তারপর জ্যৈষ্ঠ মাসে পরতাপ এবং জামির তার কাছে আসে পীতেমের মৃত্যুসংবাদ নিয়ে। সব খবর শুনে সে বাহ্যজ্ঞানশূন্য মানুষের মতো বসে থাকে অনেক সময়। তার চোখে আতঙ্ক, যা স্পষ্টতই পরতাপ ও জামিরের চোখে ধরা পড়ে। সে কাঁদে না, কিংবা চেঁচিয়ে শোকপ্রকাশ করে না। সে সামনের দিকে অনির্দিষ্টভাবে তাকিয়ে থাকে, যেন অতিপ্রাকৃত সব দৃশ্য দেখে। তারপর বিড়বিড় করতে শুরু করে। একসময় মূছা যায়।
সালমার পরিচারিকার সঙ্গে জামির ও পরতাপ তাকে ধরাধরি করে বিছানায় নিয়ে শুইয়ে দেয়। বিছানায় শোয়াবার পর তার চোখ খোলে। তখন কড়িকাঠের দিকে বিহুল দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে থাকে।
পরতাপ ও জামির সে রাত অন্য বাজিকরদের সঙ্গে কাটায়। তাদের কাছে সালমার যাবতীয় বৃত্তান্ত তারা শোনে। তারা এই চার ঘর বাজিকরের ভয়ানক আক্রোশ টের পায়।
পরদিন তারা খোঁজ নিয়ে জানতে পারে সালমা এখনো বিছানা ছাড়েনি। তৃতীয় দিনে বিদায় নেবার জন্য তারা আবার তার সঙ্গে দেখা করতে যায়।
সালমা তাদের সঙ্গে স্বাভাবিক ব্যবহার করে। এই স্বাভাবিক ব্যবহার জামির ও পরতাপের কাছে অদ্ভুত লাগে। ধনী গৃহস্থ যেমন চাষিমজুরের সঙ্গে একটা দূরত্ব বজায় রাখে, সালমার ব্যবহারেও তারা সেই জিনিসটি টের পায়। সালমা তাদের খেতে দেয় ও নিরাসক্তভাবে দলের লোকজনের খোঁজখবর নেয়। তারপর তারা যখন বিদায় চায়, সে শুধু ‘আচ্ছা’ বলে তাদের বিদায় করে।
আষাঢ় মাসে প্রচুর বৃষ্টি হয়। শ্রাবণে ঘন বর্ষা নামে। সবাই আশঙ্কা করতে থাকে এবার বড় বান হবে। কেননা খবর পাওয়া যাচ্ছিল গঙ্গা ইতিমধ্যেই ভরে গেছে। উত্তরে নাকি অনেক আগে থেকেই বর্ষা শুরু হয়েছে। মহানন্দা প্রবল বেগে জল এনে ঢালতে থাকে গঙ্গায়, ভীষণ স্রোত সে জলের। তারপর ধীরে ধীরে মহানন্দার জলের স্রোত মন্দীভূত হতে থাকে ও ক্রমশ উঁচু হয়, কেননা নিচের দিকে গঙ্গা আগেই ভরা ছিল। তখন সেই নদীর উপরে গেরুয়া রঙের ফেনা জমতে থাকে, ভেসে আসতে থাকে এবং শ্রাবণের মাঝামাঝি থেকে বিরামহীন বৃষ্টি শুরু হয়।
একটানা সাতদিন বৃষ্টি হবার পর মানুষ শহর ছেড়ে দূরে, নদী থেকে দূরে পালাবার আয়োজন করতে শুরু করল। কেননা তখন শহরের নিচু অংশগুলোতে বৃষ্টির জল ও মহানন্দার জল একসঙ্গে মিশেছে। নদীর জলের আর যেন কোনো গতি নেই। শুধু উঁচু হচ্ছে সেই জল, যেন সামনে কোনো বিশাল প্রাচীর তুলে নদীকে কেউ আটকে দিয়েছে। সামনে অবশ্যই প্রাচীর ছিল, সে প্রাচীরও জল দিয়ে তৈরি।
পনেরো দিন বৃষ্টি হবার পর শহরের উঁচু অংশগুলোতেও কোমর ডুবে গেল মানুষের। সালমা তার পনেরো হাত উঁচু কাঠের ঘরের মাচানের উপর আপৎকালীন ব্যবস্থা মজুত করল।
তারপর বৃষ্টি কিছুটা ধরে এলেও জল সমানে বাড়তে থাকল। সমস্ত শহরই প্রায় জলের তলায়। সালমার পশুশালার গরু মোষ সব মরতে শুরু করল। প্রথমে তারা মরল খাদ্যাভাবে এক এক করে, বাকিরা একসঙ্গে জলে ডুবে। তার চৌহদ্দির মধ্যেই তারা ফুলে পচে ঢোল হয়ে ভাসতে থাকল। চতুর্দিকে কটুগন্ধপূর্ণ বিষাক্ত বাতাস।
সালমা এই নরকের মধ্যে সম্পূর্ণ একা বেঁচে রইল। তার পরিচারক, পরিচারিকা সময় থাকতেই পালিয়েছিল, কিন্তু সালমা কোথাও যাওয়ার কথা ভাবেইনি।
তারপর জল যখন নামতে শুরু করে তখন সালমা মই বেয়ে উপর থেকে নিচে নেমে আসে। কোমরসমান জলে দাঁড়িয়ে একাই সে একটার পর একটা মৃত প্রাণীর দেহ বাঁশ দিয়ে ঠেলে স্রোতের দিকে বের করে দিতে থাকে।
জল একসময় সম্পূর্ণ নেমে যায়, বৃষ্টিও বন্ধ হয় পুরোপুরি। সমস্ত শহরে শুধু দীর্ঘকাল ধরে পড়ে থাকে মৃত মানুষ ও পশুর মৃতদেহ এবং পৃতিগন্ধে ভারি বাতাস।
তখন এক রাতে চেতা সহ আরো তিন ঘরের তিনজন বাজিকর সালমার বাড়িতে প্রবেশ করে। মই বেয়ে মাচানের উপরে উঠে তাকে নিয়ে আসে আলোর সামনে। তাদের চারজনের হাতে উদ্যত ছুরি। তারা সালমার সঞ্চিত মোহর, অলঙ্কার ও টাকা চায়।
সালমা ভয় পায় না এবং স্থির প্রত্যয়ে বলে, কিছু পাবি না!
চেতা বলে, না পেলেও ক্ষতি নেই, তোমার কলজেটা উপড়ে নিয়ে যাব বরং।
সালমা বলে, তাই নিয়ে যাও
তাকে তখন ডাইনির মতো দেখাচ্ছিল, তাতে চেতা ছাড়া আর তিনজন ভয় পেয়েছিল।
চেতা তার ছুরি দিয়ে সালমার মুখে ও বাহুতে ক্ষত করেছিল, তা থেকে রক্তপাত হচ্ছিল।
সালমা সেই একই ভঙ্গিতে বলে, তাও পাবি না।
চেতা তখন তার গলার উপর ছুরি চেপে ধরেছিল। বলেছিল, বল কোথায় আছে তোর দৌলত?
সালমা উন্মাদিনীর মতো বলেছিল, কেন কলজে নিবি না?
আর তখনই চেতা তার ছুরি সালমার বুকে বসিয়েছিল গভীর করে।
তারপর প্রায় সারারাত তারা সমস্ত বাড়ি ভেঙেচুরে তোলপাড় করেও কিছুই পায়নি। শুধু মাচানের উপরে তখনো এক কলসী খাবার জল ছিল আর কয়েক বস্তা চাল। ঘাতক বাজিকরেরা সেগুলো নিয়েই ফিরে গিয়েছিল।
২৮.
নমনকুড়িতে ভালো ফসল হচ্ছে ক্রমাগত। সাঁওতাল ও ওরাওঁদের ঘরে ঘরে সারা বছরের খাবার থাকে। উদ্যম লোকেরা নতুন নতুন জমি হাসিল করে। কিন্তু এসবের মূলে যে কারণটি, তা কেউ বোঝে না। সেই যে বাজিকরেরা এল আর বানবন্যা বন্ধ হল। নমনকুড়ি, জামিলাবাদ আর হিঙ্গলের যাবতীয় ডুবো জমি সব সোনা ফলাতে লাগল। প্রথম বছর পাঁচেক বর্ষার পরে জল দাঁড়াত জমিতে, কিন্তু সেও ক্রমশ কমের দিকে। তারপর থেকে আর কখনো বানভাসি হয়নি নমনকুড়িতে।
