ভারি কঠিন প্রশ্ন। পাখি কোনো কথা বলেনি এবং তা শুধু চুপ করে থাকবে বলে নয়, উত্তরটা নিয়ে সে যথার্থী সমস্যায় পড়েছিল বলে।
সে তো মাত্র কয়েকদিনের স্মৃতি। তারপর যতদিন সোজন নদীর পাড়ে একা বসে থাকত ততদিন পাখি সেই জলন্ত অঙ্গারের জ্বালা টের পেয়েছে বুকের উপরে, ভেতরে। তারপর সোজন হারিয়ে যাওয়ার পর ক্রমে টের পেয়েছে তার শরীর এবং মন এখন আর কিছুই চায় না, শুধু একটি সমর্থ পুরুষের শরীর। সে পুরুষ সোজন হোক, আর যেই হোক, এখন আর তার কিছু যায় আসে না।
ফলে প্রথমে ঝোলোপাড়ায় এবং পরে ঝোলোপাড়ার সীমানা ছাড়িয়ে মালোপাড়ায় পাখি অশান্তি ছড়ায়, আর তার পরিণতি হয় মর্মান্তিক।
দুই সন্তানের বাপ নলিন পাখির মোহ এড়াতে পারে না। তবে কে কাকে আগে প্রলুব্ধ করেছে বলা কঠিন। নলিনের চেহারা চিকন কালো, সমর্থ শরীর। অন্তত আজ থেকে পাঁচ-ছ বছর আগে এই চেহারার দৌলতেই সে যোগেন সাঁইদারের মেয়ে ধার্যবালাকে বিয়ে করতে পেরেছিও। না হলে তার যা অবস্থা তাতে সাঁইদারের মেয়ে ধার্যকে বিয়ে করার কোনো কারণ নেই।
নলিন যেহেতু অভিজ্ঞ লোক তাই পাখির সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টা বেশ কিছুদিন গোপন রাখতে সমর্থ হয়। কিন্তু এবারে সে বড় বেশি মজে, কেননা নষ্ট প্রেমে এস বেশি গেজিয়ে ওঠে, নেশা বড় বেশি জমে।
ধার্য যখন টের পায় তখন ভারি হৈ-চৈ করে সে, অশান্তি করে। নিয়মমতো নলিন ক্ষমা চায়, প্রতিজ্ঞা করে। সে অবশ্যই ভুলতে পারে না যে ধার্যর বাপ যোগেন সাঁইদারের কৃপাতেই আজ সে দু-খানা নৌকার মালিক।
কিন্তু এসব প্রতিজ্ঞা থাকে না। নলিন আরো গোপনতা ও অধিকতর চাতুরির আশ্রয় গ্রহণ করে এবং আবার ধার্যর কাছে ধরা পড়ে। নলিনকে ছেড়ে সে এবার পাখিকে নিয়ে পড়ে। পাখি অবশ্যই এপাড়ায় আসে না, কিন্তু ধার্য ওপাড়ায় গিয়ে যদি কখনো পথচলতি পাখিকে দেখতে পায় তাহলে তুমুল গালিগালাজ করে।
এসব ব্যাপারে পাখি আর আজকাল কথা বাড়ায় না। বলে, নিজের মানুষকে ঠিক রাখতে পার না, আমায় বলে কি লাভ! সে অন্যদিকে সরে যায়।
তারপর এই নিত্য অশান্তির হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য ধার্য নিজেই বুদ্ধি বার করে। প্রবল প্রতিহিংসার বিষ তাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে দিচ্ছে। নলিন এখন অন্য রাস্তা ধরেছে। সে পরিষ্কার বলেছে, বেশি ঝামেলা করবি তো একেবারে ঘরে এনে তুলব। যেমন আছিস তেমন থাক।
তা সত্ত্বেও ধার্য ঝামেলা করে এবং প্রতিফলস্বরূপ নলিনের কাছে একদিন প্রচণ্ড মার খায়। মার খাওয়া ধার্যর এই প্রথম। এ ব্যাপারে তার বড় অহঙ্কার ছিল, এখন সে অহঙ্কার ভাঙে। সে একেবারে স্তব্ধ হয়ে যায়।
তারপর একসময় সে ভাবে যে, সে যোগেন সাঁইদারের মতো ক্ষমতাশালী মানুষের মেয়ে, কাজেই এভাবে এসব মেনে নেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়।
ঝালো এবং মালোপাড়ার মাঝামাঝি একটা ছাড়া জায়গায় একটা মজা দিঘি আছে। দিঘি একসময় বড় ছিল। এখন চারদিকে মজা পচা পাক, মাঝখানে ছোট পুকুরের আকারে খানিকটা জল জায়গা। জায়গাটা নির্জন ও আগাছায় পূর্ণ। দুই পাড়ার স্ত্রীলোকদেরই এই জায়গাটা আড়ালে যাওয়ার জন্য দরকার হয়, সে কারণে পুরুষরা এদিকে বড় একটা আসে না। জায়গাটা যেহেতু ভীতিজনক, কাজেই কেউই এখানে একা আসে না। আর প্রত্যেকেরই এই আড়ালে আসার ব্যাপারে একটা নিজস্ব দল আছে। দল যে শুধু এ কাজের জন্য তা নয়, ঘনিষ্ঠতা, গল্পগুজব, প্রাণের কথা বলা, সবই এই আড়ালে আসার আকর্ষণ বাড়ায়।
পাখি শুধু এর ব্যতিক্রম। তার কোনো সঙ্গী সাথী নেই। তার ভয়ডরও নেই। সে একাই আসে, একাই যায়। কোনো স্ত্রীলোেকই তাকে পছন্দ করে না, আবার ভয়ও পায়।
ধার্য তার সঙ্গীদের সঙ্গে কি পরামর্শ করেছিল কেউ জানত না, তার সঙ্গীরাও কতটা গুরুত্ব দিয়েছিল তার প্রস্তাবে তাতেও সন্দেহ আছে। কিন্তু সেদিন সন্ধার আগে ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে পাখি ধার্য ও তার দুই সখীকে সামনে দেখতে পেয়েছিল।
ধার্য সঙ্গীদের কি যেন ইঙ্গিত করে পাখিকে বলেছিল, এই পাখি, এদিকে শোন।
পালাবার জায়গা ছিল না, আর পালাবার কথা পাখি ভাবেওনি। সে বলে, কি বলবে বল, আমার সময় নাই।
ধার্য ঠাণ্ডা গলায় বলে, সময় তোর নাই, জানি। নাগর বইসে থাকলে সময় আর কার থাকে?
বলে পাকা খুনীর মতো ধার্য এগিয়ে এসে পাখির হাতখানা ধরে।
একি হাত ধরিছ কেন?
ধার্য যে যোগেন সাঁইদারের মেয়ে তা তার চেহারাতেই বোঝা যায়। সে অক্লেশে কাধের গামছা পাখির মুখের মধ্যে ঠেসে ধরে। তার সঙ্গীদের বিশেষ সাহায্য করতে হয় না। তারা বরং ঘটনার কার্যকারিতায় হতবাকই হয়ে যায়। আর সবচেয়ে আশ্চর্য পাখি নিজেও খুব একটা বাধা দেয় না। লজ্জা, ভয়ডরের মতো জীবনের উপর আসক্তিও কি তার চলে গিয়েছিল!
ধার্য তাকে টেনে নিকে পাঁকের মধ্যে নেমে পড়ে। পাখি যেন সেই ছাগশিশু যার কান কামড়ে শিয়াল জঙ্গলে টেনে নিয়ে যায়। সে ছটফট করে ঠিকই, কিন্তু তাকে ঠিক বাধা দেওয়া বলা যায় না। ধার্য তাকে পাঁকের মধ্যে চেপে ধরে, প্রথমে হাত দিয়ে, তার পরে পা দিয়ে। পা দিয়ে চেপে সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাঁফায়। তারপর পায়ের নিচে কম্পন কমে গেলে সে পাড়ের দিকে তাকায়, সেখানে তার সঙ্গীরা ছিল না।
৩৭.
পাঁচখানা নৌকা নদীর উপর দিয়ে খুব ধীরে এগোয়। তরমুজে ভর্তি নৌকা খুব ভারি, নৌকার কানা পর্যন্ত জল উঠে এসেছে। পাঁচ নৌকায় হাজার তরমুজ। প্রতি নৌকায় দু-জন করে মানুষ সামনে পিছনে। এক নৌকায় জামির আর রূপা, আরেক নৌকায় রামজান আর আবু, অন্যেরা বাকি নৌকায়। আজ শনিবারের গঞ্জের হাট। পাইকার ব্যাপারীরা আসবে। নৌকা খুব ধীরে এগোয়। রাস্তা তো বেশি নয়, দুপুরের মধ্যেই পৌঁছানো যায় হাটে।
