লুবিনি বলে, না শারিবা, রহু রহুই। সি হামরার মঙ্গল চায়। সি চায় বাজিকর সুখে থাকুক; থিতু হোক সে।
শারিবার কাছে তবু বিষয়টার জট খোলে না। লুবিনি যত বৃদ্ধ হচ্ছে ততই সে সারাজীবনের অভিজ্ঞতার, শোনা কথার সারসংকলন করছে। পার্শ্ববর্তী সমাজের কোনো বৃদ্ধার সঙ্গে তার পার্থক্য হচ্ছে এই যে, তার কাছে নেই এমন একখানা আধার যার নাম ঈশ্বর, যার উপরে সে তার অভিজ্ঞতা, বোধবুদ্ধি সঁপে দিয়ে নিজেকে নিমিত্ত মাত্র মনে করতে পারে।
তাই শারিবা, সি বাজিকর রাজমুহল ছাড়ি আবার রাস্তা ঘুরবা বারালো। পথে পথে ফিরা বাজিকরের কুত্তা ভুকে, জানোয়ার চিল্লায়। পুরনিয়া, কাটিহার, কিশনগঞ্জ, দিনাজপুর, রঙপুর, ফির মালদা, রহুর ঘোড়ার অক্তের দাগ, ঘুর, ঘুর, ঘুররে বাজিকর, দেখ, খুঁজি দেখ, কুথায় তোর থিতু, কুথায় তুর সোয়াস্তি। আর মাথার উপর তক জ্বলে, শীতের হিম, বর্ষার জল। বাজিকরের গেঁহুর পারা অঙ তামার বন্ন হোই গিল।
একসময় যে মানুষগুলোর দেহের রঙ ছিল সোনালি গমের মতো, এখন তা হল শ্যাওলাধরা তামার মতো। পুরুষদের ঘাড় পর্যন্ত কেশরের মতো চুল একসময় ছিল অহংকারের প্রতীক, এখন দীর্ঘ দুর্বিপাকের পর শুধু পাটের ফেঁসোর মতো মিয়মাণ। মাথায় রুমাল কিংবা উড়নি বাঁধা মেয়েরা একসময় কলহাস্যে শহরের রাজপথ মুখরিত করত, এখন ক্ষুধায় কাতর ধূর্ত দৃষ্টি তাদের, চোখে নেই সেই তীব্র সম্মোহনী। অনেকের দেহেই আর তাদের প্রাচীন নুগরু, কুর্তি, ঘাগরা নেই, নেই কাচের কাজকরা বস্ত্র, গলায় পাথর। সেখানে স্থান নিয়েছে ধুতি, লুঙ্গি, এইসব এদেশীয় বস্ত্র। গলার মালাকরা মুর্শিদাবাদী সিক্কাগুলো এখন শ্যাওলাধরা। কেউ আর সেগুলো ঘসে চাকচিক্য করে না। শুধু রাস্তা দিয়ে যখন তারা চলে অথবা থামে, মনে হয় এক হাজার বছরের ধূসরতা তাদের দেহে, তাদের উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টিতে।
এক শতাব্দী ধরে তারা তাদের রক্তে জেনেছিল যে তারা ক্লান্ত হয়ে গেছে। পথ চলায় ক্লান্ত হলে থামতে হয়। কিন্তু সে নিয়ম সাধারণ পথিকের। বাজিকরের নয়। যার পথের শেষ আছে, সে ক্লান্তিতে উপেক্ষা করতে পারে। কিন্তু বাজিকরের পথের শেষ নেই। তাই ক্লান্তির বোঝা তার কাছে একসময় বড় বেশি ভারি হয়ে ওঠে।
পীতেম স্থিতি চেয়েছিল। রাজমহলে দীর্ঘদিনের উপস্থিতি তার অভিজ্ঞতায় একটা ক্ষতিকর স্থিতি। তবুও দাঁতে দাঁত কামড়ে তাকে থাকতে হয়েছিল। যদিও সেজন্য অনেক মূল্য দিতে হয়েছে, তবুও।
লুবিনি পাতালু নদীর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ঘরের দাওয়ায় জমাট অন্ধকার, বাইরের স্বচ্ছ চাঁদের আলো। আকাশে হালকা মেঘ ভেসে যাচ্ছে, তার ছায়া পড়ছে নিচে গাছের পাতায়। এ দৃশ্যে সব কিছুই কেমন আদিম দেখাচ্ছে।
লুবিনি বলে, শারিবা, তুই এমন তরতাজা জুয়ান পুরুষ, তুই ক্যান্ নাচগান হাল্লা করিস না?
ভালো লাগে না।
তুই তোর নানার থিকাও বুঢ়া, য্যান তোর নানার নানা সিই পীতেম বুঢ়ার মতো। এমন জন্মবুঢ়া হওয়া ঠিক নয়রে।
২০.
মালদা শহরে মহানন্দা নদীর তীরে বাজিকররা তাদের অস্থায়ী গেরস্থালি শুরু করে নতুন করে। গঙ্গার ওপারের উপদ্রবের কোনো আভাস এদিকে নেই। কিন্তু তাতেও কোনো স্বস্তি নেই। ভগ্ন জীর্ণ সহায়হীন মানুষগুলো এখন আরো ধূর্ত ও ঠগ হয়। ঢোলকে ডুগডুগ শব্দ শোনা যায় ঠিকই। কিন্তু তার সঙ্গে সমান তালে থাকে চুরি, বেশ্যাবৃত্তি, হাত দেখা ও ভবিষ্যৎবাণী। কেননা রাজমহল তাদের সবই কেড়ে রেখে দিয়েছে। দলের কাছে এখন পশু বলতে কিছু নেই, সঞ্চিত অর্থও অনেক আগেই নিঃশেষ। তবুও এখানেই থাকতে হবে। কেননা চারজন নিরুদ্দিষ্ট যুবকের প্রতি নির্দেশ ছিল। এখানে আসার। এখানেই তারা মিলিত হবে, নোকমুখে এমন সংবাদই সালমা পাঠিয়েছিল।
মাঘ মাসের প্রথম দিকে পরতাপ, জিল্লু, বালি এবং পিয়ারবক্স ফিরে আসে। ক্রমান্বয়ে পলায়নে ক্লান্ত চার যুবক এবং তাদের শীর্ণকায় ঘোড়া।
বাজিকর ছাউনিতে উল্লাস ওঠে না, আবার শোকও তেমন চোখে পড়ে না। গিয়েছিল তারা পাঁচজন, এসেছে চারজন। শব্দ করে একজনই কাঁদে কিছু সময়, সে ধন্দুর বউ রোহীন। যদিও ছ-মাস আগেই ধন্দুর মৃত্যুর খবর সবাই জানতে পেরেছিল এবং এখন বিষয়টা পুরনো হয়ে গেছে, তবুও এই মুহূর্তে সবাই ধন্দুর কথা ভাবছে। রোহীন শব্দ করে কাঁদে, এর মধ্যে কেউ আতিশয্য কিছু দেখে না। এখন তার কোলে ধন্দুর ছেলে এবং রাত্রে তার শয্যায় দ্বিতীয় একজন পুরুষ শোয়। এসব কথা কারো অজানা নয়। এসব সত্ত্বেও তার কান্না অস্বাভাবিক লাগে
করোর কাছে। রোহীন কিছু সময় কাঁদে, পরতাপ তার ছেলেকে কোলে নিয়ে কিছু সবয় বসে তার কাছে।
দিনতিনেক পরে পীতেম চারজনকে তার কাছে ডাকে। চার যুবক নিঃশব্দে তার কাছে বসে থাকে অনেক সময়। পীতেম কিছু বলতে চায়, অথচ পারছে না, এটা সবাই বোঝে। তারা অপেক্ষা করে। শীতের শীর্ণ গাছের মতো পীতেমের চেহারা রিক্ত।
অনেক সময় পরে পীতেম বলে, দুনিয়ার অনেক কিছু দেখে এলে তোমরা। বয়সের থেকেও অভিজ্ঞতা তোমাদের অনেক বেশি হয়েছে। যা গেছে তার জন্য কেঁদে লাভ নেই। এখন বোধহয় আমাদের গেরস্ত হওয়ার চেষ্টা করা উচিত।
চার যুবক মাথা নাড়ে। পীতেম বলে, রহু তেমনই চান। তবে আমার শরীর আর মন দুইই ভেঙে গেছে। আমাকে দিয়ে আর নতুন করে কিছু হওয়ার নয়। তোমরা দলের সেরা ছেলে। তোমরাই এবার চেষ্টা কর।
