সালমা বলেছিল, আমার কিছু দরকার নেই, মিয়া। আমি যেমন আছি তেমনই থাকতে চাই। দরকার বাজিকরদের। তাদের মাথা গোঁজার ঠাই নেই, সারা দুনিয়ায় দাঁড়াবার মতো জায়গা নেই।
বদিউল তারপরে সায় দিয়েছিল। বলেছিল, ঠিক আছে, শোভারামের সঙ্গে কথা বলে যা হোক একটা ব্যবস্থা করব।
কিন্তু এসব কিছু করার আগেই বদিউল গ্রেপ্তার হয়ে যায় শোভারামের সঙ্গে। তার দিনকতক পরে খাগড়ার মেলা থেকে ঘোড়া আর উট নিয়ে ফেরে তার ছেলে। তিনটি সুদর্শন ঘোড়ার মধ্যে একটি এই দুলদুলি, ভারি লক্ষ্মীমন্ত এবং তেজি চেহারা।
ছেলে জামাল ফিরে এসে ভালো মুরুব্বি দিয়ে কলকাতায় বদিউলের মামলায় তদ্বির শুরু করল ভালোভাবে। রাজস্ব-বোর্ড কালেক্টরের কাজ অনুমোদন করল না। কেননা লাটসাহেবের বিরক্তিজ্ঞাপক চিঠি পেল কালেক্টর। বদিউল মুক্তি পেল সসম্মানে, কিন্তু শোভারাম মুক্তি পেল না। তার নিজস্ব সম্পত্তি নিলাম করে কালেক্টর বদিউলের বকেয়া কিস্তি পরিশোধ করে নিল।
জেল থেকে ফিরে আসার পর বদিউল কয়েকদিন বিশেষ কারো সঙ্গেই দেখা করল না। তার বন্ধুবান্ধবরাও এসে ঘুরে যেতে থাকল। কিন্তু সালমা আসে প্রতিদিন। সামান্য দু-চারটে কথা বলে বদিউল, অধিকাংশ সময়টাই দু-জনে চুপচাপ বসে থাকে।
সালমা বলে, সাহেব, নতুন সাদা ঘোড়াটা খুব পয়মন্ত ঘোড়া।
বদিউল তার বিশ্বাসমতো কথাটা সায় দেয়। বলে, হ্যাঁ, সেটা আমিও ভেবেছি। দেখ, ঘোড়াটা বাড়ি আসল, আর আমার উপর থেকে জিনের কুদৃষ্টি কেটে গেল। ও ঘোড়ার ইজ্জত দিতে হবে।
তারপর দুলদুলির জন্যে সমস্ত রাজকীয় ব্যবস্থা হয়।
বদিউল বলে, বাজিকরদের জমির ব্যাপারটা আমার মনে আছে। দু-একদিনের মধ্যেই নতুন নায়েবের সাথে কথা বলব ও নিয়ে।
সালমা বাধা দেয় তাকে। বলে, ওসব এখন থাক, মিয়া। আগে সামলে ওঠো, তারপরে দেখা যাবে।
২১-২৫. মালদা শহর থেকে উত্তর-পূর্ব কোণে
মালদা শহর থেকে উত্তর-পূর্ব কোণে পঁচিশ-ত্রিশ মাইল তফাতে মহানন্দা ও টাঙ্গন নদী দুটি এক জায়গায় মিলেছে। বলা ভালো টাঙ্গন এসে মহানন্দায় পড়েছে। এই সঙ্গমের উত্তর অংশে দুই নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চল বর্তমানে আগাছার জঙ্গলে পূর্ণ, বসতিহীন। পৃথিবী সেখানে এখনো আদিম। বর্ষার সময় থেকে শীতের শুরু পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চল থাকে জলমগ্ন। উত্তরের বিশাল অঞ্চলের জল নামে এই দুই নদী দিয়ে এবং সেই জলের একটা বড় অংশ এই ব-দ্বীপ সদৃশ অঞ্চলে বছরের কয়েকমাস জমে থেকে এই ভূখণ্ডকে আদিম করে রেখেছিল। উত্তরের বালি মিশ্রিত পলি ক্রমশ জমে জমে এই জলাভূমির মধ্যে অসংখ্য ঢিবি তৈরি করেছে। জল যখন সরে যায় তখন প্রথমে মাথা তুলে দাঁড়ায় এই ঢিবিগুলি। শীতের প্রারম্ভে জল যখন সরতে থাকে তখন মনে হয় সারিবদ্ধ জলজন্তু রোদ পোহাচ্ছে পিঠ উঁচু করে।
লবণ ব্যবসায়ী সাহেবদের এক সাহেব গোমস্তা নদীপথে চলার সময়ে কোনো একদিন এই জঙ্গলাকীর্ণ জলার মধ্যে নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের লক্ষণ দেখতে পেয়েছিল। যেসব জায়গায় জল জমে না সেইসব উঁচু জায়গায় একধরনের ঋজু গাছের প্রাচুর্য দেখেছিল সে। অভিজ্ঞ মানুষটা দু-এক নজর দেখেই বুঝেছিল এ গাছগুলো শাল, যদিও পরিচিত শালের তুলনায় অপেক্ষাকৃত খর্বাকৃতি, সেই কারণেই বোধ হয় আরও বলিষ্ঠ ও স্কুল।
চারদিকে তখন রেলের লাইন বসছে নতুন উদ্যমে। রেল মানেই সাহেবদের – সমৃদ্ধি, রেল মানেই শাসক আরো সুরক্ষিত। রেল লাইন বসছে সাহেবগঞ্জ—ভাগপুরে, রেল লাইন বসছে সান্তাহার থেকে পার্বতীপুর, থেকে কাটিহার। আর রেলের জন্য তো দরকার প্রচুর কাঠের এবং অবশ্যই শালকাঠের।
আশেপাশে শালের প্রাচুর্য কোথাও নেই। লবণের গোমস্তা সাহেব রাতারাতি সরবরাহকারী ঠিকাদার হয়ে গেল। কে যাবে এই অজগর জঙ্গলে নদীনালার গোলকধাঁধায় গাছ কাটতে? মানুষের কি অভাব আছে? লক্ষ সাঁওতাল ছিন্নমূল হয়েছে? আর গাছ কাটতে, জমি উদ্ধার করতে তাদের সমতুল্য কে?
সেই তখন সাঁওতালরা প্রথম প্রবেশ করে রাজশাহিতে, দিনাজপুরে। তাদের দেখাদেখি এল মুণ্ডা এবং ওরাওঁরা এবং তাদের লেজুড় ধরে ভূঁইয়া, তুরি, মাল, মাহালি, লোহার, কোলকামার আদি খেটে-খাওয়া মানুষের দল।
বদিউল ইসলাম সেইখানে জমি দিয়েছে বাজিকরদের। প্রথম তিনবছর কোনো খাজনা নেই, তৃতীয় বছর থেকে খাজনা দিতে হবে। বালিরা চার যুবক একদিন এল সেই জমি দেখতে। এর নাম জমি? হায় কপাল!
কেন কি এমন খারাপ জমি? পাথর তো নেই, কাঁকর তো নেই। তার উপরে দেখ, কেমন জলের আয় আছে।
একথা বলে সাঁওতালরা। প্রায় পঞ্চাশ-ষাট ঘর সাঁওতালের বসত এর মধ্যেই হয়ে গেছে জায়গাটায়। পনেরো-বিশ ঘর ওঁরাও’-আছে।
তারা বলে, হাসিল জমি, তৈরি জমি কে দেবে তোমাকে? আমরা জমি হাসিল করি, চালাক লোকে পরে তার দখল নেয়। যতদিন না নেয়, ততদিন তো জমি তোমার। ততদিনই আবদার কর, ফসল কর, খাও। নিয়ে যদি নেয়, আবার খালাস করবে জমি। জমির কিছু অভাব আছে পৃথিবীতে?
বালির মুখে এসব কথা শুনে পীতেম ধন্দুর ছেলেকে বলে, দে তো বাপ, কোমরের পিছনে দু’টো তামাচার ঠোকা দে তো। আস্তে দিস, তুই বড় জলদিই জোয়ান হয়ে যাচ্ছিস। তবে জোয়ান জলদিই হওয়া দরকার, কেন কি, আজ পৃথিবীতে জমির অভাব নেই, তবে কাল হবে।
তারপর সে বালির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে, সাঁওতালরা আছে? ওরাওঁরা আছে?
আছে?
