এদিকে সে ছিল সহনশীল মানুষ। যে বুঝতে চাইত সবকিছু ও অপেক্ষা করত। কিন্তু এই উনিশ বছর বয়সে জামির কিছু চঞ্চল হয়েছিল, কেননা যৌবন এসেছিল প্রচণ্ড শক্তি নিয়ে। পীতেম তাকেও কিছুটা নিঃসঙ্গ করে গিয়েছে। হায়া যে তাকে লক্ষ্য রাখে এবং লুবিনিকে সামলায় এ ব্যাপারটা বুঝে সে লজ্জা পায়। সে চেষ্টা করে আড়ালে থাকতে। সে চেষ্টা করে কাজকর্ম নিয়ে থাকতে। পীতেম তার ভিতরে গৃহস্থ হবার বাসনা অঙ্কুরিত করেছিল, পরতাপ প্রত্যক্ষে তাকে কার্যকর করার রাস্তা দেখাচ্ছিল। আর জামির আরো একধাপ এগিয়ে হিঙ্গলের পতাকি ঘোষের মতো গৃহস্থ হওয়ার স্বপ্ন দেখত।
গৃহস্থ বটে পাকি ঘোষ। এই না হলে গৃহস্থ! চারখানা মোষের ও চারখানা বলদের হাল পতাকির। যেমন মোষের চেহারা, তেমনি বলদের চেহারা। ধানের মরাই দশটা। তার পাঁচটা গাই-মোষ এবং ছ-সাত জোড়া গাই দুধ দিত অঢেল। ভীষণ বলশালী পতাকির যেমন দাপট তেমনি উদারতা। নিজে খাটত অসুরের মতো, চাকর-পাটকেও বসে থাকতে দিত না। আশ্চর্য মানুষ পতাকি তার চাকর-পাট মুনিষ-মাহিন্দরের সঙ্গে প্রায় একত্রই থাকত এবং কারো মনোকষ্টের কারণ হতো না। পতাকিই প্রথম ব্যক্তি যে বলেছিল, ‘আমি সদ্গোপ কিসের জন্য হতে যাব, আমার অভাবটাই বা কি আর আমি কমই বা কিসে?’ আবার পতাকিই সেই ব্যক্তি যে গোপও থেকে গেল কিন্তু হিঙ্গল ছাড়ল না।
জামিলাবাদের গোপেদের সঙ্গে হিন্সলের সদ্গোপদের বিরোধ এখন একটা বিশেষ পর্যায়ে গিয়েছিল। কে কার ঘরে মেয়ে-বউকে ফুসলে বের করে আনতে পারে এখন তারই প্রতিযোগিতা চলছে। ফলে এই একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে মাঝে মধ্যে অশান্তি ও দাঙ্গা জমে উঠত। এ বিষয়েও পতাকির বৈশিষ্ট্য ছিল। সে বলত, কারো ঘরের মেয়ে-বউকে টেনে আনব না, যদি কেউ আসে ছেড়েও দেব না।
এই পতাকির সঙ্গে জামিরের আলাপ হয়েছিল হঠাই। পতাকির একটা মোষ পড়ে গিয়েছিল ছোট একটা নালার মধ্যে। চার-পাঁচজন মানুষ নিয়ে পতাকি দু ঘণ্টা চেষ্টা করেও মোষটাকে তুলতে পারেনি। জামির সেই রাস্তা দিয়ে তখন ফিরছিল। কিছু সময় দাঁড়িয়ে দেখে সেও হাত লাগিয়েছিল।
কিন্তু হাত লাগালে হবে কি? বাঁশ বুকের নিচে ঠেসে চাপ দিতে পতাকি আর্তনাদ করে ওঠে, যেন তার বুকেই বাঁশডলা হচ্ছে।
জামির বুঝেছিল এভাবে হবে না। সে পতাকিকে বলেছিল, ঘোমশায়, মোষ পড়েছে খন্দে, কাজটা হলো এখন ওঠানো। না যদি ওঠাতে পারেন তাড়াতাড়ি, খাম হয়ে যাবে জানোয়ারটা, কোনো কাজে আর লাগবে না। হায় হায় করলে চলবে?
পতাকি বলে, তুমি কি বুঝবে বাজিকরের পো, ঘর-গেরস্থালি কর না। কলজায় লাগে যে!
কিন্তু ওঠাতে তো হবে?
হাঁ, তাতো ঠিক। কিন্তু—
বাস, আর কথা না। যান তো আপনি ঐ গাছতলায় পুবমুখা হয়ে দাঁড়ান, এদিকে দেখবেন না।
অনিচ্ছুক পতাকিকে হাত ধরে গাছতলায় দাঁড় করিয়ে দেয় জামির। অন্য লোকদের বলো, আসো ভাই, হাত লাগাও ঠিকমতো। বুকের নিচে আমি ধরব ঠেলে, তোমরা তিনজনে পেটের নিচে বাঁশের চাপ রাখো আর তোমরা কোমরের জড়ানো দড়ি ধরে টেনে পগারের উপরে ওঠাবে। দেখো, সবার দম যেন একসঙ্গে ধরে।
তারপরে সে নুতন শেখা বোল ধরে—হিঃ-মারো-জোয়ান—
হহঃ–
হিঃ—আউর—থোরানি—
হহঃ–
হিঃ-পর্বত টলে—
হহঃ–
হিঃ-ব্বাপ ভাতারি—
প্রচণ্ড আওয়াজে অন্যেরা “হহঃ” বলে এবং মোষটি আর-র-র শব্দে মরণ আর্তনাদ করে ওঠে। পতাকি আর পুবমুখখা তাকিয়ে থাকতে পারে না। হাউ-মাউ করে ছুটে আসে, মেরে ফেললে রে মেরে ফেললে রে—
কিন্তু জামিরের বোল তখন সপ্তমে ঘোষের গুষ্টি উদ্ধার করছে। ঘাড়ের উপরে বাঁশ ঠেলে নালার এক কোণে সে থামের মতো কোণাকুণি দাঁড়িয়েছে। হাত পা পিঠ বুকের পেশী ক্রুদ্ধ বাঘের মতো ফুলে উঠেছে। পতাকি হতবাক হয়ে যায়, হা জোয়ান বটে ছোকরা। অন্যেরা যদি সামান্য ঢিল দেয়, মুহূর্তে ঐ ঠেসে ধরা বাঁশ পিছলে গিয়ে পাঁজরের হাড় গুঁড়ো করে দিতে পারে।
পতাকি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। উঠেছে, উঠেছে। কোমরের বাঁধন ধরে যারা উপর দিকে টানছিল তারা এবার খামি দিয়ে দাঁড়ায়। জামির যেমন ছিল তেমন দাঁড়িয়ে থাকে, শুধু নিচের দিকে যারা বাঁশ দিয়ে ঠেলছিল তারা দ্রুত উঠে এসে সামনের দু পায়ের নিচে মোষের ঘাড় ঘুরিয়ে দড়ি জড়ায়। ঘাড়ের থেকে বাঁশ সন্তর্পণে হাতে নিয়ে জামির চাড় দেয়, দড়ির টানে মোষ নালার উপরে উঠে আসে।
পতাকি বলে, সাবাস জোয়ান, বাহাদুর বটে তুমি বাজিকরের পুত!
এইভাবে পতাকির সঙ্গে আলাপ হয় জামিরের। সেদিন পতাকি তাকে তার বাড়িতে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল। দই কলা চিড়া দিয়ে যে ফলার খাইয়েছিল তাতে পরদিন পর্যন্ত জামিরের আর খাওয়ার কথা মনে হয়নি। জামির চারদিক তাকিয়ে দেখছিল গৃহস্থরা কাকে লক্ষ্মী বলে।
দ্বিতীয়বার পতাকির বাড়ি গিয়েছিল সে গুইিকে পাল খাওয়াতে। পতাকির ষাঁড়টিও তার গর্বের বস্তু ছিল। এই ষাঁড় নিয়েও সমোপদের সঙ্গে তার একটি রসিকতার সম্পর্ক ছিল। সদৃগোপদের কাছ থেকে ষাঁড় দেখাবার জন্য সে পয়সা নিত না।
না ভাই, উঁচা জাতের কাছ থেকে পয়সা নিতে পারব না।
কেন? বিনিপয়সায় আমরাই বা গাইকে পাল খাওয়াব কেন?
না খাওয়াও না খাওয়াবে, তবে আমরা আমাদের ষাঁড়গুলোকে মানাই দিয়ে রেখেছি তোমাদের জন্য।
এতে সদ্গোপেরা অপমানিত বোধ করত এবং প্রত্যেকেই প্রতিজ্ঞা করত এবারে যে করেই হোক সদ্গোপ পাড়ায় ভালো ষাঁড়ের বন্দোবস্ত করতেই হবে। কিন্তু কার্যকালে তাদের আসতেই হতো পতাকির বাড়ি এবং অপমানও হজম করতে হতো।
