দনুর অধস্তন ষষ্ঠ পুরুষকে আর নানি এসব বৃত্তান্ত শোনায় আর সেই বালক, বয়সের থেকে অনেক বেশি একাগ্রতায়, নিবিষ্ট হয়ে শোনে সেই-ব কথা।
রহু চণ্ডালের হাড় জানু রে শারিবা।
না!
ঘোর অমাবস্যায় এক বিটিছেলের এক ছেল্যা হবে। সি হোবে একোই বেটা। সি ব্যাটা মরবা হবে অমাবস্যার দিনোৎ আর লাশ ভাসান হবে আমাবস্যার আতোৎ। তবি সি লাশ গহিন আতৎ নদী থিকা উঠাবা হবে। তা-বাদে তার কণ্ঠার হাড়ে বানাবা হবে ভাতির হাড়। সি হল রহু চণ্ডালের হাড়। সে হাড় হাতেৎ রাখ্যে তুমু হয়কে লয়, লয়কে হয় করতে পারবা।
সাচা?
সাচা লয়?
তুই দেখিছিলি, নানি?
হাঁ, দেখিছি। বালি বুড়ার কাছে ছিল সি রহু চণ্ডালের হাড়। আর কেরো লয়। আর সোব্বার হাতে থাকত মেকি হাড়। তাথেই ত্যাল সিন্দুর মাখায়া সবে ভেলকি লাচাত মিছাই। কেন্তু বালি বুড়ার ছিল আসল হাড়।
তো সি হাড়টা কী হল?
ও, সিটা তোক বলা হয় নাই? তবি শোন, তোরা নানাতো এলা সব ঠিক করল যি আর বাজি লয়, আর ভিখ-মাঙ্গা লয়। ইবার আর দশজনার মতো খাইটে খাবার হোবে। তো সব ঠিকঠাক কর্যে বেবাক হুই পাতালু নদীৎ বিসজ্জন হল।
তা-বাদে?
আঃ হা, তা-বাদেই তো আসল মজা।
কেম্কা?
বাজিকর বুললে হাম কাম করে খামো, ভিখ মাঙ্গমো না। কাম করবা? তা যাও, পাটের খ্যাত নিড়াও, জনে জনে দু দু পয়সা আর এক সস্তা খাওয়া। তো ভিখমাঙ্গা নেংটার দল পাটের খেতোৎ নাইমে গেল। বাস, দু-ঘণ্টায় কাম শ্যাষ। কামও শ্যাষ, পাটের খ্যাতও শ্যাষ!
ক্যান?
অনেকদিনের চাপা পড়া স্মৃতিতে বলক ওঠে। নানি হাসে। অথচ চোখের কোণে জল চিকচিক করো। পাট-নিড়ানি কাম ভিখ-মাঙ্গা বাজিকরের কাম লয়, শারিবা। পাটের চারা আধা উঠি গৈল নিড়ানির ঘায়ে, আর আধা পড়ল পায়ের তলায় চাপা।
সেই দোষে লালমিয়া কোড়া মারুল পঁচিশ ঘা।
জামির বলেছিল, হামা কোড়া মারেন, ছাহেব। বেবাক দোষ হামার।
তখন যুদ্ধের বাজার, পাটের দাম মেলা। পুরো মাঠের পাট নষ্ট। রাগ হয় বৈকি মানুষের।
লুবিনি পিঠের ঘায়ে বুনো লতাপাতার মলম লাগায়। তমো কি রোখ রে মানুষটার শারিবা, বলে ভিখ-মাঙ্গা কাম আর করমো না। চাষিমজুরের কাম শিখবা হোবে। বলে আর হা-নিঃশ্বাস ফেলায়। তো সি হা-নিঃশ্বাস দেখি হামি। আর আর বাজিকরের থমথমা মুখ। এলা কি দেকদারি কাম! বালি বাজিকরের ছেলা লছমন বাজিকর জবর খেলোয়াড়। সি বলে, হাই, সারা দুনিয়া হামার আছিল। হামার আছিল, লদী, পাহাড়, বালি আর মাঠ, আর এখুন দেখ হামরা বন্দি হই গেলাম। বাজিকর যদি ঘাটা ছাড়ি ঘর ধরে, তবিই সি আহাম্মক, লচেৎ লয়।
বালি বললে, তা লয় রে লছমন। যি পাপে বাজিকর বাউদিয়া, সি হাজার সালের পুরানা পাপ। সি পাপ খণ্ডাবার জন্য তুমাক তো দণ্ড নিবার হবে। তোত
জামির সি দণ্ড নেয় তুমাদের বেবাকের হয়।
কি পাপ নানি, কি পাপ?
হায়, শারিবা, সি বড় কঠিন পাপ। ওলা কথা বালি বুঢ়া জানত।
নানি সে কথাটা এড়িয়ে যেত। সে পাপের কথা জানতে শারিবার অনেকদিন লাগবে। কিন্তু জানার আগে দীর্ঘদিন সে পাপের দণ্ড স্বজনদের সঙ্গে ভোগ করবে। ছোটবেলা থেকে শুনে শুনে যেগুলো সে বুঝবে সেগুলোর সত্যতা সে অস্বীকার করতে পারবে না। যেমন, সে অপমানিত হবে চোর বলে, সে গাল খাবে লুঠেরা বলে, সে গোপনে মানুষকে বাজিকর বৃদ্ধাদের কাছে আসতে দেখবে গূঢ় অভিসন্ধিতে, গুণতুক আর গুপ্তবিদ্যার সাহায্যে অভিলাষ সিদ্ধ করার জন্য।
ক্রমশ অভিজ্ঞতা এবং বহিঃসমাজ তাকে শেখাবে আরো অনেক কিছু। সে জানবে বাজিকরের নিজস্ব সমাজ বলতে বিশেষ কিছু নেই, বিশ্বাস নেই, ধর্ম নেই, কার্যকারণ, স্থান-কাল-পাত্র কাণ্ডজ্ঞান খুব কম। বাজিকর জানে হামবড়াই, কিন্তু মানুষের সমাজের প্রয়োজনীয় মৌলিক কাজ সে জানে না। সে আসলে ভীরু ও লোভী। তার নিয়তি দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও ক্ষয়রোগ। এই সমস্ত পৃথিবী তার, কিন্তু এমন কোনো জায়গা তার নেই যেখানে সে পা রেখে দু-দণ্ড দাঁড়াতে পারে।
তাই বটে, তাই বটে শারিবা! তাই তোর নানা ফির মার খায়। জমিতে হাল দিতে নাইমে মহিমবাবুর অ্যাটা ভঁইসের পায়েং ফাল মারি দিল লছমন। চাষের কামের সোমায় অ্যাটা ভঁইস চোট খায়ে বইসে গেলে গেরস্তের রাগ হয় বৈকি!
আর জামির নিজেকে সান্ত্বনা দেয় এই বলে, মার খেয়েই শিখতে হবে। হাজার বছরের কর্মহীন উদ্যোগহীন হাত, এত সহজে কাজ শিখবে? পাপের দণ্ড দিতে হবে না? আরো কত পুরুষ ধরে পাপের ভোগ ভুগতে হবে?
জানিস শারিবা, তোর নানা চাইছিল গেরস্ত হবার। চাষি-গেরস্ত। নিজের ভঁইস থাকবে, হাল-লাঙ্গল থাকবে, উঁই থাকবে। ভিখ-মাঙ্গাকে সি বড় ঘেন্না করত।
নমনকুড়ির সামান্য সময়ের মরীচিকা তাকে আরো লোভী ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করেছিল।
লুবিনি ফিসফিস্ করে এইসব কথা বলত শারিবাকে, যেন অত্যন্ত গোপন কোনো শরমের কথা বলছে, যেন কিশোরীর প্রথম গোপন কথাটি। বড় মধুর, সজ্জার, আকাঙ্ক্ষার, একান্ত নিজস্ব। যেন এরকম একটা অদ্ভুত কথা শুনে সবাই হো হো করে হেসে উঠতে পারে। সেই ভয়, এখনো। নানির এখন আশির উপরে বয়েস, জামির এই স্বপ্ন দেখতে শুরু করে এখন থেকে পঞ্চাশ বছর আগে থেকে, তবুও। জামির তো মারাই গেছে তিরিশ বছর হয়ে গেছে, তবু এখনো কেন শরম লাগে, ভয় ভয় লাগে লুবিনির?
শোন শারিবা, গোরখপুর আমাদের নিজেদের জায়গা। আমি শুনেছি তোের নানার নানার কাছ থেকে, সে শুনেছে তার নানার কাছ থেকে। আমরা ছিলাম পোরখপুরের আরো পশ্চিমে কোন এক মরুভূমি আর বালির মুলুকে। আর গোরখপুরে বাজিকরের বসত বছরে একমাস কি দু-মাস, একে কি বসত বলে? কখনো কখনো দু-বছর তিন বছর বাদে ঘুরে আসত কোনো দল। যেমন হামারদের দল, যেমন ঘুরল নাই, কুথায় হারাই গেল গোরখপুর?
