জামিরও দ্বিতীয়বার পতাকির বাড়ি ঢেকে গাই নিয়ে। গভীর রাতে গাইটা ডাকতে শুরু করেছিল। গাইয়ের ডাকে তার ঘুম ভেঙে যায় এবং ডাক শুনে তার প্রথমে খুব আনন্দ হয়। শুয়ে শুয়ে সে ডাক শোনে, কী গভীর আকাঙ্ক্ষার ডাক—আঁ–আঁ–আঁ!
কিছুক্ষণ জাগ্রত অবস্থায় গাইয়ের ডাক শুনতে শুনতে তার হঠাৎ অস্বস্তি বোধ হতে শুরু করে। দ্বাদশী লুবিনি এখনো তার ভেতরে কোনো মানসিক আন্দোলন তৈরি করতে পারেনি।
শুয়ে শুয়ে পাশের ঘরে পরতাপকে হায়ার সঙ্গে কথা বলতে শোনে সে। গাই ডাকতে তারা দুজনেই উৎফুল্ল। গাইটার এই প্রথমবারের ডাক, সুতরাং পরতাপ ও হায়া অনর্গল কথা বলতে থাকে। তারপর হঠাৎ তাদের কথা বলা বন্ধ হয়।
জামির আরো বিমর্ষ এবং বিরক্ত হয়ে যায়। চেষ্টা করেও সে আর ঘুমোতে পারে না। বাকি রাতটুকু এপাশ-ওপাশ করে অন্ধকার থাকতেই সে উঠে পড়ে।
পরতাপ ওঠার আগেই সে হিঙ্গল যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয় গাই নিয়ে! গরুটাকে পোয়াল-জল খাওয়াবার বৃথা চেষ্টা করে সে হাল ছেড়ে দেয়। নতুন ডাকা গাই ছটফট করছে, চমকে চমকে উঠছে, চাড়িতে মুখও দিল না। জামির পরতাপের ঘরের সামনে গিয়ে একবার জানান দিয়ে গরুর দড়ি হাতে নিল।
শেষরাতে পরতাপ ঘুমিয়ে পড়েছিল। তাড়াতাড়ি উঠে বলল, হ্যাঁ বাপ, তাড়াতাড়ি যা, নতুন ডাকা গাই, ডাক বন্ধ করলে আবার কবে ডাকে। দেরি করে লাভ নেই, যা বাপ।
জামির এক হাতে একটা বাঁশের লাঠি ও অন্য হাতে গরুর দড়ি ধরে বেরিয়ে পড়ে। লাঠি নেয় এই কারণে যে পথে উটকো ষাঁড় ঝামেলা করতে পারে। আড়াআড়ি গেলে হিঙ্গল জামিলাধারে থেকে কাছে হয়। তবুও মাঠ ভেঙে দুই ক্রোশ রাস্তা কম নয়। তার উপরে হাতের দড়িয়ে বাঁধা ডাকা গাই। জামিরের মতো জোয়ানও গাইয়ের সঙ্গে হাঁটতে গিয়ে হাঁফিয়ে যাচ্ছে। গাই তো হাঁটছে না, যেন ধেয়ে চলেছে, সঙ্গে জামিরকেও টেনে নিয়ে যাচ্ছে। জামির বলে, র’, র’ সবুর কর।
সে হাসে আপনমনে। তার শরীরে উত্তেজনা ও পুলক জমে। গাইটার অসহায় অবস্থা সে মনে মনে উপভোগ করে। হায়রে, জানোয়ার, ডাকলে সাড়া পায়। আবার দেখ, তার মালিকও সমান উতলা হয়। আঃ, হাহা, বায়, বায়, পথ কেন ভুল করিস?
না, জানোয়রের পথ ভুল হয় না। বাতাস তার কাছে বার্তা নিয়ে আসে। কে যে তাকে পথ দেখায়, কে জানে। গাই ঠিক পথেই চলে। যেন গাইটাই জামিরকে সহজ ও সংক্ষিপ্ত পথটা চিনিয়ে দেয়। জামির তার পিছনে পিছনে ছোটে। মাঝে মাঝে জানান দেয় গাইটা—আঁআঁআঁ। আবার কোনো দ্বিধা-বিভক্ত মোড়ে মুহূর্তখানেক থমকে থামে, আবার নিমেষে ঠিক রাস্তায় চলতে শুরু করে। জামির মজা দেখে। দেখ, জানোয়ার কেমন! কেমন চতুর এই গাই!
হিঙ্গলের ভিতরে ঢুকে গাই আর কোনো বাধা মানতে চায় না। জামির বলে, দাঁড়া রে দাঁড়া, মালিকের অনুমতি নিই আগে। এমন অধীর হলে চলে!
পতাকি ঘোষের সীমানায় ঢুকে সে আচমকা একটা গাছকে ঘুরে এসে দড়ি বেড় দিয়ে গাইকে আটকে ফেলে। হঠাৎ বাধা পাওয়াতে গাই ক্ষিপ্ত হয়ে যায় যেন। জামিরকেই শত্রু মনে করে অথবা বিরক্ত হয়ে শিং নাড়ে সক্রোধে। জামির তার শিং ধরে গলায়, পিঠে হাত বুলায়। বলে, ছিঃ! এমন অধীর হয়? মালিকের মত নিতে হবে না? গাই ঘাড় দিয়ে তাকে ঠেলে, যেন তাকে ব্যস্ততা দেখাতে বলে, আবদারের মতো, ভারি সলজ্জ তার ভঙ্গি এখন।
জামির হেসে ফেলে শব্দ করে ও তার সঙ্গে কেউ হাসে পিছন থেকে। সে দড়ি বেঁধে পিছনে তাকায়।
পিছনে তাকিয়ে জামির যাকে দেখে সে নিশ্চিত রাধা, একথা জামির নিমেষেই যেন বুঝে ফেলে। এই রাধার কথা সে কেন, এ অঞ্চলের সব যুবকই শুনেছে। পতাকির বৈমাত্রেয় বোন রাধাকে নিয়ে গোয়ালা ঘোষ ও সদ্গোপ ঘোষদের মধ্যে ইতিমধ্যেই গোটাচারেক দাঙ্গা এবং একটা খুন হয়েছে।
হ্যাঁ, সে রাধাই বটে। বয়সে জামিরের থেকে বছর তিন-চারের বড়ই হবে। সে যুবতী হাসছিল, এখন জামিরকে ঘুরে দাঁড়াতে দেখে সে জিভ দিয়ে চুক চুক শব্দ করে।
জামির তার দিক থেকে চোখ সরায় না, সরাতে পারে না সে।
রাধা বলে, সবুর কি আর সই সইতে পারে, বাজিকর?
জামির এই নির্লজ্জতায়ও চমকে ওঠে না, তাকিয়েই থাকে। রাধাকে দেখার মতোই বটে।
রাধা আবার বলে, তুমি তো বাহাদুর বাজিকর বটে, নাকি ভুল বললাম? সেদিন এক ঝলক দেখেছিলাম তো কেমন এক পালি দই চিড়া সাপটে দিলে?
জামির এবার মাথা নাড়ে। হ্যাঁ, এ সেই বাজিকর।
রাধা দাঙ্গার উপযুক্তই বটে। এমন নির্লজ্জ এবং রসিকা এ অঞ্চলে আর একটিও নেই। পতাকি তাকে সময়মতো বিয়েও দিয়েছিল, কিন্তু বদ্ধ জীবনে রাধা থাকতে পারল না। স্বামীকে ছেড়ে বছর না ঘুরতেই পালিয়ে এসেছে। আর তারপরে যায়নি।
গাইটা শিঙ দিয়ে ধাক্কা দিতে জামিরের চমক ভাঙে। রাধা আবার হেসে ওঠে। জামির তার দিক থেকে চোখ নামায়। জিজ্ঞেস করে, ঘোষ উঠেছে?
ওঠেনি! কখন মাঠে চলে গেছে।
তবে তো মুশকিল হল! কার সঙ্গে কথা বলি?
কথা বলার অবস্থা তো তোমার গাইয়ের নেই। পিছনের বাগানে নিয়ে যাও, আমি খামারু কাকাকে বলছি ষাঁড় ছেড়ে দিতে। দাদা এসে যাবে।
রাধা ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি হাসে ও ভিতরের দিকে যায়। কিছুদূর গিয়ে আবার ফিরে তাকিয়ে নিঃসন্দেহ হয় যে জামির তাকে দেখছে, আবার হাসে।
জামির খুব ধৈর্যশীল মানুষ হলেও মেয়েটার মোহিনী মায়া এড়াতে পারে না। গাছ থেকে দড়ি খুলতে গিয়ে টের পায় তার হাত কাঁপছে। দড়ি খুলে গাই নিয়ে সে পিছনের বাগানে চলে যায়।
