রমজান তাকে কথা দিয়েছিল। কিন্তু সবাই জানত এসব কথার কতটুকু মূল্য। রমজানের কী ক্ষমতা যে এতগুলো মানুষকে সে দেখে? তবুও জামির যেন আশ্বস্ত হয়েছিল।
৪০.
সাত বছর নয় এক বছর মাপ পেয়ে জামির ছ-বছর পরে মুক্তি পায়। ছ-বছর পরে যখন সে বেরিয়ে আসে তখন জামির একজন বৃদ্ধ! তার চেহারার কাঠামোটুকুই শুধু অবশিষ্ট আছে। হাড়ের কাঠামো, আর কিছু নেই। তারপর আরো বিশ বছর সে বেঁচে থাকে বাজিকরদের দুর্গতির সমস্ত দায়বহন করবার জন্য। শেষপর্যন্ত জীবন তাকে নতুন কিংবা তার আকাঙ্ক্ষিত কোনো বস্তুই দিতে পারেনি।
যখন সে জেলে ছিল বাজিকরেরা রাজশাহি শহরকে মূল বিন্দু করে কাছের ও দূরের জনপদে ঘুরে বেড়াত তাদের আদিম ব্যবসাকে কেন্দ্র করে। লুবিনির কথা স্বতন্ত্র, কিন্তু অন্য বাজিকরেরাও বছরে অন্তত দু-তিন মাসের জন্য রাজশাহি শহরে বাস করত। কারণ জামিরকে ছেড়ে তারা চিরকালের জন্য দূরে যাওয়ার কথা চিন্তা করতে না। যে কারণে রহুর সঙ্গে তার জনগোষ্ঠী জলে ঝাঁপিয়েছিল, সেই কারণ বা সংস্কার তাদের রক্তে এখনো ছিল। তাই জামিরের মুক্তির জন্য তারা অপেক্ষা করছিল। এই অপেক্ষার সময়ে অনেকে মারা যায়। মৃতদের মধ্যে সব বয়সের মানুষ ছিল। যক্ষ্মা ও অন্যান্য মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগ তাদের মধ্যে লেগেই ছিল।
জামিরের জন্য অপেক্ষা তাদের ছিল ঐকান্তিক, কিন্তু জামিরের নির্দেশিত পথে চলবার এবং চালাবার মতো শক্তিমান ব্যক্তিত্ব তাদের মধ্যে আর কেউ ছিল না। একমাত্র জীবিত বৃদ্ধ বালি কেবল দুঃখ করত।
ইতিমধ্যে রূপা বয়স্ক যুবক হয়েছিল। নিজ গোষ্ঠীর মধ্যে থেকেই কন্যা বাছাই করে লুবিনি তার বিয়ে দিয়েছিল। রূপার বিয়ের ব্যাপারটা নিয়ে লুবিনিকে খুবই ভাবতে হয়। প্রথমে সে ঠিক করেছিল, যে জামির ঘুরে এলে তবেই রূপার বিয়ে দেবে। কিন্তু রূপা ছিল জামিরের একেবারে বিপরীত না হলেও অনেকাংশেই অন্যরকম। রূপা উচ্ছল ও কিছুটা উজ্জ্বল। তার চমৎকার আকর্ষণীয় চেহারা গগাষ্ঠীর মধ্যে সমস্যা সৃষ্টি করেছিল, কেননা খুব কম স্ত্রীলোকই তার আকর্ষণ এড়াতে পারত। এ কারণে লুবিনি জামির ফিরে আসার আগেই তার বিয়ে দিয়ে দেয়। বালিও সেরকম পরামর্শই দিয়েছিল। বাজিকরেরা সবাই একমত হয়ে শা-জাদি নামে এক বালিকার সঙ্গে রূপার বিয়ে দেয়।
রূপা ছিল পাকা খেলোয়াড়। প্রচলিত খেলাগুলো ছাড়াও সে শিখে নিত যেখানে যা নতুন দেখত। তাছাড়া, তার ছিল অসাধারণ বাম্পটুতা। খেলা দেখাবার সময় অনর্গল কথা বলে মানুষের মনোযোগ ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারত সে। সে ভালো ভোলক বাজাত, চমৎকার গান গাইত। সে ছিল যথার্থই এক বাজিকর।
জামিরের হাজতবাসের সময় দলের সর্দারি পেয়েছিল পিয়ারবক্সের ছেলে ইয়াসিন। সদারির কাজে ইয়াসিন যে খুব নির্ভরযোগ্য মানুষ ছিল এমন নয়, তবুও তার থেকে উপযুক্ত লোক তখন আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। খুব শক্তসমর্থ না হলেও খুব বিবেচক হিসাবে ইয়াসিনের খ্যাতি ছিল।
জামির ফিরে আসার পর ইয়াসিন তার কাছে গিয়ে বলেছিল, ইবার লেন চাচা, আপন কম্ম নিজে করোন, হামা সোয়াস্তি দেন।
জামির বলে, কি কামডা কল্লে এতদিন, বসূত করার মতো জায়গা খুঁজিছ?
ইয়াসিন চুপ করে থাকে।
খোঁজ নাই, না পাও নাই?
এলা কি আমার কাম? বেবাক মাষে দূর দূর ছাই ছাই করে—
খোঁজই নাই, তত পাবা কি?
ক-দিন বিশ্রাম নিয়ে জামির ইয়াসিনকে ডেকে পাঠাল, বলল, সব মানুষ হেথায় থাকবে। খালি আমি তুমি যামো। আশপাশ কাছে দুরে খুঁজবা হবে বাজিকরের বসত করার মতো জায়গা এ দুনিয়ায় আছে কিনা। আগে বসত, তার পরে অন্য কাম।
এর দিন দুয়েক পরে তারা দলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। এক মাস পরে তারা ঘুরে জানাল, জায়গা একটা পাওয়া গেছে বাজিকরদের স্থায়ী আস্তানা গাড়ার। কাজেরও কিছু অগ্রিম কথাবার্তা হয়েছে সেখানে। কোথায় সেই স্থান যা বাজিকরকে ধারণ করতে পারে? এখান থেকে উত্তরে পাঁচবিবি নামে একটা বর্ধিষ্ণু গ্রাম আছে, তারই কাছে পাতালু নদীর তীরে বাজিকরদের নতুন বসত পত্তনি হবে। সেখানে হিন্দু ও মুসলমান দুই জমিদারেরই কুন্ঠিবাড়ি আছে। সেই কুন্ঠিবাড়িতে হাতি আছে। তারা দু-দলই জামিরকে কথা দিয়েছে।
৪১-৪৫. অথচ বেশ কয়েক বছর
অথচ বেশ কয়েক বছর মহিমবাবু ও লালমিয়ার সেবা করার পরও প্রশ্ন উঠেছিল, তুমরা হিন্দু না মোছলমান? এর আগে দীর্ঘ একশো বছরের মধ্যে ও প্রশ্ন কারোরই ওঠাবার দরকার হয়নি। অথচ পাঁচবিবির মহিমবাবু কিংবা লালমিয়ার কাছে তখন এ প্রশ্ন জরুরি ঠেকেছিল।
তখনো দুই কুন্ঠির খাস জমিগুলো সম্পূর্ণ উদ্ধার হয়নি। তখনো গাছ ফেলা লছে। কোথায় নাকি যুদ্ধ হচ্ছিল, তাতে অনেক গাছের দরকার, বাঁশের দরকার। তাই ভিখমাঙা বাজিকরেরা গাছ ফেলছিল আর জমি খালাস করছিল। এসব তারা করবে পাঁচবিবিতে বসত করার এক পুরুষ পরে। এই এক পুরুষ তারা জামির বাজিকরের নেতৃত্বে পাঁচবিবিতে খুঁটো গেড়ে বসে থাকবে। তারা আর ভিখ মাঙবে না, এরকম একটা প্রতিজ্ঞা বৃদ্ধ জামিরের নেতৃত্বে আবালবৃদ্ধ বাজিকরেরা নেয়। খোদাবকসো বাজিকর, বালি বাজিকর ও শিউ বাজিকর—এই তিন অতিবৃদ্ধ বাজিকর ঘনঘন মাথা নেড়ে জামিরের কথায় সায় দিয়েছিল। না, আর ‘গেহুঁ’, মার সোঁকা’ হাত পেতে ভিখ-মাঙ্গা নয়! আর বান্দর, ভাল্লু, রহু চরডালের হাড় নাড়া-চাড়া নয়!
