তবে বাজিকরও থাকবে, থাকতে তাকে হবে।
তবে ব্যবস্থা করি।
হ্যাঁ করো।
বালি তারপরে দলের পরিবার এবং লোকগণনা করে। রাজমহলে এসেছিল কুড়ি ঘর বাজিকর, থানাদারকে হিসাব দিয়েছিল একশো পাঁচজন মানুষের। এখন তার থেকে বেড়ে-কমে দাঁড়িয়েছে ষোল ঘর মানুষ। মানুষের সংখ্যা পঁচাশিজন। প্রতি সমর্থ পুরুষ পাঁচ বিঘা করে জমি পেয়েছে বদিউলের কাছ থেকে। সবই জংলা জমি, অর্থাৎ শুরুতে একেবারেই ঝাড়া হাত-পা।
কিন্তু ‘ব্যবস্থা করি’ বললেও ব্যবস্থা এত সহজে হয় না। ষোল ঘর মানুষের পাঁচ ঘর এই শহর ছেড়ে এখন আরেকটি অজ্ঞাত অপরিচিত স্থানে যেতে চায় না। পীতেম যে স্থিতির রসে দলের মানুষকে নিষিক্ত করতে চেয়েছিল এখন তা আবার কিছু অন্য রকম প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করল। মুক্ত পৃথিবীর এবং অজ্ঞাত রাস্তায় ভয়াবহতা কি পরিমাণ বেড়েছে, সেকথা যাযাবরের থেকে ভালো কে বাঝে? তাছাড়া বাজিকরের নিজস্ব রোজগারের পথও ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। কাজেই প্রথমে রাজমহল, তারপরে এই মালদার নতুন বৃত্তিসমূহ যে সামান্য স্থায়িত্বের জন্ম দিয়েছে, আর এক অজ্ঞাত ভবিষ্যতের মধ্যে গিয়ে সেটুকুকে হারাতে অনেকেই রাজি নয়। তাছাড়া আরো সমস্যা আছে। বাজিকর জানে না, পাঁচ বিঘা জমি মানে কতখানি মাটি। বাজিকর জানে না, এই জমি কি করে চাষোপযোগী করতে হয়। বাজিকর জানে না, বছরের কোন সময় বীজ বপন করতে হয়, কখন কাটতে হয়।
বালি বলে, শিখে নেব সব। বাজিকর তো বোকা নয়!
কিন্তু তার গলায় যতটা আহ্বানে আন্তরিকতা থাকে লড়াই করার জোর ততটা থাকে না, কেননা জমি নিয়ে যে জীবন, তার সঙ্গে বাজিকরের কত পুরুষের সংস্রব
বিরোধের কথা শুনে পীতেম প্রথমে কিছুটা দমে যায়। এরকম সে ভাবেনি। তার দলের মানুষেরা তার ইচ্ছা এবং পরিকল্পনার বিরুদ্ধে যাবে, একথা তার পক্ষে ভাবা সম্ভব ছিল না। কিন্তু পরে চিন্তা করে, দলের সত্যিকার কর্তৃত্ব সে বহুকালই করছে না, অথবা কর্তৃত্ব করার মতো বিশেষ কিছু নেইও আর। গত বিশ বছরে যেসব বড় বড় ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো এত শক্তিশালী যে পীতেমের আয়ত্তের বাইরেই তা ছিল। তাছাড়া, গোরখপুরে তিনশো ঘর বাজিকর ছিল। কোথায় গেছে তারা? পৃথিবীর কোন্ প্রত্যন্তে? আর কোথায় এসেছে পীতেম? যেদিন রহু তার দল নিয়ে নদীতে ঝাঁপিয়েছিল সেদিনের মানুষেরা কে কোথায় গেছে, তা কি কেউ জানে? কী নামে এখন তারা পৃথিবীতে পরিচিত? তারা কি রহুর নাম পর্যন্ত মনে রেখেছে? কে দিল তাদের নাম বাজিকর? সে তো রাস্তার নাম! এখন হোক না তার নাম বালি কর্মকার, জিল্লু টাঙ্গাওয়ালা, কি বিষেণ ঠাটারি? পীতেম কি তাই চাইছে না?
তাই পীতেম বালিকে ডেকে বলে, যারা যেতে চাইছে না, তাদের বলল, আমি চাই যে আমরা একসঙ্গে থাকি। তবুও যদি তারা একত্রে না থাকে, তবে থাকুক তারা এখানে। দুরের দেশে তো মানুষের কুটুমও থাকে। তারা আমাদের কুটুম হয়ে থাক। আমরা চল আরেকবার আমাদের কপাল ঠুকে দেখি।
২২.
পিছনে পড়ে রইল চার ঘর বাজিকরের সতেরো জন মানুষ। আরেক ঘরকে বালি শেষ পর্যন্ত রাজি করাতে পেরেছিল। পিছনে পড়ে রইল সালমা। পীতেমকে এ ব্যবস্থাও মানতে হল। বদিউল এরকম শর্তই করেছিল। ক্রমশ বদিউলের সঙ্গে সালমার সম্পর্ক এমনই এক পর্যায়ে এসেছিল যে অন্যান্য বন্ধুবান্ধব বদিউলের কাছে একেবারেই পরিত্যাজ্য হয়েছিল। সালমা ভেবেছিল এও এক বড়লোকি খেয়াল, একসময় খেয়াল কেটে গেলে সে নিষ্কৃতি পাবে। বদিউল অবশ্যই সেভাবে সালমাকে আটকায়নি। সে বলেছিল, এ বয়সে তুমি আর ওদের সঙ্গে গিয়ে করবে কি? তার থেকে যে কদিন বেঁচে থাকি, এসো বুড়োবুড়িতে এক নতুন খেলা খেলি। লোকে দেখুক প্রেমের খেলা শুধু যুবকদেরই একচেটিয়া নয়।
সালমা বলেছিল, মানুষ হাসবে না?
হাসুক।
বদিউল থোড়াই পরোয়া করে মানুষের কথার।
কিন্তু সালমা ভেবেছিল পীতেমের কথা। ধন্দুর বউ নতুন মানুষের সঙ্গে ঘর করছে। ধন্দুর ছেলে জামির, সে সবে জোয়ান হয়ে উঠেছে, সে তো সালমার কাছেই মানুষ তাছাড়া, এতদিনের অভ্যাস।
তবুও বদিউলের আবদারে মধ্যে কোথাও যেন সুপ্ত ছিল একটু দাবি অথবা বাজিকরদের জমির বিনিময়ে কিছু পাওয়ার ইচ্ছা।
কাজেই কাতর পীতেমকে সে বলেছিল, পীতেম, কিছু পেতে হলে কিছু দিতে হয়।
তাই বলে তোকে দিয়ে যাব?
আমাকে কি আর দরকার আছে তোর?
নেই?
পীতেম আঁতকে উঠেছিল। সালমা বোঝে, দীর্ঘদিনের মৌনতার সময়ে পীতেম শিশুর মতো তার উপরে নির্ভর করত। এখন অনেকটা স্বাভাবিক হলেও পীতেম একাকিত্বের কথা ভাবতে পারছে না।
কিন্তু সে নিজে তো পীড়িত বোধ করছে না! হয়ত, এই তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। সারাজীবন কোনোকিছুই তাকে তেমনভাবে আটকে রাখল না। বয়স স্বাভাবিক। নিয়মে না হলেও মন্থরভাবে তাকেও ভেঙেছে। বয়সের বার্ধক্য, শরীরে প্রৌঢ়ত্বের ক্লান্তি। পৃথিবীর রঙ এখন তার কাছেও বিবর্ণ। তবুও কোনো কিছুই তাকে আটকে রাখতে পারছে না কেন? এই যে ছেলেটাকে সে কোলেপিঠে করে মানুষ করল, যা সে সারাজীবনে এই একবারই করেছে, সেই জামিরও কেন তাকে আটকে রাখতে পারছে না! অবশ্যই বদিউলকে প্রতিদান দিতে হবে। কিন্তু সে কি এভাবেই! সর্বস্ব খুইয়ে!!
এখন যেন এভাবেই সে কাতর হতে চায়, অথচ সর্বস্ব খোয়াবার যন্ত্রণা সে তার অভ্যন্তরে টের পায় না। বয়স স্বাভাবিকভাবে যে সব দুঃস্বপ্ন আনে, তার তাড়নায় এখন সে নিজেকে অত্যন্ত সংগোপনে নিতান্ত দুর্ভাগাই মনে করে। কিন্তু স্বভাবের মধ্যে যে দম্ভ দীর্ঘকাল ধরে পালন করেছে, সেই দম্ভই তাকে এখনো পরিচালিত করে এবং এসব দুর্বলতার চিন্তা পীতমের কাছেও প্রকাশ করতে পারে
