পিছনে পড়ে থাকা মালদার চার ঘর বাজিকর নির্ঘাৎ শহুরে বদমাস হয়ে উঠেছিল। অন্তত সালমার এরকমই ধারণা হয়। প্রথম প্রথম তারা আশা করত, সালমা তার ঐশ্বর্যের কিছু অংশ অন্তত তাদের জন্য ব্যয় করবে। কিন্তু সন্ধলমা তা করত না। তার যুক্তি ছিল পরিষ্কার। কী সম্পর্ক এদের সঙ্গে তার? কতকগুলো অকর্মণ্য চোর!
এই চার ঘর বাজিকর প্রথম প্রথম তার কাছে এসে অনুনয় বিনয় করত, পরে কৌশল পাল্টে দাবি করত। কিন্তু সম্পদবৃদ্ধি সালমাকে তার জীবনের এক পরমার্থ এনে দিয়েছে। সারা জীবনে সে বুঝতে পারেনি এ জীবনটা কেন। এখন এই সম্পদবৃদ্ধির ভিতরে নিজেকে নিরস্তুর মুক্ত রেখে অস্তিত্বের একটা অর্থ খুঁজে পায় সে।
ফলে বিত্তবানদের নিয়ম অনুযায়ী সে পশ্চিমা দারোয়ান রাখে। তারা বাজিকর ও অন্যান্য সুযোগ-সন্ধানী ও কৃপাপ্রার্থীকে সামলায়।
শহরের আয়তন যত বাড়ে টাঙ্গাওয়ালা বাজিকর ও সমগোত্রীয় অন্যান্য এমদায়ী মানুষের রোজগার তত বাড়ে। কিন্তু দ্রব্যমূল্য বাড়ে তার দ্বিগুণ হারে। কাজেই সাধারণ মানুষের জীবন আরো কষ্টকর হয়। বাজিকরেরা তাদের পুরনো অভ্যাসগুলোকে অনিচ্ছাসত্ত্বেও ঝালিয়ে নেয়। কেউ ভানুমতির ঝুলি বের করে, কেউ পশু চুরি করে রাতের অন্ধকারে অন্যত্র চালান করে।
এইভাবে দুলদুলি লোপাট হয়ে যায়। নিঃসন্দেহে এটি বাজিকরদের কাজ। এর মধ্যে নিছক চুরি ছাড়া সামলাকে এক হাত নেওয়াও থাকে। পশু চুরিতে বাজিকরের কোনো বিবেকের বালাই থাকে না।
যে রাতে দুলদুলি চুরি হয় সে রাতেই বদিউল মারা যায়। দুলদুলির জিন মাহাত্ম্য তাতে আরো বাড়ে। সালমা বদিউলের মৃত্যুসংবাদ শুনে সে বাড়িতে গিয়ে দুলদুলির চুরি যাওয়ার খবরও শোনে। যদিও সে এখন শহরের পয়সাঅলাদের একজন, তবুও কিছু বিরূপ মন্তব্য তাকে হজম করতে হয়। কেননা, শহরে পশুচোর হিসাবে বাজিকরদের তখন খ্যাতি বেশ ভালোই ছিল। তাছাড়া, এ বাড়িতে যে ব্যক্তি তাকে সম্মান দিত, তার মৃত্যুর পর সালমা দেখে সে কী পরিমাণ অবাঞ্ছিত এখানে। কেউ কি একথা বলেছিল, ‘জামাল, দেখিস ও বাউদিয়া মাগি যেন কাফেনের ঘরে না যাবার পরে!’ একথা কি সালমা সত্যিই শুনেছিল? এরকম কোনো রমণীকণ্ঠ?
এবং অবশ্যই সালমাকে সে ঘরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। সালমা জানলায় দাঁড়িয়ে বদিউলের শব দেখেছিল। যদিও তার ইচ্ছা ছিল, তবুও সে শবানুগমন করতে পারেনি। সে প্রতিমুহূর্তে অপমানের আশঙ্কা করছিল এবং প্রতিক্ষেত্রেই নিষেধাজ্ঞা অনুমান ও আশঙ্কা করছিল। বদিউলের বাড়ি থেকে ফেরার পর সে যথার্থই বুঝতে পারে এ শহরে সে আদৌ সম্রান্ত নয়। সে নিতান্তই এক কুসীদজীবী, পশুপালিকা বৃদ্ধা। বদিউল জীবিত থাকাতে বহুকাল যা বুঝতে পারেনি এখন মুহূর্তে তা বোঝে। সে নিজেকে দেখে একেবারে একা।
সালমা গোপনে খবর নিয়ে জানতে পারে, চেতা নামে এক চতুর বাজিকর দুলদুলিকে চুরি করে এক রাতে বিশ-পঁচিশ ক্রোশ রাস্তা ঘোড়া ছুটিয়ে ধলদিঘির মেলায় ঘোড়া বিক্রি করে আবার তার পরদিনই ফিরে আসে। বদিউলের বাড়িতে তার অপমানের ক্রোধ গিয়ে পড়ে শেষপর্যন্ত এই চার ঘর বাজিকরের উপর। কোতোয়ালিতে জামাল ঘোড়া চুরি বিষয়ে তার বাজিকরদেরই সন্দেহের কথা বলেছিল। তিন চারজন যুবক ও বৃদ্ধ বাজিকরকে এ ব্যাপারে যখন গ্রেপ্তার করে এনে মারধর করা হয়, সে খবরে সালমা সুখী হয়।
তারপর যখন চারঘর বাজিকরের রমণীরা একত্রে এসে তার কাছে টাকা চায়, সে ক্ষিপ্তের মতো বলে, কিসের টাকা?
কোতোয়ালিতে দিতে হবে, মানুষগুলো বেবাব আটকে আছে।
আমি দেবো কেন?
তোমার টাকা আছে, তাই দেবে।
আবদার! যা যা, যত সব চোরের দল!
পীতেম বুড়া থাকলে এমন কথা বলত না।
খবরদার! পীতেমের নাম করবি না। পীতেমের কথা তোরা শুনিসনি।
তারাও তো সুখে নাই।
নাই তো নাই, আমার কী? আমি কি বাজিকর? আমার সাথে কারো কোনো সম্পর্ক নাই।
অথচ এই সালমা বুক খুলে দিয়েছিল, বস্ত্র খুলে দিয়েছিল রাজমহলের কোতোয়ালিতে পীতেমকে বাঁচাবার জন্য। সে এমন কথা বলে!
কিন্তু তারাও বাজিকরের মেয়ে। বলে, জমিদারনি হবে ভেবেছিলে? টাকা আমাদের দেবে না, একদিন গলায় পা দিয়ে কেউ নিয়ে নেবে, সেদিন আটকাবে কে? মরলে পরে মুদ্দফরাসে পায়ে দড়ি বেঁধে টেনে নিয়ে যাবে, কারণ তোমার মড়া হিন্দুতেও ছোঁবে না, মোছলমানেও ছোঁবে না। আর আমরা বাজিকরেরা? মাটি দেওয়া দুরে থাক, গোরে লাথি মারতেও আসব না।
সালমা দারোয়ান দিয়ে তাদের বের করে দিয়েছিল। বদিউল মরে যাওয়ার পর চতুর্দিক থেকে নানাধরনের অস্থিরতা ও অশান্তি তাকে ঘিরে ধরছিল। সে তখন পীতেমের কথা ভাবছিল। নমনকুড়িতে চলে যাওয়ার কথাও দু-একবার ভেবেছিল। কিন্তু শেষপর্যন্ত হয়নি। আরাম ও সাবলীল জীবনে এখন দীর্ঘকাল ধরে অভ্যস্ত সালমা এই বয়সে আর কোনো ঝুঁকি নিতে পারে না। তারপর ভেবেছিল জামিরকে এখানে নিয়ে এসে রাখবে, কেননা পীতেম আসবে না সে ঠিকই জানত।
কিন্তু পরক্ষণেই ভাবে জামিরকে নিয়ে এলে তার এই সঞ্চিত অর্থ ও এই বিশাল পশুপালা, এও তো জামিরকে দিয়ে যেতে হবে! কেন জামিরকে দেবে?
জামির তার কে?
সালমা টের পায় না কি অস্থির বিকৃতি তাকে গ্রাস করেছে। এক এক সময় তার মনে হয়, সে বোধহয় মরবে না। কেননা মরলে পরে তার এতসব সম্পত্তির কী হবে? তার ধারণা হয়, মৃত্যুটা একমাত্র দরিদ্র বাজিকরদেরই নিয়তি, সে স্বতন্ত্র। যেসব প্রক্রিয়াতে এতকাল সে লুব্ধ মানুষের যৌবন ও আয়ুবৃদ্ধি করত, এখন সেসব সে নিজের উপরই প্রয়োগ করে।
