কারণ যাই হোক, রাধা উপেক্ষিত হয়েছে আজ এবং উপেক্ষা ঢাকবার জন্য একটা মনগড়া ব্যাখ্যা সে তৈরি করেছিল বাছুর হারানো নিয়ে। কেননা, উপেক্ষা কোনো রমণীই সহ্য করে না, আর সে যদি রাধা হয়, তাহলে তো প্রশ্নই নেই।
কথার ভঙ্গি আগের মতো রেখেই সে প্রত্যাঘাত করে। বলে, তা যা বলেছ বাজিকর, ঘোষেদের নিয়মকানুন বাজিকরদের থেকে একটু আলাদাই বটে। এই যেমন ধরো না, আমাদের মাঝে বেটাবেটির মাকেই তার মুতের কাঁথা ধোওয়া-শুকা করতে হয়। তোমাদের শুনি বিটির বে হয়ে গেলে সোয়ামীকেও সে কাজ করতে হয়?
ইঙ্গিতটা হঠাৎ ধরতে পারে না জামির, তবু এটা যে একটা মারাত্মক খোঁটা সেটা রাধার তৃপ্ত উজ্জ্বল চোখ দেখে বোঝে।
সে দ্রুত বলে, কেমন? এবং সঙ্গে সঙ্গেই রাধার নিক্ষিপ্ত তীরের গতিমুখ ধরতে পারে। তার চোখ নিমেষে নেমে আসে এবং সারামুখে এক ঝলক রক্ত ছড়িয়ে পড়ে তার ফর্সা সুদর্শন মুখমণ্ডলকে রক্তিম করে। আচ্ছা! এ মেয়েটা তাহলে তার সম্বন্ধে খোঁজখবরও নিয়েছে? আচ্ছা! ওঃ, রাধা লুবিনির ইঙ্গিত করল!
রাধা খিলখিল করে হাসে। যেন জামির তার ফাঁদে পড়া শিকার এমনভাবে বলে, আঃ বাজিকর, বদনে তোমার কেমন রঙ ধরে গেল!
সে জামিরের আরো কাছে আসে, এত কাছে যে জামির তার নিঃশ্বাসের শব্দ এবং গায়ের ঘ্রাণ টের পাচ্ছিল। রাধা আবার বলে, তবে বিবির কথায় যে পুরুষের বদনে রঙ লাগে, বিবির জন্য তার মনে রঙ নাই—একথা আমি জানি।
জামিরের হাতের দড়িতে বাঁধা গাইটা এখন নিরুপদ্রব অস্তিত্ব। সে দড়ির গণ্ডির মধ্যে ঘাস পাতা টেনে খাচ্ছিল, কেননা সারাদিনের উন্মত্ততায় তার খাওয়ার কথা মনে হয়নি, অথবা খাওয়ার ব্যাপারটাই অবান্তর ছিল।
জামির গাইয়ের দড়িতে টান দেয়। তারপর বলে, কি জানি, শুনেছি অনেক পুরুষই তোমার দেখা আছে। তুমিই ভালো জানবে।
হাতের বাঁশ দিয়ে গাইকে তাড়িয়ে সে চলবার উদ্যোগ করে এবং সত্যি-সত্যিই রাধার পাশ কাটিয়ে মাঠের দিকে এগোয়।
রাধা হঠাৎ চুপ করে যায়। তার চোখের সামনে যে পুরুষমানুষটা এতক্ষণ ছিল তার নাভিদেশ থেকে কণ্ঠা পর্যন্ত দেহকাণ্ডটা বড় দীর্ঘ এবং ভীষণ সরল। সেই মানুষ এই নিয়ে দ্বিতীয়বার তাকে উপেক্ষা করল। সে চেষ্টাকৃত নিষ্ঠায় নিজেকে স্থির রেখে তীব্রভাবে বলে, বাণ মারলাম, বাজিকর; গাই তোমার দশদিনের মধ্যে পাল ঝেড়ে ফেলবে। তোমাকে আবার আসতে হবে এখানে।
জামির ফিরে তাকায় না। তার মনে হয়, এক বিশেষ ধরনের উত্তেজক খেলায় সে জিতেছে, অথচ জেতার পরেও তার আক্ষেপ থেকে যাচ্ছে।
সেদিনের ঘটনা এমনই হয়েছিল। কিন্তু নমনকুড়িতে ফিরে আসতে আসতে তার সারা শরীরে জ্বলুনি শুরু হয়েছিল। গাই নিয়ে যখন বাড়িতে ঢুকেছে তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। নিজে হাত-পা ধোওয়ার আগে গাইটাকে গোয়ালে ঢুকিয়ে ঘাস জল দিচ্ছিল জামির এবং হায়াকে ডাক দিয়ে একটা লম্ফ চেয়েছিল।
সে সময়ে সে ছিল একটা ঘোরের মধ্যে। অথচ হাত-পা চালাচ্ছিল নিতান্ত অভ্যাসবশে। আর তখন লুবিনি লক্ষ্য নিয়ে গোয়ালে ঢুকেছিল। লম্ফটা একটা উঁচু জায়গায় রেখে সে জিজ্ঞেস করে, ষাঁড় দেখিয়ে আনলে?
জামির হঠাৎ ঘুরে লুবিনির দুই বাহুসন্ধি শক্ত করে ধরে সামনে টেনে আনে। তার চোখ রক্তাভ, সমস্ত শরীরে ঘাম, মুখ চেপে ধরে এবং নিজের চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে। তারপর বাঁ হাতখানা আস্তে করে লুবিনির মাথায় রাখে।
লুবিনির মাথা তার বুক পর্যন্ত ওঠেনি। লক্ষ্যের আলোতে তাকে একটা দৈত্যের সামনে পুতুলের মতো দেখায়। চোখ খুলে জামির হাত ধরে লুবিনিকে গোয়ালঘরের বাইরে নিয়ে ছেড়ে দিয়েছিল। জামির খুব লজ্জা পেয়েছিল তখন।
তারপর রাত্রে শুয়ে শুয়ে সে তার নানার কথা ভেবেছিল, সে ভেবেছিল তার না-দেখা বাপের কথা, সে আরো ভেবেছিল তাদের গোটা বাজিকর জাতটার কথা।
তার নানা তাকে বলেছিল, বাজিকরকে মাথা তুলে দাঁড়াতে হলে সহ্য করতে হবে, দাম দিতে হবে। কোনো বিশৃঙ্খলা বরদাস্ত করবি না, জামির—না নিজের, নাপরের। এমন সব কথা বলত তার নানা।
কিন্তু দ্বিতীয়বার গাইটা যখন অস্থির হয়ে উঠল, তখন তার শরীরে রক্ত আবার ছলকে উঠেছিল। এবং কাল সারারাত সে ভোর্বছে যে রাধা তার নিয়তি। আর এখন গাই নিয়ে যখন সে মাঠ ভাঙছে, তখন সে ভাবছে অন্য কথা। সে ভাবছে যে, আসলে সে আগাগোড়াই বিশ্বাস করতে চাইছিল যে রাধার বাণমারা কথাটা সত্য হোক। তাই সত্য হল এবং সে জানে না এখন কী হবে। তবে সে তার রক্তেই টের পাচ্ছিল যে রাধা যদি আজকে তাকে উসকাতে আসে, তাহলে একভাবে সে ফেরত যাবে না।
তারপর সে নির্দিষ্ট খুঁটোয় গাই বেঁধে সেই একই তেঁতুল গাছের তলায় বসেছিল। তারপর নিয়মমতো ষাঁড় এসেছিল গাই দেখতে। তারপর তার পায়ের উপর ঢিল পড়েছিল। তারপর সে ফিরে তাকিয়ে সেই একই ভঙ্গিমায় রাধাকে দেখেছিল অন্যদিকে তাকিয়ে থাকতে।
তখন সে খুব আশ্বস্ত হয়ে বুঝেছিল যে রাধা বাণ মেরেছে তাকেই। সে উঠে রাধার গাছ পর্যন্ত যেতে রাধা সে গাছ ছেড়ে অধিকতর ঝোপঝাড়ের মধ্যে ঢুকে যায় এবং জামির তাকে অনুসরণ করে তার অপরিচিত এক অরণ্যে নিজেকে রাধার মুখোমুখি দেখে।
২৭.
মালদা শহরের জৌলুস বাড়ছিল দিনদিন। লোকও বাড়ছিল মেলা। বদিউল আরো অথর্ব হয়ে শেষমেশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পুরোপুরি বিছানা নিল। সালমা তাকে দেখতে আসত প্রায়ই, কিন্তু আগের মতো আর প্রতিদিনই আসতে পারত না। একে তার ব্যবসার সাম্রাজ্য আরো বিস্তৃত হয়েছিল, তার উপর তার বয়সও হয়েছিল কম নয়।
