কাজেই পীতেমকে সে সান্ত্বনা দেয় ঐ ভাবেই! বলে, পীতেম, কিছু পেলে কিছু দিতে হয়। বদিউল অমনি তোদের জমি দেবে কেন?
যদিও পীতেমকে সে ভালো করেই চেনে, তবুও কোথায় যেন এক কাঙাল, যাকে সে ধরতে চিনতে পারে না, আশা করে,স্থাতেম বলুক, চাই না জমি, তবু তুই থাক আমার কাছে।
পীতেম একথা বলে না। সালমা জানে পীতেম একথা বলতে পারে না। পীতেম বলে, তবে তাই হোক। রহুর আচ্ছাই পূর্ণ হোক। বাজিকর গেরস্থ হোক।
সালমা থেকে গেল। বদিউল তার জন্য নতুন ঘর তুলে দিল, মাসোহারার বন্দোবস্ত করল। গাই-মোষ কিনল কয়েকটা। তাদের রক্ষণাবেক্ষণ দুধ-ঘির বন্দোবস্ত নিয়ে দিন কেটে যায় তার। বিকালে বদিউলের কাছে যেতে হয় তাকে। মানুষটাকে খারাপ লাগে না তার। তার কাছে সারাজীবন ধরে যেসব মানুষ এসেছে বদিউল তাদের থেকে লক্ষণীয়ভাবে পৃথক। বদিউল শুধু বৃদ্ধ বয়সের একাকিত্বের হাত থেকে কিছুটা রেহাই পাবার জন্য সালমার সাহচর্য চায়।
সালমা কাটায় এক নিরুপদ্রব জীবন। তার গরু-মোষের সংখ্যা বাড়তে থাকে ক্রমশ। অঢেল দুধ দেয় তারা। পশুবিক্রির ব্যবসাও সে তারপর শুরু করল। এজন্য তাকে নোক রাখতে হয়। খরচ করার কোনো দরকার তার ছিল না, কাজেই পয়সা নিজস্ব নিয়ম অনুসারে বাড়ে এবং সালমা নেশাগ্রস্ত হয় সেই বাড়ানোর প্রক্রিয়াতে। উদ্ধৃত্ত পয়সা দিয়ে সে কেনে সোনা। গলায় পুঁতির মালা সরিয়ে রেখে সে পরে এক ছড়া মোটা বিছাহার। অন্য কোনো গহনা সে পরে না। কারণ সে বোঝে গহনা পরার বয়স তার নেই এবং সে আকাঙ্ক্ষাও তার হয় না। গলায় ভারি বিছাহার পরে এই কারণে যে, তার যে পয়সা আছে, এটা অন্যের বোঝা দরকার। পয়সা মানুষের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং ক্ষমতা আশপাশের মানুষের উপর কর্তৃত্ব করার অধিকার দেয়।
কি করবে সালমা এত পয়সা দিয়ে? বাজিকরদের দিয়ে দেবে? কেন দেবে? দিলে কি তাদের অভাব মিটবে? অভাব মিটবে না, একথা সালমা বোঝে। আর দেওয়ার আগ্রহও সে বোধ করে না। মালদা ও জামিলাবাদে, সেই দুই জায়গায় বাজিকরেরা স্থায়ী হয়েছে, তারা দুরাবস্থা কাটিয়ে ওঠার আপ্রাণ চেষ্টা করছে, একথা সালমা জানে। কখনো কখনো কেউ কেউ আসে তার কাছে আসে সাহায্যের জন্য। সালমা দু-পাঁচ টাকা দিয়ে বিদায় করে তাদের, তার বেশি কিছু করে না।
উদ্ধৃত্ত পয়সা দিয়ে সে নতুন ব্যবসা শুরু করল। বন্ধকী এবং সুদের ব্যবসায়ের এক বিচিত্র উত্তেজক নেশা আছে। সালমা সেই নেশায় আচ্ছন্ন হল।
বদিউল বলে, বিবি, শুনতে পাই অনেক পয়সা কামাচ্ছ, খাবে কে এসব পয়সা?
সেকথা আমিও ভেবেছি।
কি ভেবেছ?
মিয়া, তোমার বাপ-ঠাকুরদার সম্পত্তি রেখে গেছে, তুমি সারাজীবন খরচা করলে। হিসাবও রাখলে না কিসের থেকে কি হয়। তোমার নেশা খরচ করা। আর দেখ, বুড়ো বয়সে আমার নেশা হল পয়সা করা। ভোগ করার বয়স নেই, ইচ্ছাও নেই, অথচ পয়সা করে যাচ্ছি।
প্রশ্নটা তো আমার তাই। করছ কেন?
নেশায় করছি। তুমি যেমন নেশায় খরচ করছ, আমি তেমনি নেশায় পয়সা বানাচ্ছি। পয়সা তো মানুষ শুধু ভোগ করার জন্য করে না।
কি জানি? ভোগ ছাড়া পয়সা আর কোন কাজে লাগে কে জানে?
কয়েক বছর এইভাবে কেটে যাওয়ার সালমা পীতেম ও জামিরের কথাও ভুলে গেল। পয়সার টান তাকে এমন স্বার্থপর জগতে নিক্ষেপ করল যেখানে অন্য সব সম্পর্ক মূল্যহীন হয়ে যায়। সমস্ত দিন তার কেটে যায় নানা ব্যবসাপাতির কাজে। পীতেম জামিলাবাদ চলে যাওয়ার পর আর তার সঙ্গে দেখা হয়নি সালমার। পীতেমের পক্ষে এই দূর রাস্তা হেঁটে বা ঘোড়ায় আসা আর এই বয়সে সম্ভব নয়। চেষ্টা করলে সালমা হয়ত যাওয়ার ব্যবস্থা করতে পারে। কিন্তু তা সে করে না।
২৩.
উত্তরে শেষ ভূখণ্ড জামিলাবাদ। তারপর উত্তর ও উত্তর-পূর্ব কোণে যতদূর চোখ যায় শুধু জল আর জঙ্গল। মানুষ সেদিকে যায় না। এতকাল এমন নিয়মই ছিল।
কিন্তু সেই নিয়ম প্রথমে ভাঙে সেই গোমস্তা সাহেব, যে পরে ঠিকাদার হয়েছিল। কিন্তু সাহেব সেখানে বসতি স্থাপন করেনি বা কাউকে বসতি করায়ও নি। সেসবের দরকার তার ছিল না। কিন্তু যাদের নিয়ে এসে সে গাছ কাটিয়েছিল তাদের স্থানাভাব ছিল। সাহেব চলে যাবার পর তারা জামিলাবাদের দুই ক্রোশ উত্তরে আরেকটি গ্রাম পত্তন করে মানুষের ভৌগোলিক দূরত্বকে আরেকটু বিস্তৃত করেছিল।
সাঁওতালদের নতুন পত্তনি সেই গ্রামের নাম এখন নমনকুড়ি। পরে পনেরা-বিশ ঘর ওঁরাও এসে সাঁওতালদের কাছ থেকে স্থান চেয়ে নিয়ে তাদের আলাদা পাড়া তৈরি করেছিল।
পীতেম তার দলবল নিয়ে জামিলবাদ আর্সে আশ্বিনের শেষে। তারা জানত বর্ষায় সে অঞ্চল জলমগ্ন থাকে, কাজেই আগে গিয়ে কোনো লাভ হবে না। পত্তনি করতে হলে খরার সময় করতে হবে। আশ্বিনের লঘু মেঘ দেখে পীতেম বলেছিল, চলো জামিলাবাদ।
চার ঘর বাদ দিয়ে আর সবাই জামিলাবাদী আসল। বদিউলের কাছারিবাড়ি আছে সেখানে। বালি সেখানে ম্যানেজারের চিঠি দেখায়। কাছারির গোমস্তা অবশ্য খবর আগেই পেয়েছিল। বাজিকরদের মাতব্বরদের সে কতকগুলো অনির্দিষ্ট দিক দেখায়। বলে, ঐ যে দেখ গ্রাম, ও হল সাঁওতালদের নতুন পত্তনি নমনকুড়ি। এখান থেকে কাছে মনে হচ্ছে, নয়? কাছেই, তবে ক্রোশদুয়েক হবে। নমনকুড়ির বাঁয়ে ঐ যে ঢিপিগুলো সবে মাথা তুলছে, ওখানেই তোমাদের জমি। মাপ-জোখের দরকার নেই, আগে খালাস তো কর, ভিটা তোল মাটি কেটে, তারপরে ওসব দেখা যাবে।
