সন্ধ্যা নাগাদ ঘটনাস্থলে এসে তারা অনেক কষ্টে রূপা এবং রমজানকে খুঁজে পায়। রমজান ও রূপা কিছু মানুষের জটলার মধ্যে বোবার মতো বসেছিল।
তার আগেই অবশ্য পুলিশ এসেছিল। তারা তিনজন আহত আক্রমণকারী, অজ্ঞান জামির ও আবুকে নিয়ে গিয়েছিল।
রমজানের পরিচিত মানুষেরা তাকে নানারকম পরামর্শ দিচ্ছিল, কিন্তু সেসব কথা রমজানের কানে যাচ্ছে না। সে হতভম্বের মতো সবার দিকে, সবার মুখের দিকে, চোখের দিকে তাকাচ্ছে, মাথা নাড়ছে। কিন্তু কোনো কথাই যে তার মগজে ঢুকছে না, সেকথা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে।
বিষয়টা বুঝতে কারো অসুবিধা হয় না। এ হল সেই বাবুঘরের উদ্ধৃঙ্খল ছোকরাদের কাজ। পয়সাঅলা ঘরের ছেলে সব। পয়সা দিয়ে লোক ভাড়া করে শিক্ষা দিতে চেয়েছে রমজান আর জামিরকে, নিজেরা আড়ালে থেকে মজা দেখেছে। কিন্তু হয়ত এতটা প্রতিরোধ আশা করতে পারেনি। পাঁচখানা তরমুজের নৌকা ডুবানো আর কি এমন কঠিন কাজ। কিন্তু কাজটা কঠিন হয়ে গেল। আশাতিরিক্ত ঝামেলা হয়ে গেল। জামিরের মতো শান্ত এবং সবার কাঝেই পোষ মানতে রাজি এক দৈত্য হঠাৎ ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল। অক্লান্ত শ্রমের বিনিময়কে এভাবে নষ্ট করা মেনে নিতে পারল না।
পরদিন নদীর পার থেকে বাজিকর বসতি উঠে এল শহরের আরো কাছে, পুলিশ লাইনের মাঠের একপাশে। বৃদ্ধ বালি আরো কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে পুলিশ সাহেবের সঙ্গে দেখা করল। তারা এই প্রথম কিছু দাবির কথা বলল। এই প্রথম। পুলিশ তাদের এখান থেকে অন্য কোথাও সরে যেতে বলেছিল। বালি বলেছিল, আমরা আমাদের উপর আক্রমণ আশঙ্কা করছি। তাই আমরা কিছুদিন এখানে থাকতে চাই, হুজুরের কাছাকাছি। সময় সুযোগ মতো অন্য কোথাও চলে যাব। আর হুজুরের কাছে আমাদের দলপতির বৃত্তান্তটাও জানতে চাই।
সাহেব জানিয়েছে, জামির খুনের আসামী, তার বিচার হবে। বিচারে হাকিম যা শাস্তি দেয় তা মানতে হবে।
সাহেব তাদের কিছুদিনের জন্য পুলিশ লাইনের কাছে থাকবার অনুমতি দিয়েছিল।
জামির শিরদাঁড়ার উপরে কোথাও চোট খেয়েছিল, ফলে সেই যে সে নৌকার উপর ঘুমিয়ে পড়েছিল সে ঘুম তার ভাঙল বেশ কয়েকদিন পর। এই দিনগুলো সে থানার হাজতে মৃতের মতো শুয়েছিল। প্রতিদিন একবার করে পুলিশের ডাক্তার তাকে দেখে যেত। এর মধ্যে দু-দিন লুবিনি এবং অন্য দু-একজন বাজিকরের অনুমতি মিলেছিল তাকে দেখবার। তারা কেউ জামিরের জীবনের আশা করেনি।
যখন জামিরের জ্ঞান ফিরল তখনো তার মস্তিষ্কের নির্বোধ ভাব কাটল না। সে যদিও শান্ত ছিল, কিন্তু সে ছিল বাহ্য ও দৃশ্যমান জগতের সম্পূর্ণ বাইরে। তার বাক্শক্তিও ছিল না। এই সময় থানায় তার জন্য পৃথক বন্দোবস্ত হয় এবং লুবিনিকে তার সঙ্গে থেকে তার দেখাশোনা করার অনুমতি দেওয়া হয়।
এর এক সপ্তাহ বাদে জামির একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে লুবিনিকে দেখে হাসে। লুবিনি তার চোখে পরিচিতিরর লক্ষণ দেখে। তারপর জামির কথা বলে এবং একদিনের মধ্যে পূর্ণ স্বাভাবিকতার জগতে ফিরে আসে। এই ঘটনায় লুবিনির এক মিশ্র প্রতিক্রিয়া হয়। জামির স্বাভাবিক হওয়াতে তার অপরিসীম আনন্দ হয়, আবার জামিরকে ছেড়ে চলে যেতে হয় বলে নিদারুণ দুঃখও হয়।
৩৯.
জানো রে, শারিবা, তোর নানা কলো, ই মুই কোথায়, আমি ভায়েৎ তার মুখ চাপি ধরনো। যাঃ সব্বোনাশ, মরা মানুষ জিন্দা হয়, যোবা মানুষ কখনো কথা কয়। ওঃ, সি কি হামার সুখ, সি কি যে দুঃখ!
লুবিনি তারপরে রমজান মিয়ার কাছে গিয়েছিল, এখন কী হবে? একথার উত্তর রমজান কী দেবে? আবুও যে হাজতে।
তারপর ধীরে ধীরে শক্ত হয় রমজান। বাকি তরমুজ পাইকার ডেকে মাঠ থেকেই বিক্রি করে দেয়। কিছু টাকা পায় লুবিনি। রমজান বলে, মোকদ্দমা চালাতে হবে। পয়সা আবোলতাবোল খরচ করা যাবে না।
কিন্তু মোমদ্দমা যে চালাবে মুরুব্বি কোথায়? তাও পাওয়া যায়। রমজানের এক ভায়রা এ ব্যাপারে এগিয়ে আসে। অভিজ্ঞ বুঝদার মানুষ। বেশ কিছুদিন ধরে মামলা চলে। সে সব আইন কানুনের কূট-কুচাল কি লুবিনি বোঝে যে শারিবাকে বলবে? তবে বাবুরা জামির, আবু, ইত্যাদির বিরুদ্ধে নামী উকিল দিয়েছিল। সাক্ষী সাবুদ হাজার হেনস্থায় দিন মাস গড়িয়ে বছর ঘুরে গেল। বিচারে আবুর তিন বছর আর জামিরের সাত বছর জেল হল।
লুবিনির বুক ভাঙল। বাজিকরের মেয়েকে ছোটবেলা থেকেই নানা খেলা, ভানুমতি, বুজরুকি শিখতে হয়। কিন্তু লুবিনি অল্পবয়সেই জামির বাজিকরের বউ হয়, সেই জামির, যার নমনকুড়িতে ফসলের জমি ছিল। কাজেই বাঁশবাজি, দড়িবাজি, লুবিনির অত গরজ করে শেখার দরকার হয়নি। নমনকুড়ি ছাড়ার পর সে অভাব সে টের পায়। জামির এসব ব্যাপারে তাকে কখনো কিছু বলত না। কিন্তু তখন এসব নতুন করে ঝালিয়ে নেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না, কেননা পেট তো মানে না। আর বাজিকরের অন্য কোন বিদ্যাই বা জানা আছে! কাজেই লুবিনিও অন্যদের মতো ‘ভিখমাঙ্গা’ শুরু করেছিল অন্যদের মতোই এসবে চৌকশ হয়ে উঠেছিল।
আর এখন, যখন জামির বলল, বেঁচে থাকিস, আমি ফিরে আসব—তখন বেঁচে থাকার জন্যই লুবিনি অন্যদের সঙ্গে দেশদেশান্তর করত ভিখ-মাঙ্গার কাজ নিয়ে।
শেষবার জেলখানায় দেখা করতে আসার সময় রমজান সঙ্গে ছিল। জামিরকে সে বলেছিল, দেখেক, বাজিকরের বন্ধু মেলা ভার। আমার মানুষগুলোকে একটু নজর রাখে। আর সে লুবিনিকে ও রূপাকে দেখিয়েছিল। জামিরের চোখ ছলছল করছিল, লুবিনি কাঁদছিল।
