এর মধ্যে একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল পরতাপসে সাঁওতালদের সঙ্গে সমান তালে জমি খালাসের কাজ করে যাচ্ছিল এবং খালাসি জমিতে শস্য উৎপাদনের চেষ্টা করছিল। করছিল।
হাড়মা বলেছিল, গত দু-বছরে নমনকুড়ি ছেড়ে বর্ষার সময় অন্যত্র যেতে হয়নি। এ লক্ষণ অত্যন্ত ভালো। এর আগে প্রতিবছরই বর্ষা ঘন হয়ে নামলেই নমনকুড়ির সমস্ত মানুষকে জামিলাবাদে উঠে আসতে হতো। এই দু-বছর প্রকৃতি কিছুটা সহায় আছে এবং সামান্য কিছু হলেও আমন মরশুমে মানুষ চাষ কিছু করতে পারছে।
বাজিকরেরা আসার পরবর্তী দু-বছরেও বন্যা নমনকুড়িকে ডোবাল না, বরং জল যেন ক্রমশই কম জমছে। ফলে সাঁওতাল ওরাওঁরা প্রতিবছরই আরো বেশি করে আমন চাষ করতে শুরু করে।
পরতাপ আদিবাসীদের সমান তালে চাষের কাজে আত্মনিয়োগ করে। তার সঙ্গে থাকে তার ভাইপো জামির। পরতাপের পশুপালন এবং পশুপ্রজননেও সমান উৎসাহ।
পশু বিক্রি করতে গিয়ে পরতাপ একবার রাজশাহিতে চলনবিল অঞ্চলে এক বিচিত্র ধানের চাষ দেখে আসে। নমনকুড়ির বিল অঞ্চল ছাড়িয়ে শুরু হয়েছে রাজশাহি। পরতাপ দেখেছিল জলের মধ্যে ধানের গাছ। চলনবিল অঞ্চলে বিস্তীর্ণ অঞ্চল নমনকুড়ির মতোই জলা অঞ্চল। সেখানে মোটা দানার একধরনের ধান হয়। বর্ষার জল যেমন বাড়ে ধানের গাছও তেমনই বাড়ে। দেখেছিল অন্য বাজিকরেরাও, কিন্তু পরতাপ ছাড়া কেউ উৎসাহ দেখায়নি। পরতাপের উৎসাহ ছিল, তাই সে খোঁজখবর নেয়।
ধানের নাম বুনো ধান। বিল অঞ্চলে জল যখন কম থাকে বীজ ছিটিয়ে দেয় চাষি। দু-একটা চাষ দিয়ে আউশের মতোই ছড়াতে হয় বীজ। তারপর ধানের চারা জলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে। জলের সঙ্গে এ এক বিচিত্র প্রতিযোগিতা। ধান পাকার সময় জল কিছু কমে বটে, কিন্তু কাটতে হয় নৌকা করে। শিসের নিচে থেকে এক হাত খড় পেল তো যথেষ্ট। ফলন হয় অজস্র।
পরতাপ এসব খোঁজখবর নেয় গভীর অধ্যবসায়সহ। তারপর ফেরার পথে একমণ বীজধান সংগ্রহ করে নিয়ে আসে। ভিতরে সে খুব উত্তেজনা বোধ করে, নমনকুড়ির সাঁওতালরা জানে না, এমন আবাদ করবে সে এবার। আর আর বাজিকরেরা তার বাড়িতে ধানের পোয়ালের স্তুপ দেখে, নতুন মাটির ভিটায় কলাগাছের ঝোপ দেখে, দেখে, বেগুন আর তেঁড়সের চাষের অফুরন্ত ফলন। এতে প্রত্যেকেই কিছুটা ঈর্ষা বোধ করে। কিন্তু এ জন্য যে প্রাণপাত পরিশ্রম করতে হয় বাজিকরেরা তাতে রাজি নয়। প্রীতম লক্ষ্য করে পরতাপের ভিতরে সেই বিচিত্র নেশার জন্ম হয়েছে, যার কা লক্ষ্মণ সোরেন তাকে বলেছিল। ধানের গাছ যখন গামর হয়, কলার গাছে যখন মোচা আসে, সবজিতে যখন ফুল আসে, পীতেম লক্ষ করে পরতাপের ভাবভঙ্গি অন্যরকম হয়ে যায়, যেন একটা ঘোরের মধ্যে থাকে সে।
তারপর বুনোধানের চাষ করে সমস্ত অঞ্চলে পরতাপ একটা সাড়া তুলে দেয়, জামিলাবাদের ওস্তাদ মুসলমান চাষিরাও বিস্মিত হয় এই চাষ দেখে। তারা দিয়াড়া অঞ্চলের মানুষ, বিল অঞ্চলের চাষ তাদের জানা নেই। কাজেই পরতাপ এখন সবার পথপ্রদর্শক হয়।
পীতেম পরতাপকে দেখে স্বস্তি পায় এখন। স্থায়ী মানুষ হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে সে এখন যেন আয়ত্তের মধ্যে দেখে। বয়স তাকে এখন প্রায় সম্পূর্ণই অক্ষম করে ফেলেছে। তবু তার ইচ্ছা হয় কাস্তে কিংবা নিড়ানি হাতে নিয়ে পরতাপের মাঠে গিয়ে সে একবার নামে। শীতের সকালে পরতাপ ও জামির যখন মাথায় করে পাকা ফসলের ভার এনে উঠোনে ফেলে, সে দু-হাত দিয়ে তাদের স্পর্শ নেয়, গন্ধ শোঁকে এবং নতুন ধান শিস থেকে ছিঁড়ে নিয়ে দাঁতে কাটে। জামির তাকে ধরে নিয়ে এসে ধানের স্কুপের পাশে বসিয়ে দেয়। সে লাঠি দিয়ে শুয়োর আর মুরগি তাড়ায়। এভাবে সে একাত্ম বোধ করে এই নতুন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে।
জামিলাবাদ-নমনকুড়িতে শীত বড় বেশি পড়ে। পরতাপ আশা করেনি পীতেম এই শীত পার করতে পারবে। কিন্তু পীতেম শীত পার করে। সম্ভবত পাকা ফসলের ঘন সান্নিধ্য তাকে সঞ্জীবনী দান করেছিল। তাকে সেই অনাস্বাদিত অভিজ্ঞতা এনে দিয়েছে। ধান ও তা থেকে রূপান্তরিত চাল, যাকে, বাজিকর ‘সোঁকা’ বলে, এমন বিহুল ভাব সৃষ্টি করতে পারে, তা পীতেম কেন, পরতাপই কি জানত? তাই পীতেম বেঁচে থাকে অন্তত সেই শীত ও বসন্ত, যখন মাঠ থেকে পরতাপ ও জামির ফসল কেটে আনে, যখন পাগড়ি বাঁধা পরতাপকে পুরোপুরি চাষি গেরস্থের মতো দেখায়, জামিরের তরুণ পেশীগুলো সূর্যের আলোয় যৌবনের ইঙ্গিত দেয়, যখন পরতাপের বউ চেঁকিতে পাড় দিতে দিতে আঁচল ঠিক করে।
পীতেম এইভাবে পরতাপের সুস্থ মার্জিত গরম ভাত খায় মাঘ ফাল্গুন চৈত্র বৈশাখ মাস। তারপর একসময় গরম ভাত তার মুখে বিস্বাদ লাগতে শুরু করে, তেতো লাগে। প্রথমে সে ভেবেছিল এসব সাময়িক শারীরিক ক্লেশ, কিন্তু পরে তার ভুল ভাঙে। সে তখন ঘন ঘন দনুকে দেখতে শুরু করে, অথচ দনুর মুখ প্রশান্ত। সে রহুকেও দেখে। তাদের ঘরের উত্তর দিয়ে যেনালাটা গিয়ে টাঙ্গনে মিশেছে, সেখানে জ্যোৎস্নালোকে কিংবা আলোআঁধারি নির্জনতায় সে রহুকে বেড়াতে দেখে। রহুকে তার প্রফুল্ল মনে হয়। দনু তাকে বলে, পীতেম, রহু তোমাকে ডাকেন।
পীতেম বলে, বাপ হে বা, দাঁড়াও, আমি যাই, আমি যাই।
সে বার বার আবেগের আর্তনাদ করে এবং পরতাপ ও জামিরের ঘুম ভাঙায়। তারা উঠে এসে তাকে স্পর্শ করে। ঘামে পীতেমের সারা শরীর ভেজা, তার চোখে পরিচিতির কোনো লক্ষণ নেই। সে পরতাপকে বলে, কে তুই?
