জামির বলে, ও মেয়া ঘুরাই দিবার হবে।
সোজন ভয়ে ভয়ে বলে, না।
জামির চিৎকার করে তাকে সতর্ক করে, সো-জ-ন!
সোজন বেশ কিছু সময় চুপচাপ সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে, তারপর ধীর পায়ে চলে যায়।
জামির হেমন্তকে বলে, কাল তুমাদের মেয়াক্ ফিরত পাবা, হালদার। আজ যাও।
হেমন্ত যেমন চেয়েছিল তেমন হয় না। সে ভারি দুঃখ পায়। একসময় চক্রান্ত করার ভঙ্গিতে ফিসফিস করে বলে, বাজিকর উয়াদের কহেক পালাই যাবার।
জামির একটু হাসে। বলে, তা হয় না হালদার। তুমু তো বাজিকরের তাম্বুতে জম্মাও নাই, তুমু ইসব বোঝবা না।
পরদিন পাখি ফেরত চলে এসেছিল। সোজন তার পাশাপাশি অনেকদূর পর্যন্ত এসেছিল। তারা কোনো কথা বলেনি, তবুও তাদের উভয়ের মনই প্রচণ্ড বাঙময় হিল। সেখানে ছিল অজস্র কথা। ঝালোপাড়ায় ঢোকার বেশ খানিকটা দূরে একটা গাছের নিচে পাখি দাঁড়িয়ে পড়ে। বলে, আর নয়, বাজিকর, ইবার ঘুরে যাও।
সোজন তার চোখে চোখ রাখে। চারদিকে গ্রীষ্মের দুপুরের স্তব্ধতা। সামনে কিছু দূরে পদ্মার বালিয়াড়ি, তারপরে পদ্ম। পাখি সেদিকে তাকিয়ে ঘূর্ণি হাওয়ায় খড়কুটো ঘুরপাক খেয়ে ছুটে যেতে দেখে। কিন্তু সোজনের চোখ তার মুখে।
সোজন তার মুখ দু-হাতে তুলে ধরে। পাখি দুর্বল হাতে সোজনের হাত সরিয়ে দেবার চেষ্টা করে। বলে, লোভ কোরো না বাজিকর, এ লোভের তো শেষ নাই।
অথচ সোজনকে সে সত্যিই বাধা দিতে পারে না। সোজন তাকে বুকের মধ্যে পিষ্ট করে। বলে, আর দেখা হবে না, পাখি? পাখি কষ্টে নিজেকে মুক্ত করে। বলে, এক দেশে বাস, দেখা তো হতেই পারে। কেন্তু তাতে লাভ? সি তো খালি কষ্ট, বাজিকর!
দু-টি অল্প বয়সের তরুণ-তরুণী শিশুর মতো কাঁদে পরস্পরকে ধরে। তারপর একসময় হাত ছাড়িয়ে পাখি দৌড়ে খানিকদূর এগিয়ে যায়। আকুল আগ্রহে সোজনের দুই হাত তাকে ধরবার আগ্রহে সামনে বাড়ানো অবস্থায় থমকে থেকে যায়। পাখি ছুটতে থাকে, মাটির ঢেলার আঘাত লেগে একবার পড়ে, আবার সে উঠে ছোটে। তার আঁচল মাটিতে লুটোয়। সে ভ্রুক্ষেপ করে না। সোজন সেভাবেই দাঁড়িয়ে থাকে।
৩৩.
গঞ্জের ঘাটে রমজান এবং তার গ্রামের বেশ কয়েকজন হঠাৎ অনুপস্থিত হতে শুরু করল। জামির বিষয়টা প্রথমে স্বাভাবিক অনুপস্থিতি বলে ভেবেছিল। কিন্তু পাঁচ-ছ-দিন পর পর না আসতে দেখে সে খবর নিতে একদিন দুপুরে রমজানদের গ্রাম মামুদপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। মামুদপুর পর্যন্ত তার যেতে হয় না, তার আগেই পদ্মার একটা নতুন চরে সে রমজানকে অন্য অনেকের সঙ্গে ব্যস্ত দেখে। সময়টা শীতের শেষ, কিন্তু পদ্মার উন্মুক্ত করে রোদের তাপ বেশ চড়া। জামিরকে দেখে রমজান এগিয়ে এসে একপাশে বসে।
হাওয়ায় মিহি বালি উড়ছে। সেই হাওয়া রমজানের চুল-দাড়িকে এমনভাবে বিশ্বস্ত করছে যে তাকে প্রায় অপরিচিত মনে হচ্ছে এখন। কাছেই নদীর জল, ক্রমশ প্রশস্ততায় যেন দিগন্তের সঙ্গে মিলেছে, সেখানে নদীর রঙ ঘন নীল।
জামির বলে, এসব হচ্ছেটা কি? ক-দিন কামে যাবার দেখনো না?
রমজান সলজ্জ হাসে। বলে, লেও, তামুক খাও। আর কহেন ক্যান, চাষার ছেলে, গোরে না গেলে তো নেশা কাটবে না।
চাষার ছেলে, তো এই মরুভূমিতে কি?
সেটাই তো কছি রে, ভাই নিজের তো আর জমি-জিরাত নাই। জমি নাই তো চাষও নাই, কিন্তু হাত যে নিশপিষ করে, বুক যে ফঁফড় করে। তাই পোতি বছর চরের এই পলি বন্দোবস্ত করি কাছারির সাথ।
কী চাষ হবে এখানে?
তরমুজ, তরমুজের চাষ।
তরমুজের চাষ এই বালিতে হয়?
হ্যাঁ, দেখ নাই তরমুজের খেত কোনোদিন?
দেখেছে নিশ্চয়ই, খেয়াল করে দেখেনি। বাজিকর কী দেখেনি এই দুনিয়ার? রমজানের বুকের ফাফর জামিরের বুকে সংক্রমিত হয়। সে বলে, কেমন লাভ থাকে তরমুজের চাষে?
ফসল যদি ভালো হয়, লাভ তোমার ভালোই থাকবে। তবে তরমুজের লতা আর কোলের ছাওয়াল মানুষ করা এক কথা কিনা।
জামির তখন আরো সবকিছু জানতে চায়। কী করে চাষ করতে হয়? কাছারিতে গেলে আরো বন্দোবস্ত পাওয়া যাবে কিনা? পেলে কিসের বিনিময়ে পাওয়া যাবে? চাষের পদ্ধতি রমজান শিখিয়ে দেবে কিনা?
রমজান বলে, কেন, বাজিকর, নেশা লেগে গেল নাকি? বাজিকরের চাষের নেশা!
জামির দীর্ঘশ্বাস ফেলে। নমনকুড়ির ধানের সুবাস নাকে এখনো লেগে আছে। পথচলতি মানুষের ধানের খেতে হাওয়ার দোলা দেখলে এখনো বুকে তুফান তোলে। দেখতে দেখতে হল তো বেশ কয়েক বছর, তবুও।
সে রমজানকে বলে, চাষের কাম কিছু জানা আছে, রমজান ভাই। তাই চাষের কথায় মন মোরও পোড়ে।
সে সংক্ষেপে নমনকুড়ির কথা বলে, নানা পীতেমের কথা বলে, যাযাবর জীবনের থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য তারা যা যা করেছে সেসব বলে, বলে তার আশা-আকাঙ্খার কথা।
রমজান বলে, তাই বল, বাজিকরের এত চাষের কামের খোঁজ ক্যান।
ফেরার পথে কোনো নতুন উদ্যম জামিরকে পথের ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়। তার মনের ভেতরে তরমুজের চারা তখন অঙ্কুরিত হতে শুরু করেছে। সে তাড়াতাড়ি ফিরে পরতাপের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করতে চায়। পরতাপই চাষবাসের বাপারে তার পথপ্রদর্শক।
কিছুদূর এগিয়ে নদীতীরে একটা গাছের নিচে জামির এই নির্জন দুপুরে সোজনকে একাকী বসে থাকতে দেখে। সোজনের দুই হাঁটুর উপরে দুই হাত আড়াআড়ি রাখা। সেই দুই হাতের উপরে চিবুকের ভর রেখে সে দিগন্তজোড়া নদীর বাঁকের দিকে তাকিয়ে। এখান থেকে পদ্মার বুকের মধে দেখা যায় দুটি দিয়াড়া। দ্বীপ দুটিতে সবে মনুষ্য বসতি শুরু হয়েছে। সমস্ত চর দখলের ইতিহাসে রক্তপাতের ঘটনা থাকে। এই দুটি দ্বীপের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। একটি দাঙ্গা তো বাজিকরেরা নিজেরাই প্রত্যক্ষ করেছে। স্থানীয় মুসলমান চাষিদের সঙ্গে হালদার জেলেদের সংঘর্ষ হয়েছে বারবার। বস্তুত দ্বীপ দুটি জেগে ওঠার সময় থেকেই জেলেরা এদের ব্যবহার শুরু করে। অবশ্য যেহেতু জীবনের অধিকাংশ সময়ই তারা জলে কাটায়, সেজন্য দ্বীপ দুটিতে তাদের স্বাভাবিক অধিকার ধরে নিয়েছিল এবং নদীপথে চলাচল করার সময় মাছ ধরা ও পোতাশ্রয় হিসাবে এগুলিকে তারা ব্যবহার করত।
