মবিশ্বাসের ব্যাপারটা বহুসময়ই সমাজে পরিস্ফুট হয় যৌনতার মাধ্যমে। যদি প্রতিপত্তি আর ক্ষমতা যৌনতার সুযোগকে অপরিবর্তনীয়ভাবে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসে, বহু পুরুষই তার সদ্ব্যবহার করে। বিবর্তনীয় বিজ্ঞানীরা বলেন, হঠাৎ আসা ক্ষমতা আর প্রতিপত্তি অনেক সময়ই মানুষের আত্মসংযমের দেওয়ালকে অকেজো করে সামাজিকীকরণের স্তরকে ক্ষয়িষ্ণু করে তুলতে পারে।

এটি নিঃসন্দেহে আশাপ্রদ যে, সমাজের যে অভিব্যক্তিগুলো ডারউইনীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিজ্ঞানীরা দেখবার চেষ্টা করছিলেন বিগত কয়েক বছর ধরে, তার প্রতিফলন আমরা ধীরে ধীরে দেখতে পাচ্ছি পপুলার মিডিয়াতেও। কিছুদিন আগ পর্যন্ত ডারউইনীয় বিশ্লেষণকে বাইরে রেখেই কাজ করতেন সমাজবিজ্ঞানীরা এবং নৃতত্ত্ববিদেরা। এখন সময় পাল্টেছে। লরা বেটজিগ, নেপোলিয়ন চ্যাংনন, ডেভিড বাস, মার্টিন ড্যালি, মার্গো উইলসন সহ বহু বিজ্ঞানীদের ক্রমিক গবেষণার ফলশ্রুতিতে ধীরে ধীরে বোঝা যাচ্ছে যে ডারউইনীয় বিশ্লেষণকে আর বাইরে রাখা যাচ্ছে না, সেটা সমাজ বিজ্ঞানই হোক, নৃতত্ত্বই হোক, কিংবা হোক নিরস ইতিহাস বিশ্লেষণ। সমকালীন ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণেও ডারউইন চলে আসছে অবলীলায়। টাইম ম্যাগাজিনে ন্যান্সি গিবসের প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রবন্ধে বিবর্তনীয় বিজ্ঞানীরদের কাজের উল্লেখ তারই একটি শক্তিশালী প্রমাণ। টাইম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত ন্যান্সি গিবসের সেই সম্পাদকীয়তে একটি চার্টও সংযোজিত হয়েছে, ‘দ্য মিসকন্ডাক্ট ম্যাট্রিক্স’ নামে। সেই চার্টটি দেখলেই পাঠকেরা বুঝবেন, কেবল বিল ক্লিন্টনকে দিয়েই আমেরিকায় নারী লোলুপতা কিংবা পরকীয়ার অধ্যায় শুরু হয়নি, শুরু হয়েছিল বহু আগেই।

আমেরিকার তৃতীয় প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসনের দাসীর সাথে সম্পর্ক করে ‘অবৈধ’ সন্তানের পিতা হয়েছিলেন। আমেরিকার বিগত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় ডেমক্রেটিক দলের অন্যতম প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জন এডোয়ার্ডস এবং তার ক্যাম্পেইনের ভিডিও-ক্যামেরাম্যান হান্টারের সাথে অবৈধ সম্পর্কের খবর ফাঁস হয়ে গেলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। এর আগে একই ধরনের কাজ,

চিত্র। পেজ ১৯৬

চিত্র : টাইম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত মিসকন্ডাক্ট ম্যাট্রিক্স– আমেরিকায় ক্ষমতাধর মানুষদের নারীলোলুপতার চালচিত্র

অর্থাৎ নিজের স্ত্রীকে ফেলে পরনারীর পেছনের ছুটেছিলেন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জন ম্যাকেইন কিংবা নিউইয়র্কের গভর্নর রুডি জুলিয়ানি। তারা অবশ্য নিজের প্রেমিকাকে পরে বিয়ে করে নিজের অবৈধ সম্পর্ককে বৈধ করতে পেরেছেন জনগণের সামনে। আগামী ২০১২-এর নির্বাচনেও রিপাবলিকান পদপ্রার্থী হিসেবে আছেন ভুতপূর্ব হাউজ-স্পিকার নিউট গিংরিচ, যিনি ইতোমধ্যেই তিনটি বিয়ে করেছেন, প্রতিবারই স্ত্রী থাকা অবস্থায় অপর নারীর সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছেন, এবং শেষমেষ পুরনো স্ত্রীকে ছেড়ে নতুন প্রেমিকাকে ঘরে তুলেছেন। তাতে অবশ্য কোনো সমস্যা ছিল না, যদি না ফাঁস হয়ে যেত যে, তিনি যে সময়টাতে ক্লিটননের অবৈধ কুকর্মের বিরুদ্ধে সদা-সোচ্চার ছিলেন, এবং ক্লিন্টনের ইম্পিচমেন্টে মূল উদ্যোগী ভূমিকা নিয়েছিলেন, সেই গিংরিচ নিজেই তখন অ্যাফেয়ার করে বেড়াচ্ছিলেন তার চেয়ে ২৩ বছরের ছোট এক হাউজ অব রিপ্রেসেন্টেটিভ স্টাফের সাথে। অবশ্য এগুলো কোনোটাই আমেরিকার রাজনীতিতে তাদের ফেরৎ আসতে তাদের বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি, কারণ তারা সকলেই তাদের নিজেদের দাবিমত পূর্বের ভুল হতে শিক্ষা নিয়েছেন। যা হোক, টাইমের ‘দ্য মিসকন্ডাক্ট ম্যাট্রিক্স’-এ আছে থমাস জেফারসন থেকে শুরু করে জন এফ জেনেডি, বিল ক্লিন্টন, এলিয়ট স্পিটজার, আর্নল্ড শোয়ার্সনেগার, জন এডওয়ার্ডস, নিউট গিংরিচ, উডি এলেন, মাইক টাইসন, রোমান পোলান্সকি, টেড হ্যাগার্ড, টাইগার উডস-সহ বহু রথী-মহারথীদের নাম যারা ক্ষমতা, যশ আর প্রতিপত্তির স্বর্ণশিখরে বসে পরকীয়ায় আকণ্ঠ নিমগ্ন ছিলেন।

আমাদের দেশেও আমরা দেখেছি প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি বা বিত্তশালীরা কীভাবে ক্ষমতা আর প্রতিপত্তিকে নারীলোলুপতার উপঢৌকন হিসেবে ব্যবহার করেছেন। শুধু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার শীর্ষে থাকা পুরুষেরা নয়, অর্থ বিত্ত বৈভবে শক্তিশালী হয়ে উঠলে সাধারণ পুরুষেরাও কীভাবে আকর্ষণীয় নারীর দখলে উন্মুখ হয়ে উঠতে পারে তা চোখ-কান খোলা রেখে পর্যবেক্ষণ করলে এর সত্যতা মিলে।

বিত্তশালীরা যে কাজটি বাংলাদেশে করেছেন সে ধরনের কাজ পশ্চিমা বিশ্বে পুরুষেরা বহু দিন ধরেই করে আসছেন। পাশ্চাত্যবিশ্বকে ‘মনোগোমাস’ বা একগামী হিসেবে চিত্রিত করা হলেও, খেয়াল করলে দেখা যাবে সেখানকার পুরুষেরা উদার বিবাহবিচ্ছেদ আইনের (Liberal divorce laws) মাধ্যমে[২২০] একটার পর একটা স্ত্রী বদল করেন। ব্যাপারটাকে অনেকেই ‘সিরিয়াল পলিগামি’[২২১] (তারা আইনকানুনের বাধ্যবাধকতার কারণে একই সাথে একাধিক স্ত্রী রাখতে পারেন না, কিন্তু বিবাহবিচ্ছেদের মাধ্যমে একের পর এক সঙ্গী পরিবর্তন করেন) হিসেবে অভিহিত করেছেন। সিএনএন এর প্রাইম টাইম নিউজ হোস্ট ল্যারি কিং ইতোমধ্যেই আটটি বিয়ে (সিরিয়ালি) করেছেন। আমাদের বিবর্তনের পথিকৃৎ সুদর্শন রিচার্ড ডকিন্সও তিনখানা বিয়ে সেরে ফেলেছেন সিরিয়ালি। অবশ্য মেয়েদের মধ্যেও এ ধরনের উদাহরণ দেয়া যাবে। যেমন- হলিউডের একসময়কার জনপ্রিয় অভিনেত্রী অধুনা পরলোকগত এলিজাবেথ টেলর (যিনি আটবার সঙ্গীবদল করেছেন), কিন্তু তারপরেও পরিসংখ্যানে পাওয়া যায় যে, পশ্চিমা বিশ্বে প্রভাবশালী পুরুষেরাই সাধারণত খুব কম সময়ের মধ্যে একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করেন, নারীদের মধ্যে এই প্রবণতা তুলনামূলকভাবে কম। অর্থাৎ, ‘সিরিয়াল পলিগামি’র চর্চা পুরুষদের মধ্যেই বেশি, এবং ক্ষমতা আর প্রতিপত্তি অর্জনের সাথে সাথে সেটা পাল্লা দিয়ে বাড়ে।

[পুরুষের স্ট্যাটাস এবং বহুগামিতার সম্পর্ক সাধারণ দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, ধনী-গরিব সকলেই তো পরকীয়া করে। বস্তিবাসী দিনমজুর রিক্সাওয়ালা রহিমুদ্দিন যেমনি করে, তেমনি করে বিল ক্লিন্টনও। তাই ক্ষমতাশালী হলেই বেশি পরকীয়া করবে, তা সত্য নয় বলে মনে হতে পারে। কিন্তু যে ব্যাপারটা আমার আলোচনার উপজীব্য তা হলো– ব্যাপকহারে নারীলোলুপতা বাস্তবায়িত করতে হলে রাজনৈতিক, সামাজিক বা অর্থনৈতিকভাবে যথেষ্ট ক্ষমতাশালী হওয়া চাই। অর্থাৎ, ক্ষমতার শীর্ষে থাকলে কিংবা ক্ষমতাশালী হয়ে উঠলে সেই পুরুষালি লালসা পরিস্ফুটনের সুযোগ থাকে বেশি, ব্যাপারটা ত্বরান্বিত হয় অনেক ক্ষেত্রেই। আকবরের পক্ষেই সম্ভব ছিল ৫০০০ নারীর হারেম পোর, কিংবা সুলতান মৌলে ইসমাইলের পক্ষেই সম্ভব ছিল ১০৪২জন সন্তান-সন্ততি ধরাধামে রেখে যাওয়ার, সহায়সম্বলহীন রহিমুদ্দিনের পক্ষে নয়। এখন বিবর্তনের যাত্রাপথের এই সিমুলেশনগুলো বার বার করা হলে দেখা যাবে, সম্পদের সাথে মেটিং স্ট্র্যাটিজির একটা সম্পর্ক বেড়িয়ে আসছে। বিবর্তন মনোবিজ্ঞানীরা বহু সমাজে এর প্রতিফলন লক্ষ্য করেছেন। ক্ষমতাশালী পুরুষেরা বহুগামিতায় যেমন আসক্ত হতে চায়, তেমনি আবার মেয়েরা উঁচু স্ট্যাটাসের পুরুষদের ‘মেটিং পার্টনার হিসেবে পছন্দ করে। এর সত্যতা ভেনিজুয়ালার আদিম ইয়ানোমামো (Yanomamo), প্যারাগুয়ের আহকে (Ache), বৎসোয়ানার কাঙ (!Kung) এর মতো আদিম শিকারি সংগ্রাহক সমাজগুলোতে যেমন পাওয়া গিয়েছে, তেমনি তা পাওয়া গেছে আধুনিক সমাজের বিভিন্ন দেশেই। যেমন, তাইওয়ানের মেয়েরা মেয়েদের স্ট্যাটাসের চেয়ে ছেলেদের স্ট্যাটাসকে ৬৩% বেশি গুরুত্ব দেয়, জাম্বিয়ায় সেটা ৩০% বেশি, জার্মানিতে ৩৮% বেশি, ব্রাজিলে ৪০% বেশি ইত্যাদি[২২২]। আমেরিকার কলেজ ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে চালানো বিভিন্ন সমীক্ষা থেকেও দেখা গেছে মেয়েরা সম্পর্কের ক্ষেত্রে ছেলেদের সামাজিক পদমর্যাদাকে খুব গুরুত্ব দিয়ে বিচার করে[২২৩,২২৪]। তাই সম্পদ আহরণ, আর স্ট্যাটাসের সাথে পুরুষ নারীর মেটিং স্ট্র্যাটিজির জোরালো সম্পর্ক আছে বলেই বিবর্তন মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন। অর্থাৎ, বিবর্তনীয় পথপরিক্রমায় দেখলে দেখা যাবে, সমাজের প্রতিপত্তিশালী পুরুষেরাই বহু এবং কাক্ষিত নারীর দখল নিতে পেরেছে কিংবা পারছে, আবার অন্য দিকে নারীরাও প্রভাবশালী পুরুষদের মেটিং পার্টনার হিসেবে নির্বাচিত করতে চাইছে। ইতিহাস নির্মোহভাবে পর্যালোচনা করলেও সেটার সত্যতাই খুঁজে পাওয়া যায়। সেজন্যই পুরুষেরা ধন সম্পদ আহরণে, কিংবা নিজের খ্যাতি যশ, ধন সম্পদ আর স্ট্যাটাস বাড়ানোর জন্য নিরন্তর প্রতিযোগিতা করে, নারীরাও অন্যদিকে এ ধরনের যশস্বী প্রতিপত্তিশালী লোকজনকে আকর্ষণীয় মনে করে।

ক্ষমতা বাড়িয়ে অধিক নারীর দখল নেওয়া সম্ভবত পুরুষদের মেটিং স্ট্র্যাটিজি ছিল বরাবরই। যারা এই স্ট্রাটিজিতে সফল হয়েছে, তারাই অধিক হারে নারীর দখল নিতে পেরেছে, আর বহু সন্তান-সন্ততি রেখে গেছে। যেমন মৌলে ইসমাইল এক হাজারের উপর সন্তান সন্ততি রেখে গিয়েছিলেন হারেমের অসংখ্য নারীর গর্ভে গর্ভসঞ্চারের মাধ্যমে। চেঙ্গিস খান আর বংশধরেরা বিভিন্ন দেশে যুদ্ধজয়ের পরে এমনই ধর্ষণ করেছিলেন যে, এশিয়ার প্রায় ৮% জনসংখ্যার মধ্যে তাদের জিন ট্রাক করা যায় এখনও। শুনতে হয়তো খারাপ লাগবে, কিন্তু যে স্ট্র্যাটিজিগুলো ক্ষমতাবান পুরুষেরা একসময় ব্যবহার করেছিল তাদের প্রজননগত সফলতা ত্বরান্বিত করতে, সেগুলোর ছাপ আধুনিক সমাজেও পাওয়া যায়। সেজন্যই আদিম শিকারি-সংগ্রাহক ট্রাইব থেকে শুরু করে আলেকজান্ডার, চেঙ্গিসখান থেকে আধুনিক সমাজের বিল ক্লিন্টন, ডমেনিক স্ট্রাউস কান, আর আর্নল্ড শোয়ার্সনেগারদের মতো ক্ষমতাশালীদের আচরণে এটাই বোঝা যায় যে ক্ষমতার সাথে বহুগামিতার জোরালো সম্পর্ক অতীতেও ছিল, এখনও আছে।]

একটি ব্যাপারে এখানে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। উপরের আলোচনা থেকে কেউ যদি ধরে নেন, ক্ষমতাশালী হলেই সবাই পরকীয়ায় আসক্ত হবেন কিংবা নারীলোলুপ হয়ে যাবেন, তা কিন্তু ভুল হবে। আমাদের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এরশাদের নামে যে রকম নারী কেলেঙ্কারীর অপবাদ ছিল, বাংলাদেশের অন্য অনেক রাষ্ট্রপতিরদের ক্ষেত্রে তা ছিল না। অথচ সকলেই ছিলেন একইরকমভাবেই বাংলাদেশের ক্ষমতার শীর্ষে। আমেরিকায় রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন সময়ে বিল ক্লিন্টন মনিকার সাথে যা করেছেন বুশ কিংবা ওবামা তা করেননি। ক্ষমতা থাকলেই কেউ এরশাদের মতো নারীলোলুপ হয় না, খুব সত্যি কথা। কিন্তু এরশাদ সাহেবের মতো নারীলোলুপতা বাস্তবায়িত করতে হলে বোধ করি রাজনৈতিক, সামাজিক বা অর্থনৈতিকভাবে যথেষ্ট ক্ষমতাশালী হওয়া চাই। অর্থাৎ, ক্ষমতার শীর্ষে থাকলে কিংবা ক্ষমতাশালী হয়ে উঠলে সেই ‘পুরুষালি লালসা’ পুরিস্ফুটনের সুযোগ থাকে বেশি, ব্যাপারটা ত্বরান্বিত হয় অনেক ক্ষেত্রেই। আকবরের পক্ষেই সম্ভব ছিল ৫০০০ নারীর হারেম পোর, কিংবা সুলতান মৌলে ইসমাইলের পক্ষেই সম্ভব ছিল ১০৪২জন সন্তান-সন্ততি ধরাধামে রেখে যাওয়ার; সহায়সম্বলহীন রহিমুদ্দিনের পক্ষে নয়। সেজন্যই সাতোসি কানাজাওয়া তার বইয়ের ‘গাইস গন ওয়াইল্ড’ অধ্যায়ে বলেছেন–

Powerful men of high status throughout the history attained very high reproductive success, leaving a large number of offspring (legitimate or otherwise), while countless poor men in the country died mateless and childless. Moulay Ismail the Bloodthirsty stands out quantitively, having left more offspring than anyone else on record, but he was by no means qualitatively different from other powerful men, like Bill Clinton.

বিভিন্ন ধর্মীয় চরিত্র এবং ধর্ম প্রচারকদের জীবনী বিশ্লেষণ করলেও এই অনুকল্পের সত্যতা মিলবে। পদ্মপুরাণ অনুসারে (৫/৩১/১৪) শ্রীকৃষ্ণের স্ত্রীর সংখ্যা ষোল হাজার এক শ। এদের সকলেই যে গোপবালা ছিলেন তা নয়, নানা দেশ থেকে সুন্দরীদের সংগ্রহ করে তার হারেমে’ পুরেছিলেন কৃষ্ণ স্বীয় ক্ষমতার আস্ফালনে। হিন্দু ধর্মের ক্ষমতাবান দেবচরিত্রগুলো ইন্দ্র থেকে কৃষ্ণ পর্যন্ত প্রত্যেকেই ছিলেন ব্যভিচারী; ক্ষমতাবান ব্রাহ্মণ মুনিঋষিরা যে ছিল কামাসক্ত, বহুপত্নীক এবং অজাচারী–এগুলো তৎকালীন সাহিত্যে চোখ রাখলেই দেখা যায়। এই সব মুনিঋষিরা ক্ষমতা, প্রতিপত্তি আর জাত্যাভিমানকে ব্যবহার করতেন একাধিক নারীদখলের কারিশমায়। ইসলামের প্রচারক মুহম্মদ যখন প্রথম জীবনে দরিদ্র ছিলেন, প্রভাব প্রতিপত্তি তেমন ছিল না, তিনি খাদিজার সাথে সংসার করেছিলেন। খাদিজা ছিলেন বয়সে মুহম্মদের ১৫ বছরের বড়। কিন্তু পরবর্তী জীবনে মুহম্মদ অর্থ, বৈভব এবং সমরাঙ্গনে অবিশ্বাস্য সফলতা অর্জন করার পর অপেক্ষাকৃত কম বয়সি সুন্দরী নারীদের প্রতি আকৃষ্ট হন। খাদিজা মারা যাওয়ার সময় মহানবির বয়স ছিল ৪৯। সেই ৪৯ থেকে ৬৩ বছর বয়সে মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি কমপক্ষে হলেও ১১ টি বিয়ে করেন[২২৫]। এর মধ্যে আয়েশাকে বিয়ে করেন আয়েশার মাত্র ৬ বছর বয়সের সময়। এ ছাড়া তার দত্তক পুত্র যায়েদের স্ত্রী জয়নবের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তাকে বিয়ে করেন (সে সময় আরবে দত্তক পুত্রের স্ত্রীকে বিয়ে করার রীতি প্রচলিত ছিল না, কিন্তু মুহম্মদ আল্লাহকে দিয়ে কোরানের ৩৩:৪, ৩৩:৩৭, ৩৩:৪০ সহ প্রভৃতি আয়াত নাজিল করিয়ে নেন); এ ছাড়া ক্রীতদাসী মারিয়ার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন (সে সময় তিনি হাফসাকে ওমরের বাড়ি পাঠিয়েছিলেন বলে কথিত আছে[২২৬]) যা হাফসা এবং আয়েশাকে রাগান্বিত করে তুলেছিল; যুদ্ধবন্দি হিসেবে জুয়ারিয়া এবং সাফিয়ার সাথে সম্পর্ক পরবর্তীতে নানা রকম বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিভিন্ন পথে নারীর দখল নিতে মুহম্মদ আগ্রহী হয়েছিলেন তখনই যখন তার অর্থ প্রতিপত্তি আর ক্ষমতা বেড়ে গিয়েছিল বহুগুণে।

প্রভূত ক্ষমতা এবং যশ মানুষকে অনৈতিক করে তোলে। কিংবা কথাটা ঘুরিয়েও বলা যায়–অনৈতিকতা এবং ভোগলিঙ্গকে চরিতার্থ করতে পারে মানুষ, যদি তার হাতে প্রভুত ক্ষমতা কুক্ষিগত থাকে। এটা বুঝতে কারো রকেট সায়েন্টিস্ট হতে হয় না। সেজন্যই টাইম ম্যাগাজিনের আলোচিত ‘Sex. Lies. Arrogance. What Makes Powerful Men Act Like Pigs’ নামের সম্পাদকীয়টিতে উল্লেখ করেছেন ন্যান্সি গিবস–

ক্ষমতাধর মানুষেরা ভিন্নভাবে ঝুঁকি নিতে চায় অনেকটা নার্সিসিস্টদের মতোই। তারা মনে করতে শুরু করে সমাজের সাধারণ নিয়মকানুনগুলো আর তাদের জন্য প্রযোজ্য নয়। ধরাকে সরা জ্ঞান করতে শুরু করে তারা। আর মরার উপর খাড়ার ঘা হয়ে সে সময় তাদেরকে ঘিরে থাকে তার পরম হিতৈষী অনুরাগী, স্তাবক আর কর্মীরা, যারা নিজেদের বিভিন্ন রাজনৈতিক এবং সামাজিক উদ্দেশ্য হাসিলের লক্ষ্যে ক্ষমতাধারী মানুষটিকে রক্ষা করে যায়, তার করা অপরাধকে ঢেকে রাখতে চায়, আর তার অনৈতিক ব্যাপার স্যাপারগুলোকে নানাভাবে ন্যায্যতা দিতে সচেষ্ট হয়।

লর্ড একটন বহু আগেই বলে গিয়েছিলেন— “Absolute power corrupts absolutely’। এই ব্যাপারটা এতোটাই নির্জলা সত্য যে এ নিয়ে কেউ আলাদা করে চিন্তা করার প্রয়োজন মনে করেননি। কিন্তু কেন নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রায়ই নিরঙ্কুশ দুর্নীতির জন্ম দেয়, কেন তৈরি করে এরশাদের মতো লুলপুরুষ? এগুলোর উত্তর সৌভাগ্য কিংবা দুর্ভাগ্যজনকভাবে লুকিয়ে রয়েছে সমাজ এবং ইতিহাসের বিবর্তনবাদী বিশ্লেষণের মধ্যেই।

.

তাহলে নারীদের পরকীয়ার জৈবিক ব্যাখ্যা কী?

নারী পুরুষ উভয়ের মধ্যেই যেমন একগামিতা দৃশ্যমান, তেমনি দৃশ্যমান বহুগামিতাও। নারী পুরুষ উভয়ের মধ্যেই লংটার্ম বা দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক করার মনোবাসনা যেমন আছে, তেমনি সুযোগ এবং পরিস্থিতি বিবেচনায় উঠে আসে শর্টটার্ম বা স্বল্পমেয়াদি সম্পর্কের মনোবাঞ্ছাও। পুরুষের মধ্যে বহুগামিতা বেশি, কারণ অতীতের শিকারি-সংগ্রাহক সমাজে শক্তিশালী এবং প্রতিপত্তিশালী পুরুষেরা যেভাবে নারীর দখল নিত, সেটার পর্যাক্রমিক ছাপ এখনও ক্ষমতাশালী পুরুষদের মধ্যে লক্ষ্য করলে পাওয়া যায়। কিন্তু তার মানে এই নয় যে নারীরা রকীয়া করে না, কিংবা তাদের মধ্যে বহুগামিতা নেই। এই অধ্যায়ের আগের অংশে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে যে, প্রভাবশালী কিংবা ক্ষমতাশালী পুরুষেরা যেমন পরকীয়া করতে উন্মুখ থাকে, তেমনি, ক্ষমতাশালী কিংবা প্রভাবশালী পুরুষের স্ট্যাটাস আবার নারীর কাছে পছন্দনীয়। কোনো নারীর বর্তমান সঙ্গীর চেয়ে যদি তার প্রেমিকের পদমর্যাদা বা স্ট্যাটাস ভালো হয়, কিংবা প্রেমিক দেখতে শুনতে অধিকতর সুদর্শন হয়, কিংবা যে সমস্যাগুলো নিয়ে একটি নারী তার পার্টনার কিংবা স্বামীর সাথে অসন্তুষ্ট, সেগুলোর সমাধান যদি তার প্রেমিকের মধ্যে খুঁজে পায়, নারী পরকীয়া করে। তাই আমেরিকায় আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার, নিউট গিংরিচ, বিল ক্লিন্টন কিংবা বাংলাদেশেহুসেইন মুহম্মদ এরশাদ কিংবা হুমায়ুন আহমদে যখন পরকীয়া করতে চেয়েছে, তারা সেটা করতে পেরেছে, কারণ নারীরাও তাদের মতো যশস্বী কিংবা ‘হাই স্ট্যাটাসের’ কেউকেটাদের সাথে সম্পর্ক করতে প্রলুব্ধ হয়েছে। নারীর আগ্রহ, অনুগ্রহ কিংবা চাহিদা ছাড়া পুরুষের পক্ষে পরকীয়া করা সম্ভব নয়, এটা বলাই বাহুল্য।

আগেই বলেছি লং টার্ম এবং শর্ট টার্ম স্ট্র্যাটিজি নারী পুরুষ সবার মধ্যেই আছে। বহু কারণেই এটি নারী পরকীয়া করতে পারে, আগ্রহী হতে পারে বহুগামিতায়। নারীর পরকীয়ার এবং বহুগামিতার ব্যাপারে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অনুকল্প বা হাইপোথিসিস প্রস্তাব করেছেন বিজ্ঞানীরা, এর মধ্যে রয়েছে রিসোর্স হাইপোথিসিস, জেনেটিক হাইপোথিসিস, মেট সুইচিং হাইপোথিসিস, মেট স্কিল একুজেশন হাইপোথিসিস, মেট ম্যানুপুলেশন হাইপথিসিস ইত্যাদি[২২৭]। দু-একটি বিষয় এখানে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।

জৈবিক কারণেই অসতর্ক কিংবা অপরিকল্পিত যৌনসম্পর্কের ক্ষেত্রে (casual sex) নারীরা পুরুষদের মতো প্রজননগত উপযোগিতা পায় না। তারপরেও নারীরা পরকীয়া করে, কারণ নারীদের ক্ষেত্রে বহুগামিতার একটি অন্যতম উপযোগিতা হতে পারে, সম্পদের তাৎক্ষণিক যোগান। শিম্পাঞ্জিদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, খাদ্যের বিনিময়ে তারা পুরুষ শিম্পাঞ্জিকে যৌনতা প্রদান করে থাকে। গবেষকেরা লক্ষ করেছেন, নারী শিম্পাঞ্জিরা সেই সব পুরুষ শিম্পাঞ্জিদের প্রতিই যৌনতার ব্যাপারে থাকে সর্বাধিক উদার যারা খাদ্য যোগানের ব্যাপারে কোনো কৃপণতা করে না। শিম্পাঞ্জিদের ক্ষেত্রে কোনো কিছু সত্য হলে মানবসমাজেও সেটা সত্য হবে, এমন কোনো কথা নেই অবশ্য। কিন্তু তারপরেও বিজ্ঞানীরা আমাজনের মেহিনাকু (Mehinaku) কিংবা ট্রোব্রিয়ান্ড দ্বীপপুঞ্জের (Trobriand Island) ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের মধ্যে গবেষণা চালিয়ে দেখেছেন, সেখানেও পুরুষেরা নারীদের জন্য (অনেকটা শিম্পাঞ্জিদের সমাজের মতোই) রকমারি খাদ্য, তামাক, বাদাম, শঙ্খের মালা, বাহুবন্ধনী প্রভৃতি উপঢৌকন সংগ্রহ করে নিয়ে আসে, আর বিনিময়ে নারীরা যৌনতার অধিকার বিনিময় করে। যদি কারো কাছ থেকে উপঢৌকনের যোগান বন্ধ হয়ে যায়, তবে নারীরাও সে সমস্ত পুরুষের সাথে যৌনসম্পর্ক বন্ধ করে দেয়[২২৮]। সম্পদের যোগানের সাথে যে নারীর যৌনতা প্রদানের একটা অলিখিত সম্পর্ক আছে, তা জানার জন্য অবশ্য আদিম সমাজে যাওয়ার দরকার নেই। আধুনিক সমাজেও সেটা লক্ষ করলে পাওয়া যাবে। সবচেয়ে চরম উদাহরণটির কথা আমরা সবাই জানি–পতিতাবৃত্তি। নারী যৌনকর্মীরা অর্থসম্পদের বিনিময়ে যৌনতার সুযোগ করে দেয় পুরুষদের–এটা সব সমাজেই বাস্তবতা। এই বাস্তবতা থেকে পুরুষদের বহুগামী চরিত্রটি যেমন স্পষ্ট হয়, তেমনি হয় আর্থিক লাভের জন্য নারীর যৌনতা বিক্রির সম্পর্কটিও[২২৯]। যৌনকর্মী শুধু নয়, আমেরিকায় সাধারণ মেয়েদের মধ্যে গবেষণা করেও দেখা গেছে, যে সমস্ত নারীরা শর্ট টার্ম বা স্বল্পমেয়াদি সম্পর্কে জড়াতে ইচ্ছুক, তারা আশা করে যে, তার প্রেমিক অর্থ কড়ির দিক থেকে কোনো কৃপণতা দেখাবে না, অনেক ধরনের দামি উপহার সামগ্রী উপঢৌকন হিসেবে নিয়ে আসবে, বিলাসবহুল জীবনযাত্রায় অভ্যস্থ হবে, নিয়মিতভাবে ভালো ভালো। রেস্টুরেন্টে তাকে আপ্যায়ন করবে, এবং সর্বোপরি যে কোনো ধরনের সম্পদের বিনিয়োগে থাকবে উদার[২৩০]। কৃপণ স্বামীকে যাও বা মেয়েরা কিছুটা হলেও সহ্য করে, অ্যাফেয়ারে আগ্রহী কৃপণ যৌনসঙ্গীকে কখনোই নয়। অ্যাফেয়ার বা পরকীয়ার ক্ষেত্রে ছেলেদের কৃপণতা মেয়েদের কাছে গ্রহণীয় কিংবা পছন্দনীয় নয়, কারণ তারা সঙ্কেত পেতে শুরু করে যে, তার সঙ্গীটি হয়তো ভবিষ্যতেও তার জন্য সম্পদ বিনিয়োগে সে রকমভাবে আগ্রহী নয়। এই মানসিক অভিরুচিগুলো বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, সম্পদের তাৎক্ষণিক আহরণ নারীদের ক্ষেত্রে এক ধরনের অভিযোজনজনিত উপযোগিতা দিয়েছে, যা নারীরা অনেক সময় পরকীয়ার মাধ্যমে নিশ্চিত করতে চায়।

নারীদের পরকীয়ার ব্যাপারে আরও একটি লক্ষণীয় প্যাটার্ন পাওয়া গিয়েছে, যেটা পুরুষদের থেকে কিছুটা আলাদা। বহু ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, নতুন সঙ্গীর সাথে অপরিকল্পিত যৌনসম্পর্কের (casual sex) মাধ্যমে নারীরা সঙ্গীটিকে ভবিষ্যৎ স্বামী হিসেবে মূল্যায়ন করে নিতে চায়। সে জন্যই এমনকি স্বল্পমেয়াদি সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বহুগামী, বোহেমিয়ান ধরনের ছেলের সাথে সম্পর্ক করতে নারীরা প্রাথমিকভাবে অনিচ্ছুক থাকে; অতীতে যদি পুরুষটির বহু নারীর সাথে সম্পর্ক কিংবা আসক্তি থেকে থাকে, তা নারীটির কাছে এক ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত সংকেত নিয়ে উপস্থিত হয়। এর কারণ, স্বল্পমেয়াদি সম্পর্কে জড়ালেও তার অবচেতন মনে থাকে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের আকাক্ষা, যার নিরিখেই সে সাধারণত উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো বিচার করে থাকে। তার সঙ্গীর বহুগামিতা কিংবা অতীতে বহু নারীর প্রতি আসক্তির অর্থ তার চোখে হয়ে ওঠে তার সাথে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক রচনার ক্ষেত্রে অবিশ্বস্ততার নিয়ামক। অর্থাৎ, সে ধরে নেয় এ ধরনের পুরুষেরা ‘ভবিষ্যৎ স্বামী হিসেবে উপযুক্ত নয়। মোটাদাগে, ভবিষ্যৎ স্বামীর মধ্যে যে গুণাবলিগুলো প্রত্যাশা করে, ঠিক সেগুলোই একটি নারী তার যৌনসঙ্গীর মধ্যে খুঁজতে চায়[২৩১]। দুটি ক্ষেত্রেই মেয়েরা চায় তার পুরুষ সঙ্গী হবে দয়ালু, রোমান্টিক, সমঝদার, দুর্দান্ত, স্বাস্থ্যবান, রসিক, বিশ্বস্ত এবং সম্পদের বিনিয়োগের ব্যাপারে থাকবে উদার। সেজন্যই বিবর্তন মনোবিজ্ঞানী ডেভিড বাস তার ‘বাসনার বিবর্তন’ (The Evolution Of Desire) বইয়ে বলেন[২৩২],

উভয় ক্ষেত্রেই মেয়েদের অভিরুচির এই অপরিবর্তনীয়তা ইঙ্গিত করে যে, নারীরা অনিয়মিত যৌনসঙ্গীকে হবু স্বামী হিসেবেই দেখে এবং সেজন্য দুইক্ষেত্রেই বেশি পদপর্যাদা আরোপ করে।

বহু সমাজে আবার দেখা গেছে, যে সমস্ত সমাজে সহিংসতা খুব বেশি, নারীরা বিবাহ বহির্ভূত যৌনসম্পর্ক করে নিজের নিরাপত্তার ব্যাপারটা চিন্তা করে। স্বামীর বাইরে গোত্রের অন্য কোনো পুরুষের সাথে যদি নারীর কোনো বিশেষ বন্ধুত্ব গড়ে উঠে তবে সে স্বামী বাইরে থাকলে বাঁ অন্য কোন সময়ে বিপদ আপদ থেকে রক্ষা করতে পারবে। এ ব্যাপারটা সাধারণভাবে প্রাণিজগতের মধ্যে প্রচলিত আছে। যেমন, সাভানা বেবুনদের নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে বারবারা সুটস সহ অন্যান্য বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন যে, এই ধরনের বেবুনদের সমাজে একটি নারী বেবুনের সাথে প্রাথমিক বা মূলসঙ্গীর বাইরেও একজন বা দুজন সঙ্গীর সাথে বিশেষ ধরনের সম্পর্ক গড়ে উঠে, এবং সেই সঙ্গী বা সঙ্গীরা অন্য বেবুনদের উত্যক্ত করার হাত থেকে নারী বেবুনটিকে রক্ষা করে[২৩৩]। পর-পুরুষের সাথে যৌনতার বিনিময়ে মূলত জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে নারী বেবুনটি। এ প্রসঙ্গে বিজ্ঞানী রবার্ট স্মিথ তার একটি গবেষণাপত্রে বলেন[২৩৪]—

প্রাথমিক সঙ্গীটি সবসময় নারী বেবুন কিংবা তার সন্তানের পাশে থেকে থেকে তাকে রক্ষা করতে পারে না। তার অনুপস্থিতিতে অন্য কোনো পুরুষের সাথে নারীটির বিশেষ কোনো সম্পর্ক থাকলে তা তার বেঁচে থাকায় বাড়তি উপযোগিতা নিয়ে আসে। এভাবে নারীটি অন্য কোনো পুরুষের সাথে সম্পর্ক তৈরি করে নিজের এবং নিজের সঙ্গীর জিন রক্ষা করার ক্ষেত্রে এক ধরনের স্ট্র্যাটিজি তৈরি করে।

এ ধরনের স্ট্র্যাটিজি মানবসমাজে বর্তমানে খুব বেশি দৃশ্যমান না হলেও বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, আদিম শিকারি সংগ্রাহক কিছু সমাজে যেখানে নারীদের উপর পুরুষালি সহিংসতা, আগ্রাসন, ধর্ষণ খুবই বেশি, সেখানে নারীরা এ ধরনের অতিরিক্ত যুগল বন্ধনের মাধ্যমে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে[২৩৫]।

সঙ্গী রদবদল বা ‘মেট সুইচিং’ও হতে পারে আরেকটি বড় কারণ যার কারণে একটি নারী পরকীয়া করতে পারে। স্পটেড স্যান্ড পাইপার (বৈজ্ঞানিক নাম Actitis macularia) নামে আমেরিকার মিনেসোটার হ্রদে দৃশ্যমান এক ধরনের পাখিদের মধ্যে সঙ্গী রদবদলের প্রবণতা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় পাওয়া গিয়েছে। জীববিজ্ঞানী মার্ক কলওয়েল এবং লিউস ওরিং প্রায় চার হাজার ঘণ্টা ধরে এই পাখিদের জীবনাচরণ পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, এ ধরনের পাখিদের মধ্যে সঙ্গী রদবদল খুবই স্বাভাবিক ঘটনা36। সঙ্গী রদবদলের মাধ্যমে বর্তমান সঙ্গীর চেয়ে আরও আকর্ষণীয় সঙ্গীকে খুঁজে নেয় একটি নারী স্পটেড স্যান্ড পাইপার। মানবসমাজেও কিন্তু এ ব্যাপারটি লক্ষ করলে খুঁজে পাওয়া যাবে। বর্তমান সঙ্গীর চেয়ে অন্য কাউকে অধিকতর আকর্ষণীয়, সুদর্শন কিংবা কাঙ্খিত মনে হলে, কিংবা বর্তমান সঙ্গীর স্ট্যাটাসের চেয়ে উঁচু সামাজিক পদমর্যাদাসম্পন্ন কেউ তার সাথে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠলে নারী তার সাথেও পরকীয়ায় জড়াতে করতে পারে। পরকীয়া করতে পারে যদি নারীর বর্তমান সঙ্গী যদি অসুস্থ হয়, পঙ্গু হয়, শারীরিকভাবে অক্ষম হয়, যুদ্ধাহত হয় কিংবা মুমূর্ষ হয়। বাংলাদেশে বিগত শতকের নব্বইয়ের দশকের চাঞ্চল্যকর মুনীর-খুকুর পরকীয়া আর তাকে কেন্দ্র করে সাংবাদিক রীমা হত্যাকাণ্ডের কথা নিশ্চয় অনেকেরই মনে আছে। মধ্যবয়সি খুকু পরকীয়া প্রেম শুরু করেছিলেন ড. মেহেরুন্নেসার পুত্র মুনীরের সাথে। খুকুর স্বামী ছিলেন পক্ষাঘাতগ্রস্ত এবং অসুস্থ। স্বামীর এ শারীরিক পরিস্থিতি খুকুকে চালিত করেছিল মুনীরের সাথে পরকীয়ায় জড়াতে, আর প্ররোচিত করেছিল মুনীরকে রীমা হত্যায়। কাজেই নারী শুধু পরকীয়া করে না, প্রয়োজনে পরকীয়ার কারণে হত্যায় প্ররোচনা দেওয়া শুধু নয়, নিজ হাতে হত্যা পর্যন্ত করতে পারে। কিছুদিন আগে পরকীয়ার কারণে আয়শা হুমায়রা কীভাবে তার নিজের সন্তান সামিউলকে নির্দয়ভাবে হত্যা করে লাশ ফ্রিজবন্দি করে পরে বাইরে ফেলে দিয়েছিল, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিনের পর দিন ধরে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। পরকীয়ার কারণে মায়ের নিজ সন্তান হত্যা হয়তো খুব চরম এবং ব্যতিক্রমী উদাহরণ, কিন্তু আকর্ষণীয় সঙ্গীর জন্য বর্তমান সঙ্গীকে ত্যাগ, কিংবা স্বামীর তুলনায় আরও ‘উৎকৃষ্ট কারো সাথে লুকিয়ে ছাপিয়ে পরকীয়া তা নয়। এ ব্যাপারটা সব সময়ই এবং সব সমাজেই ছিল। পয়সাওয়ালা কিংবা সুদর্শন, স্বাস্থ্যবান, আকর্ষণীয়, মনোহর কিংবা উঁচু পদমর্যাদাসম্পন্ন সঙ্গীর জন্য পুরাতন সঙ্গীকে ত্যাগ মেয়েদের মধ্যে এক সময় একধরনের অভিযোজনগত উপযোগিতা দিয়েছিল, অন্তত হেলেন ফিশারের মতো নৃতত্ত্ববিদেরা তাই মনে করেন[২৩৭]। সেই আদিম শিকারি সংগ্রাহক সমাজের কথা চিন্তা করুন, যেখানে একটি নারীকে বিয়ে করতে হয়েছিল এক দুর্বল শিকারিকে যার চোখের দৃষ্টি ছিল ক্ষীণ, শিকারে অযোগ্য এবং স্বভাবে কাপুরুষ। এ ধরনের সম্পর্কে থাকা নারীরা মানসিক অতৃপ্তি মেটাতে হয়তো পরকীয়া শুরু করেছিল সুস্থ সবল, স্বাস্থ্যবান তরুণ কোনো সাহসী শিকারির সাথে–’মিস্টার গুড জিন’ পাওয়ার এবং ভবিষ্যত সন্তানের মধ্যে তা রেখে যাওয়ার প্রত্যাশায়। ভালো জিনের জন্য সঙ্গীবদলের ব্যপারটি যদি আদিম শিকারি সংগ্রাহক পরিস্থিতিতে নারীদের একধরনের স্ট্র্যাটিজি হয়ে থাকে, তবে সেটি এখনকার সময়েরও বাস্তবতা হতে পারে তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। র‍্যান্ডি থর্নহিলের একটি সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে এই ‘গুড জিন’ অনুকল্পের সত্যতা পাওয়া গিয়েছে[২৩৮]। গবেষণায় দেখা গেছে নারীরা যখন পরকীয়া করে তখন প্রতিসম চেহারার প্রতি আকর্ষিত হয় বেশি[২৩৯]। প্রতিসম চেহারা সবসময়ই একটি ভালো ‘ফিটনেস মার্কার হিসেবে বিবেচিত। প্রেমিকের চেহারা প্রতিসম হওয়া মানে তার প্রেমিকের চেহারা আকর্ষণীয়, তার শরীরের গঠন উন্নত, সে পুরুষালি, বুদ্ধিদীপ্ত, চৌকষ, স্বাস্থ্যবান এবং রোগজীবাণু থেকে মুক্ত[২৪০]। তাই যে নারী স্বামীকে রেখে প্রতিসম বৈশিষ্ট্যের প্রেমিকের পেছনে ছুটছে, তার প্রস্তর যুগের মস্তিষ্ক’ আসলে প্রকারান্তরে ‘ভালো জিন’ নিজ সন্তানের জন্য নিশ্চিত করে রাখতে চাইছে।

ভালো জিনের জন্য প্রলুব্ধ হয়ে পরকীয়া করার এই জেনেটিক হাইপোথিসেরই আরেকটি প্রচলিত রূপ হচ্ছে ‘জোশিলা পোলা’ বা ‘সেক্সি সন’ অনুকল্প। এই অনুকল্পটি ১৯৭৯ সালে প্রস্তাব করেছিলেন কুইন বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী প্যাট্রিক ওয়েদারহেড এবং রালি রবার্টসন। এই অনুকল্প অনুযায়ী মনে করা হয় যে, সুদর্শন পুরুষের সাথে নারী পরকীয়া করে কিংবা স্বল্পমেয়াদি যৌনসম্পর্ক স্থাপন করে কারণ, অবচেতন মনেই তার মাথায় থাকে যে, তার সন্তানও হয়ে উঠবে ঠিক একই রকম মনোহারী গুণাবলির অধিকারী। পরবর্তী প্রজন্মের নারীরা তার সন্তানের এই প্রীতিকর বৈশিষ্ট্যগুলো দিয়ে অনেক বেশি পরিমাণে আকৃষ্ট হবে, ফলে যাদের মধ্যে এই গুণাবলিগুলোর অভাব রয়েছে তাদের তুলনায় তার সন্তান অনেক বেশি প্রজননগত সফলতা অর্জন করতে পারবে। বেশ কিছু সাম্প্রতিক জরিপে এই তত্ত্বের স্বপক্ষে কিছুটা হলেও সত্যতা মিলেছে। দেখা গেছে, নারীরা যখন পরকীয়ায় আসক্ত হয় তখন তাদের একটা বড় চাহিদা থাকে স্বামীর চেহারার চেয়ে প্রেমিকের চেহারা অনেক বেশি আকর্ষণীয় হতে হবে[২৪১]।

শুধু ভালো জিন, ভালো চেহারা বা ভালো সন্তানের জন্যই নয়, নারীরা আরও বহু কারণেই পরকীয়া করতে পারে। সামাজিক স্ট্যাটাস তার মধ্যে একটি। গবেষণায় দেখা গেছে, একজন বিবাহিত নারী যখন অন্য কোনো পুরুষের সাথে পরকীয়া করে, সেই পুরুষের স্ট্যাটাস, প্রতিপত্তি, সামাজিক অবস্থান প্রভৃতি তার বর্তমান স্বামীর চেয়ে অনেক বেশি থাকে[২৪২]। প্রখ্যাত ব্যবসায়ী এবং ২০১২ সালের রিপাবালকান প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী (পরে নিবার্চনী ক্যাম্পেইন থেকে সরে দাঁড়ানো ) ডোনাল্ড ট্রাম্প বছর খানেক আগে এক অপরিচিত মডেল মার্থা মেপেলের সাথে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়লে রাতারাতি মার্থা মেপল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। মিডিয়ার পাবলিসিটি তো ছিলই, সাথে সাথে নানা ধরনের আর্থিক বিনিয়োগ, গণ্যমান্য সামাজিক অনুষ্ঠানে প্রবেশের অধিকারসহ বিভিন্ন পদমর্যাদা ভোগ করতে থাকেন। বাংলাদেশেও এরশাদ সাহেব রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন জিনাত মোশারফসহ বহু নারীর সাথে পকীয়ায় মত্ত ছিলেন, তখন সে সমস্ত নারীরাও রাতারাতি বহু রাজনৈতিক এবং সামাজিক সুযোগ সুবিধা পেয়ে গিয়েছিলেন। এ সমস্ত নারীরা এমন সব মহলে, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে কিংবা সভায় প্রবেশ করতেন অবলীয়ায়, যেগুলোতে সাধারণ মানুষদের জন্য প্রবেশ ছিল অকল্পনীয়। প্রেমের অর্থনীতির বাজারে কোনো কেউকেটা বা বিখ্যাত লোক যখন কোনো পরিচিত নারীর সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়ায়, তখন সে যত অখ্যাতই আগে থাকুক না কেন, মানুষ ভেবে নেয় নারীটি নিশ্চয় ‘স্পেশাল’। সে রাতারাতি চলে আসে আলোচনা আর ক্ষমতার কেন্দ্রে। নারীটি পায় নতুন পরিচিতি, আর সামাজিক এবং বন্ধুমহলে ঘটে তার “স্ট্যাটাসের উত্তরণ”।

যে কারণেই নারী পরকীয়া করুক না কেন, প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ সারা ব্ল্যাফার হার্ডি মনে করেন যে, নারী-পরকীয়ার ব্যাপারটা মানবেতিহাসের সূচনা থেকেই এমনভাবে জড়িত ছিল যে, সেটাকে অস্বীকার করা বোকামিই243। অন্য প্রাণীর ক্ষেত্রে যেমন, শিম্পাঞ্জিদের ক্ষেত্রে আমরা জানি সেখানে নারীরা বহুগামী। হার্ডি তার গবেষণাপত্রে শিম্পাঞ্জিদের উদাহরণ হাজির করে দেখিয়েছেন যে, বহুগামিতার মাধ্যমে নারী শিম্পাজিরা ডারউইনীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দুটি উদ্দেশ্য পূরণ করে–এক, অন্য পুরুষের সাথে সম্পর্কের মাধ্যমে তারা নিশ্চিত করে সদ্যজাত সন্তানকে কেউ ঈর্ষার বশবর্তী হয়ে হত্যা করবে না, আর দুই সন্তানের পিতৃত্ব নিয়ে গোত্রে এক ধরনের ‘ধোঁয়াশা তৈরি করা; যার ফলে সকল পুরুষ শিম্পাঞ্জিই নিজেকে তার অনাগত সন্তানের পিতা ভেবে নার