সোজন তারপর তাদের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে ঘুঘুর ফাদে ঘুঘু ধরতে দেখে। এইভাবে নলুয়াদের সাথে ঘুরতে ঘুরতে সোজন একদিন তাদের সঙ্গেই কোথায় চলে যায়। জামির অনেক খোঁজ করেও তাদের হদিস করতে পারে না। শুধু জানতে পারে নদীর ওপারে মুর্শিদাবাদে কোথায় যেন গিরিয়া প্রান্তর আছে। বর্ষার সময় সব নলুয়ারাই সেখানে আশ্রয় নেয়। গিরিয়াই তাদেরনির্দিষ্ট ঠিকানা, কিন্তু বছরের এই সময় তাদের খোঁজ করা বৃথা। জামির, জিল্লুর কাছে মুখ দেখাতে পারে না।
পাখি আর নদীতীরে সোজনকে দেখে না। পরে সে সব শোনে এবং এতদিনে যথার্থই নিরাশ্রয় হয়ে যায়। প্রচণ্ড হতাশা তাকে কুরে কুরে খায়। কেননা সে পুরুষমানুষের দেহের স্বাদ পেয়েছিল, আর সে পুরুষ ছিল সোজনের মতো সুদর্শন জোয়ান। যে কারণে খগেনের মতো বয়স্ক মানুষও তাকে প্রলুব্ধ করার সাহস পায় সে কারণ এটাই। খগেন এবং খগেনের মতো অভিজ্ঞ আরো অনেকে জানত পাখির পক্ষে সতীসাধ্বী হয়ে থাকা সম্ভব নয়। কাজেই সন্ধ্যার পরে তার ঘরের পিছনে শিসের ঝড় উঠত কিংবা কাশি শোনা যেত। চলতে ফিরতে একাকী বহু সময়ই মানুষ তাকে প্রকাশ্যে ইঙ্গিত ছুঁড়ে দিত কিংবা সরাসরি প্রস্তাব করত খগেনের পদ্ধতিতে।
পাখি প্রথম প্রথম রাগলেও, পরে আর রাগে না এবং একসময় আবিষ্কার করে যে সে এসব উপভোগ করতে শুরু করেছে। তার অভ্যন্তরের চাহিদা ও দহন তাকে নিরুপায় এক ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে বুঝে সে শেষ চেষ্টা করে। অর্থাৎ সে চেষ্টা করে ও প্রস্তাব করে দেখে এসসব মানুষের মধ্যে কেউ তাকে বিয়ে করে মর্যাদা দিতে রাজি আছে কিনা। কিন্তু এমন কাউকে সে পায় না। আর তার বিয়ের ব্যাপারে তার বাপেরও কোনো মাথাব্যথা নেই।
ফলে পদ্মাপারের মালো এবং ঝালোদের পাড়ার স্ত্রীলোেকদের কাছে অচিরেই সে এক রাক্ষসীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় ও ঘরে ঘরে অশান্তির আগুন জ্বালিয়ে দেয়। এতে সে প্রতিহিংসা চরিতার্থতার তীব্র আনন্দও পায়।
৩৫.
রমজানের সহায়তায় শেষপর্যন্ত তরমুজের চাষ করে জামির ও আরো দু-জন বাজিকর। কিন্তু সে বড় সহজে হয় না। প্রথম দিন রমজানের সঙ্গে কথাবার্তা শল সে এসেছিল পরতাপের কাছে পরামর্শ করতে। চাষের কাজে পরতাপই তো তার শিক্ষাদাতা। কিন্তু যা এতদিন লক্ষ্য করেনি, চাষের কথায় এখন জামিরের নজরে আসে। হায়, পরতাপ এখন এক অতিবৃদ্ধ, রুগ্ন অথর্ব। নমনকুড়ির সেই কর্মী মানুষটা কোথায় হারিয়ে গেছে। জামিরের প্রস্তাবে তার চোখ এখন আর লিক দিয়ে ওঠে না। জামির দেখতে পায়, আর সব দরিদ্র বৃদ্ধের মতো পরতাপ গগন দিন গুনছে।
জামির তবুও আরো দু-একজনের সঙ্গে কথা বলে, তারপর রমজানের সঙ্গে কাছারিতে গিয়ে চাষের ইজারা নেয়। কিন্তু তরমুজের চাষে এত ঝামেলা সে কি নিত? অথবা জানলে কি এ কাজে এগোত? হয়ত, এগোত। জামিরের স্বভাবই এই, একবার কোনো কাজ করবে স্থির করলে শেষপর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে। কিন্তু একথা তাকে ভাবতেই হয় যে, পুরো ব্যাপারটা সে আগেভাগে ভালো করে বোঝেনি এবং এ কাজের বিভিন্ন দিক ঠিকভাবে ভেবে দেখেনি।
কেননা রমজানের যাহোক রকমের ঘর-গেরস্থালি ছিল। কাজেই সার, গোবর, চাষের আনুষঙ্গিক শতেক জিনিসের, যা আপাতদৃষ্টিতে খুবই নগণ্য, আয়োজন ছিল। জামিরের সেসব ছিল না। তাছাড়া তরমুজ দীর্ঘ সময়ের চাষ, এই দীর্ঘ খরার সময় নদী থেকে অব্রিাম জল টেনে আনা ও গাছের গোড়ায় ঢালাতে যে কি ধরনের ধৈর্য ও পরিশ্রমের দরকার, একথা ভুক্তভোগী ছাড়া আর কেউ বুঝবে না।
তবুও বীজ থেকে যখন তরমুজলতার প্রাথমিক পাতা দু-টি বের হয়, তখন আমিরের বড় উত্তেজনা হয়। সেই নবীন পাতাকে সূর্যের উত্তাপ থেকে বাঁচানোর এনা পাততে হয় খড়ের বিছানা, কলাগাছের খোলের ঢাকনা। সে যেন শিশু মানুষ করা। যতদিন না লতা বহমান হয়, ততদিন বড় তিতিক্ষা। তারপরেও কি রেহাই আছে? লতা যখন বালির উপর দিয়ে পল্লবিত হয়, ফুল-জালি আসে তখন আরম্ভ এ রোগ আর পোকার আক্রমণ। ধসা হল লতার কুষ্ঠ, যাতে গাছের গোড়া থেকে পচতে শুরু করে। তাছাড়া আছে কাটাপোকা যা লতার যে কোনো জায়গা কেটে দু-টুকরো করে দিতে পারে।
রমজানের নির্দেশে জামির লড়াই করে। পেটে খোরাক জোটে না সবদিন। তরমুজের খেতে কাজ করতে হয় বলে গঞ্জের ঘাটে কুলির কাজে যেতে পারে না। লুবিনির সামান্য রোজগারের উপর নির্ভর করে থাকতে হয়।
তারপর সেইসব জালিতে ফল আসে, ফল ক্রমশ বড় হয়। নতুন জালি আসে, ভ্রমর আর মৌমাছি সারা খেতে উড়ে বেড়ায়, প্রজাপতি লতার উপর দোল খায়। তারপর ফলের রঙ সাদা থেকে হালকা সবুজ হয়, তারপরে গাঢ় সবুজ, তারপরে ক্রমে কালো রঙের বৃহৎ আকারের তরমুজ খড়ের বিছানায় চুপচাপ শুয়ে থাকে।
এসব দেখে রমজানের মতো জামিরের কলিজা ঠাণ্ডা হয়, খিদের পোকা আর পেটের ভেতর মোচড় মারে না, অথবা মোচড় মারলেও, আর তেমন করে মালুম হয় না জামিরের।
তারপর চৈত্রের শেষে যখন তরমুজ হাটে নিয়ে যাওয়ার জন্য তোড়জোড় শুরু হয়, তখন তরমুজ খেতের আসল দুশমনেরা এসে হাজির হয়। এরা ধসা রোগ বা কাটাপোকার থেকেও ভয়ঙ্কর। এদের বাগ মানানোর কোনো উপায় রমজানের জানা নেই।
এরা সব শহর ও আশপাশের বাবুঘরের জোয়ান ছেলে। দূরের থেকে তাদের আসতে দেখে রমজান বলে, পতিবার ভাবি আর তরমুজের চাষে যাব না, এত উৎপাত আর সহ্য হয় না। কিন্তু মন যে মানে না। এত পরিশ্রমের ফসল, দেখ, এখন কেমন নিজের হাতে লুটেরার কাছে তুলে দিতে হয়।
