সেই দেদোন এখন আচমকা জামিরের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। রাধা তাকে আগেই দেখেছিল। সে আর্তনাথ করে সরে যেতে সময় পায়, কিন্তু জামির সে সুযোগ পায় না। সে ওঠারই সময় পায় না, তার আগেই দেদোন তার উপরে চেপে বসে।
ঘোষের মেয়ের সঙ্গে পিরিত আজ তোর শেষ। হারামজাদা
দেদোন গর্জন করে, কিন্তু বেশি বাগাড়ম্বর করে না। সে শক্তিশালী মানুষ, নিজের উপর আস্থাও তার খুব।
রাধা একপাশে সরে দাঁড়িয়ে দেদোনের এই উন্মত্ততা দেখে। চিৎকার করতে কিংবা পালিয়ে যেতেও সাহস করে না সে, শুধু মাঝে মাঝে ভয়ার্ত হিক্কা তোলে।
জামির দেদোনের আক্রমণ ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়াতে পারে না। দেদোন তার উপরে চেপে বসা, চুলের মুঠি ধরে দেদোন তার মাথা মন্দিরের চাতালে ঘেঁছবার চেষ্টা করে। জামির দু-হাত দিয়ে তাকে আটকাবার প্রয়াস পায় শুধু।
দেদোন পূর্ণবয়স্ক যুবক এবং সম্ভবত জামিরের থেকে অনেক শক্তিশালী। তার দেহ সুগঠিত। কিন্তু জামির দীর্ঘকায় এবং অল্প বয়সের জন্য অনেক বেশি ক্ষিপ্র। ফলে দেদোন তার বুকের উপর চেপে বসলেও কোমরের উপরে সে ভর রাখতে পারে, আর কোমরের উপরের কোনো চাপ না থাকায় দুই পা বাঁকিয়ে জামির দেদোনকে কায়দা করে ফেলে ও নিজেকে মুক্ত করে। তারপর দু-জনে মুখোমুখি দাঁড়ায়।
রাধা জানে দেদোন যদি এ লড়াইতে জেতে তার প্রেমাস্পদ অবশ্যই খুন হবে এবং সেও অবশ্যই স্বাভাবিকভাবে বাড়ি ফিরতে পারবে না। কেননা তখন দেদোন তাকে স্বাভাবিক কামুকতায় গ্রহণ করবে না, গ্রহণ করবে অস্বাভাবিক পাশবিকতায়। এটাই নিয়ম। এজন্য সে সমাজে নিন্দিতও হবে। কেননা গ্রাহ্য বীরত্বও এটাই। তাই গলায় আঘাত খেয়ে জামিরকে ভারসাম্য হারাতে দেখে সে আতঙ্কে আরেকবার ককিয়ে ওঠে।
জামির হ্যাচকা টানে হঠাৎ প্রতিপক্ষকে ইটের চাতালে প্রথমে আছড়ে ফেলে, তারপর যাযাবরী ক্ষিপ্রতায় শূন্যে লাফিয়ে উঠে হাঁটু ভেঙে নেমে আসে দেদোনের বুকের উপর। দেদোন আর্তনাত করে উঠলেও মূহূর্তে জামিরকে ধরে ফেলে সাপটে, যে ব্যাপারটা এ লড়াইয়ের প্রথম থেকেই সে করতে চেষ্টা করছে।
বেশ কয়েকবার ওলটপালট চলে। দু-জনের মুখই রক্তাক্ত। কান এবং মুখের কষ বেয়ে রক্ত ঝরছে জামিরের। এখন তার চেহারায় খুনির ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দু-জনে দু-জনের কাছ থেকে সামান্য দূরত্বে আক্রমণের সুযোগে ঘুরছে চোখে চোখ রেখে। দু-জনেই সতর্ক কেননা দু-জনেই আহত এবং ক্লান্ত। দুজনেই জানে মারাত্মক আঘাতের সময় এটাই।
হঠাৎ রাধার খেয়াল হয় সে এখানে দাঁড়িয়ে আছে কেন? সে তো পালাতে পারত এতক্ষণে! তবে? জামির, অথবা ভয়? সে আস্তে আস্তে পিছনে সরতে শুরু করে।
দৃশ্যটা প্রথম চোখে পড়ে দেদোনের। সে জামিরকে ছেড়ে রাধার দিকে ঝাপ সে জামির এ সুযোগ ছাড়ে না। সে একটা চিতাবাঘের মতো দেদোনের পিঠের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। গর্দানের উপরে একটা প্রবল আঘাতে দেদোনের কাণ্ডজ্ঞান সম্পূর্ণ লোপ পায়। মাথার ভেতরে একটা ভোঁতা শূন্যতাবোধ, কুয়াশার মতো ঝাপসা অনুভূতির সামান্য সময়, তারপর সে ঝড়ে ভাঙা গাছের মতো আছড়ে পড়ে মাটিতে। জামির তার উপরে দৈত্যের মতো দাঁড়িয়ে হাঁফায়। তারপর রাধার দিকে তাকিয়ে একটু হাসার চেষ্টা করে টলতে টলতে জাঙ্গলের ভেতরে অদৃশ্য হয়ে যায়।
দেদোন জিতলে শুধু থুথু ফেলে চলে যেত না, দেদোন জিতলে জামির খুন হতো। কিন্তু একথা জামির বুঝেও দেদোনের মৃত্যু সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করেনি। কেনান সে শুধু আত্মরক্ষার জন্য যুদ্ধ করেছিল। সে অবশ্যই ভুল করেছিল।
দেদোন কয়েকদিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠে। তারপর গোপনে পরিকল্পনা চলে কয়েকদিন। তারপর একদিন মাঝরাত্রে নমনকুড়ির আকাশ লাল হয়ে উঠেছিল আগুনে।
দেদোন দলবল সংগঠিত করে আক্রমণ করেছিল বাজিকর বসতি। সব কটি ঘরে আগুন লাগিয়েছিল, ধর্ষণ করেছিল রমণীদের, বিশেষ করে লুবিনিকে, তার তখন চোদ্দ বছর বয়েস। দেদোন আগুনের মধ্যে ছুঁড়ে দিয়েছিল পরতাপের দুটি সন্তানকে, দাঙ্গাবাজদের ভীষণ আকৃতির হাঁসুয়ায় খুন হয়েছিল আরো দুজন মানুষ।
এই ঘটনার পর দেদোনোর বীরখীতি আরো ছড়ায়, তার পাশবিকতা ও যথেচ্ছার আরো বাড়ে। এতে মজা পায় সে। নিজেকে একদল শেয়ালের মধ্যে সিংহের মতো মনে হয় তার।
তারপর সে নমনকুড়ির সাঁওতালপাড়ায় নজর দেয়। সাঁওতাল মেয়েদের পছন্দ অপছন্দ এবং ইচ্ছা-অনিচ্ছার দাম আছে, একথা দেদোনরা জেনেছিল। এতে যে দেদোনদের দম্ভে লাগে, একথা সাঁওতালরা জানত না।
কাজেই আচমকা রাতের অন্ধকারে কিংবা হাটফেরতা দলছুট কোনো সাঁওতাল রমণী হিঙ্গলে ও জামিলাবাদে ধর্ষিতা হতে থাকে। সাঁওতালরা সতর্ক হয়। এখনো এই দেশ তাদের কাছে বিদেশ, তাছাড়া এখানে দেদোনরাই দলে ভারি। কাজেই তারা নিজেরা সতর্ক হয় ও মেয়েদের শাসন করে।
তারপর একদিন হাড়মার নতুন বউ দুর্গি জামিলাবাদের আমবাগানের হারানো গরু খুঁজতে যায়। নিরালা নির্জন আমবাগানে যে দেদোন.তাড়ির আসর বসিয়েছে, একথা সে জানবে কী করে? দুর্গি দেদোনকে বাপ ডেকেও পার পায় না। আঁচল মুখে কামড়ে ধরে সে বাড়ি ফিরে আসে এবং ‘কী হয়েছে’ জিজ্ঞেস করতে হাড়মার গায়ের উপর আছড়ে পড়ে উন্মাদের মতো মারতে থাকে তাকে। তারপর সে চেঁচিয়ে কাঁদে ও পাড়ার লোকে জানতে পারে সবই।
হাড়মা কদিন গুম হয়ে ঘরের ভিতর বসে থাকে। কোনো কাজ করে না। কোনো কাজে উৎসাহও বোধ করে না।
