পরতাপ তার মুখের কাছে ঝুঁকে বলে, আমি পরতাপ, বাপ। মুখে জল দিই, Tal?
পরতাপ কে? আমি তো তোকে চিনি না।
আমি তোমার বেটা, বাপ।
কি করিস তুই, পরতাপ?
আমি আবাদ করি, ফসল করি, বাপ।
তুই ভিখ মাঙ্গিস না?
না, বাপ।
হাত পেতে গেঁহু আর সোকা নিয়ে ঝোলায় রাখিস না?
না, বাপ।
বাঁশবাজি, দড়িবাজি, বাঁদরনাচ করিস না?
না, বাপ।
আঃ, আমার মুখে জল দে।
পরতাপ জল দেয়, জামির তাকে দু-হাতে ধরে থাকে।
রাত কেটে গেলে পীতেম একটু স্বাভাবিক হয়। সে ঘোলাটে চোখে জামিরের মুখে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তারপর বলে, তুই কে?
আমি জামির নানা, তোমার পোতা।
তুই কি করিস?
আমি কাকার সাথে হাল-জিরাতের কাম করি।
তোর বাপ কে?
আমার বাপ ধন্দু বাজিকর।
ধন্দু বাজিকর কে?
ধন্দু বাজিকর তোমার বড় বেটা, নানা।
ধন্দুকে ডাক।
জামির চুপ করে থাকে। শীতেম বিরক্ত ও উত্তেজিত হয়। বলে, ডাক তোর বাপকে।
জামির চুপ করে থাকে। পীতেম আবার প্রসঙ্গ ভুলে যায়। স্বলে, বিগামাই, হারুরানে যাই।
পীতেম দীর্ঘশ্বাস ফেলে এবং তার গলার মধ্যে শ্লেষ্মর ঘনঘন শব্দ ওঠে। তারপর সেটা বাড়তে থাকে।
জামিরের তখন নিজের গলার মধ্যেই যেন অস্বস্তি শুরু হয়। বিগামাই, হারুরানে যাই’-পীতেম বাজিকরের এই অন্তিম ইচ্ছা বা ভীতি কোন্ অজ্ঞাত দেবীর কাছে অর্ঘ্য, জামির তা পরিষ্কার বোঝে না। সে তার নানার গলার ভিতরের অস্বস্তিকর শব্দটার নিবৃত্তির জন্য নিজের অজান্তেই নিজে গলাখাঁকারি দেয়।
কিন্তু পীতমের গলার ভেতরের শব্দ ক্রমান্বয়ে একঘেয়ে গোঙানিতে পরিণত হয় ও তার বুক হাফরের মতো ওঠানামা করতে থাকে।
জামির দ্রুত উঠে বাইরে গিয়ে পরতাপ ও অন্যান্যদের ডাকে। সব ঘরের বাজিকরেরা আসে। সবাই বোঝে পীতেম ভীষণ কষ্ট পাচ্ছে, তার বাশক্তি রহিত হয়েছে।
সবাই পীতেমের শয্যা ঘিরে দাঁড়ায়। যদিও কথা বলতে পারছে না, তবুও পীতেমের চোখের দৃষ্টি স্বচ্ছ এখন। সে চোখের মণি ঘুরিয়ে শেষবারের মতো তার স্বজনদের দেখে। তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে।
বালি তার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে ও কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে, সালমা পিসিকে খবর দেব, কাকা?
পীতেম তার দিকে চোখের মণি ঘোরায়, তার দৃষ্টি অত্যন্ত করুণ এবং সেই চোখ দেখে বালি কিংবা অন্যান্যরা তার ইচ্ছা বুঝতে পারে না।
পীতেম এই অবস্থায় দু-দিন থাকে, এবং তৃতীয় দিন ভোর রাত্রে সকলের অজান্তে শেষ নিঃশ্বাস ফেলে।
সালমাকে খবর দেওয়ার জন্য বালি কিংবা পরতাপ কাউকে পাঠায়নি। কেননা এই দূরের রাস্তায় সালমার যদি আসার মতো অবস্থাও থাকে তবুও পীতোমের সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়ার আশা ছিল না।
২৫.
লুবিনির স্মৃতিতে সালমা ধূসর, কেননা তার জন্ম হয়েছিল মালদা শহরে এবং সেখানে যখন তার বছর পাঁচেক বয়স তখন দল চলে আসে নমনকুড়িতে। নমনকুড়িতে পীতেম বেঁচেছিল সাত বছর। এই সাত বছরের শেষ দু-বছর লুবিনির প্রতিপালনের দায়িত্ব পীতেম নিয়েছিল। সতেরো বছরের নবযুবক জামিরের দশ বছরের কনে লুবিনি। সুতরাং ভরণপোষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ পীতেমকেই করতে হতো।
জামির ও লুবিনি এইসময় পরস্পরের কাছাকাছি থাকত একটা সময়ই, যখন পীতেম বাজিকরদের পুরনো কথা ও দেশদেশান্তরের অভিজ্ঞতার গল্প বলত। এইসব গল্প ও কাহিনীতে জামিরের তো উৎসাহ ছিলই, লুবিনিও একাগ্রতার সঙ্গে এসব বুঝবার চেষ্টা করত। এইসময় ছাড়া জামিরের সঙ্গে লুবিনির একাগ্রতার সঙ্গে এসব বুঝবার চেষ্টা করত। এইসময় ছাড়া জামিরের সঙ্গে লুবিনির বিশেষ দেখাসাক্ষাৎ হতো না। জামিরের মনোভাব বোধ্য। লুবিনি জামিরকে বিশেষ দৃষ্টিতে দেখতে ও বুঝতে শুরু করে এর অনেক পরে।
পনেরো জোড়া ছেলেমেয়ের সঙ্গে জামির আর লুবিনিরও বিয়ে হয়েছিল। সে সময় হরদম গুজব রটত, আর অধিকাংশ গুজবের বিষয়বস্তুতে সাহেবদের জড়ানো হতো। সাহেব যুক্ত গ্বোর্কলে গুজব হতো জোরদার ও বিশ্বাসযোগ্য।
মহারানির রাজত্বে ষোল বছরের ঊর্ধ্বের ছেলেমেয়েদের আর বিয়ে দেওয়া যাবে না, এরকম গুজব রটেছিল। সাহেবরা কলের গাড়ি লোহার রেলের উপর দিয়ে চালায়, সুতরাং সবই সম্ভব। সাহেবরা সব জমি দখল করে নেবে নীল, উঁত আর আফিং চাষ করবার জন্য—একসময় এরকম কথা অনেকেই বিশ্বাস করেনি, কিন্তু তারপর বহু জায়গায় জবরদস্তি এসব চাষ করার ব্যবস্থা সাহেবরা করেছিল, এ সবাই দেখেছে।
সুতরাং একদিকে তাড়াহুড়ো করে ষোল জোড়া বাজিকর বালক-বালিকার বিয়ে দেয় পীতে। লাল সুতোয় ঘেরা চৌহদ্দির মধ্যে সম্পূর্ণ বাজিকর রীতিতে বিয়ে। মেয়েরা গান গেয়েছিল ‘লাল পাড়াঙ্গি রেশকি ডোরি’, ‘দেও আওয়েতে দেওরে, ভাই’–এইসব প্রাচীন গান।
পীতেম মারা যাবার পর লুবিনি খুব নিঃসঙ্গ হয়ে যায়। পরতাপের বউ হায়া যদিও তাকে কাছে টেনে নেয়, তবুও তার মনমরা ভাব কাটে না। বাপের ঘরে তার কেউ ছিল না। বাপ-মা আগেই মারা গেছে। থাকার মধ্যে আছে এক নানা, এখন তাকে দেখারই লোক দরকার। সুতরাং হায়া লুবিনির অবলম্বন হিসাবে পীতেম ছিল বলেই সে এদিকে মনোযোগ না দিয়েও পেরেছে। এখন তো অন্য কোনো উপায় নেই। তাছাড়া আরো একটা কারণে সে লুবিনিকে আগলে রাখার ব্যবস্থা করে। যে কাজটা ছিল পীতেমের, এখন হায়াকেই তা করতে হয়। লুবিনি সবেমাত্র বারোয় পা দিয়েছে, কিন্তু জামিরের চঞ্চল চাউনি এখন তাকে অনুসরণ করে। ব্যাপারটায় হায়া ভীত হয়, কারণ জামিরের দৈহিক আকৃতি যে-কোনো রমণীর উদ্বেগের কারণ। এটা হায়া সভয়ে খেয়াল রাখে। অন্তত আরো বছর তিনেক না গেলে লুবিনিকে জামিরের কাছে পাঠানো আদৌ নিরাপদ নয়। জামির পীতেমের মতো শরীর পেয়েছে, দীর্ঘ সবল গাছের মতো চেহারা তার, লম্বা হাত-পা।
