যতদিন পর্যন্ত এই দিয়াড়া দু-টি উলঙ্গ ছিল, ততদিন কোনো ঝামেলা হয়নি। এই শিশু অবস্থা খুব কমদিনের নয়। তারপর ক্রমে দিয়াড়া আরো উঁচু হয় এবং সবুজের সাজপোশাক পরে মনোরম হয়। আর তখনি শুরু হয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা। স্থানীয় অবস্থাপন্ন মুসলমান চাষিরা দ্বীপ দুটির দখল নেওয়ার জন্য আশপাশের জমিদার কাছারিতে চক্রান্ত করতে থাকে। হালদাররা জালিক কৈবর্ত হলেও যাদেরই সামান্য সহায় সম্বল আছে, তারাই চাষের সময়ে মাঠে নামত। দ্বীপ দুটি তাদের আয়ত্তের মধ্যে থাকায় তারা অবসরমতো কিছু-কিছু ধান ও কলাই ছড়াত এখানে। পলির প্রলেপ পড়া দ্বীপে বিনা আয়াসেই ফসল হচ্ছিল ভালো।
দিয়াড়া ও চর দখল কিংবা বেদখলের কৌশল একটাই। হঠাৎ প্রচণ্ড শক্তি প্রদর্শন করে জানান দিয়ে হয় দখল। আর বেদখলে শক্তিপ্রদর্শন হয় নির্মম ও চরম। ফলে লাশ পড়া একটা প্রায় নিয়মের ঘটনা। এতে অন্য কোনোরকম বোঝাপড়ার অবকাশ নেই।
মুসলমান জোতদাররা এক সিকস্ত জমির ক্ষতিপূরণ হিসাবে এই দিয়াড়া দুটি প্রায় দাবির আকারে উপস্থিত করে। পদ্মায় যেহেতু সিকস্ত তটের অভাব নেই, কাজেই দাবিদারেরও অভাব হয় না। সিকস্ত জমির একটা গ্রহণযোগ্য মানবিক আবেদন থাকে যার সঙ্গে আইনের কোনো সম্পর্ক না থাকলেও মানুষের সমর্থন পাওয়া কঠিন নয়।
কিন্তু হালদাররাও ছাড়ার পাত্র নয়। এই কুমারী দ্বীপ দুটির মালিকানা যেন তাদের প্রকৃতিদত্ত। কাজেই বেদখলের লড়াই দীর্ঘদিন যাবৎ ক্ষেপে ক্ষেপে এবং বেশ তীব্র আকারেই হয়। বেশ কয়েকটি লাশ পড়ে। শেষপর্যন্ত একটা অঘোষিত চুক্তিতে উভয়পক্ষ কিছুকাল স্থির থাকে। এই চুক্তির কারণ মুসলমান জোতদাররা হালদারদের হাত থেকে অপেক্ষাকৃত ছোট দ্বীপটি ছিনিয়ে নিতে সমর্থ হয়েছিল। তারা অবশ্য আপাতত কিছুটা দম নেবার জন্যই থেমে গিয়েছিল। কিন্তু হালদাররা নিজেদের স্তোক দিয়েছিল এই ভেবে যে, প্রতিপক্ষ যদি ছোট ভূখণ্ডটি নিয়ে শান্ত হয়, তত খারাপ কি? বড়টা তো রইল নিজেদের দখলে। সুতরাং একটা অস্বস্তিকর শান্তি বিরাজ করে যার আড়ালে গোপন প্রস্তুতি চলে।
দূর থেকে দ্বীপ দুটিকে ভারি চমৎকার সবুজ দেখায়। জামির দ্বীপ দেখতে দেখতেই সোজনকে দেখে। সোজনকে দেখে তার মন বিষণ্ণ হয়ে যায়। দ্বীপ এবং সোজন, এই দুই বিষয়ই তাকে এক নিমিষে নমনকুড়িতে নিয়ে যায়। দ্বীপ দুটির ফসলের প্রাচুর্য তার মনে নমনকুড়ির স্বল্পস্থায়ী কৃষকজীবনের মধুর স্মৃতিতে আলোড়ন করে, আর সোজন তাকে স্বার্থপর বেদনায় নিষিক্ত করে। সে সোজনের উপর নিষেধ আরোপ করেছে, অথচ রাধার ব্যাপারে নিজেকে শাসন করতে পারেনি।
সোজনের পিছনে গিয়ে সে দাঁড়িয়ে পড়ে, সোজন টের পায় না। একটু ইতস্তত করেসে স্নেহের কণ্ঠে বলে, সোজন
সোজন ফিরে তাকায় না।
জামির পিছন থেকে তার মাথায় হাত রাখে। সোজন মুখ ঘোরায়, তারচোখের বেদনার সঙ্গে বিরক্তি মিশ্রিত হয়। সে কিছু বলে না, জামিরের চোখে বিষণ্ণ স্নেহ। সোজন আমল দেয় না। সে হঠাৎ উঠে নদীর ঢালের দিকে নেমে যায়, পিছনে ফিরে তাকায় না।
জামির অপমান বোধ করে না, দুঃখ পায়। আহা, ছেলেটাকে দিওয়ানা করে দিলাম, সে ভাবে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে সোজনের চলে যাওয়া দেখে। সূর্য হেলে পড়েছে, বালির উপর দীর্ঘ ছায়া ফেলে সোজন জলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। দমকা ঘূর্ণি হাওয়া ‘ডানের কুটো’ উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে নাচের ভঙ্গিতে। জামির আরো বেশি করে চিন্তা করে, সোজন ও সমস্ত বাজিকর সন্তানদের স্থিতি দিতে হবে। স্থায়িত্ব একান্তই দরকার। আর সেজন্য পদ্মার বালিয়াড়িতে তরমুজের চাষ দিয়েই শুরু হোক না নতুন করে।
ফিরে যাওয়ার আগে জামির দেখল নদীর পাড়ে বাঁধা অনেকগুলো জেলে নৌকোর একটা গলুইয়ের উপর উঠে সেজন আবার একই ভঙ্গিতে বসে পড়েছে।
৩৪.
মাতব্বর খগেন পতিতের দেনার দায় থেকে মুক্ত হয় না। পাখি ফেরত এলেও পতিতের বউ হতে তার ঘোরতর আপত্তি। একথা একবার তার বাপ বলতে গিয়ে মেয়ের কাছে এমন চোপা শোনে যে দ্বিতীয়বার এ প্রসঙ্গ ওঠাতে আর সাহস পায় না।
পতিত বলে, খগেন, হয় টাকা ফেরত দে, না হয়তো পাখিরে এনে দে।
কেননা পাখির টোপে খগেন আরো কিছু টাকা নিয়েছিল পতিতের কাছ থেকে। সে বলে, ভালো মুশকিল! তুমি এটু ধৈর্য ধরবা পারেন না? এ কি এক কথার কাম?
ধৈর্য! ধৈর্য কি রে শালো? আমগাছটা কাটার সময় পর্যন্ত তুমি আমারে ধৈর্য ধরাবার চাও, না? তোমার মতলব বুঝি না। আমার ধৈর্য ধরার সময়ে আছে রে হারামজাদা?
তবে কি ভাবিছেন, পাখি এক্কেরে নাপাতে নাতে আসে তোমার গলায় মালা দিবে?
ও-রে-স-শালা! ও-রে-স-শা। তুই তো মানুষ জ্যান্ত খুন করবি। আঁ! এই কদিন আগেই কলি সব ঠিকাক?
হবে, হবে এত ব্যস্ত হয়েন না দেখি।
কিন্তু হয় না। পাখির যা মুখচোখের ভাব, খগেন তার কাছে ভিড়তেই সাহস পায় না। তার বাপকে বললে উল্টো দু-কথা এখন শুনিয়েই দেয় নীলু। কাজেই খগেন এখন পালিয়ে বেড়াতে থাকে পতিতের কাছ থেকে।
শেষপর্যন্ত পতিত তাকে ও অন্য সবাইকে রেহাই দিয়ে যায়। এসব ঘটনার মাস দুয়েকের মধ্যে সে মরে। এমন কিছু অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। বয়স তো ষাটের উপর হয়েছিলই, কয়েকদিনের জ্বরে সে মরে যায়।
আমগাছটা কাটার সময় তার ছেলেদের কাছে এসে খগেন হা-হুতাশ করে, আহাহা, কি মানুষটাই ছেল! পুণ্যিমান লোক, তাই ভোগান্তি বেশি হোল না, যেমন পড়া তেমন মরা।
