কয়েকটা তরমুজ নিয়ে এসে পরতাপের পায়ের কাছে রেখেছিল জামির। তরমুজ চাষের কথায় যে অর্থব চোখে কোনো উৎসাহ আনতে পারেনি জামির, তরমুজের চেহারা দেখে সে চোখ উত্তেজনায় ঝিলিক দিয়ে ওঠে।
পরতাপ শীর্ণ হাতে নেড়েচেড়ে ছুঁয়ে ছেনে তরমুজ দেখে। আঃ, কতদিন পরে খেতের ফসলের স্পর্শ! জামির, তোর খেতে হয়েছে এমন সোনা! আহাহা, কি চেহারা! জামির, আমি তোর খেত দেখতে যাবু। নিয়ে যাবি আমাকে?
আলবত নিয়ে যাব, চাচা।
কেমন করে নিয়ে যাবি? আমি যে হাঁটতে পারি না।
গরুর গাড়িতে করে নিয়ে যা চাচা।
গরুর গাড়ি কোথায় পাবি, জামির? তুই কি গরুর গাড়ি করতে পেরেছিস?
ধার করে নিয়ে আসব। না পাই, কাঁধে করে নিয়ে যাব তোমায়।
তাই চল। তাই নিয়ে চল। কলই যাব আমি।
পরের দিন বৃদ্ধ পরতাপকে গরুর গাড়িতে চাপিয়ে নিয়ে এসেছিল জামির। চাষির মতো মাথায় পরতাপ একটা সাদা কাপড়ের ফালি দিয়ে পাগড়ি বেঁধেছিল, হাতে নিয়েছিল লাঠি। লাঠিতে ভর করে খেতের পাশে দাঁড়িয়ে সামনের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করেছিল পরতাপ। বুক ভরে উত্তাপ আর সুঘ্রাণ নিতে চেয়েছিল সে। তারপর রমজানের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, সুঘ্রাণ পাই না কেন, বাপ?
রমজান বলে, সব ফসলের সুঘ্রাণ থাকে না, চাচা। তরমুজের খেতে কি ধানখেতের বাসে পাওয়া যাবে?
যাবে, আলবাত পাওয়া যাবে। সব ফসলের সুঘ্রাণ আছে। আমার বুড়া নাক তাই লাগে না। বাঃ, ভাল খেত। মন বড় ভরে গেল, জামির। আঃ, আমার হাতে আর জোর নাই। থাকলে তোদের দেখায়ে দিতাম।
উত্তেজনায় লাঠি ধরা হাতটা তার কাপে। জামির তাকে বসিয়ে দেয়। রমজান তার সঙ্গে অনেকক্ষণ ধরে সুখদুঃখের কথা বলে।
সেই তরমুজ কেটে পরতাপের সামনে ধরেছিল জামির। ভালো তরমুজ, চামড়া পাতলা, আগাগোড়া টকটকে লাল। পরতাপ মাড়ি ডুবিয়ে কামড় দিয়েছিল। বলেছিল, জামির রে, এ তরমুজ ক-দিন রেখে দিলে এর মধ্যে দানা হবে নির্ঘাত, মিশ্রির মতো দানা হবে।
সেই তরমুজ নিয়ে জামির এখন রামজানের সঙ্গে হাটের পাইকারের কাছে যায়।
হাটের কাছে নৌকা বেঁধে রমজান নিচে নেমে পাইকারের সঙ্গে কথা বলতে যায়। জামিরকে বলে যায়, নজর কড়া রাখেক, বাজিকরের পো। এ বড় চ্যাচোর জায়গা।
ঘাটভর্তি নৌকা, নানা জিনিসপত্র ফলমূলে ভর্তি। দক্ষিণ থেকে আসা বড় বড় ঘাসি নৌকায় নারকেলের স্তুপ। এদিকে নারকেল বিশেষ হয় না। ভালো দাম পায় ব্যাপারিরা। জামির বড় উত্তেজিত আজ। কতদিন পরে আবার মাঠের ফসল সওদা নিয়ে হাটে এসেছে। আহাঃ ভিখ-মাঙ্গা থু-করা কামে হয়ত আর যেতে হবে না। কম করেও চার পাঁচ হাজার তরমুজ সে ফলিয়েছে। এর জন্য তাকে রক্ত জল করা পরিশ্রম করতে হয়েছে, রমজানের মধ্যস্থতায় মহাজন করেছে, আর এখন সেই ফসল নিয়ে হাটে। আজকের হাটে হাওয়া বুঝে পরের হাটে বেশি মাল আনার ব্যবস্থা করতে হবে। পনেরো দিন বাদে রঘুনাথ ঠাকুরের মেলায় সব বাজিকরদের পাঠাতে হবে তরমুজ দিয়ে। সে মেলায় আকর্ষণই একমাত্র তরমুজ। লোকে বলেও তরমুজের মেলা। হাজার হাজার তরমুজ সেখানে খুচরো বিক্রি হয়। পড়তাও ভালো থাকে। জামির এসব চিন্তায় বিভোর থাকে।
হঠাৎ একসময় মানুষের চিৎকারে তার চমক ভাঙে। একখানা নৌকা বে-আক্কেলের মতো এসে তরমুজের নৌকার উপর পড়ছে। সামাল সামাল করতে করতে আবুর তরমুজ ভর্তি নৌকা ডুবে গেল। সময় থাকতে লাফ দিয়ে আবু অন্য নৌকায় উঠে গিয়েছিল। জামির কিছু বুঝবার আগেস আগন্তুক নৌকার পনেরো বিশজন আরোহী তরমুজের ভারভর্তি নৌকাগুলোর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে তিনখানা নৌকা ডুবে যেতে জামির বৈঠা তুলে নিয়েছিল। আশপাশের নৌকাগুলো থেকে হৈ হল্লা হচ্ছিল, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তারা নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে থাকে। জামিরের বৈঠা একজনের পিঠে পড়ে দু-টুকরো হয়ে গেল। সে তখন চোখের সামনে শুধু ফুলকি দেখতে পায় এবং নিমেষে গলুয়ের নিচে হাত ঢুকিয়ে একখানা বল্লম টেনে বার করে। তরমুজ খেত পাহারা দেওয়ার জন্য এই বল্লম সে নিজের হাতে বানিয়ে নিয়েছিল।
বল্লম তুলে একটা নৌকার উপরে সে আবুকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে। আবুর রক্ত দেখে জামির উন্মাদ হয়ে যায়। সে তার দীর্ঘ দেহ নিয়ে আক্রমণকারী নৌকার উপর লাফিয়ে পড়ে। নৌকা ভীষণ দোল খায়। দু-তিনজন বল্লমে বিদ্ধ হয়। জামিরের হাতের উপর একটা হেঁসোর কোপ লাগে। সে আবার নিজের নৌকায় ফিরে আসে। আক্রমণকারী নৌকাটা পিছোতে শুরু করে। তাদের একজন একটা তরমুজের নৌকায় ছিল। নিজেদের নৌকা দূরে সরে যাচ্ছে দেখে সে ঝাপ দিতে গিয়েও দূরত্ব আন্দাজ করে সাহস করল না। তারপর নিজের বিপদ বুঝে জলে ঝাপ দেওয়ার উপক্রম করতেই পিছন থেকে জামির তাকে আমূল বিদ্ধ করে এবং প্রবল আক্রোশে বল্লমে গাঁথা অবস্থায় জলের ভিতরে চেপে ধরে। প্রবল জিঘাংসায় জলের নিচে চেপে ধরা মানুষটার অন্তিম আলোড়ন সে উপভোেগ করে এবং এক সময় টের পায় মানুষটা আর নড়ছে না। সে চারদিকে তাকিয়ে প্রচুর মানুষ দেখে যারা হতবাক হয়ে তার দানবীয় কীর্তি দেখছিল। সে বল্লমসহ মানুষটাকে ছেড়ে দেয়, তারপরে দুহাতে মুখ ঢেকে নৌকার উপর বসে পড়ে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে তার সমস্ত ইন্দ্রিয় আচ্ছন্ন করে ঘুম আসে এবং সে সেই নৌকোর গলুইয়ের উপর লুটিয়ে পড়ে।
৩৮.
লুবিনি ও অন্য বাজিকরেরা প্রথমে শুনেছিল জামির খুন হয়েছে। খবর পাবার পর তারা অনেকেই সেই গঞ্জের হাটে ছুটে এসেছিল। স্বামীর দুর্ঘটনায় মৃত্যুসংবাদ শুনে কোনো রমণী যেভাবে ছুটে আসে, লুবিনিও সেভাবেই এসেছিল। আলুথালু বেশ, চুল উড়ছে হাওয়ায়, উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি, লুবিনি ছুটছে। কোন দিকে যাচ্ছে, কোন দিকে যেতে হবে সে জানত না।
