নির্দিষ্ট খুঁটোয় গাই বেঁধে জামির কিছুদূরে একটা ঝাকড়া তেঁতুল গাছের ছায়ায় বসে থাকে। এখন বেশ কিছু সময় এভাবে তাকে থাকতে হবে, ব্যাপারটা দেখতে হবে এবং নিঃসন্দেহ হতে হবে যে কাজ হয়েছে।
ছাড়া পেয়ে ষাঁড় ঠিক জায়গাতেই এসে হাজির হয়। জামির এখন নিশ্চিন্ত। সে গামছা দিয়ে ঘাড় গলা মোছে! এখন চুপচাপ বসে থাকা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই।
অনেকক্ষণ বসে থাকে জামির। নতুন গাই, ত্রাস আছে মনে। জামির বিরক্ত বোধ করতে শুরু করে। হঠাৎ একটা ঢিলের টুকরো এসে পায়ের কাছে পড়ে, তারপর আরেকটা।
জামির দিকনির্ণয় করে ঘন ঝোপের আড়ালে রাধাকে দেখল। রাধা একটা গাছে হেলান দিয়ে অন্যদিকে মুখ করে দাঁড়িয়েছিল। তার দাঁড়াবার ভঙ্গিটি খুবই মনোরম। একটা পা ভাজ করে পিছনের গাছে ঠেকা দেওয়া, অন্য পা মাটিতে, সমস্ত দেহকাণ্ড তির্যকভাবে গাছে হেলান দেওয়া।
জামির প্রথমে ভয় পেল, তারপর নিজের মনেই হাসল, কিন্তু উঠল না জায়গা ছেড়ে। রাধা এবার পাশ ফিরে তাকাল তার দিকে। তার দৃষ্টিতে আহ্বান ছিল স্পষ্ট।
জামির কি করবে বুঝতে পারছিল না। শুধু সম্মোহিতের মতো রাধাকে দেখছিল। রাখা কখনো আঙুলে আঁচল জড়াচ্ছিল, কখনো দাঁতে পাতা কাটছিল।
এইসময় জামির সামনের দিকে দূরে পতাকিকে মাঠ থেকে ফিরতে দেখল। একটা দীর্ঘ স্বস্তির প্রশ্বাস তার বুক হালকা করে দেয়। বোঝে ভীষণ ভয় পেয়েছিল 69
উঠে এসে জামির পতাকির জন্য রাস্তায় অপেক্ষা করে। সে আর পিছন ফিরে তাকায় না। ওঃ কি ভীষণ মেয়েমানুষ! অথচ কী সুন্দর!
২৬-৩০. হিঙ্গল থেকে ষাঁড় দেখিয়ে আসার পর
হিঙ্গল থেকে ষাঁড় দেখিয়ে আসার পর পঞ্চম দিনে গাই আবার অস্থির হয়ে ওঠে। গাইকে অস্থির হতে দেখে জামিরের হৃৎপিণ্ড আচমকা একটা লাফ দেয়। সে তাতে এমন চমকে ওঠে যে দ্রুত আশপাশে চোখ ঘুরিয়ে দেখে নেয় তার এই ভাবান্তর কেউ দেখে ফেলল কিনা।
রাতে শুয়ে তার ঘুম আসে না, সে উত্তর্ণ হয়ে থাকে। তারপর গাই যখন তারস্বরে ডাকতে শুরু করে সে উত্তেজনায় শয্যার উপর উঠে বসে। হ্যাঁ, গাই ডাকছে, অর্থাৎ পাল ঝেড়ে ফেলেছে গাই, আর এর পরম্পরা কী তা ভাবতেই জামিরের এই উত্তেজনা!
ভোর না হতেই জামির গাই নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। সম্পূর্ণ চেনা পথে জানোয়ারটা এবার আরো দ্রুত চলতে থাকে।
আগের দিন পতাকিকে দেখে তার ধড়ে প্রাণ এসেছিল। সে যে রধার প্ররোচনায় যথার্থ ভয় পেয়েছিল তাতে আর সন্দেহ কী! অথচ তেঁতুল গাছের তলা থেকে উঠে রাধার কাছে যাওয়ার মতো মানসিক অবস্থা তার ছিল না। তার ভিতরে অনেক রকমের ভয়ের বীজ তখন অঙ্কুরিত হচ্ছিল। তার মধ্যে অপরাধভীতি থেকেও জাতের ভয় আরো বেশি ছিল। সে বুঝতে পারছিল রাধা তার আয়ত্তের মধ্যে, অথচ—। তখন তার একবারও লুবিনির কথা মনে হয়নি।
আর ঠিক সেই সময় সে পতাকিকে আসতে দেখেছিল। পতাকিকে তখন তার একমাত্র বিকল্প মনে হয়েছিল। পতাকির সঙ্গে কথাবার্তা বলে, জলটল খেয়ে আবার যখন সে এসে তেঁতুল গাছটার তলায় বসেছিল, তখন সে অনেকটা ধাতস্থ। তখন সেখানে অবশ্যই রাধা ছিল না। অথচ তার মনে হয়েছিল, রাধা যদি এখন একেবারে সামনে এসে দাঁড়ায় তাহলেও সে আর অত ভয় পাবে না।
আচ্ছা, ব্যাপারটা কি এরকমই হয় নাকি? যেহেতু আশৈশব সে পীতেমের সান্নিধ্য বেশি করেছে এবং যেহেতু পীতেম তার বোধবুদ্ধিমতো তাকে অন্যরকম মানুষ তৈরি করার চেষ্টা করেছে, স্বশ্রেণীর আর দশজন যুবকের মতো জামির এইসব অত্যন্ত স্বাভাবিক সম্পর্কগুলোয় তেমন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে পারেনি।
কাজেই হঠাৎ তার মনের মধ্যে দ্বন্দ উপস্থিত হয়, রাধার কি তার কাছে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল? এমনও তো হতে পারে, রধা তাকে অন্য কোনো কথা বলতে চেয়েছিল। হয়ত, শুধু আলাপ করতেই চেয়েছিল? আর সে তার নিঘুম তপ্ত মস্তিষ্কে সব কিছু গুলিয়ে ফেলেছিল?
আবার শেষপর্যন্ত সে ভেবেছিল, সত্যিই কি রাধাকে ঐ ঝোপের মধ্যে গাছে হেলান দেওয়া অবস্থায় সে দেখেছিল, না তার দৃষ্টিবিভ্রম? শেষে সে সিদ্ধান্ত নেয়, সে যাই হোক, রাধাকে এত ভয় পাবার কোনো কারণ নেই।
কিন্তু ফেরার পথে এ সবই ভুল প্রমাণিত হয়। মাঠে নামার আগে একটা বাঁশবাগানের ভেতর দিয়ে পথ সংক্ষিপ্ত করতে হয়। রাধা যেন ওদিক থেকেই আসছিল। খুব স্বাভাবিকভাবেই সে বলে, খুব ধকল গেল আজ সারাদিন, না বাজিকর?
জামির কোনো উত্তরই দিতে পারে না। সে কোনোমতে একটু হাসতে চেষ্টা করে। সে শুধু চোখ তুলে একবার দেখে, রাধা তার সর্বাঙ্গ যেন চোখ দিয়ে জরিপ করছে। তার অনাবৃত দেহকাণ্ডে সে হঠাৎ অনুভব করে এক অস্বাভাবিক জড়তা। সে শুধু বলতে পারে, না, ধকল আর কী!
ধকল নয়! নতুন বাছুরটাকে বাগানে খুঁজতে গিয়ে তোমায় দেখলাম তেঁতুল গাছের নিচে। ওঃ, সে খুব কঠিন অবস্থা তোমার!
রাধা আঁচল দিয়ে মুখ চাপা দিয়ে হাসে।
জামির হঠাৎ বুঝতে শুরু কর্বে। সে বোঝে, রাধা কথা বানাচ্ছে এবং তাকে নিয়ে খেলা করছে। ধীরস্থির মানুষ সে, একটু একটু করে নিজেকে ফিরে পায় এবার। বস্তুত রাধার কথার মধ্যে তাকে অপমানজনকভাবে নিগ্রহ করার একটা প্রচেষ্টা সে ধরতে পারে। জামির একটু উত্তেজিত হয় এবং বোঝে না রাধা এমনই চায়। সে এবার একটু গুছিয়েই বলে, তা হবে। তবে আমাদের ঘরের বাছুর আড়ালে গেলে তার মা-ই তাকে ডেকে নেয়। ঘোষেদের ব্যাপার বুঝি বা আলাদা।
