শোভারাম ছিল শিক্ষিত, কিন্তু বদিউল সম্পূর্ণ অশিক্ষিত। শোভারামের গোপন উচ্চাভিলাষ ছিল স্বয়ং জমিদার হওয়ার। এটা এমন কিছু দোষের ব্যাপার নয়। নায়েবরা জমিদার হামেশাই হয়।
ফলে রাজস্ব বাকি পড়তে থাকে, যদিও বদিউল ছিল অত্যন্ত রাজভক্ত। শোভারাম সাহেবদের খুশি রাখত প্রচুর খানাপিনা এবং উৎকোচ দিয়ে।
কিস্তির তাগিদ এলে শোভারাম আর্জি জানাতো অত্যন্ত বিনীতভাবে। হুজুরের এখন বড় দুর্দিন চলছে, আরো কিছুদিন সময় দিতে সরকারের আজ্ঞা হয়। এভাবে একজন কালেক্টর পার করে দিল শোভারাম।
কিন্তু দ্বিতীয় কালেক্টরের বেলায় বিষয়টা এত সহজ হল না। রাজস্ব বোর্ডের নির্দেশে বদিউলের জমিদারি খাসে নিয়ে আসার নির্দেশ দিল কালেক্টর।
কালেক্টর বদল হলেও সহকারীরা দজ হয়নি। তারা অনেক পয়সা খেয়েছে শোভারামের। তাদের পরামর্শে কালেক্টর রাজস্ব-বোর্ডের কাছে বদিউলকে অন্তত এবারের মতো ক্ষমা করবার জন্য আবেদন করল। কালেক্টরের কথামতো বদিউল নিজে খাজনার টাকার সংগ্রহ করে রাজসরকারে জমা করল। তাছাড়াও, শোভারামকে মৃদু তিরস্কার করে এবারের মতো ক্ষমা করে দিল বদিউল।
কিন্তু শোভারাম তখন তিরস্কার কেন গাল খেতেও রাজি ছিল। জমিদারির তছরূপ করা টাকায় পুর্ণিয়ায় তার ছোটখাটো একখানা জমিদারি তখন কেনা হয়ে গেছে। বদিউলকে খুব বেশি আমল দেওয়া এখন আর তার দরকারও ছিল না। ফলে পরের বছরই আবার কিস্তির টাকা বাকি পড়ল।
কালেক্টরের সহকারীরা এবারও টাকা খেয়ে শোভারামকে সাহায্য করছিল। কিন্তু রাজস্ব-রোর্ডের উত্তপ্ত চিঠি পেয়ে কালেক্টর এবার আর কারো কথায় কর্ণপাত করল না। শোভারাম ও বদিউল দুজনকেই কারারুদ্ধ করল সে।
এই অপমানকর বন্দীত্ব বদিউলের কাছে মৃত্যুসম হয়েছিল। কদিন আগেই ছেলেকে বদিউল খাগড়ার মেলায় পাঠিয়েছিল ঘোড়া আর একটি উট কিনতে। ঘোড়া জিনকে তুষ্ট করার জন্য, আর উট কুরবানির জন্য। গ্রেপ্তারের সময় ছেলের সঙ্গে দেখা হল না। বদিউল একেবারে ভেঙে পড়ল।
এসব ঘটনার আগেই অবশ্য বদিউলের বৈঠকখানায় সালমার যাতায়াত শুরু হয়েছিল। বদিউলের ইয়ারেরা এই আশ্চর্য রমণীর খোঁজ পেয়েছিল যথাসময়েই। তাদের আবদারে শোভারাম সালমাকে ডেকে এনেছিল। মাঝেমধ্যেই বদিউলের বৈঠকখানার সালমার ডাক পড়ত।
বয়স্ক ইন্দ্রিয়পরায়ণ মানুষগুলোর মাঝখানে সালমা যেন ইন্দ্রাণী। বদিউলের ইয়ারেরা তার সঙ্গে নানা গোপন বিষয়ে আলোচনা করত, পরামর্শ নিত, ভাগ্যগণনা করাত এবং যৌবনকে ধরে রাখার পদ্ধতি-প্রক্রিয়া জানতে চাইত। এইসব সময় বদিউল ফরাসির নল নিয়ে চুপচাপ বসে মৃদু, মৃদু হাসত। নিজে কখনো ইয়ারদের সমক্ষে এসব লঘু বিষয় নিয়ে আলোচনায় যেত না। তীক্ষ্ম বুদ্ধি সালমার আলাপ করার ভঙ্গি, প্রতিপক্ষকে বোকা বানাবার কৌশল সে মনে মনে খুবই তারিফ করত।
ক্রমে সালমার সঙ্গে বদিউলের সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ হয়। বদিউল সালমার সাহচর্য ভালোবাসত এবং দু-জনে নিরালায় গল্পগুজব করে দীর্ঘ সময় কাটাত। এ ছিল নিতান্তই দু-জন বয়স্ক মানুষের আলাপ।
যেমন বদিউল বলত, কি আক্ষেপ বিবি, বয়সের সময় তোমার দেখা পেলাম at
সালমা, কেমন, মিয়া, বয়সের সময় পেলে কি সাদি করতে আমাকে?
সাদি বড় ছোট কথা বিবি, তাতে মম ভরে না।
বয়সটা কি এমন বেশি হয়েছে মিয়া? দেখই না একবার চেষ্টা করে এ বয়সেও প্রেম জমে কিনা।
হ্যাঁ, সেকথা তুমিই বলতে পারো, সালমা বিবি। বয়স তোমার পোষা পাখি, তুমি ডাক না দিলে আসবে না। নাকি, যৌবন তোমার পোষা পাখি, সদাই তোমার অঙ্গে লেপ্টে আছে?
কি কথাই শোনাও মিয়া। ধর একটু পান খাও।
এ অভ্যাসটি বদিউলের দান। বদিউল সালমাকে পানে তাম্বুলে জড়িয়েছে।
সালমা বলে, দেখ সাহেব, যৌবন বুড়োতেও চায়, যৌবন শিশুতেও চায়। কিন্তু বয়স্ক মানুষ যদি পিছন ফিরে নিজের যৌবনের দিকে তাকায় তো কি দেখে?
কি দেখে?
দেখে, সেথায় খালি ভুল আর চুক। খালি দুঃখ। সে দুঃখের আসান হওয়ার আগেই বয়সে টান ধরে ভাটির। সে ভুল শোধরাবার আগেই দেখ বয়স তোমাকে পৌঁছিয়ে দিয়েছে এমন জায়গায় সেখানে শোধরাও আর না শোধরাও তো বয়েই গেল।
আরে সেই তো মজা। সেই তো যৌবনের আসল জিনিস।
কি জানি, তোমরা সোনার পালঙ্কে শুয়ে মানিকের দানা খাও। তোমাদের কাছে বয়স বোধহয় এমনই মজার ছিল।
কি আক্ষেপ বিবি, বয়সের কালে তোমায় পেলাম না। এই তো পেয়েছ মিয়া, নেও না লুটে।
হাঃ, হা, ভালো বলেছ, এই তো পেয়েছি, নিই না লুটে, না? আরে এখন লুটবে কে? সে লুটেরার হদিশ পাই না বহুকাল।
এরকম সম্পর্ক হয় বদিউলের সঙ্গে। বালি বলেছিল, পিসি, এই সুযোগে বুড়োকে বলে কিছু জমিজমার সুরাহা করে নাও না আমাদের জন্যে। তোমার কথা তো শোনে বলে শুনেছি।
সালমা সম্পূর্ণ নিরাসক্তের মতো বলেছিল, বলে দেখব।
পরের দিন নিরালায় বদিউলকে সে বলেছিল, সাহেব, কিছু কাজের কথা আছে।
কাজের কথা? কী ভীষণ! সালমা বিবি–তুমি যে কাজের লোক একথা জানা ছিল না।
ঠাট্টা রাখ, সাহেব। সত্যিই কাজের কথা আছে।
কাজের কথা শুনে বদিউল গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল। শেষে বলেছিল, দেখ তুমি আমাকে ভালো কাজের কথা আর কাজের লোক এই দুই ব্যাপার থেকে আমি সবসময় দূরে থাকি। সেজন্যই তো শোভারামের মতো কাজের লোক নায়েব রেখেছি। এখন তুমি যে সমস্যায় ফেললে এ নিয়ে অমাকে ভাবতে হবে, শোভারামের কাছে খোঁজখবর নিতে হবে, ভালোমন্দ বিচার করতে হবে, এত সব ব্যাপার। তার থেকে তোমার যদি কিছু টাকা পেলে চলে তো বল, এক্ষুনি তার বন্দোবস্ত করছি।
