হাড়মা বলে, কষ্টে আছি, তবে শান্তিতে আছি। এতদূর ঠেলে কেউ ঝামেলা করতে আসে না।
সব পরিবারই দু-এক বিঘা করে জমি খালাস করে নিয়েছে। তার বেশি জমি খালাস করা এখনো সম্ভব হয়নি। এখন পর্যন্ত এসব জমি অকৃপণ ফসল দেয়। অবশ্য এখানে একটা কিন্তু আছে, যদি’ আছে। জল যদি তেমন বেশি নামে এই নাবাল জমিতে, তবে কিছুই করার নেই। সবই ডোবে। কাজেই ভিটার জমি প্রতিবছরেই, প্রতিবছর কেন, সময় পেলেই উঁচু করতে হয়। ভিটাতে তরকারির আবাদ হয় ভারি চমৎকার। তরকারির আবাদের সময় জল থাকে নামার মুখে, কাজেই সেটা মার যায় না। তাছাড়া গাই আছে প্রতি ঘরে দু-একটা, মুরগি আছে। একপাল করে, আছে শুয়োর। তাতেও কিছু আয় হয়। জামিলাবাদের হাটে দুই ক্রোশ রাস্তা পার হয়ে সাঁওতাল, ওরাওঁরা তরকারি, মুরগি, ডিম, জ্বালানি কাঠ, নানা ধরনের ফলফলারি নিয়ে যায়।
বিপদ? প্রধান বিপদ একই, জল। টাঙ্গন আর পুনর্ভবা দুইই সারাবছর মরা নদী। কিন্তু বর্ষার সময় কত জল, কত জল। অসাগর জল!
আছলাম বলেছিল, তা ধরো কেন, পদ্মায় যদি পানির টান থাকে তবেই বাঁচোয়া। টাঙ্গন এসে পানি ঢালছেন মহানন্দায় আবার তেনার তো নিজেরই তখন বহন ভারি। সেই পানি তিনি নিয়ে ফেলবেন সোজা নীচমুখি হয়ে সেই নবাবগঞ্জ পেরিয়ে পদ্মায়। এখন পদ্মা যদি আগেই ভারভারিক্কি হয়ে থাকেন, তো হল কম। তখন নমনকুড়ির পাথার একাই ভাসে না, জামিলাবাদও ভাসে। ভয় কি? আমরা তো এমনি করেই আছি।
বালি দেখে সবাইই অভয় দেয়। সাঁওতালরা তো সোল্লাসে গ্রহণ করে তাদের। অর্থাৎ সবাইই চায় মানুষ বাড়ুক এখানে। কিন্তু কিছুতেই সে হদিশ করতে পারে
কোথায় খুঁটি গাড়বে সে প্রথম?
এ সমস্যারও সমাধান করে নমনকুড়ির মানুষ। নমনকুড়িতে ঘর বাঁধার মতো প্রশস্ত জায়গা এখন কিছু অবশ্যই বাড়তি হয়েছে। বাজিকরদের সমর্থ পুরুষ ও স্ত্রীলোকেরা সাঁওতালদের কাছ থেকে ধার করে কোদাল আর ঝুড়ি নিয়ে অচিরে মাটি কাটতে শুরু করে। সাঁওতাল, ওরাওঁরা তাদের জোগায় সাহস আর পরামর্শ। নতুন ভিটায় মাটি পড়তে থাকে ঝপাঝপ।
২৪.
জামিলাবাদে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়েরই মানুষ ছিল। বস্তুত হিন্দুরাই এখানকার পুরনো বাসিন্দা। মুসলমানরা এখানে পরে এসেছে। তবে হিন্দুদের সংখ্যা এখনো বেশি। এরা পোপ সম্প্রদায়ের লোক। জামিলাবাদ থেকে তিন ক্রোশ পশ্চিমে হিঙ্গল নামক গ্রামে তাদের আদি বাস। নিকট অতীতে এইসব গোপেরা অন্য জায়গার স্বজনদের দেখাদেখি নিজেদের সমাজের মধ্যেই কিছু কিছু বিভেদ উপস্থিত করে। যদিও বেশ কিছুকাল ধরেই তারা পশুপালনের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের কৃষির মধ্যেও নিযুক্ত করেছিল, তবুও হিঙ্গলের গোপেদের মূল জীবিকা ছিল পশুপালনই।
আঠারো শতকের শেষদিকে ও উনিশ শতকের গোড়ায় দেশে ঘনঘন খাদ্যসঙ্কটে সরাসরি সরকার কর্তৃক খাদ্যশস্য কেনার ব্যবস্থায় কৃষিজাত পণ্যের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করে। অ-কৃষিজীবী মানুষ এ কারণেও বেশি বেশি করে কৃষিকর্মের দিকে মন দিতে থাকে।
এই হিঙ্গলে এই নিয়ে নতুন সমাজ সদগোপ ও যারা স্থানীয়ভাবে যথেষ্ট ক্ষমতাশালী নয় এমন পশুপালক স্বজনদের মধ্যে তীব্র বিরোধ উপস্থিত হয়। হয়ত এর মধ্যে কিছু স্থানীয় কারণ ছিল এবং সেই কারণই একই গোষ্ঠীর মধ্যে একটা সংঘর্ষমূলক ভাঙন ত্বরান্বিত করে। গোপ ও সদ্গোপ, এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে গোপেরাই বা কিসে নিকৃষ্ট, এই প্রশ্ন তুলে হিঙ্গল ছেড়ে জামিলাবাদে এসে তারা নতুন বসত করে। ক্রমে এই বিভক্ত সম্প্রদায়ের মধ্যে সবরকম সামাজিক ক্রিয়াকর্মও বন্ধ হয়।
জামিলাবাদের গোপেরা কৃষিকর্ম করত বটে, কিন্তু তাদের প্রধান উপজীবিকা ছিল পশুপালন। আশপাশের মেলা ও হাটগুলোতে তাদের ঘরের গরু ও মোষের কদর ছিল। জামিলাবাদ ও তার আশপাশে পশুচারণের অফুরন্ত জায়গা থাকতে এইসব গোপেরা পশুপালনই অধিকতর লাভজনক মনে করত।
নমনকুড়ির নতুন পত্তনির বাজিকরেরা জামিলাবাদের ঘোষেদের এই পশুপালন ব্যবস্থাটার প্রতি স্বাভাবিকভাবেই আকৃষ্ট হয়েছিল। কেননা, পশুপালন বিষয়টা তাদের জানা বিষয়ের মধ্যে ছিল। কৃষিকর্ম বাজিকরেরা কোনোদিন করেনি। তাছাড়া কৃষিকর্মের মূল বিষয় ধৈর্য ও অপেক্ষা। সেটা তাদের স্বভাবের মধ্যে ছিল না। চন্দ্র, সূর্য, তিথি ও নক্ষত্র বিচারের জটিলতা আর কৃষিসম্বন্ধীয় অনুশাসন, কৃষিজীবী হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেতে হলে অবশ্যই অর্জন করতে হবে। বাজিকরের দ্রুত নিষ্পত্তি করা স্বভাবের সঙ্গে এটা সহজে খাপ খেতে চাইল না। প্রথম বছরের সামান্য প্রচেষ্টা দিয়েই পীতেম বুঝল, এ একটি এমন বিদ্যা যা বংশানুক্রমিক শিক্ষা দ্বারা অর্জন করতে হবে। যেনতেনভাবে কৃষিকর্ম করা যায় না এবং যদি কৃষিকর্মেই বাজিকরকে স্থায়ী হতে হয়, তাহলে তার জন্য আরো অনেক মূল্য দিতে হবে।
তাই পীতেম যখন দেখল বালি ইত্যাদি বাজিকরেরা জামিলাবাদের ঘোষদের সঙ্গে বেশি সখ্যতা করছে এবং এদিক ওদিক থেকে গরু-মোষ নিয়ে আসছে, সে আপত্তি করার কোন কারণ দেখেনি। প্রথমত, দনু পৃথিবীর যাবতীয় মাঠে চরা জানোয়ারের মালিকানা বাজিকরদের দান করেছিল। সুতরাং বাজিকরেরা এই দুঃস্থ অবস্থাতেও কোথা থেকে এতসব ভালো ভালো জানোয়ার নিয়ে আসছে, এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন তার মনে ওঠেনি। আর, দ্বিতীয়ত, পশুপালন ও কৃষি, এই দুইএর মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব বিচারের মাত্রাজ্ঞান তখনো বাজিকরের মধ্যেই আসেনি।
