লুবিনিকে সে বলে, এংকাই মিলমিশ হোই যাবে, লয়?
কার সাথ?
ইখানকার মানুষজনের সাথ।
তাই ভাবেন তুমু?
তাই চাই মুই।
জামির এমনই চায়। কিন্তু এ শুধু তার ইচ্ছাই, আর ব্যাপারটা এত সহজ নয়।
লুবিনি বলে, কেন্তু দেখেক, মানুষ হেথায় দু-রকম আছে। আছে হিন্দু, আছে মোছলমান।
সিতে সব্বত্তই আছে।
হাঁ সিটা ঠিকেই। তবি দেখে, ইয়ার সাথ উয়ার মিল নাই, আবার উয়ার সাথ ইয়ার মিল নাই। এ দুজাতের কেরো সাথ বাজিকরের মিল নাই।
এসব কি জানে না জামির? খুবই জানে। তবুও লুবিনির সাথে অলস সংলাপ হিসাবে এই প্রিয় বিষয়টাই সে বেছে নিয়েছিল। আর এখন দেখে কী নির্দয় যুক্তিতে লুবিনি তার ইচ্ছাগুলোকে ভাঙে। তবুও সে কথা চালিয়ে যায়, এ যেন তার নিজের সঙ্গেই দ্বন্দ্ব, হয়ত ভাবে এভাবে একটা সমাধানের রাস্তা নিজের ভেতর থেকেই বেরিয়ে আসবে।
সে বলে, মিল নাই? দেখ না ক্যান্ রমজান মিয়া মোক্ কত খাতির করে, তার বেটাবিটিয়া মোক চাচা কয়, তোক কয় চাচি। তবি?
ইস্টিমারে যখুন দুফরের ভোঁ পড়ে রমজান মিয়া নাইমে অজু করে, তুমারে ডাকে তখুন?
মোক ডাকপে কান? মুই কি নমাজ পড়মো?
লুবিনি যুক্তি দিয়ে বোঝায় যে বাজিকর নমাজও পড়বে তা আবার হিন্দুদের মতো পুজো-আচ্চাও করবে না। যেসব মালোরা দুর্দিনে গঞ্জের ঘাটে এসে কুলিগিরি করে সুযোগ আসা মাত্র নৌকা পাড়ে টেনে তুলে উপুড় করে গাব আর আলকাতরা লাগায়, নিজেরা গায়ে মাথায় তেল মেখে চকচকে হয়। তারপর একদিন গলুইয়ের উপর ফুল পাতা সিঁদুর ধূপ দিয়ে ‘জয় মা গঙ্গা’ বলে নদীতে ভেসে পড়ে। আবার বড় বড় সাঁইদারদের দেখ, ব্রাহ্মণ পুরোহিত এনে পুজো করে, সাঁই সাজায়, কত আর অনুষ্ঠান। সেসব ব্যাপারে কেউ কি বাজিকরকে ডাকে?
না, ডাকে না।
তবি মিল হয় কেংকা?
নিজের মনের সংশয়ের কথাগুলোই জামির লুবিনির কাছ থেকে শোনে। তবু লুর ছেলে সোজন যখন জেলেদের ঘরের একটি মেয়েকে বিয়ে করে আনে, খন সে খুশি হয়।
কিন্তু এই খুশি হওয়া দীর্ঘস্থায়ী হয় না। জামিরের অভিজ্ঞতায় গোরখপুরের কোনো চিহ্ন নেই। কিন্তু বালি ও আরো দু-চারজন বেঁচে থাকা বৃদ্ধের স্মৃতিতে পোরখপুর এখনো জীবন্ত। এদেশের মানুষের জাত-পাত সম্বন্ধে সহনশীলতা গোরখপুরের থেকে অনেক বেশি, এ তারা দেখেছে। কিন্তু তবুও বিয়ে এমন একটি ব্যাপার যার শিকড় সমাজের গভীরতম স্তর পর্যন্ত বিস্তৃত। সাধারণভাবে যা চোখে পড়ে না, এইসব গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সম্পর্কের সূম্ভাবনায় তা উপরে উঠে আসে।
সোজন যাকে বিয়ে করে এনেছে, অথবা যাকে স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করেছে, সেই মেয়েটি পাখি। পাখি ঝালোদের মেয়ে।
জামির বলে, ঝালো কি? ঝালে আবার কোন জাত? মালো চিনি, ঝালো চিনি না।
লুবিনি চেনে। দুপুরে যখন ঘরে পুরুষমানুষ থাকে না, তখনই তো বাজিকরের মেয়েরা পাড়ায় পাড়ায় ঘোরে। লোকজন, দেশবিদেশ দেখা পুরুষমানুষ বাজিকর মণীদের বুজরুকিতে ভোলে না, দূর দূর করে। কিন্তু মেয়েদের তো অসীম কৌতূহল ঐ পুঁটুলির ভিতরে বাজিকর মেয়েরা, না জানি কি আশ্চর্য সম্ভাবনাময় জিনিসপত্র রেখে দিয়েছে ওর মধ্যে।
লুবিনি বলে, মালো আর ঝালোর ভেতরে তফাত আছে। সে জনা গাঙ্গে শায় বড় জাল নিয়া, নাও নিয়া, সি হোল মালা। সি জালের ফাঁস থাকে। টানা হাক, কি খেল্লা হোক, তাথে অনেক পয়সা লাগে। আরো লাগে নাওয়ের মালিকানা।
আর ঝালো? তার জানে ফঁস নেই। লম্বা লাঠির ভেতরে গলানো কয়েক হাত মাএ সুতোর কারিগরি, বা তিন কাঠির ভিতরে মৌচাকের মতো ঝুলে পড়া নিতান্ত আটপৌরে জাল। সেইসব দিয়ে পুকুর, নালা, বর্ষার খেত কি নয়ানজুলিতে মাছ মারা। পুরুষের পরনে অধিকাংশ সময়ই কোমরের ঘুনসিতে এক ফালি ত্যানা, পেছন ঘুরে ফের কোমরে ওঠার আগে পশ্চাৎকে দ্বিখণ্ডিত করে প্রকট করে। আর মেয়েদের খাটো শাড়ি, যা ঝোলো কন্যার জীবনে একসঙ্গে একাধিক জোটে না।
কিন্তু জামিরের এই সুখী উত্তেজনা খুব স্থায়ী হয় না। পাখির বাপ নীলু হালদার গঞ্জের, ঘাটে মাল বওয়ার কাজও করে। যেহেতু পাখি বয়স্থা হলেও সে বিয়ের ব্যবস্থা করতে পারেনি, তাতে তার লোকনিন্দা ছিল। কাজেই পাখি যখন নিজের ব্যবস্থা নিজেই করে নেয়, তাতে সে স্বস্তি বোধ করে।
কিন্তু তার স্বজনরা তাকে ছাড়বে কেন? তারা নীলুর কাছে কৈফিয়ৎ চায়। কে না জানে বাজিকর বেজাত। ঝালো বলে কি শেষমেশ বাজিকরের হাতে মেয়ে দিতে হবে? একটা সমাজ নেই।
গঞ্জের ঘাটে মানুষজন এ নিয়ে নীলুকে ঠাট্টা করতেও ছাড়ে না। কয়েকদিনের মধ্যে নীলু অতিষ্ঠ হয়ে যায়। মাতব্বরদের সে বলে, তবে কি করবা কও মোক্?
চৈত্র মাসে সব মাছমারাদের চড়কের উৎসব হয়। তাতে বেশ কয়েক বছর ধরে নীলুই হয় প্রধান সন্ন্যাসী। তাকে নিয়মকানুন মানতে হয়। উপোস করতে হয় এবং ঠাকুরের কাঠ ঘাড়ে নিয়ে এক মাস বাড়ি বাড়ি পথ পরিক্রমা করে ভিক্ষা করতে হয়। সেই ঠাকুর বড় সুন্দর। মসৃণ ও চকচকে কালোকাঠের নৌকো, তার উপরে একদিকে খোদাই করা শিবের ও তার বাহন ষাঁড়ের মূর্তি। অন্য পাশে হাত জোড় করা দুই ভক্ত। মাঝখানে একটি শঙ্খ। এহেন কাঠের ঠাকুর নিয়ে বাড়ি বাড়ি ভিক্ষা করতে হয় সারা মাস। সঙ্গে থাকে ঢোল, ঢাক, ও কাসি। বাড়ি বাড়ি গান করতে হয়। গান করে হেমন্ত। গান করাই তার নেশা ও পেশা।
হেমন্ত বলে, হল না হয় ঝজিকর। মানুষ তো, জন্তু-জানোয়ার তো নয়। পাখির মনেৎ লাগিছে, ব্যাস, আর কথা কি?
