গণ্ডগোলও হয়, হাসিঠাট্টাও হয়। কিন্তু উপস্থিত সকলে শেষপর্যন্ত খগেনের কথাতেই সায় দেয়। না দেওয়ার কোনো কারণ নেই, কেননা, যে যার নিজের সমস্যা নিয়েই এত ব্যতিব্যস্ত যে অন্যের ব্যাপারে চিন্তা করার সময় কিংবা আগ্রহ কারোই বিশেষ থাকে না। কাজেই সমাজে মিলমিশটা অন্তত থাকুক, এটুকু নিশ্চিত হতে পারলেই সবাই খুশি।
কিন্তু পাখি যদি না আসতে চায়, তবে? বাজিকরেরা যদি না আসতে দেয়? আসবে না। তার ঘাড়ে কয়টা মাথা? আসতে তাকে হবেই।
আর বাজিকরেরা যদি তাকে আটকে রাখার মতো দুঃসাহস করে তবে তার প্রতিফলও তারা পাবে।
এসব কথায় হেমন্ত ভয় পায়। সে তার নিজ গোষ্ঠীর এইসব হা-ঘরে মানুষগুলোকে ভালোই চেনে। ঝড়ে ভাঙা, বৃষ্টিতে ধোওয়া কুঁড়েঘরগুলোর ভেতরে যে এত রকমের সড়কি, বল্লম, হেঁসে থাকতে পারে, একথা আর কেউ না জানুক হেমন্ত জানে। আর নিস্তরঙ্গ দুঃখপীড়িত জীবনে, যে কোনো কারণেই বিরোধ হোক না কেন প্রতিপক্ষকে মনে হয় যাবতীয় দুর্দশার কারণ। ভীষণ আক্রোশ তখন রক্ত ছুটবে ফিনিক দিয়ে, লাশ পড়বে, পদ্মাচরের উদ্দাম হাওয়ার মতো ছুটে চলে যাবে মানুষ রক্ত দর্শন করতে? উত্তেজনা আর উত্তেজনা। এইসব সময়ে পনেরো-বিশ বছরের পুরানো ঘরণীকেও নতুন ও উত্তেজক মনে হয়। হেমন্ত এসব জানে।
সে বলে, দেখেক, দাঙ্গা যায়া লাভ নাই। ফির সি থানা পুলিসের ঝামেলি, শেষমেশ তিষ্টোবার জাগা পাবা না কোথাও। সিৰ্বারকার মালোদের সাথে বিবাদের কথাটা ভাবে।
তবি তুমুই দায়িত্ব নেও, মায়া খুলে নিয়ে আসে।
খগেন হেমন্তকেই দায়িত্ব দিতে পায়। হেমন্ত অবশ্যই এসব কাজে উপযুক্ত ব্যক্তি। সর্বত্র তার যাতায়াত, সব মানুষের সঙ্গেই তার খাতির। নীলুও বলে, হ্যাঁ, ভাই, তুমুই যাও, মাথা ঠাণ্ডা লোক তুমু, তাথে ঝামেলি কম হবে।
হেমন্ত বলে, নীলুদাদা, তুমার মনের কথাও কি এড়া? নীলু খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে উত্তর দেয়, মোরে শুধায়ো না, জবাব পাবা। বিটির বে দিবার পারি না, খোওয়াবার পারি না, আর এখনও ভাবারও পারি না কিছু।
তরুণ বয়সের একজন বলে, কাকা, গান শউনি না অনেকদিন, এট্টা গান করেক। গানের জন্য হেমন্তকে পেড়াপেড়ি করতে হয় না কখনো। সে আনমনে দোতারার কান মুচড়ে সুর বাঁধতে থাকে। তারপর ভারি সময়োপযোগী একটি গান ধরে সে।
উজানী নগরের কাটা জলে ভেসে যায়,
কাহারো বসনে লাগে কাহারো হিয়ায়।
আশ্বিনে অনাবৃষ্টি যদি
ফলন নাই পোয়ালের গাদি,
ভরা যৌবনের কালে বাপ ভাই হইল বাদী।
উজানী নগরে যাব,
পিরিতের ধন চিনে নিব,
যে করে সে করুক মানা,
কারো কথাই শুনিব না।
গাঙ্গের জোয়ার নিশিদিনই বয়—
শরীলে যৌবন দুটি দিন বইতো নয়।
তার পরের দিন হেমন্ত জামিরের কাছে এসেছিল। বাজিকরেরা তাকে চেনে ও পছন্দ করে। সেখানেও সে এই গানটিই প্রথম করে। তারপরে গল্পকথার মাঝেমধ্যে সে বারবার বিষয়টা উত্থাপন করার চেষ্টা করে। কিন্তু পারে না। খবর পেয়ে একসময় পাখি আসে, তার সাথে সোজনও আসে। পাখির দেখাদেখি সোজনও তার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে। তখন হেমন্ত একেবারে বিহ্বল হয়ে যায়। বেশ মানিয়েছে দু-টিকে। আর কি খুশির ভাব দু-জনের! কি করে আর সে এখন ওসব কথা তোলে?
সবাই চলে গেলে জামিরকে হেমন্ত কথাটা বলে। শুনে জামির কিছু সময় গুম হয়ে থাকে। শেষে বলে, তুমাদের স্বার্থ মোদের সম্পর্ক হবার পারে না?
হেমন্ত বলে, বুঝি না বাজি মোর তো কেরো সাথই সম্পর্ক আটকায় না।
ঠিক আছে, তুমাদের মেয়াকে ডাকি। তুমু নিজে মুখেৎ তা বলে যাও। জামির বহুদিন পরে রাধার কথা ভাবে। সময় সবাইকে সবকিছু ভুলিয়ে দিয়েছে। কিন্তু জামির নিজেকে এখনো অপরাধী করে রেখেছে। তাছাড়া এতদিন এদেশে বাস হয়ে গেছে। জামির ভেবেছিল, হয়ত মানুষ গ্রহণ করবে তাদের আস্তে আস্তে। কিন্তু হচ্ছে না, কিছুতেই শিকড় গাড়া যাচ্ছে না।
পাখি এলে সোজনও সঙ্গে আসে। জামির অন্যদিকে তাকিয়ে পরিষ্কার গলায় বলে, তোমা ফিরা যাবার হবে।
পাখি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
সোজন বলে, ক্যান?
ঝালোরা চায় না তাদের বিটি মোদের ঘরে থাকে।
কেন্তু তা তো মুই বিহা করি আনিছি।
সি বিহা তারা মানে না।
পাখি বলে, মুই যামো না, কাকা। বাপেরে বুঝাও তুমরা।
হেমন্ত অধোবদন হয়ে বসে থাকে।
কাকা তুমার দুটি পায়ে পড়ি, মোক্ নিবার চায়ো না।
মুই নিবার চাই না মাও, চায় না তোর বাপও, কেন্তু সমাজ চায়। তারা তুমাকেও ছাড়বে না, তুমার বাপেরেও ছাড়বে না।
পাখি এতক্ষণে নিজেকে শক্ত করে। বলে, বেশ, গেলাম মুই, তা-বাদে তুমার মাতব্বরেরা মোর কি গতি করবে?
ফির বিয়া দিবে তুমাক্।
কেডা বিয়া করবে মোক্ এরপরে?
লোক আছে।
কেডা সে লোক?
হেমন্ত মনেপ্রাণে চাইছিল পাখি বিদ্রোহ করুক। এই দৌত্য করতে রাজি হয়ে সে কি আহাম্মকি করেছে। এখন তাই সে মনেপ্রাণে চাইছিল মেয়েটা অস্বীকার করুক ঝালোদের মাতব্বরদের নির্দেশ, পালিয়ে যাক এখান থেকে, যা খুশি তাই করুক। তাই সে নির্দ্বিধায় বলে, সি লোক হইল পতিত হালদার।
কাকা! ইসব থালে তুমাদের মোর বাপেক বেকায়দা করার চাল, নয়?
যা বলো।
মুই যামো না, যা পারো করেন তুমরা।
পাখি হন হন করে হেঁটে চলে যায়। সোজন দাঁড়িয়ে থাকে। খানিকক্ষণের স্তব্ধতা। সোজন ফিরে যাওয়ার জুনা সুরে দাঁড়াতেই জামির আদেশের গলায় বলে, সোজন দাঁড়া। সোজন আবার ঘুরে দাঁড়ায়।
