তারপর অন্যদের কাছে বলে, এজন্যিই বিয়া বিয়া বাই উঠিছিলি, কী যে মানুষের লোভ!
পাখি অন্য সবার সঙ্গে পতিতপাবনের শ্রাদ্ধের নেমন্তন্ন খেয়ে আসে এবং এজন্য কোনো হীনম্মন্যতায় ভোগে না। সে বরং হেসে হেসেই সবার সঙ্গে কথা বলে। এতে অন্যেরা, বিশেষ করে পুরুষেরা তার দিকে বেশি আকৃষ্ট হয়। কেননা পতিতের শ্রাদ্ধে পাখির খেতে আসা ও তার হাসাহাসি পুরুষেরা বেহায়াপনা বলেই ধরে নেয়। আর রসিক মানুষ যদি কোনো স্ত্রীলোককে বেহায়া ধরেই নেয়, তাহলে তার বিপদের অন্ত থাকে না। তার থেকেও বড় কথা, পাখি হাতফেরতা স্ত্রীলোক। কোনো রমণী হাত-ফেরতা হলে লোভী মানুষ তাকে খুবই সহজলভ্য বলে ধরে নেয়। এতে ইদানীং পাখির বড় বিপদের আশঙ্কা হয়। তাকে অনাবশ্যক সতর্ক থাকতে হয়।
সতর্ক থাকতে হয় বয়স্ক মানুষদের কাছ থেকেও। যেমন খগেন, সে অবান্তর ঘনিষ্ঠতা করতে এসে বলে, খুব যাহোক সিদিন বুড়ার ছেরাদ্দ খায়ে আলি। কা-আনডো!
খগেন দাওয়ার উপর উঠেই বসে। অযাচিতভাবে আবার বলে, বুড়ার সাথ বিয়া না বসে ভালোই করিছিস, না হলে দেখ খামোকা অকালে বিধবা হবার হোত।
পাখি তাকে একেবারেই উসকাবার সুযোগ দেয় না। দেয়ালের মতো মুখে বলে, বাবা বাড়িত নাই, কিছু কথা থাকলে পরে আসবা পারেন।
বেহায়া খগেন হাসে। বলে, নীলাদার কাছে আসিছি আমি? যাছিলাম রাস্তা দিয়া, ভারি জল তেষ্টা পায়লো। এক ঘটি জল দে পাখি, খাই।
জল চাইলে আর মানুষ না করে কি করে! পাখি ভিতর থেকে জল এনে দাওয়ার উপরে রাখে।
খগেন পাখির মুখের দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জের মতো হাসে, তারপর চোখ মটকায়, বলে, খালি জলই খোয়াবি? আর কিছু খোয়াবি না?
পাখির চোখ মুহূর্তে ঝিলিক দিয়ে ওঠে। এই লোকটা প্রতিবন্ধক না হলে হয়ত সোজনকে ছেড়ে আসতে হতো না তাকে। আর এখন এ জানোয়ার
সে মুখে বলে, খোয়াচ্ছি দাঁড়ান।
সে ভিতরে যায়। বেড়ার পাশে দাঁড় করানো আছে তিন নলা মাছ-ধরা কোচটা। মোটা লোহার তিনটে শলাকা ত্রিভুজের আকৃতিতে লম্বা বাঁশের হাতলে আটকানো। তিনটা ফলাতেই বর্শির মতো উল্টো দিকে টানা আ। সে কোচটা হাতে নিয়ে বাইরে আসে।
এডা দেখিছেন?
খগেন লাফ দিয়ে দাওয়া থেকে নিচে নামে। ওরে বাপরে, এ যে একেবারে আলাদ সাপ, যেন এখুনি ছোবলাবে।
সে শুধু মুখে বলে, অ্যাই, অ্যাই, পাখি—আরি না, সি কথা লয়-আরি!
পাখি তার পিছনে পিছনে দাওয়া থেকে নামে ও বোঝে, এই তার মওকা। এ সময় চেঁচাতে হয় ও গালিগালাজ করতে হয়। এবং সে তা করেও। ভর দুপুরের সময় এমন কাণ্ড। পাখির গলা শুনে মানুষজন ঘরের থেকে বের হয়, এদিক সেদিক থেকে এগিয়ে আসে।
পাখির চিল্কার আরো বাড়ে, মাতব্বর, ঝালোর মাতব্বর। বড় জলের তিয়াস মাতব্বরের! আগো, তোমরা জল দেন মাতব্বরকে। আবার কথা কি, খালি জল খোয়াবি? দেখিছ এই ট্যাডা? নাড়িভুড়ি বার করি দিমো, তবে আমি এক বাপের বেটি!
খগেন পালাতে পারে না। তোতলাতে তোতলাতে সে যা বলে, তা হল, অ্যাই দেখ আরি, আমি একটু জল খাবার চালাম, তা দেখ—ইসব কিসব আকথা-কুকথা? আঁ? আমি
অর্থাৎ খগেন এখন আত্মরক্ষার ভূমিকায়। ছোরারা অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে টিটকারি দেয়। খগেন সরে পড়ে। তারপরেও পাখি বেশ খানিকক্ষণ চেঁচায়।
নীলু এরপরে আসে, ভিড় দেখে, পাখির চিৎকার শোনে এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে। তারপর যেন কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে একপাশে রাখা মাটির কলসি থেকে জল ঢেলে পা ঘোয়, মুখ হাত পোয় এবং গামছা দিয়ে মুছতে মুছতে ভিতরে ঢুকে যায়। এসবে তার কিছু যায় আসে না।
কিন্তু পাখির দিন এভাবে যায় না। অন্য সবার মতোই নদীর তীরে সে সোজনকে নিঃসঙ্গ বসে থাকতে দেখত। তার বুক খাক হয়ে যেত, কিন্তু তবুও সবকিছু ভাসিয়ে দিয়ে, অস্বীকার করে সোজনের কাছে যেতে পারত না। সে সবসময়ই বাজিকর বৃদ্ধদের আকুল আবেদনের কথা মনে রাখত। কেননা তারা সব ঘরপোড়া গরু এবং পাখি সোজনের সম্পর্কের মধ্যে দেরিতে হলেও সিদুরে মেঘ দেখতে পেয়েছিল ঠিকই।
তারপর সোজন একদিন হারিয়ে গেল। নদী পার হয়ে দশ-পনেরো জনের একটা নলুয়া বাদিয়ার দল এপারে এসেছিল। এদের মূল জীবিকাই হল পাখি ধরা ও পাখি মারা। নানারকম কৌশল তাদের পাখি মারবার। তার মধ্যে সবচেয়ে বিচিত্র পদ্ধতি হল বাঁশের নল দিয়ে মারা। এক গোছা বাঁশের নল থাকে এদের প্রত্যেকের হাতে। প্রথম নলটির মাথায় থাকে একটা লোহার ছুঁচলো কাটা। গাছের পঁচিশ ত্রিশ হাত উঁচুতে পাখি থাকলেও এই নল দিয়ে অদ্ভুত নিপুণতায় তারা পাখি মারতে পারে। গাছের নিচে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে একটা নলের পিছনে আরেকটা নলকে জোড়া দিয়ে দীর্ঘ করে। পাখি উপরের নলটির কাছাকাছি হলে আচমকা গেটের নিচ থেকে খোঁচা মেরে পাখিকে বিদ্ধ করে। এভাবে নল দিয়ে পাখি শিকার করে বলে তাদের নাম নলুয়া বাদিয়া। পাখির মাংস ও নানারকম পোমানা পাখিও এরা বিক্রি করে।
নিঃসঙ্গ সোজন নলুয়াদের পাখি শিকার ও পাখি ধরার পদ্ধতিতে প্রথমে আকৃষ্ট হয়। তার সামনে একদিন নলুয়ারা কয়েকটি টিয়াপাখি ধরল অদ্ভুত কায়দায়। তীব্র আঠা মাখা একটা পাখির দাঁড় দড়ি দিয়ে গাছের ডালে প্রথমে তারা ঝুলিয়ে দেয়। তারপর সময় বুঝে একটা পোষা টিয়াকে ছেড়ে দেয়। টিয়া গিয়ে ঝাঁকে বসে, ভাব আদান প্রদান করে বনের পাখির সঙ্গে। তারপর একসময় শেষে এসে সেই আঠা লাগানো দাঁড়ে বসে। বনের পাখিরা এই নতুন সঙ্গীর চালাকি ধরতে পারে না, তারাও এসে দাঁড়ে বসে ও আঠায় পা আটকে ফেলে। নলুয়া তখন দড়িতে ঢিল দিয়ে দাঁড় নামায় ও পাখি ধরে।
