সে বলে, কোথায় যাব কাজ খুঁজতে? গঞ্জের ঘাটে মাল তোলা-নামার কাজে কাল গিয়েছিলাম, তো এখানকার লোকেরা তাড়িয়ে দিল।
কেন?
ভিড় বেশি হলে তাদের কােজগার কমে যাবে না?
তাও তো বটে। কিন্তু জামিরের মাথা থেকে চিন্তাটা যায় না। তাহলে গঞ্জের ঘাটে কাজ আছে। সেখানে তাহলে চেষ্টা চালাতে হবে।
পরদিন সে ঘাটে যায়। নানাধরনের দেশি-বিদেশি মহাজানি নৌকোয় ঘাট ভরা। প্রচুর মাল ওঠানামা হয়। ভিড়, ধুলো, চিৎকার-চেঁচামেচি মিলে জায়গাটা অদ্ভুত রকমের ব্যস্ত ও সরগরম। জামির একটা গাছের নিচে বসে অলসভাবে দেখতে থাকে সবকিছু।
ছোট বড় অজস্র নৌকোর মধ্যে অনেকে উঁচুতে মাথা তুলে ভেসে আছে। তিনখানা বাষ্পচালিত নৌকো। এগুলো এদেশে নতুন এসেছে। মাঝে মাঝে কোনো কোনোেটা তীব্র ভো দিচ্ছে। কাঠের পাটাতনের উপর দিয়ে লাইন দিয়ে মাথায় করে, পিঠে করে কুলিরা নৌকোয়, স্টিমারে মাল তুলছে। বেশির ভাগ বস্তাতেই ধান কিংবা চাল। মানুষগুলোর সর্বাঙ্গ বেয়ে ঘাম ঝরছে। রোদ যত বাড়ছে, পরিশ্রম যত বাড়ছে, ততই মানুষগুলো এতে অন্যের সঙ্গে অসংযত ব্যবহার করছে। একের গায়ে অন্যের ধাক্কা লাগলে পরস্পরকে খেকিয়ে উঠছে। খাটনির চাপে সব মানুষগুলো যেন ক্রমশ মারমুখী হয়ে উঠছে। অসংখ্য পাতিকাক সমস্ত বন্দর এলাকা ছেয়ে আছে এবং বিরক্তিকর একঘেয়ে চিৎকার করছে।
জামির এইসব দেখছে ও চিন্তা করছে, এইসব জাগতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বাজিকরের কোনো সম্পর্ক নেই। একথা অবশ্যই সত্যি যে, যে মানুষগুলো ঐ নৌকো ও স্টিমারের জঠর ভরছে খাদ্যশস্যে, তারা প্রতিদানে পাচ্ছে শুধু নিজেদের জঠরের জন্য ঐ খাদ্যশস্যই দু-এক মুঠো। তবু এই ব্যস্ততার মধ্যে আনা কিছু আছে, যা বাজিকরের জীবনে নেই।
চেহারা দেখে জামির অনুমান করতে পারে এখানে মূলত দুই জাতের মানুষ আছে। স্থানীয় কুলিদের মধ্যে মুসলমানের সংখ্যাই বেশি। বহিরাগত মানুষও আছে, তারা বিহারি ও হিন্দিভাষী। ক্রমশ বেশি বেশি বিহার অঞ্চল থেকে এদিকে মানুষ আসছে। বিহারের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে খরা হয়েছে এবং তার জন্য দুর্ভিক্ষের অবস্থা চলছে। মানুষ তাই দলে দলে এসে কুলির কাজে এদিকের গঞ্জ, বন্দর ও রেলস্টেশনে লেগে পড়ছে। জামির চিন্তা করে এই স্রোতের সঙ্গে আপাতত মিশে যাওয়া ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনো রাস্তা নেই। যে করেই হোক এদের সঙ্গেই মিশে যেতে হবে।
সে যেখানে বসেছিল তার কাছেই বিরাট একটা নৌকায় মাল বোঝাই হচ্ছে। দুখানা কাঠের পাটাতনে উঠতে গিয়ে হঠাৎ একজনের পা বেকায়দায় পড়ে পিছলে যায়। লোকটা অদ্ভুতভাবে পড়ে। তার মাথায় কম করেও চার-পাঁচ মণ ওজনের বোঝা ছিল। পা পিছলে সামনের দিকে চলে যেতে সে সোজা চিৎ হয়ে পড়ে যায় এবং মাথার ভারি বোঝা সশব্দে বুকের উপর পড়ে তাকে পিষ্ট করে। সামনে এবং পিছনে তার ভারবাহী মানুষ, তারা কেউ সাহায্য করতে পারছে না। জামির লাফ দিয়ে উঠে গিয়ে লোকটার বোঝাটা অমানুষিক শক্তিতে তুলে একপাশ করতে যেতেই সেটা গড়িয়ে জলে পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গেই কোলাহল উঠেছিল। এখন একজন গোমস্তা ও জনা দুই-তিন পাহারাদার ছুটে আসে। জামির শুধু দেখল লোকটির মুখে এক ঝলক রক্ত উঠে এল। সে তাকে দু’হাতে তুলে গাছের তলায় নিয়ে এসে শুইয়ে দিল।
মুহূর্তে ভিড় হল। কেউ একজন চেঁচালো, রমজান চাচারে ডাক গোলাম পড়েছে। জামিরের থেকে বয়সে কিছু বড় একজন প্রৌঢ় মুসলমান দৌড়ে আসে।
হায় আল্লা, এ কী হল?
জামির রমজানকে জায়গা দেয়। রমজান দু-হাতে গোলামের রক্তাক্ত মুখ ধরে নাড়া দেয়, ডাকে।
নাড়া লেগে নাকমুখ দিয়ে আবার রক্ত ওঠে। গোলামের জ্ঞান নেই। রমজান বিহুলের মতো এদিক ওদিকে তাকায়, কি করবে বুঝতে পারে না। কেউ একজন গামছা ভিজিয়ে নিয়ে এসে নিঙড়ে গোলামের মুখের উপরে দেয়। জামির রমজানের পিঠে হাত দেয়। রমজান তাকে দেখে, সেই একই বিহুল চাউনি।
জামির বলে, ঘরে নিয়ে যেতে হবে।
ঘরে?
ঘর কত দূরে?
ঘর?
জামির পাশের আর দু’একজনকে বলে, ধর তো ভাই। রমজানের ঘর বেশি দূর নয়। সবাই মিলে ধরাধরি করে সেখানে নিয়ে আসে। সকালে যে মানুষটা তাজা ছিল দুপুরে এ অবস্থায় সে ফিরে এলে সে বাড়িতে যা হবার এখানেও তাই হয়। জামির রমজানকে থম দিয়ে বসে থাকতে দেখে, গোলামের মাকে বুক চাপড়ে কাঁদতে দেখে, দেখে গোলামের বউকে জালার মতো পেট নিয়ে উঠোনে অজ্ঞান হয়ে পড়তে।
কেননা বাড়িতে আনার আগেই গোলাম মারা গিয়েছিল। জামির হতবুদ্ধি প্রৌঢ় মানুষটির পাশে সারাক্ষণ বসে থাকে অন্যদের শোক, ব্যস্ততা, কবর দেওয়ার ব্যবস্থাপত্র ইত্যাদি দেখতে থাকে।
এইভাবে রমজানের সঙ্গে জামিরের যোগাযোগ হয়। শহরের উপকণ্ঠে রমজানদের গ্রাম। জমি থেকে বিভিন্ন কারণে উৎখাত হওয়া কয়েক ঘর মানুষের বসতি এখানে। প্রায় সবারই জীবিকাগঞ্জের ঘাটের কুলিগিরি। গোলাম ছাড়াও আরো তিনটি সন্তান আছে রমজানের, তাদের মধ্যে বড়টি মেয়ে ও বিয়ের উপযুক্ত।
স্বাভাবিক মানুষের জীবনে শোক কখনো স্থায়ী হয় না। প্রাথমিকভাবে শোক আসে প্রচণ্ড উচ্ছ্বাস নিয়ে, তখন মনে হয়, কী হবে আর? কী করব এই জীবন নিয়ে? তারপর একসময় শোক ভীষণভাবে চেপে বসে। সে চাপ এমন পাশবিক যে, মানুষ অন্য আর সব শারীরিক কষ্টের মতোই তা থেকে নিষ্কৃতি পেতে চায়। শরীরের একেবারে নিজস্ব কারখানায় তখন সজ্ঞানে অথবা অবচেতনে তৈরি হয় আশ্চর্য প্রতিরোধ, নিজের কাছে এবং অন্যের কাছে কখনো কখনো ভীষণ মর্মান্তিক বোধ হয়। তবুও এই নিয়ম ভারি অমোঘ। শোকের শুরু থেকেই মানুষ নিজের অজান্তে এই প্রতিরোধ তৈরি করতে শুরু করে, পরে মানসিক চেষ্টা তাকে আরো শক্তিশালী করে।
