এরকম কথা হেমন্তই বলতে পারে। সে দেশবিদেশ ঘুরে বেড়ায়, সম্বলের মধ্যে একটা দোতারা যন্ত্র। সে যন্ত্রে কত বিচিত্র সুরই বাজায় সে, আর সব সুরই যে-কোনো মাত্রা থেকে সমে এনে ফেলতে পারে হেমন্ত, এমনই ওস্তাদি তার। একজন মাতব্বর তুমি কি বুঝবা, হে! ঘর কর না, সমাজ কর না। মালো গুষ্ঠি পয়সার দেমাকে উচ্চশ্নে যাচ্ছে, ঝালোরা নিজ সমাজে সেটি হবার দিবে না।
নীলু বলে, ঠিক কথা, এলা ঠিক লয়।
হেমন্ত হাসে। বলে, মালো গুষ্টির পয়সাটা তুমি কুনঠি দেখলা, মাতব্বর? দু-চারজন সাঁইদারের কথা বাদ দিলে, আর বেবাকে তো নেংটা, জালের ফান্দি আটকাবার সূতা কিনার পয়সাও তো আজকাল আর জোটে না দেখি।
তমো কি তাদের গরম কমে?
গরম তোমরা দেখ, তাই তাদের গরম। মোক তো কেউ গরম দেখায় না।
ওই আবার! আরি, তুমার কথা আসে কিসে?
হেমন্ত বলে, বেশ তবি তোমরাই কও, মুই শুনি।
বলে সে তার দোতারার কানে মোচড় দিয়ে টুং টাং করে সুর বাঁধতে শুরু সবাই মিলে ঠিক করে পাখিকে ছাড়িয়ে আনতে হবে। ছাড়িয়ে এনে তাকে আবার বিয়ে দিতে হবে। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয়, এমন কুলত্যাগী মেয়েকে আবার বিয়ে করবে কে, এই প্রশ্নে।
সবার পিছনে বসে বৃদ্ধ পতিতপাবন ঝিমায়। এই প্রসঙ্গে সে মাতব্বর খগেনকে বলে, খগা মোর কথাটা মনে রাখিস, বাপ।
খগেন বলে, আর তুমি থামো তো। সেই সকাল থিকা খালি এক ট্যাক ট্যাক লাগাইছে। বলিছি তো, এ্যাটা বিহিত করে দিব।
হুঁ, দিস বাপ, ভুলিস না।
পতিত এই ঝালোদের মধ্যে ধনী লোক। সামান্য দু-চারশো টাকার সুদের কারবার সে করে, তারও গণ্ডি এই জালো সমাজ। এই পরিণত বয়সে বিপত্নীক হয়ে সে বড় বিপাকে পড়েছে। মাতব্বর খগেনের সঙ্গে তাই সে সকাল থেকেই লেগে আছে। কাজটা যদি খগেন করে দিতে পারে, তাহলে তার পুরনো নোটার কথা না হয় সে আর তুলবেই না। আর কাজটা হল, যদি পাখিকে খুলে আনা যায় তাহলে সে-ই বিয়ে করতে রাজি তাকে।
খগেন এক মুমূর্ষ গোষ্ঠীর মাতব্বর। যখন কোনো সমাজ লক্ষ্মীছাড়া হয়, তখন আর কার মাতব্বরি কে শোনে। কিন্তু মাতব্বরির মজা এই, একবার দায় চাপলে তাকে আর ঘাড় থেকে নামানো মুশকিল। কেউ চাক আর নাই চাক, মাতব্বরির নেশা তাকে মাতব্বরি করাবেই। এইসব সামাজিক সমস্যায় খগেন তাই যেচেই মাতব্বরি করে। দু-একজনকে উসকায়, দলে টানে, তারপরে তার নিজস্ব রায় দেয়। পতিতকে সে আশা দিয়ে রেখেছে দুই কারণে। প্রথমত, পুরনো দেনাটা পতিত তামাদি করে দেবে বলেছে। আর দ্বিতীয়ত, সামাজিক কর্তৃত্ব জাহির করার বেশ জোরদার একটা সুযোগ এই সমস্যা। পাখিকে খুলে আনা ও পতিতের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া, এই দুই কাজে তার কর্তৃত্ব নতুন করে প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু অধৈর্য এই বৃদ্ধের উপর এখন তার রাগ ধরে। সব ব্যাপারটা বেশ হিসাবমতো এগোচ্ছিল, মাঝখানে কথা তুলে সব বেচাল করে দেবে হয়ত।
নীলুকে সে বলে, শোনেক, নীলুদাদা, ইসব অনাচার সমাজের বুকে মুই হবার দিবা পারি না। তুমুও কি পারেন?
লুকে বলতে হয় না, তা পারি কেংকা?
ফির দেখেক, তুমু হলেন তামাম মালো-ঝোলোদের চড়কের পেধান সন্ন্যাসী। বেবাক মানুষ জানে তুমু পেধান থাকলি বাবার পূজাৎ কোন তুরুটি থাকে না। বেবাক মানুষ জানে তুমার মন্তর পড়া হাজরা আগুন, জল, মায় পদ্মা পার হয়া শশানমশানে ঘুরি মড়ার খুলি আনবে ঠিকই।
এসব কথায় নীলুর বুক ফোলে। হাজরা ছাড়ার মন্ত্র এখন একমাত্র সেই জানে। সংক্রান্তির আগের রাত্তিরে মন্ত্রপড়া তেল সিঁদুর দেওয়া খঙ্গ দিতে হয় কোনো ভক্তকে। ভক্ত তখন দিগ্বিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে সেই খঙ্গ হাতে ছুটে যায়। শ্মশান মশানে ঘোরে সারারাত্তির। সেই সময় তার সামনে পড়া খুব বিপদের। বাবার নামে সে তখন যা খুশি তাই করতে পারে। ভূতপ্রেতেরা তখন তার সঙ্গী। ভোের হওয়ার আগে মড়ার মাথার খুলি নিয়ে তাকে হাজির হতে হয়। এর নাম হাজরা ছাড়া।
মাতব্বর আবার বলে, বাবার পূজা তো আর একটা মাস গেলেই। রীতকরম সব তো তুমারই হাতে। এখন তুমুই বল যে কি করা হবে?
কি করবা কও?
পাখিরে তুলি আনবা হবে।
আনলাম, তা-বাদে? কেডা বিয়া করবে তারে?
সি ভাবনাও মুই ভাবি রাখিছি। মামার ঘর খালি। ছোলগুলা তো বেবাক পিরথগান্ন। দেখেক, বুড়া বয়সে মানুষটা বড় কষ্ট পায়। দুডা ফুটায়া দেবার লোকওনাই। অস্বীকার করবা পার না, আপদ বিপদে পতিত হালদারই আমাগোরে দেখে। পাখিরে মামার হাতেই দেও। অনেক বলি কয়ে রাজি কইরেছি মামাক।
হেমন্ত সশব্দে হেসে বলে, অ, তাই কও। তাই মুই ভাবি গাই বিয়ায়, আর যাঁড়ের ইয়া ফাটে ক্যান্।
মাতব্বর খগেন খুব রেগে ওঠে। বলে, হেমন্ত তুমু থামব কিনা? সব কথার মাঝে তুমু এ্যাটা হাসিঠাট্টা আনে ফালাবার চাও। বেপারটা কত গুরুতর সে খ্যাল তুমার নাই।
হেমন্ত হাসতে হাসতেই বলে, খুবই গুরুতর। কি গুরুতর? না, এটা জুয়ান চ্যাংড়ি এটা জুয়ান চ্যাংড়ার ঘরে গিয়া উঠিছে। মাতব্বরের কথা শুনে এটা বুড়ার ঘরেৎ উঠে নাই।
হেমন্তের ইঙ্গিতে পতিতপাবনও উত্তেজিত হয়। বলে, কি মোক বুড়া কইলি, হেমন্ত! মুই বুড়া! জানিস, তোর বাপের কাছে এখনো আটগণ্ডা পয়সা পাই। সি পসা না নিয়াই তোর বাপ মরিছে, তোর কাছেৎ কুনোদিন সে পয়সা চাইছি?
টিকিট তো কাটি রাখিছ মামা। ওপারে গিয়া বাপের কাছ থিকা সি পয়সা নেও গা। আর ক্যান মায়া বাড়াও?
