বালির নেতৃত্বে তারপর দল আবার নতুন করে বাঁচার চেষ্টা করে। চারটি ঘোড়াকে যথাসম্ভব যত্ন নেওয়া হয়। বাজিকর এ কাজে অভ্যস্ত। মাসদুয়েকের মধ্যেই তাদের চেহারাতে আবার চিক্কণতা আসে। তৈরি হয় চারটি টাঙ্গা।
মালদা শহরে টাঙ্গার প্রচলন আছে। মুসলমানদেরই এই কাজ প্রায় একচেটিয়া। বাজিকরেরা এবার তাদের সঙ্গে পাল্লা দিতে নামে। বালি আগেই সাবধান করে দেয়, টাঙ্গাওয়ালাদের সঙ্গে ঝামেলা বাধাতে যেও না কেউ। মনে রেখো, আমাদের এখানে বেঁচে থাকতে হবে।
এক মাসের মধ্যে বাজিকর যুবকেরা টাঙ্গা চালাবার পেশাদারি হাঁকডাক, নিয়মকানুন শিখে যায়। দীর্ঘ রাস্তা পরিক্রমা করে মাল ও যাত্রী আনে। মানিকচক, কালিয়াচক, খেজুরিয়া ঘাটের ধর্গ রাস্তা পাড়ি দেয়, পথচারীকে সচকিত করে চাকার গায়ে চাবুকের হাতল ঢুকিয়ে খখ শব্দে। রাস্তায় ধুলো ওড়ে, টাঙ্গাওয়ালা ছুঁড়ে দেয় বিদ্রুপ রসিকতা কিংবা নিতান্তই খিস্তি।
বালি নিজে টাঙ্গা চালায় না। বাজারের মধ্যে একটা নির্দিষ্ট স্থানে সে তার মেরামতির সরঞ্জাম আর হাপর নিয়ে বসে। কর্মকারের কাজে সে খুবই সিদ্ধহস্ত। এ ছাড়া ঘোড়ার পায়ে কিংবা গরু-মোষের পায়ে নাল পরাবার জন্য দরকার হয় তাকে। জানোয়ারকে খাসি-বলদ করানোর জন্যও ডাক পড়ে তার।
পীতেম আফিঙের পরিমাণ বাড়ায় এবং রাজমহলের গাছটির অনুরূপ আরেকটি গাছ খুঁজে বের করে। সেখানে সারাদিনরাত বসে ঝিমায় সে এবং দনুর নির্দেশের আরো কোনো গুঢ় নিহিতার্থ খুঁজে বের করবার প্রয়াস পায়।
সালমা ঘুরে বেড়ায় পাড়ায় পাড়ায়। মালদার মুসলমান সমাজ বর্ধিষ্ণু। সালমা তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে আলাপ জমায়। নিজের অভিজ্ঞতা ও বিদ্যাকে কাজে লাগায় সে। মধ্যবয়সী পুরুষ ও রমণী এই দুই জাতই তাকে সমাদর করে। কেননা এই উভয় শ্রেণীর মানুষের কাছে সম্পূর্ণ বিপরীত কারণে তার আকর্ষণ। তার সবচেয়ে বড় সম্পদ শরীর মধ্যবয়সী পুরুষকে উত্তেজনা জোগায় আর স্ত্রীলোকদের মধ্যে ঈর্ষার বীজ বপন করে। তবুও কেউই তার আকর্ষণ এড়াতে পারে না।
মাঝে মাঝে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে বেরিয়ে পড়ে তারো। আটজন দশজনের দল হয়। বড় দল করতে হলে সামর্থ্যের জোর চাই, জানোয়ার চাই। সেসব এখন কিছুই নেই।
ছোট ছোট দল এখন যায় রাজশাহি রংপুর, দিনাজপুর, আবার কখনো কখনো পূর্ণিয়া, কাটিহার, বারাউনি পর্যন্ত। কিন্তু পশ্চিমে তার বেশি আর যায় না। পশ্চিমের ভীতি এখনো তাদের মারাত্মক। কারণ পশ্চিমে একসময় ধ্বংস এসেছিল, জলস্তম্ভ হয়েছিল যা রহুকে ভাসিয়ে নিয়েছিল। পশ্চিমে গোরখপুরে ভূমিকম্পে বিশাল ভূ-খণ্ড মাটিতে বসে গিয়েছিল।
পনেরো বছর মালদা শহরকে কেন্দ্র করে বাজিকরেরা থাকল। মহানন্দায় প্রতিবছর বর্ষার সময় জল উপচে পড়ত। কোনো কোনো বছর বন্যা আসত। উত্তরের সমস্ত জল নিয়ে গঙ্গা আসত উঁচু হয়ে। মহানন্দার জল ঢালার জায়গা থাকত না, কাজেই সে দু-কুল ভাসাত। শহরও তা থেকে নিস্তার পেত না। বাজিকরেরা দলবল নিয়ে পিছিয়ে আসত।
এভাবে প্রতিবছর তারা পরের জমিতে অস্থায়ী বাসা বাঁধত। ক্রমে জীর্ণ তাঁবুগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল, আর নতুন করে তৈরি হল না। তখন তারা থাকত খোলা মাঠে অথবা খড় এবং তালপাতার ছাউনির নিচে।
যারা টাঙ্গা চালাত তারা দেখেছিল গঙ্গা পার হয়ে অনর্গল মানুষ আসছে। কালো রঙের মানুষ, তারো সাঁওতাল। তামার মতো রঙের মানুষ, তারো ওরাও। আসত আরো নানা জাতের মানুষ, যাদের পরিচয় কেউ জানত না। তাদের নিয়ে আসত সাহেবদের আড়কাঠিরা। তারা যেতে উত্তরের জেলাগুলোতে। সবাই জানত, ভীষণ খাটিয়ে মানুষ তারা। তারা জঙ্গল পরিষ্কার করত, পাথর চটাত, নদীর পাড়ের বাঁধ বানাত, চা-বাগানের নতুন পত্তনিতে কুলি হতো। সবাই জানত তারা বড় অল্পে সন্তুষ্ট। সবাই জানত রাঁচি, হাজারিবাগ, দামিন-ই-কোতে সাহেবরা তাদের মাজা ভেঙে দিয়েছে। তাই তারা ঘরছাড়া হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে যে-কোনো মূল্যে।
জিল্লু, পরতাম, বালি এবং পিয়ার, এই চার বাজিকর দূরের থেকে সারিবদ্ধভাবে চলা এইসব কালো মানুষের দিকে তাকিয়ে থাকত। কখনো চকিতে মনে হতো, আরে, এই মানুষটা তো চেনা! হায়রে, এই সেই মানুষ? হায়রে!
শহরে জমিদার বদিউল ইসলামের বিরাট বড় বাড়ি। তার আস্তাবলে বেশ কয়েকটি ভালো জাতের ঘোড়া ছিল। ভালো জাতের ঘোড়া বাজিকরের চোখে পড়বেই। তারা সবাই জানত বদিউল ইসলামের ঘোড়াগুলো ভালো। কিন্তু বালি বলে, ভালো তো কি? ওগুলো তো মাঠে চরে না।
আর মাঠে চরলেই বা কি? কোথায় যাবে বাজিকর? আর কোথায় যাবে?
কিন্তু বদিউলের ঘোড়াগুলো ভালো, একথা বাজিকর জানত। তার মধ্যেও সবচেয়ে সেরা সাদা রঙের একটা আরবি মাদি ঘোড়া। এ ঘোড়ার জন্য বদিউলের সবই পৃথক বন্দোবস্ত ছিল। ঘোড়ার নাম দুলদুলি।
কেউ চড়ত না এ ঘোড়ায়, এমনকি বদিউল নিজেও নয়। গাড়িও টানত না সুন্দরী এই ঘোড়া। তবে কেন তাকে এত আদর, এসব প্রথম প্রথম ভেবে অবাক হত বাজিকর। এখন আর হয় না। এটি বদিউলের সৌভাগ্যদায়ী জিনের মাদার। জিন তুষ্ট থাকে এই ঘোড়ার আশ্রয়ে। অথবা, ঘোড়া তো স্বয়ং জিন। তাই তার এমন বন্দোবস্ত।
অবশ্য এত সমাদরের কারণ আছে। বদিউল অত্যন্ত নিষ্ঠাবান মুসলমান। দোষের মধ্যে আমোদ-প্রমোদে একটু বেশি মগ্ন থাকত। খবর রাখত না নায়েব শোভারাম মজুমদার কিভাবে জমিদারি চালাচ্ছে।
