এর মধ্যে কোনো জাদু আছে নাকি? বাজিকর পীতেম বুড়োর জাদু? কে বা জানে অচিন দেশের মানুষ সব, জানে বা কোনো গুপ্তবিদ্যা, তা দিয়ে বশ করে নদী, বান, বৃষ্টি।
এসব কথা ভাবত সাঁওতাল, ওরাওঁরা, আর গোয়ালা, সদগোপ, মুসলমান চাষিরা। বর্ষার সময় নদী ভরে উঠত ঠিকই, কিন্তু সে আর উপচে পড়ত না। আবার আশপাশের জলও যখন নেমে আসত, নদী সে জলও নিয়মমতো পৌঁছে দিয়ে আসত মহানন্দায়, কোনো অঘটন ঘটাত না।
নতুন জমিদার বদিউলের ছেলে জুমিল অনেক আগে থেকেই বাজিকরদের উপর খাজনা বসিয়েছে। খাজনা দিতেও হচ্ছে বাজিকরদের, কিন্তু মুশকিল হল। যে আশায় পীতেম নমনকুড়িতে বসতি করল সে উদ্দেশ্য সিদ্ধ হল না। বাজিকরেরা গৃহস্থ হতে পারছে না সবাই। পরতাপ ও জামির অবশ্যই ব্যতিক্রম। তাদের দেখাদেখি অন্য পাঁচ-দশজনও জমিতে মেহনত দিতে শুরু করে। কিন্তু যেই কোনো বাধা আসে, আসে কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়, যার হাত থেকে চাষির নিস্তার নেই এবং যা হামেশাই হতে পারে, হতাশ হয়ে বসে পড়ে তারা। পরতাপ তার অর্জিত অভিজ্ঞতায় বোঝায়, আরে বাপু, ধরে নেও না কেন যে তিনটা চাষের একটা মারা যাবে। তাহলেও আর দুটো থাকে। আর সে দুটোয় তোমায় ভরে দেবে। চাষের তো এই নিয়ম।
কিন্তু এসব কথা জাত যাযাবরকে বোঝানো কঠিন। তারপর ফসলের জন্য অপেক্ষা তার কাছে আরো অশান্তির মনে হয়। কাজেই পরতাপ, জামির সহ কয়েক ঘর মাত্র পুরোপুরি চাষের কাজে আত্মনিয়োগ করে, অন্যেরা যে যার মতো পুরনো কায়দায় বেঁচে থাকার চেষ্টা করে।
নমনকুড়ির জীবন বয়ে চলে পুনর্ভবার আর টাঙ্গনের স্তিমিত স্রোতের মতো, তাতে আর ঢল নামে না, বান ডাকে না।
কিন্তু প্রকৃতির এই স্বাভাবিকতায় জামিলাবাদ এবং হিঙ্গল বড় অশান্ত হয়ে ওঠে। প্রকৃতিগত কয়েক বছর ধরে দিচ্ছে এমন অকৃপণ হাতে যে কর্মী মানুষ পরিশ্রমী মানুষ তা থেকে একটু চেষ্টাতেই ভবিষ্যতের জন্য তৈরি হয়ে যায়। পাঁচ বছর আগে যাদের ছিল এক হালের জমি, এমন অনেকেই এখন তিন হাল চার হাল করে নিয়েছে। মাঠে কাজ করার লোকের অভাব নেই। আদিবাসীরা আসছে দলে দলে, নমনকুড়ির বহর আরো বড় হচ্ছে। এমনকি গৃহস্থরা নিজেদের সুবিধার জন্য জামিলাবাদ ও হিঙ্গলেও বেশ কিছু আদিবাসী পরিবারের বসতি করিয়েছে। না হলে চাকরপাটের অভাব গুরুতর আকার ধারণ করেছিল। কাজেই জামিলাবাদ ও হিঙ্গলের জীবনে এখন প্রচুর সময়, ভোগের জন্য উদ্বৃত্ত আয়।
এই তো সময়, যখন গোয়ালাদের সঙ্গে সদৃগোপদের পুরনো শরিকি ও মর্যাদার লড়াইগুলোর নিষ্পত্তি করে নেওয়া যায়। এবং এই তো সময়, যখন জামিলাবাদের আগন্তুক বাদিয়া মুসলমানদের দাপট দেখিয়ে কিছুটা খর্বাকৃতি করে দেওয়া যায়।
কাজেই প্রচুর বিক্ষিপ্ত ও সংগঠিত ঝামেলা হয়—যেমন হয়েছিল কয়েক বছর আগে জামির-রাধার সম্পর্ককে কেন্দ্র করে।
রাধা সেই যে জামিরকে ঝোপঝাড়ের অন্ধকারে আকর্ষণ করে নিয়ে গিয়েছিল তার সে আকর্ষণ থেকে জামির সহজে নিষ্কৃতি পায়নি। তাদের এই প্রেম ও অভিসার চলেছিল বছরদুয়েক। চতুর রাধা জামির ও তার সামাজিক দূরত্বটার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারত। কাজেই অন্তত বছরখানেক সে ব্যাপারটাকে গোপন রাখতে পেরেছিল। কিন্তু তার পরে সে ধরা পড়ে যায়।
আর ধরা পড়ে দুর্দান্ত দেদোন ঘোষের হাতে। অবশ্য দেদোনের হাতে ধরা পড়াই স্বাভাবিক, কেননা, দেদোন দীর্ঘকাল ধরে রাধাকে আকাঙ্ক্ষা করে আসছে। এবং অসংখ্যবার তাকে প্রেম নিবেদনও করেছে। কিন্তু তার ভীষণ কুৎসিত মুখাকৃতি রাধাকে চিরকাল প্রতিহত করেছে। কাউকে দেহদানের ব্যাপারে রাধার একটিমাত্রই বিলাসিতা ছিল, তা হল, পুরুষটিকে সুপুরুষ হতে হবে। সম্ভবত, এই কারণেই সে স্বামীর ঘর করতে পারেনি।
দেদোন সময় পেলেই রাধা গতিবিধি অনুসরণ করত। অনেকদিন ধরেই তার সন্দেহ হচ্ছিল। সন্দেহের প্রধান কারণ, রাধা পুরুষমানুষ ছাড়া থাকতে পারে না। এতকাল সে যে ক-জন পুরুষকে সঙ্গ দিয়েছে তারা হয় জামিলাবাদ না হয় হিঙ্গলের মানুষ। সুতরাং কারো কাছেই এসব ব্যাপার গোপন থাকত না।
এখন বেশ কিছুদিন যাবৎ রাধার চালচলনের কোনো সঠিক হদিশ পাওয়া যাচ্ছিল না। তাতেই দেদোনের সন্দেহ হয় যে, এর মধ্যে নিশ্চয়ই কোনো বাইরের লোক আছে। সন্দেহ তার দৃঢ় হয় যখন একদিন সে জামিরকে অন্ধকারের মধ্যে দূরের থেকে দেখে। কিন্তু সে নিঃসংশয় হতে পারনি। অন্ধকার ছিল বলে সে জামিরের মুখ ভালো দেখতে পায়নি, কিন্তু তার সন্দেহ হয়েছিল যে, যে-মানুষটা এইমাত্র মাঠে নেমে গেল সে জামিরই।
জামির ও রাধার অভিসারকুঞ্জ ছিল জামিলাবাদের একটি পরিত্যক্ত প্রাচীন মন্দির। জায়গাটা জঙ্গল এবং কঁটাঝোপে এমন সুরক্ষিত ছিল যে মানুষের সেদিকে কোনো প্রয়োজন ছিল না। জামির নিয়মিত সেখানে রাধার সঙ্গে মিলিত হতো।
সেই গোপন স্থানে একদিন দুপুরের দিকে দেদোন ধরে ফেলে তাদের দুজনকে। প্রথমে সে নিজেকে লুকিয়ে রেখে রাধা ও জামিরের ক্রিয়াকলাপ দেখে এবং তারপর সে ঝাঁপিয়ে পড়ে জামিরের উপর।
দেদোনের খ্যাতি এ অঞ্চলে ধর্ষক হিসাবে। প্রত্যেকে সমাজেই কিছু মানুষ থাকে যাদের বাদ দিয়ে সমাজটা চলতেই পারে না, অথচ এরা উচ্চতর সমাজের বিচারে পরগাছার মতো। এই ঘোষ ও মুসলমান বসতির আশেপাশেও একরম কিছু দরিদ্র মানুষ ছিল যারা সর্বদাই সন্ত্রস্ত থাকত।এদের পুরুষেরা অবস্থাপন্নদের বাড়িতে চাকরের কাজ করত। মেয়েরা করত খেলালি কিম্বা ধান কোটা ভানা, চিড়া মুড়ি, ভাজা, ইত্যাদি কাজ। জামিলারা ছিঙ্গলের উভয় গোষ্ঠীর গোপেদের মধ্যে দেদোনের মতো কিছু মানুষ এই শ্রেণীর রমণীদের উপর যথেচ্ছাচার করত এবং এমন ত্রাসে রাখত যে বাপের সামনে মেয়েকে কিংবা স্বামীর সামনে স্ত্রীকে ধর্ষণ করলেও কেউ কোনো কালে প্রতিবাদ করতে সাহস করত না। পরবর্তীকালে দিয়াড়া অঞ্চলের মুসলমানরা এখানে উঠে আসার পর তাদের মধ্য থেকেও এ ধরনের কিছু নিপীড়কের উৎপত্তি হয়েছিল। হয়ত জামিলাবাদ ও হিঙ্গল কোনো ব্যতিক্রম নয়। তবে দেদোন নিশ্চয়ই ব্যতিক্রম, কেননা, তার খ্যাতি ছিল এমন যে, সে নাকি চালা ফুটো করে ঘরে ঢুকেও মেয়ে তুলে আনতে পারে। একমাত্র রাধার উপরে এ ধরনের কোনো আক্রমণ সে করত সাহস করেনি, তার কারণ রাধা পতাকির বোন এবং স্বশ্রেণীর মধ্যে এধরনের ঘটনার সৃষ্টি করলে একেবারে অক্ষত পার পাওয়া যায় না।
