পীতেম দূরে তাকিয়ে শুধু জল আর জঙ্গল দেখল। আশ্বিন শেষ হতে চলল, এর পরে আর জল নামবে কবে। নিজের ভেতরে হতাশার ফঁাকা শূন্যতা ঢের পায় সে। জামিরের কাঁধের উপর হাত দিয়ে শক্ত হয়ে দাঁড়াবার চেষ্টা করে পীতেম। সব ক-জন মানুষ তাকিয়ে আছে সামনের দিগন্তবিস্তৃত আদিম ভূমিখণ্ডের দিকে।
পীতেম চেষ্টা করেও ঝাপসা চোখের দৃষ্টি দিয়ে যেখানে মাটি ও খড়ের সারিবদ্ধ বাড়ি ও ফসলের খেতের স্বপ্নলোক তৈরি করতে পারে না। আচ্ছা, পাড়াটা যদি এদিক থেকে শুরু করা যায়, তাহলে ঐ বড় ঢিপিটা কেটে সমতল করতে হবে। তারপর আরো মাটি তুলে পাশের ডোবা নালা ভরাট করতে হবে। এপাশের এই আগাছার জঙ্গলটা কম করে আধমাইল তো হবেই। আগাছার জঙ্গল যখন আছে, ওর নিচে মাটি নিশ্চয় শক্ত। ঐ জঙ্গলটাকে উৎখাত করতে হবে। তাহলে সব মিলিয়ে অন্তত না হোক বিশ পঁচিশ বিঘা জমি ঐ ঢিপিটার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া যাবে। তা যদি হয় কিন্তু এই তিরিশ চল্লিশ বিঘা জমি হাসিল করা কতজন মানুষের কতদিনের কাজ? এ কি সম্ভব!
পীতেম বালির দিকে তাকায়, তাকায় পরতাপের চোখে। যুবকরা কী ভাবছে? যুবকরা কি তাকে অপদার্থ ভাবছে? এই ব্যবস্তা তো কোনো মানুষকেই খুশি করতে পারে না। আর জল! কোন্ যাযাবার জলের কাছে থাকতে চায়?
গোমস্তা লোকটি এদের ভাবভঙ্গি দেখে এবং বোঝে। বলে, ভয়ের কিছু নেই বাজিকর। ভয় একমাত্র সাপকে। তা সাপ এখানে কিছু আছে বটে। তা ধর যত জোঁক আর তত সাপ।
সাপ! বাজিকর ভাতি দেখায় বটে, কবজ, তাবিজ, মাদুলি দেয় বটে, কিন্তু সাপের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক কোনোকালেই নেই।
কেন সাপে ভয় কি? সাপও আছে, মানুষও আছে। সাপও মরে, মানুষও মরে। তা-বাদে সাপ বেশি মরে, মানুষ কম মরে। সবশেষে সাপ মানুষের থেকে তফাত থাকতে চেষ্টা করে, নাকিরে, আছলাম?
গোমস্তার সঙ্গী হেসে সায় দেয়।
গোমস্তা বলে, এই যে জামিলাবাদ, এও তো নয়া আবাদই। ক-বছর যেন হল আছলাম?
ক-বছর আর, এই ভো বছর পনরো হবে। এই তো সেদিনের কথা। মনে নাই তোমার চাচা, গঙ্গার পানি সেবার যেন আছমান ছোঁবে, চরের জমি বেবাক ডুবল? বাপ বললে আর চরে থাকব না।
হাঁ, বছর পনেরো হবে। তা দেখল, বাজিকর, এখন কেমন জমজমা। তবু বলি, আছলাম, চর ছেড়ে বড় ভাই ভালো কাম করেনি। সেই বানের পরে না ভূতনির দিয়াড়া অত বড়টা হল? আমরা ছেড়ে আসলাম, তা-বাদে বিহারের বাদিয়ারা এসে দখল নিল। আমরা যদি খামি দিয়ে থাকতাম, কোন শালার ক্ষমতা ছিল ভূতনির দখল নেয়? আমরা না দিয়াড়ার মোছলমান?
তা যা বলেছ চাচা, চরের জমি আর বরিন্দের জমি, কোনো তুলনা হয়?
গোমস্তা আর তার ভাতিজা তাদের পুরনো কথাতে ঢুকে যায়। তারা গঙ্গার দিয়াড়া অঞ্চলের মুসলমান। চিরকাল সংলগ্ন ভাগলপুর ও কাটিহার, পূর্ণিয়ার বাদিয়া মুসলমানদের সঙ্গে তাদের বিরোধ চরের জমি নিয়ে। লড়াইয়ের কোনো পক্ষই কম যেত না, কিন্তু শেষপর্যন্ত যেন বিহারিরাই জিততে থাকে। এখন শামসি, রতুয়া, মানিকচক, ভোলাহাটের গঙ্গা সংলগ্ন জমি অধিকাংশ বহিরাগতদেরই হাতে। স্থানীয় চাষিদের পিছিয়ে আসার কারণ শুধু বড় বানই নয়, বহিরাগতদের সঙ্গে তারা এঁটে উঠতে পারেনি।
বাজিকরদের কানে এসব কথা ঢোকে না। তারা এখনো সামনের দিকেই তাকিয়ে আছে। তাদের কারো কারো চোখেমুখে আতঙ্ক, কারো বিরক্তি। পীতেমের মুখের ভঙ্গি ভেঙে পড়ার মতো। বালি, পরতাপ, জিল্লুর কপালে দুশ্চিন্তার কুঞ্চন। কেউ কোনো কথা বলে না।
হঠাৎ একসময় বালক জামির চিৎকার করে ওঠে, ঐ যে মানুষ!
তার কণ্ঠস্বরে আগ্রহ এবং আবেগ ছিল। সবাই তাকিয়ে দেখল, আধা ক্রোশ দূরে একটা শাড়ির মুখে একখানা ডিঙ্গি এসে লাগল। দু-জন মানুষ সেই জলজঙ্গলের ভেতর থেকে জামিলাবাদের দিকে আসছে।
বাজিকরেরা খুব উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে থাকে, যেন তারা আশ্চর্যজনক কিছু। দেখছে।
সেই দু-জন মানুষ কখনো জঙ্গলের আড়ালে হারিয়ে যায়, আবার কোনো বাঁকে দেখা যায় তাদের। দু-জন কৃষ্ণকায় মানুষ।
হাঁ, মানুষই তো!
আছলাম বলে, মানুষ নয় তো কি জিন বেরোবে এই সকাল বেলা! দেখ চাচা, কেমন আটাশ যাচ্ছে সব!
আরে, ও তো হাড়মা আর গান্দু। একজন হল সাঁওতালপাড়ার, আর জন হল ওরাওঁপাড়ার সওদা নিতে আসছে।
সেই যে জামিরের আগ্রহের চিৎকার ‘ঐ মানুষ!’—এই দুটি কথা যেন পীতেমের অন্তরের আকাঙ্ক্ষার উল্লাস! বালি, পরতাপ আর জিল্লুর কপালের চামড়া অনেকটা সরল হয়েছিল এই শব্দ দুটি শুনে।
গোমস্তা বলেছিল, দু-চার দিন থাক এই কাছারির মাঠে। তারপর নিজেরা দেখ ভাল করে বাঁশ কাঠ পোঁতো, ভিটের পত্তন কর। এমনি করেই হয়।
বালি, পরতাপ, জিল্লু হাড়মা আর গান্দুর সঙ্গে আলাপ করেছিল। তারা যখন ফিরে যায়, তখন যেচে তাদের সঙ্গে অতিথি হয়ে তাদের গ্রামে গিয়েছিল।
দূরের থেকে যতটা ভয়াবহ মনে হয়েছিল, নমনকুড়িতে এসে ততটা খারাপ লাগেনি তাদের। পলি জমি, কাদা তেমন নেই। এটা যেমন একদিকে ভালো, আবার অন্য কোনো একদিকে খারাপও। বাড়ি তৈরি করার আঠালো শক্ত মাটি পাওয়া মুশকিল। তবে সাঁওতালরা সে সমস্যার সমাধান করেছে। পলির মধ্যেও এঁটেল মাটির চাঙড় দু-একটা পাওয়া যায়। সেখানে খুঁড়লে শক্ত মাটি পাওয়া যায়। কষ্টসাধ্য কাজ, কিন্তু এমন কষ্ট তো করতে হবেই রে, ভাই। কেউ কি আর তোমাকে হাতে তুলে খাওয়াবে, শোওয়ার জন্য ঘর-গেরস্থালি গুছিয়ে রাখবে?
