তবুও সরকারকে একসময় ব্যবস্থা নিতে হয়। কেননা আত্রাই, পুনর্ভবা, টাঙ্গন শুকোলে রেলপথের খুব একটা অসুবিধা না হলেও তিস্তা জলপাইগুড়ি ও রঙপুর ভাসাচ্ছে। তাতে ক্ষতি হচ্ছে বিরাট। কাজেই সরকারকে নজর দিতে হয়। আবার হাজার হাজার কুলি সংগ্রহ করতে হয়। তবে এবার আর খুব একটা অসুবিধা হয় না। আদিবাসীদের আগমন অব্যাহত ছিল। কুলি হতে তারা কখনোই অরাজি নয়। সুতরাং আত্রাই-এর মুখের বাধা সরতে থাকে।
ফলে পরের বছর বর্ষার সময় নমনকুড়ির নিচু জায়গা ডুবল। তারপরের বছর নমনকুড়ি নতুন আবাদি জমি ডুবল। আর তার পরের বছণ প্রবল জলস্রোতে নমনকুড়িকে পুরো ডুবিয়ে জামিলাবাদ হিঙ্গলকেও ডুবালো। আগের পনেরো-বিশ বছরের মধ্যে এরকম অভিজ্ঞতা কারো হয়নি। বাজিকরেরা আসার পর তো জল হয়ইনি। বলতে গেলে বাজিকরেরা জলকে ভয় পায়। সাঁওতাল ওরাওঁরা যদিও প্রথমে লড়াই করেছে, কিন্তু এখন এতদিন পরে তারাও অসহায় বোধ করে। জামিলাবাদ-হিঙ্গলের উঁচু জায়গায় নমনকুড়ির মানুষ ও জানোয়ার অনাদরে অবহেলায় দুরন্ত বর্ষার সঙ্গে লড়াই করে, মরে।
তারপর বৃষ্টি শেষ হয়ে যখন শরতের মেঘের আনাগোনা শুরু হয় আকাশে, তখনো নমনকুড়ির জল দিগন্ত পর্যন্ত থৈ থৈ করে। সাঁওতাল ওরাওঁরা আশায় থাকে জল একসময় নামবে, তারা আবার তাদের ডুবে যাওয়া ভিটেগুলো সন্ধান করে বের করবে। আবার মাটি তুলে উঁচু করে, তারপর আবার ঘর বাঁধবে। এতদিন প্রকৃতি হার মানবেই।
কিন্তু বাজিকরেরা এরকম সাহসিক চিন্তা করতে পারে না আর। পরতাপ, জামির ও তাদের মতো আরো দু-চারজন, যারা জমির সঙ্গে নিজেদের আত্মীয়তা তৈরি করতে পেরেছিল, দূরে জলের মধ্যে তাকিয়ে নিজেদের জমিগুলোর দিক নির্ণয় করার প্রয়াস পায় বৃথাই।
তারপর আশ্বিন মাস পার হয়ে গেলে বালি দলের সবাইকে জিজ্ঞেস করে, এবার?
একথার উত্তর কারো কাছেই নেই। তখন বালিই আবার বলে, এখানে আর নয়, কোনো নতুন জায়গা খুঁজতে হবে।
কোথায়?
একথার উত্তরও থাকে না।
তখন কেউ একজন বলে, এবার কোনদিকে যাব?
পুবে।
একথা বলে জামির।
৩১-৩৫. লুবিনি সেই পুবের দেশের কথা
লুবিনি সেই পুবের দেশের কথা শারিবাকে বলে, যে পুবের দেশের কথা দনু পীতেমকে বলেছে, পীতেম বলেছে পরতাপ, জামির আর লুবিনিকে, জামির বলেছে রুপাকে, আর এখন এই সমুদয় পুবের দেশের বৃত্তান্ত লুবিনি শোনায় শারিবাকে। কিন্তু কোথায় যে সেই স্থির দেশটি, যেখানে আছে বাজিকরের স্থিতিস্থায়িত্ব, সেকথা কেউই জানে না। প্রতিবারই মনে হয়েছে এই বুঝি সেই দেশ। প্রতিবারই কোনো না কোনো আঘাত, সে আঘাত মানুষের সৃষ্ট হোক কিংবা প্রকৃতির সৃষ্ট হোক, বাজিকরকে দিশাহারা করেছে।
নমনকুড়ি থিকা কোথায় গেলি, নানি?
লুবিনি চুপ করে থাকে। জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টাই পথে প্রান্তরে কেটেছে। কোন তাড়নায় জামির নিত্য নতুন দেশের সন্ধান করেছে, তা আর কারো কাছেই বিস্ময়ের ব্যাপার ছিল না। আবার এ ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহও আর কেউ বোধ করত না। কেননা, মালদা শহরে তারা থাকতে পারত, যেভাবে অন্য চারঘর থেকে গেছে। থাকতে পারত রাজশাহি শহরেও। কিন্তু জামির এমন একটি স্থান খুঁজছে যেখানে নমনকুড়ির মতো অজস্র ফসল সে ফলাতে পারবে, অথচ জলে ডুবে সর্বনাশ হবে না। সে যেন একটা পরিচয় চাইছিল নিজের দলের জন্য।
বালি বৃদ্ধ হওয়াতে দলের পরিচালনভার তার হাতেই এসেছিল। আর জামির দেখেছিল মাসখানেক এদিক সেদিক চলার পর মানুষগুলো জানোয়ারের মতো হাঁটছে। তারা অল্পেতেই পড়ছে ক্লান্ত হয়ে, তাদের কোমর বেঁকে যাচ্ছে, হাত ঝুলে পড়ছে সামনের দিকে। সেই রাজমহলের আমল থেকে একটানা পথে চলার অভ্যাস চলে গেছে।
এখানে সেখানে ঘুরে ফিরে শেষপর্যন্ত জামির রাজশাহি শহরের বাইরে পদ্ম নদীর ধারে নামালো তাদের মোটঘাট। সুখস্বপ্নের স্মৃতির মতো নমনকুড়ি রয়ে গেল এক বিস্ময়! সেই ধান-চাল, গরু-মোষের গেরস্থালি, সে কি এই জীবনেরই কোনো ঘটনা! এই বাজিকরের জীবন
বছর দুয়েক বাদে জামির একবার গিয়েছিল খোঁজ নিতে, কেননা নমনকুড়ি তাকে ভীষণভাবে পিছনে টানছিল। দেখে হতাশ হয়েছিল। নমনকুড়ি আবার তার আদিমতায় ফিরে গিয়েছে। বছরের ছ-মাস সম্পূর্ণই জলের তলায় থাকে। সাঁওতাল ওরাওঁরা অধিকাংশ বিভিন্ন দিকে ছিটকে পড়েছে। যারা আছে, তারা হিঙ্গল, জামিলাবাদ ইত্যাদি গ্রামগুলোর সম্পন্ন চাষী-জোতদারের চাকর, মহিন্দর কিংবা নিতান্তই কেনা গোলাম হয়ে অসম্ভব দুর্দশায় দিন কাটাচ্ছে।
বৃদ্ধ বালি তখন বলেছিল, এখন তাহলে কি করবে বাজিকর?
জামির কি একথার উত্তর জানে? তবুও বালি তাকেই প্রশ্নটা করে। দলের দায়িত্ব যখন তার উপর, উত্তর তাকেই খুঁজে বের করতে হবে।
যুদ্ধে যাওয়া পাঁচ যুবকের মধ্যে এখন তিনজন আছে, পরতাপ, বাল এবং জিল্লু। এখন তারা বৃদ্ধ। তারা এখন জামিরের দিকে তাকায়, এই বৃদ্ধ বয়সে জামিরের কাছেই তারা আশ্বাস খোঁজে। আর তখন বালির ছেলে ইয়াসিন কিংবা জিল্লুর ছেলে সোজন যদি ঝুলি ঘাড়ে করে ক্লান্ত হয়ে আস্তানায় ফেরে, জামির হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে যায়। বলে, কোথায় গিয়েছিলি? ভিখ মাঙতে? কেন আর কোনো কাজের খোঁজ করতে পারিস না?
সোজন খুব চালাক ছেলে। খেলা দেখাতে যখন শহরের রাস্তায় কিংবা গ্রামে গ্রামে ঘোরে, সঙ্গে রূপাকে নেয়। রূপাও সোজনের সঙ্গে ঘুরতে ভালোবাসে, খেলা শেখে।
