কিন্তু এভাবে তো মানুষের চলে না। তাই দুর্গিকেও ঘরসংসার করতে হয়, হাড়মাকেও মাঠে যেতে হয়। দু-জনেই একটু স্বাভাবিক হতে হাড়মা বলে, এবার একদিন আমবাগানে ডাক দেদোনকে।
দুর্গি শঙ্কিত হয়ে বলে, কেমন?
হাড়মা বলে, ছেনালি করে ডাকবি।
এসব কাজ জানি নাকি?
দরকারে সব জানতে হয়।
যা হবার তো তো হয়ে গেছে, আর এসব ঝামেলায় গিয়ে লাভ কি?
হয়ে গেছে কে বলল? হচ্ছে তো প্রায়ই। আর হয়েই যদি গিয়ে থাকে তাহলে মারলি কেন আমায়?
হাড়মা চালায় বাঁশে গোঁজা তিনসেরি হেঁসোখানা নামায়। হেঁসোর মাথা একমুঠোহাত লম্বা, পাশে আট আঙুল প্রমাণ। মুর্যের মধ্যে ধরা যায় এমন হাতলের সরু বাঁকানো বেশ খানিকটা লম্বা লোহার দণ্ড ঢোকানো। সেই লোহার মাথায় হঠাৎ চওড়া হওয়া মারাত্মক হেঁসোর ফল। বুনো জন্তু-জানোয়ারের সঙ্গে হাতহাতি লড়াই করতে এমন অস্ত্র লাগে। হার্ডমা শান্তভাবে একখানা কাঠের পালিশ করা টুকরো বের করে তার উপরে বালি ছড়িয়ে সেই হেঁসোয় ধার দিতে বসে। দুর্গি এলে, তারপর?
তার পরের কথা তারপরে ভাবব। এখনকার কথা আগে ভাব। এখন যদি পাগল হয়ে যাই ‘তারপর দিয়ে তোর কী হবে?
দুর্গি আর কথা বলে না। হাড়মার ভাবভঙ্গি দেখে সে বোঝে এ কাজ তাকে করতে হবে। সে করেও।
দেদোন টোপ খায়, কেননা টোপ খাওয়ার মতো চেহারা দুর্গির ছিল। সন্ধ্যাবেলা নির্দিষ্ট গাছের নিচে দুর্গি দাঁড়িয়ে থাকে, দেদোন আসে। দেদোন কাছে আসলে হঠাৎ সেই গাছের হাত-পা গজায় এবং দেদোনের মুণ্ড ও ধড় আলাদা হয়ে সেখানে পড়ে থাকে।
আর তখন জামিলাবাদের ঘোষপাড়ায় হরিনাম সংকীর্তনের আসরে তুমুল খোলকৰ্তাল বাজনা চলে। আজ এর বাড়ি তো কাল ওর বাড়িতে আসর বসে। মানুষ উদ্দাম হয়ে নাচে, গান গায়।
২৯.
সাঁওতাল এবং ওরাওঁরা খড় ধার দিয়েছিল, জঙ্গলে বিন্না ও শন ছিল। কাজেই বাজিকরদের ঘরগুলো আবার নতুন করে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছিল। প্রতি বাড়িতেই দুঃস্বপ্নের স্মৃতির মতো বরগায় কি আড়ায়, দু-একখানা অঙ্গারের রঙ ধরা কাঠ কিন্তু রয়ে গেল। সেগুলো আগুন ধরেছিল ঠিকই, কিন্তু নতুন করে বাড়ি বানাবার সময় দেখা গেল একেবারে পরিত্যাগ করার মতো হয়নি।
পুলিশ কোতোয়ালি ছিল হাবিবপুরে, এখান থেকে অনেকটা দূর। বাজিকরদের কেউ পরামর্শ দেয়নি কোতোয়ালিতে খবর দিতে, আর বাজিকর অতীতে কখনো স্বেচ্ছায় পুলিশের কাছে যায় নি, এখনো যায় না। জামিলাবাদ একজন চৌকিদার আছে, সরকারি নিয়মে তারই অবশ্য খবর দেওয়ার কথা। কিন্তু সে স্থানীয়দের উপেক্ষা করতে সাহস পায় না। কাজেই এই খুন, ধর্ষণ এবং অগ্নিসংযোগ স্বাভাবিক ঘটনার মতোই গৃহীত হয়। কেউ এ নিয়ে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করে না।
শুধু বালি দলের নেতা হিসাবে জামিরকে গালাগালি করে তার অপরিণামদর্শিতার জন্য। কিছু জরিমানাও হয় তার। অর্থাৎ নতুন ঘর তোলার জন্য জমিলব্ধ যাবতীয় খড় ও তার যাবতীয় গবাদি পশু বিক্রি করে তার সম্পূর্ণটাই তুলে দিতে হয় বালির হাতে। খড় অবশ্য অঙ্গীকারের মধ্যে থাকে, কেননা আগুন একপণ খড়কেও রেহাই দেয়নি।
সময় যেহেতু কারো অপেক্ষায় থাকে না, বছর ঘুরে যায় একের পর এক। তারপরে জামালের জমিদারির এই অংশ বিহার থেকে আগত ভূঁইঞা পদবিধারী কয়েকজন ব্রাহ্মণ কিনে নেয় এবং জামিলাবাদে নতুন বাড়িঘরের পত্তনি করে। এরা সব অবস্থাপন্ন মানুষ। প্রথমেই তারা, নানাধরনের শিক্ষিত মিস্ত্রি মজুর নিয়ে এসে ইট পুড়িয়ে পাকা বাড়ি তৈরি করে। বেশ কয়েকখানা পাকা বাড়ি তৈরি হয় ও পাকাপাকি হয়ে বসতে তাদের প্রায় একবছর লাগে।
এইসব ভূঁইঞারা যে-কোনো ছুতোনাতায় পুরনো পত্তনি উচ্ছেদ করে জামিলাবাদ ও হিঙ্গল সংলগ্ন অনেক জমি খাসে আনতে শুরু করল। এরা কেউই সাবেকি জমিদার নয়, শুধু বড়সড় জোতদার। কাজেই জমি থেকে নিজেরাই মুনাফা তুলবার সবরকম কায়দা এদের জানা। এ ছাড়া প্রত্যেক ঘরই মহাজনি কারবারের বিরাট জাল পেতে বসল। এরা থানা-পুলিশ-আইনকানুন ভালো বুঝত এবং এসবের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগও রাখত। ফলে সদগোপ, ঘোষ ও মুসলমানেরা এদের সমীহ করে চলতে শুরু করল।
নমনকুড়ির মাঠে ইদানীং সবচেয়ে ভালো ফসল হচ্ছিল। এইসব জমি আদিবাসী ও বাজিকরেরা নামমাত্র খাজনায় এতকাল ভোগদখল করে আসছিল। পুরানো বছরের খাজনা বাকির অজুহাতে বেশ কয়েকঘর মানুষের জমি হাতছাড়া হয়ে গেল। এর মধ্যে অবশ্যই বেশির ভাগ মানুষ বাজিকর। এইসব বাজিকরেরা এতদিনেও জমির সঙ্গে একাত্ম হতে পারেনি, কিংবা জমিজমা সংক্রান্ত আইনকানুনও বুঝতে শেখেনি।
যেসব বাজিকরের জমি চলে গেল, তাদের অধিকাংশেরই এজন্য কোনো বিকার দেখা গেল না। তাদের যেভাবে দিন চলছিল, সেভাবেই চলতে লাগল।
কিন্তু পরে পৌষে, মাঘে কৃষিকৰ্মারহিত বাজিকরেরা পরতাপ, জামির ইত্যাদির ঘরের সামনে এসে রুদ্ধবাক ঈর্ষা প্রকাশ করে তাদের চাহনিতে। এত অজস্র শস্য এবার ফলেছে যে, যে-ব্যক্তি সামান্য জমি মাত্র চাষ করেছে, তারও সারাবছরের খোরাকির জন্য ভাবতে হবে না।
সেই মাঘে লুবিনির ছেলে হল। অসামান্য রূপবান শিশু। পরতাপ তারনাম রাখল রূপা। লুবিনি ছেলে পেয়ে তার ক্ষোভ ভুলে গেল। জামির ও রাধার বৃত্তান্ত তার অজানা ছিল না। বিষয়টা যখন প্রচার হয়, লুবিনির তখন বোঝার বয়স হয়েছে। কাজেই ঈর্ষা তাকে কিছুদিন বিপর্যস্ত রেখেছিল। সে মনে মনে রাধাকে উলঙ্গ করে তার সর্বাঙ্গে আলকুশি ছড়াতে চেয়েছিল।
