জামির বলে, কেমন?
নিজেই দেখতে পাবা।
উৎপাত করবে?
উৎপাত। না দিলে বুকে ছুরি বসাবার পারে। সুলতানপুরের আখের চাষই উঠে গেল এই উৎপাতে। একশো বিঘার খেত এরা আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে, সে জানো?
পুলিশে খবর দেয় না মানুষ?
পুলিশে খবর দেবে? যাবার হবে না তোমারে গঞ্জের হাটে, টাউনের বাজারে? সেথায় এরাই তোমার জীবনমরণের হকদার।
বেশি অপেক্ষা করতে হয় না। নৌকা করে ছোকরারা এসে খেতের কাছে। নামে। রমজান গম্ভীর হয়ে থাকে। দলের মাতব্বর ছোকরা এগিয়ে এসে বলে, চাচা, তরমুজ খাব। রমজান বলে, আলবাৎ খাবা। তবে গাছেৎ কেহ হাত দিয়েন না, বাপেরা। দুটো ছিড়া দিছি, খুশি মনেৎ চলি যান।
দুটা! আমি দশজনা, চাচা। কম করে পাঁচটা তো চাইই।
অত খাবার পাবেন না বাপেরা। এক একটার ওজন দেখিছেন পাঁচ সের, ছয় সের। লষ্ট করার সামগগিরি লয়, বাপ। ওরে আবু দুডা তরমুজ ছিড়া দে, বাবুগেরে।
ছোকরারা উচ্চ হাসে। কেউ মন্তব্য করে, দুটা? আঁ? মগের মুলুক।
একজন ততক্ষণে খেতের ভেতর থেকে একটা তরমুজ ছিঁড়ে ফেলেছে। গাছটার দফা শেষ। মাঝামাঝি জায়গায় লতাটা ছিঁড়ে গেল। তার মানে বাকি ফলগুলোর দফা শেষ।
আবু লাফ দিয়ে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। বলে, এডা কি করলেন? গাছটার শব্বেনাশ করলেন?
ছোকরা পাত্তা দেয় না। বলে, আবিদ্বাপ, লাপাচ্ছে দেখো, যেন মারবে!
রমজান উঠে দাঁড়ায়। কাছে এসে বলে, আগেই আপনাগেরে নিষেধ করলাম, গাছেৎ হাত দিবেন না, শুনলেন না কথাটা?
মাতব্বর ছোকরা বলে, বেকুব, অতি বেকুব এই ছোকরা, বুঝলে চাচা? তা যাকগে, অঢেল হয়েছে এবার তোমার, দু-চারটা নষ্ট হলে গায়ে বাজবে না। এই, পাচটার বেশি তুলো না।
দলপতির নির্দেশ ছোকরারা খেতের মধ্যে ঢোকে। জামির ভাল করে দেখে এদের। বিশ বাইশ বছরের বাবুঘরের ছেলে সব, কেউই শিশু নয়। আর দেখ, কী অত্যাচার।
রমজান হাঁ-হাঁ করে ওঠে, আরে করেন কি? করেন কি?
দলপতি ছোকরা রমজানের দুই ঘাড়ের উপর হাত দিয়ে চেপে বসিয়ে দেয়। মুখে বলে, একদম কথা নয় চাচা। ভালোমুখ করে খেতে চাইছি, ভালোমুখে দিয়ে দেও।
রমজান হতভম্ব হয়ে যায়। আবু, রমজানের দ্বিতীয় ছেলে, লাফ দিয়ে গিয়ে খেতের মাঝখানে দাঁড়ায়। বলে, খবরদার খেতের বাইরে যান সব। তার হাতে একটা হেঁসো।
জামির দেখে, যে খেতের মধ্যে ছোরারা ঢুকেছে সেটা তারই। সে এবার তার বিশাল দেহটি নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। কটিদেশের সামান্য বস্ত্রখণ্ড ছাড়া তার সারা শরীরই উলঙ্গ। সে ধীর পদক্ষেপে তার খেতের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ায়। ছোকরারা তাকে দেখে গাছ থেকে হাত সরিয়ে নেয়। জামির শান্ত অথচ স্থির যায় বলে, খেতের বাইরে যান, বাবুরা।
এ কথায় কাজ হয়।
সব ক-জন গিয়ে মাতব্বরের পাশে দাঁড়ায় এবং ক্ষুব্ধ চোখে জামিরকে দেখে।
জামির নিজে খেতের বাইরে এসে বলে, রমজান ভাই দুডা দিবার চায়েছেন, সাথে আপনাগেরে হবে?
জামিরের হাত দুটি বড় বেশি লম্বা, আর তার উপরে মোটাসোটা শিরাগুলো ঈষৎ আন্দোলনেই সাপের মতো কিলবিল করে ওঠে।
জামির হাতের তালু দু-টিকে হতাশায় ভঙ্গিতে উল্টে দেয়। বলে, তবে লাচার। মেহন্নতের ফসল, বাবুরা, হারামের না। আর এটটা কথা, এই বুড়া মানুষটাকে অপমান করে ঠিক করলেন না। আপনার বাপের বয়সী লোক।
কি অপমান করলাম?
ওনারে ঘাড়ে হাত দিয়ে সালেন না আপনি? ইটা ঠিক লয়।
এতে অপমান হোল?
হোল। আর এতে মানে হয়, ওই বুড়ার থিকা আপনার গায়েৎ জোর বেশি। বুড়ার থিকা যে জোয়ানের গায়েৎ জোর বেশি, ইটা দেখাতে কি পোরমানের দরকার হয়? খ্যামতা থাকে আপুনি ওই বুড়ার বেটার ঘাড়ে হাত দেন।
জামির ইঙ্গিতে আবুকে দেখায়।
সর্দার ছোকরা চাপা ক্রুদ্ধ নিশ্বাস ছাড়ে। বলে, দরকার হলে তাও পারি।
আরেকজন এগিয়ে এসে বলে, তুমি কে চাঁদ? তোমাকে তো চিনলাম না?
আমি এক চাষা, দেখবাই পাচ্ছেন।
কথাটা বলতে পেরে এই স্থির সময়েও জামিরের বুকটা ভরে ওঠে। চাপা উত্তেজনার কম্প তার ভিতর থেকে যেন কেটে যেতে থাকে। সে বলে, দুডা লয়, তিনডা তরমুজ নিয়া চলি যান বাবুরা।
দলপতি পিছন ঘুরে দাঁড়ায়। জামিরের উদারতায় কান দেয় না। তারপর মুখ ঘুরিয়ে বলে, চাষা তুমি নও। তবে তুমি কে সে খোঁজ করব।
দলটা গিয়ে আবার নৌকায় ওঠে। জামির নৌকাটাকে চলে যেতে দেখে রমজানের পাশে এসে বসে। কিছুক্ষণ সবাই চুপচাপ বসে থাকে। রমজান বলে, কাজটা খারাবি হোল।
আবু বলে, ভালো কোন্ কামটা? খ্যাতটা নকরা-ছকরা করবা দিলে সিডা ভালো হোত?
রমজান বলে, এরা ঝামেলি পাকাবে।
জামির এতক্ষণের ঘটনা থেকে স্থির মাথায় সারসংক্ষেপ করে। শেষে বলে, রমজান ভাই, গরিবের সবেতেই ঝামেলি। এসব ঝামেলি নিয়াই বাঁচবা হবে, নচেৎ ভিখ মেঙ্গে খাওয়া লাগে।
৩৬-৪০. পাখি একটা ঘোরের মধ্যে চলছিল
পাখি একটা ঘোরের মধ্যে চলছিল। কেননা তার দেহের প্রয়োজনটা ছিল বড় বেশি। যতদিন সে তা জানত না ততদিন তো কোনো অশান্তি ছিল না। কিন্তু সোজন তাকে সেই অনুপম উদ্যানে হাত ধরে নিয়ে গিয়েছিল, যেখানকার বাতাস পর্যন্ত এমন স্বয়ংসম্পূর্ণ যে, একমাত্র পেটের খিদে ছাড়া অন্য যাবতীয় প্রয়োজনকে মানুষ হেলায় দূরে সরিয়ে রখেতে পারে। অন্তত পাখির তাই মনে হয়েছিল।
তখন এক রাতে সোজন বলেছিল, এই এখন তোর আমার দুই বুকের মাঝখানে যদি একটুকরো জ্বলন্ত কয়লা রাখা যায়, তাহলে কি হবে?
