স্ট্র্যাটিজির ব্যাপারগুলো বোঝার জন্য এবার একটি পরিচিত ধাঁধা নিয়ে আলোচনা করা যাক। গেম থিওরির প্রয়োেগ সংক্রান্ত অত্যন্ত সহজ সরল কিন্তু শক্তিশালী এই ধাঁধাটির নাম দেয়া হয়েছে আসামির সংকট (Prisoner’s dilemma)। মুক্তমনায় অপার্থিব ‘বিবর্তনের দৃষ্টিতে নৈতিকতার উদ্ভব’ নামের একটি চমৎকার লেখায় আসামির সঙ্কট নিয়ে আলোচনা করেছিলেন[২৯০]। ব্যাপারটা অনেকটা এরকমের–
ধরা যাক একজন পুলিশ একটি হত্যা মামলায় দুজন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে। কিন্তু সাক্ষ্যপ্রমাণ খুবই অপ্রতুল। ফলে পুলিশ কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারছে না। এখন আসামিদের দুজন সত্যই অপরাধ করেছে কি না কিংবা কে আসল অপরাধী তা নির্ধারণ করতে নীচের শর্তগুলো আসামিদের সামনে হাজির করা হলো–
১. একজন আসামি যদি দাবি করে (বিশ্বাসঘাতকতা) যে, অপর জন অপরাধী আর অপর জন যদি নিশ্চুপ থাকে (সহযোগিতা), তাহলে প্রথম জন মুক্তি পাবে এবং দ্বিতীয়জন ৫ বছরের কারাদণ্ড পাবে।
২. উভয়েই যদি নিশ্চুপ থাকে (দুজনের মধ্যে সহযোগিতা) তাহলে উভয়েরই ২ বছরের কারাদণ্ড হবে।
৩. উভয়েই যদি একে অপরকে দোষারোপ করে অপরাধী বানানোর চেষ্টা করে (দুইজনের মধ্যে বিশ্বাসঘাতকতা), তবে তাদের প্রত্যেকের ৪ বছরের কারাদণ্ড হবে।
এখন তাহলে আসামিদ্বয় কী করবে? তারা উত্তর খুঁজতে চেষ্টা করবে, কী করে নিজের সর্বোচ্চ লাভ হবে কিংবা নিজের সর্বোচ্চ ক্ষতি এড়ানো যাবে। প্রথমে হয়তো এক আসামি ভাববে, আমি যদি অপরকে দোষী বানাতে পারি, তাহলে আমি মুক্তি পাব। সুতরাং সে অপরজনকে দোষারোপ করবে। এখন দ্বিতীয়জন যদি নিশ্চুপ। থাকত তাহলে প্রথমজন মুক্তি পেয়ে সর্বোচ্চ লাভ অর্জন করে ফেলতো। কিন্তু মুশকিলটা হলো দ্বিতীয় আসামি যে নিশ্চুপ থাকবে তার তো কোনো গ্যারান্টি নেই। দ্বিতীয়জনও যদি প্রথমজনের মতোই অপরকে দোষারোপের কৌশল নেয়, তাহলেই হবে সমস্যা। দুইজনেরই সর্বোচ্চ ৪ বছর করে কারাদণ্ড হয়ে যাচ্ছে। তাহলে দেখা যাচ্ছে, দুজন দুজনকে দোষারোপ করতে গিয়ে নিজেরাই সর্বোচ্চ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে, তারচেয়ে বরং দুইজনই যদি নিশ্চুপ থাকত, তখন হয়তো শাস্তিমাত্রা কমে আসত। এই পুরো খেলাটা একাধিকবার পরিচালনা করা হলে হয়তো কারাবন্দিদের মধ্যে একটা সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে উঠবে, ফলে তারা নিজেদের মধ্যে বোঝাপরা করে গেম থিওরির মাধ্যমে ঘটা স্থিতিশীল কৌশল আয়ত্ব করে নেবে। বাস্তবেও তাই হয়। সেজন্যই আমরা দেখি দাগি ভয়ংকর সব আসামিদের মধ্যেও কিংবা মাফিয়া চক্রের মধ্যেও এক ধরনের সহযোগিতার সম্পর্ক থাকে। তারা পারতপক্ষে একে অপরকে ধরিয়ে দেয় না।
ট্রপিকাল রেইন ফরেস্টের দীর্ঘকায়া গাছগুলো আসামির সংকটের বাস্তব উদাহরণ। সেখানে গাছগুলোকে কেবল বংশবৃদ্ধির ব্যাপারটিই কেবল দেখতে হয় না, পাশাপাশি বাড়াতে হয় নিজেদের উচ্চতাকেও। সেই ঘন বনভূমিগুলোতে সূর্যের আলো নীচ পর্যন্ত পৌঁছয় না। কাজেই উচ্চতায় খাটো হলে থেকে যায় সূর্যের আলো না পেয়ে মারা যাওয়ার সম্ভাবনা। কাজেই অন্য জায়গার গাছেদের মতো উচ্চতা বাদ দিয়ে কেবল বংশবৃদ্ধি করা কোনো অপশনই নয় তাদের জন্য। তাই রেইন ফরেস্টের গাছের জন্য কখন বংশবৃদ্ধি করতে হবে, আর কখন উচ্চতা বাড়াতে হবে–এ নিয়ে সবসময় চলে ক্রীড়াতত্ত্বের জটিল এক খেলা। ক্রীড়াতত্ত্বের ব্যবহারিক প্রয়োগ লক্ষ করা যায় জমিতে কৃষকদের কীটনাশক প্রদানের ক্ষেত্রেও। কৃষকেরা দেখেছেন যে একটি কীটনাশক ব্যবহার করে কোনো একটি ক্ষতিকর কীট ধ্বংস করলে অনেক সময় হিতে বিপরীত হয় দেখা যায় সেই কীট মরলেও তার প্রতিযোগী অন্য কোনো ক্ষতিকর কীটের সুবিধা করে দেবার ঘটনা ঘটছে; যার নীট ফলাফল ফসলের জন্য ক্ষতি। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকেই কৃষকেরা সিদ্ধান্ত নেন। কখন কীটনাশক প্রয়োগ করবেন, কখন ছাড় দেবেন, আর প্রয়োগ করলে কোনো কোনো কীটের জন্য ওষুধ প্রয়োগ করবেন ইত্যাদি। আসলে কৃষকের মনে চলতে থাকে আসামির সংকটের মতোই গেম তত্ত্বের নিরন্তর খেলা। জীবজগতের বিবর্তন ভারসাম্যও কিন্তু অনেকটা এভাবেই কাজ করে। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে চলমান প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিবর্তন আদিমকালের মানুষের মধ্যে বহু সংঘর্ষ, সহাবস্থান, পারস্পরিক যোগাযোগ, প্রতিযোগিতা এবং সামাজিক লাভ ক্ষতির হিসেবে থেকে এক ধরনের নৈতিক চেতনার উদ্ভব ও বিকাশ ঘটিয়েছে। কীভাবে সেটা সম্ভব তা বুঝতে হলে আমাদের রিচার্ড ডকিন্সের স্বার্থপর জিন তত্ত্বের মাধ্যমে ঘটা ‘বিবর্তনীয় স্থিতিশীল কৌশল সম্বন্ধে একটু জানতে হবে।
চিত্র। পেজ ২৫৪
চিত্র : আসামির সঙ্কট— ক্রীড়াতত্ত্বের একটি অতি পরিচিত উদাহরণ।
.
স্বার্থপর জিন এবং বিবর্তনীয় স্থিতিশীল কৌশল
রিচার্ড ডকিন্সের সেলফিশ জিন বইটির কথা আমরা আগেও বলেছি। ডকিন্স বইটি লেখেন ১৯৭৬ সালে। এটি রিচার্ড ডকিন্সের প্রথম বই এবং তার শ্রেষ্ঠ কীর্তিগুলোর একটি। এই বইয়ের মাধ্যমেই ডকিন্স সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করলেন যে, বিবর্তন কাজ করে জিনের উপর, একক কোনো জীবের উপর নয়। আমাদের দেহ যাই করুক শেষ পর্যন্ত ‘অত্যন্ত স্বার্থপর’ভাবে জিনকে রক্ষা করা আর জিনকে পরবর্তী প্রজন্মে পৌঁছে দেয়াতেই উদ্দেশ্য খুঁজে নিতে বাধ্য করে, বিবর্তনীয় দৃষ্টিকোণ থেকে জীবনের কোনো ‘উদ্দেশ্য যদি থেকে থাকে তবে সেটাই সে উদ্দেশ্য। বইটির নাম ‘সেলফিশ জিন’ হলেও বইটির মূল লক্ষ্য ছিল ঠিক বিপরীত। জিনগত স্বার্থপরতা থেকেই ক্রমান্বয়ে কীভাবে উদ্ভব হয় পরার্থিতার মতো একটি বিপরীতমুখী অভিব্যক্তির–তা ব্যাখ্যা করাই ছিল বইয়ের মূল উদ্দেশ্য। ডকিন্স কিন্তু নতুন কিছু লেখেননি, বরং জর্জ উইলিয়ামস এবং উইলিয়াম হ্যামিলটনের কাজগুলোকেই জনপ্রিয় বিজ্ঞানের মোড়কে মলাটবন্দি করেছেন। তথ্যে নতুনত্ব না থাকলেও নিঃসন্দেহে নতুনত্ব আর অভিনবত্ব ছিল উপস্থাপনায়। উইলিয়ামস এবং হ্যামিলটনের কাজ ছিল একেবারেই কাঠখোট্টা একাডেমিক লেভেলে। ডকিন্স তাদের কাজকেই সাধারণ মানুষের দরবারে নিয়ে গেলেন একাডেমিক জার্গন সরিয়ে। আসলে এমনকি একাডেমিক স্তরেও ডকিন্সের বইটি প্রকাশের আগে এত ব্যাপকভাবে উইলিয়ামস এবং হ্যামিলটনের কাজ সম্বন্ধে কারও এতো জানাশোনা কিংবা গ্রহণযোগ্যতা ছিল না। এই বইয়ের মাধ্যমেই আসলে জীববিজ্ঞানীরা সমাজ এবং জীবনকে ভিন্নভাবে দেখা শুরু করলেন। পরার্থিতা, আত্মত্যাগের মতো যে বিষয়গুলো আগে বিজ্ঞানীরা পরিষ্কার করে ব্যাখ্যা করতে পারতেন না, সেগুলো আরও বলিষ্ঠভাবে জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করতে পারলেন তারা। ডকিন্সের বইটি প্রকাশের আগে জীববিজ্ঞানীরা পরার্থিতা এবং আত্মত্যাগকে ব্যাখ্যা করতেন গ্রুপ সিলেকশন বা দলগত নির্বাচনের মাধ্যমে। অর্থাৎ, আত্মত্যাগ ব্যাপারটি ব্যক্তির জন্য খারাপ হলেও পুরো দলের জন্য ভালো–এটাই ছিল আত্মত্যাগের মতো প্রবৃত্তিগুলো টিকে থাকার কারণ–এভাবেই ভাবতেন জীববিজ্ঞানীরা। কিন্তু ডকিন্সের সেলফিশ জিন বইটি এসে দাবার ছক একেবারেই উলটে দিল। ডকিন্স দেখালেন যে, দলের কথা মাথায় রেখে বিবর্তন কখনোই কাজ করে না। আসলে দলগত নির্বাচন ব্যাপারটাই বিবর্তনের পরিভাষা থেকে উঠিয়ে দেয়া উচিত। যে ব্যাপারগুলোকে আপাতঃভাবে দলগত নির্বাচনের সাহায্যে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে, তার সবগুলোকেই আসলে স্বার্থপর জিন তত্ত্বের মাধ্যমে আরও অনেক ভালোভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। কারণ, নির্বাচন হয় জিন লেভেলে, গ্রুপ লেভেলে নয়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই জীববিজ্ঞানীরা লক্ষ করেছেন নিজের জিনকে রক্ষা কিংবা যাদের সাথে জিনের নৈকট্য বেশি থাকে, তাদেরকেই রক্ষার তাগিদ প্রকৃতিতে পাওয়া যায়। আর তা থেকেই ঘটে বৃহৎ স্কেলে পরার্থিতার সূত্রপাত। পিঁপড়া, মৌমাছি, উইপোকা থেকে শুরু করে বানর, শিম্পাঞ্জি কিংবা মানুষ সব ক্ষেত্রেই দেখা গেছে জিনগত স্বার্থপরতা থেকেই উদ্ভব ঘটে পরার্থিতার, যা এতোদিন ভুল ভাবে ব্যাখ্যা করা হতো দলগত নির্বাচনের মাধ্যমে। জীববিজ্ঞানে এ এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। মানবসমাজের বিভিন্ন সামাজিক প্যাটার্ন ব্যখ্যা করার নতুন এক দুয়ার খুলে দিল ডকিন্সের স্বার্থপর জিন তত্ত্ব। স্বার্থপর জিনতত্ত্বই দলগত নির্বাচনকে সার্থকভাবে প্রতিস্থাপন করল উইলিয়ামস- হ্যামিলটন-স্মিথের প্রস্তাবিত স্বজাতি নির্বাচন (Kin selection) দিয়ে।
