জামির দেখে মূহ্যমান রমজান ধীরে ধীরে নিজেকে স্বাভাবিক করে নেয়। প্রথমে যে মানুষ বলেছিল, ‘মুই কি পাগল হোই যামো?’ এখন সে বলে, বসি থাকলে চলবে বাজিকর? এবং গঞ্জের ঘাটে স্টিমারের ভোঁ শুনে দশদিনের মাথায় সে উঠে দাঁড়ায়।
কোনো এক অজ্ঞাত সহমর্মিতায় জামির প্রতিদিন এই মানুষটার কাছে আসে। অধিকাংশ সময়ই দু-জনে চুপচাপ বসে থাকে। সুখদুঃখের কোনো কথাই হয় না। যখন কথা হয়, তার বিষয়বস্তু তাদের নিজস্ব দার্শনিক বোধবুদ্ধির লেনদেন। যেমন, রমজান বলে, দ্যাখেক বাজিকরের পো, খোদাতালার কাছে মোর কিছু নালিশ নাই, তবু যে মনটা পোড়ে কান।
তখন জামির বলে, আঃ হা, সিটা ভারী আচ্চয্যের কথা বটে এবং জামির শুধু কথার কথা বলে, যেমন কথার পিঠে কথা বলতে হয়। আবার যেমনি নিজের কথা নিজের কানে যায়, তখন ভাবতে বসে যে কথাটা ঠিক হল কিনা।
সত্যিই আশ্চর্যের কথা এবং জামির ভেবে দেখে সে ঠিকই বলেছে। কেননা, একজন আছে, যার কাছে সব নালিশ অভিযোগ বোষ দুঃখ ইত্যাদি নির্দ্বিধায় প্রকাশ করা যায়, এসব সে অভিজ্ঞতায় জানে না, জানে বুদ্ধিতে। সে জানে রমজানদের এই একজন আছে, তাই কখনো কখনো একটা বিরাট আশ্রয়ের মতো তা কাজ করে। এ আশ্রয় শুধু সমর্পণের জন্য নয়, এ এমন একটা আধার, যেখানে তুমি তোমার যাবতীয় ক্লেদ, ক্রোধ এবং ঘৃণাও নিক্ষেপ করতে পার। এই আশ্চর্য ঈশ্বর কিংবা খোদাতালা রমজান কিংবা তার সগোত্রীয় সামাজিক জীবদের এমন আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রেখেছে যেখানে চাই না তোমাকে, মানি না তোমাকে, বললেও সেই নিরীশ্বর ঘোষণা আসলে এক পরম আস্তিক্যের অভিমানে আবদ্ধ থাকে। কাজেই গোলামের মা স্বাভাবিকভাবেই বক্সতে পারে, নাথি মারি তুমার মসজিদ আর জুম্মা আর নেমাজেৎ, খোদাতলা নাই, খোদাতালা নাই। থাকলি মোর কপালেং এমুন হয়! আল্লা রসুল! আল্লা রহমানের মহিম! দুনিয়ার বেবাকে হাসির ধামার মতো প্যাটটা দেখবা পালো, আর সি পালো না!
আর তখনি রমজান বলে, না, তার কোনো নালিশ নেই।
হাসি গোলামের বউ। জামির এই দু-জনের কথাই শোনে, হাসির কথা কিছু শোনে না। না শুনলেও সে তার শূন্যদৃষ্টি দেখে, যেখানে সেই একই আস্তিক্যের ভাষা।
তাই সে আশ্চর্য হয় এই ভেবে যে, যদি নালিশই না থাকে তবে রমজানের বুক পোড়ে কেন? নমনকুড়ির বানের মতো সর্বনাশ বাজিকরের আর কী হয়েছে? কিন্তু সে একটা লোকসান। তার সঙ্গে আছে নিতান্তই নিরুপায় দুর্ভাগ্য। কোনো বাজিকর রমণী আকাশের দিকে তাকিয়ে গোলামের মায়ের মতো কাউকে গাল পাড়েনি। কোনো বাজিকর এমন কথাও বলেনি, না আমার কোনো নালিশ নেই। তারা জেনেছিল যে, ক্ষতি যা হয়েছে, তার আর আসান নেই। তাই এমন কারো কাছে আশ্রয় চায়নি যার কোনো জৈব অস্তিত্ব নেই। যে আছে তার নাম রহু। কিন্তু সে কি এমন অমোঘ? পীতেমের মতো জামিরেরও মনে হয়, না, তা কখনোই নয়। আসলে রহু, দনু, পীতেম কিংবা জামির মূলত প্রায় একই। আর বিগামাই, কালীমাই, কি ওলামাই? সেও তো শুধু পথের সংগ্রহ, তার বেশি কিছু নয়।
৩২.
লুবিনি জামিরের ভেতরে পুবের এই দেশটার যাবতীয় রীতিনীতি, আচার-আচরণ আত্মস্থ হতে দেখে। সবকিছুই বসলে যাচ্ছিল, বদলাচ্ছিল না শুধু বাজিকরের কপাল। না হলে কোথাকার কোন ভিনদেশি বাজিকর, এখন তার মুখে পর্যন্ত এদেশি ভাষা। শিশুরা এখন যেন ইচ্ছাকৃতভাবেই এই দেশের ভাষাতেই কথা বলতে চায় বেশি সময়।
এতে জামির এক ধরনের আশ্বস্ত হয়। কেননা, অভিজ্ঞতায় বুঝেছে অস্তিত্ব রক্ষায় এই পরিবর্তন ভালো। কারণ পৃথক গোষ্ঠী হিসাবে বাজিকর এই পৃথিবীতে টিকে থাকতে পারবে না, একথা পীতেই বুঝেছিল। এখন জামির বোঝে এই পরিবর্তনের মধ্যে যদি মিশে যাওয়া যায়, সেটাই হবে মঙ্গলের।
কাজেই স্বার্থপরের মতো রমজানের সঙ্গে সম্পর্ককে সে আঁকড়ে ধরে থাকে ও ব্যবহার করে। রমজানের সহায়তায় গঞ্জের ঘাটে কুলির কাজ পেতে এখন আর বাজিকর যুবকের অসুবিধা হয় না।
লুবিনি নদীর পাড়ে বসে কিংবা গঞ্জের হাটে এই দেশটাকে আরো গভীরভাবে বুঝতে শুরু করে। সারাদিন সারারাত এই বিশাল নদী দিয়ে অসংখ্য ছোট বড় নৌকো যায়। সেইসব নৌকোয় জীবনের বিচিত্র সব রঙ ধরা পড়ে যার সঙ্গে বাজিকরের কোনো মিল নেই। কোনো নৌকোয় নতুন বউ শ্বশুরবাড়ি যায়। নৌকোর আয়তন দেখে বুঝতে হবে, কেমন ঘরের মেয়ে আর কেমন ঘরের বউ। কী করে বুঝবে যে শ্বশুরবাড়ি যায়, না বাপের বাড়ি যায়? দেখ, মেয়ের মাথায় ঘোমটা আছে কিনা, তার পরে দেখ, সে মেয়ের চোখ ছলোছলো, না হাসিহাসি।
আবার সাহেব-মেম, বাবু-বিবিদের নৌকো কত বড় ও বাহারি। তিন কামরা, bার কামরার নৌকো সব। কোনো নৌকোয় তাকিয়ায় হেলান দেওয়া গেলাস হাতে সাবুদের সামনে বাই নাচ হয়। কোনো নৌকোয় সাহেব-মেম হৈ-হল্লা করে। খানাপিনা করে। আবার জেলে নৌকোই বা কত ধরনের। পদ্মাপারে জেলেরা সর্বত্রই খুব দাপটের।
লুবিনি যখন আবার গঞ্জের হাটে অন্য বাজিকর মেয়েদের সাথে কুহক, ভান্মতি, ওষুধ, শিকড়, তাবিজ ফিরি করে, তখনো তো মানুষের কত বিচিত্র জীবনপ্রণালী দেখে।
জামির ধীর স্থির মানুষ। এই ধরনের মানুষ বিবেচক হয়। যে মানুষের ধার ধরতে হয় না কাউকে, তার আত্মসন্তুষ্টি ঠেকায় কে? কিন্তু এমন মানুষ জামির নয়। নমনকুড়ির স্মৃতি অন্য অনেকের কাছে বহু দূরের হয়ে গেলেও জামিরের কাছে নয়। মাথায় বোঝা নিয়ে সে যখন স্টিমার কিংবা নৌকোয় ওঠে, তখন নিরুপায় ঘাম মাথা ও কানের পাশ বেয়ে মুখের উপরে, ঠোঁটে ও জিভেও এসে পড়ে। এই ঘামের নোনতা স্বাদ তাকে এখনো নমনকুড়ির ফসলের মাঠে নিয়ে যায়।
