লুবিনির এইসব ভাবান্তর জামির লক্ষ করেনি। কারণ জামিরের সঙ্গে লুবিনির কোনো সম্পর্ক হয়নি। তাছাড়া, সে রাধাকে নিয়ে এত বিভোর ছিল যে লুবিনির শারীরিক মানসিক কোনো পরিবর্তনই তার চোখে পড়েনি। রাধাপর্ব চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়ে যাবার পর জামির কিছুদিন আনমনা থাকে। তখন লুবিনি তাকে আড়াল থেকে নজর রাখত। জামির মোটামুটি স্বাভাবিক হয়ে যেতে লুবিনি তাকে উপেক্ষা দেখাতে শুরু করে। প্রথম প্রথম জামির এসব খেয়াল করত না। যেমন, এতকাল তার নির্দেশমতো লুবিনি হাতে হাতে যেসব সহায়তার কাজ করত, ইদানীং সেসব কাজে অবহেলা দেখাতে শুরু করল। ব্যাপারটা এমন নয় যে লুবিনি সংসারের কোনো কাজ করত না, বরং উল্টো। এই সে আরো বেশি বেশি দায়িত্ব নিয়ে কাজকর্ম দেখাশুনা করছিল। কেননা ফসল যেহেতু বেশি আসছিল, চাষি গৃহস্থের কাজের পরিধিও বাড়ছিল। লুবিনি জামিরকে উপেক্ষা করত অন্যভাবে। জামির যখন বলে, গাইটাকে এবার ছেড়ে দে, চরে আসুক। লুবিনি তখন তার দিকে একবার তাকিয়ে গোয়ালঘরের উল্টোদিকে হাঁটা দিত। আবার পরিশ্রান্ত হয়ে জামির যখন দাওয়ায় এসে বসে বলত, জল দে, লুবিনি তখন এক ঘটি জল জামিরের থেকে হাত তিনেক তফাতে ঠক্ করে নামিয়ে রেখে চলে যেত।
এধরনের মৃদু প্রতিবাদ বেশ কিছুদিন জামিরের চোখে পড়েনি। তাতে লুবিনি আরো ক্ষিপ্ত হচ্ছিল। তারপর জামির যখন নতুন করে স্ত্রীলোকের প্রয়োজন অনুভব করতে শুরু করে, তখন সকৌতুকে লুবিনির এসব ভাব সে লক্ষ করে।
একদিন সন্ধ্যাবেলা হায়া ঘরের পিছনে আবর্জনা ফেলতে গিয়ে গোয়ালঘরের পাশ দিয়ে জামিরের সন্তর্পণে মাঠে নেমে যাওয়া দেখল। জামিরের পাঁজা কোলে লুবিনিকে সে দেখেছে ঠিকই, নাহলে, অতবড় পুরুষটার বুকের উপর দুমদাম কিল মারছিল কে? জামির চাপা হাসি হাসছিল।
দেখে হায়ার প্রবল আতঙ্ক হয়। ভয় সে চেপে রাখতে পারে না, ঘরে এসে পরতাপকে বলে।
পরতাম প্রথমে কিছু বোঝে না। বলে, হ তো কি হল?
এ কথার সঠিক উত্তর হায়ারও দিতে পারে না। সে শুধু বলে, না আমার বড় ভয় করছে। কিসের ভয়?
জামিরের যা সা-জোয়ান চেহারা
পরতাপ তাকে ধমক দিয়ে বলে, যা যা নিজের কাজে যা, যাদের কাজ তাদের বুঝতে দে! পাগল
কিন্তু হায়ার আতঙ্ক কাটে না। সে লুবিনির ফেরার অপেক্ষায় থাকে। বেশ কিছু সময় পরে লুবিনি ফিরে এলে হায়া সতর্কভাবে তার চোখমুখ নজর করে দেখে। না, একটা সলজ্জ উত্তেজনা ছাড়া সে আর কিছু আবিষ্কার করতে পারে না।
এর দিনদুয়েক বাদে হায়া লুবিনিকে জামিরের ঘরে শুতে পাঠাতে শুরু করে এবং এর পরে সারাজীবন জামির আর কখনো অবিশ্বস্ততার কাজ করেনি।
৩০.
জামিলাবাদ, হিঙ্গল, নমনকুড়ি ইত্যাদি গ্রামের মানুষ জানত না কী করে এখানকার জমি এত ফলপ্রসূ হল। গত পনেরো বছর ধরে টাঙ্গন দিয়ে জল আসা ক্রমাগত কমেছে। এতকালের ডুবো জমি এখন চমৎকার আবাদি জমি হয়েছে। প্রতি মরসুমে ফসলে মাঠ হেসে উঠছে। মানুষ দেবতার আশীর্বাদ হিসাবে দেবতার নামে জয়ধ্বনি করছে। কিন্তু কেউ জানত না কি করে এমন হল।
আবার সন্তোষ, দেবীকোট, কান্তনগর, সুলতানপুর, জাহাঙ্গীরপুর ও বিজয়নগর পরগনার অসংখ্য গ্রামের মানুষ এই একই ঘটনাকে দেবতার অভিশাপ বলে ধরে নিয়েছে। সেসব গ্রামে কয়েক বছর ধরে কীর্তন, নামাজ, পূজাপার্বন ও মানত চলছে দেবতার রোষ থেকে মুক্তি পাবার জন্য। কারণ আত্রাই আর পুনর্ভবায় জল নেই। বর্ষার কয়েকমাস সামান্য জল থাকে, তাছাড়া বছরের অন্যসময় নদীগর্ভ ধু ধু বালিয়াড়ি। ব্যবসা-বাণিজ্য যাতায়াতের জন্য এইসব পরগনার বিস্তৃত অঞ্চলে এই নদী দুটিই ভরসা। কোনো অজ্ঞাত কারণে হঠাৎ নদী দুটিই শুকিয়ে গেল।
বৃদ্ধরা বলে, হ্যাঁ বাপু, এমন আরো একবার হয়েছিল বটে, বাপ-দাদাদের কাছে শুনেছি, সে এখন থেকে একশো সওয়াশো বছর আগে।
আগে যা ঘটেছিল এইবারেও তাই ঘটেছে। তিস্তা আর আত্রাই-এর সংযোগে হিমালয় থেকে নেমে আসা বড় বড় পাথরের চাই, গাছের গুড়ি জমে জল যাতায়াতের রাস্তা ক্রমশ বন্ধ করেছে। সেই বাধার উপর পলি ও বালি দীর্ঘদিন ধরে জমে জমে আত্রাই-এর মুখকে পুরো বন্ধ করে দিয়েছে। এদিকে তিস্তার প্রবল জলধারা নতুন পথ করে নিয়ে ভাসিয়ে দিচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম, জনপদ। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রংপুর জেলা। একদিকে জলের জন্য হাহাকার, অন্যদিকে বন্যা প্রতিবছরই।
আগের বারে জেলা কালেক্টররা আপ্রাণ চেষ্টা করে কলকাতার রেভিনিউ বোর্ডকে রাজি করিয়ে টাকার ব্যবস্থা করেছিল এই বাধা দূর করার জন্য। প্রতিদিন দশহাজার কুলি কাজ করত। কিন্তু সেসব ব্যবস্থা বড় সহজে হয়নি। দুর্ভেদ্য জঙ্গল ও পাহাড়ি জায়গা ছিল মানুষের বসবাসের অযোগ্য। শয়ে শয়ে মানুষ মরছিল জ্বর ও পেটের রোগে। ফলে কুলিরা পালাতে থাকে। তখন আবার কুলিদের আটকাবার জন্য দারোগা, পাহারাদার, দফাদার ইত্যাদি নিয়োগ করতে হয়।
সে সময়ে সাহেবদের এইসব আয়োজনের প্রয়োজন ছিল। লবণ, রেশম, তঁত, চাল ইত্যাদি চলাচলের জন্য তখন একমাত্র পথ ছিল নদী। কাজেই সাহেবদের ব্যবসা মার খাচ্ছিল। তার উপরে কলকাতায় তখন ঘনঘন চাল পাঠাবার দরকার হতো। নদীতে জল না থাকলে কিভাবে চাল পাঠানো যাবে? কাজেই সরকারি ব্যবস্থায় দ্রুততা ছিল।
কিন্তু এবারের ব্যবস্থা অত তাড়াতাড়ি হয় না। যাতায়াতের জন্য স্থানে স্থানে রেলব্যবস্থা হয়েছে। রাস্তাঘাটও তখনকার দিনের থেকে অনেক নির্ভরযোগ্য ও নিরাপদ হয়েছে। কাজেই কালেক্টরদের ব্যবস্থা নিতে বেশ সময় পার হয়ে যায়। অবশ্য আত্রাই-এর মুখ পুরোপুরি বন্ধ একদিনে হয়নি। বছরের পর বছর ধরে আত্রাই-এর মুখ আটকেছে, আর সেকারণে জল কমেছে দিনাজপুরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে। জল কমেছে আত্রাই, পুনর্ভবা, টাঙ্গন ও এদের অসংখ্য খাড়িগুলোতে। আর এই জল কমাতে লাভবান একমাত্র নমনকুড়ি, হিঙ্গল, জামিলাবাদের মানুষ। তাই তারা খোঁজও নেয়নি কিসে জল কমল!
